প্রচলিত সংস্কৃতিতে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য ‘ফি আমানিল্লাহ’ বা এই জাতীয় শব্দ ব্যবহারের প্রচলন থাকলেও, আল-কুরআন মাজীদ আমাদের শিখিয়েছে আরোগ্য (শিফা) লাভের এক অনন্য ও গভীরতর পদ্ধতি। অসুস্থতা কেবল একটি শারীরিক অবস্থা নয়, বরং এটি মানুষের সীমাবদ্ধতা এবং রবের অসীম দয়ার মধ্যকার একটি সেতুবন্ধন। আল-কুরআন মাজীদের আয়াতের বুনন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আরোগ্য লাভের মূল চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে রবের প্রতি পূর্ণ সমর্পণ এবং তাঁর গুণবাচক বৈশিষ্ট্যের যথাযথ উপলব্ধির মধ্যে।
শিফা বা আরোগ্যের উৎস:
সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর প্রজ্ঞা আরোগ্য লাভের ক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান ধাপ হলো অসুস্থতাকে নিজের সাথে এবং সুস্থতাকে সরাসরি আল্লাহ রব্বুল আলামিনের সাথে সম্পর্কিত করা। ইব্রাহিম (সা.আ.) যখন তাঁর রবের পরিচয় দিচ্ছিলেন, তখন তিনি একটি অকাট্য সত্য তুলে ধরেন:
“এবং যখন আমি অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন।” (২৬:৮০)
এখানে শব্দগত বিন্যাসটি লক্ষণীয়। তিনি বলেননি যে ‘আল্লাহ আমাকে অসুস্থ করেন’, বরং বলেছেন- “যখন আমি অসুস্থ হই” (وَإِذَا مَرِضْتُ)। এটি মানুষের বিনয় ও আদবকে নির্দেশ করে। অথচ আরোগ্য বা সুস্থতার ক্ষেত্রে তিনি সরাসরি ‘তিনি’ (هُوَ - হুয়া) সর্বনাম ব্যবহার করে আল্লাহ রব্বুল আলামিনকে নির্দিষ্ট করেছেন। এই আয়াতটি আমাদের শেখায় যে, আরোগ্য কোনো জড় পদার্থের বা ওষুধের গুণ নয়, বরং এটি সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা একটি ফয়সালা।
বিপদ ও করুণার সংযোগ:
সালামুন আলা আইয়ুব -এর আর্তি দীর্ঘকালীন অসুস্থতা ও কষ্টের সময় একজন মুমিন কীভাবে রবের কাছে আরজি পেশ করবে, তার সর্বোত্তম কাঠামো পাওয়া যায় আইয়ুব (সা.আ.)-এর ভাষায়। তিনি যখন চরম সংকটে ছিলেন, তখন তিনি সরাসরি কোনো দাবি না জানিয়ে নিজের অবস্থাটি রবের সামনে মেলে ধরেছিলেন:
“আমি কষ্টের সম্মুখীন হয়েছি (مَسَّنِيَ الضُّرُّ), আর আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু।” (২১:৮৩)
এখানে ‘দুর্’ (ضُرُّ) শব্দটি শারীরিক ও মানসিক সকল প্রকার ক্ষতিকর অবস্থাকে নির্দেশ করে। সালামুন আলা আইয়ুব নিজের রোগের বর্ণনা না দিয়ে কেবল বলেছেন তিনি ‘কষ্টের স্পর্শ’ পেয়েছেন। এর বিপরীতে তিনি আল্লাহর গুণবাচক নাম ‘আরহামুর রাহিমীন’ (أَرْحَمُ
الرَّاحِمِينَ) উল্লেখ করেছেন। কুরআনিক এই শৈলী নির্দেশ করে যে, যখন বান্দা নিজের অসহায়ত্ব এবং রবের করুণার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে, তখনই আরোগ্যের দুয়ার উন্মুক্ত হয়। এখানে কোনো আদেশ নেই, আছে কেবল এক গভীর ও আধ্যাত্মিক আর্তি।
আল-কুরআন নিজেই ‘শিফা’:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কুরআন মাজীদকে কেবল পথনির্দেশ হিসেবে নয়, বরং আরোগ্য হিসেবেও ঘোষণা করেছেন।
