বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই মহাবিশ্ব ও মানবজীবনকে এক সুনির্দিষ্ট ভারসাম্য (মিজান/ব্যালেন্স) এবং ঐশী সীমারেখার (হুদুদুল্লাহ) ওপর ভিত্তি করে সৃষ্টি করেছেন। কুরআনিক তাদাব্বুর (গভীর অনুধ্যান) থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, যখনই মানুষ এই ভারসাম্য বিনষ্ট করে বা রবের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে, মূলত তখনই সে ‘বাড়াবাড়ি’ বা সীমালঙ্ঘনের অপরাধে পতিত হয়। মানবীয় এই বাড়াবাড়ি কখনো নিজের নফসের ওপর হতে পারে, আবার কখনো ক্ষমতার দম্ভে অন্যের ওপরও চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে।
কুরআনের আয়াতসমূহের শব্দতাত্ত্বিক ও ভাবগত সামঞ্জস্য (symmetry) বিশ্লেষণ করলে এক অভাবনীয় চিত্র ফুটে ওঠে—নিজের প্রবৃত্তির (হাওযা) দাসত্ব থেকে সৃষ্ট সীমালঙ্ঘন এবং অন্যের স্বৈরাচারী দম্ভে (তুগইয়ান) পিষ্ট হওয়া—এই উভয় সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে এক সুনিপুণ মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা এবং শক্তিশালী ঐশী দুআও শিক্ষা দিয়েছেন।
প্রতীকী ছবি
আল-কুরআনে ‘বাড়াবাড়ি’ বা সীমালঙ্ঘন বোঝাতে মূলত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট আরবী শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত বিচ্যুতির ভিন্ন ভিন্ন স্তরকে নির্দেশ করে:
1. ‘ইসরফ’ (বাড়াবাড়ি)-এর শেকড়: ‘হাওয়া’ (প্রবৃত্তি) এবং ‘ফুরত্বা’ (সীমাহীনতা):
2. ‘তুগইয়ান’ (সীমা লঙ্ঘনকারী, অন্যায়ভাবে বাড়াবাড়ি করা)-এর মনস্তাত্ত্বিক উৎস: ‘স্বয়ংসম্পূর্ণতার অহমিকা’:
দৃষ্টান্ত-2: ত্বাগা/ত্বাগীন: মিসকীন বা গরিবদের হক থেকে বঞ্চিত করা, কৃপণতা ও লোভ, আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা না করা, আত্মঅহংকার ও আল্লাাহর উপর ভরসা না করা জুলুম :
উপরোক্ত বিষয়ের প্রমাণ হিসাবে আল কোরআনে বাগান মালিকদের পরীক্ষার ঘটনা বিশ^বাসীর জন্য এক অনন্য উদাহরন ও দৃষ্টান্ত, সতর্কবানী: দ্র: আয়াত ৬৮:১৭-৩১
‘তুগইয়ান’ থেকে সুরক্ষার নিখুঁত সমীকরণ: জান্নাতের সুসংবাদ:
3. ইবাদত বা ধর্মে বাড়াবাড়ি: ‘ই‘তিদা’ (اعْتِدَاء):
4. আল্লাহর হুকুম অমান্য করা: ‘হুদুদুল্লাহ’ অতিক্রম বা চূড়ান্ত জুলুম:
কারণ, জুলুমের সংজ্ঞাই হলো— "কোনো কিছুকে তার সঠিক স্থানে না রাখা।" আল্লাহর হুকুম অমান্য করার অর্থ হলো, বান্দা হিসেবে নিজের যে সমর্পিত স্থানে থাকার কথা ছিল, মানুষ সেই স্থান থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে।
৬. আল্লাহর আদেশ-নিষেধ অমান্য করা: ‘হুদুদুল্লাহ’ অতিক্রম বা চূড়ান্ত জুলুম (ظُلْم):
দৃষ্টান্ত 3: পারিবারিক বিধান—তালাক ও দাম্পত্য সম্পর্কে বাড়াবাড়ি (জুলুম):
দৃষ্টান্ত-5: হিলার বা আইনের ফাঁক গলে সীমালঙ্ঘন (শনিবারের আসহাবুস সাবত):
দৃষ্টান্ত-7: রবের অধিকারে হস্তক্ষেপ—মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘জুলুম’ (শিরক):
দৃষ্টান্ত-8: মিসকীন বা গরিবদের হক থেকে বঞ্চিত করা, কৃপণতা ও লোভ, আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা না করা, আত্মঅহংকার ও আল্লাাহর উপর ভরসা না করা জুলুম :
দৃষ্টান্ত-9: পানাহার, অপচয় এবং ভোগ-বিলাসে সীমালঙ্ঘন (ইসরফ, তুগইয়ান ও তাবযীর):
ক. খাওয়া-দাওয়ায় ‘ইসরফ’ (শারীরিক ও মানসিক বাড়াবাড়ি):
খ. ভোগ-বিলাস ও অপচয় বা ‘তাবযীর’ (শয়তানের মনস্তত্ত্ব):
গ. হালাল রিজিকে ‘তুগইয়ান’ বা অবাধ্যতা (আল্লাহর ক্রোধের কারণ):
