ভোট কেন দেব? কাকে দেব? না কি বিরত থাকব? ‘মন্দের ভালো’ বা ‘কম খারাপ’—কী গ্রহণযোগ্য হতে পারে? বাস্তবতার আলোকে নাযিলকৃত নাবা-নিউজ (Vote & Election).

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম

➡️ মন্দের ভালো’ বা কম খারাপ: বড় ক্ষতি ঠেকাতে ছোট ক্ষতি গ্রহণ -আল-কোরআনের ‘ওজর’ ও ‘প্রয়োজনের’ অকাট্য মূলনীতি:

➡️ আদর্শ নেতৃত্বের অভাবে ‘মন্দের ভালো’ কি গ্রহণযোগ্য? কখন এবং কেন এটি বেছে নেওয়া কুরআনি দায়িত্ব?

➡️ বৃহত্তর ফাসাদ বনাম ‘মন্দের ভালো’: আল-কোরআনের আলোকে সংকটকালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানদণ্ড:

কোরআন আমাদের 'আদর্শিক পূর্ণতা'র পাশাপাশি 'বাস্তবসম্মত সমাধান' (Pragmatic approach) শিক্ষা দেয়। যখন আমাদের সামনে একদম নিখুঁত কোনো বিকল্প থাকে না, তখন 'মন্দের ভালো' বা 'তুলনামূলক কম ক্ষতিকর' পক্ষকে বেছে নেওয়ার শক্তিশালী (Strong) ও অকাট্য দলিল কোরআনে বিদ্যমান।

যেকোন নির্বাচন- ইলেকশন- সিলেকশন  বিষয়ের প্রেক্ষাপটে একজন সচেতন নাযিলকৃত অহীর অনুশীলনকারী তথা  আল কোরআন অনুসারী হিসেবে  এই জিজ্ঞাসা অত্যন্ত সময়োপযোগী। যখন রাজনৈতিক ময়দানে শতভাগ 'মুত্তাকি' বা 'কোরআনিক মানদণ্ডের' নেতা খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন আল-কোরআন আমাদের 'নিষ্ক্রিয়' থাকতে বলেনি। বরং ওহীর অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য (Internal Evidence) এবং ভাষাতাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে 'ক্ষতি লাঘব' (Harm Reduction) ও 'মন্দের ভালো'কে বেছে নেওয়ার সুষ্পষ্ট দিক-নির্দেশনা দিয়েছে।

১. ভোট বা সমর্থন একটি ‘সাক্ষ্য’ (Shahadat): নীরবতা কি সমাধান?

কোরআনের ভাষ্যমতে, নেতৃত্ব চয়ন বা ভোট প্রদান কেবল একটি রাজনৈতিক অধিকার নয়, বরং এটি একটি ‘সাক্ষ্য’ (Testimony)। জেনেশুনে যোগ্যতর বা কম মন্দ ব্যক্তিকে ভোট না দিয়ে নীরব থাকা মানে হলো সত্য সাক্ষ্য গোপন করা।

প্রমাণিক আয়াত: আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না; যে ব্যক্তি তা গোপন করে, তার অন্তর অবশ্যই পাপী। (সূরা আল-বাকারা, ২:২৮৩)

যদি আপনি ভোটদান থেকে বিরত থাকেন, তবে আপনার নীরবতার সুযোগে একজন চরম জালেম বা ফাসাদ সৃষ্টিকারী ক্ষমতায় আসতে পারে। এমতাবস্থায় ২:২৮৩ আয়াত অনুযায়ী, সত্যের বা তুলনামূলক কল্যাণের পক্ষে সাক্ষ্য না দেওয়া আপনার অন্তরকে পাপে কলুষিত করতে পারে। সুতরাং, বিদ্যমান বিকল্পগুলোর মধ্যে 'আহসান' বা উত্তমকে খুঁজে নেওয়া একটি আমানত।


2. নিরবতার পরিণাম: লানত ও অভিশাপের অকাট্য দলিল:

আল্লাহ তায়ালা বনী ইসরাঈলকে পরীক্ষার জন্য শনিবার মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছিলেন। কিন্তু তারা কৌশল করে আইন লঙ্ঘন করতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে পুরো সমাজ তিনটি স্পষ্ট গ্রুপে বা শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে যায়।

প্রমাণিক আয়াত: আর যখন তাদের মধ্য থেকে একদল (নিরপেক্ষ দল) বলল: 'তোমরা কেন এমন এক সম্প্রদায়কে উপদেশ দিচ্ছ যাদের আল্লাহ ধ্বংস করবেন অথবা কঠোর আজাব দেবেন?' তারা (ন্যায়পন্থীরা) বলল: 'তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ওজর পেশ করার জন্য এবং যাতে তারা বেঁচে থাকে'। (সূরা আল-আরাফ, ৭:১৬৪)

তিনটি দলের পরিচিতি:

প্রথম দল (অবাধ্য গোষ্ঠী): যারা সরাসরি আল্লাহর আইন অমান্য করে শনিবার মাছ শিকার করত। (আজকের প্রেক্ষাপটে যারা সরাসরি ফাসাদ বা জুলুমের সাথে যুক্ত)।

দ্বিতীয় দল (সক্রিয় মুমিন): যারা নিজেরা সৎ ছিল এবং অন্যদেরও মন্দ কাজ থেকে বাধা দিত। তারা নীরব থাকাকে ইমানের পরিপন্থী মনে করত।

তৃতীয় দল (নিরপেক্ষ বা নীরব গোষ্ঠী): যারা নিজেরা হয়তো মাছ ধরত না, কিন্তু যারা বাধা দিত তাদের উপহাস করত। তারা বলত— 'জালেমদের বুঝিয়ে লাভ নেই, কেন ফালতু সময় নষ্ট করছ?' (আজকের প্রেক্ষাপটে যারা ভোটদান বা ন্যায়ের সমর্থন থেকে বিরত থেকে নীরব থাকে)।


বনী ইসরাঈল কেন আল্লাহর অভিশপ্ত হয়েছিল? আল-কোরআনের শব্দশৈলী স্পষ্টভাবে বলছে যে, তাদের লানত পাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাদের এই 'নিরবতা'।

প্রমাণিক আয়াত: বনী ইসরাঈলের মধ্যে যারা কুফরি করেছিল, তাদের ওপর সালামুন আলা দাউদসালামুন আলা ঈসা ইবনে মারইয়ামের মুখে লানত (অভিশাপ) বর্ষিত হয়েছিল... তারা একে অপরকে সেসব মন্দ কাজ হতে নিষেধ করত না যা তারা করত; তারা যা করত তা কতই না নিকৃষ্ট! (সূরা আল-মায়িদা, ৫:৭৮-৭৯)

