দুআয়ে কুনুত: কুনুত ও ক্বানিতীন কী?✨কুরআনের বর্ণনায় কারা এই অনুগত বান্দা? (Qunut/ Qanitin)!

🔹ক্বানিতীন কারা? দুআয়ে কুনুত:

🔹 কুনুত ও ক্বানিতীন: কারা এই বিশেষ শ্রেণি—কুরআনের বর্ণনায় তাদের বৈশিষ্ট্য-

🔹 কুনুত (Qunut) ও ক্বানিতীন: কুরআনের আলোকে অনুগত বান্দাদের পরিচয়-

       ▓▒░ বিস্তারিত ░▒▓

প্রচলিত সমাজে ‘কুনুত’ বলতে সাধারণত সালাতের মধ্যে পঠিত নির্দিষ্ট কিছু দুআকে বোঝালেও, আল-কুরআনের গভীর দর্শনে ‘কুনুত’ কোনো সাময়িক ক্রিয়া নয়; বরং এটি মুমিনের জীবনের একটি স্থায়ী অবস্থা (state of being)। এটি আল্লাহর প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্য, বিনয় এবং তাঁর কিতাবের প্রতি অবিচল আস্থার নাম।

আল-কুরআন মাজীদ একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান এবং এর শব্দচয়ন ও বিন্যাস অত্যন্ত সুনিপুণ। প্রচলিত ধারায় আমরা ‘কুনুত’ বলতে নির্দিষ্ট একটি দুআকে বুঝে থাকলেও, আল-কুরআনের শব্দতাত্ত্বিক ও প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণে ‘কুনুত’ (قنوت) শব্দটি এক গভীর ও বিস্তৃত অর্থ বহন করে। এটি কেবল একটি পঠিত দুআ নয়, বরং এটি হচ্ছে রূহানি বা আধ্যাত্মিক এক অনন্য অবস্থা।

১. কুনুত-এর সারকথা: আল-কুরআনের পারিভাষিক সংজ্ঞা ও স্বরূপ:


আল-কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে ‘কুনুত’ ও এর বিবিধ রূপ (যেমন: ক্বানিতুন, ক্বানিতীন, উক্বোন্তি) ব্যবহৃত হয়েছে। আল-কুরআনের সামষ্টিক প্রেক্ষাপটে ‘কুনুত’ বলতে বোঝায়—আল্লাহ রব্বুল আলামিনের প্রতি চরম বিনীত হয়ে, নীরবতা পালন করে, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করা এবং তাঁর কিতাবের সত্যয়ন করা। এটি মুমিনের একটি স্থায়ী গুণ বা ‘সিফাত’।

আল্লাহ সু.তা. ইরশাদ করেন:

“তোমরা সালাতের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী সালাতের এবং আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হও বিনীতভাবে (ক্বানিতীন)।” (২:২৩৮)

এখানে ‘ক্বানিতীন’ (قَانِتِينَ) শব্দটি সালাতের একটি বিশেষ গুণ নির্দেশ করছে। এটি কেবল শারীরিক দাঁড়ানো নয়, বরং মনের একাগ্রতা ও হৃদয়ের গভীরতম আনুগত্যের সংমিশ্রণ। অর্থাৎ, কুনুত হলো সেই মৌনতা ও স্থিরতা যা একজন মুমিনকে আল্লাহর সান্নিধ্যে অবিচল রাখে।

সৃষ্টিজগতের কুনুত: একটি মহাজাগতিক সংযোগ (Reciprocal Connection):

কুরআনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, কুনুত কেবল মানুষের জন্য নয়, বরং মহাবিশ্বের সকল অস্তিত্বের এক চিরন্তন স্বভাব। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:

“বরং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তাঁর; সবকিছুই তাঁর অনুগত (ক্বানিতুন)।” (২:১১৬)

এই আয়াতের শব্দগত সামঞ্জস্যতা (Nazam) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘লাহু ক্বানিতুন’ (لَهُ قَانِتُونَ) বাক্যাংশটি আকাশ ও পৃথিবীর সকল সৃষ্টির জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ হলো, মহাবিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণু আল্লাহর দেওয়া প্রাকৃতিক আইনের প্রতি শর্তহীনভাবে অনুগত। মানুষের জন্য ‘কুনুত’ হলো স্বেচ্ছায় সেই মহাজাগতিক আনুগত্যের সাথে নিজেকে শামিল করা।

বিপরীতার্থক চিত্র হিসেবে যারা অহংকারবশত আল্লাহর বিধান প্রত্যাখ্যান করে, তাদের বিপরীতে ‘ক্বানিতীন’ বা কুনুত পালনকারীরা হলো প্রকৃত সফলকাম। যেখানে সৃষ্টি জগত বাধ্য হয়ে কুনুত করছে, সেখানে মুমিন সালাতে ও যিকিরে স্বেচ্ছায় এই কুনুত বা ঐকান্তিক বিনয় প্রকাশ করে।

প্রচলিত ইবাদতে বা ফিকহের পরিভাষায় ‘কুনুত’:

ফিকহের পরিভাষায় ‘কুনুত’ বলতে সালাতের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় ‘বিশেষ দুআ পাঠ করা’-কে বোঝায়। যেমন:

