দাঁড়িয়ে পানি পান করার বিষয়ে আহসানুল হাদিস তথা আল-কোরআন কী বলে? 🥛💧 কিন্তু যে বিষয়ে বলে সে বিষয়টি কখনও কি আমারা ভেবে দেখেছি?

তোমরা যে পানি পান করছ, তা কি তোমরা ভেবে দেখেছ?🥛

-সূরা আল-ওয়াকিয়াহ ৫৬:৬৮

💧 এবং তোমরা আহার করো ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না — সূরা আল-আরাফ ৭:৩১

এই আয়াত থেকেই স্পষ্ট—আল্লাহ তায়ালা অতিরিক্ত খাওয়া, অতিরিক্ত পান করা বা অপ্রয়োজনে অপচয় করা কাউকেই পছন্দ করেন না।

তবে দাঁড়িয়ে, বসে বা শুয়ে পানি পান করা—এসব বিষয় আল্লাহর অপছন্দের তালিকায় উল্লেখ নেই।

অতএব, আসল বিষয় হলো মিতাচারিতাশালীনতা, অবস্থান নয়। 🫗

তাহলে?

দাঁড়িয়ে পানি পান করার বিষয়ে আল-কুরআন আদৌ কী কিছু বলে? কিন্তু যে বিষয়ে বলে তা-কি মুসলিমরা কখনও আমলে এনেছি? 

সুন্নাহর আমলের নামে যেসব প্রশ্ন মাথায় ঘোরে কখনও সাইন্টিফিক্যালি প্রæফ করারও নানান যুক্তি দিয়ে হলেও-

আল-কোরআনে পানি পান করা সম্পর্কে সরাসরি নির্দিষ্ট কোনো নিষেধাজ্ঞা বা নির্দেশ নেই যে কীভাবে পানি পান করতে হবে (যেমন দাঁড়িয়ে, বসে কিংবা শুয়ে , তাহলে শাররীক অসুুবিধার কারনে যাকে শুয়ে খেতে হয়?)। তবে, পানি আল্লাহর একটি নিয়ামত এবং এর গুরুত্ব সম্পর্কে অনেক আয়াত রয়েছে। কোরআন মূলত পান করার আদব বা পদ্ধতি নিয়ে নয়, বরং পানির উৎস, বিশুদ্ধতা এবং পানির অপচয় না করার উপর জোর দেয়।


💧পানির গুরুত্ব ও পানাহার: কোরআনের নির্দেশনা বনাম আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি:🥛

ইসলামের একমাত্র কিতাব যেটি মৌলিক গ্রন্থ আল-কোরআন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানুষকে সঠিক পথের দিশা দিয়েছে। তবে, প্রায়শই দেখা যায় যে, আমরা দ্বীনের গৌণ বিষয়গুলোকে প্রধান করে তুলি (যেটা কি-না আদৌ হিসাবের বিষয় নয়।), যখন কোরআনের মূল নির্দেশনাগুলো আমাদের ভাবনার আড়ালে চলে যায়। পানাহারের আদব সংক্রান্ত একটি বহুল আলোচিত বিষয় হলো দাঁড়িয়ে বা বসে পানি পান করা। এই আলোচনাটি আমাদের জন্য একটি আত্ম-পর্যালোচনার সুযোগ করে দেয়।

💧কোরআনে পানাহারের পদ্ধতি: কী বলে আসমানী কিতাব🥛?

আল-কোরআন -আহসানুল হাদিস, পান করার পদ্ধতি—যেমন দাঁড়িয়ে বা বসে—সম্পর্কে সরাসরি কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান বা নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে না। কোরআন মূলত পানির উৎস হিসেবে আল্লাহর দান, এর বিশুদ্ধতা এবং অপচয় না করার উপর জোর দেয়। এটি পানাহারের আদব বা পদ্ধতি নিয়ে নয়, বরং পানির মহিমান্বিত ভূমিকা এবং এর প্রতি আমাদের দায়িত্ব নিয়ে কথা বলে।

উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ সুবহানাহু তা’লা সূরা আল-ওয়াকিয়াহ-এর ৬৮ নং আয়াতে মানুষকে প্রশ্ন করেন, "তোমরা যে পানি পান করছ, তা কি তোমরা ভেবে দেখেছ?" এই আয়াতটি এবং এর পরের আয়াতগুলো (৬৯-৭০) আল্লাহর কুদরত ও তাঁর অসীম ক্ষমতার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। আল্লাহ বলেন, "তোমরা কি তা মেঘ থেকে নামিয়ে আনো, না আমি নামিয়ে আনি? আমি চাইলে একে লবণাক্ত করে দিতে পারি। এরপরও কি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না?"

এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, সুপেয় পানি আল্লাহরই দান। মানুষ নিজে এই পানি সৃষ্টি করতে পারে না, এমনকি মেঘ থেকে পানি নামানোর ক্ষমতাও তাদের নেই। আল্লাহ চাইলে এই মিষ্টি পানিকে লবণাক্ত করে দিতে পারেন, যা পান করার অযোগ্য হয়ে যাবে। এরপরও কি মানুষ আল্লাহর এই নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে না? এটি মানুষকে আল্লাহর নেয়ামত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হতে উৎসাহিত করে। এটি প্রকৃতির প্রতি, বিশেষ করে পানির মতো মৌলিক জিনিসের প্রতি আমাদের দায়িত্ব এবং আল্লাহর প্রতি আমাদের নির্ভরতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।

কোরআনে পানির গুরুত্ব এবং ব্যবহার সম্পর্কে আরও কিছু প্রাসঙ্গিক আয়াত রয়েছে:

💧পানির উৎস হিসেবে আল্লাহর দান🥛:

✧ এবং আমি আকাশ থেকে বিশুদ্ধ পানি বর্ষণ করেছি। (২৫:৪৮)

✧ তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর তার দ্বারা প্রত্যেক বস্তুর উদ্ভিদ উৎপন্ন করেন। (সূরা আন-নাহল, ১৬:১০)

✧ আর আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি পরিমিতভাবে, অতঃপর আমি তা পৃথিবীতে সংরক্ষণ করি এবং আমি তা অপসারণ করতেও সক্ষম। (সূরা আল-মুমিনুন, ২৩:১৮)

💧পানীয় হিসেবে পানির গুরুত্ব 🥛(drinking water):
✧  এবং তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবী থেকে ফল-ফলাদি উৎপন্ন করেন, আর তিনি তোমাদের জন্য নহরসমূহ প্রবাহিত করেন।" (সূরা ইব্রাহিম, ১৪:৩২)

✧ এবং তোমরা পান করো, আর সীমা অতিক্রম করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের ভালোবাসেন না।" (সূরা আল-আ'রাফ, ৭:৩১)

এই আয়াতগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, ইসলামে পানি একটি মূল্যবান সম্পদ এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি অনুগ্রহ। এটি পরিমিতভাবে ব্যবহার করা উচিত এবং এর অপচয় করা অনুচিত। আল-কোরআনে দাঁড়িয়ে, বসে কিংবা শুয়ে পানি বা খাবার খাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট আয়াত নেই। পানাহার সংক্রান্ত এসব আদব প্রধানত কথিত হাদিস থেকেই জানা যায়।


💧আমাদের ভাবনা ও কর্মের ফারাক🥛:

এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপিত হয়: কোরআন যে বিষয়ে ভাবতে বলেছে, সে বিষয়ে মুসলিমরা কি কখনও গভীরভাবে ভেবে দেখেছি? প্রায়শই দেখা যায় যে, আমরা গৌণ বিষয়গুলোকে ফরজের মতো করে গুরুত্ব দেই, অথচ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল যে মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে, চিন্তা করতে এবং অনুসরণ করতে বলেছেন, সেগুলোর উপর যেন এক ঢাকনা পড়ে আছে। মানুষ্য নির্মিত ধর্মের নানা অপ্রয়োজনীয় নিয়ম-কানুনের ভিড়ে মূল কোরআনের নির্দেশনাগুলো অবহেলিত থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, কোরআনে (সূরা আল-আ'রাফ, ৭:৩১) পানির অপচয় না করার সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও, মুসলিম প্রধান দেশগুলোতেও পানির অপচয় একটি বড় সমস্যা। কোরআন বারবার মানুষকে আকাশ, পৃথিবী, প্রাণীজগত ও উদ্ভিদের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করতে উৎসাহিত করে, কিন্তু অনেকেই এসব আয়াত শুধু তেলাওয়াত করে যান, গভীর চিন্তায় মগ্ন হন না। একইভাবে, কোরআনের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও দরিদ্রের হক সম্পর্কিত অসংখ্য নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও, সমাজে ধনী-গরীবের বৈষম্য ও অবিচার বিদ্যমান।

সুন্নাহর আমলের নামে যেসব প্রশ্ন মাথায় ঘোরে, সেগুলোকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণের যুক্তিতে নিয়ে আসার প্রবণতাও দেখা যায়, যা কখনো কখনো কোরআনের মূল বার্তার গভীরতা থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দেয়। গৌণ বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে বেশি আলোচনা ও বিতর্ক হয়, যা কোরআনের মৌলিক বার্তা—তাওহীদ, আখলাক, আদল, ইহসান, জ্ঞান অর্জন, সমাজ সংস্কার এবং তাকওয়া—থেকে মানুষকে বিচ্যুত করে।


🥛উপসংহার: আত্ম-পর্যালোচনার আহ্বান:

এই আলোচনাটি মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করে। আমাদের উচিত কোরআনের মূল বার্তাগুলোর প্রতি আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া, আল্লাহর আয়াতগুলো নিয়ে গভীর চিন্তা করা এবং সুন্নাতিল্লাহর মৌলিক উদ্দেশ্যগুলো অনুধাবন করা। গৌণ বিষয়গুলোকে তাদের সঠিক স্থানে রেখে, কোরআনের মৌলিক বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যাবশ্যক। এর মাধ্যমে আমরা হয়তো দ্বীনকে (ধর্ম নয়) তার প্রকৃত চেতনায় ফিরিয়ে আনতে পারব এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যে বিষয়ে ভাবতে, চিন্তা করতে ও অনুসরণ করতে বলেছেন, সেগুলোতে অধিক মনোযোগী হতে পারব।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post