■ “১০০% অথেনটিক কুরআনিক দলিলের আলোকে আমরা নিম্নোক্ত মৌলিক বিষয়সমূহ পর্যালোচনা করবো—”
■ আমাদের জন্য বর্তমান নাযিলকৃত ও অনুসরনযোগ্য কিতাবের সংখ্যা কয়টি?
■ কোনো অনাযিলকৃত কিতাব, মতবাদ বা মানব-প্রণীত আইন সম্পর্কে কুরআন কী অবস্থান গ্রহণ করেছে—এবং এগুলোকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে বাতিল বা অকার্যকর ঘোষণা করার যে কোরআনিক অর্ডিন্যান্স রয়েছে, তার প্রকৃত রূপ কী?
■ দ্বীন অনুসরণে—আল্লাহর ক্ষমা, রহমত ও জান্নাতলাভের জন্য একজন মুমিনকে স্পষ্টভাবে কতটি কিতাব অনুসরণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?
■ আল-কোরআন ব্যতীত অন্য কোনো কিতাবে কি নাযিলকৃত অহী, বিধান বা অনুসরণযোগ্য নির্দেশনা রয়েছে—এবং সেগুলো মুমিনদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে কি না?
■ আল্লাহর রাসুল (সা.) স্বীয় জীবনের আদর্শিক ও আইনগত ব্যবস্থায় কোন গ্রন্থ অনুসরণ করতেন—এবং নবী-রাসূল হিসেবে তাঁকে কোন ঐশী কিতাব অনুসরণ করতে আদিষ্ট করা হয়েছিল?
■ আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ঈমানদর-মুমিনদেরকে কোন কিতাব অনুসরণ করতে স্পষ্ট নির্দেশ, উপদেশ ও পরামর্শ প্রদান করেছেন?
■ আল-কোরআনের বাইরে দ্বীনের নামে কোনো অতিরিক্ত বিধান, শরীয়াহ, মতবাদ বা অনুসরণযোগ্য কি না—এবং থাকলে তা কোরআনিক মানদণ্ডে কতখানি বৈধ বা বাধ্যতামূলক?
১০০% অথেনটিক কুরআনিক দলিলের আলোকে এটি অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, মহান আল্লাহ দ্বীনের উৎস হিসেবে মানবজাতির জন্য কেবল ‘একটি’ কিতাবই নাযিল করেছেন এবং সেটিই আল-কুরআন। নিচে এর বিস্তারিত পর্যালোচনা ও দালিলিক প্রমাণ তুলে ধরা হলো:
১. ‘কিতাবুন’ (একটি কিতাব)—সংখ্যায় এক ও অদ্বিতীয় —একবচনে নাজিলকৃত:
‘কুরআন’ (একটি কুরআন) শব্দটি একবচনে এবং অনির্দিষ্ট (indefinite but singular noun indicating specificity of type) হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা এর অদ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যের দিকে ইঙ্গিত করে।
সুরা আল-আরাফ, আয়াত ২:
(এটি) একটি কিতাব (কিতাবুন), যা তোমার প্রতি নাজিল করা হয়েছে। সুতরাং তোমার মনে যেন এর সম্পর্কে কোনো সংকোচ না থাকে। যাতে তুমি এর মাধ্যমে সতর্ক করতে পার এবং এটি মুমিনদের জন্য উপদেশ।"
অনুধাবন: এখানে ‘কিতাবুন’ শব্দটি অনির্দিষ্ট (indefinite) কিন্তু একবচনে ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ এটি এমন এক বিশেষ কিতাব যা আল্লাহ পাঠিয়েছেন। এর বাইরে অন্য কোনো কিতাব নাজিল করার ঘোষণা এখানে নেই।
সুরা ইব্রাহিম, আয়াত ১:
"আলিফ-লাম-রা; (এটি) একটি কিতাব (কিতাবুন), যা আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে তুমি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পার..."
