জনৈক বোনের জানতে চাওয়া:
আসসালামু আলাইকুম,আমি তালাকের মাসায়ালা সম্পর্কে জানতে চাই-
আমার হাসবেন্ড ঝগড়ার সময় রাগান্বিত হয়ে আমাকে ফোন কলে এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক উচ্চারণ করে & বলে সম্পর্ক শেষ,কিন্তু তোমাকে তালাক দিলাম এই কথা বলেনি, তাহলে কি তিন তালাকই পতিত হবে? আমারা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বিয়ে করাতে তার বাবা মা সব সময় চাইত সে যেনো আমাকে ছেড়ে দেয়,সুতরাং সে এক প্রকার যুলুমের স্বীকার হয়। বাট আমরা এক জন আর একজনকে অনেক ভালোবাসি,এক সাথে থাকতে চাই।
আমরা এখনো এক সাথেই আছি, আমাদের এক সাথে থাকা টা ঠিক হচ্ছে কি না দয়া করে জানাবেন
অনুধাবনের আয়োজনে জেনে নেই:
সালামুন আলাইকুম! আল কুরআনের বিধান অনুযায়ী আপনার জিজ্ঞাসিত বিষয়ের সমাধান নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা ধরার চেষ্টা করছি। এই বিশ্লেষণটি কেবলমাত্র আল কুরআনের আয়াতসমূহ, কুরআনের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যতা (internal coherence) এবং ‘তাদাব্বুর’ (গভীর অভিনিবেশ)-এর ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।
🔗আল্লাহই চূড়ান্ত মুফতি: ‘আল্লাহু ইউফতিকুম’ (আল্লাহ তোমাদের ফতোয়া দেন):
আল কুরআনে সরাসরি আল্লাহ নিজেকে ফতোয়া প্রদানকারী হিসেবে ঘোষণা করেছেন। যখনই মানুষ কোনো জটিলতায় পড়েছে, আল্লাহ সেই ফতোয়া বা সমাধান নিজের পক্ষ থেকে পাঠিয়েছেন।
📜 দলিল (সূরা আন-নিসা ৪:১২৭ ও ৪:১৭৬):
“...قُلِ اللَّهُ يُفْتِيكُمْ فِيهِنَّ...” (৪:১২৭) - “বলুন! আল্লাহ নিজেই তোমাদের তাদের (নারীদের) বিষয়ে ফতোয়া দিচ্ছেন।”
“...قُلِ اللَّهُ يُفْتِيكُمْ فِي الْكَلَالَةِ...” (৪:১৭৬) - “বলুন! আল্লাহ তোমাদের ‘কালালাহ’ সম্পর্কে ফতোয়া দিচ্ছেন।”
আয়াতের সংযোগ (Link): এই দুটি আয়াত প্রমাণ করে যে, পারিবারিক ও উত্তরাধিকার আইনের মতো জটিল বিষয়ে মানুষ যখন রাসূল ‘সালামুন আলা’ মুহাম্মাদ-এর কাছে সমাধান চেয়েছে, তখন আল্লাহ ‘ইউফতিকুম’ (তিনি ফতোয়া দেন) শব্দ ব্যবহার করে নিজের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন।
অতএব কারও ফতোয়া নয়, সরাসরি আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুলের অনুসরনে আমাদের একমাত্র রবের নাযিলকৃত বিধানে যা আছে জেনে নেই-
বিষয়: আল কুরআনের আলোকে তালাক এবং এক বৈঠকে তিন তালাকের অসারতা:
১. দাম্পত্য সম্পর্কের মূল ভিত্তি ও উদ্দেশ্য:
"আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের নিকট প্রশান্তি লাভ কর এবং তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা আর-রুম ৩০:২১)
যেহেতু আপনারা একে অপরকে ভালোবাসেন এবং একসাথে থাকতে চান, তাই সামান্য রাগের মাথায় বলা কিছু শব্দ দিয়ে এই 'রহমত' ও 'মাওয়াদ্দাত' (ভালোবাসা) শেষ হয়ে যেতে পারে না।
২. আল কুরআনের ‘তালাক’ পদ্ধতি: একটি ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া:
"তালাক হচ্ছে দুই বার; অতঃপর হয় বিধিসম্মতভাবে রাখা, না হয় সদাচরণের সাথে বিদায় দেওয়া।" (সূরা আল-বাকারাহ ২:২২৯)
৩. ইদ্দত বা অপেক্ষা করার আবশ্যকতা:
"হে নবী! যখন তোমরা স্ত্রীদের তালাক দিতে চাও, তখন তাদের তালাক দাও তাদের ইদ্দতের প্রতি লক্ষ্য রেখে এবং ইদ্দত গণনা করো... তোমরা তাদের গৃহ থেকে বের করে দিও না এবং তারাও বের হবে না, যদি না তারা লিপ্ত হয় স্পষ্ট অশ্লীলতায়।" (সূরা আত-তালাক ৬৫:১)
৪. স্বাক্ষীর প্রয়োজনীয়তা (একটি মজবুত দলিল):
"অতঃপর তারা যখন তাদের ইদ্দতকালে পৌঁছাবে, তখন হয় তোমরা তাদের বিধিমত রেখে দাও, না হয় তাদের বিধিমত ত্যাগ করো এবং তোমাদের মধ্য থেকে দুইজন ন্যায়পরায়ণ লোককে স্বাক্ষী রাখো..." (সূরা আত-তালাক ৬৫:২)
৫. রাগের মাথায় বা অনিচ্ছাকৃত কথার হুকুম:
"তোমাদের অর্থহীন শপথের (Laghw) জন্য আল্লাহ তোমাদের ধরবেন না, কিন্তু তোমাদের অন্তরের সংকল্পের জন্য তিনি তোমাদের ধরবেন।" (সূরা আল-বাকারাহ ২:২২৫)
৬. পারিবারিক চাপ ও যুলুমের প্রেক্ষাপট:
৭. সমাধানের পথ: আপোষ-নিষ্পত্তি:
"যদি তাদের উভয়ের মধ্যে বিরোধের আশঙ্কা করো, তবে স্বামীর পরিবার থেকে একজন সালিশ ও স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত করো; যদি তারা উভয়ে নিষ্পত্তি চায়, তবে আল্লাহ তাদের মধ্যে মিল করে দেবেন।" (সূরা আন-নিসা ৪:৩৫)
সারসংক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত:
তাওবা-ইস্তেগফার:
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
উচ্চারণ: রাব্বানা জালামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফির লানা ওয়া তারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খাসিরিন।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব। আল-কুরআন: আল-আরাফ, আয়াত ৭:২৩
إِنَّهُ هُوَ ٱلتَّوَّابُ ٱلرَّحِيمُ
উচ্চারণ: ইন্নাহূ হুঅত তাওঅ-বুর রাহীম্।
অর্থ: নিশ্চয়ই তিনি, তিনিই তওবা কবুলকারী, দয়ালু-আল-কুরআন: বাকারা, আয়াত ২:৩৭।
