আল কুরআনের নিজস্ব অভিধানে ‘মিহরাব’ (الْمِحْرَاب) শব্দটি কি কেবল একটি সাধারণ কামরা, নাকি এটি সুনির্দিষ্টভাবে ইবাদতখানা, সালাত এবং সিজদাহর স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে? আসুন, কোনো বাহ্যিক অভিধান বা ইতিহাস না ঘেঁটে, কেবলমাত্র ‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’ পদ্ধতিতে আয়াতগুলোর পারস্পরিক সংযোগ থেকে এর প্রমাণগুলো দেখে নিই:
আল কুরআন মাজীদে উল্লেখিত সালামুন আলা যাকারিয়্যা, সালামুন আলা মারইয়াম, সালামুন আলা দাউদ এবং সালামুন আলা সুলাইমান-এর ‘মিহরাব’ বা ইবাদতখানার ঘটনাগুলোকে একত্রিত করলে এটি ইতেকাফ ও নিভৃত ইবাদতের ওপর একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, অভূতপূর্ব এবং অত্যন্ত শক্তিশালী প্রবন্ধ হিসেবে রূপ লাভ করে।
আল কুরআন মাজীদের আলোকে ‘মিহরাব’:
ইবাদত, ঐশী রিযিক ও আত্মিক নিভৃতবাসের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা আল কুরআন মাজীদ মানবজাতির আত্মিক পরিশুদ্ধির এক নিখুঁত মানদণ্ড। বান্দা কীভাবে তার রবের সাথে নিবিড়তম সংযোগ স্থাপন করবে, তার এক অসামান্য ও শাশ্বত রূপরেখা হলো ‘মিহরাব’ (الْمِحْرَاب)। প্রচলিত ধারণায় মিহরাব বলতে কেবল মসজিদের সামনের একটি খিলানকে বোঝানো হলেও, আল কুরআনের নিজস্ব অভিধানে ‘মিহরাব’ হলো এমন এক সুরক্ষিত, নিভৃত ও পবিত্র ইবাদতখানা, যেখানে বান্দা দুনিয়ার সকল মোহ ত্যাগ করে (ইতেকাফ বা নিভৃতবাসের মাধ্যমে) রবের কাছে নিজেকে পূর্ণরূপে সমর্পণ করে।
আল কুরআনের আয়াতগুলোর পারস্পরিক শব্দগত গাঁথুনি (নজম) এবং নবীগণের জীবনে মিহরাবের ব্যবহার গভীর অনুধ্যান করলে এর এক অভাবনীয় আধ্যাত্মিক (Metaphysical) ও মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা ফুটে ওঠে।
মিহরাব শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ ও মনস্তাত্ত্বিক সামঞ্জস্য:
আরবি অভিধান ও কুরআনিক ভাষাতত্ত্বে ‘মিহরাব’ শব্দটি ‘হা-রা-বা’ (ح-ر-ب) মূলধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ যুদ্ধ করা বা সংগ্রাম করা।
এখান থেকেই ‘মিহরাব’ শব্দটি এসেছে, যার অন্তর্নিহিত অর্থ হলো— এমন একটি স্থান, যেখানে বান্দা তার প্রবৃত্তি (নফস) এবং শয়তানের প্ররোচনার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক সংগ্রাম করে রবের নৈকট্য লাভ করে। এটি হলো সিজদাস্থান বা ইবাদতখানার সবচেয়ে সম্মানিত ও সুরক্ষিত প্রকোষ্ঠ, যেখানে জাগতিক কোলাহলের কোনো প্রবেশাধিকার নেই। আল কুরআন মাজীদে চারজন মহান ব্যক্তিত্বের সাথে মিহরাবের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আসুন, এর গভীর অনুধ্যানগুলো বিশ্লেষণ করি:
১. ঐশী রিযিক ও পবিত্রতার মিহরাব:
