বাড়াবাড়ি: কুরআনিক পরিভাষায় ‘বাড়াবাড়ি’ কী, কেন এবং কারা করে? বুদ্ধির জোরে বা আইনি মারপ্যাঁচে জঘন্য বাড়াবাড়ি স্বরূপ ও সুরক্ষার ঐশী দুআসমূহ (Transgression-Limit cross-Exceeding-excess-barabari)

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই মহাবিশ্ব ও মানবজীবনকে এক সুনির্দিষ্ট ভারসাম্য (মিজান/ব্যালেন্স) এবং ঐশী সীমারেখার (হুদুদুল্লাহ) ওপর ভিত্তি করে সৃষ্টি করেছেন। কুরআনিক তাদাব্বুর (গভীর অনুধ্যান) থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, যখনই মানুষ এই ভারসাম্য বিনষ্ট করে বা রবের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে, মূলত তখনই সে ‘বাড়াবাড়ি’ বা সীমালঙ্ঘনের অপরাধে পতিত হয়। মানবীয় এই বাড়াবাড়ি কখনো নিজের নফসের ওপর হতে পারে, আবার কখনো ক্ষমতার দম্ভে অন্যের ওপরও চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে।

কুরআনের আয়াতসমূহের শব্দতাত্ত্বিক ও ভাবগত সামঞ্জস্য (symmetry) বিশ্লেষণ করলে এক অভাবনীয় চিত্র ফুটে ওঠে—নিজের প্রবৃত্তির (হাওযা) দাসত্ব থেকে সৃষ্ট সীমালঙ্ঘন এবং অন্যের স্বৈরাচারী দম্ভে (তুগইয়ান) পিষ্ট হওয়া—এই উভয় সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে এক সুনিপুণ মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা এবং শক্তিশালী ঐশী দুআও শিক্ষা দিয়েছেন।

প্রতীকী ছবি

আল-কুরআনে ‘বাড়াবাড়ি’ বা সীমালঙ্ঘন বোঝাতে মূলত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট আরবী শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত বিচ্যুতির ভিন্ন ভিন্ন স্তরকে নির্দেশ করে:

১. ইসরফ (إِسْرَاف): এর অর্থ হলো নিজের সামর্থ্য, সময়, সম্পদ বা দ্বীনের বিষয়ে অতিরিক্ত করা বা নিজের নফসের ওপর বাড়াবাড়ি করা।

২. তুগইয়ান (طُغْيَان): এর অর্থ হলো অহংকার ও ঔদ্ধত্যের বশবর্তী হয়ে অন্যের ওপর জুলুম করা, গরিবদের হক থেকে বঞ্চিত করা বা রবের বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা।

৩. জুলুম (ظُلْم): এর অর্থ হলো কোনো কিছুকে তার সঠিক স্থানে না রাখা, যা নিজের নফসের ওপরও হতে পারে, আবার অন্যের ওপরও হতে পারে।

৪. ফুরত্বা (فُرُطًا): এর অর্থ হলো আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল হয়ে বেপরোয়া আচরণ করা বা প্রবৃত্তির তাড়নায় কোনো কাজের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া।

৫. ই‘তিদা (اعْتِدَاء): এর অর্থ হলো আল্লাহর নির্ধারিত বৈধ সীমারেখা (বিশেষ করে হালাল-হারাম বা অধিকারের ক্ষেত্রে) অতিক্রম করে যাওয়া।

‘বাড়াবাড়ি’র ঠিক বিপরীতার্থক ধারণা:

কুরআনের শব্দগত সামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই ‘বাড়াবাড়ি’র ঠিক বিপরীতার্থক (antonym) ধারণা হিসেবে আল্লাহ ‘তাকওয়া’ (সীমা রক্ষা করা) এবং ‘ইস্তিকামাহ’ (সরল পথে অবিচল থাকা)-এর কথা বলেছেন। কুরআনের অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক ইঙ্গিত (implied evidence) হলো—যে ব্যক্তি নিজের ভেতরের ‘ইসরফ’ (বাড়াবাড়ি) নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে শেষ পর্যন্ত সমাজের বুকে ‘তুগইয়ান’ বা স্বৈরাচারীতে পরিণত হয়।

নিজের সংশোধনের জন্য  এই শব্দক’টির পরিভাষাগত মনস্তাত্ত্বিক শেকড় ও তা থেকে উত্তরণের উপায় নিচে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছি, বিঈযনিল্লাহ!

1. ‘ইসরফ’ (বাড়াবাড়ি)-এর শেকড়: ‘হাওয়া’ (প্রবৃত্তি) এবং ‘ফুরত্বা’ (সীমাহীনতা):

মানুষ কেন নিজের ওপর বাড়াবাড়ি করে? কুরআন এর মনস্তাত্ত্বিক কারণ হিসেবে ‘হাওযা’ (هَوَىٰ) বা প্রবৃত্তির তাড়নাকে চিহ্নিত করেছে। সূরা কাহাফে আল্লাহ রাসূল (সা.)-কে এমন ব্যক্তিদের সঙ্গ ছাড়তে বলেছেন, যাদের হৃদয় আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল এবং যাদের কাজকর্মে চরম ‘বাড়াবাড়ি’ রয়েছে। এখানে আল্লাহ ‘ফুরত্বা’ (فُرُطًا) শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

"আর আপনি এমন ব্যক্তির আনুগত্য করবেন না, যার অন্তরকে আমি আমার স্মরণ থেকে গাফিল করে দিয়েছি, যে তার প্রবৃত্তির (হাওযা) অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ চরম বাড়াবাড়িমূলক (ফুরত্বা)।" (সূরা আল-কাহাফ: ১৮:২৮)

অনুধ্যান: এখানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্য্য কামনায় এবং তার অনুসরন করতে নিষেধ করা হয়েছে কারন তাদের ক্বলব আল্লাহর যিকির থেকে মানে কুরআন থেকে গাফেল করে দেয়। যখনই হৃদয় থেকে আল্লাহর স্মরণ (যিকির) সরে যায়, তখনই সেখানে প্রবৃত্তি (হাওযা) রাজত্ব করে এবং তার অনিবার্য পরিণতি হয় ‘ফুরত্বা’ বা সকল সীমারেখা অতিক্রম করা।

2. ‘তুগইয়ান’ (সীমা লঙ্ঘনকারী, অন্যায়ভাবে বাড়াবাড়ি করা)-এর মনস্তাত্ত্বিক উৎস: ‘স্বয়ংসম্পূর্ণতার অহমিকা’:

দৃষ্টান্ত-1: মানুষ কেন ফিরাউনের মতো ‘তুগইয়ান’ বা স্বৈরাচারী হয়? কুরআনের প্রথম নাযিলকৃত সূরাগুলোর একটিতে আল্লাহ মানবচরিত্রের এই অন্ধকার দিকটি উন্মোচন করেছেন।

"কখনোই নয়! নিশ্চয়ই মানুষ সীমালঙ্ঘন (তুগইয়ান) করেই বসে, কারণ সে নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে।" (সূরা আল-আলাক: ৯৬:৬-৭)

