দাওয়াত: ওয়াজ-নছিহত-দাওয়াতের ঐশী পদ্ধতি- (Dawa-waz)

আজকের এই উপস্থাপনা বা খুৎবার মূল প্রতিপাদ্য হলো—আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব আল-কুরআনের দিকে মানুষকে ডাকার সঠিক পদ্ধতি কী? আমরা প্রচলিত কোনো মতবাদ বা মানবরচিত পদ্ধতির আশ্রয় না নিয়ে সরাসরি আল-কুরআনের আয়াতসমূহ থেকে দেখে নেব যে, একজন মুমিন কীভাবে মানুষকে আল্লাহর বাণীর দিকে দাওয়াত দেবেন।

আল-কুরআনের আলোকে দাওয়াতের ঐশী পদ্ধতি:

১. দাওয়াতের ভিত্তি: শুধুমাত্র আল্লাহর নাযিলকৃত ওহী

দাওয়াতের প্রথম শর্ত হলো, আপনি যা প্রচার করছেন তা অবশ্যই আল্লাহর নাযিলকৃত হতে হবে। আল্লাহ কুরআনকে ‘তিবইয়ানাল লিকুল্লি শাইয়িন’ বা ‘সবকিছুর স্পষ্ট ব্যাখ্যা’ হিসেবে নাযিল করেছেন।

রেফারেন্স: “আমি আপনার প্রতি এই কিতাব নাযিল করেছি যা সব কিছুর স্পষ্ট ব্যাখ্যা, পথনির্দেশ, রহমত এবং মুসলিমদের জন্য সুসংবাদ।” (সূরা আন-নাহল, ১৬:৮৯)

শিক্ষা: দাওয়াতের সময় কুরআনের বাইরে অন্য কোনো অসম্পূর্ণ বা কাল্পনিক উৎসের প্রয়োজন নেই, কারণ আল্লাহ একে ‘মফাস্সাল’ (বিস্তারিত) বলে ঘোষণা করেছেন (সূরা আল-আনআম, ৬:১১৪)।

২. দাওয়াতের ভাষা ও পদ্ধতি: হিকমাহ ও সদুপদেশ

আল্লাহ দাওয়াতের জন্য একটি নির্দিষ্ট ফর্মুলা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

রেফারেন্স: “আপনি আপনার রবের পথের দিকে দাওয়াত দিন হিকমাহ (প্রজ্ঞা) ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন সর্বোত্তম পন্থায়।” (সূরা আন-নাহল, ১৬:১২৫)

অনুধাবন: এখানে ‘হিকমাহ’ মানে হলো কুরআনের যুক্তি ও প্রজ্ঞা। দাওয়াত দিতে হবে নরম ভাষায় (ক্বওলান লাইয়্যিনান), যেমনটি আল্লাহ মূসা (আ.)-কে ফেরাউনের কাছে পাঠানোর সময় নির্দেশ দিয়েছিলেন (সূরা ত্বহা, ২০:৪৪)।

৩. দাওয়াতের প্রধান হাতিয়ার: কুরআন দিয়ে ‘জিহাদ’

কুরআনী মুসলিম হিসেবে আমাদের বড় সংগ্রাম বা জিহাদ হলো কুরআনের আয়াত দিয়ে মানুষের যুক্তি খণ্ডন করা।

রেফারেন্স: “অতএব আপনি কাফিরদের আনুগত্য করবেন না এবং আপনি এই কুরআনের সাহায্যে তাদের বিরুদ্ধে এক বড় জিহাদ (জিহাদান কাবিরা) চালিয়ে যান।” (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৫২)

শিক্ষা: দাওয়াতের মূল কাজ হলো মানুষের সামনে কুরআনের আয়াত পেশ করা, কোনো ব্যক্তিগত দর্শন নয়। কুরআন নিজেই নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ।

৪. কেবল কুরআন দিয়েই সতর্ক করা

মানুষকে ভয় দেখানো বা সতর্ক করার জন্য অন্য কোনো কিচ্ছা-কাহিনীর প্রয়োজন নেই। আল্লাহ বলছেন:

রেফারেন্স: “...অতএব, যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দিন/সতর্ক করুন।” (সূরা ক্বাফ, ৫০:৪৫)

অনুধাবন: দাওয়াত দাতার কাজ হলো কেবল আল্লাহর আয়াত পৌঁছে দেওয়া। কুরআন পড়ার পর যদি কেউ ঈমান না আনে, তবে অন্য কোনো কথায় সে ঈমান আনবে না (সূরা আল-মুরসালাত, ৭৭:৫০)।

৫. জবরদস্তি বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন নয়

দাওয়াত দাতা নিজেকে বড় মনে করবেন না বা কাউকে বাধ্য করবেন না।

রেফারেন্স: “দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” (সূরা আল-বাক্বারা, ২:২৫৬)

রেফারেন্স: “আপনি তো কেবল একজন উপদেশদাতা, আপনি তাদের ওপর দারোগা (জবরদস্তিকারী) নন।” (সূরা আল-গাশিয়াহ, ৮৮:২১-২২)

শিক্ষা: আমাদের দায়িত্ব কেবল পৌঁছে দেওয়া (বালাগ), হিদায়াত দেওয়া আল্লাহর কাজ।

৬. সত্য মিথ্যার মিশ্রণ বর্জন করা:

দাওয়াতের সময় প্রচলিত প্রথা বা মানবরচিত বিধানকে কুরআনের আয়াতের সাথে মিশিয়ে ফেলা যাবে না।

রেফারেন্স: “তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে বুঝে সত্য গোপন করো না।” (সূরা আল-বাক্বারা, ২:৪২)