‘আল-কিতাব’ (সেই নির্দিষ্ট কিতাব)—সুনির্দিষ্টকরণ:
আল্লাহ তায়ালা যখনই ওহির পূর্ণাঙ্গতার কথা বলেছেন, তখন ‘আল’ (The) যুক্ত করে ‘আল-কিতাব’ বলেছেন, যা নির্দিষ্ট করে যে, এই কুরআনই সেই চূড়ান্ত কিতাব।
সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২:
"এটি সেই কিতাব (লিকাল কিতাব), যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হেদায়েত।"
অনুধাবন: আল্লাহ আঙুল দিয়ে নির্দেশ করার মতো করে বলছেন ‘জালিকা’ (ঐটি/এটি)। অর্থাৎ অনুসরণীয় গ্রন্থ সুনির্দিষ্ট, এটি কোনো অস্পষ্ট বিষয় নয়।
সুরা আল-কাহফ, আয়াত ১:
"সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি কিতাব নাজিল করেছেন (আনজালা... আল-কিতাবা) এবং তাতে কোনো বক্রতা রাখেননি।"
অনুধাবন: এখানেও ‘আল-কিতাব’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুল (সা.)-এর প্রতি নাজিলকৃত ওহির সমষ্টি একটি অখণ্ড কিতাব।
‘একটি’ বরকতময় কিতাব—যা উপদেশ গ্রহণের জন্য নাজিলকৃত:
আল্লাহ তায়ালা সুরা সা-দ এ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ‘কিতাবুন’ (একটি কিতাব) শব্দটি ব্যবহার করেছেন এবং এর উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন।
সুরা সা-দ, আয়াত ২৯:
"(এটি) একটি বরকতময় কিতাব (কিতাবুন আনজালনাহু), যা আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীর চিন্তা-গবেষণা (তাদাব্বুর) করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে।"
একবচন ব্যবহার: এখানে ‘কিতাবুন’ (একটি কিতাব) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে নাজিলকৃত ওহি একটি অখণ্ড সত্তা।
উদ্দেশ্য: এই একটি কিতাবের আয়াতগুলো নিয়েই গবেষণা (তাদাব্বুর) করতে বলা হয়েছে। হেদায়েতের জন্য অন্য কোনো গ্রন্থের গবেষণার কথা বলা হয়নি।
‘একটি কিতাব’ যা সত্যসহ নাজিল হয়েছে:
আল্লাহ তায়ালা সত্যসহকারে ‘একবচনে’ কিতাব নাজিল করেছেন, যেন মানুষ একে অপরের সাথে বিরোধ না করে।
সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ১৭৬:
"এটা এ জন্য যে, আল্লাহ সত্যসহ কিতাবটি (আল-কিতাব) নাজিল করেছেন। আর যারা কিতাব সম্পর্কে মতভেদ করেছে, নিশ্চয় তারা সুদূরপ্রসারী বিরোধিতায় লিপ্ত।"
অনুধাবন: এখানে ‘নাজ্জালা... আল-কিতাবা’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ বিরোধ মেটানোর মানদণ্ড হলো এই একটি কিতাব। যারা এই এক কিতাব ছেড়ে ভিন্ন মতের আশ্রয় নেয়, তারাই বিরোধে লিপ্ত হয়।
আরবি ভাষায় নাজিলকৃত ‘একটি কিতাব’:
কুরআন যে আরবি ভাষায় নাজিলকৃত ‘একটি’ সুনির্দিষ্ট কিতাব, তা আল্লাহ বারবার উল্লেখ করেছেন।
সুরা ইউসুফ, আয়াত ২:
"নিশ্চয় আমি একে নাজিল করেছি আরবি কুরআনরূপে (কুরআনান আরাবিয়্যান), যাতে তোমরা বুঝতে পার।"
ব্যাখ্যা: এখানে ‘কুরআনান’ (একটি কুরআন) বলা হয়েছে। ওহির মাধ্যম হিসেবে একাধিক আরবি গ্রন্থের কথা বলা হয়নি।
সুরা ত্বা-হা, আয়াত ১১৩:
"আর এভাবেই আমি একে আরবি কুরআনরূপে (কুরআনান আরাবিয়্যান) নাজিল করেছি এবং এতে বিশদভাবে সতর্কবাণী বর্ণনা করেছি..."
আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘একটি কিতাব’ আসার পর...
পূর্ববর্তী আহলে কিতাবদের কাছে যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘মুসাদ্দিক’ বা সত্যয়নকারী হিসেবে ‘একটি কিতাব’ এলো, তখন তারা তা প্রত্যাখ্যান করল।
সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ৮৯:
"আর যখন তাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি কিতাব (কিতাবুম-মিন ইন্দিল্লাহ) আসল, যা তাদের সাথে যা আছে তার সত্যয়নকারী..."
অনুধাবন: এখানে ‘কিতাবুন’ শব্দ দ্বারা আল-কুরআনকে বোঝানো হয়েছে, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা একক দলিল।
‘একটি’ কিতাব—যা বক্রতা মুক্ত:
আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি যে কিতাব পাঠিয়েছেন, তা একটি এবং তাতে কোনো বক্রতা নেই।
সুরা আয-যুমার, আয়াত ২৮:
"(এটি) আরবি কুরআন (কুরআনান আরাবিয়্যান), যাতে কোনো বক্রতা নেই, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে।"
এই ‘একটি’ কিতাবই হক (সত্য): রাসুল (সা.)-এর প্রতি ওহিকৃত কিতাবটিই একমাত্র সত্য।
সুরা ফাতির, আয়াত ৩১:
"আর কিতাবের মধ্য থেকে আমি তোমার প্রতি যা ওহি করেছি, তাই সত্য (আল-হক)..."
