বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম।
আয়াতে বিশ্বাসী মুসলিমের পারস্পরিক অভিবাদন: রবের রহমতের ঘোষণা:
সালামুন আলাইকুম!
দলিল: আর যখন তোমার কাছে তারা আসে যারা আমার আয়াতসমূহের উপর ঈমান আনে, তখন তুমি বলো, ‘সালামুন আলাইকুম’ তোমাদের রব নিজের ওপর রহমত লিখে নিয়েছেন... (সূরা ৬:৫৪)।
ভদ্রতা বজায় রাখার জন্য নাযিলকৃত আয়াতের ব্যাপারে অজ্ঞ/নির্বোধদের কথার জবাবে করণীয়:
অজ্ঞদের অনর্থক কথার জবাবে বিতর্কে না জড়িয়ে, তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ‘সালাম’ বা ‘সালামুন আলাইকুম’ বলাই হলো কোরআনের নির্দেশিত পন্থা।
(আয়াত-২৮:৫৫, ২৫:৬৩)
হে আমার রব! নিশ্চয় এরা এমন জনগোষ্ঠী, যারা ঈমান আনবে না। অতএব, তুমি তাদের ক্ষেত্রে এড়িয়ে চলো এবং বলো, সালাম! -আয়াত ৪৩:৮৮-৮৯
আল্লাহর নাযিলকৃত আয়াতের প্রতি বিশ্বাসী মুমিনদের অভিবাদন এবং অজ্ঞদের অনর্থক আচরণের বিপরীতে কোরআনের নির্দেশিত পন্থা অত্যন্ত সুসংহত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আয়াতে বিশ্বাসী মুসলিমের পারস্পরিক অভিবাদন: রবের রহমতের ঘোষণা:
সুরা আল-আন‘আমের ৫৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের সাথে আচরণের মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
➤ আর যখন তোমার কাছে তারা আসে যারা আমার আয়াতসমূহের উপর ঈমান আনে, তখন তুমি বলো, ‘সালামুন আলাইকুম’। তোমাদের রব নিজের ওপর রহমত লিখে নিয়েছেন..." (সূরা ৬:৫৪)।
সংশ্লিষ্ট দলিল: এই অভিবাদন কেবল দুনিয়াবি সৌজন্য নয়, বরং এটি জান্নাতি সংস্কৃতির প্রতিফলন। জান্নাতিদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন— তাদের অভিবাদন হবে: ‘সালামুন আলাইকুম ও সালাম!’ অর্থাৎ, আয়াতের প্রতি বিশ্বাসীরা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় স্থানেই ‘সালাম’ বা শান্তির বার্তার ধারক হিসাবে তাঁদের নিজেদের মধ্যে এটার প্রাকটিসে থাকবে।
যেমন-
মৃত্যুর সময় ফেরেশতাদের সম্ভাষণ: সালামুন আলাইকুম! (আয়াত-১৬:৩২):
জান্নাতে প্রবেশের সময় অভ্যর্থনা: সালামুন আলাইকুম! (আয়াত-৩৯:৭৩)
আ'রাফের অধিবাসীদের সম্ভাষণ: সালামুন আলাইকুম! (আয়াত-৭:৪৬)
জান্নাতিদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন— তাদের অভিবাদন হবে: সালাম!’ (সূরা ১০:১০)
২. অজ্ঞ ও অবজ্ঞাকারীদের বিপরীতে ‘সালাম’ ও বিমুখতা:
যখন আল্লাহর আয়াত নিয়ে উপহাস করা হয় বা অজ্ঞতাপূর্ণ কথা বলা হয়, তখন মুমিনের প্রধান কাজ হলো নিজেকে সেই পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত রাখা।
➤ আয়াত: "আর রহমান-এর বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং যখন অজ্ঞরা (জাহিলরা) তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, ‘সালাম’।" (সূরা ২৫:৬৩)।
এখানে ‘সালাম’ মানে বিবাদ মিটিয়ে সম্মানজনক প্রস্থান। এর সমর্থন পাওয়া যায় সূরা আল-কাসাস-এ— "এবং তারা যখন অনর্থক কথা শোনে, তখন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, ‘আমাদের কর্ম আমাদের জন্য এবং তোমাদের কর্ম তোমাদের জন্য; তোমাদের প্রতি সালাম (শান্তি)! আমরা অজ্ঞদের (বন্ধুত্ব) চাই না’।" (সূরা ২৮:৫৫)।
৩. বিদ্রূপকারীদের আসর ত্যাগ করার আইনি বাধ্যবাধকতা:
আল্লাহর বাণীর অবজ্ঞা করা হচ্ছে এমন পরিবেশে অবস্থান করা ঈমানি চেতনার পরিপন্থী।
➤ "আর কিতাবে তিনি তোমাদের প্রতি নাযিল করেছেন যে, যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করা হচ্ছে এবং সেগুলো নিয়ে বিদ্রূপ করা হচ্ছে, তবে তোমরা তাদের সাথে বসো না—যতক্ষণ না তারা অন্য কথায় লিপ্ত হয়; নতুবা তোমরাও তাদের মতো হয়ে যাবে..." (সূরা ৪:১৪০)।
➤ সমজাতীয় আয়াত: "আর যখন আপনি তাদেরকে দেখেন যারা আমার আয়াতসমূহ নিয়ে উপহাসে মগ্ন হয়, তখন আপনি তাদের থেকে সরে থাকুন, যতক্ষণ না তারা অন্য প্রসঙ্গে লিপ্ত হয়..." (সূরা ৬:৬৮)।
