যাদের এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে, যাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে চলার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ? (avoid and turn away from/ignoring)

ঈমান, আত্মসম্মান ও মানসিক প্রশান্তি রক্ষায় যাদের এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে- 

মুমিনরা কাদের সঙ্গ বর্জন করবে এবং কেন? — আল-কোরআনের আলোকে বর্জন ও উপেক্ষার নীতিমালা

জাহেল, বিদ্রূপকারী ও হঠকারীদের উপেক্ষা করা: ‘ইবাদুর রহমান’-এর বৈশিষ্ট্য ও কোরআনিক নির্দেশনা

আল-কোরআনে আল্লাহ মুমিনদের মানসিক প্রশান্তি, ঈমানের সুরক্ষা এবং সময়ের সঠিক ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণীর মানুষ ও পরিবেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে (তাওয়াল্লা), এড়িয়ে চলতে বা উপেক্ষা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশগুলো পালন করলে মুমিনরা অহেতুক বিবাদ ও পাপ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারেন।

নিচে বিস্তারিত তালিকা ও অনুধাবন দেওয়া হলো:

নিচের দিকে ভিডিও রয়েছে-

১. যারা আল্লাহর আয়াত নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও উপহাস করে (সূরা আল-আনআম: ৬৮):

যারা আল্লাহর আয়াত নিয়ে অযৌক্তিক তর্ক, হাসি-তামাশা বা বাজে মন্তব্য করে, অপছন্দ করে- তাদের সঙ্গ ত্যাগ করতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

  • আয়াত: "আর যখন আপনি তাদেরকে দেখেন যারা আমার আয়াতসমূহ নিয়ে উপহাসমূলক আলোচনায় মগ্ন হয়, তখন আপনি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন (উপেক্ষা করুন), যে পর্যন্ত না তারা অন্য কোনো প্রসঙ্গে লিপ্ত হয়।"

  • অনুধাবন: এখানে আল্লাহ সরাসরি নির্দেশ দিচ্ছেন যে, কোনো মজলিসে বা আড্ডায় যদি আল-কোরআনের কোন আয়াতকে নিয়ে ব্যাঙ্গ করা হয়, তবে সেখানে বসে থাকা যাবে না। তাদের সাথে তর্কে না জড়িয়ে সেখান থেকে উঠে যাওয়া বা তাদের এড়িয়ে চলাই মুমিনের কাজ।

২. জাহেল বা মূর্খ—যারা অহেতুক তর্কে লিপ্ত হতে চায় এবং ‘ইবাদুর রহমান’ হিসেবে তাদের এড়িয়ে চলা (আয়াত ৭:১৯৯, ২৫:৬২):

এখানে ‘জাহেল’ বলতে কেবল নিরক্ষর নয়, বরং যারা হঠকারী, অযৌক্তিক তর্ক করে এবং আচরণের দিক দিয়ে অসভ্য, তাদের বোঝানো হয়েছে। আল্লাহর বিশেষ বান্দা বা ‘ইবাদুর রহমান’-এর অন্যতম গুণ হলো এসব মানুষের সাথে তর্কে না জড়িয়ে শান্তি বজায় রেখে সরে পড়া।

  • আয়াত ১: "ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তুলুন, সৎকাজের নির্দেশ দিন এবং মূর্খদের (জাহেলদের) এড়িয়ে চলুন।" (৭:১৯৯)

  • আয়াত ২: "আর দয়াময় আল্লাহর (প্রকৃত) বান্দা (ইবাদুর রহমান) তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদের সাথে যখন মূর্খরা (জাহেলরা) কথা বলতে থাকে (তর্ক বা কটূক্তি করে), তখন তারা বলে, ‘সালাম’ (শান্তি) [অর্থাৎ তর্কে না জড়িয়ে বিদায় নেয়]।" (২৫:৬৩)

  • অনুধাবন: এই শ্রেণীর মানুষরা সাধারণত উস্কানিমূলক কথা বলে ঝগড়া লাগাতে চায়। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন তাদের কথার উত্তর একই ভাষায় না দিয়ে ভদ্রভাবে ‘সালাম’ বলে বা উপেক্ষা করে চলে যেতে। এটি মুমিনের আভিজাত্য বা ‘ডিগনিটি’ রক্ষা করে।

৩. যারা অসার ও অনর্থক কথাবার্তায় (Lagw) লিপ্ত (আয়াত ২৮:৫৫, ২৩:৩)

