🔹ক্বানিতীন কারা? দুআয়ে কুনুত:
🔹 কুনুত ও ক্বানিতীন: কারা এই বিশেষ শ্রেণি—কুরআনের বর্ণনায় তাদের বৈশিষ্ট্য-
🔹 কুনুত (Qunut) ও ক্বানিতীন: কুরআনের আলোকে অনুগত বান্দাদের পরিচয়-
▓▒░ বিস্তারিত ░▒▓
আল-কুরআন মাজীদ একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান এবং এর শব্দচয়ন ও বিন্যাস অত্যন্ত সুনিপুণ। প্রচলিত ধারায় আমরা ‘কুনুত’ বলতে নির্দিষ্ট একটি দুআকে বুঝে থাকলেও, আল-কুরআনের শব্দতাত্ত্বিক ও প্রাসঙ্গিক বিশ্লেষণে ‘কুনুত’ (قنوت) শব্দটি এক গভীর ও বিস্তৃত অর্থ বহন করে। এটি কেবল একটি পঠিত দুআ নয়, বরং এটি হচ্ছে রূহানি বা আধ্যাত্মিক এক অনন্য অবস্থা।
আল-কুরআন মাজীদের বিভিন্ন আয়াতে ‘কুনুত’ ও এর বিবিধ রূপ (যেমন: ক্বানিতুন, ক্বানিতীন, উক্বোন্তি) ব্যবহৃত হয়েছে। আল-কুরআনের সামষ্টিক প্রেক্ষাপটে ‘কুনুত’ বলতে বোঝায়—আল্লাহ রব্বুল আলামিনের প্রতি চরম বিনীত হয়ে, নীরবতা পালন করে, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করা এবং তাঁর কিতাবের সত্যয়ন করা। এটি মুমিনের একটি স্থায়ী গুণ বা ‘সিফাত’।
আল্লাহ সু.তা. ইরশাদ করেন:
“তোমরা সালাতের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী সালাতের এবং আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হও বিনীতভাবে (ক্বানিতীন)।” (২:২৩৮)
এখানে ‘ক্বানিতীন’ (قَانِتِينَ) শব্দটি সালাতের একটি বিশেষ গুণ নির্দেশ করছে। এটি কেবল শারীরিক দাঁড়ানো নয়, বরং মনের একাগ্রতা ও হৃদয়ের গভীরতম আনুগত্যের সংমিশ্রণ। অর্থাৎ, কুনুত হলো সেই মৌনতা ও স্থিরতা যা একজন মুমিনকে আল্লাহর সান্নিধ্যে অবিচল রাখে।
প্রচলিত ইবাদতে বা ফিকহের পরিভাষায় ‘কুনুত’:
কুনুত বাস্তবায়নে সালামুন আলা ইব্রাহিম: একনিষ্ঠ অনুগত:
সালামুন আলা ইব্রাহিম সম্পর্কে আল-কুরআন মাজীদ অত্যন্ত অলঙ্কৃত ভাষায় বলেছে:
নিশ্চয় ইব্রাহিম ছিলেন এক উম্মত (একক জাতি/অনুকরণীয়), আল্লাহর প্রতি একান্ত অনুগত (
এখানে ‘ক্বানিতান’ (قَانِتًا) শব্দটি তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য গুণ হিসেবে এসেছে। তাঁর কুনুত ছিল শিরকমুক্ত একনিষ্ঠতা। অনুধ্যান করলে বোঝা যায়, কুনুত কেবল সালাতের ভেতরের কোনো অংশ নয়, বরং এটি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর ইচ্ছার সামনে নিজেকে সঁপে দেওয়ার নাম।
'ক্বনিতীন' ও 'ক্বনিতাত': ব্যাপক আনুগত্যের চিত্র:
বিশ্বনারীদের ওপর এক মডেল: কুনুত বাস্তবায়নে একজন নারী: সালামুন আলা মারইয়াম:
সূরা আল ইমরান ৩:৪২-৪৩
আর যখন মালাকরা বলছিল, হে মারইয়াম! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে মনোনীত করেছেন এবং তোমাকে পবিত্র করেছেন। আর বিশ্বসমূহের নারীদের ওপর তোমাকে মনোনীত করেছেন।
হে মারইয়াম! তুমি তোমার রবের অনুগত হও (ইক্বনুতি), এবং সিজদা করো আর রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু করো।
কিতাব অনুসরণ ও কুনুতের সম্পর্ক:
কুরআনের অন্যান্য আয়াতে কুনুতকারীদের বৈশিষ্ট্য:
১. রাতের গভীরে কুনুত ও আখিরাতের ভয়: অনুধ্যানমূলক গভীরতা
২. পারিবারিক ও সামাজিক আনুগত্য:
৩. মহাজাগতিক আনুগত্য:
৪. সালাতে একাগ্রতা:
৫. আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্যের পুরস্কার:
কুনুত ও মুখলিসীন (Sincerity): চূড়ান্ত সংযোগ:
কিয়াম (Qiyam) ও কুনুত: রূহের অবিচলতা:
ক্বনিতীনদের দুআ: কিতাব অনুসরণের প্রামাণিক দলিল:
১. সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর দুআ (সালাত ও বংশধরদের জন্য):
২. সালামুন আলা ইব্রাহিম ও সালামুন আলা ইসমাইল-এর দুআ (কবুলিয়াতের জন্য):
৩. সালামুন আলা নূহ-এর দুআ (ক্ষমা ও দয়া):
৪. দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনায়:
৫. অবিচলতা ও বিজয়ের জন্য:
৬. ঈমানের ঘোষণা ও মুক্তি:
৭. হেদায়েতের ওপর অটল থাকার দুআ:
৮. সালামুন আলা জাকারিয়া-এর বিনয় ও প্রার্থনা:
৯. সালামুন আলা ঈসা-এর দুআ (রিযিক ও নিদর্শন):
১০. বিপদে ধৈর্য ও ভরসার দুআ (সালামুন আলা আইয়ুব ও সালামুন আলা ইউনুস):
১১. আল্লাহর ওপর চূড়ান্ত তাওয়াক্কুল:
ক্বনিতীনদের আত্মনিবেদন ও পূর্ণাঙ্গ জীবন দর্শনের দুআ:
১২. জীবনের সর্বস্ব আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করার ঘোষণা (কুনুতের সর্বোচ্চ স্তর):
একজন ক্বনিত বা অনুগত বান্দা তার জীবন-মরণ সব কিছুই রবের জন্য ওয়াকফ করে দেয়। সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর মিল্লাতের অনুসরণ হিসেবে এই আয়াতটি কুনুতের মূল মন্ত্র।
إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ◌ لَا شَرِيكَ لَهُ ۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ
ইন্না সলা-তী ওয়ানুসুকী ওয়ামাহ্ইয়া-ইয়া ওয়ামামা-তী লিল্লা-হি রব্বিল ‘আ-লামীন। লা- শারীকা লাহু ওয়াবিযা-লিকা উমির্তু ওয়া আনা আউওয়ালুল মুসলিমীন।
অর্থ: বলুন! ‘নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানি (ইবাদত), আমার জীবন ও আমার মৃত্যু জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই; আর এ নির্দেশই আমি আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম (আত্মসমর্পণকারী)।’ — (৬:১৬২-১৬৩)
১৩. তাওয়াক্কুল ও রুজু হওয়ার দুআ (ইব্রাহিমী কুনুত):
যেহেতু সালামুন আলা ইব্রাহিম ছিলেন ‘ক্বনিতান’ (একনিষ্ঠ অনুগত), তাই তাঁর শেখানো এই দুআটি কুনুত অবলম্বনকারীদের জন্য অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে যখন চারপাশ থেকে বিরোধিতা আসে।
رَّبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلَّذِينَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
রব্বানা-‘আলাইকা তাওয়াক্কাল্না-অইলাইকা আনাব্না-অইলাইকাল্ মাছী-র। রব্বানা- লা- তাজ্ব ‘আল্না- ফিতœাতাল্ লিল্লাযীনা কাফারূ অর্গ্ফিলানা-রব্বানা -ইন্নাকা আংতাল ‘আযীযুল্ হাকীম্।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা আপনার উপরই ভরসা করি এবং আপনার দিকে আমরা মুখ ফেরাই আর আপনার কাছেই প্রত্যাবর্তনস্থল। হে আমাদের রব! যারা কুফর করেছে আমাদেরকে তাদের জন্য ফিতনা বানাবেন না। আর আমাদেরকে ক্ষমা করুন। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়- আল কুরআন ৬০:৪, ৬০:৫
১৪. আখিরাতের আলো ও ক্ষমার প্রার্থনা (ক্বনিতাতদের দুআ):
