💠 হিকমা কী ও ইলম বা জ্ঞান কী? হিকমা কি অনাযিলকৃত বিষয় না মানুষের রচিত? (Knowledge & Hikmah) —আল-কোরআনের আলোকে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

💠ইলম ও হিকমা: কী, কেন ও কোথা থেকে? — আল-কোরআনের আলোকে তাত্ত্বিক অনুসন্ধান:

💠 হিকমা ও ইলমপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কারা?

💠আমি চাইব কীভাবে? দুআ ও দাওয়াহ!

আল-কোরআনের বহু আয়াতে (যেমন ৬২:২, ৩৩:৩৪) ‘হিকমাহ’ বা প্রজ্ঞার কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রচলিত ধারণায় অনেকেই মনে করে থাকেন ‘হিকমাহ’ আল-কোরআনের বাইরের আলাদা কোনো উৎস বা মানুষের রচিত কোনো বিষয়।  কিন্তু আল-কোরআন নিজেই দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করে যে, হিকমাহ কোনো মানব রচিত বিষয় নয়; বরং এটিও আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘নাযিলকৃত’ বা অবতীর্ণ ওহী, যা আল-কোরআনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।

‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’ (কোরআন দিয়ে কোরআনের ব্যাখ্যা) পদ্ধতি অনুসরণ করলে হিকমাহ সম্পর্কে যে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

আল-কোরআনের আয়াতসমূহ ‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’ পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করলে ‘জ্ঞান’ (ইলম) এবং হিকমাহ’ (প্রজ্ঞা)-এর মধ্যে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যদিও অনেক ক্ষেত্রে শব্দ দুটি পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়েছে, তবুও আল্লাহর কালামের ব্যবহারশৈলী প্রমাণ করে যে, দুটির মর্মার্থ ও কার্যকারিতা ভিন্ন।

নিচে আল-কোরআনের আয়াতের আলোকে এই পার্থক্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:


🧠 জ্ঞান (ইলম) কী?  

আর 

💡হিকমাহ (প্রজ্ঞা) কী? -আল-কোরআনের সংজ্ঞা

কোরআনের আয়াত ও আগের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ‘ইলম’ এবং ‘হিকমাহ’-এর যে গভীর অর্থ ফুটে উঠেছে, ইংরেজিতে তার ভাবার্থ প্রকাশ করতে হলে নিচের পরিভাষাগুলো (Terminology) ব্যবহার করা সবচেয়ে যথার্থ হবে:

🧠 জ্ঞান (Ilm: Knowledge / True Knowledge):

Divine Knowledge: (আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত জ্ঞান) Revealed Information: (ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য) Cognizance of Truth: (সত্য সম্পর্কে নিশ্চিত সচেতনতা) The Theory / The Text: (মূল পাঠ বা তাত্ত্বিক জ্ঞান)

💡হিকমাহ (Wisdom / Practical Wisdom:

‘হিকমাহ’ শব্দটি সাধারণ Wisdom-এর চেয়েও গভীর। আল-কোরআনের আয়াত অনুযায়ী ইংরেজিতে এর ভাবার্থ দাঁড়ায়:

Sound Judgment: (সঠিক ফয়সালা করার ক্ষমতা) Deep Insight: (গভীর অন্তর্দৃষ্টি) Prudence: (বিচক্ষণতা বা দূরদর্শিতা) Practical Application: (বাস্তব প্রয়োগ) Moral Philosophy & Law: (নৈতিক দর্শন ও বিধান)


📘 জ্ঞান (ইলম) ও হিকমাহ (প্রজ্ঞা): আল-কোরআনের আলোকে স্বরূপ ও পার্থক্য:

আল-কোরআনের গভীর দর্শনে ‘জ্ঞান’ (ইলম) এবং ‘হিকমাহ’ (প্রজ্ঞা) নিছক দুটি শব্দ নয়; বরং এ দুটি একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে, অনেকটা দেহ ও প্রাণের মতো। হিকমাহর মর্মার্থ বুঝতে হলে প্রথমে জ্ঞানের স্বরূপ বোঝা প্রয়োজন, কারণ জ্ঞানের পূর্ণতাই ঘটে হিকমাহর মাধ্যমে। ‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’ বা আয়াত দিয়ে আয়াতের ব্যাখ্যা পদ্ধতির আলোকে এই দুটি পরিভাষার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।

🧠 জ্ঞান (ইলম) কী? -আল-কোরআনের সংজ্ঞা:

আল-কোরআনের পরিভাষায় ‘ইলম’ বা জ্ঞান হলো কোনো বস্তুর প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটন করা বা কোনো সত্য সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য লাভ করা। এটি হলো হিকমাহর ভিত্তি বা কাঁচামাল। জ্ঞান মূলত তথ্যের ধারক ও বাহক। এটি আল্লাহর নাযিলকৃত বাণী, নিদর্শন বা আয়াতসমূহ জানা। যেমন—আল্লাহ আদম (আ.)-কে সবকিছুর ‘নাম’ শিক্ষা দিয়েছিলেন (সূরা বাকারা ২:৩১); এই নাম বা পরিচয় জানাই হলো জ্ঞান।

জ্ঞান মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে বের করে সত্যের আলোর সন্ধান দেয়। সূরা মুহাম্মাদের ১৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন: “জেনে রাখ (ফ’লাম), আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই...”। এখানে তাওহিদের সত্যটি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়াকেই ‘ইলম’ বলা হয়েছে। এটি মূলত মস্তিষ্ক ও উপলব্ধির বিষয়—যা শোনা, দেখা বা পড়ার মাধ্যমে অর্জিত হয়। সহজ কথায়, আল্লাহর আদেশ কী, নিষেধ কী, জান্নাত-জাহান্নামের খবর—এসব তথ্য জানা ও মনে রাখাই হলো ইলম বা ‘ইনপুট’ (Input)।

💡 হিকমাহ (প্রজ্ঞা) কী? -আল-কোরআনের সংজ্ঞা:

‘হিকমাহ’ শব্দটি আরবি ‘হুকুম’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ফয়সালা করা বা কোনো কিছুকে তার যথাযথ স্থানে স্থাপন করা। জ্ঞান যদি হয় ‘জানা’, তবে হিকমাহ হলো সেই জানাকে সঠিকভাবে ‘বোঝা’ ও ‘প্রয়োগ করা’। এটি গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও বুঝ। হিকমাহ কেবল ওপরের তথ্য নয়, বরং তথ্যের পেছনের কারণ ও উদ্দেশ্য বোঝার নাম। আল্লাহ বলেন, তিনি যাকে হিকমাহ দিয়েছেন, তাকে ‘প্রভূত কল্যাণ’ দিয়েছেন (সূরা বাকারা ২:২৬৯)। অর্থাৎ, জ্ঞান দিয়ে মানুষ তথ্য পায়, আর হিকমাহ দিয়ে মানুষ সেই তথ্যের মর্মার্থ বা ‘নির্যাস’ বের করে।