অনুধ্যান: যখনই মানুষ ভাবে যে তার অর্থ, ক্ষমতা বা পদমর্যাদার কারণে তার আর রবের সাহায্যের দরকার নেই বা সে নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ (ইস্তাগনা), ঠিক তখনই তার ভেতর ‘তুগইয়ান’-এর জন্ম নেয়।

দৃষ্টান্ত-2: ত্বাগা/ত্বাগীন: মিসকীন বা গরিবদের হক থেকে বঞ্চিত করা, কৃপণতা ও লোভ, আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা না করা, আত্মঅহংকার ও আল্লাাহর উপর ভরসা না করা জুলুম :

উপরোক্ত বিষয়ের প্রমাণ হিসাবে আল কোরআনে বাগান মালিকদের পরীক্ষার ঘটনা বিশ^বাসীর জন্য এক অনন্য উদাহরন ও দৃষ্টান্ত, সতর্কবানী: দ্র: আয়াত ৬৮:১৭-৩১

অনুধাবন: আল্লাহ তাআলা ফেরআউনের ক্ষেত্রে “ত্বাগা” (সীমালঙ্ঘন) ধাতু ব্যবহার করেছেন, যেখান থেকে “ত্বাগীন” শব্দটি এসেছে। সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ আছে কুরআন-এর সূরা তা-হা, আয়াত ২৪-এ: আরেকটি জায়গা সূরা আন-নাজিয়াত, আয়াত ১৭-এও একই কথা বলা হয়েছে।

‘তুগইয়ান’ থেকে সুরক্ষার নিখুঁত সমীকরণ: জান্নাতের সুসংবাদ:

সূরা আন-নাযিআতে আল্লাহ ‘তুগইয়ান’ (সীমালঙ্ঘন) এবং ‘হাওযা’ (প্রবৃত্তি)-কে এক সুতোয় গেঁথেছেন এবং এর বিপরীত চিত্র হিসেবে ‘তাকওয়া’ ও জান্নাতের কথা বলেছেন।

"অতঃপর যে সীমালঙ্ঘন (তুগইয়ান) করেছে এবং দুনিয়ার জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, জাহান্নামই হবে তার আবাস। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করেছে এবং নফসকে কুপ্রবৃত্তি (হাওযা) থেকে বিরত রেখেছে, জান্নাতই হবে তার আবাস।" (সূরা আন-নাযিআত: ৭৯:৩৭-৪১)

3. ইবাদত বা ধর্মে বাড়াবাড়ি: ‘ই‘তিদা’ (اعْتِدَاء):

‘বাড়াবাড়ি’ যে কেবল পাপের ক্ষেত্রেই হয়, তা নয়। ধর্মের নামে বা হালালকে হারাম করার মাধ্যমেও মানুষ বাড়াবাড়ি করতে পারে। এর জন্য আল্লাহ ‘ই‘তিদা’ (সীমা অতিক্রম করা) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটি মূলত দ্বীনের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট করার ব্যাপারে এক কঠোর সতর্কতা।

"হে মুমিনগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য যেসব পবিত্র বস্তু হালাল করেছেন, সেগুলোকে তোমরা হারাম করো না এবং সীমালঙ্ঘন (ই‘তিদা: বাড়াবাড়ি) করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।" (সূরা আল-মায়িদাহ: ৫:৮৭)

দৃষ্টান্ত: ইবাদত বা সিয়ামের বিধানে বাড়াবাড়ি (তিলকা হুদুদুল্লাহ):

রমাদান মাসে রোজা পালন এবং এর আনুষঙ্গিক নিয়মকানুন (যেমন: রাতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক, ইতিকাফের বিধান) বর্ণনা করার ঠিক পরপরই আল্লাহ অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই সীমারেখার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন: 

"এগুলো আল্লাহর সীমারেখা (তিলকা হুদুদুল্লাহ), সুতরাং তোমরা এগুলোর ধারেকাছেও যেয়ো না।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২:১৮৭)

4. আল্লাহর হুকুম অমান্য করা: ‘হুদুদুল্লাহ’ অতিক্রম বা চূড়ান্ত জুলুম:

কুরআনের পরিভাষায় আল্লাহর আদেশ-নিষেধ (Amr ও Nahy) না মানা এবং তাঁর নির্ধারিত বিধানকে পাশ কাটিয়ে চলাই হলো ‘জুলুম’ (ظُلْم) বা বাড়াবাড়ির সবচেয়ে বড় এবং মৌলিক রূপ। 

কারণ, জুলুমের সংজ্ঞাই হলো— "কোনো কিছুকে তার সঠিক স্থানে না রাখা।" আল্লাহর হুকুম অমান্য করার অর্থ হলো, বান্দা হিসেবে নিজের যে সমর্পিত স্থানে থাকার কথা ছিল, মানুষ সেই স্থান থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে।

আল্লাহর সুস্পষ্ট আদেশ-নিষেধ না মেনে চলা মূলত নিজের প্রতি এবং রবের বিধানের প্রতি সবচেয়ে বড় ‘জুলুম’ বা বাড়াবাড়ি। আল্লাহ মানুষের জীবন পরিচালনার জন্য যে আইনি ও নৈতিক সীমারেখা টেনে দিয়েছেন, কুরআন তাকে ‘হুদুদুল্লাহ’ (حُدُودُ اللَّهِ) বা আল্লাহর সীমা বলে আখ্যায়িত করেছে। যখনই মানুষ রবের নির্ধারিত আদেশ বা নিষেধ অমান্য করে, সে মূলত নিজেকে জাহান্নামের শাস্তির সম্মুখীন করে নিজের নফসের ওপরই চরম জুলুম করে। কুরআনে এর অকাট্য দৃষ্টান্ত রয়েছে:

দৃষ্টান্ত ১ (বিধান অমান্য করা): পারিবারিক ও সামাজিক বিধান বর্ণনার পর আল্লাহ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন-

"এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা (হুদুদুল্লাহ)। আর যারা আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করে, তারাই মূলত জালিম (সীমালঙ্ঘনকারী বা বাড়াবাড়িকারী)।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২:২২৯)

দৃষ্টান্ত ২ (নিষেধ অমান্য করার মনস্তত্ত্ব): মানব ইতিহাসের প্রথম আদেশ-নিষেধের ঘটনাতেই আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, নিষেধ অমান্য করার নামই হলো জুলুম। সালামুন আলা আদম ও তাঁর স্ত্রী-কে যখন আল্লাহ একটি নির্দিষ্ট গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন, তখন সতর্ক করে বলেছিলেন:

"আর তোমরা এই গাছটির কাছেও যেয়ো না, অন্যথায় তোমরা জালিমদের (সীমালঙ্ঘনকারীদের) অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।" (সূরা আল-আ‘রাফ: ৭:১৯)

অনুধ্যান: অর্থাৎ, আল্লাহর যেকোনো ছোট বা বড় নির্দেশ অমান্য করা বা তাঁর নিষেধকে তোয়াক্কা না করা হলো রবের রচিত নিখুঁত ভারসাম্যের (Mizan) বিরুদ্ধে একপ্রকার মনস্তাত্ত্বিক বিদ্রোহ। যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুম অমান্য করে, সে কেবল পাপই করে না; বরং সে মহাবিশ্বের অধিপতির নির্ধারিত সীমানা ভেঙে ‘জালিম’-এ পরিণত হয়।

