৬ বছরে বিবাহ? | নাযিলকৃত আল-কুরআন বনাম লাহুওয়াল হাদিস
📌বিয়ের বয়স: কুরআন বনাম প্রচলিত হাদিস ও শিশু বিবাহের বিতর্ক:
বিয়ের বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল বিষয়, যা আল-কুরআন এবং কিছু প্রচলিত হাদিসের বর্ণনার উপর ভিত্তি করে শতাব্দী ধরে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই বিতর্কটি কেবল ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর বাস্তব প্রভাব রয়েছে বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ শিশুর জীবনে, বিশেষ করে মুসলিম সমাজে। প্রতি বছর কোটি শিশুর বিয়ে হচ্ছে যাদের বয়স কম, এবং অনেক মুসলিম প্রধান দেশেই এই হার উদ্বেগজনক। এই অমানবিক প্রথাকে বৈধতা দিতে প্রায়শই কিছু নির্দিষ্ট হাদিসের বর্ণনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
📌আল-কুরআনের নির্দেশিকা: পরিপক্কতা, বিচারবুদ্ধি ও সম্মতি:
আল-কুরআন বিয়ের জন্য শারীরিক ও মানসিক পরিপক্কতা, সুস্থ বিচারবুদ্ধি এবং ব্যক্তির স্পষ্ট সম্মতির উপর জোর দেয়। সূরা আন-নিসা আয়াত ৪:৬-এ আল্লাহ্ তা'আলা নির্দেশ দিচ্ছেন:
"আর তোমরা ইয়াতীমদেরকে পর্যবেক্ষণে রাখ, যখন তারা বিয়ের উপযুক্ত হয় ততক্ষণ পর্যন্ত। এরপর তোমরা যদি তাদের মাঝে বিবেচনাবোধ লক্ষ করো, তখন তোমরা তাদের কাছে তাদের সম্পদ হস্তান্তর করো।"
এই আয়াতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আরবি শব্দ রয়েছে যা বিয়ের যোগ্যতা নির্ধারণের জন্য সার্বজনীন নীতি নির্দেশ করে:
◆ বুলুগ আল-নিকাহ (بُلُوغَ النِّكَاحِ): এর অর্থ হলো 'বিয়ের বয়স' বা 'বিয়ের জন্য উপযুক্ততা'। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা (যেমন ৬ বা ৯ বছর) বোঝায় না, বরং এমন একটি পর্যায়কে বোঝায় যখন একজন ব্যক্তি শারীরিকভাবে এবং মানসিকভাবে একটি সম্পর্ক এবং পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত হয়।
◆ রুশদ (رُشْدًا): এর অর্থ হলো 'সুস্থ বিচারবুদ্ধি' বা 'সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা'। অর্থাৎ, শুধু শারীরিকভাবে বড় হলেই হবে না, মানসিকভাবেও এতটা পরিপক্ক হতে হবে যাতে সে নিজের ভালো-মন্দ বুঝতে পারে এবং নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো, বিশেষ করে অর্থ-সম্পদ ও ব্যক্তিগত বিষয়ে ঠিকঠাকভাবে নিতে পারে।
এই আয়াতে 'রুশদ' শব্দটি এতিমদের সম্পদ হস্তান্তরের প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। এখানে আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিচ্ছেন যে, এতিমদের সম্পদ তখনই তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে যখন তারা কেবল বিয়ের বয়সে উপনীত হবে না, বরং তাদের মধ্যে 'রুশদ' অর্থাৎ সুস্থ বিচারবুদ্ধি বা বিবেচনাবোধ দেখা যাবে। এর অর্থ হলো, সম্পদ পরিচালনার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য শুধু শারীরিক পরিপক্কতা যথেষ্ট নয়, মানসিক পরিপক্কতা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকা আবশ্যক। বিয়ে যেহেতু সম্পদ পরিচালনার চেয়েও বড় এবং জীবনব্যাপী একটি সিদ্ধান্ত, তাই বিয়ের ক্ষেত্রেও 'রুশদ' এর শর্ত একইভাবে প্রযোজ্য এবং এমনকি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, বিশেষত আর্থিক ও ব্যক্তিগত বিষয়ে, বিয়ের জন্য একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত।
কুরআন অনুযায়ী, এই দুটি শর্ত – শারীরিক ও মানসিক পরিপক্কতা এবং সুস্থ বিচারবুদ্ধি – পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই বিয়ের জন্য যোগ্য বলে মনে করা যায় না। উপরন্তু, সূরা আন-নিসা আয়াত ৪:৫-এ আল্লাহ্ তা'আলা বলছেন:
"আর তোমাদের ধনসম্পদ যা আল্লাহ তোমাদের জন্য অবলম্বন করেছেন তা তোমরা অপরিণতদেরকে দিও না (অর্বাচিনদের হাতে তুলে দিও না)।"
যদিও এই আয়াতে সরাসরি 'রুশদ' শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি, তবে এখানে 'সুফাহা' (السُّفَهَاءَ) বা অপরিণত/অর্বাচীনদের হাতে সম্পদ তুলে দিতে নিষেধ করা হয়েছে। 'সুফাহা' বলতে এমন ব্যক্তিদের বোঝায় যাদের বিচারবুদ্ধির অভাব রয়েছে বা যারা বিচক্ষণতার সাথে সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম। এই আয়াতটি আগের আয়াতের (৪:৬) সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং এটি আরও স্পষ্ট করে যে, সম্পদ পরিচালনার জন্য 'রুশদ' বা সুস্থ বিচারবুদ্ধি অপরিহার্য। যদি সম্পদ পরিচালনার মতো বিষয়ে অপরিণত বা কম বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিকে বিশ্বাস করা না যায়, তবে বিয়ের মতো আরও গভীর ও জটিল ব্যক্তিগত সম্পর্কের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও যে একই ধরনের বা আরও উচ্চতর বিচারবুদ্ধির প্রয়োজন, তা সহজেই অনুমেয়। এটি পরোক্ষভাবে 'রুশদ' এর গুরুত্বকে তুলে ধরে, যেখানে মানসিকভাবে পরিপক্ক হওয়া এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারার ক্ষমতাকে অত্যাবশ্যক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