হিকমাহ হলো সঠিক প্রয়োগের যোগ্যতা। জ্ঞান অর্জন করার পর তা কখন, কোথায়, কীভাবে এবং কতটুকু প্রয়োগ করতে হবে—এই বিচক্ষণতাই হিকমাহ। যেমন, ওহীর বিধান (জ্ঞান) জানা এক বিষয়, আর সেই বিধান নিজের জীবনে, পরিবারে ও সমাজে এমনভাবে বাস্তবায়ন করা যাতে বিশৃঙ্খলা না হয় বরং শান্তি আসে—সেটাই হিকমাহ। সূরা বনি ইসরাইলের ৩৯ নং আয়াতে আমরা দেখেছি, আল্লাহ নৈতিক আচরণ (যেমন: অহংকার না করা, অপব্যয় না করা) কে হিকমাহ বলেছেন। অর্থাৎ, হিকমাহ হলো জ্ঞানের সেই স্তর যা মানুষের চরিত্রকে সুন্দর করে এবং তাকে পশুবৃত্তি থেকে দূরে রাখে। এটি মূলত ‘আউটপুট’ (Output)।

🔗 জ্ঞান ও হিকমাহ: একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক:

কোরআনের আয়াতসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জ্ঞান এবং হিকমাহর সম্পর্কটি অত্যন্ত গভীর এবং একে অপরের পরিপূরক। জ্ঞান হলো ম্যাপ, আর হিকমাহ হলো পথ চলা। জ্ঞান আপনাকে বলে দেয় গন্তব্য কোথায় এবং রাস্তা কোনটি (যেমন: কিতাবের আয়াত)। আর হিকমাহ আপনাকে শেখায় সেই রাস্তায় খানাখন্দ এড়িয়ে, ঝড়-বৃষ্টি মোকাবেলা করে কীভাবে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। জ্ঞান ছাড়া হিকমাহ অসম্ভব, কারণ ভুল তথ্যের ওপর সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। আবার হিকমাহ ছাড়া জ্ঞান অসার, কারণ আমল বা বাস্তবায়ন ছাড়া তথ্য কোনো কাজে আসে না।

আল-কোরআনের আয়াতের আলোকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে ‘কিতাব’ (জ্ঞান) এবং ‘হিকমাহ’ (প্রজ্ঞা)-এর সম্পর্কটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের উপমা এবং সূরা জুমুআর আয়াতের সংমিশ্রণে বিষয়টিকে নিচে আরও ‘শানিত’ ও পরিশীলিতভাবে উপস্থাপন করা হলো:

🩺 চিকিৎসকের উপমা ও কুরআনিক হিকমাহ: একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ:

একটি জরাজীর্ণ দেহকে সুস্থ করতে যেমন কেবল ঔষধের নাম জানাই যথেষ্ট নয়, তেমনি রুগ্ন আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে কেবল কিতাবের বুলি জানাই যথেষ্ট নয়। আল-কোরআনের আলোকে বিষয়টি নিম্নরূপ:

💊 জ্ঞান (ইলম) হলো ঔষধের সমাহার ((Medical Encyclopedia):

একজন ব্যক্তি ফার্মেসির সব ঔষধের নাম মুখস্থ করতে পারেন, কোন ঔষধের কী গ্রুপ তা জানতে পারেন। এটি হলো তার ‘ইলম’ বা জ্ঞান। কিন্তু কার শরীরে, কোন অবস্থায়, কী মাত্রায় সেই ঔষধ প্রয়োগ করলে রোগ সারবে—তা তিনি নাও জানতে পারেন।

🩺 হিকমাহ (প্রজ্ঞা) হলো চিকিৎসার নিপুণতা (Clinical Expertise):

একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক কেবল ঔষধের নাম জানেন না; তিনি রোগীর নাড়ি ধরেন, চোখের ভাষা বোঝেন এবং রোগের গভীরতা মেপে সঠিক ঔষধটি সঠিক মাত্রায় প্রয়োগ করেন। ঔষধ প্রয়োগের এই সূক্ষ্ম বিচারবোধ, কখন ঔষধ খাওয়াতে হবে এবং কখন বন্ধ করতে হবে—এই প্রায়োগিক দক্ষতাই হলো ‘হিকমাহ’। জ্ঞান যদি হয় ‘থিওরি’, হিকমাহ হলো তার সফল ‘প্র্যাকটিস’।

🕌 সূরা জুমুআ (৬২:২)-এর আলোকে সালাতের উদাহরণ: আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা জুমুআতে আল্লাহর রাসুল রাসূল (সা.)-এর দায়িত্বের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন: “তিনিই উম্মীদের মাঝে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন... যে তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে, তাদেরকে পবিত্র করে এবং তাদেরকে ‘কিতাব ও হিকমাত’ শিক্ষা দেয়...” (৬২:২)

এখানে সালাতের উদাহরণটি বিশ্লেষণ করলে ‘কিতাব’ ও ‘হিকমাহ’-এর পার্থক্যটি আয়াতের মাধ্যমেই পরিষ্কার হয়:

📖 কিতাবের শিক্ষা (The Command/Knowledge): আল-কোরআনে আল্লাহ বহুবার আদেশ দিয়েছেন: “আকিমুস সালাহ” (সালাত কায়েম করো)।

এটি হলো ‘কিতাব’ বা ওহীর জ্ঞান। আপনি জানলেন যে, সালাত পড়াকেই হয়তো সালাত কায়েম হয়ে গেল কিন্তু কায়েম আনুষ্ঠানিক ও অআনুষ্ঠানি পদ্ধতিতে কিভাবে সেটা জীবনের সকল ক্ষেত্রে অনুশীলনে স্থাপন করা যায় সেটা জানতে হবে। এটি হলো তথ্যের ‘ইনপুট’। এটি অনেকটা ঔষধের বোতল হাতে পাওয়ার মতো।

⚖️ হিকমাহর শিক্ষা  (The Purpose/ Transformation): 

আল্লাহর রাসূল লোকেদেরকে শুধু রুকু-সিজদাই শেখাননি, বরং সালাতের মাধ্যমে কীভাবে চরিত্র পরিবর্তন করতে হয়, তা শিখিয়েছেন নাযিলকৃত বিধানের মাধ্যমেই। আল-কোরআনেই সালাতের সেই হিকমাহ বা উদ্দেশ্য বর্ণিত হয়েছে সূরা আনকাবুতে: 

“...নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে...” (সূরা আনকাবুত ২৯:৪৫)

