◈ কেবলমাত্র আল-কোরআন মানলে রাসূলকে অনুসরণ করব কিভাবে?
(আল-কুরআনের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য ও ‘তাদাব্বুর ফিল কুরআন’ পদ্ধতির আলোকে একটি বিশ্লেষণ)
◈ রাসূল (সা.)-এর অনুসরণ মানেই তাঁর প্রতি নাযিলকৃত কুরআনের ওপর অটল থাকা:
➢ আল-কুরআন অনুসরণই রাসূল (সা.)-এর ওপর 'ফরজ' বা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে:
⦿ একমাত্র অবতীর্ণ ওহীর অনুসরণ ও অন্য সব বর্জন:
রসুলের আনুগত্যের অর্থ হলো আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা মেনে চলা। আর বলো! হক এসেছে (আল-কোরআন) এবং বাতিল বিলীন হয়েছে। নিশ্চয় বাতিল হলো বিলীন-১৭:৮১ (৪৭:২-৩)
আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন— "তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে (আল-কুরআন) তোমরা তার অনুসরণ করো এবং তাকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো অভিভাবকের অনুসরণ করো না।" (সূরা আল-আরাফ ৭:৩)।
রসুল নিজেও এই ওহীর বাইরের কিছু অনুসরণ করতেন না, বরং তিনি বলতেন— "আমার প্রতি যা ওহী করা হয়, আমি কেবল তারই অনুসরণ করি।" (সূরা আল-আহক্বাফ ৪৬:৯)।
আর নিশ্চয় এটাই আমার সুদৃঢ় পথ। সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ করো এবং বিভিন্ন পথের অনুসরণ কোরো না। তাহলে সেটা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। সেসবই, যার প্রতি তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন, যেন তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করো-6:153
⦿ রাসূল (সা.)-এর দাওয়াত ও সতর্ক করার একমাত্র উৎস ছিল এই কুরআন:
রাসূল (সা.) মানুষকে কী দিয়ে সতর্ক করতেন তা আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন— "বলুন! সাক্ষ্য হিসেবে সবচেয়ে বড় কে? বলুন, আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী; আর আমার কাছে এই কুরআন ওহী করা হয়েছে যাতে এর মাধ্যমে আমি তোমাদেরকে এবং যার কাছে এটি পৌঁছাবে তাদের সকলকে সতর্ক করি।" (৬:১৯)।
সুতরাং অন্য কোনো কিতাব নয়, বরং ওহী করা এই কুরআনের সতর্কবার্তা গ্রহণ করাই রাসূলের প্রতি যথাযথ শিষ্টাচার।
➢ কুরআনের পর্যাপ্ততা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা স্বীকার করা:
(আল-কোরআন ব্যাখ্যার জন্য অন্যকোন দ্বীনি গ্রন্থের কাছে যাওয়ার দরকার নাই: আল কোরআন নিজেকেই একটি বিস্তারিত, সুস্পষ্ট, বর্ণনা বা ব্যাখ্যা, এবং বিশদ বর্ণনাকারী গ্রন্থ হিসেবে ঘোষণা করেছে-১৬:৮৯, ১৭:৪১, ১৮:৫৪, ২:১৮৫, ১২:১১১, ৬:১১৪-১১৫, "তাফসীলাল কতিাব" (تَفْصِيلَ الْكِتَابِ) বা "কতিাবরে বস্তিারতি ব্যাখ্যা"-১০:৩৭, ৭:৫২. ৩:৭ (৬:১২৬) (আয়াতগুলিও বিস্তারিত ব্যাখ্যাকৃত ৬:৫৫), ১২:১১১)
⦿ কিয়ামতের দিন কেবল এই কুরআন সম্পর্কেই জবাবদিহি করতে হবে:
◈ মামলা: কুরআনকে 'পরিত্যক্ত' (হাজর) করার ভয়াবহ পরিণাম হিসাবে মামলা:
◈ পঠনকালীন মানসিক আদব ও শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা:
