অনুবাদ: তুমি কি দেখনি তোমার রব হাতির অধিপতিদের সাথে কীরূপ ব্যবহার করেছিলেন?
-এইমর্মে জনৈক ভদ্রলোকের প্রশ্ন (যিনি হয়তো মনে করেন—কুরআন যথেষ্ট নয়, তার আরও কিতাব দরকার):
সালামুন আলা মুহাম্মদ (সা.) কি আসহাবুল ফীল দেখেছেন? না দেখে থাকলে আল্লাহ কেন তাঁকে ‘দেখনি?’ বলে প্রশ্ন করেছেন? হস্তিবাহিনীর ঘটনা কোন সনে ঘটেছিল?
অনুগ্রহ করে কেবল কুরআন থেকেই জবাব দিন—হাদীস উল্লেখ করা যাবে না কিংবা হাদীসের রেফারেন্স টানা যাবে না। উত্তর দিন:
ভাই, আপনার প্রশ্ন ও মন্তব্য অনযায়ী- তাই আমরাও আপনাকে কুরআনের বাইরে কোনো রেফারেন্স দিচ্ছি না।
সুরা ফীলের ‘আলাম তারা’ (তুমি কি দেখনি) শব্দের অর্থ আমি কোনো ডিকশনারি বা ইতিহাস থেকে নিচ্ছি না, বরং নিচ্ছি খোদ কুরআন থেকেই। কুরআনেই সুরা ফজর (৮৯:৬), সুরা ইবরাহিম (১৪:১৯) এবং সুরা নূহ (৭১:১৫) প্রমাণ করে দিচ্ছে যে—আল্লাহর ভাষায় ‘দেখা’ মানে সব সময় ‘চোখ দিয়ে দেখা’ নয়, বরং ‘জ্ঞানচক্ষু দিয়ে নিশ্চিতভাবে জানা’। প্রমাণ-
➤ সুবহানাহু তালা বলেন-আমরা কিতাবের মধ্যে কোনো কিছু বাদ রাখি নাই। ছোট কিংবা বড় (দ্র: আয়াত ৬:৩৮, ৫৪:৫৩)
আমরা নাযিলকৃত একটিমাত্র আহসানুল হাদিসের কিতাব (৩৯:২৩) তথা আল-কোরআনের আয়াতসমূহ অনুধাবনে বিস্তারিত উত্তর জানার চেষ্টা করি:
আলোচ্য বিষয়:‘আলাম তারা’ (أَلَمْ تَرَ) বা "তুমি কি দেখনি" মানে সব সময় রক্ত-মাংসের চোখে সশরীরে উপস্থিত থেকে দেখা নয়; বরং এর অর্থ হলো জ্ঞানচক্ষু দিয়ে দেখা, উপলব্ধি করা, চিন্তা করা বা নিশ্চিত সংবাদ জানা।
‘আলাম তারা’ (তুমি কি দেখনি): চাক্ষুষ দেখা নাকি নিশ্চিত উপলব্ধি?
কুরআন মাজিদে বহুবার "আলাম তারা" (أَلَمْ تَرَ) বা এর সমার্থক শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়েছে। আরবি ব্যাকরণ ও কুরআনের ব্যবহাররীতি (Usage) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আল্লাহ তা‘আলা এই শব্দটি তিনটি ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন:
১. যা চোখের সামনে দৃশ্যমান। [চাক্ষুষ দেখা (চোখ দিয়ে দেখা)]
২. যা অতীতে ঘটে গেছে (কিন্তু নিশ্চিত সত্য)।
৩. জ্ঞানচক্ষু বা নিশ্চিত বিশ্বাস দিয়ে দেখা (উপলব্ধি করা বা জানা)। যা সৃষ্টিজগতের এমন রহস্য, যা কেবল চিন্তা ও গবেষণার মাধ্যমে ‘দেখা’ বা উপলব্ধি করা যায়।
উল্লেখিত আয়াতগুলো বিশ্লেষণ করলেই প্রমাণ মিলবে যে, এখানে ‘শারীরিক উপস্থিতি’ শর্ত নয়। নিচে আয়াতসমূহের অনুধাবনে বিষয়টি বুঝে আনার চেষ্টা করি:
১. অতীত ইতিহাসের ক্ষেত্রে ‘আলাম তারা’ (শারীরিক উপস্থিতি অসম্ভব):
আল্লাহর রাসুল (সা.) বা সম্বোধিত ব্যক্তি অতীতে উপস্থিত ছিলেন না, তবুও আল্লাহ বলছেন "তুমি কি দেখনি"। এর অর্থ— তুমি কি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নাওনি বা জানোনি?
