বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
জীবনের শেষ অধ্যায়: এক নতুন উচ্চতার সূচনা:
মানুষ সাধারণত বয়স বাড়লে বা কর্মজীবন থেকে অবসর নিলে একঘেয়েমি বা অপ্রয়োজনীয়তার বোধে ভোগে। কিন্তু আল কুরআন মুমিনকে এক অনন্য আশার বাণী শোনায়:
আর অবশ্যই আপনার জন্য পরবর্তী সময়টি (আখিরাত বা জীবনের শেষ পর্যায়) পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে উত্তম। (৯৩:৪)
অনুধ্যান: যদিও এই আয়াতের প্রাথমিক সম্বোধন মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-এর প্রতি, তবে আল কুরআনের সামগ্রিক বার্তা অনুযায়ী (২:২৮৫) এটি সকল বিশ্বাসীর জন্য একটি মহাজাগতিক সত্য। অর্থাৎ, হিদায়াতের পথে চলা একজন মুমিনের জীবনের শেষ অধ্যায়টি হবে তার পূর্ববর্তী জীবনের চেয়ে অধিকতর পরিণত, আধ্যাত্মিক ও সুন্দর।
আল কুরআনের আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ: আপনি আর কী করছিলেন?
আল কুরআন মাজীদ কেবল পাঠ করার কোনো গ্রন্থ নয়, বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট ‘আমানত’ যা মানুষের ওপর অর্পিত হয়েছে। পরকালীন জীবনে মানুষের অস্তিত্ব, তার পরিচয় এবং তার কর্মের হিসাব সরাসরি এই কিতাবের সাথে যুক্ত থাকবে। আল কুরআন ও এর আয়াতসমূহ অনুধাবনের ক্ষেত্রে মানুষের অবহেলা এবং এর বিপরীতে রবের পক্ষ থেকে যে কঠোর প্রশ্ন উত্থাপিত হবে, তা আল কুরআনের আয়াতের অভ্যন্তরীণ বিন্যাসে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিবৃত হয়েছে।
শেষের দিকে ১টি ভিডিও সংযুক্ত-
১. আল কুরআন: আপনার সম্মান এবং আপনার দায়বদ্ধতা (৪৩:৪৪):
আল কুরআন মাজীদে আল্লাহ সু.তা. এই কিতাবকে মানুষের ‘জিকর’ বা পরিচয় ও সম্মানের উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এই সম্মানের সাথে একটি অনিবার্য প্রশ্নও জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন:
আর নিশ্চয়ই এটি (আল কুরআন) আপনার জন্য এবং আপনার জাতির জন্য এক ‘জিকর’ (সম্মান/স্মারক); এবং শীঘ্রই তোমাদেরকে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে (ওয়া সাওফা তুস-আলুন)। (৪৩:৪৪)
বিশ্লেষণ ও অনুধ্যান: এই আয়াতে ‘জিকর’ (ذِكْرٌ) শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ যেমন সম্মান, তেমনি এর অর্থ হলো স্মরণিকা বা স্মারক। অর্থাৎ, কুরআন আপনার জীবনের এমন এক রেফারেন্স পয়েন্ট, যা অনুসারে আপনার পরিচয় নির্ধারিত হবে। আল্লাহ বলছেন, “শীঘ্রই তোমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে”—এই জিজ্ঞাসাটি মূলত এই কিতাবের হক আদায় এবং এর আয়াতের জ্ঞান অর্জন সম্পর্কে। এই আয়াতটি আল কুরআনের সাথে মানুষের এক অলঙ্ঘনীয় আইনি ও আধ্যাত্মিক চুক্তির ইঙ্গিত দেয়।
২. জ্ঞানহীনতার কারণ এবং কর্মের কৈফিয়ত (২৭:৮৪):
হিসাবের ময়দানে যখন মানুষ রবের সামনে দাঁড়াবে, তখন আয়াতসমূহ না বোঝার বা উপেক্ষা করার বিষয়টিকে ‘অস্বীকার’ করার শামিল করা হয়েছে। আল্লাহ সু.তা. সেই পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে বলেন:
পর্যন্ত যখন তারা (হিসাবের জন্য) আসবে, তখন তিনি (আল্লাহ) বলবেন:
তোমরা কি আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছিলে—যদিও তোমরা জ্ঞান দ্বারা তা আয়ত্ত করতে পারোনি? অথবা তোমরা আর কী করছিলে (আম্মা-যা কুনতুম তা’মালুন)? (২৭:৮৪)
গভীর অনুধাবন: এই আয়াতে “আম্মা-যা কুনতুম তা’মালুন” (أَمَّاذَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ) প্রশ্নটি এক ভয়াবহ সত্য উন্মোচন করে। এর অর্থ হলো—যদি তোমরা আমার আয়াতগুলো বোঝার জন্য সময় ব্যয় না করো, তবে সেই সময়টুকুতে তোমরা আর এমন কী গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছিলে? অর্থাৎ, আল্লাহর আয়াতের জ্ঞান অর্জনের চেয়ে বড় কোনো কাজ মানুষের থাকতে পারে না। জীবনের সকল কর্মতৎপরতা ম্লান হয়ে যাবে যদি তাতে রবের বার্তার কোনো স্থান না থাকে। এটি এক আধ্যাত্মিক ধমক যা মানুষকে তার অগ্রাধিকার (Priority) পুনর্বিন্যাস করতে উদ্বুদ্ধ করে।
৩. বার্তার প্রাপক ও বাহক: সবার প্রতি সাধারণ জিজ্ঞাসাবাদ (৭:৬)
জিজ্ঞাসাবাদ কেবল সাধারণ মানুষের জন্যই নয়, বরং যাদের কাছে বার্তা পৌঁছেছে এবং যারা পৌঁছে দিয়েছেন—উভয় পক্ষকেই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
“অতঃপর আমি অবশ্যই তাদের জিজ্ঞাসা করব যাদের কাছে (রাসূল) পাঠানো হয়েছে এবং আমি অবশ্যই রাসূলদেরকেও জিজ্ঞাসা করব।” (৭:৬)
এখানে ‘নজম’ বা বিন্যাস লক্ষ্য করুন! আল্লাহ প্রথমে উম্মতকে জিজ্ঞাসা করবেন—তোমরা বার্তাটি কীভাবে গ্রহণ করেছিলে? তোমরা কি এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করেছিলে? এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে সূরা আল-মায়েদার ১০৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ রাসূলদের একত্র
করে বলবেন, “তোমরা কী উত্তর পেয়েছিলে?” অর্থাৎ, কুরআনের জ্ঞান ও এর প্রয়োগই হবে পরকালের প্রধান বিচার্য বিষয়।
৪. অনুধ্যানের অভাব এবং তালাবদ্ধ হৃদয়ের পরিণতি (৪৭:২৪):
কেন মানুষ আয়াতের জ্ঞান অর্জন করে না? আল কুরআন এর কারণ হিসেবে হৃদয়ের কাঠিন্য ও তালাবদ্ধ অবস্থাকে দায়ী করেছে।
তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর অনুধ্যান (তাদাব্বুর) করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহে তালা লাগানো রয়েছে? (৪৭:২৪)
এখানে আল কুরআনের আয়াতসমূহ না বোঝার বিষয়টি কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি একটি চারিত্রিক বিচ্যুতি। যারা এই আয়াত নিয়ে চিন্তাভাবনা করে না, তাদের বিরুদ্ধে এই প্রশ্নটিই হবে সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে রবের নির্দেশনাকে এড়িয়ে গিয়েছিল।
৫. আল কুরআনের হক আদায়: হাক্কা তিলাওয়াতিহি (২:১২১):
আয়াতগুলোর জ্ঞান অর্জন বলতে কেবল যান্ত্রিক পাঠ বোঝায় না। আল্লাহ সু.তা. প্রকৃত জ্ঞান অন্বেষণকারীদের মানদণ্ড দিয়েছেন:
যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তা পাঠ করে যেভাবে পাঠ করা উচিত (হাক্কা তিলাওয়াতিহি); তারাই এর ওপর ঈমান রাখে। (২:১২১)
এখানে ‘হাক্কা তিলাওয়াতিহি’ মানে হলো—একে বোঝা, এর জ্ঞান আয়ত্ত করা এবং সে অনুযায়ী কর্ম সম্পাদন করা। যারা এই হক আদায় করে না, ২৭:৮৪ আয়াতের সেই প্রশ্নটি তাদের জন্যই তোলা রয়েছে— “তবে তোমরা আর কী করছিলে?”