অনুধাবন: যারা কেবল কুরআন মানতে চায়, তাদের সামনে নিছক ‘বিশুদ্ধ কুরআন’ উপস্থাপন করতে হবে। মনগড়া তাফসির বা মানুষের উক্তি দিয়ে আয়াতের ধার কমিয়ে দেওয়া যাবে না।

৭. সংখ্যাগুরু বা বাপ-দাদার দোহাই খণ্ডন করা

মানুষ যখন দাওয়াত পায়, তখন তারা বলে— ‘আমাদের বাপ-দাদারা তো এমন করেনি’ বা ‘সবাই তো এটা করে না’। কুরআন এই যুক্তি খণ্ডন করতে শেখায়:

রেফারেন্স: “আর যদি আপনি যমীনের অধিকাংশ লোকের আনুগত্য করেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে; তারা তো কেবল ধারণার (জল্পনা-কল্পনা) অনুসরণ করে।” (সূরা আল-আনআম, ৬:১১৬)
শিক্ষা: দাওয়াতের সময় মানুষকে বোঝাতে হবে যে সত্য সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না, বরং আল্লাহর আয়াতের ওপর নির্ভর করে।

৮. প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলা (বুরহান)

যেকোনো দাবির সপক্ষে কুরআন থেকে দলিল বা প্রমাণ চাইতে হবে এবং দিতে হবে।

রেফারেন্স: “বলো, তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমাদের প্রমাণ (বুরহান) নিয়ে এসো।” (সূরা আল-বাক্বারা, ২:১১১)

অনুধাবন: কুরআনী দাওয়াতের মূল সৌন্দর্য হলো এটি অন্ধ বিশ্বাসের ওপর নয়, বরং সুস্পষ্ট প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

দাওয়াত দাতার ঘোষণা:

একজন কুরআনী মুসলিম হিসেবে আমাদের দাওয়াতের সারসংক্ষেপ হবে সূরা আল-আনআমের ১৫৩ নম্বর আয়াত:

“আর এটিই আমার সহজ-সরল পথ, সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ কর এবং অন্য কোনো পথের অনুসরণ করো না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।”

আমাদের অবস্থান হবে সূরা ফুসসিলাতের ৩৩ আয়াতের মতো:
“ঐ ব্যক্তির চেয়ে কার কথা উত্তম, যে আল্লাহর দিকে ডাকে, সৎকর্ম করে এবং বলে—নিশ্চয়ই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত (মিনাল মুসলিমীন)?”

অর্থাৎ, দাওয়াতের সময় আমরা কোনো দল বা ফিরকার পরিচয় দেব না, বরং কেবল ‘মুসলিম’ হিসেবে আল্লাহর কিতাবের দিকে মানুষকে আহ্বান করব। আমাদের কাজ হবে মানুষকে কিতাবের কাছে ফিরিয়ে আনা, যাতে তারা সরাসরি আল্লাহর নূর দ্বারা পরিচালিত হতে পারে।


দাওয়াতের ক্ষেত্রে আল-কুরআন একটি ‘ওয়ান সাইজ ফিটস অল’ (সবার জন্য এক নিয়ম) পদ্ধতি অনুসরণ করে না, বরং মানুষের বিশ্বাসের স্তর ও মানসিক রোগ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন দাওয়াহ্‌ প্রটোকল বা পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে। পদ্ধতিতে শ্রেণিভেদে দাওয়াতের এই উচ্চতর বিন্যাস নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


১. নাস্তিক ও প্রকৃতিবাদীদের জন্য (যারা রবের অস্তিত্ব অস্বীকার করে):

এদের দাওয়াতের ভিত্তি হলো ‘আকল’ (বুদ্ধিবৃত্তি) ও ‘যুক্তি’ (Logic)। আল্লাহ এদেরকে প্রশ্ন দিয়ে ঘায়েল করতে বলেছেন:

যুক্তি: “তারা কি কোনো কিছু (স্রষ্টা) ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই নিজেদের স্রষ্টা?” (সূরা আত-তূর, ৫২:৩৫)

প্রকৃতি বনাম স্রষ্টা: “তারা কি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছে? বরং তারা দৃঢ় বিশ্বাস করে না।” (সূরা আত-তূর, ৫২:৩৬)

পদ্ধতি: এদের সামনে সৃষ্টির নিখুঁত ডিজাইন (সূরা আল-মুলক, ৬৭:৩-৪) এবং মহাবিশ্বের শুরু (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৩০) তুলে ধরে প্রমাণ করতে হবে যে, একজন ‘মুলক’ বা রাজত্বের মালিক অবশ্যই আছেন।

২. মুশরিক বা শিরককারীদের জন্য (যারা আল্লাহর পাশাপাশি অন্যের উপাসনা করে)

এদের দাওয়াতের পদ্ধতি হলো ‘অক্ষমতা বনাম সক্ষমতা’ তুলনা করা।

যুক্তি: “আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন? অথচ তারা আপনাকে আল্লাহর পরিবর্তে অন্য উপাস্যদের ভয় দেখায়।” (সূরা আয-জুমার, ৩৯:৩৬)

অক্ষমতার দলিল: “হে মানুষ! একটি উপমা দেওয়া হচ্ছে শোনো; তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ডাকো, তারা একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না...” (সূরা আল-হাজ্জ, ২২:৭৩)

পদ্ধতি: এদের বোঝাতে হবে যে, যাদের তারা অংশীদার বানাচ্ছে, তারা কোনো উপকার বা অপকার করার মালিক নয় (সূরা আল-আরাফ, ৭:১৯১-১৯৪)।

