স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন—তাই কি আপনি ‘স্মার্ট’?
মানুষ হওয়াই কি সৃষ্টির সেরা হওয়ার প্রমাণ?
সব মানুষই কি সৃষ্টির সেরা? তাহলে কুরআন কী বলে—সৃষ্টির সেরা কারা?
কুরআন আমাদের মানুষের মর্যাদা, জ্ঞান, বিবেক, তাকওয়া, ঈমান ও আমলের ভিত্তিতে বিষয়টি বুঝতে শেখায়।
মানুষকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে:
আল্লাহ বলেন—
“আর অবশ্যই আমি আদম-সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, স্থলে ও সমুদ্রে তাদের বহন করেছি, তাদেরকে পবিত্র রিজিক দিয়েছি এবং আমি যাদের সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের ওপর তাদেরকে বিশেষ মর্যাদা (ফাদল) দিয়েছি।”
— সূরা আল-ইসরা ১৭:৭০
অর্থাৎ, মানুষকে আল্লাহ বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। কিন্তু প্রত্যেক মানুষই কি একইভাবে মর্যাদাবান এবং সৃষ্টির সেরা? কুরআনের পরবর্তী আয়াতগুলো আমাদের ভিন্ন একটি বাস্তবতা দেখায়।
মানুষ জ্ঞান-বিবেক ব্যবহার না করলে?
আল্লাহ বলেন—
“আর অবশ্যই আমি জাহান্নামের জন্য বহু জিন ও মানুষ সৃষ্টি করেছি। তাদের হৃদয় আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না; তাদের চোখ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না; তাদের কান আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তার চেয়েও অধিক পথভ্রষ্ট। তারাই গাফেল।”
— সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৭৯
এখানে মানুষকে শুধু মানুষ হওয়ার কারণে ‘সেরা’ বলা হয়নি। বরং হৃদয়, চোখ ও কান থাকার পরও সেগুলো সত্য উপলব্ধির কাজে ব্যবহার না করলে মানুষ পশুর চেয়েও অধম অবস্থায় নেমে যেতে পারে।
নিজেদের নির্বোধ বানিয়ে রাখে কারা?
আল্লাহ বলেন—
“সাবধান! তারাই নির্বোধ, কিন্তু তারা তা জানে না।”
— সূরা আল-বাকারা ২:১৩
অর্থাৎ অজ্ঞতা শুধু জ্ঞান না থাকার বিষয় নয়; সত্য উপলব্ধির সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা প্রত্যাখ্যান করা এবং নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা ভয়াবহ পরিণতির কারণ হতে পারে।
যারা জানে এবং যারা জানে না—তারা কি সমান?
আল্লাহ বলেন—
“বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান? বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরাই (উলুল আলবাব) কেবল উপদেশ গ্রহণ করে।”
— সূরা আয-যুমার ৩৯:৯
আবার আল্লাহ বলেন—
“কিন্তু অধিকাংশ মানুষই জানে না।”
— সূরা ইউসুফ ১২:২১
প্রকৃত জ্ঞানী কারা?
আল্লাহ বলেন—
“এসব দৃষ্টান্ত আমি মানুষের জন্য বর্ণনা করি; কিন্তু জ্ঞানীরাই (আলিমুন) তা অনুধাবন করে।”
— সূরা আল-আনকাবূত ২৯:৪৩
আর কুরআন নাযিলের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে—
“এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং বোধশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিরা উপদেশ গ্রহণ করে।” -সূরা সোয়াদ ৩৮:২৯
উলামা (জ্ঞানী) -এর সংজ্ঞা: যা আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুল জানিয়েছেন এভাবে-
মূলত তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল। নিশ্চয় যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে এবং সলাত প্রতিষ্ঠা করে আর আমরা তাদেরকে যা রিযিক দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসার আশা করে, যা কখনও ব্যর্থ হবে না।-সূরা আল ফাতির; আয়াত ৩৫:২৮-২৯
এবং গভীর জ্ঞানের অধিকারীরা (ইনটেলিকচুয়াল) কেবলই একমাত্র রবের পক্ষ থেকে একমাত্র নাযিলকৃত কিতাবের প্রতি ঈমান এনে থাকেন -তাঁরাই স্মার্ট (উলুল আলবাব): দ্র: আয়াত ৩:৭
মুত্তাকীরাই প্রকৃত সজাগ ও সচেতন updated:
আল্লাহ বলেন—
“এটি মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত।”
— সূরা আল-বাকারা ২:২
আর মানুষের মর্যাদার প্রকৃত মাপকাঠি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন—
إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ
“নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে-ই, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।”
— সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১৩
জ্ঞান যার অন্তরে আল্লাহভীতি সৃষ্টি করে:
আল্লাহ বলেন—
“আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই (আলিমুন) কেবল তাঁকে ভয় করে।”
— সূরা ফাতির ৩৫:২৮
অর্থাৎ কুরআনের দৃষ্টিতে প্রকৃত জ্ঞান শুধু তথ্য জানা নয়; সেই জ্ঞান মানুষের অন্তরে আল্লাহভীতি, সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে।
তাহলে সৃষ্টির সেরা কে?
