জুলুম কিংবা যেকোনো কাজে বাড়াবাড়ি (আসরাফূ) বা সীমালঙ্ঘন করে ফেললে তাওবা-ইস্তেগফার: COMMITTING 'JULUM' OR EXCESS

 বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম

আল-কুরআনের দৃষ্টিতে কেবল মানুষের ওপর নয়, বরং প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ এবং জগতের ভারসাম্য রক্ষা করা মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা এই মহাবিশ্বকে একটি সুনির্দিষ্ট ভারসাম্যে (মিজান) সৃষ্টি করেছেন। যখনই মানুষ কোনো প্রাণীকে অকারণে কষ্ট দেয় বা প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে, তখন সে মূলত আল্লাহর সৃষ্টিতে ‘ফাসাদ’ বা বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং নিজের নফসের ওপর জুলুম করে।

আল-কুরআনের আলোকে যে কারও ওপর জুলুম করা বা অন্যায় করা মূলত নিজের নফসের ওপরই জুলুম করার শামিল। যখন কোনো মুমিন তার ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়, তখন আল্লাহ তায়ালা তাকে অত্যন্ত শক্তিশালী কিছু শব্দ ও দুআ শিখিয়ে দিয়েছেন। ‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’ পদ্ধতিতে জুলুম থেকে ক্ষমা পাওয়ার উপায় ও দুআসমূহ নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

◈ প্রাণ-প্রকৃতিকে ‘উম্মাত’ বা জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া:

জুলুম থেকে বাঁচার প্রথম ধাপ হলো এটি অনুধাবন করা যে, প্রতিটি প্রাণী ও উদ্ভিদ আল্লাহর একেকটি সুশৃঙ্খল জাতি। তাদের ওপর অন্যায় করা মানে একটি জাতির ওপর অন্যায় করা।

ভূপৃষ্ঠে বিচরণশীল কোনো প্রাণী কিংবা নিজ ডানা দিয়ে উড়ে চলা কোনো পাখি নেই যারা তোমাদের মতো একেকটি জাতি (উম্মাত) নয়...।" (সূরা আল-আন’আম, ৬:৩৮)

➤ অনুধাবন: এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা প্রাণীকুলকে মানুষের সমমর্যাদার ‘উম্মাত’ বা জাতি বলেছেন। সুতরাং মানুষের ওপর জুলুম করলে যেমন আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হয়, প্রকৃতি ও প্রাণীর ওপর জুলুমের ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য। এই অপরাধবোধ থেকেই তওবার সূচনা হয়।

◈ আল্লাহর দয়া থেকে নিরাশ না হওয়ার আশ্বাস:

জুলুমের পরিমাণ যত বড়ই হোক না কেন, আল্লাহ তায়ালা সালামুন আলা মুহাম্মদ-এর মাধ্যমে আমাদের আশার বাণী শুনিয়েছেন।

বলো! হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি (জুলুম) করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। (সূরা আজ-জুমার, ৩৯:৫৩)

➤ অনুধাবন: ‘আসরাফূ’ (বাড়াবাড়ি) শব্দটি জুলুমের চরম পর্যায়কে বোঝায়। আল্লাহ এখানে নিশ্চয়তা দিচ্ছেন যে, প্রকৃত তওবা ও সংশোধনের মানসিকতা থাকলে তিনি সব জুলুম ক্ষমা করতে প্রস্তুত।

১. জুলুম স্বীকার ও আত্ম-সংশোধনের প্রথম ধাপ/ কৃত বিপর্যয়ের (ফাসাদ) জন্য অপরাধ স্বীকার ও দুআ:

জুলুমের পর প্রথম কাজ হলো অপরাধ স্বীকার করা। মানবজাতির আদি পিতা সালামুন আলা আদম যখন ভুল করেছিলেন, তখন তিনি যে দুআটি করেছিলেন তা কিয়ামত পর্যন্ত সকল অপরাধীর জন্য ক্ষমার মডেল।

তারা উভয়ে বলল!

 رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
রব্বানা জলামনা আনফুসানা ওয়া ইল্লাম তাগফির লানা ওয়া তারহামনা লানাকুনান্না মিনাল খসিরিন।

হে আমাদের রব! আমরা আমাদের নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের ওপর দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।" (সূরা আল-আ’রাফ, ৭:২৩)

অনুধাবন: প্রাণ-প্রকৃতির ওপর করা যেকোনো অন্যায় মূলত নিজের নফসের ওপর জুলুম। আদি পিতা সালামুন আলা আদম-এর এই দুআটি যেকোনো ধরনের সীমালঙ্ঘন থেকে ফেরার শ্রেষ্ঠ উপায়। 

মানুষের হাতের কামাই বা কর্মের কারণেই স্থলে ও জলে বিপর্যয় দেখা দেয়। যখনই আমরা কোনো প্রাণ নষ্ট করি বা প্রকৃতির ক্ষতি করি, তখন নিচের এই দুআটি পাঠ করা জরুরি। এই আয়াতে আল্লাহ শিখিয়েছেন যে, অপরাধ যাই হোক না কেন, তা ‘জুলুম’ হিসেবে স্বীকার করে নিতে হবে। এটি কেবল আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার দুআ নয়, বরং নিজের অহংকার ভেঙে সত্যকে গ্রহণ করার পথ।

