একটি-ই কিতাব দ্বীনের জন্য—শুধুমাত্র-কেবলমাত্র আল-কোরআন দ্বীন লালন-পালন ও অনুসরণের জন্য (Only Quran)

 “১০০% অথেনটিক কুরআনিক দলিলের আলোকে আমরা নিম্নোক্ত মৌলিক বিষয়সমূহ পর্যালোচনা করবো—”

 আমাদের জন্য বর্তমান নাযিলকৃত ও অনুসরনযোগ্য কিতাবের সংখ্যা কয়টি?  

 কোনো অনাযিলকৃত কিতাব, মতবাদ বা মানব-প্রণীত আইন সম্পর্কে কুরআন কী অবস্থান গ্রহণ করেছে—এবং এগুলোকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে বাতিল বা অকার্যকর ঘোষণা করার যে কোরআনিক অর্ডিন্যান্স রয়েছে, তার প্রকৃত রূপ কী?

 দ্বীন অনুসরণে—আল্লাহর ক্ষমা, রহমত ও জান্নাতলাভের জন্য একজন মুমিনকে স্পষ্টভাবে কতটি কিতাব অনুসরণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?

 আল-কোরআন ব্যতীত অন্য কোনো কিতাবে কি নাযিলকৃত অহী, বিধান বা অনুসরণযোগ্য নির্দেশনা রয়েছে—এবং সেগুলো মুমিনদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে কি না?

 আল্লাহর রাসুল (সা.) স্বীয় জীবনের আদর্শিক ও আইনগত ব্যবস্থায় কোন গ্রন্থ অনুসরণ করতেন—এবং নবী-রাসূল হিসেবে তাঁকে কোন ঐশী কিতাব অনুসরণ করতে আদিষ্ট করা হয়েছিল?

 আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ঈমানদর-মুমিনদেরকে কোন কিতাব অনুসরণ করতে স্পষ্ট নির্দেশ, উপদেশ ও পরামর্শ প্রদান করেছেন?

 আল-কোরআনের বাইরে দ্বীনের নামে কোনো অতিরিক্ত বিধান, শরীয়াহ, মতবাদ বা অনুসরণযোগ্য কি না—এবং থাকলে তা কোরআনিক মানদণ্ডে কতখানি বৈধ বা বাধ্যতামূলক?

১০০% অথেনটিক কুরআনিক দলিলের আলোকে এটি অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, মহান আল্লাহ দ্বীনের উৎস হিসেবে মানবজাতির জন্য কেবল ‘একটি’ কিতাবই নাযিল করেছেন এবং সেটিই আল-কুরআন। নিচে এর বিস্তারিত পর্যালোচনা ও দালিলিক প্রমাণ তুলে ধরা হলো:

১. ‘কিতাবুন’ (একটি কিতাব)—সংখ্যায় এক ও অদ্বিতীয় —একবচনে নাজিলকৃত: 

‘কুরআন’ (একটি কুরআন) শব্দটি একবচনে এবং অনির্দিষ্ট (indefinite but singular noun indicating specificity of type) হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা এর অদ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যের দিকে ইঙ্গিত করে।

আল্লাহ তায়ালা সুরা আল-আরাফের শুরুতে স্পষ্ট করেছেন যে, এই কিতাবটি (একবচনে) রাসুলের প্রতি নাজিল করা হয়েছে।

সুরা আল-আরাফ, আয়াত ২:

(এটি) একটি কিতাব (কিতাবুন), যা তোমার প্রতি নাজিল করা হয়েছে। সুতরাং তোমার মনে যেন এর সম্পর্কে কোনো সংকোচ না থাকে। যাতে তুমি এর মাধ্যমে সতর্ক করতে পার এবং এটি মুমিনদের জন্য উপদেশ।"

অনুধাবন: এখানে ‘কিতাবুন’ শব্দটি অনির্দিষ্ট (indefinite) কিন্তু একবচনে ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ এটি এমন এক বিশেষ কিতাব যা আল্লাহ পাঠিয়েছেন। এর বাইরে অন্য কোনো কিতাব নাজিল করার ঘোষণা এখানে নেই।

কুরআনের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা অনুযায়ী, শেষ নবীর উম্মতের জন্য অনুসরণযোগ্য নাজিলকৃত কিতাবের সংখ্যা একটি এবং তার নাম আল-কুরআন

দলিল: 

সুরা সা-দ, আয়াত ৩৮:২৯: "(এটি) একটি বরকতময় কিতাব (কিতাবুন), যা আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীর চিন্তা-গবেষণা করে..." (এখানে ‘কিতাবুন’ একবচনে ব্যবহৃত হয়েছে)।

সুরা আন-নামল, আয়াত ২৭:৬: "আর নিশ্চয় তুমি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ সত্তার পক্ষ থেকে আল-কুরআন প্রাপ্ত হচ্ছ।"

সুরা আল-কাহফ, আয়াত ১৮:১: "সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি কিতাব নাজিল করেছেন (আনজালা... আল-কিতাবা)..."

সুরা ইব্রাহিম, আয়াত ১:

"আলিফ-লাম-রা; (এটি) একটি কিতাব (কিতাবুন), যা আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে তুমি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পার..."

‘আল-কিতাব’ (সেই নির্দিষ্ট কিতাব)—সুনির্দিষ্টকরণ:

আল্লাহ তায়ালা যখনই ওহির পূর্ণাঙ্গতার কথা বলেছেন, তখন ‘আল’ (The) যুক্ত করে ‘আল-কিতাব’ বলেছেন, যা নির্দিষ্ট করে যে, এই কুরআনই সেই চূড়ান্ত কিতাব।

সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২:

"এটি সেই কিতাব (লিকাল কিতাব), যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হেদায়েত।"

অনুধাবন: আল্লাহ আঙুল দিয়ে নির্দেশ করার মতো করে বলছেন ‘জালিকা’ (ঐটি/এটি)। অর্থাৎ অনুসরণীয় গ্রন্থ সুনির্দিষ্ট, এটি কোনো অস্পষ্ট বিষয় নয়।

সুরা আল-কাহফ, আয়াত ১:

"সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি কিতাব নাজিল করেছেন (আনজালা... আল-কিতাবা) এবং তাতে কোনো বক্রতা রাখেননি।"

অনুধাবন: এখানেও ‘আল-কিতাব’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুল (সা.)-এর প্রতি নাজিলকৃত ওহির সমষ্টি একটি অখণ্ড কিতাব।

‘একটি’ বরকতময় কিতাব—যা উপদেশ গ্রহণের জন্য নাজিলকৃত:

আল্লাহ তায়ালা সুরা সা-দ এ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ‘কিতাবুন’ (একটি কিতাব) শব্দটি ব্যবহার করেছেন এবং এর উদ্দেশ্য বর্ণনা করেছেন।

সুরা সা-দ, আয়াত ২৯:

"(এটি) একটি বরকতময় কিতাব (কিতাবুন আনজালনাহু), যা আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীর চিন্তা-গবেষণা (তাদাব্বুর) করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে।"

একবচন ব্যবহার: এখানে ‘কিতাবুন’ (একটি কিতাব) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রমাণ করে নাজিলকৃত ওহি একটি অখণ্ড সত্তা।

উদ্দেশ্য: এই একটি কিতাবের আয়াতগুলো নিয়েই গবেষণা (তাদাব্বুর) করতে বলা হয়েছে। হেদায়েতের জন্য অন্য কোনো গ্রন্থের গবেষণার কথা বলা হয়নি।

‘একটি কিতাব’ যা সত্যসহ নাজিল হয়েছে:

আল্লাহ তায়ালা সত্যসহকারে ‘একবচনে’ কিতাব নাজিল করেছেন, যেন মানুষ একে অপরের সাথে বিরোধ না করে।

সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ১৭৬:

"এটা এ জন্য যে, আল্লাহ সত্যসহ কিতাবটি (আল-কিতাব) নাজিল করেছেন। আর যারা কিতাব সম্পর্কে মতভেদ করেছে, নিশ্চয় তারা সুদূরপ্রসারী বিরোধিতায় লিপ্ত।"

অনুধাবন: এখানে ‘নাজ্জালা... আল-কিতাবা’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ বিরোধ মেটানোর মানদণ্ড হলো এই একটি কিতাব। যারা এই এক কিতাব ছেড়ে ভিন্ন মতের আশ্রয় নেয়, তারাই বিরোধে লিপ্ত হয়।

আরবি ভাষায় নাজিলকৃত ‘একটি কিতাব’:

কুরআন যে আরবি ভাষায় নাজিলকৃত ‘একটি’ সুনির্দিষ্ট কিতাব, তা আল্লাহ বারবার উল্লেখ করেছেন।

সুরা ইউসুফ, আয়াত ২:

"নিশ্চয় আমি একে নাজিল করেছি আরবি কুরআনরূপে (কুরআনান আরাবিয়্যান), যাতে তোমরা বুঝতে পার।"

ব্যাখ্যা: এখানে ‘কুরআনান’ (একটি কুরআন) বলা হয়েছে। ওহির মাধ্যম হিসেবে একাধিক আরবি গ্রন্থের কথা বলা হয়নি।

সুরা ত্বা-হা, আয়াত ১১৩:

"আর এভাবেই আমি একে আরবি কুরআনরূপে (কুরআনান আরাবিয়্যান) নাজিল করেছি এবং এতে বিশদভাবে সতর্কবাণী বর্ণনা করেছি..."

আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘একটি কিতাব’ আসার পর...

পূর্ববর্তী আহলে কিতাবদের কাছে যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘মুসাদ্দিক’ বা সত্যয়নকারী হিসেবে ‘একটি কিতাব’ এলো, তখন তারা তা প্রত্যাখ্যান করল।

সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ৮৯:

"আর যখন তাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি কিতাব (কিতাবুম-মিন ইন্দিল্লাহ) আসল, যা তাদের সাথে যা আছে তার সত্যয়নকারী..."