➥উদাহরণ 1:সুরা আল-ফাজর, আয়াত ৬ (৮৯:৬):
“আলাম তারা কাইফা ফা‘আলা রাব্বুকা বি-‘আদ।”
(তুমি কি দেখনি তোমার রব ‘আদ জাতির সাথে কী আচরণ করেছিলেন?)
বিশ্লেষণ: ‘আদ জাতি ধ্বংস হয়েছে রাসুল (সা.)-এর জন্মের হাজার বছর আগে। তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এখানে ‘দেখা’ মানে ‘জানা’।
➥উদাহরণ ২:সুরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৯ (২:২৫৯):
“অথবা (তুমি কি দেখনি) সেই ব্যক্তিকে, যে এমন এক জনপদ দিয়ে যাচ্ছিল যা মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল...”
বিশ্লেষণ: এটি বনী ইসরাঈলের যুগের ঘটনা। রাসুল (সা.) বা এই আয়াতের পাঠক কেউই তা স্বচক্ষে দেখেনি।
➥উদাহরণ ৩: সুরা আল-বাকারা, আয়াত ২৪৬:
“আলাম তারা ইলাল মালা-ই মিম বানী ইসরাঈলা...”
অর্থ: “তুমি কি বনী ইসরাঈলের ঐ সর্দারদের দেখোনি (তাদের বিষয়ে জানোনি)...?”
বিশ্লেষণ: সালামুন আলা মুসা-এর পরবর্তী সময়ের বনী ইসরাঈলের ঘটনা রাসুল (সা.) চোখে দেখেননি।
➥উদাহরণ 4: সুরা আল-বাকারা, আয়াত ২৫৮
“আলাম তারা ইলাল্লাজি হাজ্জা ইব্রাহীমা ফী রাব্বিহি...”
অর্থ: “তুমি কি ঐ ব্যক্তিকে দেখোনি (তার সম্পর্কে জানোনি) যে ইব্রাহিমের সাথে তার রব সম্পর্কে বিতর্ক করেছিল?”
বিশ্লেষণ: নমরুদ ও সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর ঘটনা রাসুল (সা.)-এর জন্মের হাজার বছর আগের। তিনি তা চোখে দেখেননি।
২. মহাজাগতিক সৃষ্টি ও অদৃশ্য ব্যবস্থাপনা (যা মানুষের পক্ষে সম্পূর্ণ দেখা অসম্ভব):
এমন কিছু বিষয় আল্লাহ উল্লেখ করেছেন যা মানুষের চোখের আড়ালে ঘটে বা যার সৃষ্টিপ্রক্রিয়া মানুষ দেখেনি।
➥ সুরা ইবরাহিম, আয়াত ১৯ (১৪:১৯):
“তুমি কি দেখনি (আলাম তারা) যে, আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনকে সত্যসহ সৃষ্টি করেছেন?”
বিশ্লেষণ: আসমান ও জমিন সৃষ্টির সময় কোনো মানুষ উপস্থিত ছিল না। এখানে "তুমি কি দেখনি" মানে— তুমি কি সৃষ্টিজগতের দিকে তাকিয়ে স্রষ্টার নিপুণতা উপলব্ধি করো না?
➥ সুরা নূহ, আয়াত ১৫-১৬ (৭১:১৫-১৬): “তোমরা কি দেখনি আল্লাহ কীভাবে সাত আসমান স্তরে স্তরে সৃষ্টি করেছেন?”
