মুসল্লি কাকে বলে? মুসল্লি’র সংজ্ঞা কি? -সালাত আদায় করেও জাহান্নামি হওয়ার কারণ- কী বলে আল কোরআন? (Salat-Musalli)

আমাদের সমাজে ‘মুসল্লি’র যে চিত্র প্রচলিত (দাড়ি, টুপি, জুববা, কপালে দাগ), কুরআনের মানদণ্ডের সাথে মিলিয়ে দেখলে তা অনেক ক্ষেত্রেই কেবল ‘লেবাস’ বা বহিরাবরণ হিসেবে ধরা দেয়। কুরআন ‘পোশাকী মুসল্লি’র চেয়ে ‘আচরণের মুসল্লি’র ওপর জোর দিয়েছে। তাহলে কেমনতরো সেই মুসল্লি? আল-কোরআন অনুধাবনে জানার চেষ্টা করি:

নিচে আল-কুরআনের আয়নায় সমাজের প্রচলিত ধারণা ও বাস্তবতার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

⚖️ প্রচলিত ধারণা বনাম কুরআনি বাস্তবতা: প্রকৃত মুসল্লি কে?

■ ১. দাড়ি-টুপি ও সুদর্শন চেহারা বনাম মুনাফিকের সুন্দর অবয়ব:

আমরা মনে করি, সুন্দর চেহারার দাড়ি-টুপি পরা ভদ্রলোকই পাকা মুসল্লি। অথচ কুরআন বলছে, মুনাফিকদের শারীরিক গঠন ও কথাবার্তা অত্যন্ত আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু ভেতরটা হতে পারে অন্তঃসারশূন্য।

আয়াত: “(হে নবী!) আপনি যখন তাদেরকে (মুনাফিকদের) দেখেন, তখন তাদের দেহ-অবয়ব বা শারীরিক গঠন আপনাকে মুগ্ধ করে। আর তারা যখন কথা বলে, আপনি তাদের কথা শুনতে থাকেন (তাদের বাকপটুতার কারণে)। অথচ তারা হলো দেওয়ালে ঠেকানো কাঠের খুঁটির মতো (প্রাণহীন/বিবেকহীন)...” (সূরা আল-মুনাফিকুন: ৪)

অনুধাবন: কাঠের খুঁটিতে যেমন প্রাণ থাকে না, তেমনি কেবল বাহ্যিক জুববা-পাগড়ী ও সুন্দর চেহারার আড়ালে যদি ঈমান ও মানবতাবোধ না থাকে, তবে সে কুরআনের দৃষ্টিতে মৃত কাঠ বা জড়বস্তু। আল্লাহ এখানে সতর্ক করেছেন যে, ‘দর্শনধারী’ হলেই ‘গুণবিচারী’ হওয়া যায় না।


■ ২. কপালে সেজদার দাগ বনাম চারিত্রিক দৃঢ়তা:

প্রচলিত ধারণায় কপালে দাগ থাকা বড় পরহেজগারীর লক্ষণ মনে করা হয়। কিন্তু কুরআনে ‘প্রকৃত মুসল্লি’র যে বিস্তারিত সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে (সূরা আল-মা‘আরিজ: ১৯-৩৫), সেখানে কপালে দাগ বা পোশাকের কোনো উল্লেখই নেই। সেখানে বলা হয়েছে সামাজিক ও নৈতিক গুণাবলির কথা।

আয়াত: “নিশ্চয়ই মানুষ অতিশয় অস্থিরচিত্তে সৃষ্টি হয়েছে... তবে তারা স্বতন্ত্র যারা সালাত আদায়কারী (মুসল্লি)। যারা তাদের সালাতে সর্বদা নিষ্ঠাবান। এবং যাদের সম্পদে নির্ধারিত হক রয়েছে—প্রার্থী ও বঞ্চিতদের জন্য। যারা প্রতিদান দিবসকে সত্য বলে বিশ্বাস করে... এবং যারা নিজেদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। যারা নিজেদের সাক্ষ্যদানে অটল থাকে।” (সূরা আল-মা‘আরিজ: ১৯-৩৫)