জীবনের শেষ অধ্যায়: এক নতুন উচ্চতার সূচনা:
মানুষ সাধারণত বয়স বাড়লে বা কর্মজীবন থেকে অবসর নিলে একঘেয়েমি বা অপ্রয়োজনীয়তার বোধে ভোগে। কিন্তু আল কুরআন মুমিনকে এক অনন্য আশার বাণী শোনায়:
আর অবশ্যই আপনার জন্য পরবর্তী সময়টি (আখিরাত বা জীবনের শেষ পর্যায়) পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে উত্তম। (৯৩:৪)
অনুধ্যান: যদিও এই আয়াতের প্রাথমিক সম্বোধন মুহাম্মদ (সালামুন আলাইহে)-এর প্রতি, তবে আল কুরআনের সামগ্রিক বার্তা অনুযায়ী (২:২৮৫) এটি সকল বিশ্বাসীর জন্য একটি মহাজাগতিক সত্য। অর্থাৎ, হিদায়াতের পথে চলা একজন মুমিনের জীবনের শেষ অধ্যায়টি হবে তার পূর্ববর্তী জীবনের চেয়ে অধিকতর পরিণত, আধ্যাত্মিক ও সুন্দর।
হিদায়াত অনুসরণ: দুশ্চিন্তা ও ভীতিমুক্ত জীবনের গ্যারান্টি:
অবসর জীবনে মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ‘ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা’ এবং ‘অতীতের গ্লানি’। আল কুরআন এর অব্যর্থ সমাধান দিয়েছে:
অতঃপর যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হিদায়াত আসবে, তখন যারা আমার হিদায়াত অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না। (২:৩৮)
জীবনের এই ‘গ্রেস টাইম’-এ যদি কেউ আল কুরআনের হিদায়াতকে (যা এক সময় তার কাছে অনভিজ্ঞ ছিল, ৯৩:৭) শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে, তবে তার বার্ধক্য কোনো বোঝা নয়, বরং আশীর্বাদে পরিণত হয়। এটিই হলো সেই ‘হুদা’ যা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসে।
হায়াতে তায়্যিবাহ অর্জনের শর্ত ও অবসর:
অবসর জীবনকে একটি ‘হায়াতে তায়্যিবাহ’ বা পবিত্র ও সুখী জীবনে রূপান্তরের জন্য আল কুরআন দুটি আবশ্যিক শর্ত দিয়েছে:
যে ব্যক্তি মুমিন অবস্থায় আমলে সালেহ (সৎকর্ম) করবে—সে পুরুষ হোক বা নারী—আমি তাকে অবশ্যই হায়াতে তায়্যিবাহ (পবিত্র ও সুন্দর জীবন) দান করব। (১৬:৯৭)
বার্ধক্যের শারীরিক দুর্বলতা (৩০:৫৪) যখন প্রকট হয়, তখন ‘আমলে সালেহ’ বা সংশোধনমূলক কর্মগুলো মানুষকে মানসিকভাবে শক্তিশালী রাখে। এই সময়ে বৈষয়িক ইঁদুর-দৌড় থেকে মুক্ত হয়ে সমাজ সংশোধন ও আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়াই হলো প্রশান্তির মূল উৎস।
তায়্যিব রিযিক ও আমলে সালেহ: কারণ ও ফলাফলের সম্পর্ক (২৩:৫১)
রবের নিয়ামত প্রচার: জীবনের ‘গ্রেস টাইম’-এর মূল কাজ:
চাকরি বা ব্যবসা থেকে অবসর নেওয়ার পর মানুষের হাতে যে সময়টুকু থাকে, আল কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী তার সর্বোত্তম ব্যবহার হলো:
“আর আপনার রবের নেয়ামতসমূহ বর্ণনা করুন।” (৯৩:১১)
বিশ্লেষণ: আল কুরআনের পরিভাষায় ‘নেয়ামত’ হলো আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান (৫:৩)। জীবনের এই পরিণত সময়ে একজন মুমিনের প্রধান কাজ হলো তার অর্জিত জ্ঞান ও আল্লাহর দ্বীন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এটি কেবল মুখস্থ বলা নয়, বরং নিজের জীবনে অহীর অনুশীলনের মাধ্যমে তার সুফল অন্যকে দেখানো। এটিই মানুষের অবসর জীবনকে সবচেয়ে বেশি অর্থবহ করে তোলে।
পড়ন্ত বিকেলে আল্লাহর আয়াতসমূহ এবং মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে এই চিন্তাভাবনা (৩৮:২৯) মানুষকে আল্লাহর যিকরের সাথে সংযুক্ত করে। আর এর মাধ্যমেই অর্জিত হয় হৃদয়ের প্রকৃত স্থিরতা:
“জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই কেবল অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” (১৩:২৮)
পরিশেষ: ইয়া আইয়াতুহান নাফসুল মুতমাইন্নাহ (প্রশান্তিকর বিদায়):
যখন একজন মুমিন তার অবসর জীবনকে ঈমান, আমলে সালেহ এবং আল কুরআনের অনুধ্যানে অতিবাহিত করে, তখন তার মৃত্যু আর ভয়ংকর কোনো বিভীষিকা থাকে না। বরং পৃথিবী থেকে তার বিদায় হয় এক পরম তৃপ্তির সাথে। সেই বিদায়লগ্নে তার রব তাকে সম্বোধন করে বলবেন:
“হে প্রশান্ত আত্মা (নাফসুল মুতমাইন্নাহ)! তুমি তোমার রবের কাছে ফিরে এসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার (নেককার) বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও। এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।” (৮৯:২৭-৩০)
এটিই হলো একজন বিশ্বাসীর জীবনের চূড়ান্ত সফলতা—পৃথিবীর কর্মজীবন শেষে রবের সান্নিধ্যে এক চিরস্থায়ী ও প্রশান্তিময় আশ্রয়ে প্রবেশ করা।
অবসর জীবনে নাতি-নাতনি ও বিনোদন: আল কুরআনের মানদণ্ডে সময়ের প্রকৃত মূল্যায়ন:
বার্ধক্য বা অবসর জীবনে পৌঁছে অনেকে মনে করেন, এখন কেবল নাতি-নাতনিদের সাথে
খেলাধুলা করা কিংবা টিভি দেখে সময় পার করাই জীবনের একমাত্র কাজ। কিন্তু আল কুরআন
মাজীদ মুমিনের সময়কে অত্যন্ত মূল্যবান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। সময়ের অপচয় এবং
পারিবারিক মোহের ভারসাম্য রক্ষা সম্পর্কে আল কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি নিচে বিশ্লেষণ করা হলো।
১. পরিবার ও সন্তান: নেয়ামত নাকি কেবল সময় কাটানোর মাধ্যম?