সূরা তাহরীমে আল্লাহ বিশ্বাসী নারীদের (ক্বনিতাত) উদাহরণ দিতে গিয়ে ফেরাউনের স্ত্রী এবং সালামুন আলা মারইয়াম-এর কথা বলেছেন। ঠিক তার আগেই আল্লাহ মুমিনদের দুআ শিক্ষা দিয়েছেন, যা কিয়ামতের দিন তাদের সামনে আলো হয়ে থাকবে। এটি কুনুতের আধ্যাত্মিক পূর্ণতা।
رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
রব্বানা- আত্বমিম্ লানা- নূরানা- ওয়াগফির লানা-, ইন্নাকা ‘আলা- কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের আলো পূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন; নিশ্চয় আপনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান। — (সূরা আত-তাহরীম: ৬৬:৮)
১৫. মুসলিম হিসেবে মৃত্যু ও সৎকর্মশীলদের সাথী হওয়ার দুআ:
সালামুন আলা ইউসুফ ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে থেকেও যে দুআ করেছিলেন, তা প্রমাণ করে যে একজন ‘ক্বনিত’-এর শেষ ইচ্ছাই হলো আল্লাহর হুকুম মেনে মৃত্যুবরণ করা।
فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ أَنتَ وَلِيِّي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ ۖ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ
উচ্চারণ: ...ফাত্বিরাস সামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদ্বি, আনতা ওয়ালিয়্যী ফিদ্ দুন্ইয়া- ওয়াল আ-খিরাহ; তাওয়াফ্ফানী মুসলিমাঁও ওয়া আলহিক্বনী বিস্ স-লিহীন।
অর্থ: ...হে আসমান ও জমিনের স্রষ্টা! আপনিই দুনিয়া ও আখিরাতে আমার অভিভাবক। আমাকে মুসলিম (আত্মসমর্পণকারী) হিসেবে মৃত্যু দিন এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের সাথে মিলিত করুন। -(সূরা ইউসুফ: ১২:১০১)
১৬. জ্ঞানের গভীরতা ও রহমত কামনার দুআ (উলুল আলবাবের কুনুত):
যারা গভীর জ্ঞানের অধিকারী (উলুল আলবাব), তারা আল্লাহর আয়াতের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে যে দুআ করে, তাকেও কুরআনে কুনুতের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
রব্বানা- লা- তুযিগ্ কুলূবানা- বা‘দা ইয হাদাইতানা- ওয়াহাব লানা- মিল্লাদুনকা রাহমাহ; ইন্নাকা আনতাল ওয়াহ্হা-ব।
অর্থ: হে আমাদের রব! সরল পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরগুলোকে সত্যলংঘনে বক্র করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান করুন; নিশ্চয় আপনিই মহাদাতা। — (সূরা আল-ইমরান: ৩:৮)
১৭. ভাইদের প্রতি বিদ্বেষমুক্ত থাকার দুআ (সামাজিক কুনুত):
কুনুত বা আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের একটি বড় প্রমাণ হলো মুমিন ভাইদের প্রতি অন্তরে হিংসা না রাখা।
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبَنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
রব্বানাগফির লানা- ওয়ালি ইখওয়া-নিনাল্লাযীনা সাবাকূনা- বিল ঈমা-ন, ওয়া লা- তাজ‘আল ফী কুলূবিনা- গিল্লাল লিল্লাযীনা আ-মানূ, রব্বানা- ইন্নাকা রাঊফুর রাহীম।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদেরকে এবং ঈমানে যারা আমাদের অগ্রগামী হয়েছে সেই ভাইদেরকে ক্ষমা করুন। আর মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয় আপনি স্নেহশীল, পরম দয়ালু — (সূরা আল-হাশর: ৫৯:১০)
