বিয়ে: ১টি-ই! আরও নয় কেন? Marriage: Only one? Why not more?

 বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
 ══════ •  • ══════

➤ বিয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য:

➤ আয়াতে বিশ্বাসী একজন মুমিন-মুসলিম কতটি বিয়ে করতে পারে?

➤  বিয়ের যোগ্যতা (শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক):

➤ বিয়ের বয়স নির্ধারণের মানদণ্ড:

➤ বিবাহপূর্ব প্রস্তুতি:

➤ দুআ:

░ ▓▒░বিস্তারিত░▒▓ ░

আল-কুরআন মতে বিয়ে কেবল একটি সামাজিক প্রথা নয়; বরং এটি একটি ‘মিছাক্বান গালীযা’ বা সুদৃঢ় অঙ্গীকার। একটি মাত্র বিয়ে টিকিয়ে রাখা এবং সেখানে আচরণের ভারসাম্য রক্ষা করাও অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার কাজ। নিচে আল-কুরআনের আয়াতসমূহের আলোকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

◈ বিয়ের উদ্দেশ্য: প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়া (কিন্তু উদ্দেশ্য হাসিল না হলে?)

বিয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য: 

মানুষের জৈবিক চাহিদা (সেক্স) এবং আবেগ একটি প্রাকৃতিক বিষয়, যা আল্লাহ তায়ালা মানুষের স্বভাবজাত করে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু আল-কুরআনের ‘তাদাব্বুর’ করলে দেখা যায়, বিয়ের মূল উদ্দেশ্য কেবল এই চাহিদা মেটানো নয়। যদি কেবল যৌনতাই উদ্দেশ্য হতো, তবে একে ‘মিছাক্বান গালীযা’ (সুদৃঢ় অঙ্গীকার) বলা হতো না।

আর বিয়ে কেবল আইনি বিষয় নয়, এর একটি আধ্যাত্মিক ও মানসিক ভিত্তি রয়েছে যা ছাড়া ‘উকদাহ’ বা বন্ধন স্থায়ী হয় না।

সূরা আর-রূম (৩০:২১): "আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জন্য জোড়া সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তাদের নিকট প্রশান্তি (সুকুন سكون) পাও এবং তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা (মাওয়াদ্দাহ مودة)দয়া (রাহমাহ رحمة)। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে।"

2.পরস্পর ‘লিবাস’ বা আবরক হওয়া (The Protective Goal):

যৌনতাকে কুরআন কেবল একটি শারীরিক কাজ হিসেবে দেখেনি, বরং একে একটি পারস্পরিক সুরক্ষার আবরণ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

সূরা আল-বাক্বারাহ (২:১৮৭): "...তারা (স্ত্রীরা) তোমাদের পোশাক (লিবাস) এবং তোমরা তাদের পোশাক।"

বিয়ের উদ্দেশ্য হলো স্বামী-স্ত্রী একে অপরের দোষ ঢেকে রাখা, একে অপরের মর্যাদা বৃদ্ধি করা এবং পাপাচার থেকে একে অপরকে সুরক্ষা দেওয়া।

সূরা আন-নিসা (৪:২৪): "...তোমরা তাদেরকে তোমাদের অর্থের বিনিময়ে বিয়ে করতে চাও, বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে (محصنين - মুহসিনীন), ব্যভিচারের উদ্দেশ্যে নয়..."

‘মুহসান’ শব্দটি এসেছে ‘হিসন’ (Fortress) বা দুর্গ থেকে। বিয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো নিজের চারিত্রিক পবিত্রতাকে একটি দুর্গের মধ্যে সুরক্ষিত করা। কেবল কামভাব চরিতার্থ করা এর উদ্দেশ্য নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল নৈতিক জীবন যাপন করা।

◈ ৪. ‘হারছ’ বা পরবর্তী প্রজন্মের আবাদ (The Generational Goal):

বিয়ের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো একটি পবিত্র ও নেককার বংশধর রেখে যাওয়া।

◆ সূরা আল-বাক্বারাহ (২:২২৩): "তোমাদের স্ত্রীরা তোমাদের শস্যক্ষেত্র (حرث - হারছ)..."

