অহী-বিচ্ছিন্ন মুসলিম: ভেজাল-প্রতারণার মূল কারণ? সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিমের দেশে এসব আমদানী করে কে বা কারা?

একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও, যদি এর জনগণ এবং তথাকথিত মুসলিমরা ঐশী কিতাব (আল-কুরআন) থেকে বিচ্যুত হয়, তাহলে সমাজের অধঃপতনের স্বাক্ষর কেমন হতে পারে এগুলো তার বাস্তব নমুনা অথচ আমরা সংখ্যগরিষ্ঠ মুসলিম দাবী করে কি প্রশান্তি!

এসব জালিমদের থেকে রক্ষায় আল্লাহর বিশেষ সাহায্য কামনায় দুআ: (ভিডিও নিচের দিকে):

🔗নাযিলকৃত কিতাবের সাথে নূন্যতম সম্পর্কহীন ও জোর করে স্বঘোষিত সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশের অধিকাংশের এটাই নির্মম বাস্তবতা!

সূরা ফুরকান-এর ৩০ নং আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উক্তি-

"হে আমার রব! নিশ্চয় আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যাজ্য হিসাবে গ্রহণ করেছে"

কেবল কাগজে-কলমে মুসলিম-মুসলিমের সার্টিফাই।এভাবে "জোর করে" বা "স্বঘোষিত" সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের ধারণাটি বোঝায় যে,  আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবের সাথে নূন্যতম সম্পর্কহীন  নামমাত্র মুসলিম হওয়ার কারণে বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে নিজেদের মুসলিম দাবি করা হচ্ছে, কিন্তু প্রকৃত ইসলামের চেতনা তাদের মধ্যে অনুপস্থিত। এর ফলাফল হলো:

পোশাকী মুসলিমের বাহার: বাহ্যিক বেশভূষা বা ধর্মীয় চিহ্ন ধারণ করাকে অনেকে ইসলাম মনে করে। লম্বা দাড়ি, টুপি, বোরকা ইত্যাদি পরিধান করা ইসলাম নির্দেশিত হলেও, এর সাথে যদি অভ্যন্তরীণ তাকওয়া, নৈতিকতা এবং আল্লাহর ভয় না থাকে, তাহলে এটি কেবলই "পোশাকী ইসলাম" হয়ে দাঁড়ায়। এমন "পোশাকী মুসলিম" সমাজে অনেক দেখা যায়, যারা বাহ্যিকভাবে ধার্মিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে অসৎ কাজ ও অন্যায়ে লিপ্ত থাকে।

মানুষকে শ্লথ-পচনে মানুষ-প্রাণীকুল-জীববৈচিত্র হত্যার আয়োজন: 

ভেজাল খাদ্য, দুর্নীতি, অন্যায় বিচার, স্বাস্থ্যখাতের অব্যবস্থাপনা ইত্যাদির মাধ্যমে সমাজের মানুষকে তিলে তিলে ধ্বংস করার চিত্র তুলে ধরে। ভেজাল খাদ্য মানুষকে দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা ও মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, যা এক প্রকার নীরব হত্যাযজ্ঞ। এটি শুয়াইব (সা:)-এর জাতির পরিমাপ ও ওজনে কারচুপির আধুনিক ও মারাত্মক সংস্করণ।

🔗নাযিলকৃত অহীর সাথে সম্পর্কহীন ব্যক্তিও কি মুসলিম হতে পারে? এই প্রশ্নটি মুসলিম পরিচয়ের মূল ভিত্তি নিয়ে: 

 মুসলিমের সংজ্ঞা: আয়াতে বিশ^াসীরাই মুসলিম দ্র: আয়াত ৪৩:৬৯, ৩০:৫৩, ২৭:৮১।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা কি বলেন?

