আল্লাহর নাযিলকৃত ওহির বিধান—আল-কোরআনের—সাথে অনাযিলকৃত কোনো গ্রন্থ, দলিল বা অনুসরণযোগ্য নির্দেশ যুক্ত করা নিঃসন্দেহে রবের সাথে শিরক করার শামিল -প্রমান-দলিল:
আল-কুরআন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নাজিলকৃত সর্বশেষ, চূড়ান্ত (Latest Edition) ও শাশ্বত গ্রন্থ—যা সমগ্র মানবজাতির জন্য একমাত্র পথনির্দেশনা। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এই ‘লেটেস্ট এডিশন’ বা সর্বশেষ সংস্করণটি নাযিল হওয়ার পর অনুসরনের জন্য পূর্বাপর- সকল বিধান এবং মানুষের তৈরি সকল গ্রন্থ ও মতবাদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘বাতিল’ (Discarded) হয়ে গেছে। কুরআনের এই পরম সত্য আসার পরেও যদি কেউ মানুষের তৈরি কোনো বিধান, দলিল, গ্রন্থ, দর্শন বা মতকে কুরআনের সাথে যুক্ত করে, কিংবা সেগুলোকে কুরআনের সমকক্ষ বা বিকল্প হিসেবে সমান্তরালভাবে অনুসরণ করে, তবে তা কুরআনের দৃষ্টিতে আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বে সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল। মূলত আল্লাহ প্রদত্ত নাযিলকৃত বিধানের সাথে অনাযিলকৃত কোনো কিছু সংযোজন করা মানেই তাঁর সঙ্গে শরিক স্থাপন করা। আর এই ভয়াবহ সত্যটি মনে করিয়ে দিয়ে আল্লাহ বলেন:
“আর তাদের অধিকাংশ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখে না, এমতবস্থায় ছাড়া যে তারা মুশরিক” -আয়াত: ১২:১০৬
আল-কুরআনই ‘একমাত্র সত্য’ (আল-হক) এবং এর বাইরে সব কিছুই ‘ভ্রষ্টতা’ (দলাল):
আল-কুরআন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত শাশ্বত এবং একমাত্র সত্য (Absolute Truth) বিধান। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বিভিন্ন আয়াতে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, এই কিতাবই হলো ‘হক’ এবং এর বাইরে যা কিছু আছে, তা কেবলই অনুমান, বিভ্রম বা ভ্রষ্টতা। কুরআন যে একমাত্র সত্য এবং এর বিকল্প কোনো কিছু হতে পারে না, সে সম্পর্কে কুরআনের অকাট্য দলিল ও যৌক্তিক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো:
আল-কুরআন বহাল রয়েছে, আর যেগুলোকে বাতিল ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে—তা এসেছে রব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে:
|
বলুন! সত্য (আল-কুরআন) এসেছে এবং মিথ্যা (বাতিল) বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা (বাতিল) বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল। আর আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত...-আয়াত: ১৭:৮১-৮২
|
❇️ তাহলে আমাদের জানতে হবে ‘হক’ কি আর ‘বাতিল’ কি?