শস্যক্ষেত্র যেমন কেবল আনন্দের জন্য নয়, বরং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনের জন্য, বিবাহিত জীবনও তেমনি কেবল উপভোগের জন্য নয়; এটি একটি পবিত্র প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্র। সালামুন আলা যাকারিয়া এবং সালামুন আলা ইব্রাহিম উভয়েই বিয়ের এই উচ্চতর উদ্দেশ্য অর্থাৎ ‘নেককার সন্তান’ (যুররিয়্যাতান ত্বাইয়্যিবাহ)-এর জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন।

◈ ভালোবাসা ও দয়ার অনুশীলন (The Emotional Goal):

আবেগ বা ইনষ্টিঙ্কট মানুষকে কেবল আকর্ষণ করে, কিন্তু ‘মাওয়াদ্দাহ’ (ভালোবাসা) ও ‘রাহমাহ’ (দয়া) সম্পর্ককে গভীরতা দেয়।

◆ সূরা আর-রূম (৩০:২১): "...এবং তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা (مودة) ও দয়া (رحمة)।"

যৌবন ও সৌন্দর্য চলে যাওয়ার পর যখন শারীরিক আবেগ স্তিমিত হয়ে আসে, তখন আল্লাহর দেওয়া এই ‘রাহমাহ’ বা দয়াই স্বামী-স্ত্রীকে আমৃত্যু আবদ্ধ রাখে। একে অপরের প্রতি এই সহমর্মিতা অর্জনই বিয়ের অন্যতম বড় সার্থকতা।

══════ •  • ══════

◈ ’উকদাতুন নিকাহ’ (বিয়ের গিঁট বা বন্ধন): কেন এটি সহজ নয়?

উল্লেখিত ‘উকদাহ’ শব্দটি কুরআনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি কেবল একটি চুক্তি নয়, এটি একটি ‘বন্ধন’ যা ছিন্ন করা অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার বিষয়।

সূরা আল-বাক্বারাহ (২:২৩৫): "...আর বিয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (عُقْدَةُ النِّكَاحِ - উকদাতুন নিকাহ) গ্রহণ করো না যতক্ষণ না নির্ধারিত সময় পূর্ণ হয়..."

সূরা আল-বাক্বারাহ (২:২৩৭): "...অথবা যার হাতে বিয়ের বন্ধন (عُقْدَةُ النِّكَاحِ) রয়েছে সে যদি মাফ করে দেয়..."

কুরআনের পরিভাষায় একে ‘উকদাহ’ বা গিঁট বলা হয়েছে। একজন মানুষ যখন এই গিঁট বা বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তখন সে কেবল এক ব্যক্তিকে নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া একটি বিধান ও আমানতকে গ্রহণ করে। এই ‘উকদাহ’ বা বন্ধন সম্পর্কে কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসা করা হবে, কারণ এটি একটি সুদৃঢ় চুক্তি।

বিয়ের সংখ্যা:

মূলত একজন স্ত্রীর সাথেই জীবন অতিবাহিত করার প্রতি ইঙ্গিত থাকলেও বিশেষ পরিস্থিতিতে একাধিক বিয়ের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। তবে তা নিঃশর্ত নয়। আল-কুরআনে বিশেষ পরিস্থিতিতে একাধিক বিয়ের অনুমতি থাকলেও তা ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচারের চরম কঠিন শর্তের সাথে যুক্ত। 
 

সূরা আন-নিসা (৪:৩): "...আর যদি আশঙ্কা করো যে, তোমরা ইনসাফ করতে পারবে না, তবে মাত্র একজনকেই (বিয়ে করো)...।"

ইনসাফের বাস্তবতা: মানুষের সীমাবদ্ধতা: কুরআনের অন্য আয়াতে আল্লাহ মানুষের এই ইনসাফ করার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যা একাধিক বিয়ের বিষয়টিকে কতটা সংবেদনশীল তা বুঝিয়ে দেয়।

সূরা আন-নিসা (৪:১২৯): "তোমরা যতই আকাঙ্ক্ষা করো না কেন, তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে সমান ইনসাফ বা ন্যায়বিচার করতে কখনোই সক্ষম হবে না..."