অনুধাবন: ওহির উৎস হিসেবে এখানে ‘আল-কিতাব’ (নির্দিষ্ট কিতাব) উল্লেখ করা হয়েছে।
সিদ্ধান্ত: অনুসরণযোগ্য কিতাব মাত্র একটি, এবং তা হলো আল-কুরআন।
২. একমাত্র ‘আল-কুরআন’—দ্বীনের একমাত্র উৎস:
আল্লাহ তায়ালা ‘নাযিলকৃত’ বস্তু বলতে সুনির্দিষ্টভাবে আল-কুরআনকেই বুঝিয়েছেন এবং একেই ‘ওহি’ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।
কুরআনই ওহি: “বল... আমার প্রতি এই কুরআন ওহি করা হয়েছে, যেন আমি এর মাধ্যমে তোমাদেরকে... সতর্ক করতে পারি।”
(সূরা আল-আনআম: ৬:১৯)
সুস্পষ্ট ঘোষণা: “নিশ্চয় তুমি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ সত্তার পক্ষ থেকে আল-কুরআন প্রাপ্ত হচ্ছ।”
(সূরা আন-নামল: ২৭:৬)
একমাত্র সত্য (আল-হক): “আর যারা ঈমান আনে... এবং মুহাম্মদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তার ওপর ঈমান আনে—আর তা-ই তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য (আল-হক)...” (সূরা মুহাম্মদ: ৪৭:২)
‘কিতাব’ ও ‘কুরআন’ একই সত্তা এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যাযুক্ত:
আল্লাহ তায়ালা এই কিতাবকে বিস্তারিত (মুফাস্সাল) এবং আরবি কুরআন হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।
সুরা ফুসসিলাত, আয়াত ৩:
"(এটি) একটি কিতাব (কিতাবুন), যার আয়াতসমূহ বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, আরবি কুরআনরূপে, জ্ঞানবান কওমের জন্য।"
অনুধাবন: এখানে ‘কিতাবুন’ (একটি কিতাব) এবং ‘কুরআনান’ (একটি কুরআন) শব্দদ্বয় সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আয়াতটি প্রমাণ করে যে, নাজিলকৃত কিতাবটিই হলো এই কুরআন, যা বিস্তারিত ও স্পষ্ট।
সুরা হুদ, আয়াত ১:
"আলিফ-লাম-রা; (এটি) একটি কিতাব (কিতাবুন), যার আয়াতসমূহ সুদৃঢ় করা হয়েছে, অতঃপর প্রজ্ঞাময়, সবজান্তা সত্তার পক্ষ থেকে সবিস্তারে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।"
কুরআন বা এর বিধানকে ‘ফরজ’ বা ‘অপরিহার্য’ করা হয়েছে:
সূরা আল-কাসাস, আয়াত ৮৫:
“যিনি আপনার ওপর কুরআনকে ফরজ (বিধান হিসেবে অপরিহার্য) করেছেন, তিনি নিশ্চয়ই আপনাকে আপনার গন্তব্যস্থলে ফিরিয়ে নেবেন।”
(এখানে ‘ফারাযা’ শব্দটি ব্যবহার করে কুরআন প্রচার ও এর বিধান মানাকে ফরজ করা হয়েছে)
সূরা আন-নূর, আয়াত ১:
“এটি একটি সূরা যা আমি নাজিল করেছি এবং একে ফরজ (অপরিহার্য বিধান) সাব্যস্ত করেছি; আর এতে আমি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ নাজিল করেছি, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।”
(এখানে ‘ফারাযনাহা’ শব্দটি দ্বারা এই সূরার যাবতীয় হুকুম-আহকামকে ফরজ করা হয়েছে)ওহিকৃত বিষয় হলো ‘সত্য কিতাব’:
“যিনি আপনার ওপর কুরআনকে ফরজ (বিধান হিসেবে অপরিহার্য) করেছেন, তিনি নিশ্চয়ই আপনাকে আপনার গন্তব্যস্থলে ফিরিয়ে নেবেন।”
(এখানে ‘ফারাযা’ শব্দটি ব্যবহার করে কুরআন প্রচার ও এর বিধান মানাকে ফরজ করা হয়েছে)
“এটি একটি সূরা যা আমি নাজিল করেছি এবং একে ফরজ (অপরিহার্য বিধান) সাব্যস্ত করেছি; আর এতে আমি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ নাজিল করেছি, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।”
(এখানে ‘ফারাযনাহা’ শব্দটি দ্বারা এই সূরার যাবতীয় হুকুম-আহকামকে ফরজ করা হয়েছে)
রাসুল (সা.)-এর প্রতি ওহির মাধ্যমে যা পাঠানো হয়েছে, আল্লাহ তাকে ‘আল-কিতাব’ এবং ‘আল-হক’ (সত্য) বলেছেন।
সুরা ফাতির, আয়াত ৩১:
"আর কিতাবের মধ্য থেকে আমি তোমার প্রতি যা ওহি করেছি, তাই সত্য (আল-হক); যা তার পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী..."