৩. আহলে কিতাব বা ত্রিত্ববাদীদের জন্য (যারা ঈসা আ. কে ইলাহ্ বলে)

এদের দাওয়াতের পদ্ধতি হলো ‘কালিমায়ে সাওয়া’ (Common Ground) এবং ‘সীমালঙ্ঘন’ চিহ্নিত করা

যুক্তি: “হে কিতাবীরা! তোমরা তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে অতিরঞ্জন (সীমালঙ্ঘন) করো না এবং আল্লাহর ওপর সত্য ছাড়া কিছু বলো না। মাসীহ ঈসা ইবনে মারিয়াম তো কেবল আল্লাহর রাসূল ছিলেন...” (সূরা আন-নিসা, ৪:১৭১)

ঐক্যমত: “বলো, হে কিতাবীরা! এসো সেই কথার দিকে যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমান; তা হলো—আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩:৬৪)

পদ্ধতি: তাদের কিতাবের বিকৃতি এবং ঈসা (আ.)-এর প্রকৃত পরিচয় (বান্দা ও রাসূল) কুরআনের আয়াত দিয়ে তুলে ধরা।

৪. ‘বহু কিতাব’ অনুসারীদের জন্য (যারা কুরআনের সাথে মানবরচিত হাদিস/কিতাব মেলায়)

এরা বর্তমান মুসলিম সমাজের বড় অংশ। এদের দাওয়াতের পদ্ধতি হলো ‘কুরআনের পূর্ণাঙ্গতা ও একক উৎস’ প্রমাণ করা।

পূর্ণাঙ্গতার দাবি: “তবে কি আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বিধানদাতা (হাকাম) খুঁজব? অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি এই কিতাব নাযিল করেছেন বিস্তারিতভাবে (মফাস্সাল)।” (সূরা আল-আনআম, ৬:১১৪)

অন্য বাণীর অসারতা: “এগুলো আল্লাহর আয়াত... আল্লাহর আয়াত ও তাঁর নিদর্শনের পর তারা আর কোন হাদিসে (কথায়) ঈমান আনবে?” (সূরা আল-জাছিয়াহ, ৪৫:৬)

যুক্তি: “আল্লাহ কি সর্বোত্তম হাদিস (আহসানাল হাদিস) হিসেবে কিতাব নাযিল করেননি?” (সূরা আয-জুমার, ৩৯:২৩)।

পদ্ধতি: এদের বোঝাতে হবে যে, দ্বীনের একমাত্র উৎস হলো ‘ওহী’ (কুরআন), আর মানুষের তৈরি কিতাব কখনোই ওহীর সমতুল্য হতে পারে না।

৫. যারা ঈমান ও শিরক মিশ্রিত করে (আয়াত ১২:১০৬ এর শ্রেণি)

এদের ক্ষেত্রে দাওয়াতের পদ্ধতি হলো ‘একনিষ্ঠতা’ (Ikhlas) এবং ‘বাতেল বর্জন’

বাস্তবতা: “তাদের অধিকাংশ আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, কিন্তু শিরক করা অবস্থায়।” (সূরা ইউসুফ, ১২:১০৬)

আহ্বান: “জেনে রাখো, নিছক আনুগত্য বা বিশুদ্ধ দ্বীন কেবল আল্লাহরই প্রাপ্য।” (সূরা আয-জুমার, ৩৯:৩)

পদ্ধতি: এদের সতর্ক করতে হবে যে, পীর, আলেম বা পূর্বপুরুষের অন্ধ অনুকরণ করা ‘শিরক ফির রুবুবিয়্যাহ’ বা প্রভুত্বে শিরকের অন্তর্ভুক্ত (সূরা আত-তাওবাহ, ৯:৩১)।

৬. উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য (আয়াত ৩৬:১১ এর শ্রেণি)

এরা হলো তারা যারা সত্যের অপেক্ষায় আছে। এদের দাওয়াত দিতে হয় ‘সুসংবাদ’ ও ‘তাকওয়ার’ মাধ্যমে।

পদ্ধতি: “আপনি তো কেবল তাকেই সতর্ক করতে পারেন, যে উপদেশ (জিকির/কুরআন) অনুসরণ করে এবং দয়াময় আল্লাহকে না দেখে ভয় করে। তাকে ক্ষমা ও সম্মানজনক পুরস্কারের সুসংবাদ দিন।” (সূরা ইয়াসিন, ৩৬:১১)

কুরআনের ব্যবহার: “অতএব, যে আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দিন।” (সূরা ক্বাফ, ৫০:৪৫)

যুক্তি: এদের সামনে কুরআনের রহমত ও মাগফিরাতের আয়াতগুলো বেশি পেশ করতে হবে।

৭. দাম্ভিক ও বিমুখদের জন্য (যারা সত্য শুনে উপহাস করে)

এদের ক্ষেত্রে দাওয়াত দাতার দায়িত্ব শুধু ‘পৌঁছে দেওয়া’ এবং সম্পর্ক ছিন্ন করা।

আচরণ: “যখন আপনি তাদের দেখবেন যারা আমার আয়াত নিয়ে উপহাস বা বিদ্রূপ করে, তখন আপনি তাদের থেকে সরে যান, যতক্ষণ না তারা অন্য প্রসঙ্গে লিপ্ত হয়।” (সূরা আল-আনআম, ৬:৬৮)

পরিণাম: “আর যে ব্যক্তি তার রবের নিদর্শন দ্বারা উপদিষ্ট হওয়ার পর তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার চেয়ে বড় যালিম আর কে?” (সূরা আস-সাজদাহ, ৩২:২২)

দাওয়াতের সারসংক্ষেপ (শ্রেণিভিত্তিক গাইডলাইন): 