আল্লাহ তা'আলা কুরআনে এই ধরনের পরিস্থিতি এবং নামসর্বস্ব মুসলিমদের বিষয়ে অনেক সতর্কবাণী দিয়েছেন। সূরা ফুরকান-এর ৩০ নং আয়াতটি এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এছাড়াও আরও কিছু আয়াত প্রাসঙ্গিক:

আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের (যারা মুখে ঈমানের দাবি করে কিন্তু অন্তরে কুফরি পোষণ করে) তীব্র নিন্দা করেছেন। তাদের বৈশিষ্ট্য হলো, তারা মানুষের কাছে নিজেদের ধার্মিক প্রমাণ করতে চায়, কিন্তু গোপনে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে।

* সূরা নিসা, আয়াত ১৪২: "নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহকে ধোঁকা দিতে চায়, অথচ আল্লাহই তাদের ধোঁকা দেন। যখন তারা সালাতে দাঁড়ায়, তখন অলসভাবে দাঁড়ায়, মানুষকে দেখানোর জন্য, এবং আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে।"


এতো এতো মসজিদ এতো এতো নামাজী-হাজী তাহলে এসব কি?

সূরা আল আনকাবূত  29:45

কিতাব থেকে তোমার কাছে যা প্রত্যাদেশ করা হয় তা পাঠ করো এবং সলাত প্রতিষ্ঠা করো। নিশ্চয় সলাত অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে বিরত রাখে। আর অবশ্যই আল্লাহর স্মরণই সবচেয়ে বড় এবং তোমরা যা করো আল্লাহ তা জানেন।

🔗🔥 ***********S 🔥🔗

১. ফ্রেশ-পবিত্র-উপযোগী- ও উত্তম খাবার গ্রহণ: 

কোরআনে বারবার মানুষকে 'তাইয়্যেব' বা পবিত্র ও উত্তম জিনিস খাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভেজাল খাদ্য কখনোই পবিত্র বা উত্তম হতে পারে না, কারণ এতে ক্ষতিকর বা নিকৃষ্ট উপাদান মেশানো হয়।

সূরা বাকারা, আয়াত ১৬৮: "হে মানবজাতি! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র বস্তু আছে, তা থেকে ভক্ষণ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।"

🔗দেখুন! আল্লাহর রাসুলগন কী খেতেন আর কোন ডাক্তারের কাছে যেতেন:

◆ ওহে রসূলগণ! তোমরা উপযোগী  (তৈয়্যেবাত) বস্তুসমূহ থেকে আহার করো এবং আমলে সলেহ করো (ভালো ভালো-সংশোধনের কাজ করো)। নিশ্চয় তোমরা যা করো সে বিষয়ে আমি বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন-সূরা ২৩:৫১

🔗সূরা কাহফের ঘটনা থেকে আমাদের খাদ্য-সচেতনার শিক্ষা:

শত শত বছর ঘুম পাড়িয়ে রাখা যুবকদের বিষয়ে খাদ্য-সচেতনার কথা আল্লাহ সু. তা. কিভাবে আমাদেরকে বিবৃত করেছেন-এভাবে:

অতএব, তোমরা তোমাদের এই মুদ্রা দিয়ে তোমাদের কাউকে শহরের দিকে পাঠাও। তবে সে যেন দেখে নেয়, খাবার হিসাবে সেখানকার কোনটি অধিক পরিশুদ্ধ। এরপর সে যেন সেখান থেকে খাদ্য নিয়ে আসে আর সে যেন সাবধান থাকে এবং সে যেন তোমাদের সম্পর্কে কাউকে না জানায়- আল-কাহফ ১৮:১৯

সূরা কাহফের এই আয়াত থেকে আমরা খাদ্য-সচেতনতার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাই:

১. হালাল ও পবিত্র খাদ্যের অনুসন্ধান: যুবকরা যখন ঘুম থেকে জেগে ওঠে, তখন তাদের প্রথম কাজ ছিল নিজেদের মধ্যে থেকে একজনকে দিয়ে খাবার আনতে পাঠানো। তবে তারা শুধু যেকোনো খাবার আনতে বলেনি, বরং "কোনটি অধিক পরিশুদ্ধ" তা দেখতে বলেছিল। এটি নির্দেশ করে যে, খাদ্যের উৎস, প্রস্তুতি এবং হালাল-হারামের বিষয়ে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি। শুধুমাত্র পেট ভরানোই উদ্দেশ্য নয়, বরং সেই খাবার কতটা পবিত্র ও স্বাস্থ্যসম্মত, তা যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।