অনুধাবন: এখানে ‘মিনাল কিতাবি’ (কিতাব হতে) এবং ‘আওহাইনা’ (ওহি করেছি)—শব্দগুলোর ব্যবহার প্রমাণ করে যে, ওহির বিষয়বস্তু হলো এই কিতাব।
সুরা আল-আনকাবুত, আয়াত ৪৭:
"আর এভাবেই আমি তোমার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি (আনজালনা ইলাইকাল কিতাবা)..."
ব্যাখ্যা: আল্লাহ সরাসরি বলছেন, তিনি ‘আল-কিতাব’ (নির্দিষ্ট কিতাব) নাজিল করেছেন। বহুবচন বা একাধিক কিতাবের কথা বলা হয়নি।
কুরআনকেই ‘ওহি’ হিসেবে নাজিল করা হয়েছে:/ রাসুল (সা.)-এর নিকট সুনির্দিষ্টভাবে আল-কুরআনই পাঠানো হয়েছে:
সুরা আল-আনআম, আয়াত ১৯:
অনুধাবন: এখানে স্পষ্টভাবে ‘ওহি’ শব্দটিকে ‘কুরআন’-এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে। রাসুল (সা.)-এর রিসালতের মূল দলিল হলো এই ওহিকৃত কুরআন।
"আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করছি, এই কুরআন তোমার নিকট ওহি করার মাধ্যমে..."
অনুধাবন:: এখানে ‘বিমা আওহায়না’ (যা ওহি করেছি) বলতে সরাসরি ‘কুরআন’-কে নির্দেশ করা হয়েছে।
সুরা আশ-শূরা, আয়াত ৭:
"আর এভাবেই আমি তোমার প্রতি আরবি কুরআন ওহি করেছি, যাতে তুমি মক্কাবাসী ও তার আশেপাশের লোকদের সতর্ক করতে পার..."
যা কিছু নাজিল হয়েছে, তা সবই এই কুরআনে সন্নিবেশিত এর বাইরে কোন নাযিলকৃত অহী নাই এবং তা প্রচারের নির্দেশ:
আল্লাহ যা কিছু নাজিল করেছেন, তার পুরোটাই এই কুরআনের অন্তর্ভুক্ত এবং রাসুল (সা.)-কে সেই পুরো ‘নাজিলকৃত’ বিষয়টিই হুবহু মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বলা হয়েছে।
সুরা আল-মায়েদা, আয়াত ৬৭:
"হে রাসুল, তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার নিকট যা নাজিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দাও। আর যদি তুমি তা না কর তবে তুমি তাঁর রিসালাত প্রচার করলে না..."
অনুধাবন: এই আয়াতে ‘মা উনজিলা’ (যা নাজিল করা হয়েছে) প্রচার করতে বলা হয়েছে। যেহেতু সুরা আন-নামলের ৬ নং আয়াতে আমরা দেখেছি রাসুল (সা.) ‘কুরআন’ প্রাপ্ত হচ্ছেন এবং সুরা আনআমের ১৯ নং আয়াতে তিনি বলছেন ‘আমার প্রতি এই কুরআন ওহি করা হয়েছে’, সুতরাং সুরা মায়েদার এই আয়াত প্রমাণ করে—রবের পক্ষ থেকে আসা সম্পূর্ণ বার্তাটিই এই কুরআনে বিদ্যমান এবং রাসুল (সা.) এই কুরআনের মাধ্যমেই তাঁর রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছেন। এর বাইরে গোপন কোনো ওহি বা বিধান তিনি প্রচারের জন্য পাননি।
অনাযিলকৃত কিতাব, মতবাদ বা মানব-প্রণীত আইন সম্পর্কে কুরআন কী অবস্থান গ্রহণ করেছে?
কোন কিতাবখানা আমাদেরকে অনুসরণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?
সুরা আলে-ইমরান, আয়াত ৩:১০৩: "আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে (হাবলিল্লাহ/কুরআন) দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না..."
সুরা আয-যুখরুফ, আয়াত ৪৩:৪৩: "সুতরাং তোমার প্রতি যা ওহি করা হয়েছে, তা শক্তভাবে ধারণ কর ; নিশ্চয় তুমি সরল পথের ওপর রয়েছ।"
সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২:১২১: "যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি (আতািনাহুমুল কিতাবা) , তারা তা যথাযথভাবে তিলাওয়াত করে (অনুসরণ করে); তারাই তার প্রতি ঈমান রাখে..."
সিদ্ধান্ত: নির্দেশটি হলো—আল-কুরআনকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করা এবং এর বিধান মেনে চলা।
কিতাব তিলাওয়াত করা এবং অনুসরণ করা:
সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ১২১:
"যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি (আতািনাহুমুল কিতাবা), তারা তা যথাযথভাবে তিলাওয়াত করে (অনুসরণ করে); তারাই তার প্রতি ঈমান রাখে..."