টার্গেট অডিয়েন্স

দাওয়াতের মূল মন্ত্র

রেফারেন্স আয়াত

নাস্তিক/সংশয়বাদী

সৃষ্টিতত্ত্বের যৌক্তিকতা

৫২:৩৫-৩৬, ৮৮:১৭-২০

শিরককারী

স্রষ্টার একক ক্ষমতা

২২:৭৩, ৭:১৯১-১৯৪

ত্রিত্ববাদী (খ্রিস্টান)

ঈসা (আ.)-এর মানুষের মর্যাদা

৪:১৭১, ৫:৭২-৭৩

বহু কিতাবপন্থী

কুরআনের স্বয়ংসম্পূর্ণতা

৬:১১৪, ৪৫:৬, ৩৯:২৩

শিরক মিশ্রিত মুমিন

বিশুদ্ধ আনুগত্যের দাবি

১২:১০৬, ৩৯:৩, ৬:১৫৩

সত্যান্বেষী/মুত্তাকী

জান্নাত ও ক্ষমার সুসংবাদ

৩৬:১১, ৫০:৪৫, ১৬:৮৯

দাম্ভিক/কাফির

বালাগ (পৌঁছে দেওয়া) ও প্রস্থান

৫:৯৯, ৬:৬৮, ৮৮:২১-২২

পরামর্শ:
দাওয়াতের ক্ষেত্রে আপনার একমাত্র হাতিয়ার হবে কুরআন। আল্লাহ বলছেন— “ওজাহিদহুম বিহি জিহাদান কাবিরা” অর্থাৎ “কুরআনের মাধ্যমেই তাদের সাথে বড় জিহাদ (দাওয়াহ) চালিয়ে যান।” (সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৫২)। 

আর তুমি তাদের ওপর শক্তি প্রয়োগকারী নও। সুতরাং তুমি কুরআনের মাধ্যমে তাকে উপদেশ দাও, যে আমার সতর্কবার্তাকে ভয় করে-সূরা কক্কাফ 50:51

কোনো অবস্থাতেই মেজাজ হারানো বা জবরদস্তি করা যাবে না, কারণ হেদায়েত আল্লাহর হাতে। (সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৫৬)।

অমুসলিম বা দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ (গাফেল) ব্যক্তিদের নিকট ঈমানের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে আল-কুরআন অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত, যৌক্তিক এবং হৃদয়স্পর্শী পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে আমরা অনেক সময় আগে শাখা-প্রশাখা বা শরীয়তের বিধান (হালাল-হারাম) নিয়ে আলোচনা করি, কিন্তু কুরআন প্রথমে মানুষের 'আকল' বা বিবেককে জাগ্রত করে এবং তাকে মহাবিশ্বের স্রষ্টার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

নিচে  অমুসলিম ও অজ্ঞদের ঈমানের দিকে ডাকার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রেজেন্টেশন বা দাওয়াতি ফরমেট তুলে ধরা হলো:


শিরোনাম: সৃষ্টির চিন্তন থেকে স্রষ্টার সমর্পণ (কুরআনী দাওয়াত পদ্ধতি)

১. প্রথম ধাপ: পর্যবেক্ষণ ও চিন্তার উদ্রেক করা (Observation & Reflection)

অজ্ঞ বা অমুসলিমদের সরাসরি বিধান না দিয়ে প্রথমে তাদের চারপাশের জগত নিয়ে চিন্তা করতে বলতে হবে। আল্লাহ এভাবেই শুরু করেছেন:

  • রেফারেন্স: "তবে কি তারা উটের দিকে তাকালে না যে, তা কীভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে? এবং আকাশের দিকে যে, তা কীভাবে উচ্চ করা হয়েছে? এবং পাহাড়গুলোর দিকে যে, তা কীভাবে স্থাপিত করা হয়েছে? এবং যমীনের দিকে যে, তা কীভাবে বিছানো হয়েছে?" (সূরা আল-গাশিয়াহ, ৮৮:১৭-২০)

  • অনুধাবন: দাওয়াত দাতা ব্যক্তিকে মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা দেখিয়ে প্রশ্ন করবেন—এই বিশাল ডিজাইন কি এমনি এমনি হয়েছে? নাকি কোনো ডিজাইনার আছেন?

২. দ্বিতীয় ধাপ: অস্তিত্বের যৌক্তিক প্রশ্ন তোলা (The Existential Question)

মানুষকে তার নিজের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে প্রশ্ন করতে হবে, যাতে তার অহংকার চূর্ণ হয়।

  • রেফারেন্স: "তারা কি স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই স্রষ্টা? তারা কি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছে? বরং তারা দৃঢ় বিশ্বাস করে না।" (সূরা আত-তূর, ৫২:৩৫-৩৬)

  • শিক্ষা: এই আয়াতের মাধ্যমে তাদের বিবেককে একটি চূড়ান্ত মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিতে হবে। যখন তারা স্বীকার করবে তারা নিজেরা নিজেদের স্রষ্টা নয়, তখন তাদের মন প্রকৃত সত্য গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হবে।

৩. তৃতীয় ধাপ: অভিন্ন বিষয় দিয়ে শুরু করা (Common Ground)

অমুসলিম বা অন্য মতাদর্শের মানুষের সাথে তর্কের আগে মিলগুলো খুঁজে বের করতে হবে।

  • রেফারেন্স: "বলুন, হে কিতাবীরা! তোমরা এমন এক বাণীর দিকে এসো যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমান—তা হলো, আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারও ইবাদত করব না এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করব না..." (সূরা আলে-ইমরান, ৩:৬৪)