যারা সময় নষ্টকারী ফালতু কথা, অশ্লীল আলাপ বা গীবত-শেকায়েতে মগ্ন থাকে, মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হলো তারা এসব থেকে নিজেদের সম্মান বাঁচিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায়।

  • আয়াত: "আর যখন তারা কোনো অসার (বাজে) বাক্য শোনে, তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে... আমরা মূর্খদের সাথে জড়াতে চাই না।" (২৮:৫৫)

  • অনুধাবন: এখানে উপেক্ষা করা বা পাশ কাটিয়ে যাওয়া হলো আত্মসম্মানবোধের পরিচায়ক। মুমিনরা নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে না এবং নোংরা আলাপে নিজেদের জবান মলিন করে না।

৪. যারা কেবল দুনিয়াকামী এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ (সূরা আন-নাজম: ২৯)

এমন ব্যক্তি যারা আখেরাতকে ভুলে গেছে এবং দুনিয়ার স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বোঝে না, তাদের জীবনদর্শন গ্রহণ করা থেকে সতর্ক করা হয়েছে।

  • আয়াত: "অতএব আপনি তাকে উপেক্ষা করুন (তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন), যে আমাদের স্মরণে বিমুখ হয়েছে এবং কেবল পার্থিব জীবনই কামনা করে।"

  • অনুধাবন: মুমিনদের বলা হয়েছে, যাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ভোগবিলাস, তাদের সঙ্গ বা প্রভাব থেকে দূরে থাকতে হবে, যাতে মুমিনদের আখেরাতমুখী মানসিকতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

৫. যারা মুখে বিশ্বাসী কিন্তু অন্তরে অবিশ্বাসী (4:৬৩)

মুনাফিকরা নানা অজুহাত দেখায় এবং ষড়যন্ত্র করে। আল্লাহ তাদের মিথ্যা অজুহাত গ্রহণ না করে তাদের উপেক্ষা করতে বলেছেন, তবে তাদের নসিহত চালিয়ে যেতে বলেছেন।

  • আয়াত: "অতএব, আপনি তাদের উপেক্ষা করুন (তাদের ওজর-আপত্তি শুনবেন না), তাদেরকে নসিহত করুন এবং তাদের মর্মে দাগ কাটে এমন হিতোপদেশ দিন।"

  • অনুধাবন: এখানে উপেক্ষা করার অর্থ হলো—তাদের ষড়যন্ত্রকে ভয় না পাওয়া এবং তাদের মিথ্যা ওজরের ওপর ভরসা না করা।

৬. মুশরিক বা সত্য প্রত্যাখ্যানকারী (15: ৯৪)

যখন সত্য প্রচারের পরও কেউ জেদ ধরে বসে থাকে এবং শত্রুতা করে, তখন তাদের সাথে বিবাদ না বাড়িয়ে তাদের উপেক্ষা করতে বলা হয়েছে।

  • আয়াত: "অতএব আপনাকে যে আদেশ দেওয়া হয়েছে তা আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন এবং মুশরিকদের উপেক্ষা করুন (তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন)।"

৭. কুফরী ও ফাসিক অবস্থায় মৃত মুনাফিক (9: ৮৪)

যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে শত্রুতা করে মারা গেছে, তাদের জানাজা বা কবর জিয়ারত থেকে মুমিনদের সম্পূর্ণ বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

  • আয়াত: "আর তুমি তাদের মধ্য থেকে মারা গেছে এমন কারো ওপর কখনও সলাত কোরো না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবে না। নিশ্চয় তারা আল্লাহর ও তাঁর রসূলের সাথে কুফর করেছে এবং তারা ফাসিক অবস্থায় মারা গিয়েছে।"

  • অনুধাবন: এটি ‘উপেক্ষা’ বা ‘বর্জনে’র চূড়ান্ত পর্যায়। জীবিত অবস্থায় সতর্ক থাকার পাশাপাশি, মৃত্যুর পর তাদের সাথে আধ্যাত্মিক সম্পর্কও ছিন্ন করতে হবে।

৮. দাম্পত্যসাথীদের মধ্যে ও সন্তানদের মধ্যে যারা ‘শত্রু’ বা দ্বীনের পথের বাধা (64: ১৪)

পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যারা দ্বীন পালনে বাধা দেয়, তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ নয়, বরং তাদের ভুলগুলো উপেক্ষা বা ক্ষমা করতে বলা হয়েছে।

  • আয়াত: "হে মুমিনগণ! তোমাদের দাম্পত্যসাথীদের মধ্যে ও সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু... আর যদি তোমরা তাদেরকে মার্জনা করো (ভুল উপেক্ষা করো/তাসফাহু), তাদের দোষ এড়িয়ে যাও এবং ক্ষমা করে দাও, তবে নিশ্চয় আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল..."

