পুরুষেরা আসলে বিয়ে করতে পারে কয়টি? বিয়ে কি এতই সহজ ব্যাপার? পাগলামী? নাকি একটিতেই কঠিন জবাবদিহিতা? দেখুন!
অনুধাবনের আয়োজনে: মতিউর রহমান খান
0
আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের অনুসরণকারী আয়াতের প্রতি বিশ্বাসী মুসলিমের সংখ্যা যদিও অপ্রতুল, কিন্তু স্বঘোষিত মুসলিমরা সুযোগ বুঝে মানবসৃষ্ট ধর্ম বানিয়ে এর যে কত ব্যবহার-অপব্যবহার করে তার ইয়াত্তা নেই। এর অন্যতম একটি বিষয় হলো – বিয়ে, যেখানে অবলীলায় অন্তত চারটি বিয়ের প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়।
এটি যে শুধুমাত্র একটি সামাজিক প্রথা নয়, বরং আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলার পক্ষ থেকে এক পবিত্র অঙ্গীকার। যেহেতু অনুসরনের জন্য আল-কোরআনের আয়াত পড়াশোনা হয় না, তাই ওভাবেই থেকে যায়। ফলশ্রুতিতে আল্লাহর রাসুলের একটি মামলাও ঠুকে দেয়া আছে এভাবে:
আর রসূল বলবেন – হে আমার রব! নিশ্চয় আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যাজ্য হিসাবে গ্রহণ করেছে-সূরা আল-ফুরকান ২৫:৩০।
যাহোক, প্রসঙ্গ বিয়ে, সেদিকেই ফিরে যাওয়া যাক:
ইসলামে বিয়ের বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবনযোগ্য। এটি শুধুমাত্র একটি সামাজিক প্রথা নয়, বরং আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এক পবিত্র অঙ্গীকার। আল-কোরআনে বিয়ের সংখ্যা এবং এর সাথে জড়িত দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে-
১টি ভিডিও নিচের দিকে দ্র:
বিবাহের সংখ্যা ও শর্তাবলি:
আল্লাহ তা'আলা সূরা আন-নিসার ৩ নম্বর আয়াতে বহু বিবাহের অনুমতি দিয়েছেন, তবে কঠোর শর্তসাপেক্ষে।
অনুবাদ-১: আর যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে, এতীমদের ব্যাপারে তোমরা ইনসাফ বা সুবিচার করতে পারবে না, তাহলে তোমরা বিয়ে কর (এতিমদের বিধবা মা অথবা প্রাপ্তবয়স্ক এতিম) নারীদের মধ্যে যাকে তোমাদের ভাল লাগে; দু’টি, তিনটি অথবা চারটি। আর যদি ভয় কর যে, তোমরা সমান আচরণ-ইনসাফ করতে পারবে না (এতিম সন্তানসহ বিধবা মায়েদের প্রতি) তবে মাত্র একজনঅথবা তোমাদের ডান হাত (শপথের মাধ্যমে) যার মালিক হয়েছে (তাদের মধ্য থেকে)। এটা তোমাদের জুলুম‑অবিচার না করার নিকটতর । [একের অধিক বিয়ে অসম্ভব=৪:১২৯] 4:127–129]
অনুবাদ-২:আর যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তোমরা ইয়াতীমদের প্রতি সুবিচার করতে পারবে না, তাহলে নারীদের মধ্য হতে যাকে তোমাদের ভালো লাগে বিয়ে করে নাও; দুই দুই করে বা তিন তিন করে কিংবা চার চার করে। তবে যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, তোমরা সুবিচার করতে পারবে না, তাহলে একজনকেইঅথবা তোমাদের ডান হাত যার মালিক হয়েছে তাকে। সেটাই অধিক নিকটবর্তী যে, তোমরা অবিচার করবে না।
এই আয়াতটি স্পষ্ট করে দেয় যে, একাধিক বিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র তখনই, যখন ব্যক্তি সকল স্ত্রীর প্রতি সমান আচরণ বা সুবিচার করতে সক্ষম হবে। যদি এই সুবিচার নিশ্চিত না করা যায়, তবে একজন স্ত্রীতেই সীমাবদ্ধ থাকা অত্যাবশ্যক।
সুবিচারের বাস্তবতা:
এরপর আল্লাহ তা'আলা সূরা আন-নিসার ১২৯ নম্বর আয়াতে সুবিচারের বাস্তবতার ওপর আলোকপাত করেছেন:
✨ সূরা আন-নিসা (৪:১২৯):
আর (জেনে রাখো) তোমরা যতই তীব্র ইচ্ছা-আশা-আকাঙ্ক্ষা কর না কেন, তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে কখনোই সম আচরণ/সমান ব্যবহার/ইনসাফ/সুবিচার করতে পারবে না। সুতরাং তোমরা কোনো একজনের প্রতি সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকে পড়ো না এবং অপরজনকে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখো না। যদি তোমরা নিজেদেরকে সংশোধন কর এবং সাবধানতা/সতর্কতা অবলম্বন কর, তবে (জেনে রেখো) নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