অনুধাবন: এখানে ‘কিতাবুন’ শব্দ দ্বারা আল-কুরআনকে বোঝানো হয়েছে, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা একক দলিল।

‘একটি’ কিতাব—যা বক্রতা মুক্ত:

আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি যে কিতাব পাঠিয়েছেন, তা একটি এবং তাতে কোনো বক্রতা নেই।

সুরা আয-যুমার, আয়াত ২৮:

"(এটি) আরবি কুরআন (কুরআনান আরাবিয়্যান), যাতে কোনো বক্রতা নেই, যাতে তারা তাকওয়া অবলম্বন করে।"

এই ‘একটি’ কিতাবই হক (সত্য): রাসুল (সা.)-এর প্রতি ওহিকৃত কিতাবটিই একমাত্র সত্য।

সুরা ফাতির, আয়াত ৩১:

"আর কিতাবের মধ্য থেকে আমি তোমার প্রতি যা ওহি করেছি, তাই সত্য (আল-হক)..."

অনুধাবন: ওহির উৎস হিসেবে এখানে ‘আল-কিতাব’ (নির্দিষ্ট কিতাব) উল্লেখ করা হয়েছে।

সিদ্ধান্ত: অনুসরণযোগ্য কিতাব মাত্র একটি, এবং তা হলো আল-কুরআন

২. একমাত্র ‘আল-কুরআন’—দ্বীনের একমাত্র উৎস:

আল্লাহ তায়ালা ‘নাযিলকৃত’ বস্তু বলতে সুনির্দিষ্টভাবে আল-কুরআনকেই বুঝিয়েছেন এবং একেই ‘ওহি’ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।

কুরআনই ওহি: “বল... আমার প্রতি এই কুরআন ওহি করা হয়েছে, যেন আমি এর মাধ্যমে তোমাদেরকে... সতর্ক করতে পারি।”

(সূরা আল-আনআম: ৬:১৯)

সুস্পষ্ট ঘোষণা: “নিশ্চয় তুমি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ সত্তার পক্ষ থেকে আল-কুরআন প্রাপ্ত হচ্ছ।”

(সূরা আন-নামল: ২৭:৬)

একমাত্র সত্য (আল-হক): “আর যারা ঈমান আনে... এবং মুহাম্মদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তার ওপর ঈমান আনে—আর তা-ই তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য (আল-হক)...” (সূরা মুহাম্মদ: ৪৭:২)

‘কিতাব’ ও ‘কুরআন’ একই সত্তা এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যাযুক্ত:

আল্লাহ তায়ালা এই কিতাবকে বিস্তারিত (মুফাস্সাল) এবং আরবি কুরআন হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।

সুরা ফুসসিলাত, আয়াত ৩:

"(এটি) একটি কিতাব (কিতাবুন), যার আয়াতসমূহ বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, আরবি কুরআনরূপে, জ্ঞানবান কওমের জন্য।"

অনুধাবন: এখানে ‘কিতাবুন’ (একটি কিতাব) এবং ‘কুরআনান’ (একটি কুরআন) শব্দদ্বয় সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আয়াতটি প্রমাণ করে যে, নাজিলকৃত কিতাবটিই হলো এই কুরআন, যা বিস্তারিত ও স্পষ্ট।

সুরা হুদ, আয়াত ১:

"আলিফ-লাম-রা; (এটি) একটি কিতাব (কিতাবুন), যার আয়াতসমূহ সুদৃঢ় করা হয়েছে, অতঃপর প্রজ্ঞাময়, সবজান্তা সত্তার পক্ষ থেকে সবিস্তারে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।"

কুরআন বা এর বিধানকে ‘ফরজ’ বা ‘অপরিহার্য’ করা হয়েছে:

সূরা আল-কাসাস, আয়াত ৮৫:

“যিনি আপনার ওপর কুরআনকে ফরজ (বিধান হিসেবে অপরিহার্য) করেছেন, তিনি নিশ্চয়ই আপনাকে আপনার গন্তব্যস্থলে ফিরিয়ে নেবেন।” 

(এখানে ‘ফারাযা’ শব্দটি ব্যবহার করে কুরআন প্রচার ও এর বিধান মানাকে ফরজ করা হয়েছে)

সূরা আন-নূর, আয়াত ১:

“এটি একটি সূরা যা আমি নাজিল করেছি এবং একে ফরজ (অপরিহার্য বিধান) সাব্যস্ত করেছি; আর এতে আমি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ নাজিল করেছি, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।”

(এখানে ‘ফারাযনাহা’ শব্দটি দ্বারা এই সূরার যাবতীয় হুকুম-আহকামকে ফরজ করা হয়েছে)

ওহিকৃত বিষয় হলো ‘সত্য কিতাব’:

রাসুল (সা.)-এর প্রতি ওহির মাধ্যমে যা পাঠানো হয়েছে, আল্লাহ তাকে ‘আল-কিতাব’ এবং ‘আল-হক’ (সত্য) বলেছেন।

সুরা ফাতির, আয়াত ৩১:

"আর কিতাবের মধ্য থেকে আমি তোমার প্রতি যা ওহি করেছি, তাই সত্য (আল-হক); যা তার পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী..."

অনুধাবন: এখানে ‘মিনাল কিতাবি’ (কিতাব হতে) এবং ‘আওহাইনা’ (ওহি করেছি)—শব্দগুলোর ব্যবহার প্রমাণ করে যে, ওহির বিষয়বস্তু হলো এই কিতাব।

সুরা আল-আনকাবুত, আয়াত ৪৭:

"আর এভাবেই আমি তোমার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি (আনজালনা ইলাইকাল কিতাবা)..."

ব্যাখ্যা: আল্লাহ সরাসরি বলছেন, তিনি ‘আল-কিতাব’ (নির্দিষ্ট কিতাব) নাজিল করেছেন। বহুবচন বা একাধিক কিতাবের কথা বলা হয়নি।


কুরআনকেই ‘ওহি’ হিসেবে নাজিল করা হয়েছে:/ রাসুল (সা.)-এর নিকট সুনির্দিষ্টভাবে আল-কুরআনই পাঠানো হয়েছে:

আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সা.)-এর জবানিতে সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তাঁর প্রতি যে ওহি নাজিল হয়েছে, তা হলো এই কুরআন।

সুরা আল-আনআম, আয়াত ১৯:
"বল, ‘সাক্ষ্য হিসেবে কোন্ জিনিসটি বড়?’ বল, ‘আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী। আর আমার প্রতি এই কুরআন ওহি করা হয়েছে, যেন আমি এর মাধ্যমে তোমাদেরকে এবং যাদের কাছে তা পৌঁছাবে তাদেরকে সতর্ক করতে পারি’..."

অনুধাবন: এখানে স্পষ্টভাবে ‘ওহি’ শব্দটিকে ‘কুরআন’-এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে। রাসুল (সা.)-এর রিসালতের মূল দলিল হলো এই ওহিকৃত কুরআন।

আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি তাঁর রাসুলকে ‘আল-কুরআন’ দান করেছেন। এখানে কোনো অস্পষ্টতা নেই।

সুরা আন-নামল, আয়াত ৬:
"আর নিশ্চয় তুমি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ সত্তার পক্ষ থেকে আল-কুরআন প্রাপ্ত হচ্ছ (বা তোমাকে আল-কুরআন দেওয়া হচ্ছে)।"

অনুধাবন: এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ‘তুলাক্-ক্বা’ (তোমাকে দেওয়া হচ্ছে/তুমি গ্রহণ করছ) ক্রিয়াপদের সাথে সরাসরি ‘আল-কুরআন’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসুল (সা.)-এর কাছে আসা ওহির নির্দিষ্ট নাম ও রূপ হলো ‘আল-কুরআন’।

সুরা ইউসুফ, আয়াত 12:৩:
"আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করছি, এই কুরআন তোমার নিকট ওহি করার মাধ্যমে..."

অনুধাবন:: এখানে ‘বিমা আওহায়না’ (যা ওহি করেছি) বলতে সরাসরি ‘কুরআন’-কে নির্দেশ করা হয়েছে।

সুরা আশ-শূরা, আয়াত ৭:
"আর এভাবেই আমি তোমার প্রতি আরবি কুরআন ওহি করেছি, যাতে তুমি মক্কাবাসী ও তার আশেপাশের লোকদের সতর্ক করতে পার..."

যা কিছু নাজিল হয়েছে, তা সবই এই কুরআনে সন্নিবেশিত এর বাইরে কোন নাযিলকৃত অহী নাই এবং তা প্রচারের নির্দেশ:

আল্লাহ যা কিছু নাজিল করেছেন, তার পুরোটাই এই কুরআনের অন্তর্ভুক্ত এবং রাসুল (সা.)-কে সেই পুরো ‘নাজিলকৃত’ বিষয়টিই হুবহু মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বলা হয়েছে।

সুরা আল-মায়েদা, আয়াত ৬৭:

"হে রাসুল, তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার নিকট যা নাজিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দাও। আর যদি তুমি তা না কর তবে তুমি তাঁর রিসালাত প্রচার করলে না..."

অনুধাবন: এই আয়াতে ‘মা উনজিলা’ (যা নাজিল করা হয়েছে) প্রচার করতে বলা হয়েছে। যেহেতু সুরা আন-নামলের ৬ নং আয়াতে আমরা দেখেছি রাসুল (সা.) ‘কুরআন’ প্রাপ্ত হচ্ছেন এবং সুরা আনআমের ১৯ নং আয়াতে তিনি বলছেন ‘আমার প্রতি এই কুরআন ওহি করা হয়েছে’, সুতরাং সুরা মায়েদার এই আয়াত প্রমাণ করে—রবের পক্ষ থেকে আসা সম্পূর্ণ বার্তাটিই এই কুরআনে বিদ্যমান এবং রাসুল (সা.) এই কুরআনের মাধ্যমেই তাঁর রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছেন। এর বাইরে গোপন কোনো ওহি বা বিধান তিনি প্রচারের জন্য পাননি।

অনাযিলকৃত কিতাব, মতবাদ বা মানব-প্রণীত আইন সম্পর্কে কুরআন কী অবস্থান গ্রহণ করেছে?