এখানে তাদাব্বুর (Understanding-এ আনার বিষয়):

৪:৩ এবং ৪:১২৯ আয়াত দুটি একত্রে পাঠ করলে বোঝা যায় যে, একাধিক বিয়ে কোনো বিলাসিতা নয়, বরং ইনসাফের এক কঠিন পরীক্ষা। যারা ইনসাফে ব্যর্থ হবে, তাদের জন্য একাধিক বিয়ের অনুমতি ঝুঁকির কারণ। 

এখানে ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচারকে মূল ভিত্তি ধরা হয়েছে। কুরআনের ভাষাগত সামঞ্জস্য লক্ষ্য করলে দেখা যায়, যেখানে একাধিকের কথা বলা হয়েছে, ঠিক তার সাথেই ‘আশঙ্কা’ ও ‘ইনসাফ’ শব্দ দুটি জুড়ে দেয়া হয়েছে। যেখানে ইনসাফ নিশ্চিত করা অসম্ভব প্রায়, সেখানে একটি বিয়েই হলো নিরাপদ পথ।

’উকদাতুন নিকাহ’ ও ‘মিছাক্বান গালীযা’: আল্লাহর দেয়া আমানত:

বিয়েকে কুরআন কোনো সাধারণ চুক্তি বলেনি। একে বলা হয়েছে ‘সুদৃঢ় অঙ্গীকার’ (মিছাক্বান গালীযা), যা আল্লাহ তায়ালা নবী ও রাসূলগণের (যথা: সালামুন আলা নূহ, সালামুন আলা ইব্রাহিম, সালামুন আলা মুসা ও সালামুন আলা ঈসা) কাছ থেকে নেওয়া অঙ্গীকারের সমতুল্য শব্দে ব্যক্ত করেছেন। 

এর মাধ্যমেই বোঝা যায়, বিয়েকে আল্লাহ কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন। এটি ভঙ্গ করা বা এর হক নষ্ট করা সরাসরি আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার লঙ্ঘনের শামিল।

সূরা আল-বাক্বারাহ (২:২৩৫ ও ২৩৭): এখানে বিয়ের বন্ধনকে ‘عُقْدَةُ النِّكَاحِ’ (উকদাতুন নিকাহ) বা ‘বিয়ের গিঁট’ বলা হয়েছে। এই গিঁট বা বন্ধনটি আল্লাহর নামে দেওয়া একটি প্রতিশ্রুতি, যা রক্ষা করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য বাধ্যতামূলক।

একটি বন্ধনও সহজ নয়: আচরণের ব্যাত্যয় ও কঠোর কাফফারা:

একটি মাত্র বিয়ে করে সেই বন্ধন (উকদাতুন নিকাহ) রক্ষা করাও যে কতোটা সংবেদনশীল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় স্ত্রীর সাথে আচরণের সীমালঙ্ঘনের শাস্তির বিধানে। স্ত্রীর সাথে অন্যায় আচরণ বা ‘জিহার’ (অসংলগ্ন কথা বা তাকে মা-বোনের সাথে তুলনা করে বর্জন করা)-এর মতো আচরণের জন্য আল্লাহ অত্যন্ত কঠিন প্রায়শ্চিত্ত বা কাফফারা নির্ধারণ করেছেন।

সূরা আল-মুজাদিলাহ (৫৮:৩-৪): "যারা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে ‘জিহার’ করে এবং পরে তাদের উক্তি প্রত্যাহার করে, তবে (তাদের প্রায়শ্চিত্ত হলো) একে অপরকে স্পর্শ করার আগে একটি দাস মুক্তি করা... আর যার সেই সামর্থ্য নেই, তাকে একে অপরকে স্পর্শ করার আগে টানা দুই মাস সিয়াম (রোজা) পালন করতে হবে। আর যে তাতেও অক্ষম, সে ৬০ জন মিসকিনকে অন্নদান করবে। এটি এজন্য যে, তোমরা যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনো..."