কুনুতে বিত্র (Qunut-e-Witr): বিত্র সালাতে পঠিত দুআ।

কুনুতে নাজেলা (Qunut-e-Nazilah): বিপদ-আপদে সালাতে পঠিত দুআ।

পার্থক্য: কুরআনে ‘কুনুত’ একটি জীবনদর্শন ও ব্যাপক আনুগত্যের ধারণা, আর প্রচলিত ইবাদতে এটি একটি নির্দিষ্ট আমল। তবে সালাতে দুআ করার সময় বান্দা যেহেতু দীর্ঘক্ষণ বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, তাই পারিভাষিক অর্থে একেও ‘কুনুত’ বলা হয়।

দুআ ভিডিও পোষ্টের নিচের দিকে দ্র:



কুনুত বাস্তবায়নে সালামুন আলা ইব্রাহিম: একনিষ্ঠ অনুগত: 

সালামুন আলা ইব্রাহিম  সম্পর্কে আল-কুরআন মাজীদ অত্যন্ত অলঙ্কৃত ভাষায় বলেছে:

নিশ্চয় ইব্রাহিম ছিলেন এক উম্মত (একক জাতি/অনুকরণীয়), আল্লাহর প্রতি একান্ত অনুগত (ক্বনিতান), একনিষ্ঠ এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। (সূরা নাহল: ১২০)

এখানে ‘ক্বানিতান’ (قَانِتًا) শব্দটি তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য গুণ হিসেবে এসেছে। তাঁর কুনুত ছিল শিরকমুক্ত একনিষ্ঠতা। অনুধ্যান করলে বোঝা যায়, কুনুত কেবল সালাতের ভেতরের কোনো অংশ নয়, বরং এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর ইচ্ছার সামনে নিজেকে সঁপে দেওয়ার নাম।

তাঁকে ‘ক্বনিতান’ (একবচন) বলা হয়েছে কারণ তাঁর আনুগত্য ছিল নিঃশর্ত। তিনি সমাজের স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে একাই এক জাতির ভূমিকা পালন করেছিলেন। শিরক থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর দিকে একনিষ্ঠভাবে ঝুঁকে পড়াই হলো ইব্রাহিমী কুনুতের মূল শিক্ষা।

'ক্বনিতীন' ও 'ক্বনিতাত': ব্যাপক আনুগত্যের চিত্র:

এই গুণটি মুমিন নারী ও পুরুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। সূরা আল-আহযাবের ৩৫ নং আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের দশটি গুণের মধ্যে কুনুতকে বিশেষ স্থান দিয়েছেন:

"নিশ্চয় মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী (ক্বনিতীন ওয়া ক্বনিতাত)..." (সূরা আহযাব: ৩৩:৩৫)

অনুরূপভাবে সূরা তাহরীমে নবীর স্ত্রীদের জন্য আকাঙ্ক্ষিত গুণের তালিকায় বলা হয়েছে:

"...মুসলিম, মু’মিন, অনুগত (ক্বনিতাত), তাওবাকারী, ইবাদতকারী..." (সূরা তাহরীম: ৬৬:৫)

বিশ্বনারীদের ওপর এক মডেল: কুনুত বাস্তবায়নে একজন নারী: সালামুন আলা মারইয়াম:

নারীদের মধ্যে কুনুতের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিলেন সালামুন আলা মারইয়াম। আল্লাহ তাঁকে বিশ্বজগতের নারীদের ওপর মনোনীত করেছেন  এবং কুনুতের নির্দেশ দিয়েছেন।

সূরা আল ইমরান ৩:৪২-৪৩

আর যখন মালাকরা বলছিল, হে মারইয়াম! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন এবং তোমাকে পবিত্র করেছেন। আর বিশ্বসমূহের নারীদের ওপর তোমাকে মনোনীত করেছেন।

হে মারইয়াম! তুমি তোমার রবের অনুগত হও (ইক্বনুতি), এবং সিজদা করো আর রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু করো। 

কিতাব অনুসরণ ও কুনুতের সম্পর্ক:

পরবর্তীতে তাঁর প্রশংসায় আল্লাহ রব্বুল আলামিন সূরা আত-তাহরীমে বলেন:

"এবং ইমরান-তনয়া মারইয়াম... সে তার প্রতিপালকের বাক্য (কালিমাসমূহ) ও কিতাবসমূহকে সত্য বলে গ্রহণ করেছিল (তাসদিক), এবং সে ছিল বিনয়াবনতদের (ক্বনিতীন) অন্তর্ভুক্ত।" (সূরা তাহরীম: ৬৬:১২)

অনুধাবন: এই আয়াত প্রমাণ করে যে, কেবল নীরব থাকা বা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ানোই কুনুত নয়; বরং আল্লাহর কিতাব ও বাণীসমূহকে সত্য বলে মেনে নেওয়া এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাই হলো কুনুতের শর্ত। 

সালামুন আলা মারইয়াম আল্লাহর কিতাবের বাস্তব নমুনা ছিলেন বলেই তিনি ‘ক্বনিতীন’। অর্থাৎ, আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবের জ্ঞান ও আমল ছাড়া প্রকৃত ‘ক্বনিত’ হওয়া সম্ভব নয়।


কুরআনের অন্যান্য আয়াতে কুনুতকারীদের বৈশিষ্ট্য:

কুরআন মাজিদের বিভিন্ন আয়াতে ক্বনিতদের যে বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটে উঠেছে তা নিম্নরূপ:

১. রাতের গভীরে কুনুত ও আখিরাতের ভয়: অনুধ্যানমূলক গভীরতা

কুনুত-এর একটি বিশেষ রূপ হলো রাতের নিস্তব্ধতায় আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা। আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: 