  • অনুধাবন: দাওয়াতের শুরুতে বিবাদ নয়, বরং ‘এক স্রষ্টা’—এই মৌলিক সত্যের ওপর ভিত্তি করে আলোচনা শুরু করতে হবে।

৪. চতুর্থ ধাপ: কিতাব বা দলিলের চ্যালেঞ্জ পেশ করা (The Challenge of Evidence)

দ্বীনের ব্যাপারে অজ্ঞ ব্যক্তিরা অনেক সময় অন্ধ বিশ্বাস বা বাপ-দাদার দোহাই দেয়। তখন তাদের সামনে কুরআনের অকাট্য প্রমাণের চ্যালেঞ্জ দিতে হবে।

  • রেফারেন্স: "আমি আমার বান্দার প্রতি যা নাযিল করেছি তাতে যদি তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকে, তবে তোমরা এর মতো একটি সূরা নিয়ে এসো..." (সূরা আল-বাক্বারা, ২:২৩)

  • রেফারেন্স: "এ কিতাব মহাজ্ঞানী ও সর্বস্তুত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। নিশ্চয়ই আসমান ও যমীনে মুমিনদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।" (সূরা আল-জাছিয়াহ, ৪৫:২-৩)

  • শিক্ষা: মানুষকে বোঝাতে হবে যে ঈমান কোনো রূপকথা নয়, বরং এটি সুস্পষ্ট প্রমাণের (বুরহান) ওপর প্রতিষ্ঠিত।

৫. পঞ্চম ধাপ: পরকাল ও জবাবদিহিতার ভয় ও আশা দেখানো

মানুষ যখন দুনিয়াবি মোহে অন্ধ থাকে, তখন তাকে জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও পরিণাম সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

  • রেফারেন্স: "প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর তোমরা কি মনে করেছ যে, আমি তোমাদেরকে অহেতুক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না?" (সূরা আল-মুমিনুন, ২৩:১১৫)

  • অনুধাবন: জীবনের উদ্দেশ্য এবং মৃত্যুর পরের জবাবদিহিতার আয়াতগুলো দিয়ে তাদের অন্তরে ‘তাকওয়া’ বা সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

৬. ষষ্ঠ ধাপ: সুন্দর আচরণ ও গালিগালাজ বর্জন (Etiquette of Dawah)

অমুসলিমদের উপাস্য বা তাদের বিশ্বাসকে আক্রমণ না করে বরং সত্য তুলে ধরতে হবে।

  • রেফারেন্স: "আল্লাহকে ছেড়ে তারা যাদের ডাকে, তোমরা তাদেরকে গালি দিও না; অন্যথায় তারা সীমালঙ্ঘন করে অজ্ঞতাবশত আল্লাহকেও গালি দেবে।" (সূরা আল-আনআম, ৬:১০৮)

  • শিক্ষা: দাওয়াতের ভাষা হবে নম্র এবং যুক্তিপূর্ণ, যা সূরা আন-নাহলের ১২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে (হিকমাহ ও সদুপদেশ)।

৭. সপ্তম ধাপ: চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ব্যক্তির ওপর ছেড়ে দেওয়া (Freedom of Choice)

দাওয়াত দেওয়ার পর কাউকে জোর করা যাবে না। তাকে তার বিবেকের ওপর ছেড়ে দিতে হবে।

  • রেফারেন্স: "বলো, সত্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকে। সুতরাং যার ইচ্ছা ঈমান আনুক এবং যার ইচ্ছা কুফরি করুক।" (সূরা আল-কাহাফ, ১৮:২৯)

  • রেফারেন্স: "তোমার কাজ তো কেবল পৌঁছে দেওয়া, আর হিসাব নেওয়ার দায়িত্ব আমার।" (সূরা আর-রাদ, ১৩:৪০)


দাওয়াতের সারসংক্ষেপ (খুৎবা বা প্রেজেন্টেশন ফরম্যাট):

১. ভূমিকা: আসমান ও যমীনের বিশালতা ও সৃষ্টির নিপুণতা নিয়ে আলোচনা (সূরা আল-গাশিয়াহ-এর আলোকে)।
২. যুক্তি: মানুষ নিজে নিজের স্রষ্টা হতে পারে না, তাই একজন চূড়ান্ত মালিকের আনুগত্য আবশ্যক (সূরা আত-তূর-এর আলোকে)।
৩. একত্ববাদ: সকল মানুষের স্রষ্টা এক, সুতরাং উপাসনাও হবে কেবল একজনের (সূরা আলে-ইমরান-এর আলোকে)।
৪. কুরআন পরিচয়: কুরআন কোনো মানুষের কথা নয়, এটি স্রষ্টার পক্ষ থেকে আসা একটি 'ম্যানুয়াল' বা জীবনবিধান (সূরা আল-বাকারার চ্যালেঞ্জের আলোকে)।
৫. পরিণাম: এই জীবনই শেষ নয়, অনন্তকালের সফলতার জন্য ঈমান জরুরি (সূরা মুমিনুন-এর আলোকে)।
৬. আহ্বান: "এসো সেই কিতাবের দিকে যা অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসে।" (সূরা ইব্রাহিম, ১৪:১)


এই পদ্ধতিতে দাওয়াত দিলে একজন মানুষ নিজেকে সরাসরি আল্লাহর আয়াতের মুখোমুখি দাঁড় করাবে। এখানে আমাদের কোনো মনগড়া কথা নেই। দাওয়াতের মূল কথা হবে— "ফাফিররু ইলাল্লাহ" (অতএব, আল্লাহর দিকে ধাবিত হও - সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৫০)।


দাওয়াতের কাজকে আরও বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রভাবশালী করতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে এমন কিছু যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক আয়াত নাযিল করেছেন, যা একজন বিবেকবান মানুষকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে।

নিচে একমাত্র রবের প্রতি ঈমান আনার যৌক্তিকতা এবং নাযিলকৃত আয়াতের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের একটি উচ্চতর প্রেজেন্টেশন সাজিয়ে দেওয়া হলো:


বিষয়: কেন কেবল এক আল্লাহ এবং কেন কেবল তাঁর নাযিলকৃত কিতাব?