অনুধাবন: একটি মাত্র স্ত্রীর সাথে করা সামান্য বাজে উক্তি বা অসংলগ্ন আচরণের জন্য যদি একটানা ৬০টি রোজা রাখার মতো কঠিন দণ্ড ভোগ করতে হয়, তবে বোঝা যায় ‘উকদাতুন নিকাহ’ কত গভীর দায়িত্বের বিষয়। একটি বন্ধন রক্ষা করতেই যেখানে সিয়ামের মতো কঠিন ইবাদতকে কাফফারা হিসেবে রাখা হয়েছে, সেখানে একাধিক বিয়ের দায়িত্ব যে কতখানি ভয়াবহ, তা সহজেই অনুমেয়।

বিবাহপূর্ব প্রস্তুতি: কুরআনিক বিধান জানা অপরিহার্য:

বিয়েকে কেবল জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যম মনে করা ভুল। এটি একটি আইনি ও আত্মিক বন্ধন। এই বন্ধনের গুরুত্ব না বুঝে এতে প্রবেশ করা ঝুঁকিপূর্ণ।

পূর্ব-প্রস্তুতি: বিয়ের আগেই আল-কুরআনের এই আয়াতগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত যে, স্ত্রীর সাথে আচার-আচরণে সামান্য ব্যাত্যয় ঘটলে আল্লাহর কাছে কী পরিমাণ জবাবদিহি করতে হবে।

পারিবারিক শান্তি: সূরা আর-রূম (৩০:২১) অনুযায়ী বিয়ের মূল লক্ষ্য হলো প্রশান্তি (সুকুন), ভালোবাসা (মাওয়াদ্দাহ) ও দয়া (রাহমাহ)। এই তিনটি উপাদান বজায় রাখাই হলো ‘উকদাহ’ বা বন্ধনকে সজীব রাখা।

◈ সারকথা: আল-কুরআনের বর্ণনাভঙ্গি (Tadabbur) অনুযায়ী, বিয়ে সহজ হলেও এর ভেতরের দায়বদ্ধতা ‘অতো সহজ বিষয় নয়’। যারা একটি বিয়ের বন্ধনকেও আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব ও কর্তব্য হিসেবে যত্নসহকারে রক্ষা করতে চায়, তাদের জন্য স্ত্রীর সাথে প্রতিটি কথা ও আচরণে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ, কুরআনের বিধান (৫৮:৩-৪) আমাদের সতর্ক করে যে, স্ত্রীর সাথে উল্টোপাল্টা আচরণ বা সম্পর্কের অমর্যাদা করলে তার দায়ভার সিয়ামের মতো কঠিন ইবাদতের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হতে পারে। অতএব, বিয়ের আগেই কুরআনের এই বিধানগুলো জেনে প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য।

 ═══════ • ❖ • ═══════

আর্থিক সামর্থ্যহীনতা ও বিয়ে: 

আল-কুরআনের ‘তাদাব্বুর’ (গভীরভাবে চিন্তা)  করলে দেখা যায়, বিয়ে কেবল একটি আবেগীয় সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি আর্থিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে আল-কুরআন একজন মুমিনকে যে পথ দেখিয়েছে, তা অত্যন্ত স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ।

আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে প্রথম নির্দেশ: ‘ইস্তিফাফ’ বা আত্মসংযম:

অনেকে মনে করেন সামর্থ্য না থাকলেও বিয়ে করে ফেলা উচিত। কিন্তু কুরআন অত্যন্ত বাস্তবসম্মত সমাধান দিয়েছে। যাদের বিয়ের আর্থিক সামর্থ্য নেই, তাদের জন্য প্রথম নির্দেশ হলো চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করে অপেক্ষা করা।

সূরা আন-নূর (২৪:৩৩): "আর যাদের বিয়ের সামর্থ্য নেই, তারা যেন সংযম (استعفاف - ইস্তিফাফ) অবলম্বন করে, যতক্ষণ না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেন..."

এখানে ‘ইস্তিফাফ’ শব্দের ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ হলো নিজের নফসকে পাপাচার থেকে রক্ষা করা এবং ধৈর্য ধারণ করা। এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, ‘উকদাতুন নিকাহ’ বা বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য নূন্যতম আর্থিক ভিত্তি থাকা জরুরি, যাতে স্ত্রীর মৌলিক অধিকার (ভরণপোষণ) ক্ষুণ্ণ না হয়।

পুরুষের দায়িত্ব ও আর্থিক সক্ষমতা (ক্বাওয়াম): 

কুরআন পুরুষকে পরিবারের দায়িত্বশীল বা ‘ক্বাওয়াম’ হিসেবে ঘোষণা করেছে তার আর্থিক ব্যয়ের সক্ষমতার ভিত্তিতেই।

সূরা আন-নিসা (৪:৩৪): "পুরুষেরা নারীদের ওপর দায়িত্বশীল (قوامون - ক্বাওয়ামুন), কারণ আল্লাহ তাদের একের ওপর অপরের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং তারা তাদের ধন-সম্পদ থেকে ব্যয় (নফক্বাহ) করে..."