এখানে লক্ষ্য করুন—

একজন ব্যক্তি হয়তো নিয়মিত সালাত পড়ছেন (কিতাবের জ্ঞানও অজর্ন করছেন) কিন্তু  রিবা তার জীবনে ছাড়ছেন না বা অশ্লীল কাজ করছেন। তার মানে, তিনি ‘কিতাব’ আয়ত্ত করেছেন ঠিকই, কিন্তু সালাতের ‘হিকমাহ’ (মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার প্রজ্ঞা) অর্জন করতে পারেননি। তার সালাত কেবল শরীরচর্চা হয়েছে, ‘চিকিৎসা’ বা আত্মশুদ্ধি হয়নি।

অপরদিকে, যে ব্যক্তি সালাত আদায়ের সাথে সাথে আল্লাহর ভয়ে যাবতীয় পাপ কাজ ছেড়ে দিলেন এবং বিনয়ী হলেন—তিনিই রাসূলের শেখানো ‘হিকমাহ’ লাভ করলেন। তার কাছে সালাত আর নিছক ‘আদেশ’ নয়, বরং আত্মশুদ্ধির হাতিয়ার। 

🤝 হিকমাহ (প্রজ্ঞা): 

হিকমাহ হলো যাকাত-সাদাকা পরিশোধের মাধ্যমে কিভাবে নিজের জান-মালের পরিশুদ্ধতা অজর্ন করা যায় সেজন্য এমনভাবে দেওয়া যাতে গ্রহীতার আত্মসম্মানে আঘাত না লাগে এবং দাতার মনে অহংকার না আসে। নাযিলকৃত অহীর কিতাব আল-কুরআনে কি দিবে, কাকে দিবা, কতটুক দিবে (দ্র আয়াত ২:২১৯, ২:২১৫, ৭০:২৪-২৫, ৮:৪১, ২:২৭৩..আরও বিশধভাবেন বর্নিত আছে) যেমন আল্লাহ বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা খোঁটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমাদের সদাকাসমূহ নষ্ট করো না...” (সূরা বাকারা ২:২৬৪)

এই যে ‘খোঁটা না দেওয়া’ এবং ‘লোক দেখানো মনোবৃত্তি পরিহার করা’—এটিই হলো যাকাতের হিকমাহ। দান করে যদি কেউ খোঁটা দেয়, তবে সে কিতাবের হুকুম পালন করল বটে, কিন্তু হিকমাহর অভাবে তার সেই আমলটি নষ্ট হয়ে গেল—যেমন ভুল চিকিৎসায় দামী ঔষধেও রোগী মারা যায়।

সুতরাং, আল-কোরআনের আয়াতসমূহ মন্থন করলে যে সারমর্ম পাওয়া যায় তা হলো: ‘কিতাব’ (জ্ঞান) আমাদের হাতে শরীয়তের ‘প্রেসক্রিপশন’ বা ব্যবস্থাপত্র তুলে দেয়।

আর ‘হিকমাহ’ (প্রজ্ঞা) আমাদের শেখায় কীভাবে সেই ব্যবস্থাপত্র মেনে জীবনকে সুস্থ, সুন্দর ও পবিত্র করা যায়।

ডাক্তারের উদাহরণে যেমন—সঠিক ঔষধ (জ্ঞান) এবং সঠিক চিকিৎসা পদ্ধতি (হিকমাহ) ছাড়া রোগ সারে না; তেমনি দ্বীনের ক্ষেত্রে—কোরআনের বিধি-বিধান (কিতাব) এবং তার সঠিক মর্মার্থ ও প্রয়োগ (হিকমাহ) ছাড়া মানুষের হেদায়েত বা মুক্তি সম্ভব নয়।


💠জ্ঞান (ইলম) বনাম হিকমাহ (প্রজ্ঞা): তাত্ত্বিক পার্থক্য:

আল-কোরআনে ‘কিতাব ও হিকমাহ’ অথবা ‘ইলম ও হিকমাহ’ প্রায়শই জোড়ায় জোড়ায় এসেছে। আরবি ব্যাকরণ ও কোরআনের অলঙ্কার শাস্ত্র অনুযায়ী, যখন দুটি ভিন্ন শব্দ ‘এবং’ (ওয়াও) দ্বারা যুক্ত হয়, তখন নির্দেশ করে যে দ্বিতীয়টি প্রথমটি থেকে ভিন্ন বা বিশেষ কিছু। এই মূলনীতির আলোকে পার্থক্যগুলো নিম্নরূপ:

📜 ১. তথ্য বনাম প্রয়োগ (Information vs. Application):

জ্ঞান বা ইলম হলো কোনো বিষয় সম্পর্কে জানা, তথ্য রাখা বা ওহীর টেক্সট (Text) সম্পর্কে অবগত হওয়া। পক্ষান্তরে হিকমাহ হলো সেই অর্জিত জ্ঞানকে সঠিক সময়ে, সঠিক স্থানে এবং সঠিক পদ্ধতিতে প্রয়োগ করার যোগ্যতা। সূরা বাকারার ১২৯ নং আয়াতে ইব্রাহিম (আ.) দোয়া করেছেন: “...আর তিনি তাদের কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেবেন।” এখানে ‘কিতাব’ হলো জ্ঞানের আধার বা সিলেবাস। আর ‘হিকমাহ’ হলো সেই কিতাবের বিধানগুলো কখন এবং কীভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, তার প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞান।

⚖️২. ঘটনা জানা বনাম ফয়সালা করার ক্ষমতা (Case vs. Verdict):

আল-কোরআনে এমন উদাহরণ রয়েছে যেখানে একাধিক ব্যক্তির ‘ইলম’ বা জ্ঞান ছিল, কিন্তু ‘হিকমাহ’ বা ফয়সালার গভীর বুঝ আল্লাহ একজনকে বিশেষভাবে দিয়েছিলেন। সূরা আম্বিয়ার ৭৮-৭৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন: “আর স্মরণ কর দাউদ ও সুলাইমানের কথা, যখন তারা একটি শস্যক্ষেত সম্পর্কে বিচার করছিল... আমি সুলাইমানকে বিষয়টি বুঝিয়ে দিলাম (ফাহহামনা-হা) এবং আমি উভয়কেই ‘হুকুম’ (প্রজ্ঞা/ফয়সালা) ও ‘ইলম’ (জ্ঞান) দান করেছিলাম...” এখানে সালামুন আলা দাউদ এবং সালামুন আলা সুলাইমান—উভয়ই নবী ছিলেন এবং উভয়েরই ‘ইলম’ বা জ্ঞান ছিল। কিন্তু একটি জটিল আইনি সমস্যায় সঠিক ও উত্তম সমাধানটি (Solution) সালামুন আলা সুলাইমান বের করতে পেরেছিলেন। আল্লাহ একে বলেছেন বিশেষ ‘বুঝ’ বা হিকমাহর গভীরতা। সুতরাং, ‘ইলম’ হলো আইনের ধারা জানা, আর ‘হিকমাহ’ হলো সেই আইন ব্যবহার করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা বা জটিলতা নিরসন করা।

💎 ৩. সর্বজনীনতা বনাম বিশেষ নির্বাচন (General vs. Exclusive):

