দুশ্চিন্তা-হতাশা-উদ্বেগ-অবসাদ ও মৃত্যু-কামনা: আল-কোরআনের আলোকে মানসিক প্রশান্তি ও কাউন্সেলিং (Worry, Despair, Anxiety, Depression, and Suicidal thoughts)

নিজের মৃত্যু কামনা কিংবা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়া—আল-কোরআনের সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং (পরামর্শ)

 জীবন যখন অসহ্য: হতাশা ও আত্মহত্যা রোধে আল-কোরআনের কাউন্সেলিং ও সান্ত্বনা

 মৃত্যুই কি সব সমস্যার শেষ? আত্মহত্যা ও মৃত্যু কামনা প্রসঙ্গে আল-কোরআনের চূড়ান্ত ফয়সালা ও পরামর্শ:

 হতাশ হয়ে মৃত্যু কামনা করা কোরআনের শিক্ষার পরিপন্থী এবং এটি এক প্রকারের সীমালঙ্ঘন।

বর্তমান সময়ে পারিবারিক কলহ, সামাজিক বঞ্চনা, কিংবা ব্যার্থতা, ঋণের বোঝা, নির্যাতন কিংবা শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় জর্জরিত হয়ে অনেকেই জীবন সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। কারো কারো মনে মৃত্যু কামনার উদ্রেক হয়, কেউবা আত্মহত্যার মতো মহাপাপের পথ বেছে নেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের স্রষ্টা, মানুষের রব; তিনি মানুষের মনস্তত্ত্ব (Psychology) সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানেন। তাই মানুষের এই চরম হতাশ মুহূর্তগুলোর সমাধানও তিনি আল-কোরআনে স্পষ্টভাবে বাতলে দিয়েছেন।

আল-কোরআনের আলোকে নিচে বিষয়টির গভীর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, মানসিক কাউন্সেলিং এবং প্রতিষেধক (আমল ও দোয়া) তুলে ধরা হলো।


   ▓▒░ প্রথম পর্ব ░▒▓

মৃত্যু কামনা ও আত্মহত্যার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (আল-কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি):

কোরআনের দৃষ্টিতে জীবন হলো একটি ‘আমানত’ এবং ‘পরীক্ষার ক্ষেত্র’। এই পরীক্ষা থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা বা আমানতের খেয়ানত করা স্পষ্ট অপরাধ।

১. জীবনের মালিকানা ও পরীক্ষার দর্শন: জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর একান্ত এখতিয়ার: 

মানুষ নিজের ইচ্ছায় পৃথিবীতে আসেনি, নিজের ইচ্ছায় যাওয়ারও অধিকার তার নেই।

আয়াত: “তিনিই সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন—কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ?” (সুরা মুলক: ২)

সুরা আলে-ইমরান, আয়াত ১৪৫: “আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কারও মৃত্যুবরণ করা সাধ্য নয়; এটার সময় সুনির্দিষ্ট...”

বিশ্লেষণ: জীবন একটি পরীক্ষা কেন্দ্র (Exam Hall)। পরীক্ষার প্রশ্ন কঠিন হলে কোনো ছাত্র যেমন খাতা ছিঁড়ে হল থেকে বেরিয়ে যেতে পারে না, তেমনি জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে আত্মহত্যা করা বা মৃত্যু চাওয়া মানে আল্লাহর পরীক্ষা থেকে পালানোর চেষ্টা করা। কিংবা যেহেতু জীবন একটি ‘পরীক্ষা’ এবং মৃত্যুর সময় আল্লাহ ‘সুনির্দিষ্ট’ করে রেখেছেন, তাই মৃত্যু কামনা করা মানে হলো পরীক্ষা চলাকালীন সময়েই পরীক্ষা ক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করা। এটি আল্লাহর নির্ধারিত ফয়সালার প্রতি অনীহা প্রকাশের শামিল।

২. নিজেকে ধ্বংস বা হত্যা করার নিষেধাজ্ঞা:

➤ আয়াত: “আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু।” (সুরা নিসা: ২৯)

আয়াত: “এবং নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না...” (সুরা বাকারা: ১৯৫)