➡️ হক্ক না জানলে বাতিল বোঝা যায় না:
১. রবের পক্ষ থেকে চুড়ান্ত সত্য (আল কুরআন) ও সংশয়মুক্ত বিধান:
আল্লাহ মানবজাতিকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, সত্য কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে এবং এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
➡ দলিল: সত্য (আল-হক) তোমার রবের পক্ষ থেকে; সুতরাং তুমি কখনোই সন্দেহপোষণকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না (আয়াত: ২:১৪৭)
➡ দলিল: “বলুন! ‘হে মানবকুল! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট সত্য (আল-হক) এসেছে। সুতরাং যে হিদায়াত গ্রহণ করবে, সে তো নিজের মঙ্গলের জন্যই হিদায়াত গ্রহণ করবে...’” (আয়াত: ১০:১০৮)
➡ দলিল: “এগুলো কিতাবের আয়াত। আর যা তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি নাযিল করা হয়েছে তা সত্য (হক), কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ঈমান আনে না (আয়াত: ১৩:১)
➡ দলিল: সেই কিতাব, কোনো সন্দেহ নেই; যার মধ্যে; মুত্তাকীদের জন্য হিদায়েত-আয়াত ২:২
২. সত্যের (কুরআনের) আগমনে মিথ্যার (বাতিল) বিনাশ:
সত্য যখন আসে, মিথ্যা তখন টিকতে পারে না। কুরআন হলো সেই সত্য যা বাতিলের মস্তকে আঘাত করে তাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়।
➡ দলিল: “বরং আমি সত্য (হক) দিয়ে মিথ্যার ওপর আঘাত হানি, ফলে তা মিথ্যাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়...” (আয়াত: ২১:১৮)
➡ দলিল: “বলুন, সত্য (কুরআন) এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।” (আয়াত: ১৭:৮১)
➡ দলিল: “বরং আমি তাদের কাছে সত্য (হক) নিয়ে এসেছি, আর তারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।” (আয়াত: ২৩:৯০)
৩. জ্ঞান ও সত্যের মাপকাঠি একমাত্র কুরআন:
যাদের প্রকৃত জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, তারা একমাত্র কুরআনকেই রবের পক্ষ থেকে আসা সত্য বলে মেনে নেয়।
দলিল: “আর যাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে, তারা জানে যে, আপনার রবের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, তা-ই সত্য (হক) এবং তা পরাক্রমশালী, প্রশংসিত আল্লাহর পথের দিকে পরিচালিত করে।” (আয়াত: ৩৪:৬)
দলিল: “আর যখন তারা রাসূলের প্রতি যা নাযিল হয়েছে (কুরআন) তা শোনে, তখন আপনি তাদের চোখগুলো অশ্রুসজল দেখতে পাবেন, কারণ তারা সত্য (হক) চিনতে পেরেছে। তারা বলে, ‘হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং আমাদেরকে সাক্ষ্যদানকারীদের তালিকাভুক্ত করুন। আর আমাদের কী হলো যে, আমরা আল্লাহর প্রতি এবং আমাদের নিকট যে সত্য (হক) এসেছে তার প্রতি ঈমান আনব না?...’ (আয়াত: ৫:৮৩-৮৪)
৪. বরকতময় কিতাব ও সত্যের সাক্ষ্য:
আল্লাহর কিতাব সত্য কথা বলে এবং এটি অত্যন্ত বরকতময়।
দলিল: “...আর আমার কাছে আছে এমন এক কিতাব, যা সত্য ব্যক্ত করে এবং তাদের ওপর জুলুম করা হবে না” (আয়াত: ২৩:৬২)
দলিল: “আর এটি (কুরআন) এমন এক কিতাব যা আমি নাযিল করেছি, যা বরকতময়; সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও” (আয়াত: ৬:১৫৫)
৫. কিতাবকে ‘সত্য’ হিসেবেই নাযিল করা হয়েছে:
আল্লাহ কুরআনকে সাধারণ কোনো বই হিসেবে নয়, বরং ‘সত্য’ বা ‘আল-হক’ হিসেবে নাযিল করেছেন, যা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যতা যাচাইকারী।
দলিল: “আর আমি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি সত্যসহ (বিল-হক), যা তার পূর্ববর্তী কিতাবকে সত্যয়নকারী এবং সেগুলোর ওপর তদারককারী...” (আয়াত: ৫:৪৮)
দলিল: “আর আমি কিতাব থেকে আপনার প্রতি যা ওহি করেছি, তাই সত্য (আল-হক)...” ( আয়াত: ৩৫:৩১)
দলিল: “এটা এজন্য যে, আল্লাহ সত্যসহ (বিল-হক) কিতাব নাযিল করেছেন। আর যারা কিতাব সম্বন্ধে মতভেদ সৃষ্টি করেছে, তারা নিশ্চয়ই দুস্তর মতপার্থক্যে লিপ্ত আছে।” (আয়াত: ২:১৭৬)
৬. সুনিশ্চিত সত্য (হক্কুল ইয়াকিন) ও পূর্ণাঙ্গতা:
কুরআন কোনো ধারণা বা অনুমান নয়, এটি সুনিশ্চিত সত্য এবং ন্যায়বিচারের মানদণ্ড।
দলিল: “আর নিশ্চয়ই এটি (কুরআন) সুনিশ্চিত সত্য (হক্কুল ইয়াকিন)।” (আয়াত: ৬৯:৫১)
দলিল: “আর আপনার রবের বাণী সত্য ও ন্যায়ের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ হয়েছে। তাঁর বাক্য পরিবর্তনকারী কেউ নেই...” (আয়াত: ৬:১১৫)
➥ দলিল: কোন অসত্য (বাতিল) এর কাছেও আসতে পারবে না:
আর নিশ্চয় সেটা অবশ্যই এক শক্তিশালী কিতাব। অসত্য (বাতিল) তার কাছে আসতে পারবে না, তার সামনে থেকে আর না তার পিছন থেকে। প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত—এর পক্ষ থেকে অবতরণ-আয়াত ৪১:৪১-৪২
৭. সত্যের পরে বিভ্রান্তি ছাড়া আর কী থাকে?