বিশ্লেষণ: আমরা নিচের আসমান দেখি, কিন্তু সাত আসমানের স্তরবিন্যাস চাক্ষুষ দেখা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। এটি জ্ঞান ও ওহীর মাধ্যমে ‘দেখা’ বা বিশ্বাস করা।
➥ সুরা লুকমান, আয়াত ২৯ (৩১:২৯) ও সুরা ফাতির, আয়াত ১৩: “তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহ রাতকে দিনের এবং দিনকে রাতের ভেতর প্রবিষ্ট করান...?”
বিশ্লেষণ: রাত ও দিনের এই পরিবর্তন একটি মহাজাগতিক প্রক্রিয়া। মানুষ শুধু ফলাফল দেখে, কিন্তু মহাজাগতিক সেই সিস্টেমটি চোখে দেখে না, বরং অনুধাবন করে।
৩. প্রাকৃতিক নিদর্শন ও চিন্তাশীলতা [গভীর উপলব্ধির জন্য আহ্বান]
এই আয়াতগুলোতে ‘দেখা’ মানে কেবল তাকানো নয়, বরং গবেষণা করা ও শিক্ষা নেওয়া (দ্র: আয়াত ৪৭:২৪, ৪:৮২)।
➥ সুরা হজ্জ, আয়াত ৬৩ (২২:৬৩) এবং সুরা যুমার, আয়াত ২১ (৩৯:২১): “তুমি কি দেখনি, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর তা ভূমিতে ঝর্ণাধারারূপে প্রবাহিত করেন...?”
বিশ্লেষণ: পৃথিবীর সব ঝর্ণা বা সব বৃষ্টিপাত একজন মানুষের পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। এখানে ‘দেখা’ মানে এই সিস্টেম বা প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে অবগত হওয়া।
➥সুরা নূর, আয়াত ৪৩ (২৪:৪৩): “তুমি কি দেখনি, আল্লাহ মেঘমালাকে সঞ্চালিত করেন, অতঃপর তাকে পুঞ্জীভূত করেন...?”
➥সুরা আল-ফুরকান, আয়াত ৪৫ (২৫:৪৫):
তুমি কি তোমার রবের প্রতি তাকাও না (আলাম তারা), কীভাবে তিনি ছায়াকে প্রলম্বিত করেন?”
বিশ্লেষণ: ছায়া লম্বা হওয়া বা মেঘের গঠন—এগুলো চোখের সামনে ঘটলেও আল্লাহ এখানে ‘আলাম তারা’ বলে বিজ্ঞানময় চিন্তার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।
৪. উপমা ও উদাহরণ (মেটাফোরিক্যাল দেখা)
➥ সুরা ইবরাহিম, আয়াত ২৪ (১৪:২৪):
“তুমি কি দেখনি, আল্লাহ কীভাবে উপমা পেশ করেছেন? কালিমা তাইয়্যেবা হলো একটি পবিত্র গাছের মতো...”