২. খাদ্যের মান যাচাইয়ের গুরুত্ব: "অধিক পরিশুদ্ধ" কথাটি কেবল ধর্মীয় বিশুদ্ধতা নয়, বরং খাদ্যের গুণগত মান, তাজা হওয়া এবং ক্ষতিকর উপাদান মুক্ত হওয়ার প্রতিও ইঙ্গিত করে। এটি আধুনিক সময়ে নিরাপদ খাদ্য এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের ধারণার সঙ্গেও মিলে যায়।

৩. বিচক্ষণতা ও সাবধানতা: খাবার সংগ্রহের ক্ষেত্রে "সে যেন সাবধান থাকে" কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে খাদ্যের অপচয় না করা, অতিরিক্ত না কেনা, বা কোনো ভুল সিদ্ধান্ত না নেওয়ার প্রতি নির্দেশ করা হয়েছে। এটি বর্তমান সময়ে সচেতন ভোক্তা হওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে, যেখানে আমরা খাদ্যের অপচয় রোধ এবং পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা করি।

৪. পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন: যুবকরা একটি সুপরিকল্পিত উপায়ে তাদের খাদ্য সংকট মোকাবেলা করেছিল। তারা একজনকে দায়িত্ব দেয়, তাকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয় এবং তাকে সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে। এটি যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে সুচিন্তিত পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের গুরুত্ব শেখায়, বিশেষ করে মৌলিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে।

৫. আল্লাহ্‌র উপর ভরসা ও মানবীয় প্রচেষ্টা: যদিও আল্লাহ তাদের শত শত বছর ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলেন এবং তাদের রিজিকের ব্যবস্থা করেছিলেন, তবুও তারা নিজেদের পক্ষ থেকে খাবার সংগ্রহের চেষ্টা করেছিল। এটি তাকদিরের উপর বিশ্বাস রাখা এবং একই সাথে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার গুরুত্বকে তুলে ধরে।

সংক্ষেপে, সূরা কাহফের এই আয়াতটি আমাদেরকে কেবল হালাল ও পবিত্র খাদ্যের অন্বেষণেই নয়, বরং খাদ্যের মান যাচাই, বিচক্ষণতা, পরিকল্পনা এবং নিরাপদ উপায়ে তা সংগ্রহ করার বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার এক চমৎকার দৃষ্টান্ত।

২. ক্ষতি থেকে বিরত থাকা: ইসলামে নিজেদের এবং অন্যদের ক্ষতি করা নিষিদ্ধ। ভেজাল খাদ্য স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এবং অনেক সময় মৃত্যুর কারণও হতে পারে।

সূরা বাকারা, আয়াত ১৯৫: "তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না।"



🔗 আমরা কি তাহলে অধিকাংশই ফাসিক? মা’যাল্লাহ!

তোমরা হলে এক উত্তম উম্মত, যাদের আবির্ভাব হয়েছে সকল মানুষের জন্য; তোমরা ন্যায়ের আদেশ করবে এবং অন্যায় থেকে নিষেধ করবে আর আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখবে। আর যদি আহলে কিতাব ঈমান আনত, অবশ্যই তা তাদের জন্য কল্যাণকর হতো। তাদের মাঝেও মুমিন আছে, তবে তাদের অধিকাংশই ফাসিক-সূরা ৩:১১০।

৩. এভাবে চলতে থাকলে ধ্বংস অনিবার্য: 

একটি জাতীকে পৃথিবী থেকে মুছে দেয়া হয়েছে কিন্তু কেন, কি ছিল তাদের অপরাধ? তাহলে নামাজ কি? আর ইবাদত কেমন?

নবী শুয়াইব (সা:)-এর জাতির ধ্বংসের কারণ সম্পর্কে আল-কুরআনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। তাঁর জাতি ছিল 'আহলে মাদিয়ান' বা মাদিয়ানবাসী। তাদের প্রধান অপরাধ ছিল পরিমাপ ও ওজনে কারচুপি করা, অর্থাৎ মানুষকে ঠকানো। এর পাশাপাশি তারা আল্লাহ্‌র নাযিলকৃত আয়াত অস্বীকার,  একত্ববাদে অবিশ্বাস এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা (ফাসাদ) সৃষ্টি করত।  জেনে নেই- সেটা কি কোন ধরনের অপরাধ? আসলে ইবাদত কি?