এই আয়াতগুলো থেকে এটা স্পষ্ট যে, ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত ও আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য শারীরিক বয়সের পাশাপাশি মানসিক পরিপক্কতা এবং সুস্থ বিচারবুদ্ধি থাকা অপরিহার্য। বিয়ের মতো একটি জীবনব্যাপী সম্পর্ক স্থাপনের জন্য এই 'রুশদ' বা বিচক্ষণতা অত্যন্ত জরুরি।
📌এছাড়াও, আল-কুরআন বারবার পারস্পরিক সম্মতি ও ইচ্ছার উপর জোর দিয়েছে:
পাত্র-পাত্রীর সম্মতি আবশ্যক/পারস্পরিক সম্মতি ও ইচ্ছা: সূরা বাকারা– ২:২৩২, সূরা নিসা ৪:১৯, সূরা আন-নূর ২৪:৩৩, সূরা কাসাস ২৮:২৭
এই আয়াতগুলি থেকে স্পষ্ট যে, ইসলামে বিয়ে একটি চুক্তি, যা উভয় পক্ষের স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতির উপর ভিত্তি করে সম্পন্ন হতে হবে। একটি শিশুর পক্ষে এই ধরনের সম্মতি প্রদান করা বা চুক্তির গুরুত্ব অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
📌প্রচলিত হাদিসের বর্ণনা ও বিতর্ক
শিশুবিয়ের পক্ষে যেসব হাদিস সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো নবী পত্নী আয়েশা (রাঃ)-এর বিয়ের ঘটনা। সহীহ আল-বুখারীর ৫৩৩৪ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে:
"নবী (সাঃ) আয়েশাকে বিয়ে করেন যখন তার বয়স ছিল ছয় বছর এবং তিনি তার সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন যখন তার বয়স ছিল নয় বছর।"
এই বর্ণনাটিকে শিশু বিবাহের পক্ষে একটি অকাট্য দলিল হিসেবে মনে করা হয়। তবে, এই বর্ণনার ঐতিহাসিক সঠিকতা এবং এর ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, হাদিসে উল্লেখিত বয়স যদি সঠিক হয়, তাহলে তা কোরআনের সার্বজনীন নীতির সাথে সরাসরি দ্বন্দ্ব তৈরি করে, যেখানে পরিপক্কতা, বিচারবুদ্ধি এবং সম্মতিকেই চূড়ান্ত মাপকাঠি হিসেবে ঠিক করা হয়েছে।
সমস্ত বিতর্ক ও ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে উঠে কোরআনের চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে শিশুদের সুরক্ষা, সম্মতি এবং পরিপক্কতার নীতিই প্রতিষ্ঠিত হয়।
➥শিশুদের সুরক্ষা: কোরআনের প্রথম এবং অলঙ্ঘনীয় নীতি হলো শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া। বিয়ের জন্য শারীরিক ও মানসিক পরিপক্কতা ('বুলুগ') এবং সুস্থ বিচারবুদ্ধি ('রুশদ') কে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে ঠিক করে দেওয়া হয়েছে।
➥ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: হাদিসগুলো পরীক্ষা করলে দেখা যায় যে, সেগুলো কোনো চিরন্তন ঐশ্বরিক আদেশ নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে তুলে ধরে। এগুলোকে সার্বজনীন আইন হিসেবে মেনে নেওয়াটা কোরআনের মূল বার্তার বিরুদ্ধে যায়।
➥মাকাসিদ আশ-শারিয়াহ: শিশুদের রক্ষা করা এবং তাদের শৈশবকে নিরাপদ রাখা ইসলামী শরীয়তের সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য ('মাকাসিদ আশ-শারিয়াহ') এর সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি মৌলিক দায়িত্ব।
সূরা বনী ইসরাইলের ৭০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা ঘোষণা করছেন:
"আর আমি তো আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি।"
এই সম্মান কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট বয়স, লিঙ্গ বা জাতির জন্য নয়, এটি সমস্ত মানবজাতির জন্য। আর এই সম্মানের সবচেয়ে বড় দাবিদার হলো শিশুরা। তাদের মর্যাদা রক্ষা করা, তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে সুরক্ষিত রাখা এবং একটি নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা – এটাই হলো এই ঐশ্বরিক সম্মানের প্রতি আমাদের আসল দায়বদ্ধতা।
উপসংহার
নিশ্চয় সেটা (কুরআন) অবশ্যই সম্মানিত এক রসূলের বক্তব্য-৬৯:৪০ (৮১:১৯) আল্লাহর সেই আয়াতসমূহ, যা আমরা তোমার উদ্দেশে সত্যতার সাথে পাঠ করি। অতএব, আল্লাহর ও তাঁর আয়াতসমূহের পরে তারা কোন হাদিসে বিশ্বাস করবে?-আয়াত ৪৫:৬