কুরআন স্পষ্ট ভাষায় নাজিলকৃত কিতাব ছাড়া অন্য কোনো মানব-রচিত কিতাব, মতবাদ বা আইনকে ‘বাতিল’, ‘কুফর’ এবং ‘মিথ্যা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এগুলোর অনুসরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

দলিল:

সুরা আল-বাকারা, আয়াত ২:৭৯: "সুতরাং ধ্বংস তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং তারপর বলে, ‘এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে’, যাতে তা তুচ্ছ মূল্যে বিক্রি করতে পারে..."

সুরা আল-কাসাস, আয়াত ২৮:৪৯: "বল, ‘তবে তোমরা আল্লাহর কাছ থেকে এমন একটি কিতাব নিয়ে এসো যা এ দুটির (কুরআন ও তাওরাত) চেয়ে অধিক হেদায়েতকারী..." (অর্থাৎ আল্লাহর কিতাব ছাড়া অন্য কোনো কিতাব হেদায়েত দিতে পারে না)।

সুরা আল-মায়েদা, আয়াত ৫:৪৪: "...আর আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী যারা ফয়সালা করে না, তারা কাফির।"

সুরা আন-নাজম, আয়াত ৫৩:২৮: "তারা তো কেবল অনুমান (জন্ন)-এর অনুসরণ করে; আর নিশ্চয় সত্যের (হকের) মোকাবিলায় অনুমান কোনো কাজেই আসে না।"

অর্ডিন্যান্স (আদেশ): নাজিলকৃত ওহি ছাড়া অন্য সব আইন বা কিতাব হলো ‘ধারণা প্রসূত’ (জন্ন) বা ‘মিথ্যা’। এগুলো বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য বাতিল এবং বর্জনীয়


কোন কিতাবখানা আমাদেরকে অনুসরণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে?

আল্লাহর ক্ষমা, রহমত ও জান্নাত লাভের জন্য একজন মুমিনকে সুনির্দিষ্টভাবে একটিমাত্র কিতাব অনুসরণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দলিল:

সুরা আল-আরাফ, আয়াত ৭:৩: "(হে মানুষ!) তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে (মা উনজিলা), তার অনুসরণ করো এবং তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য অভিভাবকদের (আউলিয়া) অনুসরণ করো না।" (এখানে ‘যা নাজিল করা হয়েছে’ একবচনে এই কিতাবকেই নির্দেশ করে)।

সুরা আল-আনআম, আয়াত ৬:১৫৫: "আর এটি এমন কিতাব যা আমি নাজিল করেছি, যা বরকতময়। অতএব তোমরা এর অনুসরণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।"

সুরা আয-যুমার, আয়াত ৩৯:৫৫: "আর তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তার মধ্য থেকে যা উত্তম, তোমরা তার অনুসরণ করো..."

আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল (সা.) উম্মতকে একটিমাত্র কিতাব শক্তভাবে আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশ অমান্য করা গোমরাহির শামিল।

সুরা আলে-ইমরান, আয়াত ৩:১০৩: "আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে (হাবলিল্লাহ/কুরআন) দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না..."

সুরা আয-যুখরুফ, আয়াত ৪৩:৪৩: "সুতরাং তোমার প্রতি যা ওহি করা হয়েছে, তা শক্তভাবে ধারণ কর; নিশ্চয় তুমি সরল পথের ওপর রয়েছ।"

সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২:১২১: "যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি (আতািনাহুমুল কিতাবা), তারা তা যথাযথভাবে তিলাওয়াত করে (অনুসরণ করে); তারাই তার প্রতি ঈমান রাখে..."

সিদ্ধান্ত: নির্দেশটি হলো—আল-কুরআনকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করা এবং এর বিধান মেনে চলা।

কিতাব তিলাওয়াত করা এবং অনুসরণ করা:

সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ১২১:
"যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি (আতািনাহুমুল কিতাবা), তারা তা যথাযথভাবে তিলাওয়াত করে (অনুসরণ করে); তারাই তার প্রতি ঈমান রাখে..."

অনুধাবন: এখানে ‘হাক্কা তিলাওয়াতিহি’ (যথাযথ তিলাওয়াত/অনুসরণ) বলতে কিতাবের বিধান মানাকে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ এখানে একটি কিতাবকেই নির্দেশ করেছেন।

রাসুল (সা.)-এর সাথে নাজিলকৃত ‘নূর’-এর অনুসরণ:

যারা রাসুল (সা.)-কে অনুসরণ করতে চায়, তাদের অবশ্যই তাঁর সাথে নাজিলকৃত ‘আলো’ বা কুরআনের অনুসরণ করতে হবে।

সুরা আল-আরাফ, আয়াত ১৫৭:
"...সুতরাং যারা তাঁর (নবীর) প্রতি ঈমান আনে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে এবং তাঁর সাথে যে নূর (আলো) নাজিল করা হয়েছে, তার অনুসরণ করে, তারাই সফলকাম।"

অনুধাবন: এখানে নবীর অনুসরণের শর্ত হিসেবে ‘তাঁর সাথে নাজিলকৃত নূর’-এর অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। সুরা মায়েদার ১৫ নং আয়াতে কুরআনকেই ‘নূর’ বলা হয়েছে। সুতরাং, নবীর অনুসরণের অর্থই হলো কুরআনের অনুসরণ।

‘যা নাজিল করা হয়েছে’—তার ওপর ঈমান আনা:

মুমিন হওয়ার শর্ত হলো রাসুল (সা.)-এর প্রতি নাজিলকৃত সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর ঈমান আনা এবং সেটিই ‘সত্য’।

সুরা মুহাম্মদ, আয়াত ২-3:
আর যারা ঈমান আনে ও আমলে সলেহ করে এবং সে বিষয়ে ঈমান আনে যা মুহাম্মাদের ওপর নাযিল করা হয়েছে আর তা তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য। তিনি তাদের থেকে তাদের ত্রুটিগুলো লুকিয়ে রাখেন এবং তাদের অবস্থা সংশোধন করেন।

সেটা এ কারণে যে, যারা কুফর করে তারা বাতিলের অনুসরণ করে। আর এটাও যে, যারা ঈমান আনে তারা তাদের রবের পক্ষ থেকে হকের অনুসরণ করে। ওভাবেই আল্লাহ মানুষের জন্য তাদের দৃষ্টান্তসমূহ উপস্থাপন করেন।


অনুধাবন: এখানে সালামুন আলা মুহাম্মাদ (সা.)-এর ওপর নাজিলকৃত বস্তুকে ‘আল-হক’ (একমাত্র সত্য) বলা হয়েছে। এই সত্যের বাইরে যা থাকে, তা ভ্রান্তি।

সিদ্ধান্ত: নির্দেশ কেবল একটি কিতাবের জন্য—অন্য কোনো কিতাবের জন্য নয়।


এটি একটি ‘আরবি বিধান’ (হুকমান আরাবিয়্যান):

আল্লাহ তায়ালা এই কুরআনকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা বা বিধান (Judgement/Code of Law) হিসেবে নাজিল করেছেন।

সুরা আর-রা’দ, আয়াত ৩৭:
"আর এভাবেই আমি একে (কুরআনকে) আরবি বিধানরূপে (হুকমান আরাবিয়্যান) নাজিল করেছি। আর তোমার নিকট জ্ঞান আসার পর যদি তুমি তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ কর, তবে আল্লাহর মোকাবিলায় তোমার কোনো অভিভাবক ও রক্ষাকারী থাকবে না।"

অনুধাবন: এখানে কুরআনকে ‘হুকুম’ বা বিধান বলা হয়েছে। আল্লাহর বিধানের বিপরীতে থাকে মানুষের প্রবৃত্তি বা ‘খেয়াল-খুশি’ (Ahwa)। সুতরাং বিধান হিসেবে এই একটি কিতাবই অনুসরণীয়।

এই ‘কুরআন’ই একমাত্র পথপ্রদর্শক:

আল্লাহ সুনির্দিষ্টভাবে ‘হাজাল কুরআন’ (এই কুরআন) শব্দ ব্যবহার করে জানিয়েছেন যে, এটিই মানুষকে সবচেয়ে সঠিক পথ দেখায়।

সুরা বনি ইসরাঈল (আল-ইসরা), আয়াত ৯:
"নিশ্চয়ই এই কুরআন (হাজাল কুরআনা) এমন পথ প্রদর্শন করে, যা সর্বাধিক সরল ও সঠিক..."

অনুধাবন: এখানে ‘হাজা’ (এই) শব্দটি দ্বারা কুরআনকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। হেদায়েতের জন্য অন্য কোনো উৎসের দিকে ইঙ্গিত করা হয়নি।

সুরা আল-আনআম, আয়াত ১৯২ (বা ১৫৫):
"আর এটি (হাজা) এমন কিতাব যা আমি নাজিল করেছি, যা বরকতময়। সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ কর..."

আল্লাহর রজ্জু (কুরআন) আঁকড়ে ধরা:

সুরা আলে-ইমরান, আয়াত ১০৩:
"আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে (হাবলিল্লাহ) দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না..."