৬. আল্লাহর আদেশ-নিষেধ অমান্য করা: ‘হুদুদুল্লাহ’ অতিক্রম বা চূড়ান্ত জুলুম (ظُلْم):

কুরআনের পরিভাষায় আল্লাহর আদেশ-নিষেধ (Amr ও Nahy) না মানা এবং তাঁর নির্ধারিত বিধানকে পাশ কাটিয়ে চলাই হলো ‘জুলুম’ বা বাড়াবাড়ির সবচেয়ে মৌলিক রূপ। জুলুমের সংজ্ঞাই হলো— "কোনো কিছুকে তার সঠিক স্থানে না রাখা।" 

আল্লাহ মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন পরিচালনার জন্য যে আইনি ও নৈতিক সীমারেখা টেনে দিয়েছেন, কুরআন তাকে ‘হুদুদুল্লাহ’ (حُدُودُ اللَّهِ) বা আল্লাহর সীমা বলে ঘোষণা করেছে। এই সীমারেখা লঙ্ঘনকারীকেই আল্লাহ সরাসরি ‘জালিম’ বা বাড়াবাড়িকারী হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। এর অকাট্য কয়েকটি দৃষ্টান্ত নিচে দেওয়া হলো:

দৃষ্টান্ত-1 (নিষেধ অমান্য করার মনস্তত্ত্ব): 
মানব ইতিহাসের প্রথম আদেশ-নিষেধের ঘটনাতেই আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, নিষেধ অমান্য করার নামই হলো জুলুম। আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-কে যখন আল্লাহ একটি নির্দিষ্ট গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন, তখন সতর্ক করে বলেছিলেন:

"আর তোমরা এই গাছটির কাছেও যেয়ো না, অন্যথায় তোমরা জালিমদের (সীমালঙ্ঘনকারীদের) অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।" (সূরা আল-আ‘রাফ: ৭:১৯)

অনুধ্যান: অর্থাৎ, আল্লাহর যেকোনো ছোট বা বড় নির্দেশ অমান্য করা বা তাঁর নিষেধকে তোয়াক্কা না করা হলো রবের রচিত নিখুঁত ভারসাম্যের (Mizan) বিরুদ্ধে একপ্রকার মনস্তাত্ত্বিক বিদ্রোহ। যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুম অমান্য করে, সে কেবল পাপই করে না; বরং সে মহাবিশ্বের অধিপতির নির্ধারিত সীমানা ভেঙে ‘জালিম’-এ পরিণত হয়।

দৃষ্টান্ত 3: পারিবারিক বিধান—তালাক ও দাম্পত্য সম্পর্কে বাড়াবাড়ি (জুলুম):

পারিবারিক জীবনে তালাকের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে মানুষ সবচেয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করে। স্বামী বা স্ত্রী যখন একে অপরের অধিকার নষ্ট করে, তখন আল্লাহ এটিকে কেবল ভুল বলেননি, সরাসরি ‘জুলুম’ বলেছেন:

"এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা (তিলকা হুদুদুল্লাহ)। আর তোমরা এই সীমা লঙ্ঘন কোরো না। আর যারা আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করে, তারাই মূলত জালিম (সীমালঙ্ঘনকারী বা বাড়াবাড়িকারী)।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২:২২৯)

একইভাবে সূরা তালাকেও আল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি তালাকের বিধানাবলি অমান্য করে, সে মূলত নিজের ওপরই জুলুম বা বাড়াবাড়ি করে: "আর যে আল্লাহর সীমারেখা লঙ্ঘন করল, সে মূলত নিজের নফসের ওপরই জুলুম (ظَلَمَ نَفْسَهُ) করল।" (সূরা আত্ব-তালাক: ৬৫:১)

দৃষ্টান্ত 4: উত্তরাধিকার ও সম্পদ বণ্টনের বিধানে সীমালঙ্ঘন:
সূরা নিসায় পিতা-মাতা, সন্তান ও আত্মীয়স্বজনের মাঝে সম্পদের সুনির্দিষ্ট ভাগ-বণ্টন (মিরাস) বর্ণনা করার পর আল্লাহ জানিয়ে দিয়েছেন, এই ভাগ বা বিধান পরিবর্তন করা তাঁর সীমার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং এর শাস্তি ভয়াবহ:

"আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্য হয় এবং তাঁর সীমারেখাগুলো (হুদুদাহু) অতিক্রম করে, আল্লাহ তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন, সেখানে সে চিরকাল থাকবে। আর তার জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।" (সূরা আন-নিসা: ৪:১৪)

অনুধ্যান (Tadabbur):

কুরআনের এই দৃষ্টান্তগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে—তা সিয়ামের মতো ব্যক্তিগত ইবাদত হোক, তালাকের মতো পারিবারিক বিষয় হোক, কিংবা সম্পদ বণ্টনের মতো অর্থনৈতিক বিষয় হোক—আল্লাহর হুকুম অমান্য করার অর্থ কেবল একটি ভুল করা নয়; বরং এটি হলো রবের রচিত নিখুঁত ভারসাম্যের (Mizan) বিরুদ্ধে একপ্রকার মনস্তাত্ত্বিক বিদ্রোহ। যে ব্যক্তি আল্লাহর এই নির্দেশিত বিধান বা ‘হুদুদুল্লাহ’ অমান্য করে, সে মহাবিশ্বের অধিপতির নির্ধারিত সীমানা ভেঙে ‘জালিম’-এ পরিণত হয় এবং নিজের নফসের ওপর চূড়ান্ত বাড়াবাড়ি বা ইসরফ করে বসে।

দৃষ্টান্ত-5: হিলার বা আইনের ফাঁক গলে সীমালঙ্ঘন (শনিবারের আসহাবুস সাবত):

অনেক সময় মানুষ সরাসরি বিদ্রোহ করে না, বরং ধর্মের নিয়মের মধ্যে ফাঁকফোকর বা ‘হিলা’ (Tricks) বের করে আল্লাহর সীমা পার হতে চায়। বনী ইসরাইলের একটি দলকে শনিবারে মাছ ধরতে নিষেধ করা হয়েছিল। তারা সরাসরি শনিবারে মাছ না ধরে, শনিবারে জাল ফেলে রাখত এবং রবিবারে তুলত। আল্লাহ তাদের এই প্রতারণামূলক মনস্তত্ত্বকে অত্যন্ত কঠোরভাবে ‘ই‘তিদা’ (اعْتِدَاء - সীমালঙ্ঘন) বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং তাদের বানরে পরিণত করে দিয়েছিলেন:

"আর তোমাদের মধ্যে যারা শনিবারের ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন (ই‘তিদা) করেছিল, তাদের কথা তোমরা নিশ্চিতভাবেই জানো। আমি তাদেরকে বলেছিলাম, তোমরা লাঞ্ছিত বানর হয়ে যাও!" (সূরা আল-বাকারাহ: ২:৬৫)

