সাবেকুন -হতে পারি আমরাও সাবেকুন-জান্নাতী! সালেহীনদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সহজ কুরআনিক পথ! #Sabiqun #Good deed

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

আপনার দান যেন জান্নাতের ঘ্রাণ উপলব্ধি-হাতছানি: 

আল্লাহ সুবহানাহু তালা ওয়াজ করেন- 

“আর অগ্রবর্তীরাই অগ্রগামী (সাবেকুন)তারাই নৈকট্যপ্রাপ্ত। তারা থাকবে নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতে।” 

-সূরা আল-ওয়াকিয়াহ ৫৬:১০–১২

কারা নৈকট্যপ্রাপ্ত (সাবেকুন)? -কোন সে নর-নারী? কে বা কারা তারা? 

আল কুরআনে-এ “সাবেকুন” (السَّابِقُونَ) বলতে বোঝানো হয়েছে সেইসব মানুষকে, যারা ঈমান, তাকওয়া, দান, ইখলাস ও কল্যাণকর কাজে অন্যদের আগে এগিয়ে যায়। তারা শুধু ভালো কাজ করে না; বরং আন্তরিক ভয়, আশা ও বিনয়ের সাথে দ্রুত সাড়া দেয় আল্লাহর আহ্বানে। 

এখানে “সাবেকুন” মানে শুধু আগে যাওয়া নয়; বরং কল্যাণের প্রতিটি ক্ষেত্রে আন্তরিকভাবে এগিয়ে থাকা।

সাবেকুন” হওয়ার কুরআনিক আহ্বান: 

“তোমরা কল্যাণকর কাজে (খাইরাত) অগ্রগামী হও।” -২:১৪৮ (২১:৭৩)

আল্লাহ তাদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে-

তারা কল্যাণকর কাজে দ্রুত এগিয়ে যায় [‘ইউসারীউনা ফিল খাইরাত’]

-সূরা আলে ইমরান ৩:১১৪


কীভাবে অগ্রগামী হওয়া যায়? যারা হয়েছে তারা কেমন?

কল্যাণকর (খাইরাত) কাজ কী? তাঁদের-দের বৈশিষ্ট্য কী?

সূরা আল-মুমিনূন (২৩:৫৭–৬২)-এ আল্লাহ “সাবেকুন”-দের বৈশিষ্ট্য সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন।

১. নিশ্চয় যারা তাদের রবের ভয়ে ভীত (সজাগ থাকে) -(দ্র: আয়াত ২৩:৫৭) 

২. যারা তাদের রবের আয়াতসমূহে বিশ্বাস রাখে (আস্থা রাখে)” -(দ্র: আয়াত ২৩:৫৮)

(কুরআনের নির্দেশ তাদের জীবনের মানদণ্ড হয়ে যায়)

৩. যারা তাদের রবের সাথে কাউকে শরিক করে না (অংশ বা যুক্ত করে না) -(দ্র: আয়াত ২৩:৫৯)

(রবের সাথে শিরক বা যুক্তকরন কি বুঝতে দ্র: আয়াত ১৮:৩২-৪২, ১৮:১১০)

৪. দান করে বিনয় ও ভয় নিয়ে -(দ্র: আয়াত ২৩:৬০)

(তারা দান করে, কিন্তু অহংকারে নয়—ভীত হৃদয়ে। তারা দান বা আমল করে আত্মতুষ্ট হয় না। বরং ভয় করে—আল্লাহ কবুল করবেন তো?

এরপর আল্লাহ বলেন-

উলাইকা ইউসারিঊনা ফিল খাইরাতি ওয়া হুম লাহা সাবিকূন।

“তারাই কল্যাণের কাজে দ্রুত অগ্রসর হয়, এবং তারাই তাতে অগ্রগামী (সাবেকুন)।” [‘ইউসারীউনা ফিল খাইরাত’] -২৩:৬১

এখানে “সাবিকুন” শব্দটি দেখাচ্ছে—তাদের জীবনের কেন্দ্র হলো খাইরাত বা কল্যাণকর কাজ।


তারা কতটুকু করে?

আল্লাহ মানুষের সাধ্যের সীমা জানেন।

“আর আমরা কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দিই না।” — ২৩:৬২

অতএব “সাবেকুন” হওয়া মানে সবার মতো সমান পরিমাণ কাজ করা নয়; বরং নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু আন্তরিকভাবে আল্লাহর জন্য ব্যয় করা।

লক্ষ্য করুন এখানে দান করা বা দেয়া মানে শুধু অর্থ-সম্পদ দান করা এমনটি নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি-

সুতরাং কারও সামর্থ্য অর্থে, কারও জ্ঞানে, কারও ধৈর্যে, কারও সেবায়, কারও দোয়ায়।

দাম্পত্য জীবনে “সাবেকুন”-এর এক অনন্য উদাহরণ:

আল্লাহ- সালামুন আলা জাকারিয়্যা ও তাঁর পরিবারের কথা উল্লেখ করেছেন—

এবং যাকারিয়া, যখন সে তার রবকে ডেকে বলেছিল-

(রব্বি লাতাজারনি ফারদাও ওয়াআংতা খাইরুল ওয়ারিসিন!)