 অনুধাবন: এই দুটি আয়াত একে অপরের পরিপূরক। প্রথম আয়াতে সরাসরি হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, আর দ্বিতীয় আয়াতে এমন কোনো কাজ করতে বারণ করা হয়েছে যা ধ্বংস ডেকে আনে। আত্মহত্যা হলো আল্লাহর দয়ার প্রতি অকৃতজ্ঞতা। আল্লাহ যেখানে বলছেন তিনি ‘দয়ালু’, সেখানে আত্মহত্যা করা মানে তাঁর দয়াকে অস্বীকার করা। 

মৃত্যু কামনা করা আত্মহত্যারই একটি মানসিক পর্যায়। কোরআন যেখানে নিজেকে হত্যা বা ধ্বংস করতে নিষেধ করেছে, সেখানে মৃত্যু কামনা করা সেই নিষেধাজ্ঞার সীমানার খুব কাছাকাছি অবস্থান করে।

৩. নবী-মনোনীতদের উদাহরণ এবং ‘মৃত্যু কামনা’র ধরণ (Tafsir bil Quran):

কোরআনে আমরা দুই ধরনের মৃত্যু কামনার প্রসঙ্গ পাই, যা আমাদের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে সাহায্য করে।

কোরআন মানুষের মনস্তত্ত্বকে সম্মান করে। তীব্র যন্ত্রণায় মানুষ যে ‘মৃত্যু কামনা’ করে ফেলে, তার দুটি উদাহরণ কোরআনে আছে যা আমাদের সঠিক পথ দেখায়।

👉সালামুন আলা মরিয়ম-এর আক্ষেপ (মানসিক চাপ): 

প্রসব বেদনায় এবং লোকলজ্জার ভয়ে তিনি বলেছিলেন, “হায়! এর আগে যদি আমি মরে যেতাম এবং মানুষের স্মৃতি থেকে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যেতাম!” (সুরা মরিয়ম: ২৩)।

🔗 কাউন্সেলিং-বিশ্লেষণ: 

এটি ছিল চরম শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহ এজন্য তাকে শাস্তি দেননি বা তিরস্কার করেননি, ধমক দেননি বরং তাৎক্ষণিকভাবে তাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন বরং তার মানসিক চাপ কমাতে তাকেপানি ও খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন (পরবর্তী আয়াত ২৪-২৬)। এই আয়াত প্রমাণ করে, মানুষ চরম বিপদে মৃত্যু কামনা করে ফেললে আল্লাহ হয়তো সাথে সাথে পাপ লেখেন না, তবে এটি সমাধান নয়। আল্লাহ তাকে মৃত্যু দেননি, বরং জীবন ধারণের উপায় বাতলে দিয়েছেন। অর্থাৎ, সমাধান মৃত্যু নয়, আল্লাহর ওপর ভরসা। এর আরও শিক্ষা হলো—কষ্টের সময় মৃত্যু চাওয়াটা মানুষের দুর্বলতা, কিন্তু সমাধান মৃত্যু নয়; সমাধান হলো রিজিক ও আল্লাহর সাহায্য তালাশ করা।

👉 সালামুন আলা ইউসুফ-এর প্রার্থনা (ঈমানি মৃত্যু): 

তিনি দোয়া করেছিলেন, “...তুমি আমাকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দিও...” (সুরা ইউসুফ: ১০১)।

🔗বিশ্লেষণ: এটি আত্মহত্যা বা এখনই মৃত্যু চাওয়া নয়। এটি জীবনের সমাপ্তি চাওয়া নয়, বরং সমাপ্তিটা যেন ‘সুন্দর’ হয়, তা চাওয়া। এটি বৈধ এবং প্রশংসনীয়। 
এটি হলো—‘যখনই মৃত্যু আসুক, তা যেন ঈমানের সাথে হয়’—সেই দোয়া (সমর্পিত হয়ে (মুসলিম হিসাবে) যেমনটি বলা হয়েছে আয়াত ২:১৩২, ৩:১০-এ)।একজন মুমিন এই দোয়া করতে পারে, কিন্তু বিপদ থেকে পালাতে মৃত্যু কামনা করতে পারে না।


   ▓▒░ দ্বিতীয় পর্ব ░▒▓

আল-কোরআনের সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং (মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা):

হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কে যে নেতিবাচক চিন্তাগুলো ঘোরে, কোরআন সেগুলোকে যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করে এবং ইতিবাচক বা ‘পজিটিভ মাইন্ডসেট’ তৈরি করে।

কাউন্সেলিং-১: “আমার জীবনের আর কোনো দাম নেই, সব শেষ”

➤ কোরআনের জবাব: “আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত থেকে কাফের সম্প্রদায় ছাড়া অন্য কেউ নিরাশ হয় না।” (সুরা ইউসুফ: ৮৭)

➤ বার্তা: হতাশা বা নিরাশা হলো ‘কুফরি’ বা অবিশ্বাসের লক্ষণ। আপনি যদি বিশ্বাস করেন আল্লাহ সর্বশক্তিমান, তবে আপনাকে এটাও মানতে হবে যে তিনি এক মুহূর্তে আপনার পরিস্থিতি বদলে দিতে পারেন। আত্মহত্যা করা মানে আপনি বিশ্বাস করলেন—আল্লাহর পক্ষে আমাকে বাঁচানো সম্ভব নয় (নাউজুবিল্লাহ)।

➤ কাউন্সেলিং-২: “আমার কষ্ট কেউ বোঝে না, আমি আর নিতে পারছি না”

➥ কোরআনের জবাব: “আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ বা বোঝা চাপিয়ে দেন না।” (সুরা বাকারা: ২৮৬)

➤ পরামর্শ-বার্তা: এটি আল্লাহর গ্যারান্টি। যেহেতু এই বিপদ আপনার ওপর এসেছে, তার মানে আল্লাহ জানেন—এটি সহ্য করার মতো ‘বিল্ট-ইন’ ক্ষমতা আপনার ভেতরে আছে বা এই বিপদ মোকাবেলা করার সুপ্ত শক্তি আপনার ভেতরে আছে আপনি নিজেকে যতটা দুর্বল ভাবছেন, আসলে আপনি তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী। আপনি নিজেকে দুর্বল ভাবলেও রবের দৃষ্টিতে আপনি এই লড়াইয়ে সক্ষম।

কাউন্সেলিং-৩: “এই অন্ধকার কি কখনও কাটবে না?”

মানুষ যখন বিপদে পড়ে, তখন মনে হয় এই বিপদ আর কাটবে না। কোরআন এই ধারণা ভেঙে দেয়। আর তাই কোরআনের জবাব: “এই কষ্ট চিরস্থায়ী নয়, কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে”

➥ “নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি। অবশ্যই কষ্টের সাথেই স্বস্তি আছে।” (সুরা ইনশিরাহ: ৫-৬)

পরামর্শ-বার্তা: আল্লাহ এখানে ব্যাকরণগতভাবে ‘কষ্ট’ (আল-উসর) শব্দটি নির্দিষ্ট করে একবার বুঝিয়েছেন, কিন্তু ‘স্বস্তি’ (ইউসর) শব্দটিকে ব্যাপক অর্থে দুবার ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ, একটি কষ্টের বিপরীতে দুটি সুখ বা স্বস্তি অপেক্ষা করছে। 

আল্লাহ শপথ করে দুবার বলেছেন যে কষ্টের সাথে সুখ আছে। অর্থাৎ, বর্তমান অন্ধকার সময়টি কেটে গিয়ে ভোর আসবেই। আত্মহত্যা বা মৃত্যু কামনা করা মানে সেই আসন্ন ভোরের দরজা নিজের জন্য চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া, সেই আসন্ন সুখ থেকে বঞ্চিত হওয়া।

➤ হতাশা ও দারিদ্র্যের ভয় শয়তানের অস্ত্র: 

ব্যর্থতা বা অভাবের কারণে যারা মরতে চান, তাদের জানা উচিত এই চিন্তার উৎস কোথায়।

কাউন্সেলিং-৪ 
“শয়তান তোমাদেরকে অভাব-অনটনের ভয় দেখায় এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়। আর আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন...” (সুরা আল-বাকারা: ২৬৮)

পরামর্শ-বার্তা: নেতিবাচক চিন্তা বা ‘আমার দ্বারা কিছু হবে না’—এই ভাবনাগুলো শয়তানের ধোঁকা। মুমিন শয়তানের ধোঁকায় পড়ে নিজের জীবন শেষ করতে পারে না।