এই আয়াতে 'কাফালু' (কুফরি করেছে) শব্দের সাথে 'লা ইয়াতানাহাওনা' (পরস্পরকে বাধা দিত না) শব্দটিকে যুক্ত করা হয়েছে। এর অর্থ হলো—সমাজে অন্যায় হতে দেখেও যারা নিরব থাকে বা যারা বলে 'আমাদের দরকার নেই', কোরআনের পরিভাষায় তাদের এই আচরণ কুফরির পর্যায়ভুক্ত এবং লানতের কারণ।


৩. উদ্ধার ও শাস্তির কুরআনি বিভাজন: আসহাবে সাবতের ঘটনার চূড়ান্ত ফয়সালা যখন এলো, তখন আল্লাহ তায়ালা কাদের রক্ষা করলেন এবং কাদের আজাব দিলেন, তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বর্ণনা করেছেন।

প্রমাণিক আয়াত: অতঃপর তারা যখন সেই উপদেশ ভুলে গেল যা তাদের দেওয়া হয়েছিল, তখন আমি— যারা মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করত (সক্রিয় দল) তাদের রক্ষা করলাম; আর যারা জুলুম করেছিল তাদের কঠোর আজাব দ্বারা পাকড়াও করলাম। (সূরা আল-আরাফ, ৭:১৬৫)

১৬৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে কেবল 'যারা মন্দ থেকে নিষেধ করত' (আনজাইনাল্লাজিনা ইয়ানহাওনা আনিস সু-ই) তাদের বাঁচানোর কথা বলেছেন। এখানে নীরব থাকা তৃতীয় দলটিকে বাঁচানোর কোনো উল্লেখ নেই। এই তৃতীয় দলটি হয় জালেমদের সাথে আজাবে ধ্বংস হয়েছে, অথবা তারাও শাস্তির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কারণ, 'যুলুম' কেবল অন্যায় করা নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকাটাও একটি 'যুলুম'।

শাস্তির ধরণ: অতঃপর আমি তাদের বললাম: 'তোমরা ঘৃণিত বানর হয়ে যাও'। (আয়াত ২:৬৫, ৭:১৬৬)

তাদাব্বুর: এই শাস্তিটি ছিল তাদের মানবিক মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার প্রতীক। যারা অন্যায়ের মুখে পশুর মতো নির্বাক থাকে এবং কেবল নিজের উদর পূর্তিতে ব্যস্ত থাকে (মাছ ধরা বা নিজের সুবিধা দেখা), আল্লাহ তাদের পশুরূপেই সাব্যস্ত করেছেন।

❖ যা বুঝতে চায় না বা উপলব্ধি করেনা তারা পশুর চাইতেও খারাপ-দ্র: আয়াত ৭:১৭৯।


৪. বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘নিষ্ক্রিয় নীরবতা’র ভয়াবহতা:

ভোট বা জনমতের ক্ষেত্রে যখন আমাদের সামনে দুটি পক্ষ থাকে, তখন 'চুপ থাকা' বা 'নিরপেক্ষ' থাকা মূলত আসহাবে সাবতের সেই তৃতীয় দলের চরিত্রের প্রতিফলন।

যৌক্তিক ক্রমবিকাশ: যদি আপনি মনে করেন— 'সব পক্ষই খারাপ, তাই আমি চুপ থাকব', তবে ৫:৭৯ আয়াত অনুযায়ী আপনি 'অন্যায় থেকে নিষেধ না করার' দায়ে অভিযুক্ত হতে পারেন। আপনার এই নীরবতার সুযোগে যদি বড় কোনো জালেম ক্ষমতায় এসে ফাসাদ সৃষ্টি করে, তবে তার দায় আপনার ওপরও বর্তাবে। কারণ আল্লাহ কেবল তাদেরই বাঁচান যারা 'মন্দ থেকে নিষেধ করার' (ভোট বা সমর্থনের মাধ্যমে হলেও) সক্রিয় চেষ্টা করে।


আয়াত ৭:১৬৫: মুক্তি কেবল তাদের জন্য যারা মন্দের প্রতিবাদ করে।

❒ আয়াত ৫:৭৯: অভিশাপ তাদের জন্য যারা অন্যায়ের মুখে নীরব দর্শক সেজে থাকে।

❒ আয়াত ২:৬৫: নীরবতা ও কৌশলী অবাধ্যতা মানুষের আত্মিক মর্যাদাকে পশুর স্তরে নামিয়ে দেয়।

সারকথা:

বনী ইসরাঈলের সেই ঘটনার ওহী-সাক্ষ্য আমাদের বর্তমান নির্বাচনের জন্য বড় নসিহত। নীরব থাকা বা নিরপেক্ষতার ভান করা কোনো নিরাপদ পথ নয়। হকের সংকটকালে নীরব থাকা মানে হলো জালেমকে সহায়তা করা। সুতরাং, সাধ্যের মধ্যে থাকা তুলনামূলক উত্তম বা কম খারাপ (আহসান/আক্বরাব) পক্ষকে সমর্থন বা ভোট দিয়ে নিজের ‘ওজর’ (৭:১৬৪) পেশ করাই একজন কোরআন অনুসারীর প্রকৃত পরিচয়।

আল্লাহ আমাদের আসহাবে সাবতের সেই অভিশপ্ত নীরবতা থেকে রক্ষা করুন এবং হকের পক্ষে সক্রিয় হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।

5. ‘মন্দের ভালো’ চয়নের অকাট্য দলিল: ‘নিকটতম’ (Akrab) আদর্শ:

যখন শতভাগ কোরআনিক পরিবেশ থাকে না, তখন ওহী আমাদের হকের ‘নিকটতম’ (closer to truth) পক্ষকে বেছে নিতে উৎসাহিত করে। এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ সূরা আর-রূমের প্রথম দিকের আয়াতসমূহ।

প্রমাণিক আয়াত: "রোমানরা পরাজিত হয়েছে নিকটবর্তী ভূখণ্ডে... সেদিন মুমিনগণ আল্লাহর সাহায্যে (নাসরিল্লাহ) আনন্দিত হবে।" (সূরা আর-রূম, ৩০:২-৫)

আল-কুরআনের সূরা আর-রুমের ৭ ও ৮ নম্বর আয়াতে রোমানদের প্রতিপক্ষকে যেভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহ বলেন: “তারা দুনিয়ার জীবনের বাহ্যিক দিকটা জানে এবং পরকাল সম্পর্কে তারা গাফেল।” (৩০:৭-৮)।

✧ অনুধাবন: এখানে প্রতিপক্ষকে ‘গাফেল’ (Heedless) এবং কেবল ‘বস্তুবাদী’ (Life of this world) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর বিপরীতে ‘রুম’ যেহেতু আহলুল কিতাব ছিল, তাদের কাছে অন্তত ওহীর অবশিষ্টাংশ এবং পরকালের ধারণা বিদ্যমান ছিল।