২. কৃত কর্মের জন্য নির্দিষ্টভাবে ক্ষমা প্রার্থনা/ ভারসাম্য (মিজান) নষ্ট করার অপরাধ থেকে মুক্তির দুআ:

আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করে তাতে ‘মিজান’ বা ভারসাম্য স্থাপন করেছেন। প্রকৃতির ওপর জুলুম মানে এই ভারসাম্য নষ্ট করা। -"তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং স্থাপন করেছেন ভারসাম্য (মিজান)। যাতে তোমরা ভারসাম্যলঙ্ঘন না করো।" (সূরা আর-রহমান, ৫৫:৭-৮)

যদি কারো ওপর জুলুম বা শারীরিক/মানসিক আঘাত হয়ে যায়, তবে সালামুন আলা মূসা-এর এই দুআটি অত্যন্ত কার্যকরী। তিনি যখন অনিচ্ছাকৃতভাবে একজনের ওপর আঘাত করেছিলেন, তখন তিনি সরাসরি আল্লাহর কাছে এভাবে ক্ষমা চেয়েছিলেন।

অনুধাবন: যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে বা ভুলবশত কোনো ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় (যেমন—বিনা কারণে গাছ কাটা বা পশুপাখি নিধন), তবে সালামুন আলা মূসা-এর এই দুআটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যিনি একটি প্রাণহানির পর অত্যন্ত অনুতপ্ত হয়ে বলেছিলেন:

 رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَغَفَرَ لَهُ ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

রব্বি ইন্নি জলামতু নাফসি ফাগফিরলি।

হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমি আমার নিজের ওপর জুলুম করেছি, অতএব আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। অতঃপর তিনি (আল্লাহ) তাকে ক্ষমা করে দিলেন। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আল-কাসাস, ২৮:১৬)

অনুধাবন: এখানে শিক্ষণীয় বিষয় হলো, যখনই কোনো অন্যায় হয়ে যাবে, কালক্ষেপণ না করে ‘রব্বি ইন্নি জলামতু নাফসি’ (হে আমার প্রতিপালক, আমি জুলুম করেছি) বলে আল্লাহর শরণাপন্ন হতে হবে।

৩. সকল কাজে বাড়াবাড়ি (ইসরাফ) থেকে রক্ষার দুআ:

যেকোনো বিষয়ে বাড়াবাড়ি থেকে বাঁচতে কুরআনের এই দুআটি সবচেয়ে শক্তিশালী, যা মুমিনদের হকের ওপর অবিচল রাখে।

"رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا

রব্বানাগফির লানা যুনুবানা ওয়া ইসরাফানা ফী আমরিনা ওয়া সাব্বিত আকদামানা।

অর্থ: "হে আমাদের রব! আমাদের গুনাহসমূহ এবং আমাদের কাজে আমাদের যে বাড়াবাড়ি (ইসরাফ) হয়ে গিয়েছে তা ক্ষমা করে দিন এবং আমাদের পা-সমূহকে দৃঢ় রাখুন।" (সূরা আল-ইমরান, ৩:১৪৭)

➤ অনুধাবন-: ‘ইসরাফানা ফী আমরিনা’ অংশটি দিয়ে জীবনের সকল ক্ষেত্রের বাড়াবাড়ি (প্রকৃতি বিনাশ বা জুলুম) অন্তর্ভুক্ত হয়। তওবার পর পা যেন আর পিছলে না যায়, সেজন্য ‘সাব্বিত আকদামানা’ (পা দৃঢ় রাখুন) বলা হয়েছে। 

◈ ৪. কঠিন বিপদ ও সংকটে পড়ার পর মুক্তির দুআভবিষ্যতে বাড়াবাড়ি থেকে বাঁচার রক্ষাকবচ:

নিজের মেজাজ ও ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করে ভবিষ্যতে সীমালঙ্ঘন থেকে বাঁচতে এই তাসবিহটি নিয়মিত পাঠ করা জরুরি:

অনেক সময় জুলুম বা অন্যায়ের ফলে মানুষের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় সালামুন আলা ইউনুস-এর সেই বিখ্যাত তাসবিহ বা দুআটি পড়ার নির্দেশ কুরআন আমাদের দেয় (আরও দ্র: 37:139-।46)

لَّا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনায যলিমিন।

অর্থ: "আপনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই, আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয়ই আমি জালেমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।" (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৮৭)

অনুধাবন-1: আল্লাহ তায়ালা এই দুআটির পর ৮৮ নম্বর আয়াতে বলেছেন— "এভাবেই আমি মুমিনদের মুক্তি দিয়ে থাকি।" সুতরাং জুলুমের অনুতাপে দগ্ধ ব্যক্তির জন্য এটি সর্বশ্রেষ্ঠ মুক্তির উপায়।

➤ অনুধাবন-2: এটি সালামুন আলা ইউনুস-এর দুআ। যখনই মনে হবে আমি কোনো সৃষ্টির ওপর জুলুম করে ফেলেছি, তখনই এই তাসবিহটি স্বীকারোক্তি হিসেবে কাজ করবে এবং ভবিষ্যতে ইনসাফপূর্ণ জীবন গড়ার প্রেরণা দেবে।

৪. ক্ষমার শর্ত: তওবা ও ইসলাহ (সংশোধন) ‘ইসলাহ’ বা সংশোধনের মাধ্যমে সুরক্ষার পথ:

কুরআনের নীতি হলো—"ক্ষমা কেবল তওবা ও সংশোধনের (ইসলাহ) পরে।"