“আমি অবতীর্ণ করি আল-কুরআন, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য (شِفَاءٌ) ও রহমত।” (আয়াত ১৭:৮২)
অন্যত্র বলা হয়েছে:
হে মানুষ! তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে উপদেশ এবং তোমাদের অন্তরের ব্যাধির আরোগ্য। (আয়াত ১০:৫৭)
এখানে ‘শিফা’ শব্দটি ব্যাপক অর্থবহ। এটি কেবল শারীরিক রোগ নয়, বরং মানুষের মনের অস্থিরতা, হতাশা এবং আধ্যাত্মিক সংকীর্ণতারও মহৌষধ। আয়াতের ‘নজম’ বা বিন্যাস অনুযায়ী, কুরআন প্রথমে উপদেশ (মাও'ইযাহ) দেয়, যা মানুষের চিন্তাকে সংশোধন করে, আর চিন্তার সংশোধনই শারীরিক সুস্থতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
বিপরীতমুখী চিত্র: হতাশা বনাম রহমত
অসুস্থতার সময় মানুষের মনে হতাশা আসা স্বাভাবিক। কুরআন এই হতাশাকে (يَأْس - ইয়াস) কুফরির সমতুল্য হিসেবে চিত্রিত করেছে।
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না; কেবল কাফেররাই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়। (১২:৮৭)
অসুস্থ ব্যক্তির জন্য সবচেয়ে বড় ঔষধ হলো এই ‘আশা’ বা ‘রজা’। যখন কেউ নিজেকে রবের রহমতের চাদরে আবৃত মনে করে, তখন তার অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধি পায়। বিপরীতমুখী আয়াতসমূহে দেখা যায়, যারা কেবল দুনিয়াবি উপায়ের ওপর নির্ভর করে এবং রবের ওপর ভরসা হারায়, তাদের কষ্ট দীর্ঘতর হয়।
সালাত ও সবরের মাধ্যমে সহায়তা গ্রহণ:
অসুস্থ অবস্থায় ধৈর্য (সবর) এবং রবের সাথে সংযোগ (সালাত) স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে আল-কুরআন:
“তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।” (২:৪৫)
এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক চিকিৎসা। সবর মানুষের স্নায়ুচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, আর সালাত বান্দাকে পরম সত্তার সাথে যুক্ত করে তার ভেতর প্রশান্তি বয়ে আনে। এই প্রশান্তিই আরোগ্য লাভের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
যৌক্তিক পূর্ণতা:
আল-কুরআনের আলোকে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য শ্রেষ্ঠ দুআ হলো—রবের সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করা, নিজের অক্ষমতাকে প্রকাশ করা এবং তাঁর অসীম করুণার কাছে সমর্পণ করা। ‘ফি আমানিল্লাহ’ বা এই জাতীয় প্রচলিত বাক্যের চেয়ে কুরআনের শিখিয়ে দেওয়া ভাষা অনেক বেশি শক্তিশালী এবং আধ্যাত্মিকভাবে কার্যকর। এটি অসুস্থ ব্যক্তির মনে এই বিশ্বাস প্রোথিত করে যে, রোগ নিরাময় কোনো দৈব ঘটনা নয়, বরং এটি ‘আশ-শাফী’ (আরোগ্যদানকারী)-র এক সুনিশ্চিত অনুগ্রহ।
অসুস্থতা ও আরোগ্য লাভের জন্য আল-কুরআনিক দুআ- তাসবিহ:
অসুস্থ ব্যক্তির জন্য বা অসুস্থ ব্যক্তি নিজে যে দুআগুলো আল-কুরআনের আয়াত থেকে তিলাওয়াত করতে পারেন:
১. আইয়ুব (সালামুন আলাইহে)-এর আরোগ্য লাভের দুআ:
أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَأَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
উচ্চারণ: আন্নী মাস্সানিয়াদ্ দুর্রু অ আন্তা আরহামুর-রা-হিমীন।