✧ আদল বা ভারসাম্য: যদিও রোমানরা পূর্ণাঙ্গ ‘মুসলিম’ (সালামুন আলা মুহাম্মদ-এর ওপর নাযিলকৃত শরীয়ত অনুযায়ী) ছিল না, তবুও তারা ওহীর ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত ছিল। আয়াতে ব্যবহৃত ‘বি আদনাল আরদ’ (في أدنى الأرض) শব্দটির ভৌগোলিক অর্থের পাশাপাশি একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে যে, তারা সত্যের পরিমণ্ডলের ‘নিকটবর্তী’ (Adna) ছিল। ফলে, চরম সত্যপ্রত্যাখ্যানকারী বা বস্তুবাদী শক্তির তুলনায় ওহীর আলোধারী (তা সামান্য হলেও) কোনো জাতির বিজয়কে আল্লাহ ‘নাসরুল্লাহ’ বা ‘আল্লাহর সাহায্য’ (৩০:৫) হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে, ওহীর ন্যূনতম উপস্থিতিও চরম জাহেলিয়াতের চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য।

ঈমানি প্রজ্ঞা (Systematic Insight):

এই ঐতিহাসিক ঘটনার কুরআনিক বর্ণনা থেকে মুমিনের জন্য একটি স্থায়ী নীতি (Principle) উদ্ভূত হয়। চরম বাতিল বা জালেম শক্তির বিপরীতে তুলনামূলক কম খারাপ, সত্যের নিকটবর্তী কিংবা মানবিক ও ইনসাফপূর্ণ শক্তির পক্ষ নেওয়া বা তাদের বিজয়ে আনন্দিত হওয়া মুমিনের ঈমানি প্রজ্ঞারই অংশ।

✧ কুরআনি দলিল: আল্লাহ বলেন— “যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে এবং তার মধ্যে যা উত্তম (Ahsanah), তা অনুসরণ করে। আল্লাহ তাদেরকেই হেদায়েত দান করেছেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।” (সূরা আজ-জুমার ৩৯:১৮)।

✧ সিদ্ধান্ত: এখান থেকে প্রমাণিত হয় যে—মুশরিক, নাস্তিক বা নিরঙ্কুশ বস্তুবাদী শক্তির দাপটের চেয়ে যারা অন্তত আস্তিকতায় বিশ্বাসী, ইনসাফ ও মানবাধিকারের কথা বলে এবং ওহীর কোনো না কোনো স্তরের সাথে সম্পর্কিত, তাদের সমর্থন করা কুরআনিক চেতনার পরিপন্থী নয়। বরং এটি সত্যের চূড়ান্ত বিজয়ের পথে একটি কৌশলগত ধাপ, ঠিক যেমনটি মুহাম্মদ সালামুন আলা-এর যুগে রুমের বিজয় ছিল মুমিনদের জন্য একটি ‘আনন্দের সংবাদ’।


6. বৃহত্তর ক্ষতি রোধে ‘সামান্য ক্ষতি’ মেনে নেওয়া (The principle of harm reduction):

সালামুন আলা (বিশেষ জ্ঞানপ্রাপ্ত একজন আবদ)-এর কতৃক নৌকা ছিদ্র করার ঘটনাটি রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক অন্যায়ের বিপরীতে কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের এক অনন্য দলিল।

প্রমাণিক আয়াত: আমি নৌকাটিকে ত্রুটিযুক্ত (আ’য়িবাহা) করতে চাইলাম; কারণ তাদের সামনে (আগে) ছিল এক রাজা, যে প্রতিটি (ভালো) নৌকা জোরপূর্বক দখল করে নিত। (সূরা আল-কাহাফ, ১৮:৭৯)

এখানে দুটি ‘মন্দ’ বা নেতিবাচক বিকল্প ছিল: ১. নৌকাটি আস্ত থাকা (ফলে রাজা সেটি সম্পূর্ণ ছিনিয়ে নিত)। ২. নৌকাটি সামান্য ত্রুটিযুক্ত করা (ফলে রাজার হাত থেকে বেঁচে মালিকানা টিকে থাকা)।

প্রয়োগ: যদি রাষ্ট্রক্ষমতা একজন চরম লুটেরা বা জালেমের হাতে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তাকে প্রতিহত করতে কোনো ‘ত্রুটিপূর্ণ’ কিন্তু ‘তুলনামূলক কম ক্ষতিকর’ প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া এই ১৮:৭৯ নম্বর আয়াতের হিকমতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।


7. ভারসাম্য রক্ষা ও বিপর্যয় রোধে ‘দাফ’ (Check and Balance):

আল্লাহর একটি সুনিপুণ কৌশল হলো একদল মানুষকে অন্যদল দ্বারা প্রতিহত করা, যাতে সমাজে চরম একনায়কতন্ত্র বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়।

প্রমাণিক আয়াত: আর আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে অন্যদল দ্বারা প্রতিহত (দাফ’উ) না করতেন, তবে পৃথিবী বিপর্যস্ত (ফাসাদ) হয়ে যেত। (সূরা আল-বাকারা, ২:২৫১)

তাদাব্বুর: এটি একটি রাজনৈতিক মূলনীতি। যদি আমরা ‘পারফেক্ট’ নেতার অপেক্ষায় হাত গুটিয়ে বসে থাকি, তবে সমাজ চরম জালেমদের করতলগত হবে। ২:২৫১ আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, একদলকে (চরম মন্দ) ঠেকাতে অন্যদলকে (কম খারাপ) ব্যবহার করা বা সমর্থন দেওয়া ‘ফাসাদ’ ঠেকানোর একটি ঐশী অনুমোদন।


8. সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব নেই (La Yukallifullah):

নির্বাচনী ব্যবস্থায় যদি কোনো আদর্শ প্রার্থী না থাকে, তবে তার দায় আপনার নয়। আপনি কেবল আপনার সামনে থাকা সীমিত বিকল্পগুলোর মধ্যে থেকে শ্রেষ্ঠতর বা কম ক্ষতিকর একজনকে বেছে নিতে দায়ী।

প্রমাণিক আয়াত:  "আল্লাহ কোনো ব্যক্তির ওপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত (উস’আহা) বোঝা চাপিয়ে দেন না..." (সূরা আল-বাকারা, ২:২৮৬)

যৌক্তিক সিদ্ধান্ত: আপনার সাধ্যের সীমানায় (Within your capacity) যদি কোনো আদর্শিক নেতা না থাকে, তবে আপনি কেবল বিদ্যমান প্রার্থীদের মধ্যে যিনি ‘ইনসাফ’-এর নিকটতম, তাঁকে ভোট দিতে পারেন। এটিই হলো ‘মাস্তাত্বা’তুম’ বা সাধ্যানুযায়ী আমল (৬৪:১৬)।

--- ✨ ---


সালামুন আলা ইউসুফ: কৌশলগত অংশগ্রহণের মডেল:

সালামুন আলা ইউসুফ-এর ঘটনাটি প্রচলিত রাজনীতির বাইরে এক অনন্য ওহী ভিত্তিক সাক্ষ্য। তিনি একটি রাজতান্ত্রিক ও পৌত্তলিক ব্যবস্থার অধীনে দায়িত্ব চেয়েছিলেন (১২:৫৫)।


❒ যৌক্তিক ক্রমবিকাশ: তিনি জানতেন যে ব্যবস্থাটি ত্রুটিপূর্ণ, কিন্তু তিনি দায়িত্ব না নিলে মানুষ অনাহারে মারা যেত। তিনি ‘মন্দের ভালো’ হিসেবে সেই ব্যবস্থার অংশ হয়ে বৃহত্তর কল্যাণ নিশ্চিত করেছিলেন। এটিই প্রমাণ করে যে—আদর্শ পরিবেশ না থাকলেও মন্দের ভালো বিকল্পকে ব্যবহার করে সংস্কারের চেষ্টা করা ভালো আমল।

1. সাধ্য অনুযায়ী তাকওয়া অবলম্বনের মূলনীতি (The Rule of Capability):

যখন আদর্শ বা শতভাগ নিখুঁত পরিবেশ থাকে না, তখন একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো তার সাধ্যের মধ্যে থাকা সর্বোত্তম পথটি বেছে নেওয়া।

প্রমাণিক আয়াত: "অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করো তোমাদের সাধ্য অনুযায়ী (মাস্তাত্বা’তুম); আর শোনো, আনুগত্য করো এবং ব্যয় করো; এটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর।" (সূরা আত-তাগাবুন, ৬৪:১৬)

❑ তাদাব্বুর (বিশ্লেষণ): এই আয়াতটি 'মন্দের ভালো' বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশাসনিক ও ইবাদতগত নীতি। যদি আপনার সামনে শতভাগ কোরআনিক নেতা না থাকে, তবে আপনার সাধ্যের মধ্যে (Mastata'tum) যিনি তুলনামূলক ভালো, তাকে সমর্থন করাই হলো এই আয়াতের দাবি। হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়, বরং সাধ্যমতো ইনসাফের পক্ষে কাজ করাই প্রকৃত তাকওয়া।

২. দ্বীনের মধ্যে কোনো সংকীর্ণতা বা কঠোরতা না রাখা: আল্লাহ সহজ করতে চান, কঠিন নয়:

আল্লাহ তায়ালা দ্বীনের বিধানকে মানুষের জন্য দুঃসহ করতে চান না। প্রতিকূল পরিবেশে সহজ পথ বা বিকল্প পথ গ্রহণ করা একটি ঐশী অনুমোদন।

প্রমাণিক আয়াত: "...তিনি (আল্লাহ) তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন এবং দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো কঠোরতা/সংকীর্ণতা (হারাজ) রাখেননি..." (সূরা আল-হাজ্ব, ২২:৭৮)

রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এই আয়াতটি একটি 'ইউনিভার্সাল গাইডলাইন'

প্রমাণিক আয়াত: "...আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ (ইউসর) করতে চান এবং তিনি তোমাদের জন্য কঠিন (উসর) করতে চান না..." (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৫)

❑ বিশ্লেষণ: যখন সামনে কোনো পারফেক্ট বিকল্প থাকে না, তখন ভোটদান থেকে বিরত থাকা সমাজের জন্য 'উসর' বা কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করে (যেমন—দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ বা চরম জুলুম)। অন্যদিকে, 'মন্দের ভালো'কে বেছে নিয়ে জুলুমের মাত্রা কমানো হলো 'ইউসর' বা সহজতার পথ। 

❑ সমন্বয়: যদি এমন হতো যে— 'নিখুঁত নেতা না পেলে ভোট দেওয়া যাবে না', তবে এটি জাতির জন্য এক ভয়াবহ সংকীর্ণতা বা 'হারাজ' তৈরি করত। কারণ এর ফলে চরম জালেম শাসক বিনা বাধায় ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেত। এই আয়াতটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, বৃহত্তর কল্যাণার্থে ওজর বা বিকল্প পথ অবলম্বন করা দ্বীনেরই অংশ।

৩. বাধ্য হওয়া ও অনিচ্ছাকৃত বিচ্যুতি (Doctrine of Necessity):

১৬:১০৬ আয়াতে আল্লাহ একটি চরম দৃষ্টান্ত দিয়েছেন— যদি কারো জীবন বিপন্ন হয়, তবে সে অন্তরে ইমান রেখে মুখে কুফরি প্রকাশ করলেও আল্লাহ তাকে অপরাধী করবেন না।

প্রমাণিক আয়াত: "যে ব্যক্তি তার ইমানের পর আল্লাহর সাথে কুফরি করে— তবে সে নয় যাকে বাধ্য (উকরিহা) করা হয়েছে কিন্তু তার অন্তর ইমানে অটল..." (সূরা আন-নাহল, ১৬:১০৬)

তাদাব্বুর ও উচ্চতর দর্শন (Symmetry): চিন্তা করুন, জীবনের প্রয়োজনে যদি বাহ্যিক কুফরি করার অনুমতি থাকে, তবে একটি সমাজ ও রাষ্ট্রকে চরম জালেম ও ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য 'মন্দের ভালো' পক্ষকে ভোট দেওয়া কেন জায়েজ হবে না? এটি একটি 'শক্তিশালী কিয়াস' বা তুলনামূলক দলিল। অর্থাৎ, বৃহত্তর অনিষ্ট রোধে ছোট বিচ্যুতি বা অপূর্ণাঙ্গ পথ গ্রহণ করা ওজরের অন্তর্ভুক্ত।

৫. প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু করা নিষিদ্ধ কিন্তু প্রয়োজনে বৈধ:

আল্লাহ যা হারাম করেছেন, প্রয়োজনে তার সীমার মধ্যে থেকে সুবিধা গ্রহণ করার অনুমোদন দিয়েছেন।

প্রমাণিক আয়াত: "...অথচ তিনি তোমাদের কাছে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন যা তোমাদের ওপর হারাম করেছেন— তবে তা ছাড়া যার জন্য তোমরা নিরুপায় (উদ্বুতুররিত্তুম) হয়ে পড়ো..." (সূরা আল-আনআম, ৬:১১৯)

❑ সমন্বয়: যদি পূর্ণাঙ্গ ইসলামিক ব্যবস্থা না থাকাটা একটি 'অযোগ্য পরিবেশ' হয়, তবে সেই পরিবেশে সমাজ পরিচালনার জন্য তুলনামূলক ইনসাফকামী ব্যক্তিকে চয়ন করা এই 'নিরুপায়' (Idtirar) অবস্থার অনুমোদনের আওতায় পড়ে।
--- ✨ ---