◈ কুরআন তিলাওয়াতের সময় মনোযোগ ও নীরবতা পালন (অন্যসব Mute করা):
কুরআনের প্রতি অন্যতম প্রধান আদব হলো এটি যখন পাঠ করা হয়, তখন একাগ্রতার সাথে শোনা। আল্লাহ বলেন— "আর যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শোন এবং নীরবতা পালন করো, যাতে তোমাদের প্রতি রহমত বর্ষিত হয়।" (সূরা আল-আরাফ ৭:২০৪)। অর্থাৎ, কুরআনের আলোচনার সময় অন্য কোনো কথায় মত্ত থাকা বা একে গুরুত্বহীন মনে করা শিষ্টাচার পরিপন্থী।
➢ কুরআনকে সহজ ও স্মরণযোগ্য হিসেবে গ্রহণ করা:
অনেকে মনে করেন কুরআন বোঝা কঠিন, তাই তারা এটি সরাসরি পড়ে না। কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে আদব হলো একে সহজ মনে করে গ্রহণ করা। আল্লাহ বারবার বলেছেন— "আমি কুরআনকে বোঝার (বা উপদেশ গ্রহণের) জন্য সহজ করে দিয়েছি, অতএব কোনো উপদেশ গ্রহণকারী আছে কি?" (সূরা আল-কামার ৫৪:১৭, ২২, ৩২, ৪০)। এই আয়াতটি একই সূরায় ৪ বার এসেছে, যা প্রমাণ করে যে কুরআনের সহজবোধ্যতাকে অস্বীকার করা এর প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা।
⦿ কুরআনের পূর্ণাঙ্গতা ও অসংলগ্নতাহীনতা স্বীকার করা:
কুরআনের প্রতি আদব হলো বিশ্বাস রাখা যে এতে কোনো অসংলগ্নতা নেই। আল্লাহ বলেন— "তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা করে না? এটি যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এতে অনেক বৈপরীত্য (ইখতিলাফ) পেত।" (সূরা আন-নিসা ৪:৮২)। সুতরাং একে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে না করা বা এর ব্যাখ্যায় বৈপরীত্যপূর্ণ অন্য উৎসের ওপর নির্ভর করা এর মর্যাদাহানি করার শামিল।
◈ জীবনের প্রতিটি সমস্যার সমাধান কুরআনে খুঁজে দেখা (দ্বীনের নামে/হাদিসের নামে অন্যকোন কিতাবে নয়):
কুরআনকে সবকিছুর স্পষ্ট ব্যাখ্যা হিসেবে না মানা এর প্রতি বেয়াদবি। আল্লাহ বলেন— "আমি আপনার প্রতি এই কিতাব নাযিল করেছি প্রত্যেকটি বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা (তিবইয়ানান লিকুল্লি শাই), হেদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদ হিসেবে।" (সূরা আন-নাহল ১৬:৮৯)। আরও বলা হয়েছে— "আমি এই কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দেইনি।" (সূরা আল-আনআম ৬:৩৮)। সুতরাং কোনো ধর্মীয় বা জীবনমুখী সমস্যার জন্য কুরআনকে বাদ দিয়ে অন্য কিতাবে সমাধান খোঁজা এর চরম অবমাননা।
➢ একমাত্র আল্লাহর বিধান বা ফয়সালা মেনে নেওয়া:
কুরআনের আদব হলো একে চূড়ান্ত আইনি মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা। আল্লাহ সতর্ক করেছেন— "আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, যারা সেই অনুযায়ী ফয়সালা (বিধান প্রদান) করে না, তারাই কাফির।" (সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৪৪)। একইভাবে পরের আয়াতগুলোতে (৫:৪৫, ৫:৪৭) তাদেরকে 'যালিম' ও 'ফাসিক' বলা হয়েছে। সুতরাং কুরআনের বিধানকে পাশ কাটিয়ে চলা এর প্রতি প্রকাশ্য বিদ্রোহ।
⦿ কুরআনকে সত্য-মিথ্যার একমাত্র পার্থক্যকারী (আল-ফুরকান) মানা:
কুরআনের মর্যাদা হলো এটি 'ফুরকান' বা মানদণ্ড। আল্লাহ বলেন— "বরকতময় সেই সত্তা, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি 'ফুরকান' (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী কিতাব) নাযিল করেছেন, যাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারে।" (২৫:১)। এই কিতাবের সমান্তরালে অন্য কোনো কিতাবকে 'ফুরকান' বা 'মীযান' মনে না করাই হলো এর যথাযথ হক আদায় করা।
⦿ হেদায়াতের একমাত্র সুদৃঢ় পথ-আল-কোরআন অনুসরন:
কুরআনকে অনুসরণের মাধ্যমেই রসুলের দেখানো পথে চলা সম্ভব। আল্লাহ বলেন— "নিশ্চয় এই কুরআন এমন পথ প্রদর্শন করে যা সবচেয়ে সুদৃঢ়।" (সূরা আল-ইসরা ১৭:৯)। এই হেদায়াত যারা মেনে চলে (২:৩৮), তারাই মূলত রসুলের প্রকৃত আনুগত্য করে।
➢ একমাত্র অবতীর্ণ ওহীর অনুসরণ (ইত্তিবা):
◈ একমাত্র 'সর্বোত্তম হাদিস' হিসেবে কুরআনকে গ্রহণ করা- আল-কুরআনকেই মেনে নেওয়া:
➢ কুরআনকে একমাত্র বিচারক বা ফয়সালাকারী হিসেবে গ্রহণ:
⦿ গভীরভাবে অনুধাবন ও তাদাব্বুর করা:
◈ কুরআনের আয়াতকে খণ্ডিত না করা বা অপছন্দ না করা:
⦿ কুরআনের আয়াতসমূহের প্রতি অন্ধ ও বধির না হওয়া:
◈ সর্বোত্তম বিধানের অনুসরণ করা:
◈ আয়াত গোপন না করা এবং এর বিনিময়ে পার্থিব স্বার্থ না কেনা:
কুরআনের প্রতি একটি বড় শিষ্টাচার হলো এর আয়াতকে অবিকৃত রাখা। আল্লাহ বলেন— "নিশ্চয় যারা আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব গোপন করে এবং তার বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করে, তারা নিজেদের পেটে আগুন ছাড়া আর কিছুই ঢুকায় না।" (সূরা আল-বাকারাহ ২:১৭৪)। অর্থাৎ, নিজের দল বা মতের পক্ষে কুরআনকে ব্যবহার করা বা এর সঠিক অর্থ গোপন করা চরম অপরাধ।
➢ কুরআনকে আরোগ্য ও রহমত হিসেবে গ্রহণ করা:
মানসিক ও আত্মিক প্রশান্তির জন্য অন্য কোনো দর্শনের দ্বারস্থ না হয়ে কুরআনকে আঁকড়ে ধরা এর অন্যতম আদব। আল্লাহ বলেন— "আমি কুরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য (শিফা) ও রহমত।" (সূরা আল-ইসরা ১৭:৮২)।
⦿ আল্লাহর পথে দাওয়াতের একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে কুরআনকে ব্যবহার:
অন্য কোনো মানুষের কথা বা কিতাব দিয়ে নয়, বরং কুরআন দিয়েই মানুষকে উপদেশ দেওয়া এর অন্যতম আদব। আল্লাহ বলেন— "অতএব আপনি কুরআনের মাধ্যমে তাকে উপদেশ দিন, যে আমার শাস্তিকে ভয় করে।" (সূরা ক্বাফ ৫০:৪৫)। আরও বলা হয়েছে— "সুতরাং আপনি কাফিরদের আনুগত্য করবেন না এবং এই কুরআনের সাহায্যে তাদের বিরুদ্ধে বড় জিহাদ (জিহাদান কাবিরা) চালিয়ে যান।" (সূরা আল-ফুরকান ২৫:৫২)।
আয়াত প্রত্যাখ্যান বা অগ্রাহ্য না করা:
কুরআনের আয়াত দেখেও যারা উদাসীন থাকে, তারা যালিম। যারা আয়াতের অর্থ অপছন্দ করে বা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা রবের দরবারে মামলা খাবে। যথাযথ আদব হলো আয়াতের সামনে নিজেকে সমর্পণ করা এবং একে জীবনের 'লেটেস্ট ভার্সন' বা চূড়ান্ত বিধান হিসেবে অনুসরণ করা।