১৩. তাওয়াক্কুল ও রুজু হওয়ার দুআ (ইব্রাহিমী কুনুত):
رَّبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلَّذِينَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
রব্বানা-‘আলাইকা তাওয়াক্কাল্না-অইলাইকা আনাব্না-অইলাইকাল্ মাছী-র। রব্বানা- লা- তাজ্ব ‘আল্না- ফিতœাতাল্ লিল্লাযীনা কাফারূ অর্গ্ফিলানা-রব্বানা -ইন্নাকা আংতাল ‘আযীযুল্ হাকীম্।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা আপনার উপরই ভরসা করি এবং আপনার দিকে আমরা মুখ ফেরাই আর আপনার কাছেই প্রত্যাবর্তনস্থল। হে আমাদের রব! যারা কুফর করেছে আমাদেরকে তাদের জন্য ফিতনা বানাবেন না। আর আমাদেরকে ক্ষমা করুন। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়- আল কুরআন ৬০:৪, ৬০:৫
১৪. আখিরাতের আলো ও ক্ষমার প্রার্থনা (ক্বনিতাতদের দুআ):
১৫. মুসলিম হিসেবে মৃত্যু ও সৎকর্মশীলদের সাথী হওয়ার দুআ:
১৬. জ্ঞানের গভীরতা ও রহমত কামনার দুআ (উলুল আলবাবের কুনুত):
১৭. ভাইদের প্রতি বিদ্বেষমুক্ত থাকার দুআ (সামাজিক কুনুত):
‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’-এর আলোকে কুনুত বা আনুগত্যের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ‘আলে-ইমরান’ বা ইমরানের পরিবার। এখানে সালামুন আলা মারইয়াম -এর মা (ইমরানের স্ত্রী) এবং স্বয়ং সালামুন আলা মারইয়াম -এর দুআ ও তাসবিহগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এই দুআগুলোর মাধ্যমেই একটি পবিত্র ও অনুগত (ক্বনিত) বংশধর গড়ে উঠেছিল।
১৮. সালামুন আলা মারইয়াম-এর মায়ের দুআ: কুনুতের ভিত্তি স্থাপন:
সালামুন আলা মারইয়াম-এর মা ছিলেন একজন মহীয়সী নারী। তিনি গর্ভাবস্থায় আল্লাহর কাছে যে দুআ করেছিলেন, তা ছিল ‘নজর’ বা মানতের দুআ । তিনি তাঁর গর্ভের সন্তানকে আল্লাহর রাস্তায় ‘মুহাররার’ (আজাদ বা উৎসর্গকৃত) হিসেবে কবুল করার প্রার্থনা করেছিলেন। এটি কুনুতের (আনুগত্যের) সর্বোচ্চ স্তর।
ক. সন্তানকে আল্লাহর জন্য ওয়াকফ করার দুআ:
رَبِّ إِنِّي نَذَرْتُ لَكَ مَا فِي بَطْنِي مُحَرَّرًا فَتَقَبَّلْ مِنِّي ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
ক. সন্তানকে আল্লাহর জন্য ওয়াকফ করার দুআ:
১৯. সালামুন আলা মারইয়াম-এর দুআ ও তাসবিহ: তাওয়াক্কুলের চূড়ান্ত রূপ
সালামুন আলা মারইয়াম ছিলেন ‘ক্বনিতাত’ (আনুগত্যশীলা)-দের শীর্ষস্থানীয়। কুরআনে তাঁর দীর্ঘ কোনো মোনাজাতের চেয়ে আল্লাহর আশ্রয়ের প্রতি তীব্র আকুতি এবং আল্লাহর কুদরতের প্রতি তাসবিহ (বিস্ময় ও পবিত্রতা ঘোষণা) বেশি ফুটে উঠেছে।
ক. বিপদে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার দুআ (তাওয়াক্কুল):
যখন সালামুন আলা জিবরাইল মানবাকৃতিতে তাঁর নির্জন প্রকোষ্ঠে উপস্থিত হলেন, তখন সালামুন আলা মারইয়াম ভীত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করেছিলেন। এটি মুমিনের বিপদের মুহূর্তের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার বা দুআ।
إِنِّي أَعُوذُ بِالرَّحْمَٰنِ مِنكَ إِن كُنتَ تَقِيًّا