▣ তবে- ভোট বা সুপারিশ: 'শাফায়াত' ও এর দায়বদ্ধতা:

আল-কোরআনের শব্দশৈলীতে 'শাফায়াত' মানে কেবল পরকালে সুপারিশ নয়, বরং দুনিয়াবী কাজে কাউকে সহযোগিতা বা সমর্থন করাও এর অন্তর্ভুক্ত। আপনি যখন কাউকে ভোট দেন, তখন আপনি মূলত তাঁর শাসন বা নীতির জন্য একটি 'উত্তম' অথবা 'মন্দ' সুপারিশ করছেন।

প্রমাণিক আয়াত:

যে ব্যক্তি কোনো উত্তম কাজের সুপারিশ (শাফায়াতুন হাসানাহ) করবে, তাতে তার একটি অংশ থাকবে; আর যে ব্যক্তি কোনো মন্দ কাজের সুপারিশ (শাফায়াতুন সাইয়্যিআহ) করবে, তার ওপর তার দায়ভার (কিফল) বর্তাবে। আর আল্লাহ সবকিছুর ওপর নজরদারীকারী।(সূরা আন-নিসা, ৪:৮৫)

তাদাব্বুর (গভীর অনুধাবন): এই আয়াতের ভাষাতাত্ত্বিক কাঠামোর দিকে লক্ষ্য করুন! এখানে ‘হাসানাহ’ (ভালো) ও ‘সাইয়্যিআহ’ (মন্দ) শব্দ দুটির মাধ্যমে নিরপেক্ষ অবস্থানের সুযোগ রাখা হয়নি। আপনি যখন ভোট দিচ্ছেন, তখন আপনি হয় ‘হাসানাহ’র অংশীদার হচ্ছেন অথবা ‘সাইয়্যিআহ’র বোঝা বহন করছেন। আপনার সমর্থিত নেতা যদি ক্ষমতায় গিয়ে একটি ভালো কাজ করেন, তবে আপনি ঘরে বসেই তার সওয়াব পাবেন; আর যদি তিনি জুলুম করেন, তবে ৪:৮৫ আয়াত অনুযায়ী সেই জুলুমের একটি অংশ বা দায়ভার (কিফল) আপনার আমলনামায় যুক্ত হবে।


 ▣ ভোট একটি ‘শাহাদাহ’ (شهادة): সত্য সাক্ষ্য ও এর রেকর্ড:

পারিভাষিক ও কারিগরি দিক থেকে ভোট মানে হলো কোনো ব্যক্তির যোগ্যতা ও সততার পক্ষে ‘সাক্ষ্য দেওয়া’। আল-কোরআনে সাক্ষ্য প্রদানকে একটি অলঙ্ঘনীয় আমানত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রমাণিক আয়াত (সূরা আজ-জুখরূফ): 

🔗 তাদের এই সাক্ষ্য (শাহাদাতুহুম) লিখে রাখা হবে এবং এ বিষয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ (ইউসআলুন) করা হবে (সূরা আজ-জুখরূফ, ৪৩:১৯)

এখানে ‘সাতুকতাবু’ (লিখে রাখা হবে) শব্দটি ভবিষ্যৎকাল ও নিশ্চয়তাবোধক। অর্থাৎ, ব্যালট পেপারে আপনি যে সিলটি দিচ্ছেন, তা কেবল কাগজের টুকরো নয়, বরং সেটি একটি ‘রেকর্ডকৃত সাক্ষ্য’ যা কিয়ামতের দিন আপনার সামনে পেশ করা হবে। ‘ইউসআলুন’ (জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে) শব্দটি প্রমাণ করে যে, আপনি কেন এই সাক্ষ্য দিয়েছিলেন বা কেন যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে অযোগ্যকে সমর্থন করেছিলেন—তার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে।

▣ সাক্ষ্য গোপন করার ভয়াবহতা (সূরা আল-বাকারা): আর তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না; যে ব্যক্তি তা গোপন করে, তার অন্তর অবশ্যই পাপী। আর তোমরা যা করো আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ পরিজ্ঞাত।" (সূরা আল-বাকারা, ২:২৮৩)

যৌক্তিক ক্রমবিকাশ: যদি আপনি মনে করেন ‘সবাই খারাপ, তাই ভোট দেব না’—তবে আপনি মূলত একটি সত্য সাক্ষ্য গোপন করছেন। যদি আপনার নীরবতার কারণে কোনো বড় জালেম ক্ষমতায় আসার সুযোগ পায়, তবে ২:২৮৩ আয়াত অনুযায়ী আপনার ‘অন্তর’ সেই জুলুমের দায়ভার থেকে মুক্ত থাকবে না।


▣ ইন্দ্রিয় ও অন্তরের জবাবদিহিতা (Accountability of Senses):

ভোট দেওয়ার আগে আমাদের দেখা, শোনা এবং বোঝার ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে হবে। কারণ কিয়ামতের দিন এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।

প্রমাণিক আয়াত:  যে বিষয়ে তোমার কোনো (নিশ্চিত) জ্ঞান নেই তার পেছনে পোড়ো না; নিশ্চয়ই কান, চোখ এবং অন্তর—এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ (মাস’উলা) করা হবে। (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৩৬)

তাদাব্বুর: নেতার চটকদার বক্তৃতা (কান), বাহ্যিক উন্নয়ন (চোখ) বা আবেগের (অন্তর) বশবর্তী হয়ে ভোট দিলে ১৭:৩৬ আয়াত অনুযায়ী আপনি অভিযুক্ত হবেন। আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে যে, আপনি আপনার সাধ্যের মধ্যে থাকা সবচেয়ে উত্তম বা কম ক্ষতিকর (Akrab/Ahsan) পক্ষকেই বেছে নিয়েছেন।

আল-কোরআনের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যসমূহ বিশ্লেষণ করলে একটি মজবুত (Strong) কাঠামো ফুটে ওঠে:

৪:৮৫ (শাফায়াত): আপনার ভোট বা সুপারিশ মানেই হলো ওই প্রার্থীর ভালো-মন্দের অংশীদার হওয়া।

৪৩:১৯ (শাহাদাহ): আপনার সমর্থন একটি রেকর্ডকৃত দলিল, যা নিয়ে পরকালে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

২:২৮৩ (আমানত): নিরুপায় অবস্থায় ‘মন্দের ভালো’ চয়ন না করে নীরব থাকা সাক্ষ্য গোপনের শামিল।

১৭:৩৬ (মাস’উলা): যাচাই-বাছাই না করে অন্ধভাবে ভোট দেওয়া অপরাধ।

সারকথা:

বর্তমান নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে ‘মন্দের ভালো’কে ভোট দেওয়া আপনার জন্য একটি ‘সাক্ষ্য’ (শাহাদাহ)। আপনি যদি জেনেশুনে এমন কাউকে ভোট দেন যিনি বড় ফাসাদ (বিপর্যয়) সৃষ্টি করবেন, তবে তার সেই ফাসাদের দায় ৪:৮৫ আয়াত অনুযায়ী আপনার ওপরও বর্তাবে। অন্যদিকে, যদি সাধ্যের মধ্যে থাকা তুলনামূলক ইনসাফকারীকে সমর্থন করেন, তবে তাঁর করা কল্যাণের সওয়াব আপনার আমলনামায় যুক্ত হবে। মনে রাখবেন, কিয়ামতের দিন আমাদের ‘সাক্ষ্য’ (৪৩:১৯) সম্পর্কে অবশ্যই প্রশ্ন করা হবে।

আল-কোরআনের অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্যসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

১৮:৭৯ (সালামুন আলা জনৈক বিশেষ জ্ঞানপ্রাপ্ত বান্দা): বড় অনিষ্ট ঠেকাতে ছোট অনিষ্ট (ত্রুটিপূর্ণ বিকল্প) গ্রহণ করা ঐশী প্রজ্ঞা।

৩০:৫ (রোমানদের বিজয়): চরম বাতিলের বিপরীতে হকের নিকটবর্তী (আহলে কিতাব/ইনসাফকামী) শক্তির জয় মুমিনের জন্য আনন্দের।

৩৯:১৮ (আহসান): বিদ্যমান বিকল্পগুলোর মধ্যে তুলনামূলক উত্তমকে অনুসরণ করাই হিদায়াতপ্রাপ্তদের কাজ।

২:২৫১ (দাফ’): জালেমকে প্রতিহত করতে অন্য কোনো শক্তিকে (কম খারাপ) ব্যবহার করা ফাসাদ ঠেকানোর উপায়।

সারকথা:
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘মন্দের ভালো’ বা ‘তুলনামূলক কম ক্ষতিকর’ প্রার্থীকে ভোট দেওয়া কোনো আদর্শিক আপোষ নয়, বরং এটি বৃহত্তর বিপর্যয় (Fasad) থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার একটি ‘অপরিহার্য কুরআনি সমাধান’। যারা ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকবে, তারা পরোক্ষভাবে চরম জালেমের পথ প্রশস্ত করবে। ওহীর ভাষাশৈলী ও যৌক্তিক ক্রমবিকাশ আমাদের হকের ‘নিকটতম’ (Akrab) শক্তিকে শক্তিশালী করার নির্দেশ দেয়।

======= ❖ =======

১. কোরআনে সরাসরি “ভোট” বা আধুনিক নির্বাচন নেই—তবে নীতিমালা আছে-

কোরআনে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বা নির্বাচন পদ্ধতির নাম নেই, কিন্তু শাসন, নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও দায়িত্ব অর্পণের নীতিমালা স্পষ্টভাবে আছে

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার উপযুক্ত লোকদেরকে প্রদান কর।”(সূরা নিসা ৪:৫৮)

🔹 ভোট = আমানত
কারণ আপনার ভোটের মাধ্যমে কাউকে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব দেওয়া হয়।


2. কুরআনে কি “আদর্শ শাসক সবসময় পাওয়া যাবে”—এমন শর্ত আছে? আদর্শ মু’মিন প্রার্থী না থাকলে কী করবেন?

না। কুরআন বাস্তবতাকে স্বীকার করে।

আয়াত: “আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” (সূরা আল-বাকারা ২:২৮৬)

➡️ অর্থাৎ, যেখানে সম্পূর্ণ কুরআন-অনুসারী প্রার্থী নেই, সেখানে বাস্তবসম্মত বিকল্পের মধ্যেই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

3. “কম খারাপ” নীতির কুরআনিক ভিত্তি (أخف الضررين)

(ক) বড় ক্ষতি এড়াতে ছোট ক্ষতি গ্রহণ:

“ফিতনা (অরাজকতা/অত্যাচার) হত্যার চেয়েও ভয়াবহ।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৯১)

➡️ যদি ভোট না দেওয়ার ফলে:

🔹অধিক জুলুম,
🔹রাষ্ট্রীয় অরাজকতা,
🔹মানুষের জীবন–সম্পদ আরও অনিরাপদ হয়

তবে কম ক্ষতিকর বিকল্প বেছে নেওয়া কুরআনিকভাবে যুক্তিসংগত

(খ) দুই অনিষ্টের মুখোমুখি হলে—যেটি কম জুলুমপূর্ণ সেটি গ্রহণ:

“অন্যায়ের দিকে সহযোগিতা করো না।” (সূরা আল-মায়িদা ৫:২)

➡️ এখানে নীরব থাকাও কখনো কখনো অন্যায়কে শক্তিশালী করে
তাই:

🔹সবচেয়ে বেশি জুলুমকারীকে ঠেকাতে-
🔹 তুলনামূলক কম জুলুমকারীকে সমর্থন করা
➡️ সরাসরি অন্যায় সমর্থন নয়, বরং বড় অন্যায় প্রতিরোধ

4. “মন্দের ভালো” বা “কম খারাপ” নীতি কোরআনে আছে কি?

✔️ হ্যাঁ, নীতিগতভাবে আছে

(ক) দুই অনিষ্টের মধ্যে ছোট অনিষ্ট বেছে নেওয়া

তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলো: এতে বড় পাপ আছে এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারও আছে; কিন্তু তাদের পাপ উপকারের চেয়ে বড়। (সূরা বাকারা ২:২১৯)

এখানে আল্লাহ তুলনামূলক মূল্যায়ন শেখাচ্ছেন—
পাপ বনাম উপকার → যেটার ক্ষতি বেশি, সেটি বর্জন।

➡️ অর্থাৎ ক্ষতির মাত্রা তুলনা করা কোরআনসম্মত

5. কুরআনের আলোকে “কম খারাপ” প্রার্থী বাছাইয়ের মানদণ্ড:

আপনি কাকে ভোট দেবেন, সেটা নির্ধারণে নিচের কোরআনিক ফিল্টার ব্যবহার করতে পারেন:

(১) কে তুলনামূলকভাবে বেশি ন্যায়বিচার করবে?

“ন্যায়বিচার করো, তা তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।” (সূরা আল-মায়িদা ৫:৮)

➡️ প্রশ্ন করুন:

❖ কে বিচারব্যবস্থাকে কম বিকৃত করবে?
❖ কে প্রতিহিংসামূলক নিপীড়ন কম করবে? 

🔗 জুলুমের মাত্রা কম কে?

আল্লাহ জালিমদের ভালোবাসেন না। (সূরা আলে ইমরান ৩:৫৭)

যিনি: ✦ কম রক্তপাত ঘটায়  ✦ কম অন্যায় মামলা, গুম, নির্যাতন করে 

➡️ তিনি তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য


🔗 ন্যায়বিচারের প্রতি কাছাকাছি কে?