১. তাওহীদের যৌক্তিকতা: ‘একাধিক মাবুদ’ কেন অসম্ভব?

প্রচলিত যুক্তির বাইরে কুরআন একটি চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক যুক্তি পেশ করেছে।

  • পার্থিব উপমা (Parable of Masters):
    “আল্লাহ একটি উপমা দিচ্ছেন: এক ব্যক্তির (দাস) অনেকগুলো মালিক, যারা পরস্পর বিরোধী; আর অন্য এক ব্যক্তি (দাস), যে কেবল একজনের অনুগত। এই দুই ব্যক্তির অবস্থা কি সমান? সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা জানে না।” (সূরা আয-যুমার, ৩৯:২৯)

    • অনুধাবন: একাধিক বিধানদাতা বা ইলাহ থাকলে মানুষের জীবন বিশৃঙ্খল হয়ে যেত। একক রবের আনুগত্যই মানুষের মনে প্রশান্তি আনে।

  • মহাজাগতিক শৃঙ্খলা:
    “যদি আসমান ও যমীনে আল্লাহ ছাড়া আরও ইলাহ থাকত, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত।” (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:২২)

    • যুক্তি: পুরো মহাবিশ্ব একটি একক নিয়মে (Law of Nature) চলছে, যা প্রমাণ করে এর নিয়ন্ত্রক একজনই।

২. স্রষ্টার অমুখাপেক্ষিতা বনাম সৃষ্টির অসহায়ত্ব

মানুষ কেন মূর্তিপূজা বা ব্যক্তিপূজা ছেড়ে কেবল এক আল্লাহর দিকে আসবে?

  • মালিকানার দাবি:
    “হে মানুষ! তোমরা তো আল্লাহর মুখাপেক্ষী; আর আল্লাহ—তিনি তো অভাবমুক্ত, পরম প্রশংসিত।” (সূরা ফাতির, ৩৫:১৫)

  • অক্ষমতার প্রমাণ:
    “তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদের ডাকো, তারা তো খেজুরের আঁটির ওপরকার পাতলা আবরণেরও (ক্বিৎমীর) মালিক নয়।” (সূরা ফাতির, ৩৫:১৩)

    • দাওয়াতের পয়েন্ট: মানুষকে বোঝানো যে, আপনি এমন কারও ইবাদত করছেন যে নিজের অস্তিত্বের জন্যই স্রষ্টার মুখাপেক্ষী।

৩. নাযিলকৃত আয়াতের প্রতি ঈমান আনার আবশ্যকতা (কেন কুরআন?)

অজ্ঞ ব্যক্তি প্রশ্ন করতে পারে, ‘কেন আমি এই কিতাবকেই মানব?’ তার উত্তর কুরআন নিজেই দিচ্ছে:

  • বিরোধহীনতার প্রমাণ (Consistency):
    “তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না? এটি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এতে অনেক অসংগতি/মতপভেদ (ইখতিলাফান কাসীরা) পেত।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৮২)

    • যুক্তি: মানুষের রচিত তত্ত্বে সময়ের সাথে ভুল ধরা পড়ে, কিন্তু কুরআনের আয়াতসমূহ হাজার বছর ধরে অপরিবর্তনীয় এবং স্ববিরোধী নয়।

  • অজেয় সত্য (Invincibility):
    “নিশ্চয়ই এটি এক সম্মানিত কিতাব। কোনো মিথ্যা এতে প্রবেশ করতে পারে না—সামনে থেকেও নয়, পেছন থেকেও নয়। এটি প্রজ্ঞাময়, চিরপ্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।” (সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৪১-৪২)

৪. কিতাবের আলোকবর্তিকা বনাম মানুষের ধারণা (ওহী বনাম অনুমান)

মানুষ যখন সত্য পায় না, তখন সে অনুমানের ওপর চলে। কুরআন এই ধারণাকে খণ্ডন করে:

  • অন্ধকারের বর্ণনা:
    “যাকে আল্লাহ আলো (নূর/কিতাব) দেন না, তার জন্য কোনো আলো নেই।” (সূরা আন-নূর, ২৪:৪০)

  • উত্তম কথা:
    “আল্লাহ নাযিল করেছেন উত্তম বাণী সংবলিত কিতাব, যা সুসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং যা বারবার আবৃত্তি করা হয়...” (সূরা আয-যুমার, ৩৯:২৩)

৫. বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো কিছু প্রশ্ন (Self-Reflection)

দাওয়াতের সময় মানুষকে এই আয়াতগুলো দিয়ে চিন্তা করতে উৎসাহিত করুন:

  • নিজের অস্তিত্ব: “তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন রয়েছে); তোমরা কি তবে দেখবে না?” (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:২১)

  • নিখুঁত সৃষ্টি: “তুমি পরম করুণাময়ের সৃষ্টিতে কোনো খুঁত দেখতে পাবে না। আবার তাকিয়ে দেখো, কোনো ফাটল দেখতে পাও কি?” (সূরা আল-মুলক, ৬৭:৩)

    • আহ্বান: যদি সৃষ্টির ডিজাইন এত নিখুঁত হয়, তবে স্রষ্টার নাযিলকৃত জীবনবিধান (কুরআন) কেন নিখুঁত হবে না?