অনুধাবন: আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক বা সংযোগের মাধ্যম হলো এই কিতাব। সুরা যুখরুফের ৪৩ আয়াতে যেমন বলা হয়েছে "যা ওহি করা হয়েছে তা শক্তভাবে ধর", এখানেও সেই একই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

যারা এই ‘কিতাব’ আঁকড়ে ধরে, তাদের প্রশংসা:

আল্লাহ তায়ালা সেই সব মানুষদের সৎকর্মপরায়ণ বলেছেন যারা এই নির্দিষ্ট কিতাবটিকে শক্তভাবে ধারণ করে।

সুরা আল-আরাফ, আয়াত ১৭০:
"আর যারা কিতাবকে (বিল-কিতাবি) দৃঢ়ভাবে ধারণ করে এবং সালাত কায়েম করে, নিশ্চয় আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করি না।"

অনুধাবন: এখানে ‘বিল-কিতাবি’ (কিতাবকে) একবচনে বলা হয়েছে। যারা এই এক কিতাবকে আঁকড়ে ধরে, তারাই সফল।

সুরা আয-যুখরুফ, আয়াত ৪৩:
"সুতরাং তোমার প্রতি যা ওহি করা হয়েছে, তা শক্তভাবে ধারণ কর; নিশ্চয় তুমি সরল পথের ওপর রয়েছ।"

অনুধাবন: যা ওহি করা হয়েছে (অর্থাৎ কুরআন), তাকেই শক্তভাবে ধরতে বলা হয়েছে।

আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ‘নূর’ ও ‘স্পষ্ট কিতাব’

আল্লাহ এই কিতাবকে আলো এবং স্পষ্টকারী হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
সুরা আল-মায়েদা, আয়াত ১৫:

"...নিশ্চয় আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে এসেছে একটি নূর ও সুস্পষ্ট কিতাব (কিতাবুম-মুবিন)।"

অনুধাবন: এখানে ‘কিতাবুম-মুবিন’ বলা হয়েছে, অর্থাৎ এটি এমন একটি কিতাব যা নিজেই নিজের ব্যাখ্যা দেয় এবং সত্যকে স্পষ্ট করে।

আল্লাহর রাসুল-এর চরিত্র ছিল কুরআনেরই বাস্তবায়ন:

যদিও এটি কথিত হাদিসের বিষয়, কিন্তু কুরআনের আয়াত দ্বারাও এটি প্রমাণিত যে রাসুল (সা.) কুরআনের বাইরে কিছু করতেন না।

সুরা আল-কলম, আয়াত ৪:  "আর নিশ্চয় তুমি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।"

(এর ব্যাখ্যা সুরা আহযাব ২ নং আয়াতে পাওয়া যায়: "তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি যা ওহি করা হয়, তুমি কেবল তার অনুসরণ কর...")। অর্থাৎ, ওহির (কুরআনের) পূর্ণ অনুসরণই ছিল তাঁর মহান চরিত্র।

রাসুলের ঘোষণা: “বল... আমি কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহি করা হয়।”(সূরা আল-আহকাফ: ৪৬:৯; সূরা আল-আনআম: ৬:৫০)

আল-কোরআন ব্যতীত অন্য কোনো কিতাবে কি নাযিলকৃত অহী বা বিধান রয়েছে—এবং তা কি বাধ্যতামূলক?

কুরআন চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছে যে, এর বাইরে অন্য কোনো কিতাবে আল্লাহর ওহি বা বিধান নেই এবং অন্য কোনো কিতাব অনুসরণীয় বা বাধ্যতামূলক নয়।

দলিল:

সুরা আল-ক্বালাম, আয়াত ৬৮:৩৭-৩৮: "তোমাদের জন্য কি (কুরআন ছাড়া অন্য) কোনো কিতাব আছে, যাতে তোমরা পাঠ করছ—যে, নিশ্চয় তাতে তোমাদের জন্য তা-ই রয়েছে যা তোমরা পছন্দ কর?" (আল্লাহ এখানে ব্যঙ্গাত্মকভাবে প্রশ্ন করে বোঝাচ্ছেন যে, এমন কোনো কিতাব নেই)।

সুরা আল-আনআম, আয়াত ৬:১৯: "...আর আমার প্রতি এই কুরআন ওহি করা হয়েছে, যেন আমি এর মাধ্যমে তোমাদেরকে... সতর্ক করতে পারি।"

সুরা আল-আনকাবুত, আয়াত ২৯:৫১: "এটি কি তাদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, আমি তোমার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি, যা তাদের নিকট পাঠ করা হয়?"

সিদ্ধান্ত: আল-কুরআনের বাইরে অন্য কোনো কিতাবে ওহি বা বাধ্যতামূলক বিধান নেই। কুরআনই একমাত্র যথেষ্ট এবং বাধ্যতামূলক।


আল্লাহর রাসুল (সা.) স্বীয় জীবনে কোন গ্রন্থ অনুসরণ করতেন? 

রাসুল (সা.)-এর দায়িত্ব ছিল কেবল ‘নাজিলকৃত’ বিষয়ের অনুসরণ করতেন:

আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, বিচারিক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় একমাত্র ওহি (আল-কুরআন) অনুসরণ করতেন। তাঁকে কেবল এটিই অনুসরণ করতে আদেশ দেওয়া হয়েছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের পক্ষ থেকে কোনো বিধান দিতেন না, তিনি কেবল কুরআনের অনুসরণ করতেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন কেবল নাজিলকৃত ওহির অনুসরণ করতে। তিনি নিজের থেকে কিছু বানাতেন না।

সুরা আল-আহজাব, আয়াত ২:
"আর তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি যা ওহি (নাজিল) করা হয়, তুমি কেবল তার অনুসরণ করো। নিশ্চয় তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক খবর রাখেন।"

সুরা ইউনুস, আয়াত ১০৯:
"আর তোমার প্রতি যা ওহি করা হয় তুমি তার অনুসরণ করো এবং ধৈর্য ধর, যতক্ষণ না আল্লাহ ফয়সালা দেন..."

অনুধাবন: রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ বা পদ্ধতিই ছিল ওহির অনুসরণ। সুতরাং আমাদেরও রাসুল (সা.)-এর তরিকায় চলতে হলে কেবল ওহির অনুসরণই করতে হবে।

দলিল:

সুরা আল-আহকাফ, আয়াত ৪৬:৯: "বল... আমি কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহি করা হয়..."

সুরা আল-মায়েদা, আয়াত ৫:৪৮: "অতএব আল্লাহ যা নাজিল করেছেন (কুরআন), সে অনুযায়ী তাদের বিচার-ফয়সালা করো এবং তোমার কাছে যে সত্য এসেছে তা ত্যাগ করে তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না..."

সুরা ইউনুস, আয়াত ১০:১৫: "বল, ‘নিজে থেকে এটি পরিবর্তন করার অধিকার আমার নেই। আমি তো কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহি করা হয়’..."

সুরা আল-আনআম, আয়াত 6:৫০:
"বল, ‘আমি তোমাদের বলি না যে, আমার নিকট আল্লাহর ভাণ্ডারসমূহ রয়েছে এবং আমি গায়েব জানি না এবং আমি তোমাদের বলি না যে, আমি ফেরেশতা। আমার প্রতি যা ওহি প্রেরণ করা হয়, আমি কেবল তারই অনুসরণ করি...’"

সুরা ইউনুস, আয়াত ১৫:
"আর যখন তাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ সুস্পষ্টরূপে পাঠ করা হয়, তখন যারা আমার সাক্ষাতের আশা করে না, তারা বলে, ‘এটি ছাড়া অন্য কোনো কুরআন নিয়ে এসো অথবা এটিকে পরিবর্তন কর’। বল, ‘নিজে থেকে এটি পরিবর্তন করার অধিকার আমার নেই। আমি তো কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহি করা হয়’..."

সুরা ইউনুস, আয়াত ১৫:
"...বল, ‘নিজে থেকে এটি (কুরআন) পরিবর্তন করার অধিকার আমার নেই। আমি তো কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহি করা হয়’..."

ব্যাখ্যা: এই আয়াত প্রমাণ করে, রাসুল (সা.)-এর কাজ ছিল কেবল কুরআনের অনুসরণ এবং প্রচার। কুরআনের বাইরে গিয়ে দ্বীনের ব্যাপারে কিছু বলার বা পরিবর্তন করার এখতিয়ার তাঁর ছিল না।

সিদ্ধান্ত: রাসুল (সা.)-এর আদর্শিক ও আইনগত ভিত্তি ছিল ১০০% আল-কুরআন

রাসুল (সা.)-এর আদর্শ: কেবলই কুরআনের অনুসরণ:

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, বিচারিক ফয়সালা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ১০০% কুরআনের অনুসরণ করেছেন। তিনি কুরআনের বাইরে এক চুলও নড়তেন না।

রাসুলের ঘোষণা: “বল... আমি কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহি করা হয়।”

(সূরা আল-আহকাফ: ৪৬:৯; সূরা আল-আনআম: ৬:৫০)

বিচার কার্যে একমাত্র মানদণ্ড: “অতএব আল্লাহ যা নাযিল করেছেন (কুরআন), সে অনুযায়ী তাদের বিচার-ফয়সালা করো এবং... তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না।”

(সূরা আল-মায়েদা: ৫:৪৮)

ওহি ছাড়া রাসুলের নিজস্ব এখতিয়ার নেই: “বল, ‘নিজে থেকে এটি পরিবর্তন করার অধিকার আমার নেই। আমি তো কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহি করা হয়’।” (সূরা ইউনুস: ১০:১৫)


রাসুল (সা.)-এর নিজের পক্ষ থেকে কিছু বানানোর ক্ষমতা ছিল না:

কুরআন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, রাসুল (সা.) যদি কুরআনের বাইরে কোনো কথা আল্লাহর নামে চালিয়ে দিতেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতো।

সুরা ইউনুস, আয়াত ১৫:
"আর যখন তাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ সুস্পষ্টরূপে পাঠ করা হয়, তখন যারা আমার সাক্ষাতের আশা করে না, তারা বলে, ‘এটি ছাড়া অন্য কোনো কুরআন নিয়ে এসো অথবা এটিকে পরিবর্তন কর’। বল, ‘নিজে থেকে এটি পরিবর্তন করার অধিকার আমার নেই। আমি তো কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহি করা হয়’..."