এটি কুরআনের এক অকাট্য ও চূড়ান্ত ঘোষণা। সত্য (কুরআন) একটাই, আর এর বাইরে যা আছে সব বিভ্রান্তি।
দলিল: “তিনিই আল্লাহ, তোমাদের ‘সত্য’ (হক) রব। সুতরাং সত্যের পরে বিভ্রান্তি (দলাল) ছাড়া আর কী থাকে? অতএব তোমাদেরকে কোথায় ফিরানো হচ্ছে?” (আয়াত: ১০:৩২)
অনুধাবন: যেহেতু কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ‘হক’, তাই এর বাইরে বা এর বিপরীতে মানুষের তৈরি যে কোনো বিধান বা কিতাবই ‘দলাল’ বা বিভ্রান্তি। সত্য এবং মিথ্যার মাঝখানে কোনো নিরপেক্ষ স্থান নেই।
৮. অনুমান সত্যের বিকল্প হতে পারে না:
মানুষের রচিত গ্রন্থ বা মতবাদগুলো মূলত অনুমানের (Zann) ওপর ভিত্তি করে রচিত, যা সত্যের মোকাবিলায় অচল।
দলিল: “...আর তাদের অধিকাংশই অনুমান (Zann) ছাড়া অনুসরণ করে না। নিশ্চয় সত্যের বিপরীতে অনুমান কোনো ধরণের কাজে আসবে না। তারা যা করে সে সম্পর্কে নিশ্চয় আল্লাহ বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন-১০:৩৬ (৫৩:২৮)
৯. মুমিনের নিরাময় ও রহমত:
কুরআন মুমিনের অন্তরের নিরাময় এবং একমাত্র উপদেশের উৎস।
দলিল: “হে মানবকুল! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট এসেছে উপদেশ এবং অন্তরে যা আছে তার নিরাময়...” (আয়াত: ১০:৫৭)
১০. এক পথ বাদে বাকি সব পথ বিচ্ছিন্নকারী:
আল্লাহর পথ (কুরআন) একটাই। এর বাইরে অন্য রাস্তা বা মতবাদ মানুষকে সত্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
দলিল: “(ওয়া আন্না হাজা ছিরাতি মুছতাকিম)আর এটিই আমার সরল সঠিক পথ, তোমরা এরই অনুসরণ করো। আর অন্যান্য পথের অনুসরণ করো না, তাহলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে...” (আয়াত: ৬:১৫৩)
সারকথা: সূরা ইউনুসের ৩২ নম্বর আয়াতের “ফামা-যা বা‘দাল হাক্কি ইল্লাদ-দলাল” (সত্যের পরে বিভ্রান্তি ছাড়া আর কী থাকে?)—এই অংশটিই চূড়ান্ত ফয়সালা। অর্থাৎ, আল-কুরআন যদি হক হয় (যা নিঃসন্দেহে হক), তবে এর বাইরে বিধান হিসেবে মানা অন্য সবকিছুই ভ্রষ্টতা। এর বাইরে বা এর সমান্তরালে অন্য কোনো বিধান বা গ্রন্থকে সত্যের মাপকাঠি মনে করা কুরআনের ওপর অবিশ্বাস এবং সত্যকে অপমান করার শামিল।
▓▒░ ফুল এন্ড ফাইনাল গেজেট অব রব্বুল আলামিন ░▒▓
১. ‘লেটেস্ট এডিশন’ গ্রহণ ও ‘বাতিল’ বর্জন করতে বলা হয়েছে:
ঈমানের মূল দাবিই হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সর্বশেষ সত্য বা ‘লেটেস্ট এডিশন’ গ্রহণ করা এবং এর বিপরীতে থাকা বাতিল বা ‘ওল্ড ভার্সন’ (মানবসৃষ্ট বিধান) বর্জন করা। সত্য আসার পর মিথ্যার কোনো স্থান নেই।
দলিল-1: “আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে এবং মুহাম্মদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে—আর তা-ই তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য (Haqq)—তাতে বিশ্বাস করেছে... এটা এজন্য যে, যারা কুফরি করেছে তারা বাতিলের অনুসরণ করেছে এবং যারা ঈমান এনেছে তারা তাদের রবের পক্ষ থেকে আসা সত্যের (কুরআনের) অনুসরণ করেছে।” (আয়াত: ৪৭:২-৩)