আল-কুরআনে সালামুন আলা শুয়াইব এবং তাঁর জাতির ঘটনা একাধিক সূরায় বর্ণিত হয়েছে, যেমন সূরা আ'রাফ, সূরা হুদ এবং সূরা শু'আরা।

এখানে কিছু মূল আয়াত উল্লেখ করা হলো যা তাদের ধ্বংসের কারণ তুলে ধরে:

পরিমাপ ও ওজনে কারচুপি:

আর মাদইয়ানে তাদের ভাই শুয়াইবকে। সে বলল, হে আমার কওম! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের জন্য কোনো ইলাহ নেই। আর তোমরা পরিমাপে ও পরিমাপক—এ কম কোরো না। নিশ্চয় আমি তোমাদেরকে ভাল অবস্থাতেই দেখছি আর নিশ্চয় আমি তোমাদের ব্যাপারে আশঙ্কা করছি পরিবেষ্টনকারী একদিনের শাস্তির। আর হে আমার কওম! তোমরা পরিমাপে ও পরিমাপক—এ ন্যায়সঙ্গতভাবে পূর্ণ করো। আর মানুষকে তাদের পণ্যসামগ্রী কম দিও না। আর বিপর্যয়কারী হয়ে পৃথিবীর মধ্যে গোলযোগ সৃষ্টি কোরো না-সূরা হুদ, আয়াত ৮৪-৮৫

◆ আসলে নামাজ-ইবাদত মানে কি? কেবল কংক্রিটের জঙ্গল উন্নয়নের নামে টাকা-পয়সা-সম্পদ ইচ্ছামত ব্যয় করা?

কিতাব থেকে তোমার কাছে যা প্রত্যাদেশ করা হয় তা পাঠ করো এবং সলাত প্রতিষ্ঠা করো। নিশ্চয় সলাত অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে বিরত রাখে। আর অবশ্যই আল্লাহর স্মরণই সবচেয়ে বড় এবং তোমরা যা করো আল্লাহ তা জানেন-২৯:৪৫

সূরা হুদ, আয়াত ৮৬-৮৭:

"আল্লাহ্‌র রেখে দেওয়া উত্তম জিনিস তোমাদের জন্য ভালো, যদি তোমরা মুমিন হও। আর আমি তোমাদের উপর রক্ষক নই। তারা বলল, 'হে শুয়াইব! তোমার সালাত (নামাজ) কি তোমাকে এই নির্দেশ দেয় যে, আমরা আমাদের পিতৃপুরুষরা যাদের ইবাদত করত, তাদের বর্জন করি, অথবা আমরা আমাদের সম্পদে যা ইচ্ছা তা করতে পারব না? তুমি তো সহনশীল ও বিচক্ষণ!'

ভিডিও: প্রথম আলো

কথিত সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিমের দেশে এসব আমদানী করে কে বা কারা?


৩. তাদের প্রত্যাখ্যান ও শাস্তির বর্ণনা:

সূরা আ'রাফ, আয়াত ৯১-৯২:

তারপর ভূমিকম্প তাদেরকে পাকড়াও করল, ফলে তারা তাদের গৃহেই উপুড় হয়ে পড়ে রইল। যারা শুয়াইবকে অস্বীকার করেছিল, মনে হলো যেন তারা কখনোই সেখানে বসবাস করেনি। যারা শুয়াইবকে অস্বীকার করেছিল, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হলো।

সূরা হুদ, আয়াত ৯৪-৯৫:

"আর যখন আমাদের আদেশ এসে গেল, তখন শুয়াইব ও তার সাথে যারা ঈমান এনেছিল, তাদেরকে আমাদের রহমত দ্বারা বাঁচিয়ে নিলাম। আর যারা জুলুম করেছিল, তাদেরকে এক মহাগর্জন পাকড়াও করল। ফলে তারা তাদের গৃহেই উপুড় হয়ে পড়ে রইল, মনে হলো যেন তারা কখনোই সেখানে বসবাস করেনি। দূর হোক মাদইয়ানবাসী, যেমন দূর হয়েছিল সামুদ জাতি।"

সারসংক্ষেপ:

নবী শুয়াইব (সা:)-এর জাতি, মাদিয়ানবাসীর ধ্বংসের প্রধান কারণগুলো ছিল:

পরিমাপ ও ওজনে কারচুপি: যা ছিল তাদের প্রধান অর্থনৈতিক অপরাধ এবং সমাজে অন্যায় ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মূল উৎস।

শিরক ও আল্লাহ্‌র একত্ববাদ অস্বীকার: তারা পূর্বপুরুষদের অনাযিলকৃত প্রমাণহীন উপাসনা করত।

আল্লাহ্‌র পথে বাধা সৃষ্টি: তারা মানুষকে সৎপথ থেকে ফিরিয়ে রাখার আয়োজনে ছিল এবং নাযিলকৃত আল্লাহর অহীর আয়াতকে প্রত্যাক্ষান করত।

মালে ভেজাল-ওজনে কম-বেশী করে মানুষকে ঠকানো, প্রতারণার মাধ্যমে ফাসাদ বা বিপর্যয় সৃষ্টি: তাদের অন্যায় কার্যকলাপ সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টি করেছিল।

এই অপরাধগুলোর কারণে আল্লাহ তায়ালা তাদের উপর ভূমিকম্প এবং এক মহাগর্জন (বা বজ্রপাত) এর মাধ্যমে শাস্তি প্রেরণ করেছিলেন, যা তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়।

সূরা ফুরকান-এর ৩০ নং আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উক্তি-

"হে আমার রব! নিশ্চয় আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যাজ্য হিসাবে গ্রহণ করেছে"

আমাদের বর্তমান মুসলিম সমাজের অবস্থা নিয়ে সত্যিই অনেক প্রশ্ন তোলে।

এই আয়াত এবং এর প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে, বর্তমান মুসলিম উম্মাহর অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। "কুরআনকে পরিত্যাজ্য হিসাবে গ্রহণ করা" এর অর্থ শুধু এই নয় যে মানুষ কুরআন পড়ে না, বরং এর আরও ব্যাপক অর্থ রয়েছে:

১. কুরআন না পড়া ও না বোঝা: অনেকেই কুরআন পড়ে না বা পড়লেও এর অর্থ বোঝে না। আর যারা পড়ে, তারা হয়তো তেলাওয়াতকে সওয়াবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে, কিন্তু এর নির্দেশাবলি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না।

২. কুরআনের নির্দেশ উপেক্ষা করা: সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে কুরআনের বিধানগুলো প্রয়োগ না করা। আধুনিকতার অজুহাতে বা অন্য কোনো যুক্তিতে কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশাবলিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া।

৩. কুরআনের আইন ও বিচার ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান: মুসলিম দেশগুলোতে ইসলামী শরিয়া আইন বাস্তবায়নে অনীহা বা এর বিরোধিতা করা। সেক্যুলার আইন বা মানব-রচিত আইনকে প্রাধান্য দেওয়া।

৪. কুরআনের উপদেশ থেকে বিমুখ থাকা: মুসলিমরা যখন পার্থিব জ্ঞান-বিজ্ঞানের পেছনে ছুটে কুরআনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উপদেশ থেকে দূরে সরে যায়, তখনও এটি কুরআন পরিত্যাগের শামিল।

৫. কুরআনের উপর গবেষণা ও তাদাব্বুর (গভীর চিন্তা) না করা: 

কুরআনের আয়াতসমূহ নিয়ে গবেষণা, এর বিজ্ঞানসম্মত দিকগুলো উদ্ঘাটন এবং এর চিরন্তন বার্তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা না করা।

আলেম সমাজের ভূমিকা:

আলেম সমাজ কি এই সতর্কতামূলক আয়াতগুলো যথেষ্ট পরিমাণে আলোচনা করেন?