এই আয়াতের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য (Internal Coherence) নির্দেশ করে যে, ‘ব্যয় করার সামর্থ্য’ হলো নেতৃত্বের অন্যতম শর্ত। যার নিজেরই ভরণপোষণের সক্ষমতা নেই, তার জন্য অন্য একজনের দায়িত্ব (উকদাহ) নেওয়া কুরআনিক মূলনীতির আলোকে অত্যন্ত সতর্কতার বিষয়।

বিয়ে কি দারিদ্র্য দূর করে? (আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ও শর্ত):

কুরআনের একটি আয়াতকে প্রায়ই দারিদ্র্য সত্ত্বেও বিয়ের সমর্থনে পেশ করা হয়, তবে এর সাথে পূর্বের আয়াতটির (২৪:৩৩) ভারসাম্য বুঝতে হবে।

সূরা আন-নূর (২৪:৩২): "...তারা যদি অভাবগ্রস্ত হয়, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ।"

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ৩২ নম্বর আয়াতে সমাজকে উৎসাহিত করা হয়েছে অভাবীদের বিয়েতে সাহায্য করতে, আর ৩৩ নম্বর আয়াতে ব্যক্তিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সামর্থ্য না আসা পর্যন্ত নিজেকে সংযত রাখতে। অর্থাৎ, সমাজ এগিয়ে আসবে এবং ব্যক্তি নিজে পরিশ্রম ও ইবাদতের মাধ্যমে সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করবে।

বিকল্প ব্যবস্থা ও নমনীয়তা:

রাসূলগণের জীবনেও আমরা দেখি, বিয়ের জন্য দেনমোহর বা কায়িক শ্রমের মাধ্যমে সামর্থ্য প্রমাণের নজির রয়েছে। (যেমন: সালামুন আলা মুসা যখন মাদইয়ানে আট বা দশ বছর শ্রম প্রদানের বিনিময়ে বিয়ের চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন - সূরা আল-কাসাস)। আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে মোহরানা পরিশোধের ক্ষেত্রে বা জীবনযাত্রার মানে কুরআন সহজীকরণের কথাও বলেছে।

সূরা আত-ত্বালাক (৬৫:৭): "বিত্তবান যেন তার বিত্ত অনুযায়ী ব্যয় করে, আর যার জীবনোপকরণ সীমিত, সে যেন আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা থেকে ব্যয় করে। আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেন না..."

কেন সামর্থ্য ছাড়া বিয়ে ‘অতো সহজ বিষয় নয়’?

ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, বিয়ের বন্ধনকে আল্লাহ ‘মিছাক্বান গালীযা’ (সুদৃঢ় অঙ্গীকার) বলেছেন।

➔ আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে মোহরানা (স্ত্রীর অধিকার) অনাদায়ী থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

➔ ভরণপোষণে ব্যর্থ হলে দাম্পত্য কলহ সৃষ্টি হয়, যা ‘সুকুন’ বা প্রশান্তি নষ্ট করে।

➔ যে ব্যক্তি নিজের নফসের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সামর্থ্য ছাড়াই বিয়ে করে, সে পরে স্ত্রীর অধিকার আদায়ে ব্যর্থ হয়ে গুনাহগার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

প্রস্তুতি: অতএব, যাদের সামর্থ্য নেই, তাদের উচিত তাড়াহুড়ো না করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা, কঠোর পরিশ্রম করা এবং সূরা আন-নূরের ৩৩ নম্বর আয়াতের নির্দেশনা অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করা। কারণ, যে বন্ধন (উকদাহ) সম্পর্কে কিয়ামতে জিজ্ঞাসা করা হবে, সেই বন্ধনে অপ্রস্তুত অবস্থায় প্রবেশ করা কোনো বুদ্ধিমান মুমিনের কাজ নয়।

 ══════ •  • ══════

বিয়ের জন্য উপযুক্ত শারীরিক-মানসিক-বয়সের যোগ্যতা:

সালামুন আলা মুছা-এর দৃষ্টান্ত ও কুরআনিক বিশ্লেষণ:

আল-কুরআনের বর্ণনাভঙ্গিতে বিয়ের জন্য কেবল আর্থিক সামর্থ্যই যথেষ্ট নয়, বরং শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক ও চারিত্রিক বলিষ্ঠতা অপরিহার্য শর্ত। ‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’ পদ্ধতিতে সূরা আল-কাসাস-এ বর্ণিত সালামুন আলা মুছা-এর কাহিনী বিশ্লেষণ করলে বিয়ের যোগ্যতার এক পূর্ণাঙ্গ মানদণ্ড পাওয়া যায়।

বিয়ের যোগ্যতার মূল ভিত্তি: ‘আল-ক্বাউয়ীয়ু’ ও ‘আল-আমীনু’:

সালামুন আলা মুছা যখন মিশরের সীমানা পেরিয়ে মাদইয়ানে উপস্থিত হলেন, তখন তিনি এক বৃদ্ধের দুই কন্যাকে তাদের পশুপালকে পানি পান করাতে সাহায্য করেন। এরপর সেই কন্যারাই তাদের পিতার কাছে সালামুন আলা মুছা-এর দুটি বিশেষ গুণ তুলে ধরেন যা তাকে পরিবারের সদস্য হিসেবে (জামাতা বা কর্মী হিসেবে) গ্রহণ করার মানদণ্ড ছিল।

সূরা আল-কাসাস (২৮:২৬): "তাদের (কন্যাদের) একজন বললো, 'হে আমার পিতা! আপনি একে মজুর হিসেবে নিয়োগ করুন; কারণ আপনার মজুর হিসেবে সেই শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যে শক্তিশালী (القوي - আল-ক্বাউয়ীয়ু) এবং বিশ্বস্ত (الأمين - আল-আমীনু)।"

এখানে ‘তাদাব্বুর’ করলে দেখা যায়, একটি টেকসই পরিবার গঠনের জন্য দুটি স্তম্ভের প্রয়োজন:

১. শারীরিক যোগ্যতা (আল-ক্বাউয়ীয়ু): একজন পুরুষের পরিবার পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় শারীরিক শক্তি ও পরিশ্রম করার ক্ষমতা থাকা। সালামুন আলা মুছা বিশাল ভারী পাথর সরিয়ে একাই কুয়া থেকে পানি তুলে সেই পশুদের পান করিয়েছিলেন, যা তার শারীরিক সক্ষমতার প্রমাণ ছিল।

২. মানসিক ও চারিত্রিক যোগ্যতা (আল-আমীনু):

বিশ্বস্ততা ও মানসিক দৃঢ়তা। বিবাহের মতো ‘মিছাক্বান গালীযা’ বা সুদৃঢ় অঙ্গীকার পালনের জন্য আমানতদারিতা অপরিহার্য। যার চারিত্রিক শুদ্ধতা বা মানসিক স্থিরতা নেই, সে বিয়ের ‘উকদাহ’ বা গিঁট রক্ষা করতে পারে না।

মানসিক সংহতি ও শ্রমের অঙ্গীকার (সালামুন আলা মুছা-এর শিক্ষা)

সালামুন আলা মুছা-এর বিয়ের মোহরানা বা চুক্তিটি ছিল শারীরিক শ্রম ও দীর্ঘমেয়াদী মানসিক ধৈর্যের সমন্বয়।

সূরা আল-কাসাস (২৮:২৭): "সে (বৃদ্ধ পিতা) বললো, 'আমি আমার এই দুই কন্যার একজনকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে চাই এই শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার কাজ করে দেবে; আর যদি তুমি দশ বছর পূর্ণ করো, তবে তা তোমার পক্ষ থেকে অতিরিক্ত (অনুগ্রহ)...'।

এখানে লক্ষণীয় যে, সালামুন আলা মুছা একজন প্রবাসী ছিলেন, তার কাছে নগদ অর্থ ছিল না। কিন্তু তার শারীরিক শক্তি এবং মানসিক বিশ্বস্ততা থাকার কারণে তিনি ৮ থেকে ১০ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদী শ্রমের চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে বিয়ের যোগ্য বলে বিবেচিত হলেন। এটি প্রমাণ করে যে:

➔ বিবাহপূর্ব প্রস্তুতিতে একজন পুরুষের ধৈর্যশীল ও পরিশ্রমী হওয়ার মানসিকতা থাকা জরুরি।

➔ যদি নগদ অর্থ (মোহরানা) না থাকে, তবে শারীরিক শ্রম বা যোগ্যতার বিনিময়েও বিয়ের ব্যবস্থা হতে পারে, যা কুরআন সমর্থন করে।

◈ বয়সের মাপকাঠি: সক্ষমতা ও দায়িত্ব:

কুরআনের অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বিয়ের জন্য যে ‘সামর্থ্য’ বা শারীরিক-মানসিক সক্ষমতার কথা বলেছেন, তা সালামুন আলা মুছা-এর কাহিনীর সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

 সূরা আন-নিসা (৪:৬): "আর তোমরা ইয়াতিমদের পরীক্ষা করো যতক্ষণ না তারা বিয়ের বয়সে (نِكَاحًا - নিকাহের যোগ্যতায়) পৌঁছায়; এরপর যদি তাদের মধ্যে বিচার-বুদ্ধির (رُشْدًا - রুশদান) পরিচয় পাও, তবে তাদের সম্পদ তাদের হাতে সোপর্দ করো..."

এখানে ‘নিকাহের বয়স’ বলতে কেবল জৈবিক বয়স বোঝায়নি, বরং এর সাথে ‘রুশদান’ বা মানসিক পরিপক্কতা (Intellectual/Mental maturity) যুক্ত করা হয়েছে। সালামুন আলা মুছা-এর কাহিনীতে সেই ‘রুশদান’ বা প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায় যখন তিনি অপরিচিত দুই নারীর প্রতি দয়া প্রদর্শন করেন এবং অত্যন্ত মার্জিতভাবে তাদের সাহায্য করেন।

বিবাহ অতো সহজ বিষয় কেন নয়?

সালামুন আলা মুছা-এর দৃষ্টান্ত থেকে আমরা শিখি যে, বিয়ের ‘উকদাহ’ (বন্ধনে) প্রবেশ করার জন্য:

❖ শারীরিক সামর্থ্য থাকতে হবে যেন জীবনযুদ্ধে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া যায়।

❖ মানসিক বিশ্বস্ততা (Trustworthiness) থাকতে হবে যেন স্ত্রী ও পরিবারের আমানত রক্ষা করা যায়।

❖ আর্থিক দৈন্যতা থাকলেও শারীরিক শ্রম ও চারিত্রিক দৃঢ়তার মাধ্যমে তা কাটিয়ে ওঠার সংকল্প থাকতে হবে।

যে ব্যক্তি শারীরিকভাবে অলস এবং মানসিকভাবে অস্থিতিশীল বা অবিশ্বস্ত, সে বিয়ের জন্য কুরআন বর্ণিত ‘আল-ক্বাউয়ীয়ু’ ও ‘আল-আমীনু’ মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়। অতএব, বিয়ের আগে কেবল অনুষ্ঠান নয়, বরং নিজেকে এই দুই গুণের আলোকে গড়ে তোলা হলো আসল প্রস্তুতি। কারণ, যে বন্ধন আল্লাহর নামে এবং আল্লাহর দেওয়া অঙ্গীকারের ভিত্তিতে হয়, তার জন্য নিজেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে উপযুক্ত করা ঈমানের অংশ।

🔗 বিয়ের এসকল বিষয় কুরআনি ইতিহাস/মেছাল থেকে নেব কেন? দ্র: আয়াত ১২:১১১

 ═══════ •  • ═══════

সালামুন আলা মানিত্তাবায়াল হুদা।  [আমার সালাম তার ওপর যে সঠিক পথ (আয়াত) অনুসরন করে-২০:৪৭]

দুআ: আয়াত (২৫:৭৪):

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

রব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যা-তিনা ক্বুররতা আ’ইয়ুনিঁও ওয়াজ’আলনা লিল মুত্তাক্বীনা ইমা-মা।

হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের জীবনসঙ্গিনী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করো এবং আমাদের মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ (নেতা) করো -সূরা আল-ফুরক্বান, ২৫:৭





Post a Comment (0)
Previous Post Next Post