  • অনুধাবন: এখানে উপেক্ষা করার অর্থ হলো—তাদের ওপর রাগ না করা এবং পারিবারিক শান্তি বজায় রাখার স্বার্থে তাদের ভুলগুলো দেখেও না দেখার ভান করা (সংশোধনের চেষ্টা সহকারে)।

৯. আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চরম বিরুদ্ধাচরণকারী আত্মীয়-স্বজন (সূরা আল-মুজাদালাহ: ২২)

এমন আত্মীয় যারা আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তাদের সাথে অন্তরের গভীর ভালোবাসা বা বন্ধুত্ব (Muwaddah) রাখা যাবে না।

  • আয়াত: "আপনি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী এমন কোনো সম্প্রদায় পাবেন না, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারীদের সাথে বন্ধুত্ব বা ভালোবাসা পোষণ করে, এমনকি তারা যদি তাদের পিতা, পুত্র, ভাই বা জ্ঞাতি-গোষ্ঠীও হয়..."

  • অনুধাবন: এখানে ‘আবেগীয় উপেক্ষা’ (Emotional Detachment) করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, তাদের প্রতি আত্মীয়তার সাধারণ হক আদায় করা যাবে, কিন্তু অন্তরের গভীর বন্ধুত্ব রাখা যাবে না যা ঈমানকে দুর্বল করে।

১০. চূড়ান্ত হঠকারী ও সত্য বিমুখ জাতি—দাওয়াতের পর (সূরা আয-যারিয়াত: ৫১:৫৪-৫৫; সূরা আল-কামার: ৫৪:৬)

যাদেরকে বারবার বোঝানোর পরও তারা সত্য গ্রহণ করে না, তাদের পেছনে আর সময় নষ্ট না করে মুখ ফিরিয়ে নিতে বলা হয়েছে।

  • আয়াত: "অতএব আপনি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন (ফাতাওয়াল্লা ‘আনহুম), এতে আপনার কোনো দোষ নেই।" (৫১:৫৪)

  • অনুধাবন: এটি মুমিনদের দায়মুক্তির ঘোষণা। সত্য পৌঁছে দেওয়ার পর হঠকারীদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যাতে নিজের শক্তি ও সময় নষ্ট না হয়।

১১. আত্মিকভাবে ‘মৃত’ ও ‘বধির’—যারা সত্য শুনে পিঠ ফিরিয়ে নেয় (সূরা আন-নামল: ২৭:৮০; সূরা আর-রূম: ৩০:৫২)

যাদের বিবেক মরে গেছে, তাদের পেছনে দাওয়াতের শ্রম দেওয়া অর্থহীন, তাই তাদের উপেক্ষা করতে হবে।

  • আয়াত: "নিশ্চয় আপনি মৃতদেরকে শোনাতে পারবেন না এবং আপনি বধিরকেও আহ্বান শোনাতে পারবেন না, যখন তারা পিঠ দেখিয়ে মুখ ফিরিয়ে চলে যায়।"

  • অনুধাবন: এই আয়াতগুলো শেখায় যে, যারা সত্য শোনার যোগ্যতাই হারিয়ে ফেলেছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে পিঠটান দেয়, তাদের নিয়ে মুমিনদের হতাশ হওয়ার কিছু নেই; বরং তাদের এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।


সারসংক্ষেপ:
কোরআনের এই আয়াতগুলো একত্রিত করলে দেখা যায়, আল্লাহ মুমিনদের বিদ্রূপকারী, জাহেল, অসার আলাপকারী, দুনিয়াপূজারী, মুনাফিক এবং চরম হঠকারীদের থেকে সামাজিক ও মানসিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলেছেন। একই সাথে পারিবারিক ক্ষেত্রে ভুল উপেক্ষা বা ক্ষমা করতে এবং আল্লাহর শত্রুদের সাথে আত্মিক সম্পর্ক বর্জন করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

ভিডিও-১


ভিডিও-২


Post a Comment (0)
Previous Post Next Post