জ্ঞান ভালো এবং মন্দ—উভয় বিষয়ে হতে পারে। যেমন, ফেরেশতারা জাদুর ‘ইলম’ বা জ্ঞান হারুত-মারুতকে পরীক্ষা হিসেবে দিয়েছিল (সূরা বাকারা ২:১০২), যদিও সেই জ্ঞান আমল করা নিষিদ্ধ ছিল। অর্থাৎ, তথ্য হিসেবে কোনো কিছু জানাই ইলম। কিন্তু হিকমাহ সর্বদা কল্যাণকর। হিকমাহ কখনো খারাপ কাজে ব্যবহৃত হতে পারে না। আল্লাহ বলেন: “তিনি যাকে চান হিকমত (প্রজ্ঞা) দান করেন। আর যাকে হিকমত দেয়া হয়েছে, তাকে ‘অনেক কল্যাণ’ (খাইরান কাসিরা) দেয়া হয়েছে...” (সূরা বাকারা ২:২৬৯)। এখানে হিকমাহকে সরাসরি ‘প্রচুর কল্যাণ’-এর সাথে সমার্থক করা হয়েছে। কেউ জাদু জানলে তাকে ‘আলেম’ (জ্ঞানী) বলা যেতে পারে, কিন্তু তাকে কখনোই ‘হাকিম’ (প্রজ্ঞাবান) বলা হয় না। কারণ হিকমাহ মানুষকে কেবল সত্য ও সঠিক পথের দিকেই নিয়ে যায়।

🧩 ৪. থিওরি বনাম নৈতিকতা ও দর্শন (Theory vs. Moral Philosophy):

ইলম হলো বস্তুর স্বরূপ উপলব্ধি করা, যা মস্তিষ্কের খোরাক। আর হিকমাহ হলো আত্মার খোরাক, যা মানুষের আচরণের সাথে সম্পর্কিত। সূরা বনি ইসরাইলের ২২ থেকে ৩৯ নং আয়াতে আল্লাহ হিকমাহর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে পিতামাতার সেবা, আত্মীয়ের হক, মাপে সঠিক দেওয়া ইত্যাদি নৈতিক আচরণের কথা বলেছেন। এরপর তিনি বলেন: “এগুলো হিকমাতের অন্তর্ভুক্ত, যা তোমার রব তোমার প্রতি ওহী করেছেন।” (১৭:৩৯)। অর্থাৎ, আপনি জানলেন যে ‘পিতামাতার সেবা করা ফরজ’—এটা হলো ‘ইলম’। আর আপনি বাস্তবে পিতামাতার সাথে বিনম্র আচরণ করলেন, ধমক দিলেন না এবং বার্ধক্যে তাদের যত্ন নিলেন—এই আচরণটি হলো ‘হিকমাহ’।

🔍 ৫. কিতাব বনাম সুন্নাতিল্লাহ বাস্তবায়ন (Scripture vs. Implementation):

‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’ অনুযায়ী, অনেক আয়াতে ‘কিতাব’ এবং ‘হিকমাহ’ পাশাপাশি এসেছে। এখানে কিতাব হলো আল্লাহর নাযিলকৃত বাণী বা আইন (Law)। আর হিকমাহ হলো সেই আইনের উদ্দেশ্য (Objective) এবং তা বাস্তবায়নের প্রজ্ঞা। যেমন, সূরা জুমুআ ৬২:২ আয়াতে বলা হয়েছে রাসূল (সা.) মানুষকে ‘কিতাব ও হিকমাহ’ শেখান। এর অর্থ হলো, তিনি শুধু কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান না (যা ইলম পৌঁছানো), বরং তিনি হাতে-কলমে শিখিয়ে দেন কীভাবে সালাত-সংযোগ স্থাপন করতে হবে, কীভাবে অহীর অনুসরনে বিচার করতে হবে এবং কীভাবে আয়াতের মর্মার্থ জীবনে ধারণ করতে হবে। এই প্রায়োগিক শিক্ষাই হলো হিকমাহ।


📝 চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সারসংক্ষেপ:

আল-কোরআনের আয়াতসমূহ মন্থন করলে ইলম এবং হিকমাহ-এর মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্যটি ফুটে ওঠে তা হলো—‘ইলম’ (জ্ঞান) হলো পথের সন্ধান জানা। এটি হলো ‘তথ্য’ (Data) এবং ‘উপলব্ধি’ (Awareness); যা কিতাবের শব্দ ও বাক্যের জ্ঞান। অন্যদিকে ‘হিকমাহ’ (প্রজ্ঞা) হলো সেই পথে সঠিকভাবে চলার কৌশল। এটি হলো ‘প্রয়োগ’ (Application) এবং ‘বিচক্ষণতা’ (Insight); যা কিতাবের মর্মার্থ, বিধি-বিধানের সঠিক প্রয়োগ এবং উন্নত নৈতিক চরিত্রের সমন্বয়।

সহজ কথায়, আল-কোরআন নিজেই হলো ‘ইলম’ (সর্বোচ্চ জ্ঞান), আর এই কোরআনকে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রে সঠিক ও সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন করার নামই হলো ‘হিকমাহ’। জ্ঞান চোখ খুলে দেয়, আর হিকমাহ সেই চোখের দৃষ্টিকে স্বচ্ছ ও সুদূরপ্রসারী করে।

হিকমাহ আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘নাযিলকৃত’ (Revealed)

অনেকের ধারণা, কিতাব আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, আর হিকমাহ হলো নবীর নিজস্ব কথা বা অন্য কিছু। কিন্তু কোরআন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে, কিতাব এবং হিকমাহ—উভয়ই আল্লাহ ‘নাযিল’ করেছেন।

আল্লাহর ঘোষণা: আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন-

“...আর স্মরণ কর তোমাদের উপর আল্লাহর নিআমত এবং কিতাব ও হিকমাতের যা তিনি তোমাদের উপর নাযিল করেছেন, যার দ্বারা তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন...।” -সূরা বাকারা ২:২৩১

এখানে ‘আনজালা’ (নাযিল করেছেন) ক্রিয়াপদটি কিতাব এবং হিকমাহ উভয়ের জন্যই সমানভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ, কিতাবের উৎস যেমন ওহী, হিকমাহর উৎসও খোদ ওহী।

নবীর প্রতি ওহী: আল্লাহ বলেন-

 “...আর আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও হিকমত নাযিল করেছেন এবং তোমাকে এমন বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন যা তুমি জানতে না...” (সূরা নিসা ৪:১১৩)

এই আয়াত নিশ্চিত করে যে, হিকমাহ নবীর বানানো বা অর্জিত কোনো জ্ঞান নয়, বরং এটিও আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।


হিকমাহ আল-কোরআনের ভেতরেই নিহিত:

কোরআন নিজেকেই ‘হিকমতপূর্ণ কিতাব’ বা ‘আল-কিতাব আল-হাকিম’ হিসেবে পরিচয় দেয়। একটি পাত্রকে তখনই পানিপূর্ণ বলা যায় যখন তার ভেতরে পানি থাকে। ঠিক তেমনি কোরআনকে ‘হাকিম’ বলা হচ্ছে কারণ এই কিতাবের আয়াতগুলোর মধ্যেই হিকমাহ কানায় কানায় পূর্ণ।

📖 প্রজ্ঞাময় কিতাবের সাক্ষ্য (সূরা ইউনুস ১০:১ ও লোকমান ৩১:২): 

“আলিফ-লাম-রা; এগুলো প্রজ্ঞাময় কিতাবের (আল-কিতাবিল হাকিম) আয়াতসমূহ।”

আল্লাহ যখন কিতাবকে ‘হাকিম’ (Wise/প্রজ্ঞাময়) বিশেষণে বিশেষায়িত করছেন, তখন এটি স্বতঃসিদ্ধ যে এই কিতাবের ভেতরে যা আছে, তা-ই হিকমাহ। কিতাবের আয়াতগুলোই হিকমতের আধার।

📖 কোরআনের শপথ (সূরা ইয়াসিন ৩৬:২-৩): 

“শপথ প্রজ্ঞাময় (হাকিম) কুরআনের। নিশ্চয় তুমি রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত।”

যদি হিকমাহ কোরআনের বাইরের বিষয় হতো, তবে আল্লাহ কোরআনকে ‘হাকিম’ বলে শপথ করতেন না।

📖 মূল কিতাবেও এটি প্রজ্ঞাময় (সূরা যুখরুফ ৪৩:৩-৪):

“নিশ্চয় আমি একে করেছি আরবি কুরআন, যাতে তোমরা বুঝ। আর নিশ্চয় তা আমার কাছে ‘উম্মুল কিতাবে’ (মূল কিতাবে) উচ্চমর্যাদাশীল ও ‘হাকিম’ (প্রজ্ঞাময়)।”

অর্থাৎ, নাযিলকৃত অবস্থায় যেমন এটি হিকমতপূর্ণ, লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত মূলেও এটি হিকমতপূর্ণ।


হিকমাহ মানে কুরআনের সুনির্দিষ্ট বিধান ও সদাচারণ:

কোরআনে ‘হিকমাহ’ বলতে বিমূর্ত কোনো কল্পনা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট কিছু আদেশ, নিষেধ এবং নৈতিক নীতিমালাকে বোঝানো হয়েছে, যা কোরআনের আয়াতের মাধ্যমেই বর্ণিত হয়েছে।

⚖️ হিকমতের ব্যবহারিক রূপ (সূরা বনি ইসরাইল ১৭:৩৯): 

এই সূরায় আল্লাহ পিতা-মাতার সেবা, আত্মীয়ের হক, অপব্যয় না করা, ব্যভিচার ও হত্যা না করা, এতিমের মাল ভক্ষণ না করা, মাপে কম না দেওয়া এবং অহংকার না করার নির্দেশ দিয়েছেন। এসব বিধান বর্ণনার পর ৩৯ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন:

“এগুলো হিকমাতের অন্তর্ভুক্ত, যা তোমার রব তোমার প্রতি ওহী করেছেন।”

এই আয়াতটি অকাট্য প্রমাণ দেয় যে, কোরআনের ভেতরে বর্ণিত বিধি-বিধান, নসিহত এবং শিষ্টাচারগুলোই হলো ‘হিকমাহ’। আল্লাহর দেওয়া হুকুম, আহকাম এবং নীতি-নৈতিকতাই হিকমাহর বাস্তবিক রূপ।


আয়াতসমূহ ‘মুহকাম’ বা হিকমাহ দ্বারা সুবিন্যস্ত:

কোরআনের আয়াতগুলোর গঠনশৈলীই হিকমাহর প্রমাণ।

🧩 সুদৃঢ় আয়াত (সূরা হুদ ১১:১): “এটি এমন একটি কিতাব, যার আয়াতসমূহ ‘উহকিমাত’ (প্রজ্ঞাপূর্ণ/সুদৃঢ় করা হয়েছে), তারপর সবিস্তারে ব্যাখ্যা করা হয়েছে...”

এখানে ‘উহকিমাত’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। এটি ‘হিকমাহ’ শব্দের একই মূল (Root) থেকে এসেছে। অর্থাৎ, কোরআনের আয়াতগুলোই হলো হিকমাহর গাঠনিক রূপ। আয়াত ছাড়া হিকমাহ নেই, হিকমাহ ছাড়া আয়াত নেই।

হিকমাহ ‘তিলাওয়াত’ বা পাঠ করা যায়:

আল-কোরআনের আয়াত এবং হিকমাহ—উভয়টিই যে তিলাওয়াত বা পাঠ করার বিষয়, তা কোরআন নিজেই প্রমাণ করে।

🏠 তিলাওয়াতের নির্দেশ (সূরা আহযাব ৩৩:৩৪): 

“আর তোমাদের ঘরে আল্লাহর আয়াতসমূহ ও হিকমত থেকে যা ‘পঠিত’ (তিলাওয়াত) হয়, তা তোমরা স্মরণ রেখো...”

আমরা জানি, সালাতে বা ইবাদতে একমাত্র আল্লাহর বাণী (কোরআন) তিলাওয়াত করা হয়। এখানে বলা হচ্ছে আয়াত এবং হিকমাহ দুটোই ‘তিলাওয়াত’ করা হয়। যদি হিকমাহ কোরআনের বাইরের কোনো গোপন জ্ঞান বা ভিন্ন কোনো গ্রন্থ হতো, তবে তা ‘তিলাওয়াত’ (Recite) করার কথা বলা হতো না। যেহেতু হিকমাহ তিলাওয়াত করা হয়, তাই প্রমাণিত হয় যে কোরআনের আয়াতগুলোর মধ্যেই হিকমাহ বিদ্যমান।

🗣️ প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ (সূরা আলে ইমরান ৩:৫৮):

“এগুলো আমি তোমার কাছে তিলাওয়াত করি, যা আয়াতসমূহ ও ‘যিকরুল হাকিম’ (প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ)।”
এখানে যা তিলাওয়াত করা হচ্ছে (ওহী), তাকেই ‘যিকরুল হাকিম’ বলা হচ্ছে।

নবী-রাসূলগণ কীভাবে কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দিতেন?

কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে নবীদের দায়িত্ব হিসেবে ‘কিতাব ও হিকমাহ’ শিক্ষা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ দুটি আলাদা বই শিক্ষা দেয়া নয়, বরং একই ওহীর দুটি দিক শিক্ষা দেয়া।

🕯️সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর দোয়া (সূরা বাকারা ২:১২৯): 

“হে আমাদের রব... তাদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করুন, যে তাদের প্রতি আপনার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দিবে...”