➤ কাউন্সেলিং-5: “মানুষের জুলুম ও ষড়যন্ত্রে আমি শেষ হয়ে গেলাম”

➥ কোরআনের জবাব: “তারা ষড়যন্ত্র করে, আর আল্লাহও কৌশল করেন। আর আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী।” (সুরা আনফাল: ৩০)

➥ বার্তা: আপনার শত্রুরা আপনাকে শেষ করে দিতে চাইলেও, চাবিকাঠি আল্লাহর হাতে। আপনি যদি ধৈর্য ধরেন, আল্লাহ এমন কোনো উৎস থেকে আপনাকে সাহায্য করবেন যা আপনি কল্পনাও করেননি।

🔗 জুলুমের বিচার আল্লাহ অবশ্যই করবেন:

যারা অন্যের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মরতে চান, তাদের জন্য কোরআনের বার্তা হলো—জালিমকে ছাড় দেওয়া হয়, কিন্তু ছেড়ে দেওয়া হয় না।

তুমি কখনও মনে করো না যে, জালিমরা যা করছে সে বিষয়ে আল্লাহ বেখবর। তিনি তো তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছেন কেবল সেই দিন পর্যন্ত, যেদিন চক্ষুসমূহ ভয়ে অপলক হয়ে থাকবে।” (সুরা ইব্রাহিম: ৪২)


পরামর্শ: আপনি আত্মহত্যা করলে জালিম দুনিয়াতে পার পেয়ে গেল, আর আপনি আখিরাতে শাস্তির মুখে পড়লেন। বেঁচে থেকে আল্লাহর কাছে বিচার চাওয়া এবং লড়াই করাই হলো বিজয়।

➥ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া কুফরি আচরণের শামিল:

মানুষ সাধারণত তখনই মৃত্যু চায় যখন সে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যায়। কিন্তু কোরআন নিরাশ হতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে।

সুরা ইউসুফ, আয়াত ৮৭: “...তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত থেকে কাফের সম্প্রদায় ছাড়া অন্য কেউ নিরাশ হয় না।”

সুরা আয-যুমার, আয়াত ৫৩: “বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর অবিচার করেছ; তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না...”

বিশ্লেষণ: বিপদে পড়ে মৃত্যু কামনা করা প্রমাণ করে যে বান্দা আল্লাহর সাহায্যের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো সবর (ধৈর্য) ধারণ করা, মৃত্যু কামনা করা নয়।


   ▓▒░ তৃতীয় পর্ব ░▒▓ 👇

■ মানসিক প্রশান্তির জন্য কোরআনি ‘‘অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট প্রেসক্রিপশন’ (দোয়া ও আমল):

হতাশা কাটাতে ও ধৈর্য ধারণে কোরআনি দোয়া (চিকিৎসা):

মানসিক প্রশান্তি এবং আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার জন্য কোরআনে বর্ণিত নবী-রাসূলদের ও তাঁর মনোনীত বান্দাদের পরীক্ষিত কিছু দোয়া নিচে দেওয়া হলো। চরম মুহূর্তে এই দোয়াগুলো ‘অ্যান্টি-ডিপ্রেসেন্ট’ বা মহৌষধের মতো কাজ করে।

যখন পৃথিবী ছোট হয়ে আসে, তখন এই কোরআনি দোয়াগুলো অন্তরে গভীর প্রশান্তি আনে এবং গায়েবি সাহায্য নিয়ে আসে। হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য এগুলো মহৌষধ।

যারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, তাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ হলো দুটি হাতিয়ার ব্যবহার করা:

👉 বেশী বেশী আল-কোরআন স্টাডিতে-এর আয়াত চিন্তা-ভাবনায় আনার চেষ্টা করা (দ্র: আয়াত ৪৭:২৪, ৪:৮২): তাহলে অন্য দুর্শ্চিন্তায় শয়তান প্ররোচিত করতে পারবে না (১৬:৯৭, ৭:২০৪, ৩৮:২৯)

👉 চিত্ত বা ক্বলবের প্রশান্তি: যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে তাদের ক্বলবসমূহের প্রশান্তি লাভ করে। জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে-আয়াত ১৩:২৮