অনুধ্যান (Tadabbur): এটি একটি জোরালো সতর্কবার্তা যে, রবের দেওয়া ‘হুদুদুল্লাহ’ বা সীমারেখাকে বুদ্ধির জোরে বা আইনি মারপ্যাঁচে (Loophole) এড়ানোর চেষ্টা করাও এক জঘন্য বাড়াবাড়ি। আল্লাহ কেবল মানুষের বাহ্যিক কাজই দেখেন না, ভেতরের নিয়তের ‘সীমালঙ্ঘন’ও দেখেন।

দৃষ্টান্ত-6: প্রাকৃতিক ও জৈবিক ভারসাম্য নষ্ট করা (কওমে লূতের ‘ইসরফ’):

আল্লাহ মানবজীবনের পবিত্রতার জন্য নর-নারীর মাঝে যে প্রাকৃতিক আকর্ষণ ও বিয়ের সীমারেখা দিয়েছেন, সালামুন আলা লূত-এর জাতি সেই জৈবিক সীমা অতিক্রম করেছিল। সমকামিতার মতো এই জঘন্য বিকৃতিকে আল্লাহ কেবল পাপ বলেননি; বরং কুরআনের ভাষায় একে সরাসরি ‘ইসরফ’ (বাড়াবাড়ি) এবং ‘আদুন’ (সীমালঙ্ঘন) বলে আখ্যায়িত করেছেন:

"তোমরা তো কামপ্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে নারীদের ছেড়ে পুরুষদের কাছে গমন করো। বরং তোমরা হলে এক সীমালঙ্ঘনকারী (মুসরিফূন) সম্প্রদায়।" (সূরা আল-আ‘রাফ: ৭:৮১)

এবং সূরা শুআরায় বলা হয়েছে: بَلْ أَنتُمْ قَوْمٌ عَادُونَ "বরং তোমরা এমন এক সম্প্রদায় যারা সীমা অতিক্রম করেছ (আদুন)।" (২৬:১৬৬)

অনুধ্যান (Tadabbur): প্রবৃত্তির (Hawa) দাসত্ব করতে গিয়ে মানুষ যখন আল্লাহর সৃষ্ট স্বাভাবিক প্রকৃতি (Fitrah) ও ভারসাম্য (Mizan) নষ্ট করে ফেলে, তখন সে মূলত নিজের সত্তার ওপর চূড়ান্ত ‘ইসরফ’ বা বাড়াবাড়ি করে।

দৃষ্টান্ত-7: রবের অধিকারে হস্তক্ষেপ—মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘জুলুম’ (শিরক):

সংজ্ঞায় বলা হয়েছে—জুলুম মানে "কোনো কিছুকে তার সঠিক স্থানে না রাখা।" এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় সত্য হলো—ইবাদত, আইন ও আনুগত্য পাওয়ার একমাত্র অধিকার স্রষ্টার। কেউ যদি এই অধিকার অন্য কোনো সৃষ্টিকে (গাইরুল্লাহ) দিয়ে দেয়, তবে সে জিনিসটিকে তার সঠিক স্থান থেকে সরিয়ে সবচেয়ে ভুল জায়গায় রাখল। তাই সালামুন আলা লুকমান তাঁর সন্তানকে উপদেশ দিতে গিয়ে শিরককে সরাসরি ‘সবচেয়ে বড় জুলুম’ বলেছেন:

"আর স্মরণ করো, যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিল, ‘হে আমার বৎস! আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক কোরো না। নিশ্চয়ই শিরক হলো সবচেয়ে বড় জুলুম (বাড়াবাড়ি/অবিচার)।’" (সূরা লুকমান: ৩১:১৩)

অনুধ্যান (Tadabbur): মানুষ যখন আল্লাহর ক্ষমতা, ফয়সালা বা বিধানের জায়গায় অন্য কাউকে বসায়, তখন সে মূলত রবের সীমানায় অবৈধ অনুপ্রবেশ করে। এটিই হলো অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় ‘বাড়াবাড়ি’ বা জুলুম।

দৃষ্টান্ত-8: মিসকীন বা গরিবদের হক থেকে বঞ্চিত করা, কৃপণতা ও লোভ, আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা না করা, আত্মঅহংকার ও আল্লাাহর উপর ভরসা না করা জুলুম :

দৃষ্টান্ত: উপরোক্ত বিষয়ের প্রমাণ হিসাবে আল কোরআনে বাগান মালিকদের পরীক্ষার ঘটনা বিশ^বাসীর জন্য এক অনন্য উদাহরন ও দৃষ্টান্ত, সতর্কবানী: দ্র: আয়াত ৬৮:১৭-২৯

দৃষ্টান্ত-9: পানাহার, অপচয় এবং ভোগ-বিলাসে সীমালঙ্ঘন (ইসরফ, তুগইয়ান ও তাবযীর):

মানুষের প্রবৃত্তি বা ‘হাওযা’ সবচেয়ে বেশি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে পেট এবং সম্পদের মাধ্যমে। আল্লাহ মানুষের জন্য দুনিয়ার পবিত্র বস্তু ও রিজিক হালাল করেছেন, কিন্তু এর সাথে একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা বা ব্যালেন্স (Mizan) জুড়ে দিয়েছেন। যখনই মানুষ প্রয়োজন অতিরিক্ত ভোগ করে, অপচয় করে বা বিলাসিতায় মত্ত হয়, তখন সে মূলত নিজের সত্তা এবং সমাজের ওপর চূড়ান্ত বাড়াবাড়ি করে। কুরআনে এর তিনটি চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক রূপ তুলে ধরা হয়েছে:

ক. খাওয়া-দাওয়ায় ‘ইসরফ’ (শারীরিক ও মানসিক বাড়াবাড়ি):

আল্লাহ সিজদাস্থানে বা ইবাদতের সময় সুন্দর পোশাক পরার নির্দেশ দেওয়ার পরপরই খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন:

"আর তোমরা পানাহার করো, কিন্তু অপচয় বা সীমালঙ্ঘন (ইসরফ) কোরো না। নিশ্চয়ই তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।" (সূরা আল-আ‘রাফ: ৭:৩১)

“আর তারা যখন ব্যয় করে, তখন অপচয় করে না ইসরফ)  এবং কৃপণতাও করে না…” -আয়াত ২৫:৬৭

খ. ভোগ-বিলাস ও অপচয় বা ‘তাবযীর’ (শয়তানের মনস্তত্ত্ব):

প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করা বা কেবল অহংকার ও লোকদেখানোর জন্য সম্পদ নষ্ট করাকে কুরআন ‘তাবযীর’ বলেছে এবং এই কাজটিকে সরাসরি শয়তানের চরিত্রের সাথে তুলনা করেছে:
وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا ۝ إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ

"আর কিছুতেই অপচয় (তাবযীর) কোরো না। নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।" (আয়াত:১৭:২৬-২৭)

গ. হালাল রিজিকে ‘তুগইয়ান’ বা অবাধ্যতা (আল্লাহর ক্রোধের কারণ):

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, আল্লাহ হালাল খাবার খাওয়ার অনুমতির সাথে স্বৈরাচারী শব্দ ‘তুগইয়ান’ (طُغْيَان) যুক্ত করেছেন! অর্থাৎ, ভোগের ক্ষেত্রে অহংকারী হওয়াটা রবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শামিল:

"আমি তোমাদেরকে যেসব পবিত্র বস্তু রিজিক হিসেবে দিয়েছি, তা থেকে আহার করো; কিন্তু এতে সীমালঙ্ঘন বা অবাধ্যতা (তুগইয়ান) কোরো না, অন্যথায় তোমাদের ওপর আমার ক্রোধ নেমে আসবে।" (আয়াত: ২০:৮১)

অনুধ্যান (Tadabbur):
খাদ্য ও ভোগ-বিলাসে বাড়াবাড়ি করা কেন এত মারাত্মক ‘জুলুম’? কারণ এর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রভাব ভয়াবহ।

১. অতিরিক্ত পানাহার মানুষের অন্তরকে মৃত করে দেয় এবং প্রবৃত্তিকে (Hawa) উসকে দেয়, ফলে সে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল হয়ে পড়ে।

২. সমাজের একশ্রেণির মানুষের ভোগ-বিলাস বা ‘Consumerism’ মূলত অন্য দরিদ্র মানুষের অধিকার হরণ করে (যা সামাজিক জুলুম)।

৩. সম্পদ ও বিলাসিতা মানুষকে আত্মঅহংকারী (মুতরাফিন) করে তোলে, আর এই ‘স্বয়ংসম্পূর্ণতার দম্ভ’ থেকেই জন্ম নেয় ফিরাউনী ‘তুগইয়ান’ বা রবের বিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। তাই খাওয়া-দাওয়ায় বা ভোগে পরিমিতিবোধ (তাকওয়া) হলো মানুষের ভেতরকার ‘বাড়াবাড়ি’ দমনের প্রথম ও প্রধান ধাপ।

দৃষ্টান্ত-9: ‘ইসরফ’-এর চূড়ান্ত পরিণতি: ফিরাউনের ‘মুসরিফীন’ উপাধি:

কুরআনের ভাষায় যারা ‘ইসরফ’ (বাড়াবাড়ি) করে, তাদেরকে ‘মুসরিফীন’ বলা হয়।মানুষ যখন তার ক্ষমতা, অহংকার এবং ঔদ্ধত্যের সীমারেখা পার করে ফেলে, তখন সেই স্বৈরাচারী রূপটিও ‘ইসরফ’-এরই একটি চরম পর্যায়।  সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং অনুধ্যানের বিষয় হলো—আমরা সাধারণত ‘ইসরফ’ বলতে কেবল টাকা-পয়সা বা খাবার অপচয় করাকে বুঝি। কিন্তু কুরআন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্বৈরাচারী, অহংকারী ও নিজকে রবের দাবিদার মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জালিম  ফিরাউনকেও এই একই শব্দে অর্থাৎ ‘মুসরিফীন’ (সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত) বলে আখ্যায়িত করেছে!  অর্থাৎ ফিরাউনের চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আল্লাহ তাকে সরাসরি ‘মুসরিফীন’-এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

"আর নিশ্চয়ই ফিরাউন জমিনে চরম অহংকারী (স্বৈরাচারী) ছিল এবং নিশ্চয়ই সে ছিল সীমালঙ্ঘনকারীদের (মুসরিফীন) অন্তর্ভুক্ত।" (সূরা ইউনুস: ১০:৮৩)

একইভাবে সূরা আদ-দুখানে বনী ইসরাইলকে ফিরাউনের অপমানজনক শাস্তি থেকে উদ্ধার করার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ বলেন:

"(আমি তাদেরকে উদ্ধার করেছি) ফিরাউনের হাত থেকে; নিশ্চয়ই সে ছিল চরম অহংকারী এবং সীমালঙ্ঘনকারীদের (মুসরিফীন) অন্তর্ভুক্ত।" (সূরা আদ-দুখান: ৪৪:৩১)

অনুধ্যান (Tadabbur):

ফিরাউনকে কেন ‘মুসরিফীন’ বলা হলো? এর মাঝে একটি ভয়ংকর মনস্তাত্ত্বিক সূত্র লুকিয়ে আছে। প্রবন্ধের শুরুতেই একটি কথা ছিল— "যে ব্যক্তি নিজের ভেতরের ‘ইসরফ’ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে শেষ পর্যন্ত সমাজের বুকে ‘তুগইয়ান’ বা স্বৈরাচারীতে পরিণত হয়।" ফিরাউন ঠিক এই কাজটিই করেছিল। সে তার নফস, ক্ষমতা ও অহংকারের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ (মিজান) রাখেনি। সে রবের দেওয়া সীমানা (হুদুদুল্লাহ) তো ভেঙেছিলই, এমনকি নিজেকে ‘রব’ দাবি করে অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় ‘ইসরফ’ বা বাড়াবাড়ি করে বসেছিল।

অর্থাৎ, আজ যে ব্যক্তি ছোট ছোট অবাধ্যতা, অপচয় বা প্রবৃত্তির দাসত্বের মাধ্যমে ‘মুসরিফ’ হয়, কাল তার ভেতরেই ফিরাউনের মতো ‘তুগইয়ান’ বা চরম অহংকারের বীজ ডালপালা মেলতে শুরু করে।


‘ইসরফ’ (বাড়াবাড়ি) থেকে ফিরে আসার ঐশী সান্ত্বনা:

মানুষ যখন নফসের ধোঁকায় পড়ে নিজের ওপর চরম ‘ইসরফ’ বা বাড়াবাড়ি করে ফেলে এবং অপরাধবোধে হতাশায় নিমজ্জিত হয়, শয়তান তখন তাকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করতে চায়। ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পরম মমতায় তাকে ফিরে আসার আহ্বান জানান। কুরআনের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক আয়াতটিতে আল্লাহ এই ‘ইসরফ’ শব্দটিই ব্যবহার করে বান্দাকে বুকে টেনে নিয়েছেন:

"বলুন! ‘হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি (ইসরফ) করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’" (সূরা আয-যুমার: ৩৯:৫৩)

অর্থাৎ, এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ‘ইসরফ’ থেকে মুক্তির প্রথম ধাপই হলো রবের রহমতের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করা এবং ক্ষমা চাওয়া—যা সূরা আলে ইমরানের ১৪৭ নং আয়াতের মাধ্যমে চমৎকারভাবে প্রমাণিত।

তবে শর্ত প্রযোজ্য: ক্ষমার পেছনের ‘Action Plan’:

সাধারণত অনেকেই সূরা যুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতটি (যেখানে আল্লাহ সব পাপ ক্ষমার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন) পড়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগেন, কিন্তু এর পেছনের শর্ত বা ‘Action Plan’-এর দিকে খেয়াল করেন না।

ক্ষমা প্রাপ্তির এই প্রতিশ্রুতির সাথে একটি সুনির্দিষ্ট শর্ত যুক্ত রয়েছে—বান্দাকে অবশ্যই রবের কাছে পূর্ণাঙ্গ সমর্পণ বা আত্মসমর্পণ করতে হবে। আর আল্লাহর কিতাব অনুসরণ ব্যতিরেকে এই সমর্পণ কখনোই বাস্তব রূপ লাভ করে না। আল্লাহ বান্দাকে তাঁর বিশেষ রহমত ও অনুগ্রহ দান করবেন এবং সিরাতুল মুস্তাকীমের পথে অবিচল রাখবেন তখনই, যদি সে আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব বা নূরকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে। মূলত, সত্যসহ নাযিলকৃত এই ঐশী কিতাবকে আঁকড়ে ধরা মানে স্বয়ং আল্লাহকেই আঁকড়ে ধরা।

