■ সওয়াব অর্জনের আগে উল্লেখিত অন্যায়/নিষিদ্ধ আইটেম থেকে বিরত হওয়া:
➥ তবে যদি তারা বিরত হয়, তাহলে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু-আয়াত 2:192
দুআ ভিডিও নিচের দিকে
➥ নিচের আয়াত দুখানা অনুধ্যান করলে দেখা যায়, এই আয়াতসমূহে প্রদত্ত আদেশ ও নিষেধের ভেতরেই গুনাহের (কবিরা গুনাহ) প্রকৃত বিষয়টিও সূক্ষ্মভাবে নিহিত আছে—মানা ও না-মানার মাঝেই মানুষের নৈতিক অবস্থান নির্ধারিত হয়।
নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতার ও সদাচারের ও নিকটাত্মীয়কে দান করার বিষয়ে আদেশ দেন এবং অশ্লীলতা ও মন্দকাজ ও বাড়াবাড়ি থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো। আর তোমরা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করো, যখন তোমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হও। আর তোমরা শপথ ভঙ্গ কোরো না তা সুদৃঢ় করার পর। অথচ তোমরা আল্লাহকে তোমাদের ওপর দায়িত্বশীল বানিয়েছ। নিশ্চয় আল্লাহ জানেন যা তোমরা করো- আয়াত ১৬:৯০-৯১
এই আয়াতদ্বয়ে নির্দেশ (আদেশ) ও নিষেধগুলো গুনে দেখলে এমন দাঁড়ায়—
আদেশ (৩টি):
১. ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন করা
২. সদাচার করা
৩. নিকটাত্মীয়কে দান করা
(+ পাশাপাশি অর্থগতভাবে আরও দু’টি নির্দেশ ধরা হয়:
৪. উপদেশ গ্রহণ করা
৫. অঙ্গীকার পূর্ণ করা)
সরাসরি মূল কর্মমূলক আদেশ ধরা হলে ৩টি, আর প্রসারিত অর্থে নিলে ৫টি।
নিষেধ (৩টি):
১. অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকা
২. মন্দকাজ থেকে বিরত থাকা
৩. সীমালঙ্ঘন (বাড়াবাড়ি) থেকে বিরত থাকা
(+ আরেকটি স্পষ্ট নিষেধ:)
৪. শপথ ভঙ্গ না করা
মোট নিষেধ ৪টি।
সংক্ষেপে: মূল আদেশ: ৩টি (বা বিস্তৃত অর্থে ৫টি)
নিষেধ: ৪টি।
সুতরাং আমাদের জেনে নেয়া উচিৎ- আমাদের রবের দৃষ্টিতে কাবীরা গুনাহ’ বা বড় বড় গুনাহ, পাপ বা অন্যায়গুলি কী কী?
যেগুলোর জন্য অবশ্যই শাস্তিযোগ্য যদি ক্ষমা না পাওয়া যায়, এগুলো একটি স্পষ্ট তালিকা কেবলমাত্র আয়াত অনুধাবনে-‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’ অনুযায়ী-
কুরআন মাজিদের আলোকে ‘কাবীরা গুনাহ’ বা মহাপাপগুলো চিহ্নিত করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হলো—যেসব কাজের জন্য কুরআনে জাহান্নামের আগুনের হুমকি দেওয়া হয়েছে, আল্লাহর লানত (অভিশাপ) দেওয়া হয়েছে, অথবা আল্লাহর ক্রোধের কথা বলা হয়েছে। নিচে ‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’ (কুরআন দিয়ে কুরআনের ব্যাখ্যা) এর আলোকে সাজানো কাবীরা গুনাহের বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হলো:
সূরা আন-আনআম (আয়াত ৬:১৫১-১৫২) এবং সূরা বনী ইসরাঈল বা আল-ইসরা (আয়াত ১৭:২২-৪১) -এর বিষয়বস্তু প্রায় একই এবং এগুলোকে কুরআনের 'নৈতিক নির্দেশাবলী' বা 'শাশ্বত ওসিয়ত' বলা হয়।
বলো! তোমরা এস! তোমাদের রব তোমাদের উপর যা হারাম করেছেন আমি সেগুলো বর্ণনা করছি যে-