নাকি সে (উত্তম), যে রাতের অনেকটা সময় ধরে আনুগত্য প্রকাশকারী (ক্বনিত), সিজদাকারী হয়ে ও দাঁড়িয়ে, সে আখিরাতকে ভয় করে এবং সে তার রবের রহমতের প্রত্যাশা করে?" (সূরা আয-যুমার: ৩৯:৯)

এই আয়াতের প্রসঙ্গের সাদৃশ্য (contextual similarity) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কুনুত শব্দটি এখানে রাতের ইবাদত, মানে কুরআন সম্পৃক্ত বা কুরআন অধ্যায়ন ও অনুশীলনীতে রাত কাটানোকে তাহাজ্জুদ (বিহি) বলা হয়েছে (দ্র: আয়াত ১৭:৭৮-৭৯)। দিনের কোলাহলমুক্ত সময়ে যখন মানুষ ঘুমের ঘোরে মগ্ন, তখন একজন মুমিন যখন ‘ক্বানিতুন’ অবস্থায় থাকে, তখন তার রুহ ও রবের মধ্যে এক সরাসরি আধ্যাত্মিক সংযোগ (metaphysical connection) তৈরি হয়।

২. পারিবারিক ও সামাজিক আনুগত্য:

"পুণ্যবতী নারীরা (স্বামীদের ও আল্লাহর) অনুগত (ক্বনিতাত) হয়..." (সূরা আন-নিসা: ৪:৩৪)

৩. মহাজাগতিক আনুগত্য:

"আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে সবই তাঁর; সবাই তাঁর অনুগত (ক্বনিতুন)।" (সূরা বাকারা: ২:১১৬)

অর্থাৎ, সৃষ্টির প্রতিটি অণু-পরমাণু আল্লাহর কুনুত করছে; মানুষ যখন কুনুত করে, তখন সে মহাজাগতিক ছন্দের সাথে একাত্ম হয়।

৪. সালাতে একাগ্রতা:

"...আর আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়ে দাঁড়াও (ক্বনিতীন)।" (সূরা বাকারা: ২:২৩৮)

৫. আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের পুরস্কার: 

"আর তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি অনুগত হবে (ইয়াকনুত)... তাকে আমি দু'গুণ পুরস্কার দেব..." (সূরা আহযাব: ৩৩:৩১)

কুনুত ও মুখলিসীন (Sincerity): চূড়ান্ত সংযোগ:

আল্লাহর মনোনীত বান্দাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তারা ‘মুখলিস’ বা একনিষ্ঠ। কুনুত-এর গভীরতম স্তর হলো ইখলাস বা একনিষ্ঠতা। আল্লাহ সু.তা. বলেন:

“তাদেরকে কেবল এই নির্দেশই দেওয়া হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ (মুখলিসীন) করে...” (৯৮:৫)

ইমপ্লাইড এভিডেন্স: ইব্রাহিম (সালামুন আলাইহে) সম্পর্কে যখন বলা হয়েছে তিনি ছিলেন ‘ক্বানিতান’ (একনিষ্ঠ অনুগত), তখন তার পরেই বলা হয়েছে ‘হানিফান’ (একেশ্বরবাদী বা একনিষ্ঠ)। (১৬:১২০)। 
এর মাধ্যমে কুরআন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কুনুত কেবল তখনই সার্থক হয় যখন তাতে ‘ইখলাস’ বা পূর্ণ একনিষ্ঠতা থাকে। কুনুত হলো আনুগত্যের দেহ, আর ইখলাস হলো তার প্রাণ।

 কিয়াম (Qiyam) ও কুনুত: রূহের অবিচলতা:

সালাতে দাঁড়ানো বা ‘কিয়াম’ এবং ‘কুনুত’ শব্দ দুটি প্রায়ই সমান্তরালে চলে। আল্লাহ রব্বুল আলামিন রাত জাগরণকারীদের প্রশংসা করে বলেন:

“এবং যারা তাদের রবের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে (ক্বিয়ামা) রাত্রি অতিবাহিত করে।” (২৫:৬৪)
গভীর বিশ্লেষণ: এখানে ‘ক্বিয়ামা’ (দাঁড়ানো) অবস্থাটি সরাসরি কুনুত-এর অবস্থাকে নির্দেশ করছে। 
৩৯:৯ আয়াতে যেভাবে ‘ক্বানিতুন’ ব্যক্তিকে রাতের আঁধারে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, ২৫:৬৪ আয়াতে সেই একই অবস্থাকে ‘ক্বিয়ামা’ বলা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, কুনুত হলো একটি ‘এক্টিভ মেডিটেশন’ বা সক্রিয় ধ্যান, যেখানে শরীর স্থির থাকে কিন্তু রূহ রবের দিকে ধাবিত হয়।

▓▒░ দুআয়ে কুনুত! ░▒▓

ক্বনিতীনদের দুআ: কিতাব অনুসরণের প্রামাণিক দলিল:

যারা প্রকৃত ক্বনিত, তাদের দুআগুলো নিছক শব্দমালার সমষ্টি নয়; বরং তা আল্লাহর কিতাবের প্রতি তাদের বিশ্বাস ও নির্ভরতার নির্যাস। কুরআনে বর্ণিত এই দুআগুলোই হলো ‘দুআয়ে কুনুত’-এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ।  