আল কুরআন অনুযায়ী সন্তান ও নাতি-নাতনিরা জীবনের সৌন্দর্য, কিন্তু তারা যেন জীবনের
একমাত্র লক্ষ্য না হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ সু.তা. ইরশাদ করেন:
ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য (যিনাতুল হায়াতুদ দুনিয়া); আর স্থায়ী সৎকর্মসমূহ (আল-বাক্বিয়াতুস সলিহাত) আপনার রবের কাছে প্রতিদানের আশায় শ্রেষ্ঠ এবং প্রত্যাশার স্থলেও শ্রেষ্ঠ। (১৮:৪৬)
অনুধাবন: নাতি-নাতনিদের সাথে সময় কাটানো একটি মানবিক আনন্দ, কিন্তু একে যদি কেবল ‘সময় কাটানোর’ (Time pass) উপায় হিসেবে নেওয়া হয়, তবে তা মুমিনের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ আল কুরআন সতর্ক করেছে যে, পরিবার ও সম্পদ যেন আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত না করে:
“হে মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ (যিকরুল্লাহ) থেকে উদাসীন না করে।” (৬৩:৯)
২. অসার বিনোদন ও টিভির প্রসঙ্গে আল কুরআনের বার্তা:
অবসরে অনেকে দীর্ঘ সময় টিভি বা অসার আলাপচারিতায় মগ্ন থাকেন। আল কুরআন মুমিনের সফলতার অন্যতম শর্ত হিসেবে অসারতা থেকে বিমুখ থাকাকে উল্লেখ করেছে:
এবং যারা অনর্থক বা অসার ক্রিয়াকলাপ (লাগউ) থেকে বিমুখ থাকে। (২৩:৩)
বিশ্লেষণ: ‘লাগউ’ (اللغو) বলতে এমন প্রতিটি কাজকে বোঝায় যা ইহকাল বা পরকালে কোনো প্রকৃত কল্যাণ বয়ে আনে না। যদি টিভি দেখা বা গল্পগুজব কেবল সময় নষ্ট করার জন্য হয়, তবে তা মুমিনের মর্যাদার সাথে অসংগতিপূর্ণ। যারা হিদায়াতপ্রাপ্ত, তাদের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেন:
“যখন তারা অসার ক্রিয়াকলাপের (লাগউ) সম্মুখীন হয়, তখন তারা তা এড়িয়ে চলে এবং বলে—
আমাদের জন্য আমাদের আমল এবং তোমাদের জন্য তোমাদের আমল...” (২৮:৫৫)
৩. সময়ের সঠিক বিনিয়োগ: ‘আসর’ ও ‘সালাহ’:
আল কুরআন সময়ের গুরুত্ব বোঝাতে ‘আসর’ (সময়)-এর কসম খেয়ে বলেছে যে, মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে, যদি না সে চারটি কাজ করে (১০৩:১-৩):
১. ঈমান আনা।
২. আমলে সালেহ (সৎকর্ম) করা।
৩. সত্যের উপদেশ দেওয়া (কেবলমাত্র আল কুরআন বিষয়ের)।
৪. ধৈর্যের উপদেশ দেওয়া।
অবসর জীবনের সময়টুকু মূলত ‘আমলে সালেহ’ এবং ‘সত্যের দাওয়াহ’ প্রচারের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার নির্যাস পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং নিজেকে আল্লাহর কিতাবের গভীর অনুধ্যানে (তাদাব্বুর) নিয়োজিত রাখাই হলো সময়ের শ্রেষ্ঠ ব্যবহার।
আপনার হিসাব আপনারই: কোথাও কেউ নেই—
আল কুরআন মাজীদের পাতায় পাতায় মানুষের ব্যক্তি-সত্তার দায়বদ্ধতার এক অমোঘ ঘোষণা উচ্চারিত হয়েছে। পার্থিব জীবনের সকল কোলাহল, পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক সখ্যের শেষে প্রতিটি মানুষ তার রবের সামনে একাকী দাঁড়াবে। সেই মুহূর্তে তার একমাত্র সঙ্গী হবে তার কর্ম। “আপনার হিসাব আপনারই—কোথাও কেউ নেই” এই ধ্রুব সত্যটি আল কুরআনের আয়নায় কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে:
১. চূড়ান্ত জবাবদিহিতার একক সত্তা: ‘কাফা বিনাক্সিকা’ (১৭:১৩-১৪):
আল্লাহ রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন:
“আমি প্রত্যেক মানুষের কর্ম (তায়েরাহু) তার গ্রীবালগ্ন করেছি... (তাকে বলা হবে) তুমি তোমার কিতাব পাঠ করো; আজ তোমার হিসাব গ্রহণের জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট (কাফা বিনাক্সিকাল ইয়াওমা আলাইকা হাসিবা)।” (১৭:১৩-১৪)
২. সম্পর্কের নিঃসারতা ও পলায়নপরতা (৮০:৩৪-৩৭):
