▣ আমরা যা ভক্ষন করছি, কিয়ামতের ময়দানে সে-ও কি উপস্থিত হবে? ‘রব্বিল আলামিন’-এর সার্বভৌমত্ব ও নিখিল বিশ্বের সমাবেশ।
◈ পশু-পাখি ও প্রাণীকুল কি মানুষের মতোই ‘উম্মত’ বা সম্প্রদায়?
আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের রসনা তৃপ্তির জন্য দস্তরখানায় হরেক পদের আয়োজন করি—মাছ, মাংস, হাঁস-মুরগির রোস্ট কিংবা গরু-খাসির রেজালা আমরা খুব তৃপ্তি সহকারে খাই। কিন্তু কখনও কি আমরা গভীর চিন্তা (তদাব্বুর) করে দেখেছি যে, এই প্রতিটি প্রাণী আল্লাহর কাছে কেবল ‘খাদ্য’ বা মানুষের ‘ভোগের বস্তু’ নয়? বরং আল-কুরআনের অকাট্য ভাষ্যে এরা একেকটি সুশৃঙ্খল ‘উম্মত’ বা আইনি সত্তা।
আল-কুরআন আমাদের এক রূঢ় ও বিস্ময়কর সত্যের মুখোমুখি করে দেয়—যে প্রাণীটি আজ আমাদের দস্তরখানায় আহার হিসেবে উপস্থিত, কাল কিয়ামতের ময়দানে সে-ও তার স্রষ্টার সামনে একটি স্বতন্ত্র অস্তিত্ব হিসেবে উপস্থিত হবে।
❖ আমাদের চারপাশের অবহেলিত প্রাণীকুল: কুকুর, বিড়াল ও অন্যান্য:
কেবল আমাদের আহার হওয়া প্রাণীরাই নয়, বরং আমাদের চোখের সামনে ঘুরে বেড়ানো কুকুর, বিড়াল, রাস্তার পাশের তুচ্ছ কীট কিংবা লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা বন্য প্রাণীকুল—তারাও কি এই ‘হাশর’ বা সমাবেশের অন্তর্ভুক্ত?
➢ কুরআনিক অনুধাবন: সুরা আল-আন’আমের ৩৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ যখন বলেন ‘উমামুন আমছালুকুম’ (তোমাদের মতোই একেকটি উম্মত), তখন তিনি কোনো বিভাজন করেননি। গৃহপালিত বিড়ালটি যে আপনার আদরে বড় হচ্ছে, কিংবা রাস্তার কুকুরটি যে অবহেলায় রাত পার করছে—তারা কেউ বিচ্ছিন্ন জীব নয়। তারা প্রত্যেকেই আল্লাহর মহাজাগতিক শাসনতন্ত্রের একেকটি সুবিন্যস্ত উম্মত।
➢ সামঞ্জস্যপূর্ণ বাস্তবতা: আমরা যাকে আজ তুচ্ছ ভাবছি বা যার ওপর নির্মমতা করছি, সে-ও কিয়ামতের দিন আল্লাহর ‘রুবুবিয়্যাত’-এর ছায়াতলে উপস্থিত হবে। মহাবিশ্বের প্রতিটি প্রাণ, তা সে পানির মাছ হোক কিংবা আকাশের পাখি—সবাইকে একটি নির্দিষ্ট দিনে পুনরায় সমবেত করা হবে। কারণ, আল্লাহ কেবল মানুষের রব নন, তিনি ‘রব্বিল আলামিন’ (সকল জগতের প্রতিপালক)।
❖ চিন্তার খোরাক:
দস্তরখানের রোস্ট করা মুরগিটি থেকে শুরু করে রাস্তার তৃষ্ণার্ত কুকুরটি পর্যন্ত—প্রতিটি প্রাণের একটি সুনির্দিষ্ট হিসাব ও পরিচয় আল্লাহর কিতাবে সংরক্ষিত আছে। সুতরাং নেয়ামত গ্রহণে যেমন শুকরিয়া প্রয়োজন, তেমনি আল্লাহর অন্যান্য ‘উম্মত’ বা সৃষ্টির প্রতি দয়া ও ইনসাফ প্রদর্শনে গাফিলতি করা আত্মঘাতী হতে পারে।
“আমি কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দিইনি; অতঃপর তাদের সবাইকে তাদের রবের কাছে সমবেত করা হবে।” (সুরা আল-আন’আম: 6:38)
◈ ১. প্রাণীকুলকে ‘উম্মত’ হিসেবে স্বীকৃতি:
“আমি কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দিইনি; অতঃপর তাদের সবাইকে তাদের রবের কাছে সমবেত করা হবে।” (সুরা আল-আন’আম: 6:38)
◈ ১. প্রাণীকুলকে ‘উম্মত’ হিসেবে স্বীকৃতি:
“আর পৃথিবীতে বিচরণকারী কোনো প্রাণী নেই এবং এমন কোনো পাখি নেই যা তার ডানা দিয়ে ওড়ে—তারা সবাই তোমাদের মতোই এক একটি উম্মত বা সম্প্রদায়। আমি কিতাবে (লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে) কোনো কিছুই বাদ দিইনি; অতঃপর তাদের সবাইকে তাদের রবের কাছে সমবেত করা হবে (ইউহশারূন)” -6:38
◈ ২. বন্য প্রাণীদের সমাবেশের চ‚ড়ান্ত লগ্ন (সুরা আত-তাকভীর: 81:5)
◈ ৩. জমায়েত করার বিষয়ে আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতা:
“আর তাঁর নিদর্শনাবলির অন্যতম হলো আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি এবং এই দুয়ের মধ্যে তিনি যেসব জীবজন্তু (দাব্বাহ) ছড়িয়ে দিয়েছেন সেগুলো; আর তিনি যখন ইচ্ছা তাদের সমবেত করতে (জাম’য়িহিম) সক্ষম”-(সুরা আশ-শূরা: 42:29)
◈ ৪. প্রতিটি সত্তার উপস্থিতি ও সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব
“আসমান ও জমিনে এমন কেউ নেই, যে দয়াময় আল্লাহর কাছে বান্দা হিসেবে উপস্থিত হবে না। তিনি তাদের পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তাদের সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে গণনা (Count) করে রেখেছেন। আর কিয়ামতের দিন তাদের প্রত্যেকেই তাঁর কাছে আসবে একা একা (ফারদা)।” (সুরা মারইয়াম: 19:93-95)
◈ ৫. প্রাণীকুলের ইবাদত ও তাসবীহ
“তুমি কি দেখ না যে, আসমান-জমিনের সবাই এবং ডানা বিস্তারকারী পাখিরা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে? প্রত্যেকেই তার সালাত (প্রার্থনা) ও তাসবীহ (পবিত্রতা ঘোষণা) সম্পর্কে জানে...।”