কুনুত যেহেতু কেবল সালাতে দাঁড়ানো নয়, বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ‘আল্লাহর জন্য নিজেকে বিলীন করে দেওয়া’ (total submission), তাই নিম্নের দুআগুলো ‘ক্বনিতীন’দের (অনুগতদের) অপরিহার্য পাথেয়।

১. সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর দুআ (সালাত ও বংশধরদের জন্য):

رَبِّ ٱجْعَلْنِى مُقِيمَ ٱلصَّلَوٰةِ وَمِن ذُرِّيَّتِى رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَآءِ. رَبَّنَا ٱغْفِرْ لِى وَلِوَٰلِدَىَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ ٱلْحِسَابُ
উচ্চারণ: রব্বিজ্‘আল্নী মুক্বীমাছ্ ছলা-তি ওয়া মিন র্যুরিইয়াতি, রব্বানা- ওয়া তাক্বাব্বাল্ দু‘আ-, রব্বানা-র্গ্ফিলী ওয়া লিওয়া-লিদাইয়া ওয়া লিলমু’মিনীনা ইয়াওমা ইয়াক্বূমুল হিসা-ব।

অর্থ: হে আমার রব! আমাকে ও আমার বংশধরদের মধ্য থেকে সলাত কায়েমকারী (প্রতিষ্ঠাকারী) বানান। হে আমাদের রব! আর আপনি আমার দুআ কবুল করুন। হে আমাদের রব! যেদিন হিসাব অনুষ্ঠিত হবে, সেদিন আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে ও মুমিনদেরকে ক্ষমা করে দিন! (সূরা ইব্রাহিম: ১৪:৪০-৪১)

২. সালামুন আলা ইব্রাহিম ও সালামুন আলা ইসমাইল-এর দুআ (কবুলিয়াতের জন্য):

رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
উচ্চারণ: রব্বানা-তাক্বাব্বাল্ মিন্না; ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল্ ‘আলীম্। অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-র্বু রাহীম্।

অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে ক্ববূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই তো ক্ষমাশীল, দয়ালু। (সূরা বাকারা: ২:১২৭-১২৮)

৩. সালামুন আলা নূহ-এর দুআ (ক্ষমা ও দয়া):

رَّبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ وَأَنتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ
উচ্চারণ: রব্বিগফির ওয়ারহাম ওয়া আনতা খাইরুর রাহিমীন।

অর্থ: হে আমার রব! ক্ষমা করুন ও দয়া করুন; আর আপনিই তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। (সূরা মুমিনুন: ২৩:১১৮)

৪. দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনায়:

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ: রব্বানা- আ-তিনা-ফিদ্ দুন্ইয়া-হাসানাতাওঁ অফিল্ আ-খিরাতি হাসানাতাওঁ অক্বিনা-‘আযা-বান্না-র।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়ার মধ্যে কল্যাণ ও আখিরাতের মধ্যে কল্যাণ দান করুন। এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। (সূরা বাকারা: ২:২০১)

৫. অবিচলতা ও বিজয়ের জন্য:

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
রব্বানাগ্ র্ফিলানা- যুনূবানা- অইস্রা-ফানা- ফী- আম্রিনা-অছাব্বিত্ আক্ব্দা-মানা- অর্ন্ছুনা- ‘আলাল্ ক্বাওমিল্ কা-ফিরীন্।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদেরকে আমাদের পাপসমূহ ও আমাদের কাজকর্মের মধ্যে আমাদের সীমালঙ্ঘন/বাড়াবাড়ি ক্ষমা করুন এবং আমাদের পদক্ষেপসমূহকে সুদৃঢ় রাখুন আর কাফির জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করুন! (সূরা আল-ইমরান: ৩:১৪৭)

৬. ঈমানের ঘোষণা ও মুক্তি:

رَبَّنَا إِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণ: রব্বানা- ইন্নানা- আ-মান্না- ফাগর্ফি লানা- যুনূবানা-ওয়া ক্বিনা-‘আযা-বান্নার।

অর্থ: হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আমরা ঈমান এনেছি। সুতরাং আমাদের জন্য আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করুন আর আগুনের শাস্তি থেকে আমাদের রক্ষা করুন। (সূরা আল-ইমরান: ৩:১৬)

(বি:দ্র: পরের আয়াতেই ৩:১৭-তে এদের ‘ক্বানিতীন’ বা অনুগত বলা হয়েছে)

৭. হেদায়েতের ওপর অটল থাকার দুআ:

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
উচ্চারণ: রব্বানা-লা-তুযিগ্ কুলূবানা- বা’দা ইয্ হাদাইতানা-অহাবলানা-মিল্ লাদুন্কা রহ্মাতান্, ইন্নাকা আন্তাল্ অহ্হা-ব্।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদেরকে হিদায়েত দানের পরে আমাদের অন্তরসমূহকে বক্র করবেন না, আর আমাদেরকে দান করুন আপনার পক্ষ থেকে দয়া, নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই মহান দাতা। (সূরা আল-ইমরান: ৩:৮)

৮. সালামুন আলা জাকারিয়া-এর বিনয় ও প্রার্থনা:

رَبِّ إِنِّي وَهَنَ الْعَظْمُ مِنِّي وَاشْتَعَلَ الرَّأْسُ شَيْبًا وَلَمْ أَكُن بِدُعَائِكَ رَبِّ شَقِيًّا
উচ্চারণ: রব্বি ইন্নী অহানাল্ ‘আজ্মু মিন্নী অশ্তা‘আলার রাসু শাইবাঁও অলাম্ আকুম্ বিদু‘আ-য়িকা রব্বি শাক্বিয়্যা-।

