বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম
▣ হলফনামা ও ‘হাল্লাফ’: দলিলে ও নির্বাচনে মুমিনের দায়বদ্ধতা-
▣ আল-কুরআনের দৃষ্টিতে শপথের অপব্যবহার ও চারিত্রিক শুদ্ধি-
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে জমি ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল কিংবা নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘হলফনামা’ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল আইনি প্রক্রিয়া। যখন কেউ হলফনামায় স্বাক্ষর করেন, তখন তিনি কেবল রাষ্ট্রীয় আইনের মুখোমুখি হন না, বরং স্রষ্টার দরবারে এক সুদৃঢ় অঙ্গীকারনামা পেশ করেন। আল-কুরআনের ‘তাদাব্বুর’ এবং ‘তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন’ পদ্ধতিতে ‘হলফ’ বা শপথের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করলে এক ভয়াবহ কিন্তু সতর্কতামূলক বাস্তবতা উন্মোচিত হয়।
নিচে ‘হাল্লাফ’ (অধিক শপথকারী) ও ‘আইমান’ (শপথসমূহ) শব্দমূলের আলোকে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
◈ ১. ‘হাল্লাফ’ (حَلَّاف): হীন চরিত্রের আধিক্যবাচক রূপ
আল-কুরআনের সূরা আল-কলমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা একজন বিশেষ শ্রেণির মানুষের বর্ণনা দিতে গিয়ে ‘হাল্লাফ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
✦ "এবং আপনি অনুসরণ করবেন না এমন প্রত্যেক ব্যক্তির, যে অধিক শপথকারী (হাল্লাফ) এবং যে লাঞ্ছিত (হীন)।" (৬৮-সূরা আল-কলম: ১০)
➲ তাদাব্বুর ও শব্দগত সামঞ্জস্য (Symmetry): এখানে ‘হাল্লাফ’ শব্দটি ‘মাহিন’ (লাঞ্ছিত বা হীন) শব্দের সাথে যুক্ত। এর তাত্ত্বিক অর্থ হলো— যে ব্যক্তি নিজের সত্যনিষ্ঠার ওপর ভরসা হারিয়ে ফেলে, সে-ই মানুষের বিশ্বাস অর্জনের জন্য বারবার ‘হলফ’ বা শপথের আশ্রয় নেয়। নির্বাচনী হলফনামায় যারা অতিরঞ্জিত তথ্য দেয় বা জমিক্রয়ের দলিলে সত্য গোপন করে শপথের স্তূপ তৈরি করে, তারা মূলত আল্লাহর দৃষ্টিতে মানসিকভাবে হীন ও লাঞ্ছিত।
◈ ২. ‘আইমান’ (أَيْمَان): শপথ যখন প্রতারণার ঢাল
কেন ‘হাল্লাফ’-এর বর্ণনায় ‘আইমান’ শব্দটি প্রাসঙ্গিক? কারণ ‘হাল্লাফ’ হলো ব্যক্তির অভ্যাস, আর ‘আইমান’ (শপথসমূহ) হলো তার অন্যায়ের হাতিয়ার। মোনাফেকরা তাদের অপরাধ ঢাকতে এই ‘আইমান’-কে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করে।
✦ "তারা তাদের শপথগুলোকে (আইমানাহুম) ঢাল (জুন্নাহ) হিসেবে ব্যবহার করে, ফলে তারা আল্লাহর পথ হতে মানুষকে নিবৃত্ত করে।" (৫৮-সূরা আল-মুজাদালাহ: ১৬)
➲ বাস্তব প্রয়োগ: জমি ক্রয়ের দলিলে জমির প্রকৃত মূল্য কম দেখানো কিংবা নির্বাচনী হলফনামায় নিজের অবৈধ সম্পদের তথ্য গোপন করে যখন কেউ স্বাক্ষর করেন, তখন তিনি মূলত এই ‘আইমান’-কে তার জালিয়াতি ঢাকার ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করেন। এটি কুরআনি দৃষ্টিতে এক জঘন্যতম চারিত্রিক বিচ্যুতি।