👉 “তোমরা ধৈর্য (সবর) ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।” (সুরা বাকারা: ২:৪৫, ২:১৫৩)

1. মুমিনের করণীয়: সবর ও সালাত:

কোরআন কষ্টের সময় মৃত্যু না চেয়ে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিয়েছে।

সুরা আল-বাকারা, আয়াত ১৫৫-১৫৬: “আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব... এবং ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যারা তাদের ওপর বিপদ আপতিত হলে বলে-

إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ

‘আমরা তো আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী’।

প্রশান্তিকর সংবাদ: ওরাই, যাদের ওপর রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে সলাতসমূহ (অহীর সংযোগ স্থাপন) ও রহমত। আর তারাই হিদায়েতপ্রাপ্ত-আয়াত ২:১৫৭

2. ডিপ্রেশন বা গভীর বিষণ্নতা কাটানোর দোয়া/ চরম হতাশা ও অন্ধকার থেকে মুক্তির দোয়া:

যখন মনে হয় চারদিকের দরজা বন্ধ, তখন এই দোয়াটি পড়ুন। মাছের পেটের গভীর অন্ধকার থেকে সালামুন আলা ইউনুস এই দোয়ার মাধ্যমে মুক্তি পেয়েছিলেন।

لَّآ اِلٰهَ اِلَّآ اَنْتَ سُبْحٰنَكَ اِنِّيْ كُنْتُ مِنَ الظّٰلِمِيْنَ

‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জোয়ালিমিন।’ 

অর্থ: “তুমি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই; তুমি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি নিজের প্রতি অবিচার করেছি।” (সুরা আম্বিয়া: ৮৭)

ফলাফল: আল্লাহ বলেন, “আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম  (তার ফোন রিসিভ করেই এ্যাকশনে গেলাম)  এবং তাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। আর এভাবেই আমি মুমিনদেরকে মুক্তি দিয়ে থাকি।” (সুরা আম্বিয়া: ৮৮) 

3. দুশ্চিন্তা, ভয় ও প্যানিক অ্যাটাক দূর করার দোয়া:
ভবিষ্যতের ভয়ে বা শত্রুর ভয়ে যখন বুক কাঁপে:যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব ভয় হয় বা সামাজিকভাবে কেউ ক্ষতি করতে চায়:

حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ

‘হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল।’ 

অর্থ: “আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক।” (সুরা আলে-ইমরান: 3:১৭৩)

4. মানসিক অস্থিরতা ও বুকের চাপ কমানোর দোয়া-সাহায্য কামনাটেনশনে যখন দম বন্ধ লাগে, কথা বলা যায় না-

رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي  وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي  وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي  يَفْقَهُوا قَوْلِي

‘রাব্বিশ রাহলি সদরি, ওয়া ইয়াসসির লি আমরি।’

অর্থ: “হে আমার রব! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন।” (সুরা ত্ব-হা: 20:২৫-২৬)

5. অসহায়ত্ব ও নিঃসঙ্গতায় পাঠ করার দোয়া:

أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ

আন্নী মাস্ সানিয়াদ্বদ্বুররু অআংতা আরহামুুর র-হিমীন্।  

অর্থ: [আইয়ুব যখন সে তার রবকে ডেকে বলেছিল-(রব্বি!)]  নিশ্চয়ই আমি আমাকে স্পর্শ করেছে দুঃখ-কষ্ট। আর আপনিই দয়ালুদের শ্রেষ্ঠ দয়ালু! -কুরআনুল কারীম-২১:৮৩ 

ফলাফল: তখন আমরা তার জন্য সাড়া দিলাম। এরপর আমরা তার সাথে দুঃখ—কষ্ট এর যা ছিল তা দূর করে দিলাম। এবং আমরা তাকে তার পরিবারকে ফিরিয়ে দিলাম আর তাদের সাথে তাদের অনুরূপ। আমাদের কাছ থেকে অনুগ্রহ স্বরূপ ও ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশ হিসাবে-২১:৮৪।

6. পরাজিত বা জুলুমের শিকার ব্যক্তির দোয়া: 

যখন মনে হয় আপনি হেরে গেছেন, আর লড়তে পারছেন না (সালামুন আলা নূহ -এর দোয়া):