কিছু আলেমের ভূমিকা: নিঃসন্দেহে অনেক আলেম আছেন যারা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কুরআনের বার্তা প্রচার করেন এবং জাতিকে এর দিকে আহ্বান করেন। তারা সততা, ন্যায়পরায়ণতা, পরিমাপ ও ওজনে সুবিচার এবং আল্লাহর ভয় সম্পর্কে আলোচনা করেন। ভেজাল খাদ্য, প্রতারণা, সুদ, ঘুষ ইত্যাদি সামাজিক ব্যাধিগুলো নিয়েও তারা সোচ্চার।

সাধারণ প্রবণতা: তবে, সাধারণ প্রবণতা হিসেবে এটিও অস্বীকার করা কঠিন যে, অনেক সময় ওয়াজ-মাহফিলে বা খুতবায় ফজিলত বা নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের উপর বেশি জোর দেওয়া হয়, কিন্তু কুরআনের মৌলিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বিচারিক দিকগুলো এবং বর্তমান সমাজের ভেজাল, দুর্নীতি, অন্যায় ইত্যাদি সমস্যার সাথে এর সম্পর্ক নিয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হয় না।

কুরআনের প্রায়োগিক দিক: অনেক সময় আলেম সমাজও কুরআনের প্রায়োগিক দিকগুলোকে উপেক্ষা করে শুধু তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেন, অথবা বিতর্কিত বিষয়গুলো এড়িয়ে চলেন। ফলে সাধারণ মানুষ মনে করে কুরআন শুধু নির্দিষ্ট কিছু ইবাদত বা আধ্যাত্মিক বিষয়ের জন্য, যা দৈনন্দিন জীবনের সমস্যার সমাধান দেয় না।

রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ: অনেক আলেম সামাজিক বা রাজনৈতিক চাপের কারণেও সত্য কথা বলতে বা কুরআনের নির্দেশাবলী খোলাখুলিভাবে ব্যাখ্যা করতে দ্বিধা করেন।

বর্তমান জাতির অবস্থা:

নবী শুয়াইব (সা:)-এর জাতির ধ্বংসের কারণগুলোর দিকে তাকালে আমাদের জাতির বর্তমান অবস্থার সাথে কিছু বেদনাদায়ক মিল খুঁজে পাওয়া যায়:

পরিমাপ ও ওজনে কারচুপি: ভেজাল খাদ্য, ওজনে কম দেওয়া, পণ্যের মান নিয়ে প্রতারণা - এগুলো আমাদের সমাজে মহামারীর আকার ধারণ করেছে।

দুর্নীতি ও ঘুষ: প্রশাসনিক এবং সামাজিক প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি ও ঘুষ একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যা মাদিয়ানবাসীদের অর্থনৈতিক অন্যায়েরই আধুনিক রূপ।

প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি: ব্যবসায়, চাকরিতে, লেনদেনে সততার অভাব প্রকট।

ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা না করা: ন্যায়বিচার প্রায়শই অর্থের কাছে পরাস্ত হয়।

ধর্মীয় দায়বদ্ধতা উপেক্ষা: আল্লাহর একত্ববাদের দাবি করা হলেও, অনেক সময় তাঁর নির্দেশাবলি উপেক্ষা করে পার্থিব স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।

যদি আমরা সত্যিকার অর্থেই কুরআনের এই সতর্কবার্তাগুলোকে গুরুত্ব না দিই এবং আমাদের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনে পরিবর্তন না আনি, তাহলে অতীতের জাতিগুলোর মতো আমরাও আল্লাহর অসন্তোষ ও শাস্তির সম্মুখীন হতে পারি, যা বিভিন্ন রূপে আমাদের উপর আসতে পারে (যেমন অর্থনৈতিক সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সামাজিক বিশৃঙ্খলা ইত্যাদি)।

তাই, সূরা ফুরকান-এর ৩০ নং আয়াতটি আমাদের জন্য একটি গুরুতর আত্মপর্যালোচনার আহ্বান। আমাদের উচিত কুরআনকে শুধু তেলাওয়াত বা বরকতের জন্য সীমাবদ্ধ না রেখে, এর নির্দেশাবলিকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা এবং আলেম সমাজেরও উচিত এই বিষয়গুলো নিয়ে আরও খোলামেলা ও প্রায়োগিক আলোচনা করা।

৪. জনস্বার্থ রক্ষা: ইসলাম জনস্বার্থ ও কল্যাণের উপর গুরুত্ব দেয়। ভেজাল খাদ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর।

এসব জালিমদের থেকে রক্ষায় আল্লাহর বিশেষ সাহায্য কামনায় দুআ: (ভিডিও):





Post a Comment (0)
Previous Post Next Post