অর্থ: হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমি, আমার হাড়গুলো দুর্বল হয়ে গিয়েছে এবং বার্ধক্যে মাথা শুভ্র হয়েছে। আর হে আমার রব! আপনাকে ডেকে আমি বিফল হই নাই। (সূরা মারইয়াম: ১৯:৪)

৯. সালামুন আলা ঈসা-এর দুআ (রিযিক ও নিদর্শন):

ٱللَّهُمَّ رَبَّنَآ أَنزِلْ عَلَيْنَا مَآئِدَةً مِّنَ ٱلسَّمَآءِ... وَٱرْزُقْنَا وَأَنتَ خَيْرُ ٱلرَّٰزِقِينَ
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা রব্বানা- আন্যিল্ ‘আলাইনা- মা-য়িদাতাম্ মিনাস্ সামা-য়ি... অরযুক্বনা-অ আংতা খাইর্রু রা-যিক্বীন্।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের রব! আপনি আমাদের জন্য আকাশ থেকে খাদ্যপূর্ণপাত্র নাযিল করুন... আর আপনি আমাদেরকে রিযিক দিন। আর আপনিই উত্তম রিযিকদাতা। (সূরা মায়েদা: ৫:১১৪)

১০. বিপদে ধৈর্য ও ভরসার দুআ (সালামুন আলা আইয়ুব ও সালামুন আলা ইউনুস):

সালামুন আলা আইয়ুব:

أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
অর্থ: নিশ্চয়ই আমাকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করেছে। আর আপনিই দয়ালুদের শ্রেষ্ঠ দয়ালু! (সূরা আম্বিয়া: ২১:৮৩)
সালামুন আলা ইউনুস:
لَّآ اِلٰهَ اِلَّآ اَنْتَ سُبْحٰنَكَ اِنِّيْ كُنْتُ مِنَ الظّٰلِمِيْنَ
অর্থ: আপনি ছাড়া ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র! নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা আম্বিয়া: ২১:৮৭)

১১. আল্লাহর ওপর চূড়ান্ত তাওয়াক্কুল:

حَسبِيَ ٱللَّهُۖ عَلَيهِ يَتَوَكَّلُ ٱلمُتَوَكِّلُونَ
উচ্চারণ: হাসবিয়াল্লাহু আলাইহি ইয়াতাওয়াক্কালুল মুতাওয়াক্কিলুন।

অর্থ: (বলো!) আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট। তাঁর ওপরই ভরসাকারীরা ভরসা করে। (সূরা যুমার: ৩৯:৩৮)

ক্বনিতীনদের আত্মনিবেদন ও পূর্ণাঙ্গ জীবন দর্শনের দুআ:

১২. জীবনের সর্বস্ব আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করার ঘোষণা (কুনুতের সর্বোচ্চ স্তর):

একজন ক্বনিত বা অনুগত বান্দা তার জীবন-মরণ সব কিছুই রবের জন্য ওয়াকফ করে দেয়। সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর মিল্লাতের অনুসরণ হিসেবে এই আয়াতটি কুনুতের মূল মন্ত্র।

 إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ◌ لَا شَرِيكَ لَهُ ۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ

ইন্না সলা-তী ওয়ানুসুকী ওয়ামাহ্ইয়া-ইয়া ওয়ামামা-তী লিল্লা-হি রব্বিল ‘আ-লামীন। লা- শারীকা লাহু ওয়াবিযা-লিকা উমির্তু ওয়া আনা আউওয়ালুল মুসলিমীন।

অর্থ: বলুন! ‘নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানি (ইবাদত), আমার জীবন ও আমার মৃত্যু জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই; আর এ নির্দেশই আমি আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম (আত্মসমর্পণকারী)।’ (৬:১৬২-১৬৩)

১৩. তাওয়াক্কুল ও রুজু হওয়ার দুআ (ইব্রাহিমী কুনুত):

যেহেতু সালামুন আলা ইব্রাহিম ছিলেন ‘ক্বনিতান’ (একনিষ্ঠ অনুগত), তাই তাঁর শেখানো এই দুআটি কুনুত অবলম্বনকারীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে যখন চারপাশ থেকে বিরোধিতা আসে।

رَّبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ  رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلَّذِينَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

রব্বানা-‘আলাইকা তাওয়াক্কাল্না-অইলাইকা আনাব্না-অইলাইকাল্ মাছী-র। রব্বানা- লা- তাজ্ব ‘আল্না- ফিতœাতাল্ লিল্লাযীনা কাফারূ অর্গ্ফিলানা-রব্বানা -ইন্নাকা আংতাল ‘আযীযুল্ হাকীম্।  

অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা আপনার উপরই ভরসা করি এবং আপনার দিকে আমরা মুখ ফেরাই আর আপনার কাছেই প্রত্যাবর্তনস্থল। হে আমাদের রব! যারা কুফর করেছে আমাদেরকে তাদের জন্য ফিতনা বানাবেন না। আর আমাদেরকে ক্ষমা করুন। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই  পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়- আল কুরআন ৬০:৪, ৬০:৫

১৪. আখিরাতের আলো ও ক্ষমার প্রার্থনা (ক্বনিতাতদের দুআ):