"পৃথিবীতে সংশোধন হওয়ার পর তোমরা তাতে বিপর্যয় (ফাসাদ) সৃষ্টি করো না। তাঁকে ডাকো ভয় ও আশা নিয়ে। নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত মুহসিনদের (সদাচারী) অতি নিকটে।" (সূরা আল-আ’রাফ, ৭:৫৬)

"অতঃপর যারা অজ্ঞতাবশত মন্দ কাজ করে, তারপর তওবা করে এবং নিজেদের সংশোধন করে (ইসলাহ), নিশ্চয়ই আপনার রব এরপর তাদের জন্য পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আন-নাহল, ১৬:১১৯)

➤ অনুধাবন: ‘আসলাহূ’ (সংশোধন করা) শব্দের অর্থ হলো—যার ওপর জুলুম করা হয়েছে তার হক ফিরিয়ে দেওয়া বা তার কাছে ক্ষমা চেয়ে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলা। যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ মানুষের পাওনা বা অধিকার (হক) ফিরিয়ে না দেবে, ততক্ষণ আল্লাহর ক্ষমা পূর্ণতা পায় না।

কুরআনি সামঞ্জস্যতা (Internal Coherence) অনুযায়ী, কেবল মুখে দুআ করলেই ক্ষমা পূর্ণ হয় না, বরং তার সাথে ‘ইসলাহ’ বা সংশোধন প্রয়োজন। বিশেষ করে জুলুম যদি কোনো মানুষের সাথে সম্পর্কিত হয়।

প্রাণ-প্রকৃতির ওপর জুলুম করার পর তওবার অংশ হলো ‘ইসলাহ’। অর্থাৎ গাছ কাটলে গাছ লাগানো, কোনো প্রাণীকে কষ্ট দিলে তার ক্ষতিপূরণ বা সেবা করা। এই সংশোধনমূলক কাজের মাধ্যমেই আল্লাহর রহমত পাওয়া যায়।

করণীয়: আপনি যদি কারো ওপর জুলুম করে থাকেন, তবে আল-কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী আপনার করণীয় হলো:

১. সালামুন আলা আদম-এর মতো অপরাধ স্বীকার করে ‘রব্বানা জলামনা...’ দুআটি পাঠ করা।

২. সালামুন আলা মূসা-এর মতো আল্লাহর কাছে সরাসরি ক্ষমা চাওয়া।

৩. সূরা আন-নাহল (১৬:১১৯) অনুযায়ী, যার ওপর জুলুম করেছেন তার কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া বা তার ক্ষতিপূরণ করে দেওয়া (ইসলাহ)।

সর্বশেষ প্রার্থনা:

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
উচ্চারণ: রব্বানাগফির লানা ওয়ালি ইখওয়ানিনাল্লাযিনা সাবাকুনা বিল ঈমানি ওয়ালা তাজআল ফী কুলুবিনা গিল্লাল লিল্লাযিনা আমানু রব্বানা ইন্নাকা রউফুর রহিম।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের সেই ভাইদের ক্ষমা করুন যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে। আর মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আপনি পরম দয়ালু, অতি দয়াবান (সূরা হাশর, ৫৯:১০)

আল-কুরআন আমাদের শেখায় যে, মহাবিশ্বের প্রতিটি সৃষ্টিই আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে। তাই যেকোনো অণু পরিমাণ জুলুম বা বাড়াবাড়ি থেকে বাঁচতে হলে আমাদের সদা সচেতন থাকতে হবে। ওপরের দুআসমূহ পাঠ করার পাশাপাশি শপথ নিতে হবে যে—"রব্বি ফালান আকুনা যহীরল লিলমুজরিমীন" (হে আমার রব, আমি আর কখনো অপরাধীদের সাহায্যকারী হব না—২৮:১৭)।

 ভবিষ্যতে অপরাধীদের সহায়তা না করা:

অনুতপ্ত হয়ে তওবা ও ইসলাহ (সংশোধন)-এর পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই হকের পথে অবিচল থাকা এবং ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের জুলুম বা জালিমদের সহযোগিতা করা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা। আল-কুরআনে এই বিষয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী দিকনির্দেশনা ও দুআ রয়েছে: নিজেকে জুলুম থেকে বাঁচিয়ে রাখার আত্মরক্ষা কবচ হিসেবে নিচের আয়াত ও দুআসমূহ সংযোজন করা হলো।

১. ভবিষ্যতে অপরাধীদের সহায়তা না করার সুদৃঢ় অঙ্গীকার:

জুলুম থেকে ফিরে আসার পর একজন মুমিনের প্রধান কাজ হলো এই অঙ্গীকার করা যে, সে আর কখনো কোনো অপরাধী বা জালিম গোষ্ঠীকে সমর্থন দেবে না। সালামুন আলা মূসা যখন তাঁর ভুল বুঝতে পারলেন, তখন তিনি আল্লাহর কাছে একটি ঐতিহাসিক অঙ্গীকার করেছিলেন যা আমাদের জন্য দুআ ও শিক্ষা।

 رَبِّ بِمَا أَنْعَمْتَ عَلَيَّ فَلَنْ أَكُونَ ظَهِيرًا لِّلْمُجْرِمِينَ
রব্বি বিমা আনআমতা আলাইয়্যা ফালান আকুনা যহীরল লিলমুজরিমীন।