অনুধাবন: এই আয়াত প্রমাণ করে যে, রাসুল (সা.)-এর অনুসরণীয় বিষয় ছিল অপরিবর্তনীয় এবং তা কেবলই আল্লাহর ওহি (কুরআন)।

সুরা আল-হাক্কাহ, আয়াত ৪৪-৪৬:
"সে (রাসুল) যদি আমার নামে কোনো কথা রচনা করত, তবে আমি অবশ্যই তার ডান হাত ধরে ফেলতাম। তারপর আমি তার জীবন-ধমনী কেটে দিতাম।"

অনুধাবন: এটি প্রমাণ করে যে, দ্বীনের ব্যাপারে রাসুল (সা.)-এর নিজস্ব কোনো মনগড়া কথা বলার সুযোগ ছিল না। যা বলেছেন, তা ওহি (কুরআন) থেকেই বলেছেন।

আল-কোরআনের বাইরে দ্বীনের নামে কোনো অতিরিক্ত বিধান বা শরীয়াহ বৈধ কি না?

কুরআন ঘোষণা করে যে, আল্লাহর হুকুম বা বিধান দেওয়ার মালিক একমাত্র তিনি। কুরআনের বাইরে কেউ যদি বিধান বা শরীয়াহ তৈরি করে, তবে তা ‘শিরক’ এবং অবৈধ।


অতিরিক্ত বিধান তৈরি করা শিরক:

কুরআনের বাইরে কেউ যদি বিধান বা শরীয়াহ তৈরি করে, তবে তা আল্লাহর সাথে শরিক করা।

দলিল: “তাদের কি এমন কোনো শরিক (দেবতা/বিধানদাতা) আছে, যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন বিধান দিয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি? ...” (সূরা আশ-শূরা: ৪২:২১)

সুরা আল-কাহফ, আয়াত ১৮:২৬: "...আর তিনি (আল্লাহ) তাঁর বিধানে (হুকুম) কাউকেও শরিক করেন না।"
সুরা ইউসুফ, আয়াত ১২:৪০: "...বিধান (হুকুম) দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত (দাসত্ব/আইন মান্য) করবে না..."

সুরা ফুসসিলাত, আয়াত ৪১:৪২: "বাতিল এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না—না এর সামনে থেকে, না এর পেছন থেকে..." (অর্থাৎ কুরআনের বাইরে নতুন কোনো বিধান আসার সুযোগ নেই)।

সিদ্ধান্ত: কুরআনের বাইরে দ্বীনের নামে যেকোনো অতিরিক্ত বিধান, শরীয়াহ বা মতবাদ আল্লাহর অনুমতিবিহীন এবং তা বাতিল ও অবৈধ


আল্লাহর কিতাব ছাড়া অন্য কিছু অনুসরণের নিষেধাজ্ঞা/ নাজিলকৃত বিধানের অনুসরণ এবং অন্য ‘আউলিয়া’ বর্জন/একমাত্র এই পথের (কুরআনের) অনুসরণ এবং অন্য পথের নিষেধাজ্ঞা:

আল্লাহ তায়ালা সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন কেবল তাঁর নাজিলকৃত কিতাব অনুসরণ করতে এবং অন্য কোনো অলি-আউলিয়া বা কর্তৃপক্ষের অনুসরণ না করতে।

সুরা আল-আরাফ, আয়াত ৩:
"তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে (কুরআন), তার অনুসরণ কর এবং তাঁকে ছাড়া অন্য কোনো অভিভাবকের (আউলিয়া) অনুসরণ করো না। তোমরা খুব অল্পই উপদেশ গ্রহণ কর।"

অনুধাবন: এখানে ‘মা উনজিলা ইলাইকুম’ (যা তোমাদের প্রতি নাজিল করা হয়েছে) বলতে কুরআনকে বোঝানো হয়েছে। এর বাইরে অন্য কাউকে অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।  এই আয়াতে দুটি অংশ। প্রথমত, ‘যা নাজিল করা হয়েছে’ (কুরআন) তার অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক (ফরজ)। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ ছাড়া বা আল্লাহর কিতাব ছাড়া অন্য কোনো অভিভাবক বা কর্তৃপক্ষের অনুসরণ নিষিদ্ধ। অর্থাৎ, যেখানে কুরআনের বিধান আছে, সেখানে অন্য কারো কথা মানা যাবে না।

 আল্লাহ তায়ালা একটিমাত্র সোজা সরল পথের (সিরাতুল মুস্তাকিম)  কথা বলেছেন যা এই কুরআনে নির্দেশিত। এর বাইরে অন্য পথ অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। এর বাইরে অন্য কোনো পথ বা মতের অনুসরণ করলে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। 

সুরা আল-আনআম, আয়াত ১৫৩:
"আর এটিই আমার সোজা পথ। সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ করো। আর অন্য পথগুলোর অনুসরণ করো না, তবে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে..."

অনুধাবন: এখানে ‘হাজা’ (এটি) বলে এই নাজিলকৃত বিধান বা কুরআনকে নির্দেশ করা হয়েছে। কুরআনের পথই একমাত্র ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’। এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা কুরআনের বাইরে অন্য যেকোনো উৎস, মতবাদ বা পথের অনুসরণকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।

সুরা আয-যুমার, আয়াত 39:৫৫:
"আর তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তার মধ্য থেকে যা উত্তম, তোমরা তার অনুসরণ করো—তোমাদের প্রতি অতর্কিতভাবে এবং তোমাদের অগোচরে আজাব আসার পূর্বে।"

‘যা নাজিল করা হয়েছে’ তা কী?

কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে, যা নাজিল করা হয়েছে তা হলো এই ‘কিতাব’ (কুরআন)।

সুরা আল-আনআম, আয়াত 6:১৫৫:
"আর এটি (কুরআন) এমন একটি কিতাব, যা আমি নাজিল করেছি (আনজালনাহু), যা বরকতময়। অতএব তোমরা এর অনুসরণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।"

সুরা আন-নিসা, আয়াত 4:১০৫:
"নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাজিল করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করেন যা আল্লাহ আপনাকে দেখিয়েছেন সে অনুযায়ী..."

সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত 17:৪৬:
"যখন তুমি কুরআনে তোমার রবের কথা ‘এককভাবে’ (ওয়াহদাহু) উল্লেখ কর, তখন তারা বিমুখ হয়ে পিঠ ফিরিয়ে চলে যায়।"

অনুধাবন: আল্লাহকে একমাত্র রব এবং বিধানদাতা হিসেবে মানতে হলে কুরআনের মাধ্যমেই মানতে হবে।

বিচারের দিন প্রশ্ন করা হবে কেবল কুরআন সম্পর্কে /একমাত্র আল-কুরআন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে:

কিয়ামতের দিন বা দুনিয়ার বিচার ফয়সালা—সবকিছুর ভিত্তি হবে একমাত্র এই কিতাব।

সুরা আয-যুখরুফ, আয়াত ৪৪:
"নিশ্চয়ই এটি (কুরআন) তোমার জন্য এবং তোমার কওমের জন্য উপদেশ। আর শীঘ্রই তোমাদেরকে (এই কিতাব সম্পর্কে) জিজ্ঞাসা করা হবে।"

অনুধাবন: পরকালে জিজ্ঞাসাবাদের সিলেবাস হলো কুরআন। অন্য কোনো কিতাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে না।

সুরা আল-কাহফ, আয়াত ২৭:
তোমার প্রতি তোমার রবের যে কিতাব ওহি করা হয়েছে, তা তিলাওয়াত কর। তাঁর বাক্য পরিবর্তন করার কেউ নেই এবং তুমি তিনি ছাড়া আর কোনো আশ্রয়স্থল পাবে না।"

বিচার ফয়সালা কেবল ‘নাজিলকৃত’ বিধান দিয়েই হতে হবে/বিচার-ফয়সালার জন্য ‘সত্যসহ’ নাজিলকৃত কিতাব

জীবনের যেকোনো মতবিরোধ বা বিচার কার্যে ফয়সালা হতে হবে কেবল নাজিলকৃত ওহির মাধ্যমে। অন্য কোনো উৎস থেকে ফয়সালা নেওয়া যাবে না।

সুরা আল-মায়েদা, আয়াত ৪৮:
"...অতএব আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সে অনুযায়ী তাদের বিচার-ফয়সালা করো এবং তোমার কাছে যে সত্য এসেছে তা ত্যাগ করে তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না..."

সুরা আল-মায়েদা, আয়াত ৪৯:
"আর (আমি আদেশ করছি যে) আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, তুমি সে অনুযায়ী তাদের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করো, তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না এবং তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকো, যেন আল্লাহ যা তোমার প্রতি নাজিল করেছেন, তার কোনো কিছু থেকে তারা তোমাকে বিচ্যুত করতে না পারে..."

অনুধাবন: এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে, ‘যা নাজিল করা হয়েছে’ (কুরআন) তা-ই চূড়ান্ত মানদণ্ড। এর বাইরে গিয়ে কারো মনগড়া মত বা সমাজের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী বিচার করা আল্লাহর নির্দেশের অমান্য।

মানুষের মতবিরোধ নিরসনের জন্য আল্লাহ সত্যসহকারে এই কিতাব পাঠিয়েছেন:

সুরা আন-নিসা, আয়াত ১০৫:
"নিশ্চয়ই আমি তোমার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাজিল করেছি (আনজালনা ইলাইকাল কিতাবা), যাতে তুমি মানুষের মধ্যে বিচার-ফয়সালা কর যা আল্লাহ তোমাকে দেখিয়েছেন সে অনুযায়ী..."

অনুধাবন: বিচারক বা শাসকের জন্য সংবিধান হলো এই ‘আল-কিতাব’। অন্য কোনো গ্রন্থকে বিচারের মানদণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।

সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২১৩:
"...অতঃপর আল্লাহ সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে নবীদের পাঠালেন এবং তাদের সাথে সত্যসহ কিতাব নাজিল করলেন (আনজালা মা'আহুমুল কিতাবা), যাতে মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন যে বিষয়ে তারা মতবিরোধ করত..."
অনুধাবন: এখানেও ‘আল-কিতাব’ শব্দটি একবচনে এসেছে। অর্থাৎ সকল নবীর মূল মিশন ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা কিতাবের মাধ্যমে ফয়সালা করা।

আল-কুরআন আহসানুল হাদিস যা বেষ্ট অব দি বেষ্ট  কিতাব:

আল্লাহ এই কিতাবকে ‘আহসানাল হাদিস’ বা উত্তম বাণী বলেছেন এবং এটি একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ গ্রন্থ।

সুরা আয-যুমার, আয়াত ২৩:
"আল্লাহ নাজিল করেছেন উত্তম হাদিস, একটি কিতাব (কিতাবান) যা পরস্পরে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বারবার পঠিত..."