বিশ্লেষণ: এখানে ‘কালিমা’ বা ‘গাছ’ কোনো নির্দিষ্ট বাহ্যিক গাছ নয়, এটি একটি উপমা। উপমা কখনো চোখে দেখা যায় না, এটি হৃদয় দিয়ে বুঝতে হয়।
উপলব্ধিতে সিদ্ধান্ত (সুরা ফীলের প্রেক্ষিতে):
উক্ত আয়াতসমূহ (যেমন—১৪:১৯, ২২:১৮, ৭১:১৫, ৮৯:৬ ইত্যাদি) অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, কুরআনের পরিভাষায় "আলাম তারা" (তুমি কি দেখনি) বাক্যটি ব্যবহার করতে বক্তা বা শ্রোতার ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা জরুরি নয়।
অতএব, সুরা ফীলে যখন আল্লাহ রাসুল (সা.)-কে বলছেন, “আলাম তারা কাইফা ফা‘আলা...” (তুমি কি দেখনি হাতিওয়ালাদের সাথে তোমার রব কী করেছেন?), তখন:
১. এর জন্য রাসুল (সা.)-এর ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা আবশ্যক নয়।
২. ‘আদ জাতি (৮৯:৬) বা আসমান সৃষ্টির (১৪:১৯) ঘটনার মতো এটিও একটি নিশ্চিত সত্য ঘটনা, যা রাসুল (সা.) ও আরববাসী জানতেন।
৩. এই ঘটনাটি এতটাই প্রসিদ্ধ ও নিশ্চিত ছিল যে, এটি জানা আর স্বচক্ষে দেখার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এটি ‘ইলমুল ইয়াকীন’ (নিশ্চিত জ্ঞান) এর পর্যায়ে পড়ে।
এক কথায় উত্তর: কুরআনের বহু আয়াতে আল্লাহ এমন সব বিষয়ের ক্ষেত্রে "তুমি কি দেখনি" বলেছেন যা মানুষ চোখে দেখেনি। সুতরাং, সুরা ফীলের ক্ষেত্রেও "দেখেছেন" মানে চাক্ষুষ দর্শন নয়, বরং নিশ্চিত জ্ঞান ও উপলব্ধি।
হস্তী বাহিনীর ঘটনা কোন সনে?
এসব পুরানো ইতিহাস আল্লাহ সুবহানাহু তালা নাযিলকৃত অহীর মাধ্যমে আল্লাহর রাসুল তথা বিশ্ববাসীকে কেন জানালেন?
উত্তর:
কুরআন মাজিদের কোথাও ক্যালেন্ডারের সাল বা তারিখ (যেমন ৫৭০ খ্রিস্টাব্দ বা অমুক সন) উল্লেখ করা হয়নি। কুরআন ঘটনার শিক্ষা (Lesson) এবং আল্লাহর ক্ষমতার প্রকাশকে গুরুত্ব দেয়, তারিখকে নয়। তাই কুরআন থেকে এর নির্দিষ্ট ‘সন’ বের করা করার প্রয়োজনবোধ করলে গবেষনা করতে থাকুন যেমনটি বলা হয়েছে ৪৭:২৪, ৪:৮২ আয়াতে। তবে সুরা কুরাইশের সাথে এর যোগসূত্র থেকে বোঝা যায়, এটি কুরাইশদের নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট একটি ঘটনা।
এসব কুরআনি ইতিহাস থেকে কে বা কারা শিক্ষা নেয়?
➤ অবশ্যই তাদের ঘটনাবলীর মধ্যে রয়েছে বোধসম্পন্নদের (উলিল আলবাব) জন্য শিক্ষা। এটা এমন কোনো বিবরণ হতে পারে না, যা রচনা করা হয়। বরং তার প্রত্যায়ন যা তার সামনে আছে এবং প্রত্যেক বিষয়ের বিশদ বিবরণ এবং দিক—নির্দেশনা ও রহমত এমন জনগোষ্ঠীর জন্য, যারা ঈমান আনে-আয়াত ১২:১১১
(এতে বুঝা গেল-আল-কোরআনের এসব কাহিনী/ইতিহাসের শিক্ষা-অনুধাবন সবার জন্য নয়-কেবল উলিল আলবাব রহমত প্রাপ্ত ঈমানদার জনগোষ্ঠীর জন্য-কিন্তু আপনি...?)
আল্লাহ রব্বুল আলামিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন-
➤তাদের জন্য কি যথেষ্ট হয় না যে আমরা, আমরাই তোমার ওপর কিতাব নাযিল করেছি, যা তাদের সামনে পাঠ করা হয়? নিশ্চয় সেটার মধ্যে এমন জনগোষ্ঠীর জন্য অবশ্যই অনুগ্রহ ও উপদেশ রয়েছে, যারা ঈমান রাখে-সূরা আল আনকাবুত আয়াত ২৯:৫১
➤আল্লাহর সেই আয়াতসমূহ, যা আমরা তোমার উদ্দেশে সত্যতার সাথে পাঠ করি। অতএব, আল্লাহর ও তাঁর আয়াতসমূহের পরে তারা কোন হাদিসে বিশ্বাস করবে?-সূরা ৪৫:৬
✅ সুরা আল আনকাবুত (২৯:৫১)-এর আলোকে আমাদের কাছে আল্লাহ সু.তালার একমাত্র নাযিলকৃত আয়াতসমূহই নিশ্চিতভাবে যথেষ্ট মনে হয়েছে:
আয়াত: “তাদের জন্য কি যথেষ্ট হয় না যে আমরা, আমরাই তোমার ওপর কিতাব নাযিল করেছি...”