অনুধাবন: এখানে ‘হাক্কা তিলাওয়াতিহি’ (যথাযথ তিলাওয়াত/অনুসরণ) বলতে কিতাবের বিধান মানাকে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ এখানে একটি কিতাবকেই নির্দেশ করেছেন।
রাসুল (সা.)-এর সাথে নাজিলকৃত ‘নূর’-এর অনুসরণ:
সুরা আল-আরাফ, আয়াত ১৫৭:
"...সুতরাং যারা তাঁর (নবীর) প্রতি ঈমান আনে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে এবং তাঁর সাথে যে নূর (আলো) নাজিল করা হয়েছে, তার অনুসরণ করে, তারাই সফলকাম।"
অনুধাবন: এখানে নবীর অনুসরণের শর্ত হিসেবে ‘তাঁর সাথে নাজিলকৃত নূর’-এর অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। সুরা মায়েদার ১৫ নং আয়াতে কুরআনকেই ‘নূর’ বলা হয়েছে। সুতরাং, নবীর অনুসরণের অর্থই হলো কুরআনের অনুসরণ।
‘যা নাজিল করা হয়েছে’—তার ওপর ঈমান আনা:
সুরা মুহাম্মদ, আয়াত ২-3:
অনুধাবন: এখানে সালামুন আলা মুহাম্মাদ (সা.)-এর ওপর নাজিলকৃত বস্তুকে ‘আল-হক’ (একমাত্র সত্য) বলা হয়েছে। এই সত্যের বাইরে যা থাকে, তা ভ্রান্তি।
এটি একটি ‘আরবি বিধান’ (হুকমান আরাবিয়্যান):
সুরা আর-রা’দ, আয়াত ৩৭:
"আর এভাবেই আমি একে (কুরআনকে) আরবি বিধানরূপে (হুকমান আরাবিয়্যান) নাজিল করেছি। আর তোমার নিকট জ্ঞান আসার পর যদি তুমি তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ কর, তবে আল্লাহর মোকাবিলায় তোমার কোনো অভিভাবক ও রক্ষাকারী থাকবে না।"
অনুধাবন: এখানে কুরআনকে ‘হুকুম’ বা বিধান বলা হয়েছে। আল্লাহর বিধানের বিপরীতে থাকে মানুষের প্রবৃত্তি বা ‘খেয়াল-খুশি’ (Ahwa)। সুতরাং বিধান হিসেবে এই একটি কিতাবই অনুসরণীয়।
এই ‘কুরআন’ই একমাত্র পথপ্রদর্শক:
সুরা বনি ইসরাঈল (আল-ইসরা), আয়াত ৯:
"নিশ্চয়ই এই কুরআন (হাজাল কুরআনা) এমন পথ প্রদর্শন করে, যা সর্বাধিক সরল ও সঠিক..."
সুরা আল-আনআম, আয়াত ১৯২ (বা ১৫৫):
"আর এটি (হাজা) এমন কিতাব যা আমি নাজিল করেছি, যা বরকতময়। সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ কর..."
আল্লাহর রজ্জু (কুরআন) আঁকড়ে ধরা:
"আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে (হাবলিল্লাহ) দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না..."
অনুধাবন: আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক বা সংযোগের মাধ্যম হলো এই কিতাব। সুরা যুখরুফের ৪৩ আয়াতে যেমন বলা হয়েছে "যা ওহি করা হয়েছে তা শক্তভাবে ধর", এখানেও সেই একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যারা এই ‘কিতাব’ আঁকড়ে ধরে, তাদের প্রশংসা:
আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ‘নূর’ ও ‘স্পষ্ট কিতাব’
আল্লাহর রাসুল-এর চরিত্র ছিল কুরআনেরই বাস্তবায়ন:
আল-কোরআন ব্যতীত অন্য কোনো কিতাবে কি নাযিলকৃত অহী বা বিধান রয়েছে—এবং তা কি বাধ্যতামূলক?
আল্লাহর রাসুল (সা.) স্বীয় জীবনে কোন গ্রন্থ অনুসরণ করতেন?