সূরা তাহরীমে আল্লাহ বিশ্বাসী নারীদের (ক্বনিতাত) উদাহরণ দিতে গিয়ে ফেরাউনের স্ত্রী এবং সালামুন আলা মারইয়াম-এর কথা বলেছেন। ঠিক তার আগেই আল্লাহ মুমিনদের দুআ শিক্ষা দিয়েছেন, যা কিয়ামতের দিন তাদের সামনে আলো হয়ে থাকবে। এটি কুনুতের আধ্যাত্মিক পূর্ণতা।

رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

রব্বানা- আত্বমিম্ লানা- নূরানা- ওয়াগফির লানা-, ইন্নাকা ‘আলা- কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের আলো পূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন; নিশ্চয় আপনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান। (সূরা আত-তাহরীম: ৬৬:৮)

১৫. মুসলিম হিসেবে মৃত্যু ও সৎকর্মশীলদের সাথী হওয়ার দুআ:

সালামুন আলা ইউসুফ ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে থেকেও যে দুআ করেছিলেন, তা প্রমাণ করে যে একজন ‘ক্বনিত’-এর শেষ ইচ্ছাই হলো আল্লাহর হুকুম মেনে মৃত্যুবরণ করা।

فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنتَ وَلِيِّي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ

উচ্চারণ: ...ফাত্বিরাস সামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদ্বি, আনতা ওয়ালিয়্যী ফিদ্ দুন্ইয়া- ওয়াল আ-খিরাহ; তাওয়াফ্ফানী মুসলিমাঁও ওয়া আলহিক্বনী বিস্ স-লিহীন।

অর্থ: ...হে আসমান ও জমিনের স্রষ্টা! আপনিই দুনিয়া ও আখিরাতে আমার অভিভাবক। আমাকে মুসলিম (আত্মসমর্পণকারী) হিসেবে মৃত্যু দিন এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের সাথে মিলিত করুন। -(সূরা ইউসুফ: ১২:১০১)

১৬. জ্ঞানের গভীরতা ও রহমত কামনার দুআ (উলুল আলবাবের কুনুত):

যারা গভীর জ্ঞানের অধিকারী (উলুল আলবাব), তারা আল্লাহর আয়াতের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে যে দুআ করে, তাকেও কুরআনে কুনুতের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখানো হয়েছে।

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ

রব্বানা- লা- তুযিগ্ কুলূবানা- বা‘দা ইয হাদাইতানা- ওয়াহাব লানা- মিল্লাদুনকা রাহমাহ; ইন্নাকা আনতাল ওয়াহ্হা-ব।

অর্থ: হে আমাদের রব! সরল পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরগুলোকে সত্যলংঘনে বক্র করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান করুন; নিশ্চয় আপনিই মহাদাতা। (সূরা আল-ইমরান: ৩:৮)

১৭. ভাইদের প্রতি বিদ্বেষমুক্ত থাকার দুআ (সামাজিক কুনুত):

কুনুত বা আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের একটি বড় প্রমাণ হলো মুমিন ভাইদের প্রতি অন্তরে হিংসা না রাখা।

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبَنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ

রব্বানাগফির লানা- ওয়ালি ইখওয়া-নিনাল্লাযীনা সাবাকূনা- বিল ঈমা-ন, ওয়া লা- তাজ‘আল ফী কুলূবিনা- গিল্লাল লিল্লাযীনা আ-মানূ, রব্বানা- ইন্নাকা রাঊফুর রাহীম।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদেরকে এবং ঈমানে যারা আমাদের অগ্রগামী হয়েছে সেই ভাইদেরকে ক্ষমা করুন। আর মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয় আপনি স্নেহশীল, পরম দয়ালু (সূরা আল-হাশর: ৫৯:১০)


‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’-এর আলোকে কুনুত বা আনুগত্যের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ‘আলে-ইমরান’ বা ইমরানের পরিবার। এখানে সালামুন আলা মারইয়াম -এর মা (ইমরানের স্ত্রী) এবং স্বয়ং সালামুন আলা মারইয়াম-এর দুআ ও তাসবিহগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এই দুআগুলোর মাধ্যমেই একটি পবিত্র ও অনুগত (ক্বনিত) বংশধর গড়ে উঠেছিল।

১৮. সালামুন আলা মারইয়াম-এর মায়ের দুআ: কুনুতের ভিত্তি স্থাপন:

সালামুন আলা মারইয়াম-এর মা ছিলেন একজন মহীয়সী নারী। তিনি গর্ভাবস্থায় আল্লাহর কাছে যে দুআ করেছিলেন, তা ছিল ‘নজর’ বা মানতের দুআ। তিনি তাঁর গর্ভের সন্তানকে আল্লাহর রাস্তায় ‘মুহাররার’ (আজাদ বা উৎসর্গকৃত) হিসেবে কবুল করার প্রার্থনা করেছিলেন। এটি কুনুতের (আনুগত্যের) সর্বোচ্চ স্তর।

ক. সন্তানকে আল্লাহর জন্য ওয়াকফ করার দুআ:

رَبِّ إِنِّي نَذَرْتُ لَكَ مَا فِي بَطْنِي مُحَرَّرًا فَتَقَبَّلْ مِنِّي ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

রব্বি ইন্নী নাযারতু লাকা মা- ফী বাতনী মুহাররারান ফাতাক্বাব্বাল মিন্নী; ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল ‘আলীম।