আল্লাহ সুবহানাহু তালা এখানে স্পষ্ট করে দিচ্ছেন যে, হেদায়েত বা পথপ্রদর্শনের জন্য এই কিতাবই (কুরআন) যথেষ্ট। আমরা যখন সুরা ফীল পড়ি, তখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—ঘটনাটি কত সালে ঘটেছে? হাতির নাম কী ছিল? আবরাহার সৈন্য সংখ্যা কত ছিল? এসব খুঁটিনাটি তথ্য কুরআনে নেই।
ইতিহাসের বই বা হাদিসে হয়তো বাড়তি তথ্য আছে, কিন্তু আল্লাহ বলছেন— ‘এই কিতাবই যথেষ্ট’। তার মানে হলো, সুরা ফীলে আল্লাহ যতটুকু তথ্য দিয়েছেন (হাতিওয়ালাদের চক্রান্ত, পাখির আক্রমণ, কঙ্কর নিক্ষেপ ও তাদের ধ্বংস)—আমাদের ঈমান ও শিক্ষার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। এর বাইরে সাল-তারিখ জানার ওপর আমাদের হেদায়েত নির্ভর করে না।
২. সুরা আল জাসিয়া (৪৫:৬):
“অতএব, আল্লাহর ও তাঁর আয়াতসমূহের পরে তারা কোন হাদিসে (কথায়/বাণীতে) বিশ্বাস করবে?”
এখানে আল্লাহ নিজেই কুরআনের আয়াতগুলোকে চূড়ান্ত সত্য এবং অন্য সব ‘হাদিস’ (আভিধানিক অর্থে কথা বা বানী) বা বর্ণনার ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন।
কেউ যদি দাবি করে যে, “আলাম তারা” মানে সশরীরে দেখা এবং যেহেতু রাসুল (সা.) সশরীরে দেখেননি তাই এটি মিথ্যা বা রূপক (মা’যাল্লাহ!)—তাহলে সে মূলত আল্লাহর আয়াতের ব্যবহাররীতিকে (Methodology) অস্বীকার করছে।
আমরা যখন কুরআনের অন্য আয়াত (যেমন ১৪:১৯, ৭১:১৫, ৮৯:৬) দিয়ে প্রমাণ করলাম যে, আল্লাহ ‘অদৃশ্য’ বা ‘অতীত’ ঘটনার ক্ষেত্রেও ‘আলাম তারা’ শব্দ ব্যবহার করেন—তখন এটিই হলো ‘আল্লাহর আয়াত দিয়ে আল্লাহর কথার ব্যাখ্যা’।
এখন যদি কেউ কুরআনের এই নিজস্ব ব্যাখ্যা বা লুগাত (ভাষা) বাদ দিয়ে নিজের মনগড়া যুক্তি বা অন্য কোনো উৎসের কথা (হাদিস বা ইতিহাস) দিয়ে এর বিরোধিতা করে, তবে এই আয়াত (৪৫:৬) অনুযায়ী আল্লাহর সেই চ্যালেন্স গ্রহন করুক। কারণ, আল্লাহর আয়াতের নিজস্ব ব্যাখ্যার পরে আর কোনো কথার প্রয়োজনীয়তা অন্তত আমাদের কাছে নেই।
সুতরাং, কুরআনের আয়াত দিয়েই প্রমাণিত হলো—রাসুল (সা.) ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থেকেও ঘটনাটি সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করেছেন, যা দেখার মতোই সত্য।"
আল কোরআন প্রয়োজনীয় বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও পূর্ণাঙ্গ, বিস্তারিত, বিশদভাবে/বিভিন্নভাবে বর্ণনা করা হয়েছে- প্রমাণ আয়াতসমূহ: ১০:৩৭, ১৬:৮৯, ৪১:২-৩, ১২:১১১, ৬:১১৪-৬১১৫ (৬:৩৮), ১৭:৪১, ২০:১১৩, ১২:১১১ (২৯:৫১, ৫:৩)
অতএব আমরাও ইয়াকীন (নিশ্চিত জ্ঞান) না আসা পর্যন্ত আল-কুরআনই স্বয়ং সম্পুর্ন- বুঝবো কি করে? (দ্র: আয়াত ৭৪:৪৭, ১০২:৫-৭)
আল-কোরআনের বিবৃত ইতিহাস/কাহিনী বাদ দিয়ে মানুষের রচিত ইতিহাসে ঈমান আনা যাবে কি?