দলিল-2: “বলুন, সত্য (কুরআন) এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল। আর আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত...” (আয়াত: ১৭:৮১-৮২)
২. কুরআনই একমাত্র সুপ্রতিষ্ঠিত পথ দেখায়:
আল্লাহর কিতাব বাদে মানুষের তৈরি অন্য কোনো পথ বা মতবাদ মানুষকে সঠিক গন্তব্যে নিতে পারে না। কারণ, একমাত্র এই কুরআনই সবচেয়ে সরল ও সুপ্রতিষ্ঠিত পথের সন্ধান দেয়। এর সাথে মানুষের অসম্পূর্ণ বিধান যুক্ত করা মানে আল্লাহর দেখানো ‘সবচেয়ে সঠিক’ পথকে অবিশ্বাস করা।
দলিল: “নিশ্চয়ই এই কুরআন এমন পথ প্রদর্শন করে, যা সর্বাধিক সরল ও সুপ্রতিষ্ঠিত (Most Upright/Suitable); এবং মুমিনদেরকে সুসংবাদ দেয়—যারা সৎকর্ম করে—যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।” (সূরা বনী-ইসরাঈল/আল-ইসরা, আয়াত: ১৭:৯)
৩. একমাত্র সত্যের (কুরআনের) সাথে মিথ্যার (বাতিল) মিশ্রণ নিষিদ্ধ:
কুরআন হলো নির্ভেজাল সত্য। এর সাথে মানুষের তৈরি বিধান বা মতবাদ মেশানো মানে সত্যের সাথে মিথ্যার মিশ্রণ ঘটানো, যা আল্লাহ কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
দলিল: আর তোমরা সত্যের সাথে মিথ্যাকে মিশ্রিত করো না এবং জেনেশুনে সত্য গোপন করো না (আয়াত: ২:৪২)
দলিল: আর যে সত্য (কুরআন) নিয়ে এসেছে এবং যে তা সত্য বলে মেনে নিয়েছে, তারাই তো মুত্তাকি (আয়াত: ৩৯:৩৩)
৪. মুমিনের আনন্দ ও ইবাদতের একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু ‘কুরআন’:
মানুষ দ্বীনের নামে যত হাদিস গ্রন্থ, ইতিহাস বা কিতাব জমা করুক না কেন, মুমিনের আনন্দ ও তৃপ্তি হতে হবে একমাত্র আল্লাহর নাযিলকৃত কুরআনে। ইবাদত হবে কেবল কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী।
দলিল: “হে মানবকুল! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট এসেছে উপদেশ (কুরআন)... বলুন! ‘আল্লাহর অনুগ্রহে ও তাঁর রহমতে (কুরআন নাযিল হওয়ায়)’; সুতরাং তা নিয়েই যেন তারা আনন্দিত হয়। তারা যা (দুনিয়ায় বা কিতাবাদি) জমা করে, তা থেকে এটি উত্তম।” (আয়াত: ১০:৫৭-৫৮)
দলিল: “যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে (কুরআন), তাতে আনন্দিত হয়... বলুন, আমি তো কেবল আদেশপ্রাপ্ত হয়েছি যে, আমি আল্লাহর ইবাদত করব এবং তাঁর সাথে শরিক করব না।” ( আয়াত: ১৩:৩৬)
৫. বিধানদাতা নন: রাসূল (সা.)-এর দায়িত্ব ছিল কেবল কুরআনের অনুসরণ:
নবীজির দায়িত্ব কোনো নতুন কিতাব রচনা করা ছিল না, বরং তাঁর দায়িত্ব ছিল আল্লাহর ইবাদত করা, মুসলিম হওয়া এবং কেবল কুরআন পাঠ ও প্রচার করা।
দলিল: “(বলুন) আমি আদেশপ্রাপ্ত হয়েছি যে... আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত হব। আর এও যে, আমি ‘কুরআন’ পাঠ করব। অতএব যে হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়, সে তো মূলত তার নিজের জন্যই হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়...” (আয়াত: ২৭:৯১-৯২)