রাসুল (সা.)-এর আদর্শ: কেবলই কুরআনের অনুসরণ:
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, বিচারিক ফয়সালা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ১০০% কুরআনের অনুসরণ করেছেন। তিনি কুরআনের বাইরে এক চুলও নড়তেন না।
রাসুলের ঘোষণা: “বল... আমি কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহি করা হয়।”
(সূরা আল-আহকাফ: ৪৬:৯; সূরা আল-আনআম: ৬:৫০)
বিচার কার্যে একমাত্র মানদণ্ড: “অতএব আল্লাহ যা নাযিল করেছেন (কুরআন), সে অনুযায়ী তাদের বিচার-ফয়সালা করো এবং... তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না।”
(সূরা আল-মায়েদা: ৫:৪৮)
ওহি ছাড়া রাসুলের নিজস্ব এখতিয়ার নেই: “বল, ‘নিজে থেকে এটি পরিবর্তন করার অধিকার আমার নেই। আমি তো কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহি করা হয়’।” (সূরা ইউনুস: ১০:১৫)
রাসুল (সা.)-এর নিজের পক্ষ থেকে কিছু বানানোর ক্ষমতা ছিল না:
সুরা ইউনুস, আয়াত ১৫:
"আর যখন তাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ সুস্পষ্টরূপে পাঠ করা হয়, তখন যারা আমার সাক্ষাতের আশা করে না, তারা বলে, ‘এটি ছাড়া অন্য কোনো কুরআন নিয়ে এসো অথবা এটিকে পরিবর্তন কর’। বল, ‘নিজে থেকে এটি পরিবর্তন করার অধিকার আমার নেই। আমি তো কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহি করা হয়’..."
সুরা আল-হাক্কাহ, আয়াত ৪৪-৪৬:
"সে (রাসুল) যদি আমার নামে কোনো কথা রচনা করত, তবে আমি অবশ্যই তার ডান হাত ধরে ফেলতাম। তারপর আমি তার জীবন-ধমনী কেটে দিতাম।"
অনুধাবন: এটি প্রমাণ করে যে, দ্বীনের ব্যাপারে রাসুল (সা.)-এর নিজস্ব কোনো মনগড়া কথা বলার সুযোগ ছিল না। যা বলেছেন, তা ওহি (কুরআন) থেকেই বলেছেন।
আল-কোরআনের বাইরে দ্বীনের নামে কোনো অতিরিক্ত বিধান বা শরীয়াহ বৈধ কি না?
অতিরিক্ত বিধান তৈরি করা শিরক:
আল্লাহর কিতাব ছাড়া অন্য কিছু অনুসরণের নিষেধাজ্ঞা/ নাজিলকৃত বিধানের অনুসরণ এবং অন্য ‘আউলিয়া’ বর্জন/একমাত্র এই পথের (কুরআনের) অনুসরণ এবং অন্য পথের নিষেধাজ্ঞা:
সুরা আল-আরাফ, আয়াত ৩:
"তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে (কুরআন), তার অনুসরণ কর এবং তাঁকে ছাড়া অন্য কোনো অভিভাবকের (আউলিয়া) অনুসরণ করো না। তোমরা খুব অল্পই উপদেশ গ্রহণ কর।"
অনুধাবন: এখানে ‘মা উনজিলা ইলাইকুম’ (যা তোমাদের প্রতি নাজিল করা হয়েছে) বলতে কুরআনকে বোঝানো হয়েছে। এর বাইরে অন্য কাউকে অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এই আয়াতে দুটি অংশ। প্রথমত, ‘যা নাজিল করা হয়েছে’ (কুরআন) তার অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক (ফরজ)। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ ছাড়া বা আল্লাহর কিতাব ছাড়া অন্য কোনো অভিভাবক বা কর্তৃপক্ষের অনুসরণ নিষিদ্ধ। অর্থাৎ, যেখানে কুরআনের বিধান আছে, সেখানে অন্য কারো কথা মানা যাবে না।
‘যা নাজিল করা হয়েছে’ তা কী?
"যখন তুমি কুরআনে তোমার রবের কথা ‘এককভাবে’ (ওয়াহদাহু) উল্লেখ কর, তখন তারা বিমুখ হয়ে পিঠ ফিরিয়ে চলে যায়।"
অনুধাবন: আল্লাহকে একমাত্র রব এবং বিধানদাতা হিসেবে মানতে হলে কুরআনের মাধ্যমেই মানতে হবে।
বিচারের দিন প্রশ্ন করা হবে কেবল কুরআন সম্পর্কে /একমাত্র আল-কুরআন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে:
সুরা আয-যুখরুফ, আয়াত ৪৪:
"নিশ্চয়ই এটি (কুরআন) তোমার জন্য এবং তোমার কওমের জন্য উপদেশ। আর শীঘ্রই তোমাদেরকে (এই কিতাব সম্পর্কে) জিজ্ঞাসা করা হবে।"
অনুধাবন: পরকালে জিজ্ঞাসাবাদের সিলেবাস হলো কুরআন। অন্য কোনো কিতাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে না।
সুরা আল-কাহফ, আয়াত ২৭:
তোমার প্রতি তোমার রবের যে কিতাব ওহি করা হয়েছে, তা তিলাওয়াত কর। তাঁর বাক্য পরিবর্তন করার কেউ নেই এবং তুমি তিনি ছাড়া আর কোনো আশ্রয়স্থল পাবে না।"
বিচার ফয়সালা কেবল ‘নাজিলকৃত’ বিধান দিয়েই হতে হবে/বিচার-ফয়সালার জন্য ‘সত্যসহ’ নাজিলকৃত কিতাব
সুরা আল-মায়েদা, আয়াত ৪৮:
"...অতএব আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী তাদের বিচার-ফয়সালা করো এবং তোমার কাছে যে সত্য এসেছে তা ত্যাগ করে তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না..."