🕯️দোয়ার বাস্তবায়ন (সূরা বাকারা ২:১৫১ ও সূরা জুমুআ ৬২:২): 

“যেমন আমি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের নিকট একজন রাসূল পাঠিয়েছি... যে তোমাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে, তাদেরকে পবিত্র করে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয়...”

🕯️ পূর্ববর্তী নবীদের শিক্ষা (সূরা মায়েদাহ ৫:১১০ ও আলে ইমরান ৩:৪৮): 

সালামুন আলা ঈসা প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, “...যখন আমি তোমাকে শিক্ষা দিয়েছিলাম কিতাব ও হিকমাত এবং তাওরাত ও ইঞ্জিল...”

এখানে শিক্ষার ধারাক্রমটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

১. তিলাওয়াত: আল্লাহর আয়াত পাঠ করা (Reading the Text)।

২. তাজকিয়া: আত্মশুদ্ধি করা।

৩. তালীম: কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেয়া।

এখানে ‘কিতাব’ হলো আল্লাহর বাণী বা টেক্সট (Text), আর ‘হিকমাহ’ হলো সেই বাণীর সঠিক বুঝ, প্রয়োগবিধি, বিধি-বিধান এবং মর্মার্থ (Understanding/ Application/ Law)। যেমন একজন শিক্ষক ক্লাসে ‘পাঠ্যবই’ (কিতাব) পড়ান এবং সাথে সাথে সেই বইয়ের জটিল বিষয়গুলো বুঝিয়ে দেন—এটি বইয়ের বাইরের কোনো বিষয় নয়, বরং বইয়েরই গভীরতর জ্ঞান। নবীগণ মানুষকে কোরআন এবং কোরআনের বিধান/প্রজ্ঞা (হিকমাহ) শিক্ষা দিতেন, যা মূলত একই ওহীর দুটি দিক।

সারসংক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত:

‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’ বা আয়াত দিয়ে আয়াতের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে হিকমাহ সম্পর্কে চূড়ান্ত যে সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়:

উৎস: হিকমাহ আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত (২:২৩১, ৪:১১৩)।

অবস্থান: হিকমাহ এই ‘প্রজ্ঞাময় কিতাব’ বা কোরআনের ভেতরেই সংরক্ষিত (১০:১, ৩৬:২, ৩১:২)।

স্বরূপ: কোরআনের আদেশ, নিষেধ, উপদেশ এবং বিধি-বিধানগুলোই হলো হিকমাহ (১৭:৩৯)।

চর্চা: কিতাবের আয়াত এবং এর অন্তর্নিহিত বিধান (হিকমাহ) দুটোই তিলাওয়াত ও আলোচনার বিষয় (৩৩:৩৪, ৩:৫৮)।

অতএব, হিকমাহ আলাদা কোনো সোর্স বা মানুষের রচিত হাদিস বা জ্ঞান নয়। বরং আল-কোরআন হলো ‘থিওরি’ আর এই কোরআনের সঠিক বুঝ, এর বিধি-বিধানের প্রজ্ঞাপূর্ণ প্রয়োগ এবং এর উপদেশাবলীই হলো ‘হিকমাহ’। আল্লাহ যা নাযিল করেছেন (কোরআন), তার মধ্যেই হিকমাহ সংরক্ষিত, সুরক্ষিত এবং সুবিন্যস্ত।

▓▒░দানকৃত হিকমাহ ░▒▓

 নবী ও রাসূলগণ এবং আল্লাহর দানকৃত হিকমাহ -আল-কোরআনের আয়াতভিত্তিক দলিল:

আল-কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি যুগে যুগে তাঁর মনোনীত নবী ও রাসূলগণকে ‘কিতাব’-এর পাশাপাশি ‘হিকমাহ’ (প্রজ্ঞা/ Wisdom) বা ‘হুকুম’ (ফয়সালা করার জ্ঞান) দান করেছেন। এটি কোনো অর্জিত জ্ঞান নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত বিশেষ ওয়াহ বা দান।

নিচে আল-কোরআনের আয়াতের আলোকে যেসকল নবী-রাসূলকে জ্ঞান ও হিকমাহ প্রদান করা হয়েছিল, তার বিবরণ তুলে ধরা হলো:

👑 সালামুন আলা  দাউদ ও হিকমাহ প্রাপ্তি:

আল্লাহ তায়ালা সালামুন আলা  দাউদ-কে বাদশাহি এবং হিকমাহ—উভয়টিই দান করেছিলেন।
দলিল (সূরা বাকারা ২:২৫১):

“অতঃপর তারা আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাদেরকে পরাস্ত করল এবং দাউদ জালূতকে হত্যা করল। আর আল্লাহ তাকে (দাউদকে) রাজত্ব ও হিকমত দান করলেন এবং তিনি যা চেয়েছেন তা তাকে শিক্ষা দিয়েছেন।”

আরেকটি আয়াতে আল্লাহ বলেন:
দলিল (সূরা সদ ৩৮:২০): “আমি তার রাজত্বকে সুদৃঢ় করলাম এবং তাকে হিকমত (প্রজ্ঞা) ও ফয়সালাকারী বাগ্মীতা দান করলাম।”

🕊️ সালামুন আলা ঈসা ও হিকমাহর ঘোষণা :

সালামুন আলা ঈসা বনি ইসরাইলের কাছে আগমন করেছিলেন স্পষ্ট প্রমাণ এবং হিকমাহ নিয়ে।

দলিল (সূরা যুখরুফ ৪৩:৬৩):
“আর ঈসা যখন স্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে আসল, তখন সে বলল, ‘আমি তোমাদের কাছে হিকমত (প্রজ্ঞা) নিয়ে এসেছি এবং তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছ তা স্পষ্ট করার জন্য এসেছি।...”

আল্লাহ তাকে কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন:
দলিল (সূরা আলে-ইমরান ৩:৪৮): “আর তিনি তাকে শিক্ষা দেবেন কিতাব, হিকমাত, তাওরাত ও ইঞ্জিল।”

🕌 সালামুন আলা ইব্রাহিম ও তাঁর বংশধর:

আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর বংশধরদের ওপর বিশেষ অনুগ্রহ করেছেন এবং তাঁদেরকে কিতাব ও হিকমাহ দান করেছেন।

দলিল (সূরা নিসা ৪:৫৪): “নাকি তারা মানুষের প্রতি ঈর্ষা করে সেবব বিষয়ে যা আল্লাহ তাদেরকে তাঁর অনুগ্রহে দান করেছেন? আমি তো ইব্রাহিমের পরিবারকে কিতাব ও হিকমত দান করেছি এবং তাদেরকে দিয়েছি বিশাল রাজত্ব।”

⚖️ সালামুন আলা ইউসুফ -এবং হুকুম ও ইলম:

সালামুন আলা ইউসুফ যখন যৌবনে পদার্পণ করলেন, তখন আল্লাহ তাঁকে ফয়সালা করার ক্ষমতা (হুকুম) এবং জ্ঞান (ইলম) দান করলেন। কোরআনের ভাষায় ‘হুকুম’ শব্দটি হিকমাহরই ব্যবহারিক রূপ (Judgement/Wisdom)।

দলিল (সূরা ইউসুফ ১২:২২): “আর সে যখন পূর্ণ যৌবনে উপনীত হল, আমি তাকে হুকুম (প্রজ্ঞা/ফয়সালা)ইলম (জ্ঞান) দান করলাম। আর এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি।”

🌊 সালামুন আলা মূসা:

সালামুন আলা মূসা-কেও একইভাবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর হিকমাহ ও জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল।

দলিল (সূরা কাসাস ২৮:১৪): “আর সে যখন যৌবনে পদার্পণ করল এবং পূর্ণ বয়স্ক হল, তখন আমি তাকে হুকুম (প্রজ্ঞা/ফয়সালা)ইলম (জ্ঞান) দান করলাম...”

🏚️ সালামুন আলা লূত:

সালামুন আলা  লূত-কেও আল্লাহ হুকুম ও ইলম দান করেছিলেন।

দলিল (সূরা আম্বিয়া ২১:৭৪): “আর লূতকে আমি হুকুম (প্রজ্ঞা/ফয়সালা)ইলম (জ্ঞান) দান করলাম এবং তাকে সেই জনপদ থেকে উদ্ধার করলাম, যার অধিবাসীরা অশ্লীল কাজ করত...”

🧒 সালামুন আলা ইয়াহইয়া:

আল্লাহ সুবহানাহু তা’লা সালামুন আলা ইয়াহইয়া-কে শৈশবেই হিকমাহ বা কিতাবের বুঝ দান করেছিলেন।

দলিল (সূরা মারয়াম ১৯:১২): “হে ইয়াহইয়া, তুমি কিতাবটি শক্তভাবে ধর। আর আমি তাকে শৈশবেই ‘হুকুম’ (প্রজ্ঞা/জ্ঞান) দান করলাম।”


🕋 সর্বশেষ নবী সালামুন আলা মুহাম্মদ (সা.):

আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ নবীর প্রতিও কিতাব এবং হিকমাহ নাযিল করেছেন, যা পূর্বেই বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

দলিল (সূরা নিসা ৪:১১৩): “...আর আল্লাহ তোমার প্রতি কিতাব ও হিকমাত নাযিল করেছেন এবং তোমাকে এমন বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন যা তুমি জানতে না...”

📝 সিদ্ধান্ত: 

আল-কোরআনের এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, হিকমাহ কোনো মানব রচিত দর্শন বা সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তি নয়। এটি নবী-রাসূলগণের প্রতি আল্লাহর বিশেষ দান (ওয়াহ)। সালামুন আলা দাউদ, ঈসা, ইব্রাহিম, ইউসুফ, মূসা, লূত, ইয়াহইয়া এবং সর্বশেষ নবী সালামুন আলা মুহাম্মদ (সা:)—সকলকেই আল্লাহ আসমানি কিতাবের পাশাপাশি সেই কিতাবের বিধান প্রয়োগের জ্ঞান ও হিকমাহ দান করেছিলেন, যাতে তাঁরা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী মানুষের মাঝে সঠিক ফয়সালা করতে পারেন।

 ▓▒░মনোনীত বান্দাদের জ্ঞান ও হিকমাহ░▒▓

■ নবীগণ ছাড়াও আল্লাহর মনোনীত বান্দাদের জ্ঞান ও হিকমাহ প্রাপ্তি— আল-কোরআনের আয়াতভিত্তিক দলিল:

আল-কোরআন গভীর মনোযোগ দিয়ে অধ্যয়ন করলে দেখা যায়, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন শুধুমাত্র নবী-রাসূলগণকেই নয়, বরং তাঁর মনোনীত বিশেষ কিছু বান্দাকেও ‘হিকমাহ’ এবং ‘বিশেষ জ্ঞান’ (ইলম) দান করেছিলেন। যদিও তাঁরা নবী ছিলেন কি না তা নিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু কোরআন স্পষ্ট ভাষায় সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ তাঁদেরকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ করেছিলেন।

কোরআনে এমন কিছু ঘটনার বর্ণনা রয়েছে যেখানে আল্লাহ সাধারণ মানুষের ধারণার ঊর্ধ্বে গিয়ে তাঁর বিশেষ বান্দাদের জ্ঞান দান করেছেন। আল-কোরআনের আয়াতের আলোকে এমন কয়েকজন বিশেষ ব্যক্তিত্বের তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:

📜 সালামুন আলা লুকমান ও হিকমাহ:

কোরআনে ‘লুকমান’ নামে একটি স্বতন্ত্র সূরা রয়েছে। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে তিনি নবী ছিলেন না, বরং আল্লাহর একজন অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান ও অলি বান্দা ছিলেন। আল্লাহ তাঁকে খাসভাবে ‘হিকমাহ’ দান করার ঘোষণা দিয়েছেন।

দলিল (সূরা লুকমান ৩১:১২): “আর আমি তো লুকমানকে হিকমত দান করেছিলাম এই মর্মে যে, তুমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় কর। আর যে শুকরিয়া আদায় করে, সে তো নিজের জন্যই শুকরিয়া আদায় করে...”

(এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, হিকমাহ আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত দান বা ওহী লব্ধ জ্ঞান, যা লুকমান পেয়েছিলেন।)

🌊 মূসা (আ.)-এর সফরসঙ্গী (খিজির) ও ‘ইলমে লাদুন্নি’:

সূরা কাহাফে সালামুন আলা মূসা এবং আল্লাহর এক বিশেষ বান্দার ভ্রমণের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। কথিত হাদিসে তাঁর নাম ‘খিজির’ বলা হলেও কোরআনে তাঁকে ‘আমার বান্দাদের একজন’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। আল্লাহ তাঁকে নিজের পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত ও জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছিলেন, যাকে আধ্যাত্মিক পরিভাষায় ‘ইলমে লাদুন্নি’ (আল্লাহর নিকট থেকে সরাসরি প্রাপ্ত জ্ঞান) বলা হয়।

দলিল (সূরা কাহাফ ১৮:৬৫): “অতঃপর তারা উভয়ে (মূসা ও তাঁর সঙ্গী) আমার বান্দাদের মধ্য থেকে এক বান্দাকে পেল, যাকে আমি আমার পক্ষ থেকে রহমত দান করেছি এবং তাকে আমার পক্ষ থেকে বিশেষ জ্ঞান (ইলম) শিক্ষা দিয়েছি।”