সালামুন আলা মারইয়াম মিহরাবের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও আধ্যাত্মিক চিত্রটি পাওয়া যায় সালামুন আলা মারইয়াম -এর জীবনে। তাঁর মাতা তাঁকে রবের সেবায় একনিষ্ঠভাবে উৎসর্গ করেছিলেন। আল্লাহ রব্বুল আলামিন তাঁকে কীভাবে গ্রহণ করেছিলেন, তা আল কুরআন চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছে:
"অতঃপর তাঁর রব তাঁকে উত্তমভাবে গ্রহণ করলেন এবং তাঁকে উত্তমরূপে লালন-পালন করলেন। আর তিনি তাঁকে যাকারিয়্যার তত্ত্বাবধানে রাখলেন। যখনই যাকারিয়্যা মিহরাবে (الْمِحْرَابِ) তাঁর কাছে প্রবেশ করতেন, তখনই তাঁর কাছে রিযিক (رِزْقًا) পেতেন। তিনি বলতেন,
‘হে মারইয়াম! এসব তুমি কোথা থেকে পেলে?’ সে বলত, ‘এসব আল্লাহর কাছ থেকে; নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অগণিত রিযিক দান করেন’।" (৩:৩৭)
বিশ্লেষণমূলক সামঞ্জস্য:
এই আয়াতের অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত হলো— মিহরাব বা ইতেকাফের স্থান কেবল ইবাদতের জায়গা নয়, বরং এটি ঐশী রিযিক বা ভরসার (তাওয়াক্কুল) চূড়ান্ত পরীক্ষাগার। যখন কোনো বান্দা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেকে মিহরাবে আবদ্ধ করে, তখন তার জাগতিক ও আত্মিক রিযিকের সম্পূর্ণ দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ সু.তা. গ্রহণ করেন। মিহরাব হলো এমন এক পবিত্র শূন্যতা, যাকে আল্লাহ তাঁর রহমত দিয়ে পূর্ণ করে দেন।
২. সালাত, তাসবিহ ও দুআ কবুলের মিহরাব:
সালামুন আলা যাকারিয়্যা মারইয়াম (সালামুন আলাইহে)-এর মিহরাবে রবের এই অকল্পনীয় রিযিক দেখে সালামুন আলা যাকারিয়্যা -এর অন্তরে এক প্রবল আশার সঞ্চার হয়। তিনি বৃদ্ধ বয়সে নিঃসন্তান হওয়া সত্ত্বেও ঠিক সেই মিহরাবেই রবের কাছে হাত পাতেন: "সেখানেই (هُنَالِكَ - মিহরাবে) যাকারিয়্যা তার রবের কাছে দুআ করেছিল..." (৩:৩৮)
তাঁর এই দুআর জবাব আল্লাহ রব্বুল আলামিন কোথায় এবং কীভাবে দিয়েছিলেন? আল কুরআন বলছে:
"অতঃপর ফেরেশতারা তাঁকে ডেকে বলল, যখন তিনি মিহরাবে (فِي الْمِحْرَابِ) দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন (يُصَلِّي - ইউসাল্লি), ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে ইয়াহইয়ার সুসংবাদ দিচ্ছেন...’" (৩:৩৯)
তাসবিহ ও নিভৃতবাসের (ইতেকাফ) দৃষ্টান্ত:
সালামুন আলা যাকারিয়্যা-কে যখন নিদর্শন দেওয়া হলো, তখন তাঁকে বলা হলো তিন দিন ও তিন রাত মানুষের সাথে ইশারা ছাড়া কথা না বলতে এবং বেশি বেশি তাসবিহ করতে (৩:৪১, ১৯:১০)। এই সময়টি তিনি মিহরাবেই কাটিয়েছিলেন। "অতঃপর তিনি মিহরাব (الْمِحْرَابِ) থেকে বের হয়ে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে এলেন এবং তাদেরকে ইঙ্গিতে বললেন, তোমরা সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা (তাসবিহ) করো।" (১৯:১১)
