সিগারেট-বিড়ি: ধূমপান কি নিষিদ্ধ ও শাস্তির কারণ হতে পারে?—আয়াত কী বলে? Cigarettes & BeRi: Smoking!

আমি কি তোমাকে দুটি ঠোঁট দেই নি? 

-(সূরা আল-বালাদ ৯০:৮–৯)

▣ ধোঁয়ার জন্য নয় তো কোন কাজে এই ঠোট দুটি লাগাবো?

══════════════════════

১। মূলনীতি: কুরআনে হালাল‑হারামের পদ্ধতি:
══════════════════════

◆ আল্লাহ সুবহানাহু তালা কুরআনে কিছু বিষয় সরাসরি হারাম ঘোষণা করেছেন, আবার কিছু বিষয়কে নীতিগত বিধানের অধীনে এনে বিচার করার দায়িত্ব দিয়েছেন ‘উলিল আলবাব’-দের।

◆ কুরআন বলে—
“তিনি তাদের জন্য পবিত্র বস্তু (তাইয়্যিব) হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তু (খাবাইস) হারাম করেন।” (৭:১৫৭)

◆ এখানে ‘খাবাইস’ (অপবিত্র, ক্ষতিকর, নোংরা) শব্দটি একটি নীতিগত মানদণ্ড। কোনো বস্তু যদি মানুষের দেহ, জীবন, বুদ্ধি ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়, তবে তা এই ‘খাবাইস’-এর অন্তর্ভুক্ত।

➤ “হে মানুষ! পৃথিবীতে যা হালাল ও তাইয়্যিব, তা থেকে খাও।” (২:১৬৮)

 কেবল হালাল হলেই যথেষ্ট নয়; তাইয়্যিব হওয়াও শর্ত: ✦ হালাল = আইনি অনুমতি

✦ তাইয়্যিব = গুণগত পবিত্রতা ও কল্যাণ

এই কারণে কুরআন বারবার বলে:“হালালান তাইয়্যিবান”

➤ “তাইয়্যিব” শব্দের কুরআনি অর্থ-পরিসর ط ي ب (ত্ব-ই-বা) মূলধাতু থেকে

তাইয়্যিব / তাইয়্যিবাত অর্থ— ✦ পবিত্র ✦ পরিষ্কার ✦ কল্যাণকর✦ মনোরম ✦ ক্ষতিহীন ✦ স্বভাবগতভাবে গ্রহণযোগ্য

কুরআনে এটি শুধু খাবারের জন্য নয়, বরং—রিজিক, কথা, ভূমি, জীবনধারা, কাজকর্ম এসব ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে।

আয়াত রেফারেন্স: ৭:১৫৭, ৩৫:১০, ৭:৫৮, ২:১৬৮

══════════════════════

তবুও যে খাইতে/ভোগ করতে ওটাই যে ভালো লাগে! কিন্তু কেন?

“অপবিত্র ও পবিত্র সমান নয়—যদিও অপবিত্রের আধিক্য তোমাকে আকৃষ্ট করে”-(৫:১০০)

══════════════════════

২। ধূমপান ও ‘খাবাইস’ ধারণা

══════════════════════

◆ ধূমপান এমন একটি বস্তু—
▣ যা দেহে প্রবেশ করে বিষাক্ত ধোঁয়া
▣ ফুসফুস, হৃদপিণ্ড ও রক্তকে ক্ষতিগ্রস্ত করে
▣ নিজের পাশাপাশি অন্যকেও (passive smoking) ক্ষতি করে

◆ কুরআনের ভাষায় এটি ‘তাইয়্যিব’ (পবিত্র) নয়; বরং ‘খাবিস’।

◆ আল্লাহ বলেন—
“তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।” (২:১৯৫)

◆ ধূমপান জেনে‑বুঝে ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হওয়া। এটি আয়াতটির নীতিগত লঙ্ঘন।

══════════════════════

৩। সূরা আদ‑দুখান (৪৪:১০‑১৪) ও ধোঁয়ার শাস্তি

══════════════════════

◆ আল্লাহ বলেন—
“অতএব অপেক্ষা কর সেই দিনের, যেদিন আকাশ সুস্পষ্ট ধোঁয়া নিয়ে আসবে। তা মানুষকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে। এটি হবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (৪৪:১০‑১১)

◆ এখানে ‘দুখান’ (ধোঁয়া) শব্দটি কুরআনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

◆ তাদাব্বুরের আলোকে লক্ষ্যণীয়—
▣ ধোঁয়া = শ্বাসরোধকারী আচ্ছাদন
▣ ধোঁয়া = যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা
▣ ধোঁয়া = আল্লাহর আযাবের উপমা ও বাস্তব রূপ

◆ যারা নিজেরাই ধোঁয়াকে অভ্যাসে পরিণত করে, তারা কি আল্লাহর আযাবের প্রতীকের সাথে আত্মসাদৃশ্য তৈরি করছে না?