অর্থ: হে আমার রব! আমার গর্ভে যা আছে, নিশ্চয় আমি তা আপনার জন্য মানত করলাম ‘উৎসর্গীকৃত’ (আজাদ) হিসেবে। সুতরাং আপনি আমার পক্ষ থেকে তা কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
(সূরা আল-ইমরান: ৩:৩৫)

খ. সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শয়তান থেকে সুরক্ষার দুআ:
সন্তানটি মেয়ে (মারইয়াম) হওয়ার পর তিনি হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাঁর এবং তাঁর ভবিষ্যৎ বংশধরদের (ঈসা আ.-এর) সুরক্ষার জন্য দুআ করেন:

وَإِنِّي سَمَّيْتُهَا مَرْيَمَ وَإِنِّي أُعِيذُهَا بِكَ وَذُرِّيَّتَهَا مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ

উচ্চারণ: ...ওয়াইন্নী সাম্মাইতুহা- মারইয়ামা, ওয়া ইন্নী উ‘ঈযুহা- বিকা ওয়া যুররিয়্যাতাহা- মিনাশ্ শাইতানির রাজীম।

অর্থ: ...আর আমি তার নাম রাখলাম ‘মারইয়াম’। এবং নিশ্চয় আমি তাকে ও তার সন্তানদেরকে অভিশপ্ত শয়তান থেকে আপনার আশ্রয়ে সমর্পণ করছি।
(সূরা আল-ইমরান: ৩:৩৬)


১৯. সালামুন আলা মারইয়াম-এর দুআ ও তাসবিহ: তাওয়াক্কুলের চূড়ান্ত রূপ

সালামুন আলা মারইয়াম ছিলেন ‘ক্বনিতাত’ (আনুগত্যশীলা)-দের শীর্ষস্থানীয়। কুরআনে তাঁর দীর্ঘ কোনো মোনাজাতের চেয়ে আল্লাহর আশ্রয়ের প্রতি তীব্র আকুতি এবং আল্লাহর কুদরতের প্রতি তাসবিহ (বিস্ময় ও পবিত্রতা ঘোষণা) বেশি ফুটে উঠেছে।

ক. বিপদে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার দুআ (তাওয়াক্কুল):
যখন সালামুন আলা জিবরাইল মানবাকৃতিতে তাঁর নির্জন প্রকোষ্ঠে উপস্থিত হলেন, তখন সালামুন আলা মারইয়াম ভীত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন। এটি মুমিনের বিপদের মুহূর্তের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার বা দুআ।

إِنِّي أَعُوذُ بِالرَّحْمَٰنِ مِنكَ إِن كُنتَ تَقِيًّا

ইন্নী আ‘ঊযু বির-রহমা-নি মিনকা ইন কুনতা তাক্বিয়্যা-।

অর্থ: (মারইয়াম বললেন,) ‘আমি তোমার থেকে ‘রহমান’-এর (পরম করুণাময়ের) আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যদি তুমি মুত্তাকি (আল্লাহভীরু) হয়ে থাকো।’
(সূরা মারইয়াম: ১৯:১৮)

খ. আল্লাহর কুদরতের সামনে তাসবিহ ও আত্মসমর্পণ:

যখন তাঁকে সুসংবাদ দেওয়া হলো যে তাঁর কোনো পুরুষসঙ্গ ছাড়াই সন্তান হবে, তখন তিনি আল্লাহর কুদরতের সামনে নিজের অক্ষমতা ও রবের মহত্ত্ব তুলে ধরেছিলেন। এটি এক প্রকার তাসবিহ ও কুনুত।

 رَبِّ أَنَّىٰ يَكُونُ لِي وَلَدٌ وَلَمْ يَمْسَسْنِي بَشَرٌ ۖ قَالَ كَذَٰلِكِ اللَّهُ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ ۚ إِذَا قَضَىٰ أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُن فَيَكُونُ

রব্বি আন্না- ইয়াকূনু লী ওয়ালাদুওঁ ওয়ালাম ইয়ামসাসনী বাশার; ...ইযা- ক্বাদ্বা- আমরান ফাইন্নামা- ইয়াকুলু লাহু কুন ফাইয়াকূন।

অর্থ: [তিনি বললেন, ‘হে আমার রব! কেমন করে আমার সন্তান হবে, অথচ কোনো মানুষ আমাকে স্পর্শ করেনি?’ (ফেরেশতা) বললেন, ‘এভাবেই] আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত নেন, তখন কেবল বলেন “হও”, আর তা হয়ে যায়(সূরা আল-ইমরান: ৩:৪৭)

২০. সদ্যজাত সালামুন আলা ঈসা-এর প্রথম কালাম: কুনুতের ঘোষণা:

সালামুন আলা মারইয়াম-এর কুনুত বা নীরবতার রোজার (সূরা মারইয়াম ১৯:২৬) ফলস্বরূপ আল্লাহ সদ্যজাত শিশু সালামুন আলা ঈসা-এর মুখ দিয়ে যে কথা বলিয়েছিলেন, তা ছিল কুনুতের সারসংক্ষেপ—দাসত্বের ঘোষণা।

 إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا ◌ وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا

ইন্নী ‘আবদুল্লা-হি আ-তা-নিয়াল কিতা-বা ওয়া জা‘আলানী নাবিয়্যা-; ওয়া জা‘আলানী মুবা-রাকান আইনামা- কুনতু ওয়া আওসা-নী বিস্সলা-তি ওয়ায্ যাকা-তি মা- দুমতু হাইয়্যা-।