ইন্নী আ‘ঊযু বির-রহমা-নি মিনকা ইন কুনতা তাক্বিয়্যা-।
অর্থ: (মারইয়াম বললেন,) ‘আমি তোমার থেকে ‘রহমান’-এর (পরম করুণাময়ের) আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যদি তুমি মুত্তাকি (আল্লাহভীরু) হয়ে থাকো।’
— (সূরা মারইয়াম: ১৯:১৮)
খ. আল্লাহর কুদরতের সামনে তাসবিহ ও আত্মসমর্পণ:
যখন তাঁকে সুসংবাদ দেওয়া হলো যে তাঁর কোনো পুরুষসঙ্গ ছাড়াই সন্তান হবে, তখন তিনি আল্লাহর কুদরতের সামনে নিজের অক্ষমতা ও রবের মহত্ত্ব তুলে ধরেছিলেন। এটি এক প্রকার তাসবিহ ও কুনুত।
رَبِّ أَنَّىٰ يَكُونُ لِي وَلَدٌ وَلَمْ يَمْسَسْنِي بَشَرٌ ۖ قَالَ كَذَٰلِكِ اللَّهُ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ ۚ إِذَا قَضَىٰ أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُن فَيَكُونُ
রব্বি আন্না- ইয়াকূনু লী ওয়ালাদুওঁ ওয়ালাম ইয়ামসাসনী বাশার; ...ইযা- ক্বাদ্বা- আমরান ফাইন্নামা- ইয়াকুলু লাহু কুন ফাইয়াকূন।
অর্থ: [তিনি বললেন, ‘হে আমার রব! কেমন করে আমার সন্তান হবে, অথচ কোনো মানুষ আমাকে স্পর্শ করেনি?’ (ফেরেশতা) বললেন, ‘এভাবেই] আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত নেন, তখন কেবল বলেন “হও”, আর তা হয়ে যায়— (সূরা আল-ইমরান: ৩:৪৭)
খ. আল্লাহর কুদরতের সামনে তাসবিহ ও আত্মসমর্পণ:
২০. সদ্যজাত সালামুন আলা ঈসা-এর প্রথম কালাম: কুনুতের ঘোষণা:
সালামুন আলা মারইয়াম-এর কুনুত বা নীরবতার রোজার (সূরা মারইয়াম ১৯:২৬) ফলস্বরূপ আল্লাহ সদ্যজাত শিশু সালামুন আলা ঈসা-এর মুখ দিয়ে যে কথা বলিয়েছিলেন, তা ছিল কুনুতের সারসংক্ষেপ—দাসত্বের ঘোষণা।
إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا ◌ وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا
ইন্নী ‘আবদুল্লা-হি আ-তা-নিয়াল কিতা-বা ওয়া জা‘আলানী নাবিয়্যা-; ওয়া জা‘আলানী মুবা-রাকান আইনামা- কুনতু ওয়া আওসা-নী বিস্সলা-তি ওয়ায্ যাকা-তি মা- দুমতু হাইয়্যা-।
অর্থ: (শিশু ঈসা) বলল, ‘নিশ্চয় আমি আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী বানিয়েছেন। আর আমি যেখানেই থাকি না কেন, তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন এবং আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যতদিন আমি জীবিত থাকি, ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করতে।’ -(সূরা মারইয়াম: ১৯:৩০-৩১)
পর্যালোচনা:
সালামুন আলা মারইয়াম-এর মায়ের দুআ থেকে শুরু করে সালামুন আলা মারইয়াম-এর আশ্রয় প্রার্থনা এবং সালামুন আলা ঈসা-এর নবুওয়াতের ঘোষণা—সবই ‘কুনুত’ -এর একই সুতোয় গাঁথা। তাঁরা সবাই ছিলেন আল্লাহর সিদ্ধান্তের সামনে পরম বিনয়ী ও আত্মসমর্পণকারী।
সূরা আল-মায়েদার ১১৮ নম্বর আয়াতটি বাহ্যিক দৃষ্টিতে একটি স্বীকারোক্তি মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে ঈসা ইবনে সালামুন আলা মারইয়াম -এর উম্মতের প্রতি স্নেহ এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি চূড়ান্ত বিনয়। এটি কুনুতের (আত্মসমর্পণের) এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যেখানে সরাসরি ক্ষমা না চেয়েও আল্লাহর হিকমত ও ক্ষমতার ওপর ভরসা করে পরোক্ষভাবে ক্ষমার আরজি পেশ করা হয়েছে।