সুরা আল-মায়েদা, আয়াত ৪৯:
"আর (আমি আদেশ করছি যে) আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, তুমি সে অনুযায়ী তাদের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করো, তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না এবং তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকো, যেন আল্লাহ যা তোমার প্রতি নাজিল করেছেন, তার কোনো কিছু থেকে তারা তোমাকে বিচ্যুত করতে না পারে..."
অনুধাবন: এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে, ‘যা নাজিল করা হয়েছে’ (কুরআন) তা-ই চূড়ান্ত মানদণ্ড। এর বাইরে গিয়ে কারো মনগড়া মত বা সমাজের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী বিচার করা আল্লাহর নির্দেশের অমান্য।
মানুষের মতবিরোধ নিরসনের জন্য আল্লাহ সত্যসহকারে এই কিতাব পাঠিয়েছেন:
আল-কুরআন আহসানুল হাদিস যা বেষ্ট অব দি বেষ্ট কিতাব:
সুরা আয-যুমার, আয়াত ২৩:
"আল্লাহ নাজিল করেছেন উত্তম হাদিস, একটি কিতাব (কিতাবান) যা পরস্পরে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বারবার পঠিত..."
অনুধাবন: আল্লাহ নিজেই তাঁর নাজিলকৃত ওহিকে ‘কিতাবান’ (একটি কিতাব) হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন যা স্ববিরোধিতায় মুক্ত এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ।
‘আল-ফুরকান’ (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী একটি মানদণ্ড):
আল-বাইল’ বা সুস্পষ্ট দলিল:
অন্য কোনো কিতাব আনার চ্যালেঞ্জ:
মানুষের জন্য ‘একটি’ স্পষ্ট ঘোষণা (বায়ান):
‘মুহাইমিন’ বা সব কিতাবের রক্ষক ও সত্যয়নকারী:
আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ‘হাদিস’ (কথা/বাণী) মানা যাবে কি?
সুরা আল-মুরসালাত, আয়াত ৫০:
"অতঃপর এই কুরআনের পর তারা আর কোন কথার (হাদিসের) প্রতি ঈমান আনবে?"
সুরা আল-আরাফ, আয়াত ১৮৫:
"...এরপর তারা আর কোন কথার (হাদিসের) প্রতি ঈমান আনবে?"
একটি কিতাবই কি যথেষ্ট নয়?
অনেকে প্রশ্ন তোলেন, শুধু নাজিলকৃত কিতাব দিয়ে কি জীবন চলবে? এর উত্তরে আল্লাহ বলেন:
সুরা আল-আনকাবুত, আয়াত ৫১:
"তাদের জন্য কি এটি যথেষ্ট নয় যে, আমি তোমার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি (আনজালনা আলাইকাল কিতাবা), যা তাদের নিকট পাঠ করা হয়? নিশ্চয় এতে মুমিন কওমের জন্য রহমত ও উপদেশ রয়েছে।"
অনুধাবন: আল্লাহ এখানে প্রশ্নবোধক বাক্যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন। ‘আনজালনা আলাইকাল কিতাবা’ (আমি তোমার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি)—এই অংশটি প্রমাণ করে যে, রাসুলের কাছে রক্ষিত ও পঠিত এই কিতাবটিই উম্মতের হেদায়েতের জন্য এককভাবে যথেষ্ট।
মানুষকে উপদেশ ও সতর্ক করতে হবে কেবল কুরআন দিয়ে:
মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি নাজিলকৃত বিষয়ই একমাত্র ‘হক’ বা সত্য:
২. সত্য (কুরআন) আসার পর বাতিলের বিলুপ্তি এবং কুরআনের নিরাময় ক্ষমতা:
একমাত্র মহাসত্য আল-কুরআন: যার সামনে বা পেছনে কোনো বাতিল নেই:
সুরা ফুসসিলাত, আয়াত ৪১-৪২:
নিশ্চয় যারা উপদেশ (কুরআন) আসার পর তা অস্বীকার করে (তাদের শাস্তি অবধারিত); আর এটি অবশ্যই এক সম্মানিত ও পরাক্রমশালী কিতাব (কিতাবুন আযীয)।" বাতিল এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না—না এর সামনে থেকে, না এর পেছন থেকে। এটি প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত সত্তার পক্ষ থেকে নাজিলকৃত।"