══════════════════════

ঠোঁট আল্লাহর দান (৯০:৯)

══════════════════════

ঠোঁট আল্লাহর দান (৯০:৯): যে ঠোঁট আল্লাহ দিয়েছেন রিজিক ও পবিত্রতার জন্য, সেই ঠোঁট দিয়ে ধোঁয়া টানা—কুরআনের দৃষ্টিতে জবাবদিহিমুক্ত হতে পারে না।

আয়াত দ্র: প্রতিটি দানের হিসাব হবে (১৭:৩৬), ✦ অঙ্গগুলো সাক্ষ্য দেবে (৩৬:৬৫), ✦ মানুষকে সঠিক ও ভুল পথ দেখানো হয়েছে (৯০:১০)

══════════════════════

৪। জীবন ও শ্বাস: আল্লাহর আমানত

══════════════════════

◆ আল্লাহ বলেন—
“তিনি তোমাদেরকে জীবন দান করেছেন, অতঃপর মৃত্যু দেবেন।” (২২:৬৬)

◆ জীবন ও দেহ মানুষের মালিকানা নয়; এটি আমানত।

◆ ধূমপান দ্বারা—
▣ শ্বাসপ্রশ্বাস নষ্ট হয়
▣ জীবনকাল হ্রাস পায়
▣ আল্লাহর আমানতের খেয়ানত ঘটে

◆ কুরআন বলে—
“নিশ্চয়ই শ্রবণ, দৃষ্টি ও হৃদয়—এগুলোর প্রত্যেকটির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (১৭:৩৬)

══════════════════════

৫। অপচয় ও অর্থনৈতিক ক্ষতি

══════════════════════

◆ আল্লাহ বলেন—
“নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।” (১৭:২৭)

◆ ধূমপানে অর্থ ব্যয় হয় এমন কিছুর পেছনে—
▣ যার কোনো উপকার নেই
▣ বরং ক্ষতি নিশ্চিত

◆ এটি ‘ইস্রাফ’ ও ‘তাবযীর’-এর অন্তর্ভুক্ত।

══════════════════════

৬। অন্যকে ক্ষতি করা: সামাজিক দায়

══════════════════════

◆ কুরআন নীতিগতভাবে ঘোষণা করে—
“একজন আরেকজনের বোঝা বহন করবে না।” (৬:১৬৪)

◆ কিন্তু ধূমপানে—
▣ পরিবারের সদস্য
▣ শিশু
▣ সহকর্মী

—সকলেই অনিচ্ছায় ক্ষতির শিকার হয়। এটি জুলুমের শামিল।

◆ আল্লাহ বলেন—
“জালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।” (২:২৭০)

══════════════════════

৭। কুরআনের সামঞ্জস্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত

══════════════════════

◆ কুরআনের বিভিন্ন আয়াত একত্রে বিচার করলে স্পষ্ট হয়—
▣ ধূমপান ‘খাবাইস’
▣ ধূমপান আত্মধ্বংস
▣ ধূমপান অপচয়
▣ ধূমপান জুলুম
▣ ধূমপান আল্লাহর আযাবের প্রতীকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ

◆ অতএব, কুরআনের আলোকে ধূমপান—
▣ নিষিদ্ধ (মামনু’)
▣ শাস্তির কারণ হতে পারে
▣ উলিল আলবাবদের জন্য বর্জনীয়

══════════════════════
উপসংহার
══════════════════════

কুরআন কোনো কিতাব নয় যা প্রতিটি ক্ষতিকর বস্তু নাম ধরে নিষিদ্ধ করবে; বরং এটি একটি নীতিনির্ভর হেদায়াত। যে ব্যক্তি কুরআন নিয়ে চিন্তা‑ভাবনা করে (তাদাব্বুর), সে নিজেই বুঝে নেয় কোনটি হালাল ও কোনটি হারাম। ধূমপান সেইসব বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত, যা কুরআনের নীতিমালার আলোকে স্পষ্টভাবে পরিত্যাজ্য।

“এতে অবশ্যই নিদর্শন রয়েছে বোধশক্তিসম্পন্নদের জন্য।” (৩৯:২১, 12:111)

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post