➢ নাযিলকৃত বিধানকে অপছন্দ করার পরিণাম:
অনেকে প্রচলিত প্রথা বা মানুষের রচিত কিতাবের সাথে না মিললে কুরআনের আয়াতকে অপছন্দ বা অগ্রাহ্য করে। এই মানসিকতাকে আল্লাহ আমল বাতিলের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন— "এটি এ কারণে যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তারা তা অপছন্দ করেছে; সুতরাং আল্লাহ তাদের সকল আমল নিষ্ফল করে দিয়েছেন।" (সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:৯)। যথাযথ আদব হলো—নিজের খেয়ালখুশি বা অন্য কোনো মতবাদের ওপর কুরআনের আয়াতকে প্রাধান্য দেওয়া।
⦿ কুরআনকে জীবনের 'লেটেস্ট ভার্সন' বা চূড়ান্ত তদারককারী (মুহাইমিন) মানা:
কুরআন পূর্ববর্তী সকল কিতাবের সত্যতা যেমন নিশ্চিত করে, তেমনি এটি সকল বিষয়ের ওপর তদারককারী বা ‘গার্ডিয়ান’। আল্লাহ বলেন— "আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি, যা তার আগের কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর ওপর তদারককারী (মুহাইমিন)। সুতরাং আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী তাদের মধ্যে ফয়সালা করুন...।" (সূরা আল-মায়িদাহ ৫:৪৮)। সুতরাং কুরআন বাদ দিয়ে অন্য কোনো ব্যাখ্যা বা বর্ণনাকে অনুসরণের মাপকাঠি বানানো এই 'মুহাইমিন' কিতাবের মর্যাদাহানি করার শামিল।
সারসংক্ষেপ ও উপসংহার:
কুরআন মাজিদের সাথে যথাযথ আদব বা শিষ্টাচার পালনের সারকথা হলো:
➢ একে আল্লাহর নাযিলকৃত 'সর্বোত্তম হাদিস' (৩৯:২৩) হিসেবে মেনে নেওয়া।
➢ একে জীবনের সকল ক্ষেত্রের 'একমাত্র বিচারক' (৬:১১৪) হিসেবে সাব্যস্ত করা।
➢ এটি যে 'সবকিছুর বিস্তারিত ব্যাখ্যা' (১৬:৮৯) তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা।
➢ এর আয়াত নিয়ে 'গভীর চিন্তা ও গবেষণা' (৪৭:২৪) করা।
➢ একে 'পরিত্যক্ত' (২৫:৩০) না করে জীবনের একমাত্র 'পথপ্রদর্শক' (১৭:৯) হিসেবে অনুসরণ করা।
এই বিষয়গুলো নিশ্চিত করাই হলো কুরআনের মর্যাদা রক্ষা করা। কেবল ঠোঁট দিয়ে চুমু খাওয়া বা উঁচু তাকে তুলে রাখা নয়, বরং অন্তর ও কর্ম দিয়ে একে জীবনের সর্বস্তরে উচ্চাসীন রাখাই হলো প্রকৃত কুরআনকেন্দ্রিক আদব।
কুরআনের আয়াতসমূহ দেখেও উদাসীন থাকা, সত্য জানার পর তা প্রত্যাখ্যান করা কিংবা অহংকারবশত মুখ ফিরিয়ে নেয়া কেবল নৈতিক অপরাধ নয়, বরং এটি রবের নাযিলকৃত হেদায়াতের সাথে চূড়ান্ত পর্যায়ের বেয়াদবি। আল-কুরআনের সাথে যথাযথ আদব পালনের অর্থই হলো—এর প্রতিটি আয়াতের সামনে মস্তক অবনত করা, একে জীবনের একমাত্র অকাট্য দলিল ও ‘লেটেস্ট ভার্সন’ হিসেবে গ্রহণ করা এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে রসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণে একমাত্র ওহীর ফয়সালাকে মেনে নেওয়া।
দুআ: আয়াত ৩:৮
হে আমাদের রব! আপনি আমাদের হিদায়াত দান করার পর আমাদের অন্তরকে বক্র করে দেবেন না। আর আপনার নিকট থেকে আমাদেরকে দয়া দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহান দাতা।