أَنِّي مَغْلُوبٌ فَانتَصِرْ

‘রাব্বি ইন্নি মাগলুবুন ফানতাসির।’   

অর্থ: “হে আমার রব! আমি তো পরাজিত (অসহায়), অতএব তুমি সাহায্য করো।” (সুরা কামার: ১০)

7. অসহায় অবস্থায় এবং জীবিকার সংকটে দোয়া:

সালামুন আলা মুসা যখন আপনজনহীন, গৃহহীন ও ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাস্তায় ছিলেন, তখন তিনি এই দোয়া করেছিলেন:

رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ

রাব্বি ইন্নি লিমা আনজালতা ইলাইয়া মিন খাইরিন ফাকির।’

অর্থ: হে আমার রব! তুমি আমার প্রতি যে অনুগ্রহই নাযিল করবে, আমি তার মুখাপেক্ষী। (সুরা কাসাস:28:২৪)

8. ক্ষমা প্রার্থনা করলে শাস্তি আরোপ করা হয় না: (দ্র: আয়াত ৮:৩৩):

رَّبِّ اغْفِرْ وَارحَمْ وَأَنتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ
রব্বিগ্ফির ওয়ারহাম অআংতা খইরুর র-হিমীন্। 

অর্থ: হে আমার রব! ক্ষমা করুন এবং দয়া করুন, আপনিইতো দয়ালুদের শ্রেষ্ঠ- আল কুরআন ২৩:১১৮

9. বিপদে ধৈর্যধারণ ও ঈমানী মৃত্যুর জন্য দোয়া:

ফেরাউনের জাদুকররা যখন সালামুন আলা মুসা-এর প্রতি ঈমান আনল এবং ফেরাউন তাদের হাত-পা কেটে হত্যার হুমকি দিল, তখন তারা জীবন ভিক্ষা চায়নি। বরং তারা সেই কঠিন নির্যাতিনে যেন ‘ধৈর্য’ হারা না হয় এবং ‘ঈমান’ না হারায়—সেজন্য এই দোয়াটি করেছিল। যারা জুলুমের শিকার বা কঠিন মানসিক চাপে আছেন, তাদের জন্য এটি শ্রেষ্ঠ দোয়া।
إِنَّا إِلَى رَبِّنَا مُنقَلِبُونَ
آمَنَّا بِآيَاتِ رَبِّنَا لَمَّا جَاءَتْنَا ۚ رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ
ইন্না- ইলা-রব্বিনা- মুন্ক্বালিবূন্। আ-মান্না- বিআ-ইয়া-তি রব্বিনা-লাম্মা-জ্বা - য়াতœা-; রব্বানা-আফ্রিগ্ ‘আলাইনা- ছব্রাওঁ অতাওয়াফ্ফানা-মু¯িøমীন্।  

অর্থ: নিশ্চয়ই আমারা আমাদের ররের দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। আমরা আমাদের রবের আয়াতগুলোর প্রতি ঈমান এনেছি। হে আমাদের রব! আপনি আমাদের ওপর ধৈর্য ঢেলে দিন এবং আমাদেরকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দান করুন- আল কুরআন ৭:১২৫-৭:১২৬ ( ২৬:৫০-৫১)

10. সমর্পনকারী (মুসলিমদের মধ্যে অর্ন্তভ্ক্তু) সাথে মৃত্যুবরণ করার নববী দোয়া (জীবনের পরিসমাপ্তিটা যেন ‘সুন্দর’ হয়):

এটি সালামুন আলা ইউসুফ-এর দোয়া। তিনি জীবনের চরম কষ্টের সময় নয়, বরং যখন তিনি মিশরের ক্ষমতায় এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে মিলিত হলেন, অর্থাৎ জীবনের সুখের মুহূর্তে আল্লাহর কাছে এই দোয়া করেছিলেন। এটি প্রমাণ করে, এই দোয়াটি হতাশা থেকে নয়, বরং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা থেকে উৎসারিত।

فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنتَ وَلِيِّي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ
‘ফা-ত্বিরাস সামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদ্বি আনতা ওয়ালিয়্যী ফিদ্দুনইয়া- ওয়াল আ-খিরাহ; তাওয়াফ্ফানি মুসলিমাওঁ ওয়া আলহিক্বনি বিচ্ছোয়া-লিহীন।’