গভীর অনুধ্যান: এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, মিহরাব হলো সালাতে (সিজদায়) দণ্ডায়মান হওয়ার স্থান এবং সকাল-সন্ধ্যার তাসবিহর কেন্দ্র। এটি ইতেকাফকারীর জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা যে— মিহরাবে দাঁড়িয়ে করা মুখলিস (একনিষ্ঠ) দুআ আল্লাহ রব্বুল আলামিন কখনোই ফিরিয়ে দেন না।
৩. ক্ষমা প্রার্থনা, সিজদাহ ও সুরক্ষিত মিহরাব:
সালামুন আলা দাউদ সালামুন আলা দাউদ ছিলেন এক অসীম ক্ষমতার অধিকারী নবী ও শাসক। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বিশাল দায়িত্বও তাঁকে রবের নিভৃত ইবাদত থেকে দূরে রাখতে পারেনি। তাঁর মিহরাবটি কেমন ছিল, তার একটি শ্বাসরুদ্ধকর চিত্র আল কুরআন তুলে ধরেছে:
"আর তোমার কাছে কি সেই বিবাদমান লোকদের সংবাদ পৌঁছেছে? যখন তারা প্রাচীর টপকে (تَسَوَّرُوا) মিহরাবে (الْمِحْرَابَ - ইবাদতখানায়) প্রবেশ করেছিল।" (৩৮:২১)
বিপরীতমুখী চিত্র ও সামঞ্জস্য:
জাগতিক রাজারা সিংহাসনে বা দরবারে বসেন, যা সবার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু সালামুন আলা দাউদ (সালামুন আলাইহে)-এর মিহরাব ছিল এমন এক সুরক্ষিত এবং দেয়ালবেষ্টিত স্থান, যেখানে সাধারণ দরজা দিয়ে প্রবেশ না করে প্রাচীর টপকে ঢুকতে হয়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে, মিহরাব হলো জাগতিক কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন (ই’তিযাল) থাকার একটি একান্ত ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক জোন। এই মিহরাবে তিনি কী করতেন? যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে এটি রবের পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা, তখন তিনি মিহরাবের মূল হক আদায় করলেন: "...অতঃপর সে তার রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করল এবং রুকু বা সিজদাবনত হয়ে লুটিয়ে পড়ল (وَخَرَّ رَاكِعًا) ও তাঁর অভিমুখী হলো।" (৩৮:২৪)
অর্থাৎ, ক্ষমতা ও রাজত্বের অহংকার ত্যাগ করে কেবল রবের সামনে লুটিয়ে পড়ার (সিজদাহ) স্থানই হলো মিহরাব।
৪. রাজকীয় ইবাদতের স্থাপত্য বা ‘মাহারীব’:
সালামুন আলা সুলাইমান সালামুন আলা দাউদ-এর পুত্র সালামুন আলা সুলাইমান যখন পৃথিবীতে এক অভাবনীয় ও অকল্পনীয় সাম্রাজ্যের অধিকারী হলেন, তখন তিনি তাঁর রাজকীয় শক্তিকে ব্যক্তিগত ভোগবিলাসে (ইসরাফ) ব্যবহার করেননি। বরং জিনদের মাধ্যমে রবের ইবাদতের জন্য সুবিশাল স্থাপত্য নির্মাণ করেছিলেন। আল কুরআন বলছে: "তারা (জিনেরা) সুলাইমানের ইচ্ছানুযায়ী বিশাল ইবাদতখানাসমূহ (مَّحَارِيبَ - মাহারীব, মিহরাবের বহুবচন), ভাস্কর্য, হাউযের মতো বৃহদাকার পাত্র এবং সুদৃঢ়ভাবে স্থাপিত বিশাল ডেকচিসমূহ নির্মাণ করত..." (৩৪:১৩)
যৌক্তিক সামঞ্জস্য:
এখানে ‘মাহারীব’ শব্দটি বহুবচনে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর জমিনে তাকওয়ার ভিত্তিকে প্রতিষ্ঠিত ইবাদতখানা বা মিহরাব নির্মাণ করা এবং তাকে আবাদ করা নবীগণের অন্যতম প্রধান কাজ। এই মিহরাবগুলো ফেরাউনি অহংকার বা অপচয়ের (ইসরাফ) বিপরীত; এগুলো হলো রবের প্রতি চরম কৃতজ্ঞতা ও ইবাদতের নিদর্শন।
মিহরাব, মসজিদ এবং ইতেকাফের অভ্যন্তরীণ ঐকতান:
আল কুরআন মাজীদের এই আয়াতগুলোকে একত্রিত করলে একটি নিখুঁত অভ্যন্তরীণ ঐকতান বা সমীকরণ তৈরি হয়।
✦ ‘মসজিদ’ হলো সিজদাহ করার স্থান, আর ‘মিহরাব’ হলো সেই সিজদাস্থানের সবচেয়ে নিভৃত, পবিত্র এবং ধ্যানমগ্ন হওয়ার কেন্দ্র।
✦ ইতেকাফকারী যখন মসজিদে নিজেকে ‘আকিফ’ (আবদ্ধ) করেন, তখন তিনি মূলত সালামুন আলা মারইয়ামের মতো জাগতিক রিযিকের চিন্তা ত্যাগ করেন, সালামুন আলা যাকারিয়্যার মতো সালাত ও তাসবিহতে দণ্ডায়মান হন, এবং সালামুন আলা দাউদ (সালামুন আলাইহে)-এর মতো রবের ভয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়েন।
✦ মিহরাব হলো সেই আধ্যাত্মিক আশ্রয়স্থল, যেখানে একজন মুমিন দুনিয়ার সকল মোহ ও আসক্তি (নারী, সন্তান, সম্পদ - ৩:১৪) প্রাচীরের বাইরে রেখে একনিষ্ঠ (মুখলিস) চিত্তে রবের মুখোমুখি হন।
আল কুরআন মাজীদের সুবিশাল জ্ঞানভাণ্ডার ও আয়াতসমূহের সুনিপুণ গাঁথুনি থেকে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে— মিহরাব কোনো সাধারণ কামরা বা স্থাপত্যের নকশা নয়। এটি হলো রবের সাথে বান্দার সংযোগের চূড়ান্ত মাধ্যম। সালামুন আলা মারইয়ামের ঐশী রিযিক, সালামুন আলা যাকারিয়্যার দুআ কবুল, সালামুন আলা দাউদের সিজদাহ এবং সালামুন আলা সুলাইমান -এর কৃতজ্ঞতা—এই সবকিছুরই নীরব সাক্ষী হলো ‘মিহরাব’।
যুগে যুগে মুমিনরা যখন তাকওয়ার ভিত্তিকে প্রতিষ্ঠিত মসজিদে ইতেকাফের জন্য প্রবেশ করেন, তখন তাঁরা মূলত নবীদের এই মিহরাবের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারকেই ধারণ করেন। মিহরাব হলো প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে রবের প্রশান্তি লাভের এক নীরব, শাশ্বত ও ঐশী বিপ্লব।
আল কুরআনের অভিধানে ‘মিহরাব’: ইবাদত ও সিজদাস্থানের অকাট্য প্রমাণ আল কুরআন মাজীদে ‘মিহরাব’ শব্দটি এমন সব কাজের সাথে যুক্ত হয়ে এসেছে, যা প্রমাণ করে যে এটি সম্পূর্ণভাবে রবের ইবাদত, সালাত এবং সিজদাহর জন্য নির্ধারিত একটি নিভৃত স্থান।
১. মিহরাব এবং সালাতের (সিজদাহর) সরাসরি সংযোগ:
মিহরাব যে ইবাদত বা সালাতের স্থান, তার সবচেয়ে অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় সালামুন আলা যাকারিয়্যা (সালামুন আলাইহে)-এর আয়াতে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন যখন ফেরেশতাদের মাধ্যমে তাঁকে সুসংবাদ দিচ্ছিলেন, তখন তিনি কোথায় এবং কী অবস্থায় ছিলেন? "অতঃপর ফেরেশতারা তাঁকে ডেকে বলল, যখন তিনি মিহরাবে (فِي الْمِحْرَابِ) দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন (يُصَلِّي - ইউসাল্লি)..." (৩:৩৯)