অর্থ: (শিশু ঈসা) বলল, ‘নিশ্চয় আমি আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী বানিয়েছেন। আর আমি যেখানেই থাকি না কেন, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন এবং আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যতদিন আমি জীবিত থাকি, ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করতে।’ -(সূরা মারইয়াম: ১৯:৩০-৩১)

পর্যালোচনা:
সালামুন আলা মারইয়াম-এর মায়ের দুআ থেকে শুরু করে সালামুন আলা মারইয়াম-এর আশ্রয় প্রার্থনা এবং সালামুন আলা ঈসা-এর নবুওয়াতের ঘোষণা—সবই ‘কুনুত’-এর একই সুতোয় গাঁথা। তাঁরা সবাই ছিলেন আল্লাহর সিদ্ধান্তের সামনে পরম বিনয়ী ও আত্মসমর্পণকারী।

সূরা আল-মায়েদার ১১৮ নম্বর আয়াতটি বাহ্যিক দৃষ্টিতে একটি স্বীকারোক্তি মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে ঈসা ইবনে সালামুন আলা মারইয়াম-এর উম্মতের প্রতি স্নেহ এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি চূড়ান্ত বিনয়। এটি কুনুতের (আত্মসমর্পণের) এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যেখানে সরাসরি ক্ষমা না চেয়েও আল্লাহর হিকমত ও ক্ষমতার ওপর ভরসা করে পরোক্ষভাবে ক্ষমার আরজি পেশ করা হয়েছে।


২১. বিচার দিবসে সালামুন আলা ঈসা-এর কুনুত: বিনয় ও আত্মনিবেদনের চূড়ান্ত বাক্য:

হাশরের ময়দানে যখন আল্লাহ ঈসা নবীকে-কে প্রশ্ন করবেন, তখন তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছার ওপর সঁপে দিয়ে একটি জওয়াব দেবেন। এটি মূলত একটি ‘পরোক্ষ দুআ’ বা সুপারিশ, যেখানে তিনি আল্লাহর বান্দাদের বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর ইনসাফ ও হিকমতের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। এটি ‘কুনুত’ বা আদবের সর্বোচ্চ স্তর।

إِن تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ ۖ وَإِن تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

ইন্ তু‘আয্যিব্হুম্ ফাইন্নাহুম্ ‘ইবা-দুকা, ওয়া ইন্ তাগফির লাহুম্ ফাইন্নাকা আনতাল্ ‘আযীযুল হাকীম্।

অর্থ: ‘যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন, তবে তারা তো আপনারই বান্দা; আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করেন, তবে নিশ্চয় আপনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’
(সূরা আল-মায়েদা: ৫:১১৮)

কুনুতের শিক্ষা:
সাধারণত ক্ষমার দুআয় ‘গফুর ও রহিম’ (ক্ষমাশীল ও দয়ালু) নাম ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সালামুন আলা ঈসা এখানে ‘আযীয ও হাকীম’ (পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়) নাম ব্যবহার করেছেন। এর দ্বারা তিনি এই কুনুত বা বিনয় প্রকাশ করেছেন যে—

১. আল্লাহ যদি ক্ষমা করেন, তবে তা তাঁর দুর্বলতা নয় বরং ক্ষমতা (আযীয)।

২. তিনি যদি শাস্তি দেন বা ক্ষমা করেন, তা তাঁর প্রজ্ঞা (হাকীম) অনুযায়ীই হবে; এতে কারো কোনো হাত নেই।

এই বাক্যের মাধ্যমে নবী ঈসা আল্লাহর দরবারে নিজের উম্মতের জন্য এক মার্জিত ‘শুভ কামনা’ বা মুক্তির পথ খোলা রেখেছেন, যা কেবল একজন প্রকৃত ‘ক্বনিত’ (অনুগত)-এর পক্ষেই সম্ভব।

বিশ্লেষণ:
উপরোক্ত দুআগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ‘কুনুত’ হলো—

১. সালাত ইবাদতে একাগ্রতা (৬:১৬২)
২. আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর পূর্ণ ভরসা (৬০:৪)
৩. নিজের ঈমান আমলের পূর্ণতা কামনা (৬৬:৮)
৪. শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আনুগত্য (১২:১০১)

সুতরাং, কুরআনের ভাষায় কুনুত কোনো সাময়িক অনুষ্ঠান নয়, বরং  এটি ‘তাওহীদি জীবনব্যবস্থার এক অবিচল অঙ্গীকার’

উপসংহার

কুরআনের দৃষ্টিতে কুনুত কেবল কিছু শব্দ আউড়ানো নয়। ক্বনিতীন বা অনুগত বান্দা হওয়ার অর্থ হলো—আল্লাহর কিতাবকে সত্য জানা, সেই কিতাবের বিধান অনুযায়ী নিজের জীবন পরিচালনা করা এবং সুখে-দুঃখে সর্বদা রবের দিকে বিনয়াবনত থাকা। সালামুন আলা ইব্রাহিম এবং সালামুন আলা মারইয়াম-এর জীবনাদর্শ ও কুরআনে বর্ণিত এই দুআগুলোই হলো কুনুতের প্রকৃত নির্যাস।

দুআ ভিডিও


Post a Comment (0)
Previous Post Next Post