অর্থ: হে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর স্রষ্টা! আপনিই দুনিয়া ও আখেরাতে আমার অভিভাবক। আপনি আমাকে ‘মুসলিম’ (আপনার অনুগত) হিসেবে মৃত্যু দিন এবং আমাকে সংশোধনকারী (সৎকর্মশীলদের) সাথে মিলিত করুন। (সুরা ইউসুফ, আয়াত: 12:১০১)

11. সকল শয়তান থেকে বাঁচার দোয়া:

(সুরা আল-মুমিনুন: আয়াত ৯৭-৯৮)

رَّبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ ۞ وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحْضُرُونِ

‘রব্বি আ‘ঊযু বিকা মিন হামাযা-তিশ শায়াত্বী-ন। ওয়া আ‘ঊযু বিকা রব্বি আঁই ইয়াহদুরূন।’

হে আমার রব! আমি শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আর হে আমার রব! আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি—যাতে তারা (শয়তানরা) আমার কাছে উপস্থিত না হতে পারে-আয়াত ৯৭-৯৮


12. সুরা আল-ফালাক (বাইরের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য):

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ مِن شَرِّ مَا خَلَقَ وَمِن شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ وَمِن شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। 

১. আ‘উযু বিরাব্বিল ফালাক্ব। ২. মিন শাররি মা খালাক্ব। ৩. ওয়া মিন শাররি গাসিক্বিন ইযা ওয়াক্বাব। ৪. ওয়া মিন শাররিন নাফ্ফা-ছা-তি ফিল ‘উক্বাদ।
৫. ওয়া মিন শাররি হা-সিদিন ইযা হাসাদ।

বলুন! আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি বিদীর্নকারী/ উষার (ভোরের) রবের;  ২. তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট হতে, ৩. এবং অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট হতে, যখন তা আচ্ছন্ন হয়ে যায়, ৪. এবং গিরায় (বন্ধনের ক্ষেত্রে) ফুঁৎকারদানকারী (জাদুকর) অনিষ্ট হতে, ৫. এবং হিংসুকের অনিষ্ট হতে, যখন সে হিংসা করে।


13. সুরা আন-নাস (মনের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য):

أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ◌ مَلِكِ النَّاسِ◌ إِلَـٰهِ النَّاسِ◌مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ◌ الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ◌  مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ

আ‘ঊযু বিরব্বিন্না-স্।  মালিকিন্না-স্। ইলা-হি ন্না-স্। মিন্ শাররিল ওয়াস্ ওয়া-সিল্ খান্না-সি। আল্লাযী ইউওয়াস্ওয়িসু ফী ছুদূরিন্না-স্। মিনাল্ জ্বিন্নাতি অন্না-স্।   

অর্থ: বলুন! আমি আশ্রয় চাচ্ছি মানুষের ররের কাছে। মানুষের মালিক। মানুষের ইলাহ। প্ররোচনাদানকারী খন্নাসের অনিষ্ট থেকে।  যে মানুষের অন্তরসমূহের মধ্যে প্ররোচনা দেয়। জ¦ীন (উম্মাদনা-২৩:৭০) ও মানুষের মধ্য থেকে- আল কুরআন ১১৪:১-৬

উপসংহার ও পরামর্শ:

যারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, তাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ হলো দুটি হাতিয়ার ব্যবহার করা:

“তোমরা ধৈর্য (সবর) ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।” (সুরা বাকারা: ২:৪৫, ২:১৫৩)

তাই, জীবনের খাতা ছিঁড়ে না ফেলে  সিজদায় পড়ে যাই। রব্বুল আলামিনের কাছে ধর্না দেই, কাঁদুন যেভাবে সমুদ্রের মধ্যে বিপদে পড়লে মানুষ তার রবকেই হানিফ করে তাঁকে ডাকে (দ্র: আয়াত ৬:৬৩, ৭:২৯, ৭:৫৫-৫৬, ৭:২০৫, ৩২:১৬)। যিনি জীবন দিয়েছেন, জীবনকে সুন্দর করার দায়িত্বও তিনি নেবেন—বিইযনিল্লাহ!


Post a Comment (0)
Previous Post Next Post