অনুধাবনীয় প্রমাণ: আল কুরআনে সালাতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো রুকু ও সিজদাহ (২২:৭৭)। যেহেতু সালামুন আলা যাকারিয়্যা (সালামুন আলাইহে) মিহরাবে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন, এটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে ‘মিহরাব’ হলো সালাত এবং সিজদাহ আদায়ের জন্য নির্ধারিত একটি সুনির্দিষ্ট স্থান বা ইবাদতখানা।
২. মিহরাব এবং তাসবিহ-এর সংযোগ:
সালামুন আলা যাকারিয়্যা যখন ইবাদতখানা বা মিহরাব থেকে বের হয়ে আসলেন, তখন তিনি তাঁর কওমকে কী নির্দেশ দিয়েছিলেন? "অতঃপর তিনি মিহরাব (الْمِحْرَابِ) থেকে বের হয়ে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে এলেন এবং তাদেরকে ইঙ্গিতে বললেন, তোমরা সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা (তাসবিহ) করো।" (১৯:১১)
অনুধাবনীয় প্রমাণ: মিহরাবের ভেতরের মূল কাজই ছিল রবের তাসবিহ করা। তিনি নিজে মিহরাবে যে ইবাদতে নিবিষ্ট ছিলেন, বাহিরে এসে তাঁর অনুসারীদেরকেও সেই তাসবিহ করারই নির্দেশ দিলেন। সুতরাং মিহরাব হলো তাসবিহ ও জিকিরের কেন্দ্র।
৩. মিহরাব এবং সিজদাবনত হওয়ার সংযোগ (সালামুন আলা দাউদ):
সালামুন আলা দাউদ মিহরাবে অবস্থানকালে যখন বুঝতে পারলেন যে রব তাঁকে পরীক্ষা করেছেন, তখন তিনি কী করেছিলেন? "আর তোমার কাছে কি সেই বিবাদমান লোকদের সংবাদ পৌঁছেছে? যখন তারা প্রাচীর টপকে মিহরাবে (الْمِحْرَابَ) প্রবেশ করেছিল।" (৩৮:২১)
"...অতঃপর সে তার রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করল এবং রুকু বা সিজদাবনত হয়ে লুটিয়ে পড়ল (وَخَرَّ رَاكِعًا) ও তাঁর অভিমুখী হলো।" (৩৮:২৪)
অনুধাবনীয় প্রমাণ: এই আয়াত দুটি প্রমাণ করে যে, মিহরাব হলো এমন এক দেয়ালঘেরা সংরক্ষিত স্থান (যেখানে প্রাচীর টপকে ঢুকতে হয়েছিল), যা জাগতিক কাজ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আর সেই মিহরাবে সালামুন আলা দাউদ (সালামুন আলাইহে)-এর মূল কাজ ছিল রবের কাছে ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা এবং সিজদাবনত হওয়া।
৪. ‘মসজিদ’ ও ‘মিহরাব’-এর আধ্যাত্মিক সমার্থক রূপ:
আল কুরআনে ‘মসজিদ’ (مَسْجِد) শব্দের মূল ধাতু হলো ‘সীন-জীম-দাল’ (س-ج-د), যার অর্থ সিজদাহ করার স্থান। অপরদিকে ‘মিহরাব’ হলো সেই সিজদাস্থান বা ইবাদতখানার আরও নিভৃত, সুরক্ষিত এবং গভীর ধ্যান বা ইতেকাফের জন্য নির্ধারিত বিশেষ প্রকোষ্ঠ। সালামুন আলা মারইয়াম এই মিহরাবেই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন (৩:৩৭), যেখানে স্বয়ং আল্লাহ সু.তা. তাঁর রিযিকের ব্যবস্থা করেছিলেন।
সারসংক্ষেপ:
আল কুরআনের নিজস্ব টেক্সট (Textual evidence) থেকে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, ‘মিহরাব’ কোনো সাধারণ থাকার ঘর নয়। বরং এটি হলো— ✦ সালাত কায়েম করার স্থান (৩:৩৯) ✦ সকাল-সন্ধ্যায় তাসবিহ করার কেন্দ্র (১৯:১১)
ক্ষমা প্রার্থনা ও সিজদাবনত হওয়ার সংরক্ষিত ইবাদতখানা (৩৮:২১, ৩৮:২৪)
সুতরাং, ইতেকাফের আলোচনায় "সিজদাস্থানে (মসজিদে) রবের সাথে একনিষ্ঠ সংযোগ"-এর কথা বলতে গিয়ে সালামুন আলা মারইয়াম, সালামুন আলা যাকারিয়্যা, সালামুন আলা দাউদ এবং সালামুন আলা সুলাইমান-এর ‘মিহরাব’-এর উদাহরণ টানা আল কুরআনের আলোকে শতভাগ নিখুঁত, যৌক্তিক এবং সমার্থক। মিহরাব হলো ইতেকাফের জন্য ব্যবহৃত সিজদাস্থান বা ইবাদতখানার প্রাচীন ও ঐশী রূপ।
প্রাসঙ্গিক দুআ-তাসবিহ:
মিহরাবে বা নিভৃত ইবাদতে (ইতেকাফে) রবের স্মরণ, ক্ষমা প্রার্থনা এবং সৎ-সন্ততি বা পবিত্রতার জন্য আল কুরআন মাজীদ থেকে নিম্নোক্ত দুআগুলো পাঠ করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ:
১. মিহরাবে দাঁড়িয়ে পড়া দুআ (সালামুন আলা যাকারিয়্যা-এর দুআ):
رَبِّ هَبْ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً ۖ إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ
রব্বি হাব্ লী মিল্লাদুনকা যুররিয়্যাতান ত্বইয়্যিবাহ; ইন্নাকা সামী‘উদ দু‘আ~।
অর্থ: 'হে আমার রব! আমাকে আপনার পক্ষ থেকে পবিত্র সন্তান দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী।' (আল কুরআন ৩:৩৮)
২. মিহরাবে সিজদাবনত অবস্থায় ক্ষমা প্রার্থনার দুআ:
لَّا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণ: লা-ইলা-হা ইল্লা-আন্তা সুবহা-নাকা ইন্নী কুনতু মিনাজ জ-লিমীন।
অর্থ: 'আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র মহান! নিশ্চয় আমি ছিলাম জালিমদের অন্তর্ভুক্ত।' (আল কুরআন ২১:৮৭)
৩. রহমত ও সুগম পথের দুআ:
رَبَّنَا آتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا
উচ্চারণ: রব্বানা- আ-তিনা- মিল্লাদুনকা রহমাতাওঁ ওয়া হাইয়্যি' লানা- মিন আমরিনা- রশাদা-।
অর্থ: 'হে আমাদের রব! আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন এবং আমাদের কাজকে আমাদের জন্য সুগম করে দিন।' (আল কুরআন ১৮:১০)
উচ্চারণ: রব্বানা-তাক্বাব্বাল্ মিন্না; ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল্ ‘আলীম্ অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-বুর রাহীম্।
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে ক্ববূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন। এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিইতো ক্ষমাশীল, দয়ালু—আল কুরআন ২:১২৭, ২:১২৮
وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রব্বুল আলামিনের।