দলিল: “...বলুন, আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী। আর এই কুরআন আমার নিকট ওহি করা হয়েছে, যেন এর দ্বারা আমি তোমাদেরকে এবং যাদের নিকট এটা পৌঁছাবে, তাদের সতর্ক করতে পারি...” (আয়াত: ৬:১৯)
৬. আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ‘হাদিস’ বা বাণীর অনুসরণ অবৈধ:
আল্লাহর নাযিলকৃত ওহির বাইরে অন্য কোনো ‘হাদিস’ বা মানুষের মুখের বাণীর অনুসরণ করার কোনো বৈধতা নেই। আল্লাহর আয়াতের পর অন্য কোনো হাদিস মানা ঈমানের পরিপন্থী।
দলিল: এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমি আপনার নিকট যথাযথভাবে আবৃত্তি করছি। সুতরাং আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পরে তারা আর কোন ‘হাদিস’ (কথায়/বাণীতে) ঈমান আনবে? (সূরা আল-জাসিয়া, আয়াত: ৪৫:৬)
৭. বিচার-ফয়সালার জন্য একমাত্র কিতাব আল-কোরআন:
আল্লাহর কিতাবকে পাশ কাটিয়ে মানুষের লেখা কিতাবকে বিচারক বা ফয়সালাকারী বানানো আল্লাহর বিধানের পূর্ণাঙ্গতাকে অস্বীকার করার শামিল।
দলিল: “তবে কি আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বিচারক (ফয়সালাকারী) অনুসন্ধান করব? অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি বিস্তারিত কিতাব (কুরআন) নাজিল করেছেন...” (আয়াত: ১১৪)
দলিল: “...আর আমি আপনার প্রতি এমন কিতাব নাযিল করেছি, যা প্রত্যেকটি বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা (তিবইয়ানাল লিকুল্লি শাই)...” (আয়াত: ১৬:৮৯)
৩. আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা না মেনে অন্য বিধান অনুসরণ করা—বাতিল: সুরা মায়িদা ৫:৪৪, ৪৫, ৪৭
➡ অনুধাবন: যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান ছাড়া অন্য কিছুকে হুকুম হিসেবে গ্রহণ করে—তারা কাফির, জালিম, ফাসিক বলা হয়েছে।
অর্থাৎ মানুষের তৈরি বিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল।
৪. আল্লাহর বাণীর বাইরে কোনো নির্দেশ অনুসরণ করা নিষিদ্ধ:
সুরা আহযাব ৩৩:৩৬: ➡ আল্লাহ ও তাঁর রসূল যখন কোনো সিদ্ধান্ত দেন, তখন মুমিনের আর “বিকল্প” রাখার সুযোগ নেই।
অর্থাৎ—মানুষের বানানো বিকল্প ব্যবস্থা বাতিল।
৮. মানবসৃষ্ট বিধান রচনা ও অনুসরণের ভয়াবহ পরিণাম:
যারা নিজ হাতে কিতাব লিখে সেটাকে আল্লাহর বিধানের সমকক্ষ দাবি করে কিংবা আল্লাহর অনুমতি ছাড়া বিধান তৈরি করে, তারা নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে মানুষকে বিধানদাতা (রব) হিসেবে মেনে নেয়।
দলিল: “অতএব ধ্বংস (ওয়াইল) তাদের জন্য, যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির জন্য বলে, ‘এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে’...” (আয়াত: ২:৭৯)
দলিল: আর নিশ্চয় তাদের মধ্যে অবশ্যই একদল আছে, কিতাবপাঠে যারা তাদের জিহ্বা বাঁকায়, যেন তোমরা সেটা কিতাবের অন্তর্ভুক্ত মনে করো, অথচ সেটা কিতাবের অন্তর্ভুক্ত নয়। আর তারা বলে, সেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে, অথচ সেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নয়। আর তারা আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা বলে অথচ তারা জানে। (আয়াত: 3:78)