একজন ‘এক কিতাবে’ (আল-কোরআন) বিশ্বাসী হিসেবে প্রচলিত ইতিহাস দিয়ে কোরআনকে বিচার করা বা কোরআনের ব্যাখ্যা খোঁজা যে কোরআনের স্বয়ংসম্পূর্ণতার দাবির সাথে সাংঘর্ষিক, আয়াতগুলো অনুধাবনের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে:
আয়াত অনুধাবন: ইতিহাসের সত্যতা ও আল-কোরআনের স্বয়ংসম্পূর্ণতা
১. সত্য ও মিথ্যার মিশ্রণ বর্জন (প্রসঙ্গ: আয়াত ২:৪২) মানুষের রচিত ইতিহাস সর্বদাই মানুষের সীমাবদ্ধ জ্ঞান, পক্ষপাত এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত। ইতিহাসবিদরা যা লিপিবদ্ধ করেন, তাতে সত্য ও মিথ্যার সংমিশ্রণ থাকা খুবই স্বাভাবিক। আল্লাহ তা’আলা সূরা বাকারার ৪২ নং আয়াতে নির্দেশ দিয়েছেন: “তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে সংমিশ্রিত করো না...”।
সুতরাং, যে ইতিহাসে মানুষের অনুমান ও অতিরঞ্জন মিশে আছে, তা দিয়ে আল্লাহর পবিত্র এবং পরম সত্য বাণীকে (কোরআন) যাচাই করা বা ব্যাখ্যা করা ঈমানের দৃষ্টিতে একটি বড় ত্রুটি। আল্লাহর বাণী ধ্রুব সত্য, আর মানুষের ইতিহাস পরিবর্তনশীল ও ত্রুটিপূর্ণ।
২. একমাত্র ওহীর অনুসরণ (প্রসঙ্গ: আয়াত ৭:৩) সূরা আল-আ’রাফের ৩ নং আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন: “তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে, তা অনুসরণ করো এবং তাঁকে ছাড়া অন্য অভিভাবকদের অনুসরণ করো না...”।
এখানে ‘যা নাযিল করা হয়েছে’ তা হলো একমাত্র আল-কোরআন। সূরা ফিলের মতো কোনো সূরাকে বোঝার জন্য যদি আমরা তৎকালীন আরবদের মুখে প্রচলিত গল্প বা পরবর্তী সময়ে লেখা ঐতিহাসিক দলিলাদির (যা ওহী নয়) ওপর নির্ভর করি, তবে তা আয়াত ৭:৩-এর সরাসরি লঙ্ঘন। এটি এক প্রকারের ‘অন্য অভিভাবক’ বা উৎসের অনুসরণ, যা কোরআনের একচ্ছত্র আধিপত্যকে অস্বীকার করার শামিল।
৩. ইতিহাসের একমাত্র বিশুদ্ধ উৎস (প্রসঙ্গ: আয়াত ১২:৩ ও ১২:১১১) আল্লাহ তা’আলা সূরা ইউসুফের ৩ নং আয়াতে বলেছেন: “আমি তোমার নিকট সর্বোত্তম কাহিনী /ইতিহাস বর্ণনা করছি এই কোরআন ওহী করার মাধ্যমে...”। এবং ১১১ নং আয়াতে বলা হয়েছে: “...এই কোরআন কোনো মনগড়া কথা নয়, বরং তা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যতা প্রমাণকারী, প্রতিটি বিষয়ের বিস্তারিত বিবরণ...”।