দৃষ্টান্ত-9: ‘ইসরফ’-এর চূড়ান্ত পরিণতি: ফিরাউনের ‘মুসরিফীন’ উপাধি:
কুরআনের ভাষায় যারা ‘ইসরফ’ (বাড়াবাড়ি) করে, তাদেরকে ‘মুসরিফীন’ বলা হয়।মানুষ যখন তার ক্ষমতা, অহংকার এবং ঔদ্ধত্যের সীমারেখা পার করে ফেলে, তখন সেই স্বৈরাচারী রূপটিও ‘ইসরফ’-এরই একটি চরম পর্যায়। সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং অনুধ্যানের বিষয় হলো—আমরা সাধারণত ‘ইসরফ’ বলতে কেবল টাকা-পয়সা বা খাবার অপচয় করাকে বুঝি। কিন্তু কুরআন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্বৈরাচারী, অহংকারী ও নিজকে রবের দাবিদার মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জালিম ফিরাউনকেও এই একই শব্দে অর্থাৎ ‘মুসরিফীন’ (সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত) বলে আখ্যায়িত করেছে! অর্থাৎ ফিরাউনের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আল্লাহ তাকে সরাসরি ‘মুসরিফীন’-এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
ফিরাউনকে কেন ‘মুসরিফীন’ বলা হলো? এর মাঝে একটি ভয়ংকর মনস্তাত্ত্বিক সূত্র লুকিয়ে আছে। প্রবন্ধের শুরুতেই একটি কথা ছিল—
অর্থাৎ, আজ যে ব্যক্তি ছোট ছোট অবাধ্যতা, অপচয় বা প্রবৃত্তির দাসত্বের মাধ্যমে ‘মুসরিফ’ হয়, কাল তার ভেতরেই ফিরাউনের মতো ‘তুগইয়ান’ বা চরম অহংকারের বীজ ডালপালা মেলতে শুরু করে।
‘ইসরফ’ (বাড়াবাড়ি) থেকে ফিরে আসার ঐশী সান্ত্বনা:
তবে শর্ত প্রযোজ্য: ক্ষমার পেছনের ‘Action Plan’:
১. ফিরে আসার করার উপায়? (সূরা যুমার ৩৯:৫৩-৫৫)
২. রহমত প্রাপ্তির শর্ত: নূরকে আঁকড়ে ধরা (সূরা নিসা ৪:১৭৪-১৭৫)
৩. আল্লাহকে চূড়ান্ত ফয়সালাকারী মানা মানেই কিতাবকে মানা (সূরা আন-আম ৬:১১৪)
4. পরিপূরক শক্তিশালী দলিল:
নিজের নফসের ওপর বাড়াবাড়ি (ইসরফ ও জুলুম) থেকে সুরক্ষার অনুধ্যান:
অন্যের বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন (তুগইয়ান) থেকে সুরক্ষার অনুধ্যান:
জালিমের চক্রান্ত ও বাড়াবাড়ি থেকে চূড়ান্ত সুরক্ষার ঐশী ঢাল (Tawfid / তাফউইদ):
وَأُفَوِّضُ أَمْرِي إِلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ
অউফাও ওয়িদ্বু আ¤্রীয় ইলা ইল্লালাহু; ইন্নাল্লাহা বাছীরুম বিল ইবাদ।৬. সালামুন আলা ইবরাহীম-এর দুআ: জালিমের ঔদ্ধত্যের শিকার না হওয়ার বা ‘ফিতনা’ বা পরীক্ষার বস্তু না হওয়ার প্রার্থনা:
রব্বানা লা তাজ‘আলনা ফিতনাতাল লিল্লাযীনা কাফারূ ওয়াগফির লানা রব্বানা, ইন্নাকা আনতাল ‘আযীযুল হাকীম।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদেরকে কাফিরদের জন্য ফিতনার (পরীক্ষা বা নির্যাতনের) পাত্র বানাবেন না। হে আমাদের রব! আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" (সূরা আল-মুমতাহানাহ: ৫)
رَبَّنَا ظَلَمْنَآ أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ ٱلْخَـٰسِرِينَ
রব্বানা-জোয়ালাম্না- আন্ফুসানা- অইল্লাম্ তার্গ্ফিলানা-অর্তাহাম্না-লানাকূনান্না মিনাল্ খা-সিরীন্। ইন্নাহূ হুঅত তাওঅ-বুর রাহীম্।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা আমাদের নিজেদের উপর জুলুম করেছি। আর যদি না আপনি আমাদের জন্য ক্ষমা করেন এবং আমাদের অনুগ্রহ করেন, নিশ্চয়ই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব-আল কুরআন ৭:২৩
إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
ইন্নাহূ হুঅত তাওঅ-বুর রাহীম্। অর্থ: নিশ্চয়ই তিনি, তিনিই তওবা কবুলকারী, দয়ালু- আল কুরআন ২:৩৭
[ঝঁৎবষু, ঐব রং ঃযব ধপপবঢ়ঃবৎ ড়ভ ৎবঢ়বহঃধহপব, সড়ংঃ গবৎপরভঁষ-২:৩৭]
