মানুষের রচিত ইতিহাস বনাম আল-কোরআনের বর্ণিত ইতিহাস (history)—একজন আয়াতবিশ্বাসীর জন্য কোনটি গ্রহণযোগ্য?
অনুধাবনের আয়োজনে: মতিউর রহমান খান
0
একজন আয়াতবিশ্বাসী মুসলিমের জন্য মানুষের রচিত ইতিহাস বনাম আল-কোরআনের ইতিহাসের তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং করণীয় সম্পর্কে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছি।
মানুষের রচিত ইতিহাস বনাম আল-কোরআনের শাশ্বত সত্য: মুমিনের চূড়ান্ত অবস্থান:
একজন ‘এক কিতাবে’ (আল-কোরআন) বিশ্বাসী মুসলিম হিসেবে আপনার জন্য আল-কোরআনের বর্ণিত ইতিহাস বা কাহিনীই একমাত্র চূড়ান্ত সত্য (আল-হক) এবং গ্রহণীয়। মানুষের রচিত ইতিহাস যদি কোরআনের তথ্যের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তবে তা বর্জনীয়। আর যদি তা কোরআনের সাথে মিলে যায় বা কোরআন এ বিষয়ে নীরব থাকে, তবে তা শর্তসাপেক্ষে ‘ঐতিহাসক তথ্য’ হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু দ্বীনের দলিল বা চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নয়। নিম্নে এ বিষয়ে কোরআনের অকাট্য দলিল ও যুক্তিগুলো উপস্থাপন করা হলো:
❖ আল-কোরআনের ইতিহাসই চূড়ান্ত সত্য (আল-হক):
মানুষের রচিত ইতিহাস সর্বদাই মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞান, আবেগ, রাজনৈতিক প্রভাব বা তথ্যের বিকৃতি দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। কিন্তু মহান আল্লাহ দাবি করেছেন যে, কোরআনের কাহিনীগুলো নিছক গল্প নয়, বরং ধ্রুব সত্য। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:
“নিশ্চয়ই এই বর্ণনা সত্য এবং আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।” (সূরা আলে-ইমরান: ৬২) অন্যত্র আসহাবে কাহাফের প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:
“আমি আপনার নিকট তাদের সংবাদ ‘সঠিকভাবে’ (বিল-হক) বর্ণনা করছি।” (সূরা আল-কাহফ: ১৩) এখানে ‘সঠিকভাবে’ শব্দটি প্রমাণ করে যে, মানুষের রচিত কাহিনীতে ভুল থাকতে পারে, কিন্তু আল্লাহ যা বলেন তাতে ভুলের কোনো অবকাশ নেই।
❖ অনুমাননির্ভর ইতিহাসের অসারতা (জন্ন বনাম হাক্ক):
ইতিহাসবিদরা অনেক সময় শোনা কথা, জনশ্রুতি বা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ইতিহাস রচনা করেন। কোরআন এই অনুমাননির্ভর জ্ঞানকে সত্যের বিপরীতে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করেছে।
আল্লাহর ঘোষণা: “তাদের অধিকাংশই কেবল অনুমানের অনুসরণ করে। নিশ্চয় সত্যের মোকাবেলায় অনুমানের কোনোই কাজে আসে না।” (সূরা ইউনুস: ৩৬)
আসহাবে কাহাফের সংখ্যা নিয়ে মানুষের বিতর্কের উদাহরণ দিয়ে আল্লাহ শিখিয়ে দিয়েছেন যে, মানুষ ‘অদৃশ্যের বিষয়ে অনুমান করে’ (রাজমাম বিল-গাইব) কথা বলে। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, এসব বিষয়ে তর্কে না জড়িয়ে ওহীর তথ্যের ওপর নির্ভর করাই মুমিনের কাজ (সূরা কাহফ: ২২)।
❖ কোরআন হলো সত্য-মিথ্যার চূড়ান্ত মানদণ্ড (মুহাইমিন):
পূর্ববর্তী কিতাব বা মানুষের কাছে থাকা ঐতিহাসিক তথ্যের ওপর কোরআন হলো ‘মুহাইমিন’ বা রক্ষণাবেক্ষণকারী ও তদারককারী। অর্থাৎ, মানুষের ইতিহাসের যেটুকু কোরআনের সাথে মিলবে তা সত্য, আর যা মিলবে না তা বাতিল।
আল্লাহ বলেন: “আর আমি আপনার প্রতি কিতাব (কোরআন) নাজিল করেছি সত্যসহ, যা পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর ওপর তদারককারী (মুহাইমিন)।” (সূরা আল-মায়েদাহ: ৪৮)
সুতরাং, প্রচলিত ইতিহাসকে কোরআনের ফিল্টারে যাচাই করতে হবে। কোরআন যাকে সত্য বলবে তা-ই সত্য; বাকি সব বর্জনীয়।