অনুধাবন: এখানে আল্লাহ প্রকৃত মুসল্লির পরিচয় দিতে গিয়ে দাড়ি, টুপি বা পোশাকের কথা বলেননি। বরং তিনি ৭টি গুণের কথা বলেছেন:

১. সালাতে ধারাবাহিকতা।
২. সম্পদে গরিবের হক রাখা (দানশীলতা)।
৩. পরকালের ভয়।
৪. লজ্জাস্থানের হেফাজত (চরিত্রবান)।
৫. আমানত রক্ষা করা (বিশ্বস্ততা)।
৬. প্রতিশ্রুতি পালন করা।
৭. সত্য সাক্ষ্য দেওয়া।
সমাজের তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ মুসল্লি যদি আমানত খেয়ানত করে, ওয়াদা ভাঙ্গে কিংবা গরিবের হক না দেয়—তবে কুরআনের সংজ্ঞায় সে ‘প্রকৃত মুসল্লি’র কাতারেই পড়ে না।


৩. পোশাকী তাকওয়া বনাম অন্তরের তাকওয়া (লিবাসুত তাকওয়া):

আমরা মনে করি বোরখা বা লম্বা জুববাই একমাত্র ইসলামি পোশাক। অথচ কুরআন বলছে, শরীরের পোশাকের চেয়ে ‘তাকওয়ার পোশাক’ (আত্মসংযম ও আল্লাহ সচেতনতা) অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আয়াত: “হে বনী আদম! আমি তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থান আবৃত করে এবং যা শোভাবর্ধনকারী। আর তাকওয়ার পোশাকই (লিবাসুত তাকওয়া) হলো সর্বোৎকৃষ্ট।” (সূরা আল-আ‘রাফ: ২৬)

অনুধাবন: একজন ব্যক্তি আপদমস্তক ঢাকা পোশাকে থেকেও যদি তার অন্তরে লোভ, হিংসা ও অহংকার পুষে রাখে, তবে সে আল্লাহর কাছে উলঙ্গতুল্য। অন্যদিকে সাধারণ পোশাকে থেকেও যদি কেউ হারাম বর্জন করে ও আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকে, তবে সে-ই প্রকৃত পোশাক পরিহিত।


■ ৪. কেবলামুখী হওয়া বনাম অর্থের মোহ ত্যাগ করা:

সমাজে দেখা যায়, অনেক মুসল্লি মসজিদে প্রথম কাতারে সালাত আদায় করেন কিন্তু এতিমের সম্পদ গ্রাস করেন বা আত্মীয়ের হক দেন না। আল্লাহ বলছেন, কেবল কেবলামুখী হয়ে দাঁড়ানোর নাম পুণ্য নয়।

আয়াত: “সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিমদিকে তোমরা মুখ ফিরাবে; বরং সৎকর্ম হলো... সম্পদের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও আত্মীয়-স্বজন, এতিম-মিসকিন, মুসাফির ও সাহায্যপ্রার্থীদেরকে এবং দাসমুক্তির জন্য অর্থ দান করা... এবং প্রতিশ্রুতি দিলে তা পূর্ণ করা...” (সূরা আল-বাকারা: ১৭৭)

অনুধাবন: এই আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ‘মুসল্লি’ হওয়ার দাবি কেবল সালাতের দিক পরিবর্তনের (Ritual) মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সম্পদের মায়া ত্যাগ করে মানুষের উপকারে আসাই হলো সততার মাপকাঠি।


৫. লোকদেখানো ভদ্রতা বনাম গোপন দান:

সমাজে অনেক ‘ভদ্রলোক’ মুসল্লি আছেন যারা জনসমক্ষে দান করেন বা ভালো সাজেন, কিন্তু গোপনে কৃপণ। কুরআন একে ধিক্কার জানিয়েছে।

আয়াত: “যারা নিজেদের সালাত সম্পর্কে গাফেল, যারা লোকদেখানো কাজ করে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহসামগ্রী (অন্যকে) দিতে নিষেধ করে।” (সূরা আল-মাউন: ৫-৭)


প্রকৃত ‘মুসল্লি’র সংজ্ঞা এবং সালাত আদায় করেও জাহান্নামি হওয়ার কারণ:

কেবল রুকু-সিজদা করলেই কেউ প্রকৃত মুসল্লি হয় না, যতক্ষণ না তার সম্পদের মধ্যে অভাবীর হক আদায় করা হয়। যারা সালাত আদায় করে কিন্তু গরিবের হক দেয় না, কুরআন তাদের জন্য কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। প্রকৃত সালাত মানুষকে কৃপণতা ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখে; যদি তা না হয়, তবে সেই সালাত ত্রুটিপূর্ণ।

আয়াত: “অতএব সেই মুসল্লিদের জন্য দুর্ভোগ (ওয়াইল), যারা নিজেদের সালাত সম্পর্কে গাফেল, যারা লোকদেখানো কাজ করে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহসামগ্রী (অন্যকে) দিতে নিষেধ করে।” (সূরা আল-মাউন: ৪-৭)

অনুধাবন: সূরা আল-মা‘আরিজে ‘প্রকৃত মুসল্লি’র সংজ্ঞায় আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন— “তবে তারা স্বতন্ত্র যারা সালাত আদায়কারী... এবং যাদের সম্পদে নির্ধারিত হক রয়েছে—প্রার্থী ও বঞ্চিতদের জন্য। আর যারা কর্মফল দিনকে সত্য মনে করে। এবং যারা, তারা তাদের রবের আযাবের ব্যাপারে ভীত” (সূরা আল-মা‘আরিজ: ২২-২7)।

পক্ষান্তরে, যারা এই হক আদায় করে না, পরকালে জান্নাতিদের প্রশ্নের জবাবে তারা নিজেদের অপরাধ স্বীকার করবে এভাবে— “জান্নাতিরা অপরাধীদের জিজ্ঞাসা করবে, ‘কিসে তোমাদেরকে ‘সাকার’ জাহান্নামে নিক্ষেপ করেছে?’ তারা বলবে, ‘আমরা মুসল্লিদের (সালাত আদায়কারীদের) অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না এবং আমরা মিসকিনকে আহার করাতাম না। এবং আমরা অহেতুক সমালোচনাকারীদের সঙ্গে অহেতুক সমালোচনা করতাম। আর আমরা কর্মফল দিন সম্পর্কে মিথ্যারোপ করতাম।” (সূরা আল-মুদ্দাসসির: ৪১-৪৪)

বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয় সূরা বাকারার ‘আয়াতুল বির’ বা পুণ্যময়তার আয়াতে। আল্লাহ বলেন, কেবল কিবলামুখী হয়ে সালাত আদায়ের নামই পুণ্য নয়, বরং সম্পদের মোহ থাকা সত্ত্বেও তা দান করাই হলো সত্যবাদীদের পরিচয়।

আরও দলিল: “সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিমদিকে তোমরা মুখ ফিরাবে; বরং সৎকর্ম হলো... সম্পদের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও আত্মীয়-স্বজন, এতিম-মিসকিন, মুসাফির ও সাহায্যপ্রার্থীদেরকে এবং দাসমুক্তির জন্য অর্থ দান করা...” (সূরা আল-বাকারা: ১৭৭)

এখানে ‘প্রকৃত সালাত আদায়কারী’র বৈশিষ্ট্য এবং ‘সালাত নষ্টকারীদের’ পরিণাম সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে:

৫. সফল মুমিনদের পরিচয়: সালাতে বিনয় এবং সক্রিয় দানশীলতা:

সালাত কেবল উঠা-বসার নাম নয়, বরং এটি মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে তাকে দানশীল ও দায়িত্ববান বানায়। যারা সফল মুমিন, তাদের সালাত এবং সম্পদের ব্যবহার অবিচ্ছেদ্য।

আয়াত: “অবশ্যই মুমিনরা সফল হয়েছে। যারা নিজেদের সালাতে বিনয়াবনত থাকে। যারা অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিমুখ থাকে। এবং যারা যাকাত (পবিত্রতা/দান) দানে সক্রিয় থাকে।” (সূরা আল-মুমিনুন: ১-৪)