সংক্ষেপে, আল্লাহর রহমত ও বিশেষ অনুগ্রহ (ফাদল) পাওয়ার বাস্তব ও মূর্ত রূপ হলো তাঁর নাযিলকৃত কিতাব (কুরআন) বা ঐশী সংবিধানকে শক্তভাবে ধারণ করা। এর সুস্পষ্ট প্রমাণসমূহ নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. ফিরে আসার করার উপায়? (সূরা যুমার ৩৯:৫৩-৫৫) 

সূরা যুমারের যে তিনটি আয়াতের ক্রম (sequence) উল্লেখ করা হয়েছে, তা মূলত একজন অপরাধী বা সীমালঙ্ঘনকারী বান্দার রবের কাছে ফিরে আসার একটি ‘পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ’। এখানে আল্লাহ তিনটি ধাপে বান্দাকে তাঁর রহমতের চাদরে আবৃত করেছেন:

ধাপ-১: ক্ষমার সুসংবাদ ও হতাশা মুক্তি (আয়াত ৩৯:৫৩): আল্লাহ বলছেন, "নিরাশ হয়ো না, আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করে দেবেন।" এটি হলো মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি (Psychological relief)।

ধাপ-২: সমর্পণ বা আত্মসমর্পণ (আয়াত 
৩৯:৫৪):
"তোমরা তোমাদের রবের অভিমুখী হও (আনীবূ) এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করো (আসলিমূ)...।" অর্থাৎ, ক্ষমা পাওয়ার জন্য অহংকার ছেড়ে রবের দিকে মানসিক ও শারীরিকভাবে ফিরে আসতে হবে।

ধাপ-৩: বাস্তব কর্মপন্থা বা ইত্তেবা (আয়াত ৩৯:৫৫): "আর তোমরা অনুসরণ করো (ইত্তাবিঊ) তোমাদের রবের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত উত্তম বিষয়ের (কুরআনের)...।"

বিশ্লেষণ: কেবল মুখে "আমি আত্মসমর্পণ করলাম" বলাই শেষ কথা নয়। আত্মসমর্পণের প্রমাণ হলো—আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব বা হিদায়াতকে অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ (ইত্তেবা) করা। কিতাবের অনুসরণ ছাড়া ‘ইসলাম’ বা ‘আত্মসমর্পণ’ কেবলই একটি অন্তঃসারশূন্য দাবিতে পরিণত হয়।

২. রহমত প্রাপ্তির শর্ত: নূরকে আঁকড়ে ধরা (সূরা নিসা ৪:১৭৪-১৭৫)

সূরা নিসার আয়াত দুটির সংযোগ কুরআনের রূপক (Metaphorical) ভাষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক চমৎকার উদাহরণ।

আয়াত ১৭৪: আল্লাহ বলছেন, "হে মানুষ! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ (বুরহান) এসেছে এবং আমি তোমাদের প্রতি এক স্পষ্ট আলো (নূরুম মুবীন) নাযিল করেছি।" (এখানে ‘প্রমাণ’ ও ‘আলো’ বলতে কুরআন ও রাসূল (সা.)-কে বোঝানো হয়েছে)।

আয়াত ১৭৫: "অতঃপর যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তাঁকে (বা তাঁর রজ্জুকে) দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছে (ওয়া‘তাসামূ বিহী), তিনি তাদেরকে তাঁর নিজস্ব রহমত ও অনুগ্রহে প্রবেশ করাবেন এবং তাঁর দিকে যাওয়ার সরল পথ (সিরাতুল মুস্তাকীম) দেখাবেন।"

বিশ্লেষণ: আল্লাহ নিরাকার এবং আমাদের দৃষ্টির অগোচরে। তাহলে একজন মানুষ কীভাবে আল্লাহকে "আঁকড়ে ধরবে" (ই‘তিসাম)? এর উত্তর হলো—আল্লাহকে আঁকড়ে ধরার একমাত্র দৃশ্যমান ও বাস্তব উপায় হলো তাঁর নাযিলকৃত "নূর" বা কিতাবকে আঁকড়ে ধরা। যে কিতাব ছেড়ে দিল, সে মূলত আল্লাহকেই ছেড়ে দিল।

৩. আল্লাহকে চূড়ান্ত ফয়সালাকারী মানা মানেই কিতাবকে মানা (সূরা আন-আম ৬:১১৪)

এটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং গভীর একটি পর্যবেক্ষণ। সূরা আন-আমের ১১৪ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন:

أَفَغَيْرَ اللَّهِ أَبْتَغِي حَكَمًا وَهُوَ الَّذِي أَنزَلَ إِلَيْكُمُ الْكِتَابَ مُفَصَّلًا
অর্থ: "তবে কি আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বিচারক (ফয়সালাকারী) খুঁজব? অথচ তিনিই তো তোমাদের কাছে বিস্তারিত কিতাব নাযিল করেছেন..."

বিশ্লেষণ: এই আয়াতের প্রথমাংশ ও দ্বিতীয়াংশের মাঝে এক অভাবনীয় যৌক্তিক সম্পর্ক (logical equivalence) রয়েছে। আল্লাহ প্রশ্ন করছেন— "আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে বিধান বা ফয়সালা চাইব?" এর পরপরই তিনি বলছেন না যে, "আল্লাহ সর্বশক্তিমান বা তিনি আসমানে আছেন"; বরং তিনি বলছেন— "তিনিই তো বিস্তারিত কিতাব নাযিল করেছেন।"

অর্থাৎ, আল্লাহর ফয়সালা বা হুকুম মানার একমাত্র অর্থই হলো এই ‘মুফাসসাল’ (বিস্তারিত) কিতাবের ফয়সালা মানা। কিতাবের বাইরে আল্লাহর ফয়সালা খোঁজার কোনো সুযোগ নেই। একমাত্র নাযিলকৃত কিতাবের ফয়সালা মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই আল্লাহকে না ছাড়ার বা তাঁকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার প্রকৃত প্রমাণ মেলে।


4. পরিপূরক শক্তিশালী দলিল:

এই সঠিক বুঝকে আরও মজবুত করার জন্য কুরআনের আরও দুটি শক্তিশালী কনসেপ্ট বা আয়াত যুক্ত করা যায়:

ক. আল্লাহর ‘রজ্জু’ (রশি) মানেই তাঁর কিতাব: সূরা আলে ইমরানে আল্লাহ বলেছেন:

"আর তোমরা সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জুকে (হাবলাল্লাহ) শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।" (৩:১০৩)

সুতরাং, আল্লাহকে আঁকড়ে ধরা বা তাঁর রহমতে প্রবেশের শর্তই হলো কিতাবকে আঁকড়ে ধরা।

খ. কিতাব অনুসরণের সরাসরি নির্দেশ: সূরা আল-আ‘রাফে আল্লাহ এই চিন্তাধারাটিকে একটি সরাসরি আদেশের মাধ্যমে সিলমোহর করে দিয়েছেন:

"তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, তোমরা তার অনুসরণ করো (ইত্তেবা করো); এবং তাঁকে (আল্লাহকে) ছাড়া অন্য কোনো অভিভাবকের অনুসরণ করো না।" (৭:৩)

লক্ষ্য করুন, এখানেও "আল্লাহকে ছাড়া অন্য অভিভাবক না মানা"-কে সরাসরি "নাযিলকৃত কিতাবের অনুসরণ"-এর সমার্থক হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে।


নিজের নফসের ওপর বাড়াবাড়ি (ইসরফ ও জুলুম) থেকে সুরক্ষার অনুধ্যান:

মানুষ প্রায়শই নিজের অজান্তে, আবেগের বশবর্তী হয়ে বা প্রবৃত্তির তাড়নায় নিজের ওপর বাড়াবাড়ি করে ফেলে। সূরা আলে ইমরানের নজম (আয়াত বিন্যাস) বিশ্লেষণ করলে এক অপূর্ব চিত্র ফুটে ওঠে। উহুদ যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যখন মুমিনদের একাংশ নির্দেশ পালনে সামান্য বিচ্যুতি ঘটিয়েছিল, তখন আল্লাহ পূর্ববর্তী নবীদের অনুসারীদের একটি আদর্শ দুআ তুলে ধরেন। তারা বিপদে পড়ে নিজেদের বীরত্বের অহংকার করেনি, বরং নিজেদের কাজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ‘ইসরফ’ বা বাড়াবাড়ির জন্য ক্ষমা চেয়েছে।

নিজের বাড়াবাড়ি ও ত্রুটি থেকে ক্ষমার দুআ:

 رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
রব্বানাগফির লানা যুনূবানা ওয়া ইসরফানা ফী আমরিনা ওয়া ছাব্বিত আক্বদামানা ওয়ানসুরনা ‘আলাল ক্বাওমিল কাফিরীন।

হে আমাদের রব! আমাদের পাপসমূহ এবং আমাদের কাজের মধ্যকার বাড়াবাড়িগুলো (ইসরফ) ক্ষমা করে দিন, আমাদের পা সুদৃঢ় রাখুন এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন। (৩:১৪৭)

একইভাবে, ইউনুস (সালামুন আলাইহে) যখন সাময়িকভাবে অধৈর্য হয়ে তাঁর জাতির প্রতি রাগ করে চলে গিয়েছিলেন, তখন তিনি মাছের পেটে বসে উপলব্ধি করেন যে, এটি তাঁর নিজের ওপর একটি জুলুম বা বাড়াবাড়ি ছিল। এই অনুধাবন থেকে তিনি যে তাসবিহ পাঠ করেছিলেন, তা বিপদে পড়া যেকোনো মানুষের জন্য নিজের নফসের ওপর করা বাড়াবাড়ি থেকে মুক্তির এক শাশ্বত আশ্রয়।

নিজের জুলুম বা বাড়াবাড়ি স্বীকার করে মুক্তির তাসবিহ:
لَّا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায যালিমীন।

আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র মহান! নিশ্চয়ই আমি ছিলাম জালিমদের (নিজের ওপর বাড়াবাড়িকারীদের) অন্তর্ভুক্ত।" (২১:৮৭)

অন্যের বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন (তুগইয়ান) থেকে সুরক্ষার অনুধ্যান:

কখনো কখনো বান্দা নিজে সংযত থাকলেও, অন্য কোনো ক্ষমতাধর বা জালিম ব্যক্তি তার ওপর বাড়াবাড়ি বা জুলুম চাপিয়ে দেয়। কুরআনে এর সবচেয়ে বড় প্রতিচ্ছবি হলো ফিরাউন। আল্লাহ যখন মূসা (সালামুন আলাইহে) ও হারূন (সালামুন আলাইহে)-কে ফিরাউনের কাছে পাঠালেন, তখন তাঁরা ফিরাউনের ‘তুগইয়ান’ (অবাধ্যতা) এবং ‘ফারাতা’ (তাড়াহুড়ো করে বাড়াবাড়ি বা আগ্রাসন চালানো)-এর আশঙ্কা করেছিলেন।

“তারা বলল, ‘হে আমাদের রব! আমরা আশঙ্কা করছি যে, সে আমাদের ওপর বাড়াবাড়ি করবে (আঁই ইয়াফরুত্বা) অথবা সে সীমালঙ্ঘন করবে (আঁই ইয়াত্বগা)।’” (২০:৪৫)

আল্লাহ তাদের এই ভয়ের জবাবে যে আধ্যাত্মিক নির্ভরতা দিয়েছিলেন, তা যেকোনো মুমিনের জন্য অন্যের বাড়াবাড়ির মুখে চরম শক্তির উৎস: “তোমরা ভয় কোরো না, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সাথে আছি, আমি শুনি এবং আমি দেখি।” (২০:৪৬)।

জালিম সম্প্রদায়ের এই ধরনের বাড়াবাড়ি ও ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য কুরআনে অত্যন্ত শক্তিশালী কিছু আশ্রয় প্রার্থনার দুআ রয়েছে।

জালিমের আগ্রাসন ও ফিতনা থেকে মুক্তির দুআ:

 رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ ۝ وَنَجِّنَا بِرَحْمَتِكَ مِنَ الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
রব্বানা লা তাজ‘আলনা ফিতনাতাল লিলক্বাওমিয যালিমীন। ওয়া নাজ্জিনা বিরাহমাতিকা মিনাল ক্বাওমিল কাফিরীন।

হে আমাদের রব! আমাদেরকে জালিম সম্প্রদায়ের ফিতনার (নির্যাতনের) পাত্র বানাবেন না। এবং আপনার অনুগ্রহে আমাদেরকে কাফির সম্প্রদায়ের হাত থেকে রক্ষা করুন।" (১০:৮৫-৮৬)

বাড়াবাড়িকারী সমাজ থেকে হিজরত বা মুক্তির দুআ:

সূরা নিসায় আল্লাহ সেই সব দুর্বল নারী, পুরুষ ও শিশুদের চিত্র তুলে ধরেছেন, যাদের ওপর সমাজ চরম বাড়াবাড়ি করছিল। তাদের আর্তনাদ আল্লাহ দুআ হিসেবে কুরআনে গেঁথে দিয়েছেন:

 رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَٰذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ وَلِيًّا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ نَصِيرًا
রব্বানা আখরিজনা মিন হাযিহিল ক্বারইয়াতিয যালিমি আহলুহা, ওয়াজ‘আল লানা মিল লাদুনকা ওয়ালিয়্যাও ওয়াজ‘আল লানা মিল লাদুনকা নাসীরা।

হে আমাদের রব! আমাদেরকে এই জনপদ থেকে বের করুন, যার অধিবাসীরা জালিম। আর আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন অভিভাবক নির্ধারণ করে দিন এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দিন।" (৪:৭৫)

জালিমের কর্ম ও বাড়াবাড়ি থেকে ব্যক্তি-নিরাপত্তার দুআ:

ফিরাউনের স্ত্রীর (আসিয়া) দুআটি কুরআনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যেখানে তিনি কেবল জালিম ব্যক্তির থেকেই নয়, বরং তার ‘عمل’ (অপকর্ম ও বাড়াবাড়ি) থেকেও আল্লাহর কাছে বিচ্ছিন্নতা ও আশ্রয় চেয়েছেন।

رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِن فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
রব্বিবনি লী ‘ইনদাকা বাইতান ফিল জান্নাতি ওয়া নাজ্জিনী মিন ফির‘আউনা ওয়া ‘আমালিহী ওয়া নাজ্জিনী মিনাল ক্বাওমিয যালিমীন।

হে আমার রব! আপনার কাছে জান্নাতে আমার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করুন এবং আমাকে ফিরাউন ও তার কর্ম (বাড়াবাড়ি) থেকে রক্ষা করুন, আর আমাকে জালিম সম্প্রদায় থেকে নাজাত দিন।" (৬৬:১১)

জালিমের চক্রান্ত ও বাড়াবাড়ি থেকে চূড়ান্ত সুরক্ষার ঐশী ঢাল (Tawfid / তাফউইদ):

যখন জালিমের ‘তুগইয়ান’ চরম আকার ধারণ করে এবং চারদিক থেকে ষড়যন্ত্র (মকর / مكر) ঘিরে ধরে, তখন মুমিনের চূড়ান্ত হাতিয়ার হলো নিজের সমস্ত বিষয় আল্লাহর কাছে সমর্পণ (তাফউইদ) করা। ফিরাউনের দরবারে একজন ঈমানদার ব্যক্তি (যিনি ঈমান গোপন রেখেছিলেন) ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন। এটি সূরা মুমিনের (গাফির) এক অবিস্মরণীয় আয়াত:

وَأُفَوِّضُ أَمْرِي إِلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ بَصِيرٌ بِالْعِبَادِ

অউফাও ওয়িদ্বু আ¤্রীয় ইলা ইল্লালাহু; ইন্নাল্লাহা বাছীরুম বিল ইবাদ।   "আমি আমার সকল বিষয় আল্লাহর কাছে সমর্পণ (তাফউইদ) করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ বান্দাদের প্রতি সম্যক দৃষ্টি রাখেন।" (সূরা গাফির: ৪০:৪৪)

অনুধ্যান: যখন মুমিন তার নিজের পক্ষের সমস্ত বাড়াবাড়ি ত্যাগ করে শূন্য হাতে নিজেকে রবের ফয়সালার ওপর ছেড়ে দেয় (তাফউইদ), তখন রব নিজেই জালিমের ষড়যন্ত্র ও সীমালঙ্ঘন থেকে তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব নেন।

৬. সালামুন আলা ইবরাহীম-এর দুআ: জালিমের ঔদ্ধত্যের শিকার না হওয়ার বা ‘ফিতনা’ বা পরীক্ষার বস্তু না হওয়ার প্রার্থনা:

 তিনি প্রার্থনা করেছিলেন যেন জালিমদের বাড়াবাড়ি এতদূর না পৌঁছায় যে, তারা মুমিনদের ওপর নির্যাতন করে নিজেদেরকে সঠিক ভাবতে শুরু করে।

رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلَّذِينَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

রব্বানা লা তাজ‘আলনা ফিতনাতাল লিল্লাযীনা কাফারূ ওয়াগফির লানা রব্বানা, ইন্নাকা আনতাল ‘আযীযুল হাকীম।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদেরকে কাফিরদের জন্য ফিতনার (পরীক্ষা বা নির্যাতনের) পাত্র বানাবেন না। হে আমাদের রব! আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" (সূরা আল-মুমতাহানাহ: ৫)

رَبَّنَا ظَلَمْنَآ أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ ٱلْخَـٰسِرِينَ

রব্বানা-জোয়ালাম্না- আন্ফুসানা- অইল্লাম্ তার্গ্ফিলানা-অর্তাহাম্না-লানাকূনান্না মিনাল্ খা-সিরীন্।  ইন্নাহূ হুঅত তাওঅ-বুর রাহীম্।   

অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা আমাদের নিজেদের উপর জুলুম করেছি। আর যদি না আপনি আমাদের জন্য ক্ষমা করেন এবং আমাদের অনুগ্রহ করেন, নিশ্চয়ই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব-আল কুরআন ৭:২৩

إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ

ইন্নাহূ হুঅত তাওঅ-বুর রাহীম্। অর্থ: নিশ্চয়ই তিনি, তিনিই তওবা কবুলকারী, দয়ালু- আল কুরআন ২:৩৭  

[ঝঁৎবষু, ঐব রং ঃযব ধপপবঢ়ঃবৎ ড়ভ ৎবঢ়বহঃধহপব, সড়ংঃ গবৎপরভঁষ-২:৩৭]

رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِيۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
রব্বি ইন্নী জোয়ালাম্তু নাফ্সী ফার্গ্ফিল্;ী ইন্নাহূ হুওয়াল্ গফূর্রু রহীম্।   
অর্থ: হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমি আমার নিজের প্রতি জুলুম করেছি। অতএব, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, নিশ্চয়ই তিনি, তিনিই ক্ষমাশীল, দয়ালু- আল কুরআন ২৮:১৬

যৌক্তিক পূর্ণতা:

কুরআনের এই সার্বিক বিশ্লেষণ থেকে একটি সুনিশ্চিত যৌক্তিক ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতা পাওয়া যায়। ‘বাড়াবাড়ি’—তা নিজের ভেতরের অবাধ্যতা (ইসরফ) হোক বা বাইরের কোনো শক্তির আগ্রাসন (তুগইয়ান) হোক—উভয়ের মূল কারণ হলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখাকে ভুলে যাওয়া।

কুরআন আমাদের শিক্ষা দেয় যে, অন্যের বাড়াবাড়ি থেকে আল্লাহর সাহায্য তখনই পাওয়া যায়, যখন মানুষ সর্বপ্রথম নিজের ভেতরের ইসরফ বা বাড়াবাড়ির জন্য রবের কাছে আত্মসমর্পণ করে ও ক্ষমা চায় (যেমনটি ৩:১৪৭ আয়াতে দেখা যায়)। কারণ, যে হৃদয় নিজের ত্রুটি স্বীকার করে রবের সামনে নত হয়, মহাবিশ্বের রব সেই হৃদয়কে যেকোনো ফিরাউনী শক্তির ‘তুগইয়ান’ বা সীমালঙ্ঘন থেকে রক্ষা করার জন্য অদৃশ্য ঢাল হয়ে যান। সুতরাং, বাড়াবাড়ি থেকে সুরক্ষার মূল চাবিকাঠি হলো—আল্লাহর সীমারেখার (হুদুদুল্লাহ) ভেতরে নিজেকে সমর্পণ করা এবং যাবতীয় সংকটময় মুহূর্তে পরম নির্ভরতায় কেবল তাঁরই শেখানো শব্দমালায় তাঁরই কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা।

রব্বানা ওয়া তাকাব্বাল দুুআ। আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন!

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post