❖ সর্বোত্তম কাহিনী ও বিস্তারিত বিবরণ (আহসানুল কাসাস):
মানুষ অনেক সময় মনোরঞ্জনের জন্য ইতিহাস বা কাহিনী রচনা করে, যাতে অতিরঞ্জন থাকে। কিন্তু কোরআন হলো ‘আহসানুল কাসাস’ বা সর্বোত্তম কাহিনী। আল্লাহ বলেন:
“আমি তোমার নিকট ‘সর্বোত্তম কাহিনী/ইতিহাস’ বর্ণনা করছি এই কোরআন ওহী করার মাধ্যমে...” (সূরা ইউসুফ: ৩)
আরও বলা হয়েছে: “অবশ্যই তাদের ঘটনাবলীর মধ্যে রয়েছে বোধসম্পন্নদের জন্য শিক্ষা। এটা এমন কোনো বিবরণ হতে পারে না, যা রচনা করা হয়। বরং তার প্রত্যায়ন যা তার সামনে আছে এবং প্রত্যেক বিষয়ের বিশদ বিবরণ এবং দিক—নির্দেশনা ও রহমত এমন জনগোষ্ঠীর জন্য, যারা ঈমান আনে।” (সূরা ইউসুফ: ১১১)
যেখানে আল্লাহ নিজে বলছেন যে তিনি ‘সবকিছুর বিস্তারিত বিবরণ’ (তাজসিলা কুল্লি শাই) দিয়েছেন, সেখানে সূরা ফিল বা অন্য কোনো ঘটনার ব্যাখ্যার জন্য বাইরের ইতিহাসের দ্বারস্থ হওয়া মানে পরোক্ষভাবে আল্লাহর বর্ণনাকে ‘অসম্পূর্ণ’ মনে করা—যা ঈমানের পরিপন্থী।
❖ সত্য ও মিথ্যার মিশ্রণ বর্জন এবং ওহীর একচ্ছত্র অনুসরণ:
মানুষের রচিত ইতিহাসে সত্য ও মিথ্যার সংমিশ্রণ থাকা খুবই স্বাভাবিক। আল্লাহ তা’আলা কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন:
“তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে সংমিশ্রিত করো না...” (সূরা আল-বাকারা: ৪২)
যে ইতিহাসে মানুষের অনুমান ও অতিরঞ্জন মিশে আছে, তা দিয়ে আল্লাহর পবিত্র বাণীকে যাচাই করা বা ব্যাখ্যা করা ঈমানের দৃষ্টিতে বড় ত্রুটি।
তাছাড়া, আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন একমাত্র ওহীর অনুসরণ করতে: “তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে, তা অনুসরণ করো এবং তাঁকে ছাড়া অন্য অভিভাবকদের অনুসরণ করো না...” (সূরা আল-আ’রাফ: ৩)
বাইরের ইতিহাস বা কিতাব থেকে শিক্ষা নেওয়া মানে আল্লাহর দেওয়া ‘সর্বোত্তম’ উৎসকে ছেড়ে ভেজাল উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়া, যা ‘অন্য অভিভাবক’ গ্রহণের শামিল।
❖ অসার কাহিনী বর্জনের সতর্কতা
মানুষের রচিত কিছু কাহিনী বা ইতিহাস মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় বা ঈমানকে দুর্বল করে। কোরআন এগুলোকে ‘লাহওয়াল হাদিস’ (অসার বাক্য/কাহিনী) বলে অভিহিত করেছে।
আল্লাহ সতর্ক করে বলেন: “মানুষের মধ্যে কেউ কেউ অসার কাহিনী ক্রয় করে, যাতে তারা জ্ঞান ছাড়াই (মানুষকে) আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে...” (সূরা লোকমান: ৬)
অতএব, যে ইতিহাস বা কাহিনী কোরআনের শিক্ষার বিরোধিতা করে (যেমন: ফেরাউন ডুবে মরেনি বা ঈসা আ. ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন বলে প্রচলিত ইতিহাস), তা একজন মুসলিমের জন্য সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা ফরজ।
➢ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত:
প্রচলিত ইতিহাস সত্য-মিথ্যার দোলাচলে দোদুল্যমান, পক্ষান্তরে আল-কোরআন পরম সত্য ও সংরক্ষিত। তাই সূরা ফিল, আসহাবে কাহাফ বা অন্য যেকোনো আয়াতের মর্মার্থ বুঝতে মানুষের লেখা ইতিহাসের ওপর নির্ভর করা কেবল অপ্রয়োজনীয়ই নয়, বরং তা আল্লাহর বাণীর স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও মর্যাদার প্রতি একধরনের অনাস্থা। মুমিনের জন্য একমাত্র শিক্ষণীয় ইতিহাস ও সত্যের উৎস হলো আল-কোরআন। এর বাইরে সত্য খোঁজা বা ইতিহাস দিয়ে কোরআনকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা স্পষ্ট ভ্রষ্টতা। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।