দলিল: “তাদের কি এমন কোনো শরিক আছে, যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন বিধান প্রবর্তন করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি?” (আয়াত: ৪২:২১)৯. হুকুম কেবল আল্লাহর:
সৃষ্টি যার, আইন দেওয়ার অধিকারও একমাত্র তাঁর। বিধান প্রণয়নে আল্লাহ কাউকে শরিক করেন না। সুতরাং কুরআনের পাশাপাশি অন্য বিধান মানা আল্লাহর সার্বভৌমত্বে শিরক।
দলিল: “সাবধান! সৃষ্টি যার, হুকুম বা বিধানও চলবে একমাত্র তাঁরই...” (সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত: ৫৪)
দলিল: “...এবং তিনি নিজ হুকুমে কাউকেও শরিক করেন না।” (সূরা আল-কাহফ, আয়াত: ২৬)
দলিল: “হুকুম বা বিধানের মালিক আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নয়। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না...” (সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৪০)
১০. দলাদলি ও মানুষের ‘অভিভাবকত্ব’ বর্জন:
কুরআনকে পাশ কাটিয়ে বা এর সাথে অন্য কিছু মিশিয়ে যারা দলে দলে বিভক্ত হয়, তারা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত। মুমিন কেবল নাযিলকৃত ওহির অনুসরণ করে।
দলিল: “তোমরা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। যারা নিজেদের দ্বীনকে টুকরো টুকরো করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে; প্রত্যেক দলই নিজেদের কাছে যা আছে তা নিয়ে আনন্দিত।” (সূরা আর-রুম, আয়াত: ৩০:৩১-৩২)
11. একমাত্র নাযিলকৃত কিতাবই অনুসরন করতে বলা হয়েছে:
দলিল: “তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে (কুরআন), তোমরা তার অনুসরণ করো। আর তাঁকে (আল্লাহকে) বাদ দিয়ে অন্য কোনো অভিভাবকের অনুসরণ করো না...” ( আয়াত: 7:৩)
১১. জিনদের সাক্ষ্য: রবের সাথে শিরক না করার উপায় হিসাবে একমাত্র আল-কুরআনই অনুসরনযোগ্য এবং মানুষের ভয়
জিন জাতি কুরআন শুনেই বুঝেছিল যে, এটিই একমাত্র পথ এবং এর সাথে অন্য কিছু মানা শিরক। অথচ মানুষ অনাযিলকৃত বিধানকে ভয় পায়, আল্লাহকে নয়।
দলিল: “...আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি, যা সঠিক পথের নির্দেশ দেয়। তাই আমরা তাতে ঈমান এনেছি এবং আমরা কখনোই আমাদের রবের সাথে কাউকে শরিক করব না।” (সূরা জিন, আয়াত: ৭২:১-৩)
দলিল: “আমি কীভাবে তোমাদের তৈরি শরিকদের ভয় পাব? অথচ তোমরা আল্লাহ যে বিষয়ে কোনো দলিল বা ক্ষমতা নাজিল করেননি... সে বিষয়ে তাঁকে শরিক করতে ভয় পাও না?” (সূরা আল-আনআম, আয়াত: ৬:৮১)
১২. বিধানদাতা একমাত্র আল্লাহ; রাসূল (সা.) কেবল আল্লাহর কিতাব দিয়েই ফয়সালাকারী:
অনেকে মনে করেন রাসূল (সা.) আল্লাহর পাশাপাশি একজন বিধানদাতা বা শরিয়া প্রণেতা (Lawmaker)। কিন্তু কুরআন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে যে, বিধানদাতা একমাত্র আল্লাহ। রাসূল (সা.)-এর দায়িত্ব ছিল কেবল আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব দিয়েই বিচার-ফয়সালা করা, নিজের পক্ষ থেকে কোনো বিধান তৈরি করা নয়।
দলিল: “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করেন—ওই অনুযায়ী যা আল্লাহ আপনাকে দেখিয়েছেন...” (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪:১০৫)
দলিল: “আর আপনি তাদের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করুন যা আল্লাহ নাযিল করেছেন তার মাধ্যমে, এবং তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না...” (সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৫:৪৮-৪৯)
দলিল: “সে (নবী) যদি আমার নামে কোনো কথা রচনা করত, তবে আমি অবশ্যই তার ডান হাত ধরে ফেলতাম এবং তার জীবনশিরা কেটে দিতাম।” (সূরা আল-হাক্কাহ, আয়াত: ৬৯:৪৪-৪৬)
দলিল: আর যখন তাদের সামনে আমাদের সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, যারা আমাদের সাক্ষাতের আশা করে না, তারা বলে, এটা ছাড়া কোনো কুরআন নিয়ে এস অথবা একে পরিবর্তন করো। বলো! আমার জন্য সঙ্গত হবে না যে, আমি তা পরিবর্তন করব আমার নিজের পক্ষ থেকে। আমার প্রতি যা ওহী করা হয় আমি তা ছাড়া অনুসরণ করি না। নিশ্চয় আমি মহাদিনের শাস্তিকে ভয় করি, যদি আমি আমার রবের অবাধ্য হয়ে যাই!
অনুধাবন: এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, নবীজির নিজস্ব কোনো বিধান দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না। তিনি যদি ওহির বাইরে কিছু বানাতেন, তবে আল্লাহ তাঁকে কঠোর শাস্তি দিতেন। সুতরাং, নবীজির নামে প্রচলিত কোনো মানুষের লেখা কিতাবকে বিধান হিসেবে মানা আল্লাহর সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ।
উপসংহার: রবের সাথে সাক্ষাতের চূড়ান্ত শর্ত:
চূড়ান্ত ফয়সালা হিসেবে আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন, এই কুরআনই হলো আরবি ভাষায় নাযিলকৃত চূড়ান্ত বিধান। জ্ঞান আসার পর খেয়াল-খুশির অনুসরণ করলে আল্লাহর সামনে কোনো রক্ষাকারী পাওয়া যাবে না।
দলিল: “...আপনার নিকট জ্ঞান আসার পর আপনি যদি তাদের (মানুষের) খেয়াল-খুশির অনুসরণ করেন, তবে আল্লাহর মোকাবিলায় আপনার কোনো অভিভাবক বা রক্ষাকারী থাকবে না।” (সূরা আর-রা‘দ, আয়াত: ১৩:৩৭, ৩৯)
দলিল: “...সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে (আনুগত্য ও বিধানে) অন্য কাউকেও শরিক না করে।” (সূরা আল-কাহফ, আয়াত: ১১০)
অর্থাৎ, ইবাদতে শরিক না করার অর্থ হলো—আল্লাহর হুকুম, আইন ও বিধানের সাথে অনাযিলকৃত কোনো মানুষের তৈরি বিধান, দলিল বা নির্দেশকে বিন্দুমাত্র যুক্ত না করা। সার্বভৌমত্ব অবিভাজ্য; তাই কুরআন মানার অর্থই হলো জীবনের সর্বক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহর বিধান মেনে নেওয়া, আর এর ব্যত্যয় ঘটানো নিঃসন্দেহে রবের সাথে শিরক করার শামিল।