৪. নবীদের জীবনে অজ্ঞতার বিপরীতে ‘সালাম’
অজ্ঞদের আচরণের বিপরীতে সালাম বলা এবং বিমুখ থাকা সকল রাসুলের অভিন্ন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।➤ সালামুন আলা ইব্রাহিম: যখন তাঁর পিতা তাঁকে পাথর ছুড়ে মারার হুমকি দিয়েছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন— "সালামুন আলাইকা (তোমার ওপর শান্তি হোক), আমি আমার রবের কাছে তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব।" (সূরা ১৯:৪৭)।
➤ সালামুন আলা মুসা ওয়া হারুন: ফেরাউনের মতো উদ্ধত ব্যক্তির কাছে যাওয়ার সময়ও আল্লাহ তাঁদের নরম কথা বলার নির্দেশ দিয়েছিলেন (সূরা ২০:৪৪), যা শান্তি ও হেদায়েতের পথ উন্মুক্ত করে ওয়াস-সালামু ‘আলা মানিত্তাবা‘আল হুদা-২০:৪৭।
➤ শেষ ফয়সালা: রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে— "হে আমার রব! নিশ্চয় এরা এমন জনগোষ্ঠী, যারা ঈমান আনবে না। অতএব, তুমি তাদের ক্ষেত্রে এড়িয়ে চলো এবং বলো, সালাম! আয়াত ৪৩:৮৮-৮৯"।
৫. মর্যাদাপূর্ণ পরিহার: ‘হাজরান জামীলা’
কোরআনের শব্দগত সামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আল্লাহ কেবল এড়িয়ে চলতে বলেননি, বরং তা হতে হবে মর্যাদাপূর্ণ।
➤ "লোকেরা যা বলে তাতে আপনি ধৈর্য ধারণ করুন এবং সৌজন্যের সাথে (সুন্দরভাবে) তাদেরকে পরিহার করুন (হাজরান জামীলা)।" (সূরা ৭৩:১০)।
➤ "আপনি ক্ষমাশীলতার নীতি অবলম্বন করুন, সৎকাজের নির্দেশ দিন এবং অজ্ঞদের এড়িয়ে চলুন।" (সূরা ৭:১৯৯)।
➤ মর্যাদার সাথে অতিক্রম: "এবং যখন তারা অসার/অনর্থক কাজের পাশ দিয়ে চলে, তখন সশ্রদ্ধভাবে (মর্যাদার সাথে) তা এড়িয়ে চলে।" (সূরা ২৫:৭২)।
৬. আয়াত প্রত্যাখ্যানকারীদের স্বরূপ ও পরিণতি:
যারা জেনে-বুঝে আল্লাহর আয়াত নিয়ে হঠকারিতা করে, কোরআন তাদের চিত্র এভাবে আঁকে:➤ "যে আল্লাহর আয়াতসমূহ নিজের কাছে পঠিত হতে শোনে, অথচ সে অহঙ্কারী হয়ে (অজ্ঞতায়) অটল থাকে যেন সে তা শুনতেই পায়নি। সুতরাং তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দিন।" (সূরা ৪৫:৮)।
➤ "মানুষের মধ্যে এমনও আছে যে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য অজ্ঞতাবশত অবান্তর কথা (লাহওয়াল হাদীস) ক্রয় করে এবং আল্লাহর পথকে বিদ্রূপের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের জন্য রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।" (সূরা ৩১:৬)।
৭. সংশ্লিষ্ট দুআ (হেদায়েত ও ধৈর্য রক্ষায়):
অজ্ঞদের আচরণে ধৈর্য ধরতে এবং আল্লাহর রহমত কামনায় এই কোরআনি দুআটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক: رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
রাব্বানা লা তুযিগ কুলুবানা বা’দা ইয হাদাইতানা ওয়াহাব লানা মিল্লাদুনকা রাহমাতান, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহাব।অর্থ: "হে আমাদের রব! আপনি আমাদের হেদায়েত দেওয়ার পর আমাদের অন্তরসমূহকে সত্যলংঘনে প্রবৃত্ত করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন; নিশ্চয়ই আপনি পরম দাতা।" (সূরা ৩:৮)।
⦿ সারসংক্ষেপ ও শিক্ষা (Tadabbur):
১. মুমিনদের মূল চাবিকাঠি হলো ‘সালাম’ (শান্তি), যা কেবল একটি শব্দ নয় বরং একটি আদর্শিক অবস্থান।
২. অজ্ঞদের সাথে তর্কে লিপ্ত হওয়া মানে তাদের নিম্নস্তরের মানসিকতায় নিজেকে নামিয়ে আনা।
৩. ‘সালামুন আলাইকুম’ বলার অর্থ হলো— আমি তোমার অনিষ্ট থেকে মুক্ত এবং আমি তোমার সাথে বিবাদে জড়াতে আগ্রহী নই।
৪. আল্লাহর আয়াত নিয়ে বিদ্রূপকারীর মজলিস ত্যাগ করা ইবাদতের অংশ।
সালামুন আলাল মুরসালিন (সমস্ত রাসুলগণের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক)। আলহামদুলিল্লাহির রব্বিল আলামিন!-আর সমস্ত প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহর জন্য।