১. নিষেধাজ্ঞাসমূহ (হারাম বা বর্জনীয় কাজ): আয়াতগুলোতে যে বিষয়গুলো কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে:
১. নিষেধাজ্ঞাসমূহ (হারাম বা বর্জনীয় কাজ): আয়াতগুলোতে যে বিষয়গুলো কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে:
আল্লাহর সাথে শিরক করা (যুক্ত করা/ অংশীবাদ): আল্লাহর সত্তা বা গুণাবলীতে অন্য কাউকে অংশীদার করা বা সমকক্ষ মনে করা। ( দলিল: আয়াত ৬:১৫১, ১৭:২২, ৪:৪৮, ৩১:১৩)
আল্লাহর সাথে শিরক করা (যুক্ত করা/ অংশীবাদ): আল্লাহর সত্তা বা গুণাবলীতে অন্য কাউকে অংশীদার করা বা সমকক্ষ মনে করা। ( দলিল: আয়াত ৬:১৫১, ১৭:২২, ৪:৪৮, ৩১:১৩)
➥ ইবাদতে শিরক: দললি: আয়াত ১৭:২৩, ১৮:১১০
➥ অহীর সাথে কিছু যুুক্ত করলে বা শিরক করলে আমল বরবাদ: ৩৯:৬৫, ৬:৮৮, ৬৯:৪৪, ৩:১৫১
2. পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার (ইহসান): পিতা-মাতার সাথে সর্বোত্তম ব্যবহার করা। বিশেষ করে বার্ধক্যে তাদের ধমক না দেওয়া, 'উফ' শব্দ না করা এবং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলা।
(আয়াত ৬:১৫১, ১৭:২৩–২৪)
3. সন্তান হত্যা করা: দারিদ্র্যের কারণে (বর্তমানে অভাব আছে বলে) অথবা দারিদ্র্যের ভয়ে (ভবিষ্যতে অভাব হবে ভেবে) সন্তানকে হত্যা করা। (আয়াত ৬:১৫১, ১৭:৩১)
4. অশ্লীলতা—খোলা ও গোপন—কাছেও না যাওয়া: প্রকাশ্য হোক বা গোপন—যেকোনো অশ্লীল কাজ (যেমন: ব্যভিচার বা যিনা) এবং এর ধারেকাছে যাওয়াও হারাম। (আয়াত ৬:১৫১, ১৭:৩২)
5. আর তোমরা ব্যভিচার/জিনার কাছে যেও না। নিশ্চয় তা হলো অশ্লীল এবং পথ হিসাবে অতি মন্দ-আয়াত ১৭:৩২
6. যেকোন প্রাণকে হত্যা হারাম—তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা নিষিদ্ধ: (আয়াত ৬:১৫১, ১৭:৩৩)
“যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করল... সে যেন দুনিয়ার সকল মানুষকে হত্যা করল।” (৫:৩২)
যেকোন প্রাণকে হত্যা হারাম—তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা নিষিদ্ধ: (আয়াত ৬:১৫১, ১৭:৩৩)
দলিল: “যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করবে, তার শাস্তি জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তার প্রতি রাগান্বিত হবেন ও তাকে অভিশাপ দেবেন।” (৪:৯৩)
পরিমাপ ও পরিমাপকে পূর্ণ না করে দেয়া (পারফেক্ট মাপ-ঝোপ): ব্যবসা-বাণিজ্যে ওজন ও মাপে কম না দেওয়া এবং দাঁড়িপাল্লা সঠিক রাখা। (আয়াত ৬:১৫২, ১৭:৩৫)
অপচয় (তাব্জির) করা নিষিদ্ধ: সম্পদ অহেতুক উড়ানো বা অপব্যয় করা (শয়তানের ভাই হওয়া)। (১৭:২৬–২৭) কৃপণতা বা অত্যধিক কঞ্জুস/কার্পণ্য করা নিষিদ্ধ:
অহংকার ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ নিষিদ্ধ: (আয়াত ১৭:৩৭) অনুমান নির্ভর কথা বলা: এমন বিষয়ের পেছনে লাগা নিষিদ্ধ যার সম্পর্কে জ্ঞান নেই (যেমন: মিথ্যা সাক্ষ্য, গুজব ছড়ানো), তার পেছনে পড়া। (আয়াত ১৭:৩৬) আত্মীয় ও অভাবীদের হক আদায়: আত্মীয়-স্বজন, মিসকিন এবং মুসাফিরদের প্রাপ্য অধিকার বা সাহায্য প্রদান করা (আয়াত ১৭:২৬) অন্যায় কথা/মিথ্যা সাক্ষ্য/অবিচার করা নিষিদ্ধ: কথা বলার সময় বা সাক্ষ্য দেওয়ার সময় সর্বদা সত্য ও ন্যায় কথা বলা, এমনকি তা নিজের আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে গেলেও। (আয়াত ৬:১৫২, ১৭:৩৩ ও ১৭:৩৬) প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা নিষিদ্ধ — অঙ্গীকার পূরণ করা বাধ্যতামূলক : আল্লাহর সাথে বা মানুষের সাথে করা যেকোনো অঙ্গীকার বা ওয়াদা পূর্ণ করা। (আয়াত ৬:১৫২, ১৭:৩৪) মিথ্যা বলা বড় গুনাহ যেহেতু শাস্তির কথা উল্লেখিত): আয়াত ২:১০ (শেষাংশ)
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা শেষে বলেছেন, এগুলো এমন উপদেশ যা তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যেন মানুষ অনুধাবন করতে পারে এবং উপদেশ গ্রহণ করে।
۞ ۞ ۞ ۞ ۞ ۞ ۞
আরও বিস্তারিত:
1. নিফাক (কপটতা/মুনাফিকি):
৩. আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ:
৪. অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা:
৫. ফাসাদ বা বিপর্যয় সৃষ্টি (সন্ত্রাসবাদ/দাঙ্গা):
৬. যাদু (সিহর) বা কুফরি কালাম চর্চা (ঐশী শক্তির বিপরীতে শয়তানি শক্তির আশ্রয়):
◼ মুসল্লি না হওয়া:
▶ অপরাধীদের সম্পর্কে। কিসে তোমাদেরকে সাকারের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছে? তারা বলবে, আমরা মুসল্লিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। এবং আমরা মিসকিনদের খাওয়াতাম না। এবং আমরা অহেতুক সমালোচনাকারীদের সঙ্গে অহেতুক সমালোচনা করতাম। আর আমরা কর্মফল দিন সম্পর্কে মিথ্যারোপ করতাম। যতক্ষণ না আমাদের কাছে এসেছে ‘অবশ্যম্ভাবী বিশ্বাস’-সূরা আল মুদ্দাছছির 74:41-47
▶ “সুতরাং দুর্ভোগ সেই সালাত আদায়কারীদের জন্য, যারা তাদের সালাত সম্বন্ধে উদাসীন।” (সূরা মাউন: ৪-৫)
৮. যাকাত-সাদাকা না দেওয়া ও সম্পদ পুঞ্জীভূত করা (কৃপণতা)
৯. পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া ও অসদাচরণ
১০. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা:
১১. ব্যভিচার (যিনা) করা:
১২. চরিত্রবান সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি মিথ্যা অপবাদ দেওয়া (ক্বযফ)
১৩. এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করা:
১৪. সুদ (রিবা) খাওয়া:
১৫. যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া:
১৬. গীবত করা (মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সমান):
১৭. আল্লাহর আয়াত, বিধান বা সত্য গোপন করা:
১৮. ওজনে ( পরিমাপে ও পরিমাপক) কম দেওয়া (প্রতারণা )
১৯. অহংকার (তাকাব্বুর)/ দম্ভ ও অহংকার (ইবলিসি চরিত্র):
২০. মদ, জুয়া ও ভাগ্য গণনা:
২১. আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সীমারেখা লঙ্ঘন করা:
২২. আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া:
গভীরতর অনুধ্যান: ‘কাবাইর’ বনাম ‘লামাম’ (যৌক্তিক পূর্ণতা)
আল-কুরআন মাজীদের আয়াতের গাঁথুনি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘কাবাইর’ বা বড় পাপগুলো মূলত ‘হুদুদুল্লাহ’ বা আল্লাহর সীমানা লঙ্ঘন।
বিপরীত শব্দ (Antonym): ‘কাবাইর’-এর বিপরীতে এসেছে ‘সায়্যিআত’ (৪:৩১) বা ‘লামাম’ (৫৩:৩২)।
ইমপ্লাইড এভিডেন্স (অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত): বড় পাপগুলো সরাসরি মানুষের সমাজব্যবস্থা ও নৈতিক ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেয়। এজন্যই এগুলোর শাস্তি কঠোর।
তওবার সুযোগ: আল-কুরআনের সৌন্দর্য হলো, বড় পাপ করার পরও যদি কেউ একনিষ্ঠভাবে ফিরে আসে (তওবা), তবে আল্লাহ তার পাপকে পুণ্যে পরিণত করে দেন।
“তবে যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে নেকি দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন।” (২৫:৭০)
‘ইছম’ (إِثْم) বনাম ‘জুনা’ (جُنَاح): পাপাচারের ভাষাগত পার্থক্য (৬:১২০, ২:১৭৩):
আল-কুরআনে বড় পাপকে প্রায়শই ‘ইছম’ (إِثْم) বলা হয়েছে।
“তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন পাপ (إِثْمَ - ইছম) বর্জন করো; নিশ্চয়ই যারা পাপ অর্জন করে, শীঘ্রই তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দেওয়া হবে।” (৬:১২০)
গভীরতর সংযোগ: এর বিপরীতে যখন অনিচ্ছাকৃত বা নিরুপায় হয়ে কোনো কাজ করা হয়, তখন আল্লাহ ‘লা জুনাআ’ (لَا جُنَاحَ - কোনো পাপ নেই) শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন। যেমন—মৃত জানোয়ার ভক্ষণ করা হারাম, কিন্তু প্রাণ বাঁচানোর জন্য অনিচ্ছায় খেলে ‘ফলা ইছমা আলাইহি’ (তার ওপর কোনো পাপ নেই - ২:১৭৩)। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, ‘ইছম’ বা কাবাইরা পাপ কেবল কাজের মাধ্যমে নয়, বরং ‘ইচ্ছা’ ও ‘ধৃষ্টতা’র সাথে সম্পৃক্ত।
‘তাবদীল’ (تبديل): পাপের আধ্যাত্মিক রূপান্তর (২৫:৭০-৭১):
আল-কুরআনের এক সুগভীর ও বিস্ময়কর আধ্যাত্মিক দিক হলো—বড় পাপ করার পরও যদি কেউ একনিষ্ঠভাবে ফিরে আসে, তবে তার সেই অতীত পাপগুলো মুছে যায় না, বরং সেগুলো পরিবর্তিত হয়।
“তবে যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে; আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে নেকি দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন (يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ)।” (২৫:৭০)
আধ্যাত্মিক পূর্ণতা: এটিই হলো ‘মেটাফিজিক্যাল ট্রান্সফরমেশন’ বা আধ্যাত্মিক রূপান্তর। যখন একজন পাপী তার ‘কাবাইর’ বা বড় পাপের জন্য চরম অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে, তখন তার সেই অনুতাপের শক্তি এতোই প্রবল হয় যে, অতীতের বড় পাপগুলোও আল্লাহর রহমতে বড় নেকিতে পরিণত হয়। এটি আল্লাহর প্রশস্ত ক্ষমার (واسع المغفرة) এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