অর্থ: হে আমার রব! আপনি আমার ওপর যে নেয়ামত দান করেছেন, এরপর আমি কখনোই অপরাধীদের সাহায্যকারী হব না (সূরা আল-কাসাস, ২৮:১৭)

অনুধাবন: এই আয়াতে ‘যহীর’ (সহায়তাকারী/পৃষ্ঠপোষক) শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জুলুম থেকে তওবা করার পর এটিই হলো শ্রেষ্ঠ ইস্তেকামাত বা দৃঢ়তা যে, কোনো অবস্থাতেই অন্যায় কাজে কারো ‘সাপোর্ট’ বা সহযোগিতা করা যাবে না। আল্লাহর নেয়ামতের শোকরিয়া হলো অন্যায়ের সঙ্গ ত্যাগ করা।

২. জালিমদের দলে অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার আরজি:

ভুলবশত বা পরিবেশের চাপে পড়ে যেন আবার জালিমদের কাতারে নাম না ওঠে, সেজন্য কুরআনে এই দুআটি শেখানো হয়েছে।

رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
রব্বানা লা তাজআলনা মাআল কউমিয যলিমীন।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের জালিম সম্প্রদায়ের সঙ্গী করবেন না।" (সূরা আল-আ’রাফ, ৭:৪৭)

অনুধাবন: মানুষ অনেক সময় নিজের অজান্তেই জালিমদের সাহচর্য বা বন্ধুত্বের কারণে জুলুমে জড়িয়ে পড়ে। এই দুআটি পাঠ করলে আল্লাহ তায়ালা অন্তরকে জালিমদের প্রভাব ও তাদের সাহচর্য থেকে দূরে রাখেন।

৩. জুলুমের পরিবেশ থেকে মুক্তির প্রার্থনা:

যদি কেউ এমন পরিবেশে থাকে যেখানে জুলুম করা বা হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না, তবে তার জন্য সালামুন আলা মুহাম্মদ-কে শেখানো এই দুআটি অত্যন্ত জরুরি।

رَّبِّ فَلَا تَجْعَلْنِي فِي الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
রব্বি ফালা তাজআলনী ফিল কউমিয যলিমীন।

অর্থ: "হে আমার রব! তবে আপনি আমাকে জালিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করবেন না।" (সূরা আল-মুমিনুন, ২৩:৯৪)

অনুধাবন: এই দুআটি মুমিনকে মানসিকভাবে দৃঢ় করে যেন সে যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজের নীতিতে অটল থাকতে পারে এবং কোনো অন্যায় সমাজ বা ব্যবস্থার অংশ না হয়।

◈ 4. একজন মহিয়শী নারীর যিনি জুলুম বা জালিমি পরিবেশ থেকে রক্ষার জন্য সেই কালজয়ী দুআ-এর দৃষ্টান্ত বিশ^বাসীর জন্য এভাবে-

আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের জন্য একটি আদর্শ বা দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি যখন মজলুম অবস্থায় ছিলেন, তখন কেবল দুনিয়ার মুক্তি নয়, বরং আল্লাহর সান্নিধ্য ও জান্নাত কামনা করেছিলেন। "আর আল্লাহ মুমিনদের জন্য ফেরাউনের স্ত্রীর উদাহরণ পেশ করছেন; যখন তিনি বলেছিলেন (66:11):

رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِن فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ

রব্বিবনি লী ইনদাকা বাইতান ফিল জান্নাতি ওয়া নাজ্জিনী মিন ফিরআউনা ওয়া আমালিহী ওয়া নাজ্জিনী মিনাল কউমিয যলিমীন।

হে আমার রব! আমার জন্য আপনার সান্নিধ্যে জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করুন এবং আমাকে ফেরাউন ও তার দুষ্কর্ম থেকে রক্ষা করুন, আর আমাকে জালিম সম্প্রদায় থেকে নাজাত দিন।" (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬:১১)

رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ ۝ وَنَجِّنَا بِرَحْمَتِكَ مِنَ الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
রব্বানা লা তাজআলনা ফিতনাতাল লিলকউমিয যলিমীন, ওয়া নাজ্জিনা বিরাহমাতিকা মিনাল কউমিল কাফিরীন।

অর্থ: "হে আমাদের রব! আমাদের জালিম কউমের পরীক্ষার পাত্র বানাবেন না। আর আপনার রহমতে আমাদের কাফির কউম থেকে রক্ষা করুন।" (সূরা ইউনুস, ১০:৮৫-৮৬)

5. শয়তানের প্ররোচনা ও ক্রোধ থেকে বাঁচার উপায়:

অধিকাংশ জুলুম বা অন্যায় মানুষের রাগ বা শয়তানের প্ররোচনার কারণে ঘটে থাকে। এই প্ররোচনা থেকে বাঁচতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন:

  رَّبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ ۝ وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحْضُرُونِ
রব্বি আউযুবিকা মিন হামাযাতিশ শায়াতীন, ওয়া আউযুবিকা রব্বি আই ইয়াহযুরুন।

অর্থ: "বলো: হে আমার রব! আমি শয়তানের প্ররোচনা থেকে আপনার আশ্রয় চাচ্ছি। আর হে আমার রব! তারা আমার কাছে উপস্থিত হওয়া থেকেও আপনার আশ্রয় চাচ্ছি।" (সূরা আল-মুমিনুন, ২৩:৯৭-৯৮)

