'শোনা' বা 'শ্রবণ' (السَّمْع – আস্-সাম‘) কেবল একটি শারীরিক ক্ষমতা নয়, বরং এটি আধ্যাত্মিক জ্ঞান, প্রজ্ঞা, হিদায়াত এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আল-কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন আয়াতে এই 'শোনার' গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা, এর সুফল এবং এর মাধ্যমে অর্জিত শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। মনোযোগ সহকারে শোনার মাধ্যমেই একজন মানুষ আল্লাহ তা'আলার বাণী ও তাঁর নির্দেশাবলী অনুধাবন করতে পারে এবং সঠিক পথে পরিচালিত হতে পারে।
১. অন্যসব Mute করে গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতে হয় কেন?
কুরআন মাজীদকে মনোযোগ সহকারে শোনার মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর রহমত লাভ করা এবং হিদায়াতের পথে চলা। আল্লাহ তা'আলা নিজেই নির্দেশ দিয়েছেন:
وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
➡️ আর যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগ সহকারে তা শোনো এবং নীরব থাকো, যাতে তোমরা রহমত প্রাপ্ত হও। (সূরা আল-আ'রাফ, ৭:২০৪)এই আয়াতটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, কুরআন পাঠের সময় নীরব ও মনোযোগী থাকা উচিত, যাতে আল্লাহর বিশেষ দয়া ও রহমত লাভ করা যায়। মনোযোগী না হলে কুরআনের বাণী হৃদয়ে প্রবেশ করে না, ফলে এর থেকে যে হেদায়েত লাভের কথা, তা ব্যাহত হয়।
২. শোনার সুফল ও শিক্ষার বিষয়:
মনোযোগ দিয়ে শোনার মাধ্যমে মানুষ শুধু রহমতই লাভ করে না, বরং এর সুদূরপ্রসারী সুফল রয়েছে যা মানব জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।
ক. হিদায়াত ও জ্ঞান অর্জন:
যারা মনোযোগ সহকারে কথা শোনে এবং তার মধ্যে যা উত্তম তা গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদেরকেই হিদায়াত দান করেন। এই 'শোনা' শুধু পার্থিব জ্ঞান অর্জনের জন্যই নয়, বরং আত্মিক উন্নতি ও প্রজ্ঞার জন্যও অত্যাবশ্যক।
➡️ অতএব, আমার সেই বান্দাদের সুসংবাদ দাও যারা মনোযোগ সহকারে কথা শোনে এবং তার মধ্যে যা উত্তম (আহসানাহু), তা অনুসরণ করে। এরাই তারা যাদেরকে আল্লাহ পথপ্রদর্শন করেছেন এবং এরাই বুদ্ধিমান (উলিল আলবাব)। (সূরা আয-যুমার, ৩৯:১৮)এই আয়াতে 'উলুল আলবাব' বা বোধসম্পন্ন ব্যক্তি বলতে তাদের বোঝানো হয়েছে, যারা শোনার পর তা বিশ্লেষণ করে এবং শ্রেষ্ঠ অংশটি গ্রহণ করে।
খ. মনোযোগ সহকারে শুনলে তার প্রভাবে কি হয়? জ্বিন জাতির দৃষ্টান্ত:
আল- কুরআনে জ্বিন জাতির কুরআন শোনার ঘটনা একটি বিশেষ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তারা যখন কুরআন শুনেছিল, তখন তা মনোযোগ সহকারে শুনেছিল এবং এর প্রভাবে তৎক্ষণাৎ ঈমান এনেছিল। শুধু তাই নয়, তারা তাদের কওমের কাছে ফিরে গিয়ে সতর্ককারী হিসেবে কাজ করেছিল।
➡️ আর যখন আমরা জ্বিনদের মধ্য থেকে একদলকে তোমার দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম, যারা কুরআন শুনবে। এরপর যখন তারা তার কাছে উপস্থিত হলো, তারা বলল, তোমরা চুপচাপ শুন। এরপর যখন সম্পন্ন হলো, তারা তাদের জাতির কাছে সতর্ককারী হয়ে ফিরে গেল। তারা বলল, হে আমাদের কওম! নিশ্চয় আমরা এমন কিতাব শুনেছি যা মূসার পরবর্তীতে নাযিল করা হয়েছে, যা এর পূর্ববর্তী সেটার সত্যায়নকারীরূপে। তা সত্যের দিকে এবং সুদৃঢ় পথের দিকে পরিচালিত করে। হে আমাদের কওম! তোমরা আল্লাহর আহ্বানকারীকে সাড়া দাও এবং তাঁর প্রতি ঈমান আন। তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের পাপগুলোকে ক্ষমা করবেন এবং তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি থেকে রক্ষা করবেন। আর যে আল্লাহর আহ্বানকারীকে সাড়া দিবে না, তাহলে পৃথিবীর মধ্যে কোনো প্রতিহতকারী নেই এবং তিনি ছাড়া তার জন্য কোনো অভিভাবক নেই। ওরাই স্পষ্ট ভ্রষ্টতার মধ্যে রয়েছে। (সূরা আল-আহকাফ, ৪৬:২৯-৩২)