২১. বিচার দিবসে সালামুন আলা ঈসা-এর কুনুত: বিনয় ও আত্মনিবেদনের চূড়ান্ত বাক্য:
হাশরের ময়দানে যখন আল্লাহ ঈসা নবীকে-কে প্রশ্ন করবেন, তখন তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছার ওপর সঁপে দিয়ে একটি জওয়াব দেবেন। এটি মূলত একটি ‘পরোক্ষ দুআ’ বা সুপারিশ, যেখানে তিনি আল্লাহর বান্দাদের বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর ইনসাফ ও হিকমতের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। এটি ‘কুনুত’ বা আদবের সর্বোচ্চ স্তর।
إِن تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ ۖ وَإِن تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
ইন্ তু‘আয্যিব্হুম্ ফাইন্নাহুম্ ‘ইবা-দুকা, ওয়া ইন্ তাগফির লাহুম্ ফাইন্নাকা আনতাল্ ‘আযীযুল হাকীম্।
অর্থ: ‘যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন, তবে তারা তো আপনারই বান্দা; আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করেন, তবে নিশ্চয় আপনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’
— (সূরা আল-মায়েদা: ৫:১১৮)
কুনুতের শিক্ষা:
সাধারণত ক্ষমার দুআয় ‘গফুর ও রহিম’ (ক্ষমাশীল ও দয়ালু) নাম ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সালামুন আলা ঈসা এখানে ‘আযীয ও হাকীম’ (পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়) নাম ব্যবহার করেছেন। এর দ্বারা তিনি এই কুনুত বা বিনয় প্রকাশ করেছেন যে—
১. আল্লাহ যদি ক্ষমা করেন, তবে তা তাঁর দুর্বলতা নয় বরং ক্ষমতা (আযীয )।
২. তিনি যদি শাস্তি দেন বা ক্ষমা করেন, তা তাঁর প্রজ্ঞা (হাকীম ) অনুযায়ীই হবে; এতে কারো কোনো হাত নেই।
এই বাক্যের মাধ্যমে নবী ঈসা আল্লাহর দরবারে নিজের উম্মতের জন্য এক মার্জিত ‘শুভ কামনা’ বা মুক্তির পথ খোলা রেখেছেন, যা কেবল একজন প্রকৃত ‘ক্বনিত’ (অনুগত)-এর পক্ষেই সম্ভব।
বিশ্লেষণ:
উপরোক্ত দুআগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ‘কুনুত’ হলো—
১. সালাত ও ইবাদতে একাগ্রতা (৬:১৬২)।
২. আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর পূর্ণ ভরসা (৬০:৪)।
৩. নিজের ঈমান ও আমলের পূর্ণতা কামনা (৬৬:৮)।
৪. শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আনুগত্য (১২:১০১)।
সুতরাং,
কুরআনের ভাষায় কুনুত কোনো সাময়িক অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি ‘তাওহীদি জীবনব্যবস্থার এক অবিচল অঙ্গীকার’।
বিশ্লেষণ:
উপরোক্ত দুআগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ‘কুনুত’ হলো—
১. সালাত ও ইবাদতে একাগ্রতা (৬:১৬২)।
২. আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর পূর্ণ ভরসা (৬০:৪)।
৩. নিজের ঈমান ও আমলের পূর্ণতা কামনা (৬৬:৮)।
৪. শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আনুগত্য (১২:১০১)।
সুতরাং, কুরআনের ভাষায় কুনুত কোনো সাময়িক অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি ‘তাওহীদি জীবনব্যবস্থার এক অবিচল অঙ্গীকার’।