এই আয়াতটি একটি গভীর সত্য প্রকাশ করে – মানুষের পক্ষে একাধিক স্ত্রীর মধ্যে আবেগ ও ভালোবাসার দিক থেকে সম্পূর্ণ সুবিচার করা অত্যন্ত কঠিন। তবে, আর্থিক, বাসস্থান, সময় ও অন্যান্য ব্যবহারিক সুবিচারের ক্ষেত্রে সমতা বিধান অপরিহার্য। এই আয়াতে সতর্ক করা হয়েছে যে, কোনো একজনের প্রতি সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকে পড়ে অন্যজনকে যেন ‘ঝুলন্ত’ অবস্থায় না রাখা হয়।
বিবাহ একটি সুদৃঢ় অঙ্গীকার: 'মিছাকান গালীযান' (مِيثَاقًا غَلِيظًا):
বিয়ে শুধুমাত্র একটি সামাজিক চুক্তি নয়, এটি আল্লাহ তা'আলার সামনে করা এক 'সুদৃঢ় অঙ্গীকার' বা 'কঠোর চুক্তি'। কোরআনে 'মিছাকান গালীযান' শব্দটি এর গুরুত্বকে তুলে ধরে।
✨ সূরা আন-নিসা (৪:২১):
আর কিভাবে তোমরা তা (মোহর) ফিরিয়ে নেবে? অথচ তোমরা একে অপরের সাথে মিলিত হয়েছ এবং তারা তোমাদের কাছ থেকে সুদৃঢ় অঙ্গীকার (মিছাকান গালীযান) গ্রহণ করেছে।
এটি পরিষ্কারভাবে বোঝায় যে, বিবাহ এমন এক বন্ধন যা ভঙ্গ করা সহজ নয় এবং এর সাথে জড়িত দায়িত্বগুলো আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার বিষয়।
'মিছাকান' এবং জবাবদিহিতা:
'মিছাকান' (مِيثَاقًا) শব্দটি কোরআনে বিভিন্ন স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ 'অঙ্গীকার', 'চুক্তি', 'প্রতিজ্ঞা' বা 'চুক্তিপত্র'। এটি আল্লাহ, নবীগণ এবং মানুষের মধ্যকার সুদৃঢ় ও পবিত্র প্রতিশ্রুতিকে নির্দেশ করে। এই অঙ্গীকার সম্পর্কে পরকালে জিজ্ঞাসা করা হবে।
✨ সূরা বাকারাহ (২:২৭): যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ় অঙ্গীকার (মিছাক) করার পর তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ যা জোড়া লাগাতে নির্দেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করে; এরাই ক্ষতিগ্রস্ত।
✨ সূরা মা'ইদাহ (৫:৭): স্মরণ কর, আল্লাহ তোমাদের প্রতি তাঁর নিয়ামত এবং যে অঙ্গীকার (মিছাক) দ্বারা তিনি তোমাদেরকে আবদ্ধ করেছেন, যখন তোমরা বলেছিলে, 'আমরা শুনলাম ও মান্য করলাম'। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরের বিষয় সম্পর্কে সবিশেষ অবগত।
✨ সূরা রাদ (১৩:২০): যারা আল্লাহর অঙ্গীকার (মিছাক) পূর্ণ করে এবং চুক্তি ভঙ্গ করে না।
✨ সূরা আহযাব (৩৩:৭): স্মরণ কর! যখন আমি নবীদের কাছ থেকে তাদের অঙ্গীকার (মিছাক) গ্রহণ করেছিলাম এবং তোমার কাছ থেকেও, আর নূহ, ইব্রাহিম, মূসা ও ঈসা ইবনে মারিয়ামের কাছ থেকেও। আর আমি তাদের কাছ থেকে নিয়েছিলাম সুদৃঢ় অঙ্গীকার (মিছাকান গালীযান)।
সর্বোপরি, আল্লাহ তা'আলা অঙ্গীকার পূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন যে অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে:
আর তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কর, নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে-১৭:৩৪
উপসংহার:
এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, বিয়ে এক অতি পবিত্র, গুরুত্বপূর্ণ ও সুদৃঢ় অঙ্গীকার, যা শুধু ইহকালে নয়, পরকালেও এর প্রতিটি দিক সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। বিয়ের পূর্বে সংশ্লিষ্ট সকলকে এই কোরআনিক বিধান সম্পর্কে অবহিত করা অত্যন্ত জরুরি। যখন মানুষ আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান ছেড়ে দেয়, তখনই অজ্ঞতাবশত বা স্বেচ্ছায় জুলুম ও অবিচার করে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর নির্দেশনা অনুসরণ করে কোরআনভিত্তিক বিয়ের কার্য সম্পন্ন হলে, মানুষ এই পবিত্র সম্পর্কের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারত এবং এর মাধ্যমে সমাজে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হতো।