অনুধাবন: আল্লাহ নিজেই তাঁর নাজিলকৃত ওহিকে ‘কিতাবান’ (একটি কিতাব) হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন যা স্ববিরোধিতায় মুক্ত এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ।

‘আল-ফুরকান’ (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী একটি মানদণ্ড):

আল্লাহ তায়ালা এই কিতাবকে ‘আল-ফুরকান’ নামে অভিহিত করেছেন। ফুরকান অর্থ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী। এটি বহুবচনে নয়, একবচনে নাজিল হয়েছে।

সুরা আল-ফুরকান, আয়াত ১:
"বরকতময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ‘ফুরকান’ (সত্য-মিথ্যার মানদণ্ড) নাজিল করেছেন, যাতে তিনি বিশ্ববাসীর জন্য সতর্ককারী হতে পারেন।"

অনুধাবন: এখানে ‘নাজ্জালা’ (নাজিল করেছেন) ক্রিয়াপদের সাথে ‘আল-ফুরকান’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, রাসুল (সা.)-এর প্রতি নাজিলকৃত চূড়ান্ত মানদণ্ড একটিই, আর তা হলো এই কুরআন।

এর আগে রাসুল (সা.) ‘কিতাব’ জানতেন না (অর্থাৎ এই একটিই তাঁর কিতাব):

আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই কুরআন নাজিল হওয়ার আগে আল্লাহর নবী কিতাব বা ঈমানের বিস্তারিত বিবরণ জানতেন না। এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল এই একটি কিতাবই পেয়েছেন।

সুরা আশ-শূরা, আয়াত ৫২:
"আর এভাবেই আমি তোমার প্রতি আমার নির্দেশ থেকে ‘রুহ’ (ওহি/কুরআন) ওহি করেছি। তুমি জানতে না ‘কিতাব’ কী এবং ঈমান কী। কিন্তু আমি একে (কুরআনকে) বানিয়েছি ‘নূর’ (আলো), যার মাধ্যমে আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হেদায়েত দান করি..."

অনুধাবন: এই আয়াতে ওহিকে ‘রুহ’ (আত্মা/প্রাণ) বলা হয়েছে। এবং বলা হয়েছে, এর আগে তিনি ‘আল-কিতাব’ জানতেন না। অর্থাৎ তাঁর নবুওয়াতী জীবনের একমাত্র সম্বল ও জ্ঞানভাণ্ডার হলো এই নাজিলকৃত কিতাব।

আল-বাইল’ বা সুস্পষ্ট দলিল:

আল্লাহর রাসুল (সা.) ঘোষণা করেছেন যে তিনি তাঁর রবের পক্ষ থেকে আসা একটি স্পষ্ট দলিলের (বায়্যিনাহ) ওপর আছেন।

সুরা আল-আনআম, আয়াত ৫৭:
"বল, ‘নিশ্চয় আমি আমার রবের পক্ষ থেকে আসা সুস্পষ্ট প্রমাণ বা দলিলের (বায়্যিনাহ) ওপর আছি, আর তোমরা তা অস্বীকার করেছ...’"

অনুধাবন: এখানে ‘বায়্যিনাহ’ (সুস্পষ্ট দলিল) বলতে ওহির জ্ঞান বা কুরআনকে বোঝানো হয়েছে। তিনি একাধিক দলিলের কথা বলেননি, বরং একটি সুনির্দিষ্ট ভিত্তির কথা বলেছেন।

অন্য কোনো কিতাব আনার চ্যালেঞ্জ:

যদি কুরআনের বাইরে অন্য কোনো কিতাব বা দলিল অনুসরণীয় হতো, তবে আল্লাহ মুশরিকদের চ্যালেঞ্জ দিতে গিয়ে অন্য কিতাব আনতে বলতেন না।

সুরা আল-ক্বালাম, আয়াত ৩৭-৩৮:
"তোমাদের জন্য কি কোনো কিতাব আছে, যাতে তোমরা পাঠ করছ—যে, নিশ্চয় তাতে তোমাদের জন্য তা-ই রয়েছে যা তোমরা পছন্দ কর?"

অনুধাবন: আল্লাহ ব্যঙ্গাত্মকভাবে প্রশ্ন করছেন—তোমরা যে মনগড়া কথা বলছ, তোমাদের কাছে কি অন্য কোনো আসমানি কিতাব আছে? এর অর্থ হলো—আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত কিতাব একটাই, আর সেটি হলো কুরআন। এর বাইরে অন্য কোনো কিতাব নেই যেখানে আল্লাহর বিধান পাওয়া যাবে।

সুরা ফাতির, আয়াত ৪০:
"...নাকি আমি তাদেরকে (কুরআন ছাড়া অন্য) কোনো কিতাব দিয়েছি, ফলে তারা তার (সেই কিতাবের) স্পষ্ট প্রমাণের ওপর আছে?..."

অনুধাবন: আল্লাহ এখানে অন্য কোনো কিতাব দেওয়ার বিষয়টি নাকচ করে দিচ্ছেন।

মানুষের জন্য ‘একটি’ স্পষ্ট ঘোষণা (বায়ান):

এই কুরআনকে আল্লাহ মানবজাতির জন্য ‘বায়ান’ বা স্পষ্ট ঘোষণা বলেছেন।
সুরা আলে-ইমরান, আয়াত ১৩৮:

"এটি (কুরআন) মানুষের জন্য সুস্পষ্ট ঘোষণা (বায়ান) এবং মুত্তাকীদের জন্য হেদায়েত ও উপদেশ।"

অনুধাবন: ‘হাজা’ (এটি) বলে কুরআনকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এটিই মানবজাতির জন্য আল্লাহর চূড়ান্ত ইশতেহার।

‘মুহাইমিন’ বা সব কিতাবের রক্ষক ও সত্যয়নকারী:

এই কিতাবটি নাজিল হওয়ার পর পূর্বের সব কিতাবের বিধান রহিত হয়ে গেছে এবং এটিই এখন একমাত্র কর্তৃত্বশীল কিতাব।

সুরা আল-মায়েদা, আয়াত ৪৮:
"আর আমি তোমার প্রতি কিতাবটি (আল-কিতাব) সত্যসহ নাজিল করেছি, যা তার পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যয়নকারী এবং তার ওপর তদারককারী বা রক্ষক (মুহাইমিন)..."

অনুধাবন: এই কুরআন পূর্বের সব কিতাবের ওপর ‘মুহাইমিন’ (কর্তৃত্বশীল/সংরক্ষণকারী)। সুতরাং এখন অনুসরণ কেবল এই একটি কিতাবেরই হবে, কারণ এটিই চূড়ান্ত সংস্করণ।

আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ‘হাদিস’ (কথা/বাণী) মানা যাবে কি?

কুরআনে ‘হাদিস’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে এবং আল্লাহ প্রশ্ন করেছেন, কুরআনের পরে তারা আর কোন ‘হাদিস’ বা কথায় ঈমান আনবে?
সুরা আল-জাসিয়া, আয়াত ৬:

"এগুলো আল্লাহর আয়াত, যা আমি তোমার নিকট যথাযথভাবে আবৃত্তি করছি। অতএব, আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পর তারা আর কোন হাদিসে (কথায়) ঈমান আনবে?"
অনুধাবন: এখানে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আল্লাহর আয়াত (কুরআন) শোনার পর আর কোনো হাদিস বা কথার ওপর বিশ্বাস স্থাপনের সুযোগ নেই।

সুরা আল-মুরসালাত, আয়াত ৫০:
"অতঃপর এই কুরআনের পর তারা আর কোন কথার (হাদিসের) প্রতি ঈমান আনবে?"
সুরা আল-আরাফ, আয়াত ১৮৫:

"...এরপর তারা আর কোন কথার (হাদিসের) প্রতি ঈমান আনবে?"

একটি কিতাবই কি যথেষ্ট নয়?

অনেকে প্রশ্ন তোলেন, শুধু নাজিলকৃত কিতাব দিয়ে কি জীবন চলবে? এর উত্তরে আল্লাহ বলেন:

আল্লাহ তায়ালা সেই সব লোকদের প্রশ্ন করেছেন যারা এই এক কিতাবের বাইরে অলৌকিক নিদর্শন বা অন্য তথ্যের সন্ধান করে। আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, এই একটি কিতাবই যথেষ্ট।

সুরা আল-আনকাবুত, আয়াত ৫১:
"তাদের জন্য কি এটি যথেষ্ট নয় যে, আমি তোমার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি (আনজালনা আলাইকাল কিতাবা), যা তাদের নিকট পাঠ করা হয়? নিশ্চয় এতে মুমিন কওমের জন্য রহমত ও উপদেশ রয়েছে।"

অনুধাবন: আল্লাহ এখানে প্রশ্নবোধক বাক্যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন। ‘আনজালনা আলাইকাল কিতাবা’ (আমি তোমার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি)—এই অংশটি প্রমাণ করে যে, রাসুলের কাছে রক্ষিত ও পঠিত এই কিতাবটিই উম্মতের হেদায়েতের জন্য এককভাবে যথেষ্ট।

আল্লাহ নিজেই সার্টিফিকেট দিচ্ছেন যে, তিনি যা নাজিল করেছেন (এই কিতাব), তা হেদায়েতের জন্য যথেষ্ট।

মানুষকে উপদেশ ও সতর্ক করতে হবে কেবল কুরআন দিয়ে:

আল্লাহ রাসুল (সা.)-কে নির্দেশ দিয়েছেন অন্য কোনো কিতাব বা কথা দিয়ে নয়, বরং এই কুরআন দিয়েই যেন মানুষকে উপদেশ দেওয়া হয় এবং জিহাদ (প্রচেষ্টা) করা হয়।

সুরা ক্বাফ, আয়াত ৪৫:
"তারা যা বলে সে সম্পর্কে আমি সম্যক অবগত। আর তুমি তাদের উপর জবরদস্তিকারী নও। অতএব, যে আমার ধমককে ভয় করে, তাকে কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দাও।"

অনুধাবন: উপদেশের মাধ্যম হিসেবে আল্লাহ সুনির্দিষ্টভাবে ‘বিল-কুরআন’ (কুরআন দ্বারা) শব্দ ব্যবহার করেছেন।

সুরা আল-ফুরকান, আয়াত ৫২:
"অতএব তুমি কাফিরদের আনুগত্য করো না এবং তুমি এর (কুরআনের) সাহায্যে তাদের সাথে কঠোর সংগ্রাম (জিহাদ) কর।"

অনুধাবন: এখানে ‘বিহি’ (এর দ্বারা) সর্বনামটি কুরআনের দিকে ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ আদর্শিক লড়াই বা প্রচারের হাতিয়ার একমাত্র কুরআন।

সুরা আল-আনআম, আয়াত ১৯ (পুনরাবৃত্তি):
"...এবং আমার প্রতি এই কুরআন ওহি করা হয়েছে, যেন আমি এর মাধ্যমে (বিহি) তোমাদেরকে সতর্ক করতে পারি..."

মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি নাজিলকৃত বিষয়ই একমাত্র ‘হক’ বা সত্য:

আল্লাহ তায়ালা সুরা মুহাম্মদে স্পষ্ট করেছেন যে, রাসুল (সা.)-এর প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, সেটাই ‘আল-হক’ এবং এর অনুসরণ করাই মুমিনদের কাজ। বিপরীতে কাফেররা ‘বাতিল’-এর অনুসরণ করে।

সুরা মুহাম্মদ, আয়াত ২-৩:
আর যারা ঈমান আনে, সৎকর্ম করে এবং মুহাম্মদের প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে তার ওপর ঈমান আনে—আর তা-ই তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য (আল-হক)—আল্লাহ তাদের মন্দ কাজগুলো মুছে দেন এবং তাদের অবস্থা সংশোধন করে দেন।"

"এটা এ জন্য যে, যারা কুফরি করেছে তারা বাতিলের অনুসরণ করেছে, আর যারা ঈমান এনেছে তারা তাদের রবের পক্ষ থেকে আগত সত্যের (আল-হক) অনুসরণ করেছে। এভাবেই আল্লাহ মানুষের জন্য তাদের দৃষ্টান্তসমূহ বর্ণনা করেন।"

অনুধাবন: এখানে দুটি পক্ষ—মুমিন এবং কাফের। মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হলো তারা ‘হক’-এর অনুসরণ করে। আর সেই ‘হক’ কী? আয়াত ২-এ সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে: "মুহাম্মদের প্রতি যা নাজিল করা হয়েছে" অর্থাৎ আল-কুরআন। পক্ষান্তরে, এর বাইরে যা কিছু আছে, আল্লাহ তাকে ‘বাতিল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

২. সত্য (কুরআন) আসার পর বাতিলের বিলুপ্তি এবং কুরআনের নিরাময় ক্ষমতা:

সুরা বনি ইসরাঈলে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, এই সত্য (কুরআন) আসার পর বাতিল টিকে থাকতে পারে না। এবং এই সত্য কিতাবই মুমিনদের জন্য আরোগ্য।

সুরা বনি ইসরাঈল (আল-ইসরা), আয়াত ৮১-৮২:
"আর বল, ‘সত্য (আল-হক) এসেছে এবং বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয় বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল’।" আর আমি কুরআনে এমন কিছু নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য শিফা (নিরাময়) ও রহমত; আর তা জালিমদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে।"

৩. আয়াতগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক (Justification):
‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’ পদ্ধতিতে আয়াত ৪৭:২-৩ এবং ১৭:৮১-৮২ এর সংযোগ নিম্নরূপ:

‘হক’ বা সত্যের পরিচয়: সুরা মুহাম্মদের ২ নং আয়াতে বলা হয়েছে, মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি নাজিলকৃত কিতাবই হলো ‘আল-হক’। আবার সুরা বনি ইসরাঈলের ৮১ নং আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘সত্য (আল-হক) এসেছে’। অর্থাৎ, এই কুরআন আসাই হলো সত্যের আগমন।

বাতিলের অনুসরণ বনাম বাতিলের বিলুপ্তি: সুরা মুহাম্মদের ৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে, কাফেররা ‘বাতিলের’ অনুসরণ করে। আর সুরা বনি ইসরাঈলের ৮১ নং আয়াতে বলা হয়েছে, সত্য (কুরআন) আসার কারণে ‘বাতিল’ অপসারিত হয়েছে। সুতরাং, মুমিনরা যখন কুরআনের অনুসরণ করে, তখন তারা মূলত বাতিলকে প্রত্যাখ্যান করে সত্যকে গ্রহণ করে।

অনুসরণ ও ফলাফল: সুরা মুহাম্মদে বলা হয়েছে, সত্যের (কুরআনের) অনুসরণ করলে আল্লাহ পাপ মোচন করেন এবং অবস্থা ভালো করে দেন। এর সমর্থনে সুরা বনি ইসরাঈলের ৮২ নং আয়াতে বলা হয়েছে, এই কুরআন মুমিনদের জন্য ‘শিফা’ (নিরাময়) ও ‘রহমত’।

একমাত্র মহাসত্য আল-কুরআন: যার সামনে বা পেছনে কোনো বাতিল নেই:

আল্লাহ তায়ালা আল-কুরআনকে এমন এক সুরক্ষিত ও চূড়ান্ত কিতাব হিসেবে ঘোষণা করেছেন, যার মধ্যে মিথ্যা বা বাতিলের কোনো অনুপ্রবেশ সম্ভব নয়—না অতীত থেকে, না ভবিষ্যৎ থেকে। অর্থাৎ, এর বিধান অপরিবর্তনীয় এবং এর পরে অন্য কোনো কিতাব দ্বীনের উৎস হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে না।

সুরা ফুসসিলাত, আয়াত ৪১-৪২:
নিশ্চয় যারা উপদেশ (কুরআন) আসার পর তা অস্বীকার করে (তাদের শাস্তি অবধারিত); আর এটি অবশ্যই এক সম্মানিত ও পরাক্রমশালী কিতাব (কিতাবুন আযীয)।" বাতিল এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না—না এর সামনে থেকে, না এর পেছন থেকে। এটি প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত সত্তার পক্ষ থেকে নাজিলকৃত।"

আয়াতের অনুধাবন ও তাৎপর্য

১. বাতিল অনুপ্রবেশ করতে পারে না: ‘লা ইয়া’তিহিল বাতিলু’ (বাতিল এতে আসতে পারে না)। এর অর্থ হলো, এই কিতাবের কোনো অংশ ভুল প্রমাণ করা যাবে না, এর কোনো বিধান বাতিল করা যাবে না এবং এতে মানুষের কোনো কথা মিশ্রিত করা যাবে না।

2. সামনে ও পেছন থেকে (মীম বাইনি ইয়াদাইহি ওয়া মিন খালফিহি):

* সামনে থেকে: অর্থাৎ এই কিতাব নাজিল হওয়ার সময় বা এর সমসাময়িক কেউ এর বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি দাঁড় করাতে পারেনি বা এতে মিথ্যা ঢোকাতে পারেনি।

* পেছন থেকে (ভবিষ্যৎ): কিয়ামত পর্যন্ত ভবিষ্যতে কেউ এমন কোনো কিতাব রচনা করতে পারবে না যা এই কুরআনের সত্যতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে বা এর বিধানকে রহিত করতে পারে। আল্লাহ নিজেই এর সংরক্ষক। এর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য আয়াত (সমর্থনমূলক) এই আয়াতটির অর্থ আরও পরিষ্কার হয় যখন আমরা দেখি আল্লাহ অন্য আয়াতে বলছেন যে, তাঁর বাণীর কোনো পরিবর্তনকারী নেই এবং এর পরে অন্য কোনো কথার ওপর ঈমান আনা যাবে না।


সুরা আল-কাহফ, আয়াত ২৭:
"তোমার প্রতি তোমার রবের যে কিতাব ওহি করা হয়েছে, তা তিলাওয়াত কর। তাঁর বাক্য (বাণী) পরিবর্তন করার কেউ নেই..."

অনুধাবন: যদি ভবিষ্যতে কেউ নতুন কোনো কিতাব বা বিধান আনার দাবি করে, তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ আল্লাহর বাণী পরিবর্তনের ক্ষমতা কারো নেই।


সুরা আল-মুরসালাত, আয়াত ৫০:
"অতঃপর এই কুরআনের পর তারা আর কোন কথার (হাদিসের) প্রতি ঈমান আনবে?"