অনুধাবন: এই আয়াতে আল্লাহ সফলতার মানদণ্ড হিসেবে সালাতের পরপরই যাকাত বা দানশীলতার কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, যে সালাত মানুষকে কৃপণতা মুক্ত করে সম্পদের পবিত্রতা অর্জনে (দানে) উদ্বুদ্ধ করে না, তা প্রকৃত মুমিনের সালাত হতে পারে না। প্রকৃত মুসল্লি তিনি, যার সালাত তাকে সামাজিকভাবে দায়িত্ববান ও দানশীল করে তোলে।


৬. সালাত বিনষ্টকারী এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসারীদের ধ্বংস:

পরবর্তী যুগের এমন কিছু মানুষের কথা বলা হয়েছে, যারা সালাত ঠিকই আদায় করবে বা নামেমাত্র পড়বে, কিন্তু তাদের চরিত্র হবে লোভ ও প্রবৃত্তির দাস। তাদের জন্য রয়েছে ‘গাই’ নামক জাহান্নামের উপত্যকা।

আয়াত: “অতঃপর তাদের পরে এল এমন এক অপদার্থ পরবর্তী বংশধর, যারা সালাত বিনষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির (লোভ-লালসার) অনুসরণ করল। সুতরাং অচিরেই তারা ‘গাই’ (জাহান্নামের শাস্তি/ধ্বংস)-এর সম্মুখীন হবে।” (সূরা মারইয়াম: ৫৯)

অনুধাবন: মুফাসসিরদের মতে, ‘সালাত বিনষ্ট করা’ মানে কেবল সালাত ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং সালাতের সময় অবহেলা করা এবং সালাতের শিক্ষা (যেমন: দান, সহমর্মিতা) ভুলে গিয়ে দুনিয়ার লোভ-লালসায় মগ্ন হওয়া। সালাত আদায় করা সত্ত্বেও যারা সম্পদের লোভে অন্ধ হয়ে গরিবের হক নষ্ট করে, তারা মূলত সালাতের উদ্দেশ্যকেই বিনষ্ট করে।


৭. সালাত ও অন্যায়ের সম্পর্ক: সালাত কি আপনাকে পরিবর্তন করেছে?
সালাত আদায়ের প্রধান উদ্দেশ্য হলো মানুষকে অশ্লীলতা ও অন্যায় কাজ (যেমন: কৃপণতা, এতিমের সম্পদ গ্রাস, হক নষ্ট করা) থেকে বিরত রাখা।

আয়াত: “(হে নবী!) কিতাব থেকে যা আপনার প্রতি ওহী করা হয়েছে তা তেলাওয়াত করুন এবং সালাত কায়েম করুন। নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে...” (সূরা আল-আনকাবুত: ৪৫)

অনুধাবন: যদি কোনো ব্যক্তি সালাত আদায় করার পরেও কৃপণতা করে, মানুষের হক নষ্ট করে এবং সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখে, তবে বুঝতে হবে তার সালাত আল্লাহর কাছে কবুল হচ্ছে না বা সেই সালাত ‘প্রাণহীন’। কারণ, জীবন্ত সালাত অবশ্যই মুসল্লির চরিত্র পরিবর্তন করে দেবে এবং তাকে বদান্যতার দিকে ধাবিত করবে।


৮. লোকদেখানো সালাত ও মুনাফিকি আচরণ:

সূরা মাউনের মতোই সূরা নিসায় মুনাফিকদের সালাতের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে মানুষকে দেখানোর জন্যই ইবাদত করে।

আয়াত: “নিশ্চয়ই মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দিতে চায়... আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায়, তখন অলসভাবে দাঁড়ায়; তারা মানুষকে দেখানোর জন্য তা করে এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে।” (সূরা আন-নিসা: ১৪২)

অনুধাবন: প্রকৃত মুসল্লির সালাত হয় আল্লাহর জন্য, তাই সে গোপনেও দান করে। আর মুনাফিক বা নামধারী মুসল্লির সালাত হয় লোকদেখানো, তাই সে সুযোগ পেলেই হাত গুটিয়ে নেয় এবং জনকল্যাণমূলক কাজ (মাউন) থেকে বিরত থাকে।

🔸ওয়া কুলিল হাক্কু মির-রাব্বিকুম | 
-বলুন! সত্য তোমাদের রবের পক্ষ থেকেই (এসেছে)-আয়াত ১৮:২৯

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post