কুরআন সরাসরি বলে—
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَٰئِكَ هُمْ خَيْرُ الْبَرِيَّةِ
“নিশ্চয়ই যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে (সে অনুযায়ী আমল করে/নিজকে সে অনুযায়ী সংশোধন করে), তারাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ।”
— সূরা আল-বাইয়্যিনাহ ৯৮:৭
এখানে কুরআন “সব মানুষ” বলেনি; বরং নির্দিষ্টভাবে বলেছে—
যারা ঈমান এনেছে + সৎকর্ম করেছে = তারাই “খাইরুল বারিয়্যাহ” (সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ)।
আর তাদের প্রতিদান—
“তাদের প্রতিদান তাদের রবের কাছে স্থায়ী জান্নাত... আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট।”
— সূরা আল-বাইয়্যিনাহ ৯৮:৮
তাহলে আসল ‘স্মার্ট’ কে?
শুধু স্মার্টফোন আছে বলে স্মার্ট নয়।
কুরআনের আলোকে প্রকৃত বুদ্ধিমান ও সফল মানুষ সে—
জানে → বোঝে → চিন্তা করে → সত্য গ্রহণ করে → তাকওয়া অবলম্বন করে → ঈমান আনে → সৎকর্ম করে।
আর কুরআনের ভাষায়—
“তারাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ।”
— খাইরুল বারিয়্যাহ — (৯৮:৭)
অন্যদিকে যে জ্ঞান-বিবেকের সুযোগ পেয়েও তা ব্যবহার করে না, তার সম্পর্কে কুরআন সতর্ক করেছে—
“তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তার চেয়েও অধিক পথভ্রষ্ট। তারাই গাফেল।”
— সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৭৯
তাই প্রশ্নটা হওয়া উচিত—
আমার হাতে স্মার্টফোন আছে কি না—তা নয়;
আমার অন্তর (ক্বলব) কি কুরআনের জ্ঞানে জাগ্রত, সজাগ ও সচেতন?
(সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪৬; সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৭৯)
আমি কি কুরআন গভীরভাবে জানি, বুঝি ও অনুধাবন করি?
(সূরা আলে ইমরান ৩:৭–৮; সূরা সোয়াদ ৩৮:২৯; সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:২৪)
আমি কি জ্ঞান ও উপলব্ধির ভিত্তিতে ঈমান এনেছি?
(সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:১৯; সূরা আল-হাজ্জ ২২:৫৪; সূরা আলে ইমরান ৩:১৮)
এবং আমি কি সেই ঈমান অনুযায়ী আমল করি—সৎকর্ম সম্পাদন করি?
(সূরা আল-বাইয়্যিনাহ ৯৮:৭; সূরা আল-আসর ১০৩:৩)
কারণ কুরআনের ভাষায়—যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারাই “খাইরুল বারিয়্যাহ”—সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ।
(সূরা আল-বাইয়্যিনাহ ৯৮:৭)
কারণ কুরআনের মাপকাঠিতে—মানুষের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব তার বাহ্যিক ‘স্মার্টনেসে’ নয়; বরং ঈমান, সৎকর্ম, জ্ঞান, উপলব্ধি ও তাকওয়ায়।