অনুধাবন: কুরআনের পরে (পেছনে) অন্য কোনো কথা বা কিতাবকে দ্বীনের উৎস হিসেবে মানা যাবে না। কারণ ‘এর পেছনে কোনো বাতিল নেই’ মানে এর পরে আর কোনো নতুন বিধান আসবে না যা এটাকে রিপ্লেস বা পরিবর্তন করবে।

সিদ্ধান্ত:
সুরা ফুসসিলাতের ৪২ নম্বর আয়াত এবং আনুষঙ্গিক আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে:

১. আল-কুরআন চূড়ান্তভাবে সংরক্ষিত এবং মহাসত্য।
২. এর আগে বা পরে কোনো ‘বাতিল’ বা মিথ্যা একে স্পর্শ করতে পারবে না।
৩. ভবিষ্যতে কেউ যদি দ্বীনের নামে অন্য কোনো কিতাব রচনা করে বা অনুসরণ করে, তবে তা আল্লাহর কাছে প্রত্যাখ্যাত, কারণ কুরআনের সত্যতা ও কর্তৃত্ব চিরস্থায়ী এবং এর কোনো বিকল্প নেই।

চূড়ান্ত সারসংক্ষেপ (Final Conclusion):

‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’ বা কুরআনের নিজস্ব বক্তব্যের আলোকে ১০০% অথেনটিক সিদ্ধান্ত:

১. নাজিলকৃত কিতাব সংখ্যায় একটি—আল-কুরআন: আল্লাহ তায়ালা ‘কিতাবুন’ (একটি কিতাব) নাজিল করেছেন, বহু কিতাব নয়। (রেফারেন্স: সূরা সাদ ৩৮:২৯, সূরা আল-আরাফ ৭:২)

২. অন্য কোনো মানব-রচিত কিতাব বা আইন প্রত্যাখ্যাত: দ্বীনের উৎস হিসেবে কুরআনের বাইরে অন্য কোনো কিতাব বা আইন আল্লাহ গ্রহণ করেন না; তা বাতিল। (রেফারেন্স: সূরা আল-ক্বালাম ৬৮:৩৭, সূরা আন-নাজম ৫৩:২৮)

৩. মুমিনদের ক্ষমার একমাত্র গাইডবুক: ক্ষমা ও হেদায়েতের জন্য অনুসরণীয় একমাত্র কিতাব হলো কুরআন। (রেফারেন্স: সূরা আল-আরাফ ৭:৩, সূরা আল-আনআম ৬:১৫৫)

৪. কুরআনের বাইরে ওহি বা বাধ্যতামূলক নির্দেশনা নেই: আল্লাহ যা ওহি করেছেন তা এই কুরআনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।  (রেফারেন্স: সূরা আল-আনআম ৬:১৯, সূরা ইউসুফ ১২:৩)

৫. রাসুল (সা.)-এর আজীবন আমল: তিনি আজীবন কেবল কুরআনেরই অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করেছেন। (রেফারেন্স: সূরা আল-আহকাফ ৪৬:৯, সূরা ইউনুস ১০:১৫)

৬. উম্মতের প্রতি নির্দেশ: উম্মতকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কেবল আল্লাহর রজ্জু বা এই কুরআনকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে। (রেফারেন্স: সূরা আলে-ইমরান ৩:১০৩, সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:৪৩)

৭. অতিরিক্ত শরীয়াহ তৈরি করা শিরক: আল্লাহর বিধানের বাইরে অতিরিক্ত শরীয়াহ বা বিধান তৈরি করা শিরক এবং অবৈধ। (রেফারেন্স: সূরা আশ-শূরা ৪২:২১) 

“এই কিতাব (কুরআন) কি তাদের জন্য যথেষ্ট নয়?” (সূরা আল-আনকাবুত: ২৯:৫১)—এই প্রশ্নটিই সব বিতর্কের অবসান ঘটায়।


নাজিলকৃত ওহি কী? = একমাত্র ‘আল-কুরআন’।  (রেফারেন্স: সূরা আল-আনআম ৬:১৯, সূরা ইউসুফ ১২:৩, সূরা আশ-শূরা ৪২:৭)

২. অনুসরণ করতে হবে কী? = যা ওহি করা হয়েছে (কুরআন)। (রেফারেন্স: সূরা আল-আনআম ৬:৫০, সূরা আল-আহকাফ ৪৬:৯)

৩. রাসুল (সা.)-এর দায়িত্ব কী ছিল? = ওহির অনুসরণ করা এবং সেই ওহি পৌঁছে দেওয়া। (রেফারেন্স: সূরা ইউনুস ১০:১৫, সূরা আল-আহযাব ৩৩:২)

৪. প্রচার ও উপদেশের মাধ্যম কী? = একমাত্র আল-কুরআন। (রেফারেন্স: সূরা ক্বাফ ৫০:৪৫, সূরা আল-ফুরকান ২৫:৫২)

সিদ্ধান্ত: কুরআনের দৃষ্টিতে আল্লাহ তাঁর রাসুলকে একমাত্র কুরআনই দিয়েছেন, তিনি একমাত্র কুরআনই মেনে চলেছেন এবং উম্মতকে একমাত্র কুরআন আঁকড়ে ধরারই নির্দেশ দিয়ে গেছেন।


আল্লাহ, রাসুল ও উম্মতের সম্পর্ক:

১. আল্লাহ রাসুলকে সুনির্দিষ্টভাবে ‘আল-কুরআন’ দিয়েছেন। (রেফারেন্স: সূরা আন-নামল ২৭:৬)

২. যা কিছু নাজিল হয়েছে (কুরআন), তার সবটাই তিনি উম্মতের কাছে পৌঁছে দিতে আদিষ্ট ছিলেন। (রেফারেন্স: সূরা আল-মায়েদা ৫:৬৭)

৩. রাসুল (সা.) এবং উম্মতের জন্য অনুসরণীয় একমাত্র পথ হলো এই কিতাব; অন্য সব পথ বর্জনীয়। (রেফারেন্স: সূরা আল-আনআম ৬:১৫৩)

৪. তিনি যা মেনে চলতেন, তা কেবলই ‘ওহি’ বা কুরআন। (রেফারেন্স: সূরা আল-আনআম ৬:৫০)

সিদ্ধান্ত: আল্লাহর ওহি, রাসুলের প্রচার এবং আমাদের অনুসরণ—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু একমাত্র আল-কুরআন।


সারসংক্ষেপ: কিতাবের সংখ্যা ও মর্যাদা:

১. আল্লাহ রাসুল (সা.)-এর প্রতি যা নাজিল করেছেন তাকে ‘কিতাবুন’ (একটি কিতাব) বা ‘আল-কিতাব’ (সেই নির্দিষ্ট কিতাব) বলে সম্বোধন করেছেন। (রেফারেন্স: সূরা আল-আরাফ ৭:২, সূরা আল-বাকারা ২:২)

২. এই কিতাব নাজিল করাই মুমিনদের জন্য যথেষ্ট বলে ঘোষণা করা হয়েছে। (রেফারেন্স: সূরা আল-আনকাবুত ২৯:৫১)

৩. বিচার ফয়সালার মানদণ্ড হিসেবে এই এক কিতাবকেই নির্ধারণ করা হয়েছে। (রেফারেন্স: সূরা আন-নিসা ৪:১০৫)

সিদ্ধান্ত: আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত, রাসুল (সা.)-এর প্রতি ওহিকৃত এবং উম্মতের জন্য অনুসরণীয় গ্রন্থ বহু নয়, বরং একটিমাত্র কিতাব—আল-কুরআন।


আল্লাহ ‘কিতাবুন’ (একটি কিতাব) নাজিল করেছেন। (রেফারেন্স: সূরা ফুসসিলাত ৪১:৩)

২. সেই কিতাবটিই হলো ‘আল-কুরআন’। (রেফারেন্স: সূরা হুদ ১১:১)

৩. ওহির বিষয়বস্তু হলো এই ‘সত্য কিতাব’। (রেফারেন্স: সূরা ফাতির ৩৫:৩১)

৪. মুক্তি পেতে হলে এই ‘একটি কিতাব’-কেই শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে। (রেফারেন্স: সূরা আল-আরাফ ৭:১৭০)

সিদ্ধান্ত: ‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’ অনুযায়ী—আল্লাহর বিধান, রাসুলের ওহি এবং মুমিনের পাথেয়—সবকিছুই এই এক কিতাবকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত।


এটি একমাত্র ‘ফুরকান’ বা সত্য-মিথ্যার মানদণ্ড। (রেফারেন্স: সূরা আল-ফুরকান ২৫:১)

২. এটিই সেই ‘রুহ’ বা ওহি, যা ছাড়া রাসুল (সা.) কিতাব বা ঈমান সম্পর্কে জানতেন না। (রেফারেন্স: সূরা আশ-শূরা ৪২:৫২)

৩. আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য অন্য কোনো কিতাব নেই। (রেফারেন্স: সূরা আল-ক্বালাম ৬৮:৩৭)

৪. এটিই একমাত্র ‘বায়ান’ বা সুস্পষ্ট ঘোষণা। (রেফারেন্স: সূরা আলে-ইমরান ৩:১৩৮)

৫. এটি অন্য সব কিতাবের ওপর ‘মুহাইমিন’ বা কর্তৃত্বশীল ও সংরক্ষক। (রেফারেন্স: সূরা আল-মায়েদা ৫:৪৮)

সিদ্ধান্ত: কুরআনের পাতায় পাতায় এই সাক্ষ্যই ছড়িয়ে আছে যে—নাজিলকৃত কিতাব একটি, অনুসরণীয় বিধান একটি এবং রাসুল (সা.)-এর পথও ছিল এই একটি কিতাবকেন্দ্রিক।


সতর্ক করার একমাত্র মাধ্যম ‘ওহি’। (রেফারেন্স: সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৪৫)

২. এটিই একমাত্র ‘আরবি বিধান’ বা আইন। (রেফারেন্স: সূরা আর-রা’দ ১৩:৩৭)

৩. রাসুলের সাথে পাঠানো ‘নূর’ বা আলোর অনুসরণই মুক্তির পথ। (রেফারেন্স: সূরা আল-আরাফ ৭:১৫৭)

৪. মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি যা নাজিল হয়েছে, তা-ই একমাত্র ‘হক’ বা সত্য। (রেফারেন্স: সূরা মুহাম্মদ ৪৭:২)

  • আল্লাহ ‘কিতাবুন’ (একটি কিতাব) নাজিল করেছেন।

  • সেই কিতাবটিই গবেষণার (তাদাব্বুর) একমাত্র বিষয়বস্তু।

  • এই কিতাবটিই সত্য এবং সত্যয়নকারী হিসেবে এসেছে।

  • এটি আরবি ভাষায় নাজিলকৃত ‘একটি কুরআন’

সুতরাং, দ্বীনের উৎস এবং অনুসরণীয় গ্রন্থ হিসেবে আল-কুরআন সংখ্যায় এক, মর্যাদায় অদ্বিতীয় এবং আল্লাহ প্রদত্ত একমাত্র বিধান।


Post a Comment (0)
Previous Post Next Post