পার্থিব জীবনে আমরা যাদের জন্য সবচেয়ে বেশি শ্রম দেই—বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান—পরকালের সেই কঠিন মুহূর্তে তারা কেউ পাশে থাকবে না। আল কুরআন এই বিচ্ছিন্নতার চিত্র অত্যন্ত নিপুণভাবে এঁকেছে:
সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাই থেকে, তার মা ও তার বাবা থেকে, এবং তার স্ত্রী ও তার সন্তান থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকেরই এমন এক অবস্থা হবে যা তাকে অন্য সবার থেকে উদাসীন করে রাখবে। (৮০:৩৪-৩৭)
৩. অন্যের বোঝা বহনে অসমর্থতা (৬:১৬৪):
“আর কোনো বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না (ওয়া লা তাযিরু ওয়া যিরাতুঁও উইযরা উখরা)।” (৬:১৬৪)
১৯:৯৫ আয়াতে আল্লাহ আরও পরিষ্কার করে বলেছেন—
“কিয়ামতের দিন তাদের প্রত্যেকেই তাঁর কাছে একাকী (ফারদান) আসবে।” এখানে ‘ফারদান’ (فَرْدًا) শব্দটি একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতার চরম সীমা নির্দেশ করে। আপনার পাপের অংশীদার যেমন কেউ হবে না, তেমনি আপনার আমলে সালেহ-এর ভাগীদারও কেউ হবে না।
৪. অবয়বহীন সত্যের সাক্ষী: নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ (৩৬:৬৫):
যখন মানুষ মুখ দিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করবে, তখন তার শরীরের অংশগুলোই তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে।
আজ আমি তাদের মুখে মোহর মেরে দেব, তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা তাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য দেবে। (৩৬:৬৫)
অনুধাবন: এটি একটি বিস্ময়কর দৃশ্য। আপনি যখন ভাবছেন ‘কোথাও কেউ নেই’, তখন আপনার নিজের হাত এবং পা-ই ‘পর’ হয়ে আপনার বিরুদ্ধে কথা বলছে। অর্থাৎ, আপনার হিসাব মেলাতে বাইরের কোনো সাক্ষীর প্রয়োজন আল্লাহর নেই; আপনার অস্তিত্বই আপনার হিসাবের জন্য যথেষ্ট।
৫. প্রজ্ঞা ও হিকমাহ: নিজের বিরুদ্ধে নিজে সাক্ষী (৭৫:১৪-১৫):
মানুষ তার কৃতকর্ম সম্পর্কে সব সময় সচেতন থাকে, যদিও সে অজুহাতের আড়ালে তা লুকাতে চায়। “বরং মানুষ নিজের সম্পর্কে সম্যক অবগত (বাসিরাহ), যদিও সে তার ওজর-আপত্তি পেশ করে।” (৭৫:১৪-১৫)
এখানে ‘বাসিরাহ’ (بَصِيرَةٌ) শব্দটি অন্তর্দৃষ্টি বা চাক্ষুষ প্রমাণের চেয়েও শক্তিশালী। আপনি আপনার নফসের হিসাবের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিচারক। তাই অবসর জীবন বা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আল কুরআন আমাদের বারবার নিজের দিকে তাকাতে বলছে, কারণ ফেরার পর আপনি কেবল নিজের মুখোমুখিই হবেন।
সংশ্লিষ্ট কুরআনী দুআ-তাসবিহ:
নিজের আমলনামা সহজ করা এবং আল্লাহর ক্ষমা লাভের জন্য আল কুরআনের প্রার্থনা:
জীবনের কর্ম-আমল কবুল ও তওবার দুআ:
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُالْعَلِيمُ وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
উচ্চারণ: রব্বানা-তাক্বাব্বাল্ মিন্না; ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল্ ‘আলীম্ অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-বুর রাহীম্।
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে ক্ববূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন। এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিইতো ক্ষমাশীল, দয়ালু। (২:১২৭, ২:১২৮)
কঠিন দিনে লাঞ্ছনা থেকে মুক্তির দুআ:
رَبَّنَا وَلَا تُخْزِنَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۗ إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ
উচ্চারণ: রব্বানা ওয়া লা তুখযিনা ইয়াওমাল কিয়ামাতি, ইন্নাকা লা তুখলিফুল মিআদ।
অর্থ: হে আমাদের রব! কিয়ামতের দিন আমাদের লাঞ্ছিত করবেন না; নিশ্চয়ই আপনি প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না। (৩:১৯৪)
হিসাব সহজ করার এবং ক্ষমা লাভের আর্তি:
رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ
উচ্চারণ: রব্বানাগফির লি ওয়া লি ওয়ালিদাইয়্যা ওয়া লিল মু’মিনিনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাকে, আমার পিতামাতাকে এবং সকল মুমিনকে ক্ষমা করুন সেদিন, যেদিন হিসাব প্রতিষ্ঠিত হবে। (১৪:৪১)
বয়স ও বিশেষ কুরআনী দুআসমূহ:
বার্ধক্যে শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি, বংশধরের হিদায়াত এবং সুন্দর পরিণতির জন্য আল কুরআনে চমৎকার কিছু দুআ শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই দুআগুলো পড়া এবং এর মর্ম অনুধাবন করা নিজেই একটি বড় ইবাদত। বার্ধক্যে কৃতজ্ঞতা ও নেক আমলের তৌফিক চাওয়ার দুআ:
رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي ۖ إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ
উচ্চারণ: রাব্বি আওযি’নি আন আশকুরা নি’মাতাকাল্লাতি আন’আমতা আলাইয়্যা ওয়া আলা ওয়ালিদাইয়্যা ওয়া আন আ’মালা সলিহান তারদাহু ওয়া আসলিহ লি ফী যুররিয়্যাতি, ইন্নি তুবতু ইলাইকা ওয়া ইন্নি মিনাল মুসলিমিন।
হে আমার রব! আমাকে সামর্থ্য দিন যাতে আমি আপনার সেই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে পারি যা আপনি আমাকে ও আমার পিতামাতাকে দিয়েছেন এবং যাতে আমি এমন আমলে সালেহ করতে পারি যা আপনি পছন্দ করেন; এবং আমার সন্তানদের সংশোধন করে দিন। নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি তওবা করলাম এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত। (৪৬:১৫)
৩. সন্তান ও নাতি-নাতনিদের চোখের শীতলতা হওয়ার দুআ:
رَبَّنَا هَبْ ل مِنْأَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
উচ্চারণ: রব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আইয়ুনিন ওয়াজআলনা লিল মুত্তাকিনা ইমামা।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের নয়নপ্রীতিকর করুন এবং আমাদেরকে মুত্তাকীনদের নেতা বানিয়ে দিন। (২৫:৭৪)
জ্ঞান ও নেককারদের সঙ্গ পাওয়ার প্রার্থনা:
رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَأَلْحِقْنِيبِالصَّالِحِينَ
উচ্চারণ: রাব্বি হাব লি হুকমাঁও ওয়া আলহিকনি বিস সলিহিন।
অর্থ: হে আমার রব! আমাকে প্রজ্ঞা (হিকমাহ) দান করুন এবং আমাকে নেককারদের/সালেহীনদেরঅন্তর্ভুক্ত করুন। (২৬:৮৩)
দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের দুআ:
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي لْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ: রব্বানা আতিনা ফিদ দুনিয়া হাসানাতাঁও, ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাঁও, ওয়া ক্বিনা আযাবান্নার। অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়ায় কল্যাণ দান করুন, আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। (২:২০১)
ক্ষমা চাওয়ার জন্য খুবই উপযুক্ত একটি কুরআনিক দুআ:
رَبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ وَأَنتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ
উচ্চারণ: রব্বিগফির ওয়ারহাম, ওয়া আনতা খাইরুর রাহিমীন।
অর্থ: হে আমার রব! ক্ষমা করুন এবং দয়া করুন; আর আপনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। সূরা আল-মু’মিনূন, আয়াত ২৩:১১৮