আয়াতের অনুধাবন ও তাৎপর্য
১. বাতিল অনুপ্রবেশ করতে পারে না: ‘লা ইয়া’তিহিল বাতিলু’ (বাতিল এতে আসতে পারে না)। এর অর্থ হলো, এই কিতাবের কোনো অংশ ভুল প্রমাণ করা যাবে না, এর কোনো বিধান বাতিল করা যাবে না এবং এতে মানুষের কোনো কথা মিশ্রিত করা যাবে না।
2. সামনে ও পেছন থেকে (মীম বাইনি ইয়াদাইহি ওয়া মিন খালফিহি):
* সামনে থেকে: অর্থাৎ এই কিতাব নাজিল হওয়ার সময় বা এর সমসাময়িক কেউ এর বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি দাঁড় করাতে পারেনি বা এতে মিথ্যা ঢোকাতে পারেনি।
* পেছন থেকে (ভবিষ্যৎ): কিয়ামত পর্যন্ত ভবিষ্যতে কেউ এমন কোনো কিতাব রচনা করতে পারবে না যা এই কুরআনের সত্যতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে বা এর বিধানকে রহিত করতে পারে। আল্লাহ নিজেই এর সংরক্ষক। এর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য আয়াত (সমর্থনমূলক) এই আয়াতটির অর্থ আরও পরিষ্কার হয় যখন আমরা দেখি আল্লাহ অন্য আয়াতে বলছেন যে, তাঁর বাণীর কোনো পরিবর্তনকারী নেই এবং এর পরে অন্য কোনো কথার ওপর ঈমান আনা যাবে না।
সুরা আল-কাহফ, আয়াত ২৭:
"তোমার প্রতি তোমার রবের যে কিতাব ওহি করা হয়েছে, তা তিলাওয়াত কর। তাঁর বাক্য (বাণী) পরিবর্তন করার কেউ নেই..."
অনুধাবন: যদি ভবিষ্যতে কেউ নতুন কোনো কিতাব বা বিধান আনার দাবি করে, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ আল্লাহর বাণী পরিবর্তনের ক্ষমতা কারো নেই।
সুরা আল-মুরসালাত, আয়াত ৫০:
"অতঃপর এই কুরআনের পর তারা আর কোন কথার (হাদিসের) প্রতি ঈমান আনবে?"
অনুধাবন: কুরআনের পরে (পেছনে) অন্য কোনো কথা বা কিতাবকে দ্বীনের উৎস হিসেবে মানা যাবে না। কারণ ‘এর পেছনে কোনো বাতিল নেই’ মানে এর পরে আর কোনো নতুন বিধান আসবে না যা এটাকে রিপ্লেস বা পরিবর্তন করবে।
সিদ্ধান্ত:
সুরা ফুসসিলাতের ৪২ নম্বর আয়াত এবং আনুষঙ্গিক আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে:
১. আল-কুরআন চূড়ান্তভাবে সংরক্ষিত এবং মহাসত্য।
২. এর আগে বা পরে কোনো ‘বাতিল’ বা মিথ্যা একে স্পর্শ করতে পারবে না।
৩. ভবিষ্যতে কেউ যদি দ্বীনের নামে অন্য কোনো কিতাব রচনা করে বা অনুসরণ করে, তবে তা আল্লাহর কাছে প্রত্যাখ্যাত, কারণ কুরআনের সত্যতা ও কর্তৃত্ব চিরস্থায়ী এবং এর কোনো বিকল্প নেই।
চূড়ান্ত সারসংক্ষেপ (Final Conclusion):
“এই কিতাব (কুরআন) কি তাদের জন্য যথেষ্ট নয়?” (সূরা আল-আনকাবুত: ২৯:৫১)—এই প্রশ্নটিই সব বিতর্কের অবসান ঘটায়।
নাজিলকৃত ওহি কী? = একমাত্র ‘আল-কুরআন’। (রেফারেন্স: সূরা আল-আনআম ৬:১৯, সূরা ইউসুফ ১২:৩, সূরা আশ-শূরা ৪২:৭)
আল্লাহ, রাসুল ও উম্মতের সম্পর্ক:
সারসংক্ষেপ: কিতাবের সংখ্যা ও মর্যাদা:
আল্লাহ ‘কিতাবুন’ (একটি কিতাব) নাজিল করেছেন। (রেফারেন্স: সূরা ফুসসিলাত ৪১:৩)
এটি একমাত্র ‘ফুরকান’ বা সত্য-মিথ্যার মানদণ্ড। (রেফারেন্স: সূরা আল-ফুরকান ২৫:১)
সতর্ক করার একমাত্র মাধ্যম ‘ওহি’ । (রেফারেন্স: সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৪৫)
আল্লাহ ‘কিতাবুন’ (একটি কিতাব) নাজিল করেছেন।সেই কিতাবটিই গবেষণার ( তাদাব্বুর ) একমাত্র বিষয়বস্তু।এই কিতাবটিই সত্য এবং সত্যয়নকারী হিসেবে এসেছে।এটি আরবি ভাষায় নাজিলকৃত ‘একটি কুরআন’ ।
