➢ পারস্পরিক সম্পর্ক: এখানে দেখা যাচ্ছে, যখনই মানুষ নিজেকে ‘বেশি সম্পদশালী’ ও ‘বেশি ক্ষমতাধর’ দেখে, তখনই সে তার সামনে থাকা সঙ্গীকে (যিনি হয়তো আর্থিকভাবে দুর্বল) খাটো করে কথা বলে। সে ভুলে যায় যে, এই সামর্থ্য আল্লাহর দান। সে মনে করে এই সম্পদই তাকে অন্যদের ওপর ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ (Dominance) দিয়েছে। ফলে সে তার পুরনো বন্ধু বা শুভাকাঙ্ক্ষীদের যথাযথ মর্যাদার জায়গায় রাখতে চায় না।
◈ সামাজিক উপেক্ষা ও ‘তাস’ঈর’ (Social Disregard):
ক্ষমতা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতার অহংকারে মানুষ অন্যকে কীভাবে উপেক্ষা করে, তার একটি সূক্ষ্ম চিত্র আল্লাহ সূরা লোকমানের ১৮ নম্বর আয়াতে দিয়েছেন:
“আর তুমি মানুষের দিক থেকে তোমার গাল ফিরিয়ে নিও না (অহংকারবশে)।”
➢ এখানে ‘তুসা’ইর’ (تُصَعِّرْ) শব্দটি এসেছে ‘সা’আর’ (Sa’ar) থেকে। এটি মূলত উটের এক প্রকার রোগ, যা হলে উটের ঘাড় বেঁকে যায় এবং সে একদিকে তাকিয়ে থাকে।
➢ প্রয়োগ: যখন মানুষ নিজেকে প্রভাবশালী ভাবে, তখন সে অন্যের সাথে কথা বলার সময় সোজা হয়ে তাকায় না বা মনোযোগ দেয় না। এই ‘ঘাড় বাঁকিয়ে রাখা’ বা ‘মুখ ফিরিয়ে নেওয়া’ হলো অবজ্ঞার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। সে মনে করে— “এদের দিকে তাকানোর বা এদের কথা শোনার সময় আমার নেই।”
◈ উপহাস-উপেক্ষা আর বিদ্রূপের মানসিকতা (Mockery):
নিজেকে বড় মনে করার একটি অনিবার্য ফল হলো অন্যকে উপহাস করা। সূরা আল-মুতাফফিফীনের ২৯-৩০ আয়াতে আল্লাহ বলেন:“নিশ্চয় যারা অপরাধী ছিল, তারা মুমিনদের দেখে হাসত। আর যখন তাদের পাশ দিয়ে চলত, তখন চোখ টিপে ইশারা করত (বিদ্রূপ করে)।”
❖ বিশ্লেষণ: যখন প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে, তখন সে সত্যের অনুসারীদের বা সাধারণ মানুষকে ‘ব্যাকডেটেড’ বা ‘দুর্বল’ মনে করে হাসাহাসি করে। এই ‘চোখ টিপে ইশারা করা’ (ইয়াতাগামাযুন) হলো চরম অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ।
◈ অন্যকে হিসাবে আনার ফুরসত কই! (নসিহত বা উপদেশ গ্রহণে অনীহা):
স্বয়ংসম্পূর্ণতার ব্যাধি যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন মানুষ আল্লাহর উপদেশকেও উপেক্ষা করে। সূরা আল-বাকারার ২০৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:“যখন তাকে বলা হয়— ‘আল্লাহকে ভয় কর’, তখন তার অহংকার তাকে পাপের ওপর জেদি করে তোলে।”
➢ আয়াতের শিক্ষা: একজন ক্ষমতাশীল ব্যক্তি যখন নিজেকে অভাবমুক্ত মনে করে, তখন কেউ তাকে সঠিক পথ দেখালে সে তাকে ‘শত্রু’ বা ‘বেয়াদব’ মনে করে। তার ভেতরের ‘ইজ্জত’ বা মিথ্যা মর্যাদা তাকে সত্য গ্রহণ থেকে অন্ধ করে রাখে।
◈ ‘মুতাকাব্বির’ এর দৃষ্টিতে ‘অন্যরা’:
উপরের বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, মানুষ যখন নিজেকে দুনিয়ায় স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে, তখন অন্যদের প্রতি তার আচরণে ৪টি বিষয় প্রকাশ পায়:➔ অশ্রবণ (Ignoring Advice), অদর্শন (Looking Down), বিদ্রূপ (Mockery)
➔ অধিকার হরণ (Injustice): যেহেতু সে নিজেকে বড় মনে করে, তাই সে অন্যের হক বা পাওনা মিটিয়ে দেওয়াকে নিজের জন্য অমর্যাদাকর মনে করে।
২. ব্যতিক্রম কে বা কারা? (The Exceptions - The Humble Successors):
আল্লাহর কিছু প্রিয় বান্দা আছেন যাদেরকে দুনিয়াবী সকল সফলতা, ক্ষমতা ও সম্পদ দেওয়া সত্ত্বেও তারা এক মুহূর্তের জন্যও নিজেকে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ মনে করেন না। তারা জানেন, প্রতিটি নিশ্বাস আল্লাহর মুখাপেক্ষী।
◈ কৃতজ্ঞ সফল ব্যক্তি (The Grateful Achiever):
এরা সফল হলে ‘তাকাব্বুর’ (অহংকার) না করে ‘শুকর’ (কৃতজ্ঞতা) আদায় করে। তাদের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলেন হযরত সুলাইমান (আ.)। পৃথিবীর ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ক্ষমতার অধিকারী হয়েও তিনি বলেছিলেন:
এ আমার রবের অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি না কি অকৃতজ্ঞতা (সূরা আন-নামল: ৪০)।
◈ ইবাদুর রহমান (Gentleman:the Servants of the Merciful):
এরা পৃথিবীতে সফল এবং প্রভাবশালী হওয়া সত্ত্বেও চলার পথে অত্যন্ত বিনয়ী থাকেন। তারা অন্যকে উপেক্ষা করা তো দূরের কথা, মূর্খরা গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে এলেও তারা শান্তির বাণী শুনিয়ে বিদায় নেন।
➢ কুরআনিক কোড: “আর দয়াময় আল্লাহর বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে চলাফেরা করে।” (সূরা আল-ফুরকান: ৬৩)।
◈ মুত্তাকী ও মুহসিন (The God-conscious):
ব্যতিক্রম সেই সব মানুষ, যারা বিশ্বাস করে দুনিয়ার এই পদ-পদবী একটি আমানত মাত্র। তারা মানুষকে ‘যোগ্যতা’ দিয়ে নয়, বরং ‘মানবতা’ দিয়ে বিচার করে। তারা অন্যকে উপেক্ষা করে না, কারণ তারা জানে আল্লাহর কাছে মর্যাদার মাপকাঠি সম্পদ নয়, বরং ‘তাকওয়া’।
➢ কুরআনিক কোড: “নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক মর্যাদাবান, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)।
۞ আখিরাত মুখী চিন্তা:
“এই পরকাল আমি তাদের জন্যই নির্ধারিত করি, যারা পৃথিবীতে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে ও অনর্থ সৃষ্টি করতে চায় না।” (সূরা আল-কাসাস: ৮৩)
◈ সতর্কবার্তা:
কুরআনের আয়াতসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘ইস্তিগনা’ (নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবা) হলো মূল বিষবৃক্ষ, যার ফল হলো অন্য মানুষকে উপেক্ষা করা। ফেরাউন বা কারুন—সবার পতনের মূলে ছিল এই একই ভাবনা: “আমিই সব, বাকিরা কিছুই না।” অথচ আল্লাহ বলেন— “তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই সবচাইতে বেশি মর্যাদাবান, যে বেশি তাকওয়াবান।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)। অর্থাৎ মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি ক্ষমতা বা স্বয়ংসম্পূর্ণতা নয়, বরং বিনয় এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্য।
◈ অহংকারীদের অনিষ্ট থেকে বাঁচার বা আশ্রয় লাভের কুরআনি দুআসমূহ:
১. সালামুন আলা মুসা-এর দুআ (দাম্ভিকদের থেকে আশ্রয়ের জন্য):
إِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُم مِّن كُلِّ مُتَكَبِّرٍ لَّا يُؤْمِنُ بِيَوْمِ الْحِسَابِ
“আমি আমার ও তোমাদের প্রতিপালকের আশ্রয় নিচ্ছি প্রত্যেক এমন অহংকারী থেকে, যে বিচার দিবসে বিশ্বাস করে না।” (সূরা গাফির: ২৭)
২. অন্তরকে অহংকার ও বিদ্বেষ মুক্ত রাখার দুআ:
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا
হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের আগে যারা ঈমান এনেছে তাদেরও। আর আমাদের অন্তরে মুমিনদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ (বা অহংকার) রাখবেন না।” (সূরা আল-হাশর: ১০)
3. অহংকারীদের অনিষ্ট থেকে বাঁচার এবং নিজের অন্তরকে রক্ষার দুআ:
নিজেকে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ ভাবার মানসিক ব্যাধি থেকে বাঁচতে এবং দাম্ভিকদের উপেক্ষা থেকে রক্ষা পেতে এই কুরআনি দুআগুলো নিয়মিত পড়া উচিত:
۞ নিজের অন্তর রক্ষার জন্য:
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا
হে আমাদের রব! সরল পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে সত্যলঙ্ঘনের দিকে ঝুঁকে পড়তে দেবেন না। (সূরা আল-ইমরান: ০৮)।
4. শয়তানের কুপ্ররোচনা ও অহংকারীদের প্রভাব থেকে বাঁচার দুআ:
رَّبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ . وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحْضُرُونِ
হে আমার পালনকর্তা! আমি শয়তানের প্ররোচনা থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। এবং হে আমার পালনকর্তা! আমার কাছে তাদের উপস্থিতি থেকেও আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (সূরা আল-মুমিনুন: ৯৭-৯৮)