হে আমার রব! আমাকে একাকী ছেড়ে দিবেন না। আর আপনিই উত্তম মালিকানার অধিকারী। 

তখন আমরা তার জন্য সাড়া দিয়েছিলাম এবং আমরা তার জন্য দান করেছিলাম ইয়াহইয়াকে আর আমরা তার দাম্পত্যসাথীকে (স্বামী-স্ত্রী) তার জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন করেছিলামনিশ্চয় তারা ভালকাজের ক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যেত (ইউছারিউনা ফিল খাইরাতি) এবং আমাদেরকে আগ্রহ ও ভয় নিয়ে ডাকত। আর তারা ছিল আমাদের কাছে বিনয়াবনত (খাসিইন) -সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৮৯-৯০

এখানে দেখা যায়, নেককার দাম্পত্য শুধু একসাথে থাকা নয়; বরং একসাথে আল্লাহর দিকে এগিয়ে যাওয়া।

তারা—

■ একে অপরকে ঈমানের পথে সাহায্য করে,

■ দোয়ায় একত্র হয়,
■ কল্যাণে প্রতিযোগিতা করে,
■ আল্লাহর কাছে আশা ও ভয় নিয়ে ফিরে আসে।

সারকথা:

“সাবেকুন” হলো সেইসব মানুষ—

■ যারা ঈমানকে জীবন্ত রাখে,

■ দ্রুত ভালো কাজে সাড়া দেয়,

■ রবের সাথে তথা রবের বিধানের সাথে কোন কিছু যুক্ত করা থেকে বিরত থাকে,

■ দান করে বিনয়ের সাথে,

■ নিজেদের আমল নিয়ে আত্মতুষ্ট হয় না,

■ এবং সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য।

তাদের লক্ষ্য শুধু জান্নাত নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য।

“তারাই নৈকট্যপ্রাপ্ত; নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতসমূহে।” — ৫৬:১১–১২

 এবং এরাই সালেহীনদের মধ্যে অর্ন্তভুক্ত:

তারা আল্লাহর ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে এবং ন্যায়ের আদেশ করে ও অন্যায় থেকে নিষেধ করে এবং কল্যাণকর কাজের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর ওরাই সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত-আয়াত ৩:১১৪ 

“আর আমরা তাদেরকে আমাদের রহমতের অন্তর্ভুক্ত করেছি। নিশ্চয় তারা ছিল সালেহীনদের অন্তর্ভুক্ত।” -আয়াত ২১:৮৬

আর এরাই জান্নাতী: 

“আর যে আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে, তারা থাকবে তাদের সঙ্গে—যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন; নবী, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ ও সালেহীনদের সঙ্গে। আর তারা কত উত্তম সঙ্গী!” -সূরা আন-নিসা ৪:৬৯

“সাবেকুন” হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় কুরআনি দুআসমূহ:

কুরআন-এ “সাবেকুন” হওয়ার আকাঙ্ক্ষা মানে আল্লাহর দিকে দ্রুত ফিরে আসা, কল্যাণে অগ্রসর হওয়া এবং অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা। এ উদ্দেশ্যে কিছু কুরআনি দুআ ও তাসবিহ খুব গভীরভাবে সম্পর্কিত।

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ

রাব্বানাগফির লানা ওয়া লি-ইখওয়ানিনাল্লাযীনা সাবাকূনা বিল-ঈমানি, ওয়া লা তাজআল ফি কুলুবিনা গিল্লাল্লিল্লাযীনা আমানূ। রাব্বানা ইন্নাকা রাউফুর রাহীম।

হে আমাদের রব! আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের সেই ভাইদেরও, যারা ঈমানে আমাদের আগে অগ্রগামী হয়েছে (সাবাকূনা বিল-ঈমানি)। আর মুমিনদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয় আপনি অতি স্নেহশীল, পরম দয়ালু।”

— সূরা আল-হাশর ৫৯:১০

১. হিদায়াত ও তাকওয়ার দুআ

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ

হে আমাদের রব! হিদায়াত দেওয়ার পর আমাদের অন্তর বক্র করে দেবেন না, আর আমাদেরকে আপনার পক্ষ থেকে রহমত দান করুন।  -৩:৮

এ দুআ “সাবেকুন”-দের অন্তরের স্থিরতা শেখায়।


২. সালেহীনদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দুআ:

رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ

হে আমার রব! আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন এবং আমাকে সালেহীনদের অন্তর্ভুক্ত করুন। -২৬:৮৩

৩. অন্তরকে ইখলাসপূর্ণ রাখার দুআ

وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

আর আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য অনুসরণীয় বানান।-২৫:৭৪

এ দুআ নেতৃত্ব নয়, বরং তাকওয়ায় অগ্রগামী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা।


৪. কল্যাণে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা

رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ

হে আমাদের রব! আমাদের উপর ধৈর্য ঢেলে দিন এবং মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দিন। -৭:১২৬

“সাবেকুন” হওয়ার পথে ধৈর্য অপরিহার্য।

৫. দাম্পত্য ও পরিবারকে নেককার বানানোর দুআ

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের প্রশান্তি বানান এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ বানান। -২৫:৭৪

এটি পরিবারকে নিয়েও “খাইরাতে অগ্রগামী” হওয়ার দুআ।


৪. হাসবুনাল্লাহ!

حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ

আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক। — ৩:১৭৩

এটি ভয় ও নির্ভরতার ভারসাম্য শেখায়।


“সাবেকুন” হওয়ার অন্তরগত অবস্থা:

কুরআনের আলোকে তারা—

ভয় ও আশার মাঝখানে থাকে,

আমল করেও কবুল হওয়ার ভয় রাখে,
দ্রুত ভালো কাজে সাড়া দেয়,
বিনয়ী থাকে,

এবং নিজেদের সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে।

আল্লাহ বলেন

فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ

তোমরা কল্যাণকর কাজে অগ্রগামী হও।-২:১৪৮

আল হামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামিন!

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post