অর্থ: আমি কষ্টের সম্মুখীন হয়েছি, আর আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়ালু। (সুরা আল-আম্বিয়া, ২১:৮৩)
২. সালামুন আলা ইব্রাহিম -এর দৃঢ় বিশ্বাসের অভিব্যক্তি:
رَبَّ ٱلْعَـٰلَمِينَ الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِينِ وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينِ وَالَّذِي أَطْمَعُ أَن يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ
রব্বাল আলামিনাআল্লাযী খলাক্বনী ফাহুওয়া ইয়াহ্দীন্। অল্লাযী হুওয়া ইয়ুত্ব‘ইমুনী অইয়াস্ক্বীন্। অ ইযা-মারিদ্ব্তু ফাহুওয়া ইয়াশ্ফীন্। অল্লাযী ইয়ুমীতুনী ছুম্মা ইয়ুহ্য়ীন্। অল্লাযী- আত্বমাউ’ আইঁ ইয়াগ্ফিরালী খাতী-আতী ইয়াওমাদ দীন্।
অর্থ: জগতসমূহের রব যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, সুতরাং তিনিই আমাকে পথ দেখাবেন। এবং তিনিই, যিনি আমাকে খাওয়ান এবং আমাকে পান করান। আর যখন আমি অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন; আর তিনিই আমাকে মৃত্যু দিবেন, তারপর আমাকে জীবিত করবেন। আর তিনিই, আমি আশা করি যে, বিচার দিবসে তিনি আমার জন্য আমার দ্রæটিগুলো ক্ষমা করে দিবেন-আল কুরআন ২৬:৭৭-৮২ (৩০:৪০)।
وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ
উচ্চারণ: অ ইযা মারিদ্বতু ফাহুওয়া ইয়াশফীন।
অর্থ: এবং যখন আমি অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন। (সুরা আশ-শুআরা, ২৬:৮০)
৪. সার্বিক কষ্ট দূরীকরণ ও আশ্রয়ের দুআ:
أَنِّي مَسَّنِيَ الشَّيْطَانُ بِنُصْبٍوَعَذَابٍ
উচ্চারণ: আন্নী মাস্সানিয়াশ শাইত্ব-নু বিনুস্ববিঁও অ ‘আযা-ব।
অর্থ: শয়তান আমাকে যন্ত্রণা ও কষ্টের মধ্যে ফেলেছে। (সুরা সোয়াদ, ৩৮:৪১)
(উল্লেখ্য: অসুস্থতার সময় মানসিক অস্থিরতা কাটাতে আইয়ুব সালামুন আলাইহে এই আরজি পেশ করেছিলেন)
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ وَتُبْ عَلَيْنَاۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
ব্বানা-তাক্বাব্বাল্ মিন্না; ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল্ ‘আলীম্ অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-বুর রাহীম্।
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে ক্ববূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন। এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিইতো ক্ষমাশীল, দয়ালু। (আল কুরআন ২:১২৭, ২:১২৮)
سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ وَلَامٌ عَلَىالْمُرْسَلِينَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
সুবহা-না রব্বিকা রব্বিল ‘ইযযাতি ‘আম্মা- ইয়াসিফূন। অসালা-মুন ‘আলাল মুরসালীন।
অলহামদু লিল্লা-হি রব্বিল ‘আ-লামীন!
অর্থ: আপনার রব, যিনি সকল সম্মানের অধিকারী, তিনি তারা যা আরোপ করে তা থেকে পবিত্র।
এবং রাসুলগণের প্রতি শান্তি (সালাম)। আর সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহে প্রতিপালক আল্লাহর
জন্য। (আল কুরআন ৩৭:১৮০-১৮২)