➡️ বলো! আমার কাছে ওহী করা হয়েছে যে, জ্বীনদের থেকে একটি দল মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। তারপর তারা বলেছে, নিশ্চয় আমরা, আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি। সেটা আলোকিত পথের দিকে পরিচালিত করে। সুতরাং আমরা সেটার প্রতি ঈমান এনেছি। আর কখনও আমরা আমাদের রবের সাথে কাউকে শিরক করব না। এবং এটাও যে, মর্যাদায় আমাদের রব হলেন সুউচ্চ। তিনি গ্রহণ করেননি কোনো সঙ্গিনী আর না কোনো সন্তান। আর এটাও যে, আমাদের নির্বোধরা, আল্লাহ সম্পর্কে অবান্তর উক্তি করত। (সূরা আল-জ্বিন, ৭২:১-৫)এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, মনোযোগ দিয়ে শোনার প্রভাব এতটাই গভীর হতে পারে যে, তা শুধু শ্রোতার ব্যক্তিগত জীবনে নয়, বরং তার পারিপার্শ্বিক সমাজেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
গ. আল্লাহ মানুষকে শোনার ও দেখার ক্ষমতা দিয়েছেন যাতে তারা চিন্তা করে:
আল্লাহ তা'আলা মানবজাতিকে শ্রবণশক্তি দান করেছেন যাতে তারা এই ক্ষমতা ব্যবহার করে আল্লাহর সৃষ্টি ও বাণী নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে।
➡️আর আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের গর্ভ থেকে বের করেছেন — যখন তোমরা কিছুই জান না। তিনি তোমাদের জন্য শ্রবণ, দৃষ্টি ও হৃদয় (আফইদা) দিয়েছেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও। (সূরা আন-নাহল, ১৬:৭৮)এখানে আল্লাহ বলেন, জ্ঞান ও উপলব্ধির সূচনা হয় "শ্রবণ" থেকে, আর এর উদ্দেশ্য হলো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
ঘ. অবিশ্বাসীরা শোনে কিন্তু অনুধাবন করে না:
যারা শোনার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর বাণীকে বুঝে না বা তা থেকে উপকৃত হয় না, কুরআন তাদের সমালোচনা করেছে।
➡️আর অবশ্যই আমরা জাহান্নামের জন্য জ্বীন ও মানুষের মধ্য থেকে বহুজনকে সৃষ্টি করেছি। তাদের রয়েছে এমন হৃদয়সমূহ সেগুলো দিয়ে তারা উপলব্ধি করে না। আর তাদের রয়েছে এমন চোখসমূহ সেগুলো দিয়ে তারা দেখে না। আর তাদের রয়েছে এমন কানসমূহ সেগুলো দিয়ে তারা শুনে না। ওরাই পশুর মতো। বরং তারা অধিক পথভ্রষ্ট। ওরাই উদাসীন/তারাই গাফেল/অবহেলাকারী (অসতর্ক)। এই আয়াতে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র শোনাই যথেষ্ট নয়; বুঝে শোনা ও গ্রহণ করা জরুরি।
আল-কুরআন ঘুমঘুম অবস্থায়, অর্ধমৃত কিংবা মৃত মানুষের জন্য নয়:
আর আমরা তাকে কবিতা শিক্ষা দিই নাই এবং সেটা তার জন্য শোভনীয়ও নয়। সেটা উপদেশবাণী ও সুস্পষ্ট কুরআন ছাড়া নয়। যেন সেটা, যে জীবিত রয়েছে তাকে সতর্ক করে-সূরা ইয়াসীন ৩৬:৬৯-৭০
ঙ. জিজ্ঞাসা করা হবে:
মানুষকে তার শ্রবণশক্তির ব্যবহার সম্পর্কে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ ۚ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا
➡️ আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার পেছনে পড়ো না। নিশ্চয় শ্রবণ, দৃষ্টি ও হৃদয় ((ফুয়াদ) — এসবের প্রতিটির ব্যাপারে প্রশ্ন করা হবে। (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩৬)এটি শোনার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়, কারণ এর সঠিক ব্যবহারের উপর পরকালের কল্যাণ নির্ভরশীল।
৩. শোনার জন্য অ্যাডভাইস (উপদেশ):
উপরিউক্ত আয়াতসমূহ থেকে শোনার বিষয়ে কিছু স্পষ্ট উপদেশ পাওয়া যায়:
মনোযোগ ও নীরবতা: কুরআন তেলাওয়াতের সময় পূর্ণ মনোযোগ ও নীরবতা বজায় রাখা।
পর্যালোচনা ও উত্তমকে গ্রহণ: যেকোনো কথা বা বাণী শোনার পর তা বিশ্লেষণ করে উত্তমকে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করা।
হেদায়েতের উদ্দেশ্যে শোনা: শুধুমাত্র বিনোদন বা সময় কাটানোর জন্য নয়, বরং হেদায়েত ও শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে শোনা।
চিন্তা ও অনুধাবন: যা শোনা হচ্ছে, তা নিয়ে গভীর চিন্তা করা এবং এর অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবনের চেষ্টা করা। (47:24)
আমল ও প্রচারে অংশীদারিত্ব: শোনা বিষয়গুলো নিজের জীবনে প্রয়োগ করা এবং অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করা, যেমনটি জ্বিনেরা করেছিল।
সারকথা:
কুরআনের দৃষ্টিতে 'শোনা' শুধু একটি জৈবিক কাজ নয়, বরং এটি জ্ঞান, চিন্তা, হেদায়েত, প্রজ্ঞা ও আল্লাহভীতির পথে প্রথম ধাপ। মনোযোগ দিয়ে শোনা মানেই অন্তরে প্রভাব নেওয়া, উপলব্ধি করা এবং জীবনকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে পরিবর্তন করার সুযোগ সৃষ্টি করা। এটি কেবল শারীরিক প্রক্রিয়া নয়, বরং একটি আধ্যাত্মিক অনুশীলন যা আল্লাহর নৈকট্য লাভে সহায়ক। তাই, প্রত্যেক মুসলিমের উচিত কুরআন ও ভালো কথা মনোযোগ সহকারে শোনা এবং তার উত্তম অংশকে জীবনে ধারণ করা।