অনুধাবন: ভবিষ্যতে আবার কোনো জুলুমে লিপ্ত হওয়ার প্রধান উসকানি আসে শয়তানের পক্ষ থেকে। এই দুআটি নিয়মিত পাঠ করলে মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আসে এবং মানুষ অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারে।

6. হকের ওপর অবিচল (ইস্তেকামাত) থাকার বিশেষ দুআ/ হকের পথে অবিচল ও অটল থাকার সম্মিলিত দুআ:

তওবা করার পর যেন অন্তর আবার বক্র হয়ে না যায়, সেজন্য কুরআনের এই সর্বশ্রেষ্ঠ দুআটি নিয়মিত পাঠ করা কর্তব্য।

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنْكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ"
রব্বানা লা তুযিগ কুলুবানা বা’দা ইয হাদাইতানা ওয়া হাবলানা মিল্লাদুনকা রহমাহ, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহাব।

অর্থ: "হে আমাদের রব! আপনি আমাদের হেদায়েত দান করার পর আমাদের অন্তরসমূহকে বক্র করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি পরম দাতা।" (সূরা আল-ইমরান, ৩:৮)

অনুধাবন: এই আয়াতে ‘হেদায়েত’ বা ‘হুদা’ পাওয়ার পর তা ধরে রাখার আকুতি জানানো হয়েছে। জুলুম ছেড়ে হকের পথে আসাই হলো বড় হেদায়েত, আর সেই পথে টিকে থাকাই হলো চূড়ান্ত সফলতা।

জুলুম এবং বাড়াবাড়ি থেকে মুক্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর পথে টিকে থাকার জন্য এই দুআটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ:

رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
রব্বানা আফরিগ আলাইনা সাবরান ওয়া সাব্বিত আকদামানা ওয়ানসুরনা আলাল কউমিল কাফিরীন।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের ওপর ধৈর্য ঢেলে দিন, আমাদের পা-সমূহকে দৃঢ় রাখুন এবং কাফির সম্প্রদায়ের ওপর আমাদের সাহায্য করুন। (সূরা আল-বাকারা, ২:২৫০)

➤ অনুধাবন: এই দুআটি সালামুন আলা দাউদ এবং তাঁর সঙ্গীরা জালিম শাসক জালুত ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সময় করেছিলেন। যখন কেউ জুলুমের সঙ্গ ত্যাগ করে হকের পথে আসে, তখন তার ওপর বিভিন্ন চাপ আসতে পারে। সেই চাপ সহ্য করে পা দৃঢ় রাখাই হলো বড় সফলতা।

সারকথা ও সিদ্ধান্ত:

আল-কুরআনের এই দুআসমূহ কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং এগুলো একেকটি জীবনদর্শন।

সালামুন আলা মূসা-এর মতো অঙ্গীকার করুন যে—"আমি আর কখনো অপরাধীদের সাপোর্ট দেব না।"

সালামুন আলা মুহাম্মদ-এর শিখিয়ে দেওয়া পথে শয়তানের প্ররোচনা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চান।

❖ যেকোনো ধরনের বাড়াবাড়ি বা সীমালঙ্ঘন থেকে বাঁচতে নিজের অন্তরকে আল্লাহর রহমতের চাদরে আবৃত রাখুন।

মনে রাখবেন, প্রকৃত তওবা বা ইস্তেগফার কেবল অতীতের গুনাহ মোচন করে না, বরং ভবিষ্যতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার দেয়াল তৈরি করে দেয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের তওবা কবুল করে হকের পথে অবিচল রাখুন।


যেকোনো কাজে বাড়াবাড়ি  ও সীমালঙ্ঘন থেকে ক্ষমার জন্য দুআ:

-কুরআনের পরিভাষায় ‘ইসরাফ’ (الإسراف) বা ‘আসরাফূ’ শব্দটির অর্থ কেবল অপচয় নয়, বরং এর গভীর অর্থ হলো—আল্লাহর নির্ধারিত সীমালঙ্ঘন করা, নিজের ওপর জুলুম করা কিংবা যেকোনো কাজে বাড়াবাড়ি করা। তওবা ও ইসলাহ্-এর পূর্ণতার জন্য নিজের করা ‘ইসরাফ’ বা বাড়াবাড়ি থেকে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে তা থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া অপরিহার্য। 

আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন শব্দের মাধ্যমে (যেমন: ই’তিদা, যুলম, খাতা’) এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন এবং তা থেকে পরিত্রাণ ও ক্ষমার জন্য একাধিক শক্তিশালী দুআ ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ‘ ‘আসরাফূ’ বা সীমালঙ্ঘন থেকে ক্ষমার জন্য প্রাসঙ্গিক ও প্রত্যক্ষ দুআসমূহ নিচে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হলো।

◈ ‘আসরাফূ’ বা বাড়াবাড়ি করার পর আল্লাহর আশার বাণী/আয়াত:

জুলুম বা অন্যায়ের মাধ্যমে যারা নিজেদের নফসের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছে, তাদের হতাশ না হতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন সালামুন আলা মুহাম্মদ-এর মাধ্যমে।

"বলো, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি (আসরাফূ) করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন।" (সূরা আজ-জুমার, ৩৯:৫৩)