৬. চূড়ান্ত আহ্বান: সত্য শোনার আদব

যখন কাউকে দাওয়াত দেবেন, তাকে আল্লাহর এই নির্দেশটি মনে করিয়ে দিন:

  • মনোযোগের শর্ত: “যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগ দিয়ে তা শোনো এবং চুপ থাকো, যাতে তোমাদের ওপর রহমত করা হয়।” (সূরা আল-আ’রাফ, ৭:২০৪)

  • সুসংবাদ: “যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে এবং তার মধ্যে যা উত্তম তা অনুসরণ করে; তাদেরকেই আল্লাহ হিদায়াত দিয়েছেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।” (সূরা আয-যুমার, ৩৯:১৮)


দাওয়াতের এই ফরমেটের বিশেষ বৈশিষ্ট্য:

১. এটি কোনো দলীয় মতবাদ নয়, বরং সরাসরি আল্লাহর কালামের উপস্থাপন।

২. এটি যুক্তিভিত্তিক (Logical): এখানে সৃষ্টির নিখুঁত হওয়া এবং স্রষ্টার একত্ববাদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করা হয়েছে।

৩. এটি চ্যালেঞ্জিং: এটি মানুষকে তার নিজের অস্তিত্ব এবং মহাবিশ্ব নিয়ে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে।

(প্রেজেন্টেশনের ইতি টানার জন্য):

হে মানুষ! আল্লাহ আমাদের জন্য ‘বুরহান’ (সুস্পষ্ট প্রমাণ) পাঠিয়েছেন। তিনি বলছেন: “হে মানুষ! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে প্রমাণ (বুরহান) এসেছে এবং আমি তোমাদের প্রতি সুস্পষ্ট নূর (আলো) নাযিল করেছি।” (সূরা আন-নিসা, ৪:১৭৪)। সুতরাং আসুন, আমরা অনুমানের অনুসরণ ছেড়ে এই অকাট্য প্রমাণের দিকে ফিরে আসি।

এভাবেই কুরআন ভিত্তিক দাওয়াত দিলে একজন মানুষ নিজের অজান্তেই তার রবের প্রতি বিনয়ী হতে শুরু করবে, ইনশাআল্লাহ।


ঈমানহীন বা সংশয়বাদীদের জন্য কুরআনী দাওয়াতকে আরও উচ্চতর ও বুদ্ধিবৃত্তিক (Intellectual) পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা কুরআনে এমন কিছু ‘আয়াত’ বা ‘নিদর্শন’ রেখেছেন যা সরাসরি বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা এবং দর্শনের সাথে সম্পর্কিত।

নিচে  দাওয়াতের জন্য আরও গভীর ও তথ্যভিত্তিক একটি প্রেজেন্টেশন কাঠামো তুলে ধরা হলো:


উচ্চতর প্রেজেন্টেশন: মহাবিশ্বের মহাবিস্ময় ও আল্লাহর কালামের অকাট্যতা

১. সৃষ্টির শুরু: শূন্য থেকে অস্তিত্ব (Cosmology & Logic)

আধুনিক বিজ্ঞান মহাবিশ্বের শুরু নিয়ে যে ‘বিগ ব্যাং’ তত্ত্ব দেয়, কুরআন তার চেয়েও গভীরতর যৌক্তিক প্রশ্ন তোলে।

  • আয়াত: “অবিশ্বাসীরা কি দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে (রদকান), অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম (ফাফাতাকনাহুমা)...?” (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৩০)

  • তাফসির বিল কুরআন (যুক্তি): এই পৃথকীকরণ কি এমনিতেই হয়েছে? আল্লাহ উত্তর দিচ্ছেন— “তারা কি স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই স্রষ্টা?” (সূরা আত-তূর, ৫২:৩৫)।

  • দাওয়াতের পয়েন্ট: কার্যকারণ (Cause and Effect) তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিটি প্রভাবের পেছনে একজন প্রভাবক থাকে। মহাবিশ্ব নিজে নিজের কারণ হতে পারে না।

২. প্রসারমান মহাবিশ্ব ও সুনিপুণ নিয়ন্ত্রণ

বিজ্ঞান অতি সম্প্রতি জেনেছে মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে, যা কুরআন দেড় হাজার বছর আগে ঘোষণা করেছে।

  • আয়াত: “আমি আকাশ নির্মাণ করেছি আমার ক্ষমতাবলে এবং আমিই একে সম্প্রসারিত করছি (মুসিঊন)।” (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৪৭)

  • তাফসির বিল কুরআন (ভারসাম্য): এই প্রসারণ কি বিশৃঙ্খল? না— “তিনি আকাশকে করেছেন সমুন্নত এবং স্থাপন করেছেন ভারসাম্য (মীযান)।” (সূরা আর-রাহমান, ৫৫:৭)।

  • যুক্তি: গাণিতিক নির্ভুলতা ছাড়া এই মহাবিশ্ব টিকে থাকা অসম্ভব। এই ‘মীযান’ বা ব্যালেন্স প্রমাণ করে একজন ‘হাকিম’ বা প্রজ্ঞাময় সত্তাকে।

৩. জীবনের উৎস ও জৈবিক অলৌকিকতা

মানুষকে তার নিজের জন্ম প্রক্রিয়া নিয়ে ভাবলে সে নাস্তিক থাকতে পারে না।

  • আয়াত: “আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি... তা দিয়ে আমি প্রত্যেক জোড়ায় জোড়ায় উদ্ভিদ উৎপন্ন করি।” (সূরা লোকমান, ৩১:১০)

  • সংশ্লিষ্ট আয়াত: “আমি প্রাণবান সবকিছু সৃষ্টি করলাম পানি থেকে; তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?” (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৩০)

  • ভ্রূণতত্ত্ব (Embryology): “অতঃপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তে (আলাক্বাহ) পরিণত করি, অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে (মুদগাহ) পরিণত করি...” (সূরা আল-মু’মিনুন, ২৩:১৪)।

  • যুক্তি: একজন মরুচারী মানুষের পক্ষে এই সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক স্তরগুলো জানা কি সম্ভব ছিল? নাকি এটি স্রষ্টার বাণী?

