আদর্শ ‘ভালো মানুষ’: সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য:
সৃষ্টির মধ্যে (মানুষের মধ্যে) সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ কে, এই বিষয়ে সরাসরি কোনো আয়াতে নাম উল্লেখ করে বলা হয়নি যে অমুক ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ। তবে, আল-কোরআনে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য বা গুণাবলীর কথা বলা হয়েছে, যা মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাকওয়া (আল্লাহভীতি) এবং জ্ঞান (ইলম)।
সৃষ্টির
সেরা (খাইরুল বারিয়্যাহ):
সূরা
বাইয়্যিনাহ, আয়াত ৭:
إِنَّ
الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَٰئِكَ هُمْ خَيْرُ الْبَرِيَّةِ
"নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তারাই সৃষ্টির সেরা (খাইরুল বারিয়্যাহ)।"
এই আয়াতটি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, আল্লাহর
কাছে যারা ঈমান আনে
এবং সৎকর্ম করে, তারাই সমগ্র
সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ। এখানে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো ঈমান ও
আমালে সালিহ (সৎকর্ম)। এই আয়াতটি পরের আলোচনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে
তাকওয়া (আল্লাহভীতি) এবং জ্ঞান (যা
সৎকর্মের দিকে পরিচালিত করে)
এর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছিল।
অতএব, কোরআনের দৃষ্টিতে মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত মানদণ্ড হলো খাঁটি ঈমান এবং সেই ঈমানের প্রতিফলনস্বরূপ সৎকর্ম।
১. ভালো মানুষের মৌলিক সংজ্ঞা (আয়াতুল বির):
“পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফেরানোই সৎকর্ম নয়; বরং সৎকর্ম হলো—যে আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতাগণ, ঐশী কিতাব ও নবীদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে; এবং সম্পদের প্রতি ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও তা আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন, মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থী ও দাসমুক্তির জন্য ব্যয় করে; সালাত কায়েম করে ও জাকাত প্রদান করে; এবং প্রতিশ্রুতি দিলে তা পূর্ণ করে; এবং অর্থ-সংকট, দুঃখ-কষ্ট ও সংগ্রামের সময়ে ধৈর্য ধারণ করে। তারাই সত্যবাদী এবং তারাই মুত্তাকি।” (সূরা বাকারা: ১৭৭)
২. আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি:
ইরশাদ হয়েছে: “হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে মর্যাদাবান, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান (আল্লাহভীরু-আল্লাহ সচেতন)। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবখবর রাখেন” (সূরা আল-হুজুরাত: ৪৯:১৩)
৩. ‘ইবাদুর রহমান’ বা দয়াময়ের বান্দার বৈশিষ্ট্য:
৪. ভালো মানুষের সুনির্দিষ্ট ৯টি বৈশিষ্ট্য:
১. গভীর ঈমান ও আল্লাহর সাথে সম্পর্ক:
২. বিনয় ও নম্রতা:
▣অজ্ঞ বা মূর্খ লোকেরা যখন তাদের সাথে তর্কে লিপ্ত হয় বা কটূকথা বলে, তখন তারা তর্কে না জড়িয়ে ‘সালাম’ (শান্তি) বলে বিদায় নেয়।
▣তারা কাউকে কোনো কথা দিলে বা প্রতিশ্রুতি দিলে তা ভঙ্গ করে না (সূরা মুমিনুন: ৮)।
৪. অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকা:
৫. রাগ নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমা প্রদর্শন:
▣ তারা সচ্ছল ও অসচ্ছল উভয় অবস্থায় দান করে।৬. লজ্জাস্থান ও চরিত্রের হেফাজত:
▣ তারা নিজেদের চরিত্রের পবিত্রতা রক্ষা করে এবং অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকে (সূরা মুমিনুন: ৫)।৭. সত্যবাদিতা ও ন্যায়বিচার:
▣ তারা সর্বদা সত্য কথা বলে, এমনকি তা নিজের বা আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে গেলেও (সূরা নিসা: ১৩৫)।▣কারও প্রতি শত্রুতা থাকলেও তারা ন্যায়বিচার থেকে সরে আসে না।
৮. পিতামাতা ও মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার:
▣ তারা পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করে এবং তাদের ধমক দেয় না, বরং সম্মানসূচক কথা বলে (সূরা বনি ইসরাইল: ২৩)।▣তারা মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে এবং এতিম ও মিসকিনদের অবহেলা করে না।
৯. পরকালের ভয়:
▣ তারা তাদের রবকে ভয় করে এবং বিচার দিবসের শাস্তির ব্যাপারে ভীত থাকে। তারা মনে করে না যে তাদের আমলই যথেষ্ট, বরং সর্বদা আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী থাকে।সারসংক্ষেপ
জ্ঞানের ভিত্তিতে মর্যাদাবান:
কোরআনে জ্ঞানের গুরুত্বও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং জ্ঞানীদের উচ্চ মর্যাদা দান করা হয়েছে।
"...তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা অনেক ধাপ বাড়িয়ে দেবেন।
আর তোমরা যা করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।"
এখানে, মুমিনদের এবং জ্ঞানীদের মর্যাদার উচ্চতার কথা বলা হয়েছে।