➤ অনুধাবন: আল্লাহ তায়ালা ‘ইসরাফ’ বা বাড়াবাড়িকে সরাসরি ক্ষমার যোগ্য বলেছেন যদি বান্দা তওবা করে ফিরে আসে। এটি আমাদের জন্য বড় মানসিক শক্তি যে, অতীতের বড় কোনো জুলুম বা বাড়াবাড়ি আমাদের চিরস্থায়ীভাবে পথভ্রষ্ট করতে পারবে না যদি আমরা ফিরে আসি।

 মুসরিফ বা বাড়াবাড়িকারীদের দলভুক্ত না হওয়ার সতর্কতা:

ভবিষ্যতে যেন আবার কোনো বাড়াবাড়িতে লিপ্ত না হই, সেজন্য মুসরিফদের (সীমালঙ্ঘনকারী) পরিণাম কুরআন থেকে অনুধাবন করা জরুরি।

অতঃপর আমি তাদের (রাসূলদের) দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলাম। ফলে আমি তাদেরকে ও যাদের ইচ্ছা রক্ষা করলাম এবং বাড়াবাড়িকারীদের (মুসরিফীন) ধ্বংস করে দিলাম (সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৯)

➤ অনুধাবন: কুরআনের এই বর্ণনা আমাদের মনে আল্লাহর ভয় জাগ্রত করে। বাড়াবাড়ি বা সীমালঙ্ঘন হলো ধ্বংসের কারণ। সুতরাং ভবিষ্যতে কোনো জুলুমের সাপোর্ট করা বা নিজে জুলুম করা মানেই ধ্বংসের পথে পা বাড়ানো। নিজেকে এই ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে সবসময় সচেতন থাকতে হবে।

◈ 1. মুসরিফদের কথা ও প্ররোচনা থেকে দূরে থাকার দুআ:◈ নিজের সকল বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘন থেকে ক্ষমার শ্রেষ্ঠ দুআ 

দুনিয়াতে অনেক সময় এমন লোক বা নেতৃত্ব থাকে যারা নিজেরা মুসরিফ (বাড়াবাড়িকারী) এবং অন্যদেরও সেই পথে ডাকে। তাদের অনুসরণ থেকে বাঁচতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন:

"আর তোমরা বাড়াবাড়িকারীদের (মুসরিফীন) আদেশ মান্য করো না; যারা পৃথিবীতে ফাসাদ (বিপর্যয়) সৃষ্টি করে এবং সংশোধন (ইসলাহ) করে না।" (সূরা আশ-শুয়ারা, ২৬:১৫১-১৫২)

তওবার পর ‘ইসলাহ’ বা সংশোধন যারা করে না, তারা মুসরিফ। এই আয়াতটি আমাদের ভবিষ্যতে বন্ধু নির্বাচনে এবং সামাজিক-রাজনৈতিক সমর্থনে সতর্ক করে দেয়। বাড়াবাড়িকারীদের সমর্থন করা মানেই তাদের ফাসাদের অংশীদার হওয়া।

পূর্ববর্তী ক্বওমদের মধ্যে যারা ঈমানের ওপর অটল ছিলেন এবং জিহাদের ময়দানে সংকটের সম্মুখীন হতেন, আল্লাহ তায়ালা তাদের একটি বিশেষ দুআ শিখিয়েছেন। এই দুআটি মূলত নিজেদের সকল ‘ইসরাফ’ বা বাড়াবাড়ি থেকে ক্ষমা চাওয়ার জন্য।

" رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

উচ্চারণ: রব্বানাগফির লানা যুনুবানা ওয়া ইসরাফানা ফী আমরিনা ওয়া সাব্বিত আকদামানা ওয়ানসুরনা আলাল কউমিল কাফিরীন।

অর্থ: "আর তাদের কথা এছাড়া আর কিছুই ছিল না যে, তারা বলল: 

হে আমাদের রব! আমাদের গুনাহসমূহ এবং আমাদের কাজে আমাদের যে বাড়াবাড়ি (ইসরাফ) হয়ে গিয়েছে তা ক্ষমা করে দিন, আমাদের পা-সমূহকে দৃঢ় রাখুন এবং কাফির সম্প্রদায়ের ওপর আমাদের সাহায্য করুন।" (সূরা আল-ইমরান, ৩:১৪৭)

➤ অনুধাবন: এই আয়াতে ‘ইসরাফানা ফী আমরিনা’ শব্দসমষ্টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষ যখন কোনো কাজে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে বা জুলুম করে ফেলে, তখন সেটিই হলো তার ‘আমরে’ বা বিষয়ে বাড়াবাড়ি। এই দুআটি পাঠ করলে আল্লাহ যেমন অতীতের বাড়াবাড়ি ক্ষমা করেন, তেমনি ভবিষ্যতে হকের ওপর টিকে থাকার জন্য ‘সাব্বিত আকদামানা’ (পা দৃঢ় রাখা)-এর মাধ্যমে শক্তি দান করেন।

2. ভুলবশত সীমালঙ্ঘন ও বোঝার চেয়ে বেশি অন্যায়ের বোঝা থেকে মুক্তির দুআ 

মানুষ যখন নিজের ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কোনো অন্যায়ে জড়িয়ে পড়ে বা ভুলে কোনো সীমালঙ্ঘন করে ফেলে, তখন সূরা বাকারার এই শেষ দুআটি হলো সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রার্থনা। আল্লাহ তায়ালা এটি আমাদের শিখিয়েছেন যেন কোনো অনিচ্ছাকৃত ‘ইসরাফ’ আমাদের ধ্বংস না করে।

رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا ۚ رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا ۚ رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ ۖ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا...