ন্যায়বিচার করো, তা তাকওয়ার নিকটতর। (সূরা মায়েদা ৫:৮)

এমনকি তিনি পূর্ণ দ্বীনদার না হলেও:❖ আদালত, প্রশাসন, সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষা করেন কি না

🔗 জনগণের ক্ষতি কম কার শাসনে?

আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না সংশোধনের পর। (সূরা আ’রাফ ৭:৫৬)

যার শাসনে:

❖ অর্থনৈতিক ধ্বংস 
❖ সামাজিক অস্থিরতা 
❖ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বেশি

➡️ তিনি বর্জনযোগ্য


🔗 ইসলাম বিদ্বেষী বা প্রকাশ্য দ্বীন-বিদ্রূপকারী কি না?

যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রূপ করে, আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত করেছেন।  (সূরা আহযাব ৩৩:৫৭)

➡️ প্রকাশ্য ইসলামবিদ্বেষী প্রার্থী সবচেয়ে অগ্রহণযোগ্য, এমনকি প্রশাসনিকভাবে দক্ষ হলেও।


(৩) কে ফাসাদ (রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলা) কম ছড়াবে?

আয়াত: আল্লাহ ফাসাদকারীদের পছন্দ করেন না। (সূরা আল-কাসাস ২৮:৭৭)

➡️ প্রশ্ন করুন:

❖ কে ক্ষমতায় এলে রাষ্ট্রীয় লুটপাট কম হবে? 
❖ কে সমাজে বিভক্তি কমাবে? 

(৪) কে মানুষের বাকস্বাধীনতা ও সাক্ষ্যকে কম দমন করবে?

আয়াত: সাক্ষ্য গোপন করো না; যে গোপন করে তার হৃদয় পাপী। (সূরা আল-বাকারা ২:২৮৩)

➡️ যে শাসনে সত্য বলা তুলনামূলক নিরাপদ—সে কম মন্দ।

২) কে মানুষের জান–মালের ক্ষতি কম করবে?

আয়াত: “যে একজন নিরপরাধ মানুষ হত্যা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল।” (সূরা আল-মায়িদা ৫:৩২)

➡️ যে শাসনে:

❖ গুম, 
❖ বিচারবহির্ভূত হত্যা, 
❖ রাষ্ট্রীয় সহিংসতা 
কম—সে তুলনামূলকভাবে কম খারাপ।

৫. ভোট না দিলে কি গুনাহ?

কোরআনের দৃষ্টিতে:

আপনি যদি ভোট না দিয়ে

জেনে-শুনে সবচেয়ে জুলুমকারী শক্তিকে সুযোগ করে দেন

তবে এটি নীরব সহযোগিতা হয়ে যেতে পারে।

“পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।” (সূরা মায়েদা ৫:২)


6. ভোট না দেওয়া কি বেশি তাকওয়াপূর্ণ?

সব সময় নয়।

“তোমরা ন্যায়ের আদেশ দাও ও অন্যায়ের নিষেধ করো।” (সূরা আলে ইমরান ৩:১০৪)

➡️ যদি ভোট না দেওয়ার ফলে:

সবচেয়ে জালিম শক্তি ক্ষমতায় আসে

তবে ভোট না দেওয়া নীরব সহযোগিতায় পরিণত হতে পারে

7. নিয়্যতের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

আয়াত:“আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক রূপ নয়, তোমাদের নিয়্যত দেখেন।” (সূরা আল-বাকারা ২:২২৫-এর অর্থগত শিক্ষা)

➡️ আপনার নিয়্যত যদি হয়:

❖আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের চেষ্টা,
❖ বড় জুলুম প্রতিরোধ,
❖মানুষের ক্ষতি কমানো

সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত (কোরআনের আলোকে)

✔️ আদর্শ মু’মিন প্রার্থী না থাকলে
✔️ দুই বা ততোধিক অপূর্ণ প্রার্থীর মধ্যে
✔️ যে প্রার্থী:

❖ কম জুলুম করে
❖ কম ফিতনা সৃষ্টি করে
❖একমাত্র নাযিলকৃত অহী অনুশীলনে তথা ইসলামের প্রকাশ্য বিরোধী নয়
❖ জনগণের ক্ষতি তুলনামূলক কম
➡️ তাকে ভোট দেওয়া ‘মন্দের ভালো’ হিসেবে কোরআনিকভাবে বৈধ

তবে আল্লাহ সু.তা. কাকে খিলাফত বা পৃথিবীতে স্থলাভিক্ত করবেন:

আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সলেহ করেছে, অবশ্যই তিনি তাদেরকে পৃথিবীর মধ্যে স্থলাভিষিক্ত করবেন যেভাবে তিনি তাদের পূর্বে যারা ছিল তাদেরকে স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন, এবং অবশ্যই তিনি তাদের জন্য তাদের সে দ্বীনকে সুদৃঢ় করবেন, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং অবশ্যই তিনি তাদেরকে তাদের ভয়ের পরে নিরাপত্তায় বদলে দিবেন। তারা আমার ইবাদত করবে, তারা আমার সাথে কোনোকিছু শিরক করবে না। আর সেটার পরও যারা কুফর করে, তাহলে ওরাই পাপাচারী-আয়াত ২৪:৫৫
──────── ❖ ────────

সঠিক সাক্ষ্য ও আমানত রক্ষার জন্য কুরআনি দুআ:

সাক্ষ্য প্রদানের সময় যেন আমরা পক্ষপাতিত্ব বা ভয়ের বশবর্তী না হই, সেজন্য আল-কোরআনে বর্ণিত এই দুআগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:

➤ সত্যের ওপর অটল থেকে সাক্ষ্য দেওয়ার দুআ:

(সূরা আন-নিসার ১৩৫ নম্বর আয়াতের শিক্ষার আলোকে)

رَبَّنَا آتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا

রাব্বানা আতিনা মিল্লাদুনকা রাহমাতাওঁ ওয়া হাইয়্যি’ লানা মিন আমরিনা রাশাদা।

অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজসমূহকে (সাক্ষ্য ও সিদ্ধান্তকে) সঠিক ও কল্যাণকর পথে পরিচালিত করুন।" (সূরা আল-কাহাফ, ১৮:১০)

➤ জালেমদের সাথে হাশর না হওয়ার দুআ:

رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ

রাব্বানা লা তাজ'আলনা মা'আল ক্বাওমিজ জলিমিন।

অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জালেম সম্প্রদায়ের সঙ্গী (সমর্থক) করবেন না। (সূরা আল-আরাফ, ৭:৪৭)

অন্যায়ের মুখে যেন আমরা হক কথা বলতে পারি এবং সঠিক পক্ষ অবলম্বন করতে পারি, সেজন্য এই দুআগুলো পড়া জরুরি:

➤ সঠিক ও ইনসাফপূর্ণ বিচার ফয়সালার জন্য দুআ:

رَبَّنَا افْتَحْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ قَوْمِنَا بِالْحَقِّ وَأَنتَ خَيْرُ الْفَاتِحِينَ

রাব্বানাফতাহ বাইনানা ওয়া বাইনা ক্বাওমিনা বিল হাক্কি ওয়া আন্তা খাইরুল ফাতিহিন।

অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের ও আমাদের জাতির মধ্যে ন্যায়ভাবে ফয়সালা করে দিন এবং আপনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী। (সূরা আল-আরাফ, ৭:৮৯)  

সঠিক সিদ্ধান্ত ও হিকমাহ প্রাপ্তির কুরআনি দুআ:

বর্তমান অস্থিতিশীল ও জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য নিম্নোক্ত দুআগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়:

 সঠিক ও নিকটতম হিদায়াত কামনার দুআ:

عَسَىٰ أَن يَهْدِيَنِ رَبِّي لِأَقْرَبَ مِنْ هَٰذَا رَشَدًا

আসা আইঁ ইয়াহদিয়ানি রাব্বি লি-আক্বরাবা মিন হাজা রাশাদা।

অর্থ: আশা করি আমার প্রতিপালক আমাকে এর চেয়েও সত্য ও সঠিকের নিকটতম পথের হিদায়াত দান করবেন।" (সূরা আল-কাহাফ, ১৮:২৪)

➤ জালেমদের সহায়তা না করার শপথ:
(সালামুন আলা মুসা এই শপথ করেছিলেন)

رَبِّ بِمَا أَنْعَمْتَ عَلَيَّ فَلَنْ أَكُونَ ظَهِيرًا لِّلْمُجْرِمِينَ

রাব্বি বিমা আন’আমতা ‘আলাইয়্যা ফালান আকুনা জোয়হিরান লিল মুজরিমিন।

অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন, তার বিনিময়ে আমি কখনোই অপরাধীদের সাহায্যকারী হব না। (সূরা আল-কাসাস, ২৮:১৭)

শহর-দেশের নিরাপত্তার জন্য প্রধান দুআ:

এটি নবী সালামুন আলা ইবরাহীম শহরের নিরাপত্তার জন্য করেছিলেন। আমরা আমাদের শহর বা দেশের জন্য এই দুআটি করতে পারি।

رَبِّ اجْعَلْ هَٰذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقْ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ

উচ্চারণ: রব্বিজ-আল হা-যা বালাদান আ-মিনাও ওয়ারযুক আহলাহু মিনাছ ছামারা-ত।

অর্থ: “হে আমার পালনকর্তা! আপনি একে (শহরকে) একটি নিরাপদ শহর বানিয়ে দিন এবং এর অধিবাসীদেরকে ফলমূল দিয়ে রিযিক দান করুন।”
(সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১২৬)


শহরকে শান্তিময় করার দুআ:

এই দুআটিতেও নিরাপত্তার পাশাপাশি ঈমানের ওপর অটল থাকার প্রার্থনা করা হয়েছে।

رَبِّ اجْعَلْ هَٰذَا الْبَلَدَ آمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَن نَّعْبُدَ الْأَصْنَامَ

উচ্চারণ: রব্বিজ-আল হা-যাল বালাদা আ-মিনাও ওয়াজ-নুবনী ওয়া বানিয়্যা আন না’বুদাল আসনা-ম।

অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! এই শহরকে শান্তিময় করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখুন। (সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৩৫)


কোনো জনপদে বা স্থানে নিরাপদে বসবাসের দুআ:

যখন কেউ নতুন কোনো শহর বা এলাকায় বসবাস শুরু করে, তখন এই দুআটি পড়া খুব কার্যকর।

رَّبِّ أَنزِلْنِي مُنزَلًا مُّبَارَكًا وَأَنتَ خَيْرُ الْمُنزِلِينَ

উচ্চারণ: রব্বি আনযিলনী মুনযালান মুবা-রকাওঁ ওয়া আনতা খয়রুল মুনযিলীন।

অর্থ: হে আমার পালনকর্তা! আমাকে কল্যাণময় স্থানে অবতরণ করান (বসবাস করান); আর আপনিই শ্রেষ্ঠ অবতরণকারী। (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত: ২৯)


শহর বা জনপদকে ধ্বংস ও বিপর্যয় থেকে রক্ষার জন্য সাধারণ দুআ:

কুরআনে বিভিন্ন জাতি বা জনপদের ওপর আযাব আসার কথা বলা হয়েছে। কোনো জনপদের শান্তি ও ঈমানি পরিবেশ রক্ষার জন্য এই প্রার্থনা করা যায়:

عَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْنَا رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ  وَنَجِّنَا بِرَحْمَتِكَ مِنَ الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

উচ্চারণ: আলা-ল্লাহি তাওয়াক্কালনা। রব্বানা লা- তাজ‘আলনা ফিতনাতাল্ লিল্ ক্বওমিয্ যালিমীন। ওয়া নাজ্জিনা বিরাহমাতিকা মিনাল্ ক্বওমিল্ কাফিরীন

অর্থ: আমরা আল্লাহ্‌র উপরই নির্ভর করলাম। হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে জালিম জনগোষ্ঠীর জন্য পরীক্ষার বস্তু বানাবেন না।  আর আমাদেরকে আপনার রহমতের মাধ্যমে কাফির জনগোষ্ঠী থেকে মুক্তি দিন- আল-কুরআন: ইউনুস, আয়াত ১০:৮৫-৮৬

দেশ ও দুনিয়ার সার্বিক কল্যাণের দুআ:

এটি কুরআনের সবচেয়ে ব্যাপক দুআ। একটি দেশের শান্তি, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি—সবই এই 'কল্যাণ' বা 'হাসানাহ' শব্দের অন্তর্ভুক্ত।

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

রব্বানা- আ-তিনা- ফিদ্দুনইয়া- হাসানাতাঁও ওয়া ফিল আ-খিরতি হাসানাতাঁও ওয়াক্বিনা- ‘আযা-বান না-র।

অর্থ: “হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন আর আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।”

(সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২০১)


কনটেন্টের উদ্দেশ্য:

এই আর্টিকেলটির কোথাও কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তার পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট চাওয়া হয়নি

এটি কেবলমাত্র ঈমানি দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে, সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে ভালো পথের দিকে আহ্বান জানাতে, ওহি-বাণীর আলোকে প্রস্তুত করা হয়েছে।

বিশেষ সতর্কতা: এই আলোচনা বিশ্বাসীদের জন্য প্রযোজ্য

হে আমাদের রব! আমরা ভুল করলে আমাদের ক্ষমা করে দিন। (সূরা আল-বাকারা, ২:২৮৬)

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post