(এই জ্ঞানটি কিতাবি জ্ঞানের বাইরের এক বিশেষ জ্ঞান ছিল, যার মাধ্যমে তিনি ভবিষ্যতের কিছু ঘটনার কার্যকারণ বুঝতে পারতেন, যা  সালামুন আলা মূসা -এর কাছেও গোপন ছিল।)

👑 তালূত (তোলুথ) ও জ্ঞানের প্রশস্ততা:

বনি ইসরাইল যখন একজন রাজার আবেদন করল, তখন আল্লাহ ‘তালূত’ নামক এক ব্যক্তিকে রাজা হিসেবে মনোনীত করলেন। তিনি ধনী বা বংশীয় মর্যাদাবান ছিলেন না বলে লোকেরা আপত্তি তুলল। তখন নবী জানালেন যে, আল্লাহ তাঁকে দুটি বিশেষ গুণ দিয়েছেন: দৈহিক শক্তি এবং জ্ঞানের গভীরতা

দলিল (সূরা বাকারা ২:২৪৭): “...নবী বলল, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাকে (তালূতকে) তোমাদের উপর মনোনীত করেছেন এবং তাকে জ্ঞানে (ইলমে) ও দেহে প্রচুর প্রাচুর্য দান করেছেন’। আর আল্লাহ যাকে চান, তাকে তাঁর রাজত্ব দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ।”

✨ সালামুন আলা সুলাইমান-এর সভার জ্ঞানী ব্যক্তি:

সালামুন আলাসুলাইমান যখন রানী বিলকিসের সিংহাসনটি চোখের পলকে নিয়ে আসার কথা বললেন, তখন জিনদের মধ্যে একজন শক্তিশালী ইফরিত বলল সে পারবে। কিন্তু তার চেয়েও দ্রুত কাজটি করে দেখালেন এমন একজন মানুষ, যার কাছে ‘কিতাবের জ্ঞান’ ছিল।

দলিল (সূরা নামল ২৭:৪০): “কিন্তু কিতাবের জ্ঞান যার ছিল, সে বলল, ‘আপনার চোখের পলক ফেলার আগেই আমি তা আপনার কাছে নিয়ে আসব’...”

(এই ব্যক্তি নবী ছিলেন না, কিন্তু আল্লাহ তাঁকে আসমানি কিতাবের এমন গভীর জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক শক্তি দিয়েছিলেন যার বলে তিনি এই অলৌকিক কাজটি করতে সক্ষম হয়েছিলেন)

🛤️ যুল-কারনাইন ও কার্যকারণ জ্ঞান:

যুল-কারনাইন ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ। আল্লাহ তাঁকে পৃথিবীতে ক্ষমতা দিয়েছিলেন এবং প্রতিটি কাজ সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ‘উপকরণ’ বা ‘জ্ঞান’ (সাবাব) দান করেছিলেন।

দলিল (সূরা কাহাফ ১৮:৮৪):  “আমি তাকে পৃথিবীতে ক্ষমতা দিয়েছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের কার্যকারণ (উপকরণ/জ্ঞান) দান করেছিলাম।”


📝 পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত:

উপরোক্ত আয়াতগুলো (৩১:১২, ১৮:৬৫, ২:২৪৭, ২৭:৪০, ১৮:৮৪) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

হিকমাহ সর্বজনীন দান নয়: আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিকমাহ দান করেন, তবে এটি অর্জন করার জন্য আল্লাহর আনুগত্য প্রয়োজন।

নবীর বাইরেও জ্ঞান: নবুয়ত ছাড়াও আল্লাহ তাঁর বিশেষ বান্দাদের (যেমন  খিজির  (কথিত-পরিচিত), লুকমান, তালূত) বিশেষ জ্ঞান বা হিকমাহ দান করতে পারেন।

জ্ঞানের উৎস: এই সকল জ্ঞানের উৎস একমাত্র আল্লাহ। তিনি কখনো ওহীর মাধ্যমে (নবীদের), কখনো ইলহামের মাধ্যমে, আবার কখনো কিতাবের গভীর বুঝের মাধ্যমে এই জ্ঞান দান করেন।

সুতরাং, হিকমাহ ও জ্ঞান আল-কোরআনেরই একটি জীবন্ত প্রবাহ, যা আল্লাহ তাঁর বিশেষ বান্দাদের অন্তরে ঢেলে দেন, যাতে তাঁরা সত্যকে উপলব্ধি করতে পারেন এবং আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

🔷 জ্ঞান ও হিকমা চাওয়ার কোরআনিক দুআসমূহ:

1️⃣ رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا

“রব্বি যিদ্‌নী ইল্‌মা।” অর্থ: হে আমার রব, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন। — সূরা ত্বাহা 20:114


📘 হিকমা (প্রজ্ঞা/বুদ্ধিমত্তা) চাওয়ার দুআ

কোরআনে সরাসরি “হিকমা দাও”—এমন কোনো দুআ নেই, কিন্তু আল্লাহ যেভাবে নবী ও বান্দাদের হিকমা দিয়েছেন, সেই ভাষায় চাওয়া যায়। সেগুলোর ভিত্তিতে রুচিসম্মত কোরআনিক দুআগুলো হলো:

2️⃣ رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا

“রব্বি হাব্‌ লি হুক্‌মা।”  অর্থ: হে আমার রব, আমাকে প্রজ্ঞা/বিচক্ষণতা দান করো। — সূরা আশ-শু'আরা 26:83 


3️⃣ وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ

“ওয়া আলহিক্‌নি বিস্‌সালিহীন।” অর্থ: আর আমাকে সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত করো।  — সূরা আশ-শু'আরাহ 26:83

➡️ হিকমা পেতে সৎ বান্দাদের পথে অন্তর্ভুক্ত হওয়া একটি কোরআনিক অনিবার্যতা।


📘 জ্ঞান + প্রজ্ঞা চাওয়ার সমন্বিত দুআ

4️⃣ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ…

(আয়াতের অংশ)

“হে আমার রব, যে নিয়ামত তুমি আমাকে দান করলে তার শোকর আদায় করতে আমাকে সক্ষম করো এবং আমাকে সৎকাজে সাহায্য করো।” — সূরা আন-নামল 27:19

➡️ কোরআনে জ্ঞান + হিকমা — উভয়ই মূলত সৎকাজের পথ আল্লাহ তাওফিক দেওয়ার মাধ্যমে পাওয়া যায়—এই আয়াতে তার দুআ আছে।


📘 সবশেষে একটি পূর্ণ কোরআনিক দুআ (জ্ঞান, হিকমা, সঠিক দৃষ্টি)

5️⃣ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا

“হে আমাদের পালনকর্তা, তুমি তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য রহমত দান করো এবং আমাদের কাজ-কর্মে সঠিক পথ নির্দেশ করো।” — সূরা আল-কাহফ 18:10

➡️ রশদ = সঠিক দিকনির্দেশনা + প্রজ্ঞা—হিকমার কেন্দ্রীয় অর্থ।


Audio-Video

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post