উচ্চারণ: রব্বানা লা তুআখিযনা ইন নাসিনা আও আখত’না, রব্বানা ওয়ালা তাহমিল আলাইনা ইসরন কামা হামালতাহু আলাল্লাযিনা মিন কবলিনা, রব্বানা ওয়ালা তুহাম্মিলনা মা লা ত-কতা লানা বিহ, ওয়া’ফু আন্না ওয়াগফির লানা ওয়ারহামনা।

অর্থ: "হে আমাদের রব! যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদের ধরবেন না। হে আমাদের রব! আমাদের ওপর এমন বোঝার ভার দেবেন না যা আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর দিয়েছিলেন। হে আমাদের রব! এমন ভার আমাদের ওপর দেবেন না যা বহন করার শক্তি আমাদের নেই। আপনি আমাদের ক্ষমা করুন, আমাদের গুনাহ মাফ করুন এবং আমাদের ওপর দয়া করুন।" (সূরা বাকারা, ২:২৮৬)

অনুধাবন: ‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’ পদ্ধতিতে ‘আখত’না’ (আমরা ভুল করেছি) শব্দটি ‘ইসরাফ’ বা সীমালঙ্ঘনের সাথে সরাসরি যুক্ত। আমরা যখন কোনো কাজে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি (ইসরাফ করি), তখন আমরা মূলত আল্লাহর দেওয়া সীমারেখায় ভুল করে বসি। এই দুআটি সেই ভুলের কারণে সৃষ্ট শাস্তির বোঝা থেকে মুক্তি দেয়।

3. জাতির বা ব্যক্তির ভুল ও মূর্খতাজনিত সীমালঙ্ঘন থেকে ক্ষমার দুআ:

সালামুন আলা মূসা যখন দেখলেন তাঁর সম্প্রদায়ের কিছু লোক বাছুর পূজা করে চরম সীমালঙ্ঘন (ইসরাফ) করেছে, তখন তিনি আল্লাহর কাছে এই আরজি জানিয়েছিলেন। এটি যেকোনো ধরনের চরম বাড়াবাড়ি থেকে ক্ষমার একটি বড় দলিল।

رَبِّ لَوْ شِئْتَ أَهْلَكْتَهُم مِّن قَبْلُ وَإِيَّـىَ ۖ أَتُهْلِكُنَا بِمَا فَعَلَ ٱلسُّفَهَآءُ مِنَّآ ۖ إِنْ هِىَ إِلَّا فِتْنَتُكَ تُضِلُّ بِهَا مَن تَشَآءُ وَتَهْدِى مَن تَشَآءُ ۖ أَنتَ وَلِيُّنَا فَٱغْفِرْ لَنَا وَٱرْحَمْنَا ۖ وَأَنتَ خَيْرُ ٱلْغَـفِرِينَ. وَٱكْتُبْ لَنَا فِى هَـذِهِ ٱلدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِى ٱلْـَٔاخِرَةِ إِنَّا هُدْنَآ إِلَيْكَ۞

রব্বি লাও শি”তা আহ্লাক্তাহুম্ মিন্ ক্ববøু-অ ইয়্যা-ইয়া আতুহ্লিকুনা- বিমা-ফা‘আলাস্ সুফাহা- য়ু মিন্না- ইন্ হিয়া ইল্লা- ফিতœাতুক্ ; তুদ্ধিল্লু বিহা-মান্ তাশা- য়ু অতাহ্দী মান্ তাশা-য়ু; আংতা অলিয়্যুনা-ফার্গ্ফিলানা-র্অহাম্না- অআংতা খাইরুল্ গ-ফিরীন্। অক্তুব্ লানা-ফী হা-যিহিদ্ দুন্ইয়া- হাসানাতাঁও অফিল্ আ-খারতি ইন্না-হুদ্না- ইলাইক্।  

অর্থ: (এরপর যখন ভ‚মিকম্প (earthquake) তাদেরকে আক্রান্ত করল, সে বলল!)  হে আমার রব! আপনি যদি চাইতেন, তবে পূর্বেই তাদেরকে ও আমাকে ধ্বংস করতে পারতেন। আমাদের মধ্য থেকে নির্বোধরা যা করেছে সে কারনে কি আপনি আমাদেরকে ধ্বংস করবেন? নিশ্চয়ই সেটা কেবল আপনার পরীক্ষা। সেটা দিয়ে যাকে চান আপনি পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান আপনি হেদায়েত করেন।  আপনিই আমাদের অভিভাবক। সুতরাং আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং  আমাদেরকে অনুগ্রহ করুন। আর আপনিইতো সর্বোত্তম ক্ষমাকারী। আর পৃথিবীতে এবং আখেরাতে আমাদের জন্য কল্যাণ লিখে দিন। নিশ্চয়ই আমরা, আমরাই আপনার দিকে পথ ধরেছি- আল কুরআন ৭:১৫৫-১৫৬

অনুধাবন: অনেক সময় আমরা অন্যদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে বা নিজের নির্বুদ্ধিতার কারণে ‘ইসরাফ’ বা অন্যায়ে লিপ্ত হই। এই দুআটি আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের দোহাই দিয়ে ক্ষমা চাওয়ার একটি প্রত্যক্ষ পদ্ধতি।

◈ 4. সব অপরাধ ও বাড়াবাড়ি মুছে নূর পূর্ণ করার দুআ:

মুমিনদের জন্য আখেরাতে যখন নূর বণ্টন করা হবে, তখন তারা তাদের ছোট-বড় সকল বাড়াবাড়ি ও ভুলের জন্য এই দুআটি করতে থাকবে।

رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ"
উচ্চারণ: রব্বানা আতমিম লানা নূরানা ওয়াগফির লানা, ইন্নাকা আলা কুল্লি শাইয়িন কদীর।
অর্থ: "হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের নূর পূর্ণ করে দিন এবং আমাদের ক্ষমা করুন; নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।" (সূরা আত-তাহরীম, ৬৬:৮)

➤ অনুধাবন: বাড়াবাড়ি বা ইসরাফ মানুষের জীবনের নূর বা হেদায়েতের আলোকে কমিয়ে দেয়। এই দুআটি সেই অভাব পূরণ করে ঈমানি শক্তি বাড়িয়ে দেয় যেন ভবিষ্যতে আর কোনো পঙ্কিলতায় পা না পড়ে।

নফসের ওপর চূড়ান্ত সীমালঙ্ঘনের (ইসরাফ) পর পূর্ণাঙ্গ তওবা:

সূরা যুমারে আল্লাহ তায়ালা ‘আসরাফূ’ শব্দটিকে সরাসরি উল্লেখ করে যে সান্ত্বনা দিয়েছেন, তারই প্রেক্ষাপটে আল-কুরআন আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে আল্লাহর দিকে পুরোপুরি রুজু হতে হয়।

তোমরা তোমাদের রবের অভিমুখী হও এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করো (ইসলাম কবুল করো) তোমাদের কাছে আজাব আসার আগে; এরপর তোমরা কোনো সাহায্য পাবে না।" (সূরা আজ-জুমার, ৩৯:৫৪)

অনুধাবন: ৩৯:৫৩ আয়াতে ‘আসরাফূ’ করার পর ৫৪ আয়াতে ‘আনিবূ’ (আল্লাহর দিকে ফিরে আসো) বলা হয়েছে। এটি কোনো গতানুগতিক দুআ নয়, বরং এটি একটি জীবন পরিবর্তনকারী নির্দেশ। সীমালঙ্ঘনের পর কেবল দুআ পড়া যথেষ্ট নয়, বরং পুরোপুরি আল্লাহর হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণ করাই হলো ‘ইসরাফ’ থেকে বাঁচার প্রকৃত দুআ।

ভবিষ্যতে সীমালঙ্ঘন (ই’তিদা) থেকে বেঁচে থাকার সুরক্ষা:

আল্লাহ তায়ালা সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। এটি মাথায় রেখে ভবিষ্যতে যেন কোনো সীমালঙ্ঘন না হয়, সেজন্য এই সতর্কবাণীটি অন্তরে ধারণ করে দুআ করা জরুরি।

ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ
অর্থ: তোমরা তোমাদের রবকে ডাকো সবিনয়ে এবং গোপনে; নিশ্চয়ই তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের (মু’তাদীন) পছন্দ করেন না।" (সূরা আল-আ’রাফ, ৭:৫৫)

অনুধাবন: ‘মু’তাদীন’ এবং ‘মুসরিফীন’ (বাড়াবাড়িকারী) শব্দ দুটি কুরআনে প্রায় সমার্থকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই আয়াতে আল্লাহ শিখিয়েছেন যে, দুআ করার পদ্ধতিটিও হতে হবে বিনম্র (তাদররুআ)। অহংকার বা দম্ভের সাথে দুআ করাও এক প্রকার সীমালঙ্ঘন। সুতরাং বিনয়ের সাথে ক্ষমা চওয়াই হলো বাড়াবাড়ি থেকে বাঁচার পথ।

সমন্বয় ও জীবন-দর্শন (Internal Coherence):

কুরআনি সামঞ্জস্যতা আমাদের বলে:
স্বীকৃতি: ২:২৮৬ এর মাধ্যমে নিজের দুর্বলতা ও ভুল স্বীকার করা।

আশ্রয়: ৭:১৫৫ এর মাধ্যমে আল্লাহর অভিভাবকত্ব কামনা করা।

অবিচলতা: ৬৬:৮ এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে নূরের পথে থাকার প্রার্থনা করা।

◈ সারকথা ও জীবন-দর্শন ◈

আল-কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী ‘আসরাফূ’ বা বাড়াবাড়ি থেকে বাঁচার তিনটি স্তম্ভ:

১. স্বীকৃতি: ৩:১৪৭ আয়াতের মাধ্যমে স্বীকার করা যে, আমার কাজে বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।

২. অঙ্গীকার: ২৬:১৫১ আয়াত অনুযায়ী ভবিষ্যতে কোনো মুসরিফ বা বাড়াবাড়িকারীর আনুগত্য বা সাপোর্ট না করা।

৩. ইস্তেকামাত: ২:২৫০ আয়াতের মাধ্যমে ধৈর্য ও দৃঢ়তার জন্য আল্লাহর সাহায্য চাওয়া।

আল-কুরআনের এই দুআগুলো নিয়মিত পাঠ এবং এর অর্থ হৃদয়ে লালন করলে ইনশাআল্লাহ যেকোনো ধরনের ‘ইসরাফ’ (বাড়াবাড়ি), ‘ই’তিদা’ (সীমালঙ্ঘন) এবং ‘যুলম’ (অবিচার) থেকে আল্লাহ আমাদের হিফাজত করবেন।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post