৪. ইতিহাসের অকাট্যতা: সংরক্ষিত তথ্য (Historical Miracle)

কুরআন এমন কিছু ঐতিহাসিক তথ্য দেয় যা তৎকালীন যুগে মানুষের জানা ছিল না। যেমন ফেরাউনের লাশ সংরক্ষণ।

  • আয়াত: “আজ আমি তোমার দেহটি রক্ষা করব, যাতে তুমি তোমার পরবর্তীকালের মানুষের জন্য নিদর্শন হয়ে থাকো।” (সূরা ইউনুস, ১০:৯২)

  • যুক্তি: বাইবেল বা অন্য কিতাবে এই তথ্য এভাবে নেই। ১৮৯৮ সালে মমিটি পাওয়ার পর কুরআনের এই ভবিষ্যৎবাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে কুরআন কোনো মানুষের রচনা নয়।

৫. কেন কেবল কুরআনই সত্য? (The Ultimate Challenge)

কুরআন নিজেকে কেবল ধর্মগ্রন্থ হিসেবে নয়, বরং একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে পেশ করে।

  • চ্যালেঞ্জ ১ (অনুকরণ অসম্ভব): “যদি জিন ও মানুষ এই কুরআনের অনুরূপ আনার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা তা আনতে পারবে না।” (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮৮)

  • চ্যালেঞ্জ ২ (ভুল প্রমাণ): “তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা করে না? এটি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এতে অনেক অসংগতি (ইখতিলাফ) পেত।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৮২)

  • যুক্তি: পৃথিবীতে এমন কোনো বই নেই যার লেখক শুরুতে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন— এতে কোনো সন্দেহ নেই (২:২) এবং এতে কোনো ভুল খুঁজে পাওয়া যাবে না।

৬. মানবাত্মার ফিতরাত বা স্বভাবজাত টান

বিজ্ঞান ও যুক্তির বাইরে মানুষের অন্তরের এক গভীর তৃষ্ণা আছে।

  • আয়াত: “জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই কেবল অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” (সূরা আর-রাদ, ১৩:২৮)

  • আয়াত: “সুতরাং আপনি আপনার চেহারাকে একনিষ্ঠভাবে দ্বীনের দিকে প্রতিষ্ঠিত রাখুন—আল্লাহর সেই ফিতরাত (প্রকৃতি), যার ওপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আর-রূম, ৩০:৩০)

  • যুক্তি: ক্ষুধার যেমন খাদ্য আছে, তৃষ্ণার যেমন পানি আছে, তেমনি মানুষের ‘আধ্যাত্মিক তৃষ্ণার’ উত্তর হলো ঈমান। এটি ছাড়া মানুষ মানসিকভাবে পূর্ণ হতে পারে না।


ঈমানহীনদের জন্য দাওয়াতের চূড়ান্ত ফরমেট:

১. প্রশ্ন করুন: এই মহাবিশ্ব এবং আপনার অস্তিত্ব কি একটি নিছক দুর্ঘটনা (Accident)? নাকি একটি মহাপরিকল্পনা (Design)?
২. নিদর্শন দেখান: কুরআন থেকে মহাকাশ, ভ্রূণতত্ত্ব এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্যের আয়াতগুলো পাঠ করুন।
৩. বিবেককে জাগান: মানুষকে বলুন— যদি একটি ছোট ঘড়ি একজন ঘড়ি নির্মাতা ছাড়া তৈরি হতে না পারে, তবে এই কোটি কোটি নক্ষত্র এবং গ্যালাক্সি কি একজন ‘রব’ ছাড়া চলতে পারে? (সূরা আত-তূর, ৫২:৩৫-৩৬)
৪. কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব: তাকে চ্যালেঞ্জ দিন যে, কুরআন কেবল বিশ্বাস করতে বলে না, বরং চিন্তা করতে (তাফাক্কুর) বলে। কুরআনের কোনো একটি তথ্যের ভুল প্রমাণ করতে বলুন।
৫. ফলাফল: তাকে বলুন— “সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই বিষয়।” (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৮১)

সারকথা:
আপনার দাওয়াতের ভিত্তি হবে ‘ইলম’ (জ্ঞান) এবং ‘বুরহান’ (প্রমাণ)। আল্লাহ বলছেন, “যাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে তারা দেখতে পায় যে, আপনার রবের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তা-ই সত্য।” (সূরা সাবা, ৩৪:৬)।

এই বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক পদ্ধতি অবলম্বন করলে একজন শিক্ষিত ও বিবেকবান অমুসলিম বা ঈমানহীন ব্যক্তির পক্ষে কুরআনকে অস্বীকার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। ইনশাআল্লাহ।

ওয়ামা তাউফিকি ইলাহ বিল্লাহ! (وَمَا تَوْفِيقِي إِلَّا بِاللَّهِ)  (অর্থ: আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো কাজে সফলতা নেই) —আয়াত: ১১:৮৮

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post