যেখানে আল্লাহ নিজে বলছেন যে তিনি ‘সর্বোত্তম কাহিনী’ বা আহসানুল কাসাস বর্ণনা করেছেন এবং কোরআন হলো ‘সবকিছুর বিস্তারিত বিবরণ’ (তাজসিলা কুল্লি শাই), সেখানে সূরা ফিল বা অন্য কোনো ঘটনার জন্য বাইরের ইতিহাসের দ্বারস্থ হওয়া মানেই হলো—পরোক্ষভাবে আল্লাহর বর্ণনাকে ‘অসম্পূর্ণ’ মনে করা (মা’আযাল্লাহ!)। সূরা ফিলের শিক্ষা (আবরাহা বা হস্তী বাহিনীর নামধাম বা সনের চেয়ে) উদ্ধত শক্তির পতনের যে মূলনীতি আল্লাহ বয়ান করেছেন, সেটাই মুখ্য। বাইরের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া মানে আল্লাহর দেওয়া ‘সর্বোত্তম’ উৎসকে ছেড়ে ভেজাল উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়া।
সিদ্ধান্ত: প্রচলিত ইতিহাস সত্য-মিথ্যার দোলাচলে দোদুল্যমান। পক্ষান্তরে আল-কোরআন পরম সত্য ও সংরক্ষিত। তাই সূরা ফিল বা অন্য যেকোনো আয়াতের মর্মার্থ বুঝতে মানুষের লেখা ইতিহাসের ওপর নির্ভর করা কেবল অপ্রয়োজনীয়ই নয়, বরং তা আল্লাহর বাণীর স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও মর্যাদার প্রতি একধরনের অনাস্থা। মুমিনের জন্য একমাত্র শিক্ষণীয় ইতিহাস ও সত্যের উৎস হলো আল-কোরআন; এর বাইরে সত্য খোঁজা বা কোরআনকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা স্পষ্ট ভ্রষ্টতা।
আয়াতের মধ্যে বক্রতা-জটিলতা খুঁজে বেড়ায় কে বা কারা? আর এর জ্ঞানের ক্ষেত্রে যারা সুগভীর তারা কি বলে দেখুন-
তিনিই, যিনি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন, যার মাঝে রয়েছে কিছু দ্ব্যর্থহীন আয়াত; সেগুলো কিতাবের মূল, আর কিছু দ্ব্যর্থবোধক। আর তারা, যাদের অন্তরের মধ্যে রয়েছে বক্রতা, ফিতনার সন্ধানে ও অপব্যাখ্যার সন্ধানে তারা সেখান থেকে যেগুলো দ্ব্যর্থবোধক হয়ে থাকে সেগুলো খুঁজে বেড়ায়। এবং সেগুলোর ব্যাখ্যা আল্লাহ ছাড়া জানেন না। আর জ্ঞানের ক্ষেত্রে যারা সুগভীর তারা বলে, আমরা ঈমান এনেছি সেগুলোর প্রতি। সবই আমাদের রবের পক্ষ থেকে। আর বোধসম্পন্নরা ছাড়া উপদেশ গ্রহণ করে না।
রব্বানা লাতুযিগ ক্বুলুবানা.....
হে আমাদের রব! আমাদেরকে হিদায়েত দানের পরে আমাদের অন্তরসমূহকে বক্র হতে দিবেন না, আর আমাদেরকে দান করুন আপনার পক্ষ থেকে দয়া, নিশ্চয় আপনি, আপনিই মহান দাতা-আয়াত ৩:৭-৮