◈ ৩. দলিলে জালিয়াতি ও ‘পা পিছলে যাওয়ার’ সতর্কবার্তা
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক সময় জমিক্রয় বা ব্যবসায়িক স্বার্থে মিথ্যা হলফনামা দেওয়া হয়। কুরআন একে একটি ভয়াবহ পরিণতির সাথে তুলনা করেছে।
✦ "তোমরা তোমাদের শপথগুলোকে (আইমানাকুম) একে অপরের মধ্যে প্রতারণার উপায় হিসেবে গ্রহণ করো না। করলে পা স্থির হওয়ার পর পিছলে যাবে এবং আল্লাহর পথে বাধা দেওয়ার কারণে তোমরা শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করবে।" (১৬-সূরা আন-নাহল: ৯৪)
➲ অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য (Internal Coherence): এখানে ‘পা পিছলে যাওয়া’ বলতে ঈমান থেকে বিচ্যুত হওয়া ও দুনিয়াবি ধ্বংসকে বোঝানো হয়েছে। একজন ক্রেতা বা বিক্রেতা যখন হলফনামায় জেনেশুনে মিথ্যা বলেন, তখন তিনি সাময়িকভাবে লাভবান হলেও আধ্যাত্মিকভাবে তার অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যায়।
◈ ৪. ‘আক্কাদতুম’ (عَقَّدتُّم): সুচিন্তিত শপথের কঠোরতা
অনিচ্ছাকৃত শপথের চেয়ে সুচিন্তিত শপথের দায়ভার কুরআনে অনেক বেশি। হলফনামায় স্বাক্ষর করা একটি সুচিন্তিত কাজ।
✦ "আল্লাহ তোমাদের পাকড়াও করবেন না তোমাদের অর্থহীন শপথের জন্য; কিন্তু তিনি তোমাদের পাকড়াও করবেন সেই শপথের জন্য যা তোমরা সুদৃঢ়ভাবে (আক্কাদতুম) করো।" (৫-সূরা আল-মায়িদাহ: ৮৯)
➲ তাদাব্বুর: হলফনামা বা দলিলে স্বাক্ষর করা একটি ‘আক্কাদতুম’ বা সুদৃঢ় অঙ্গীকার। এটি কোনো অর্থহীন কথা নয়। যারা এই সুচিন্তিত হলফ করে তথ্য গোপন করে, আল্লাহ তাদের অবশ্যই পাকড়াও করবেন।
◈ ৫. সামান্য মূল্যে আল্লাহর অঙ্গীকার বিক্রয় (Thamanun Qalilan):
নির্বাচনী ক্ষমতা বা জমির মুনাফা—এগুলো দুনিয়াবি দৃষ্টিতে বড় মনে হলেও আল্লাহর কাছে তা ‘সামান্য মূল্য’ মাত্র।
✦ "নিশ্চয় যারা আল্লাহর অঙ্গীকার ও নিজেদের শপথের (আইমানিহিম) বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করে, পরকালে তাদের কোনো অংশ নেই।" (৩-সূরা আল-ইমরান: ৭৭)
➲ তাদাব্বুর: নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে বা কয়েক কাঠা জমি অবৈধভাবে দখল করতে যারা মিথ্যা হলফনামা দাখিল করে, তারা মূলত পরকালের বিশাল অংশের বিনিময়ে এই ‘সামান্য মূল্য’ ক্রয় করছে।
◈ ৬. নবীগণের (সালামুন আলাইহিম) আদর্শ: ‘হাল্লাফ’ হওয়ার বিপরীতে সত্যনিষ্ঠা
নবী ও রাসূলগণ (সা:) ছিলেন ‘হাল্লাফ’ বা অতিরিক্ত শপথ করার অভ্যাসের সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর মানুষ।
➲ সালামুন আলা মুহাম্মদ-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সেই সব ‘হাল্লাফ’ ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকতে, যারা শপথকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করত।
➲ সালামুন আলা ইয়াকুব তাঁর সন্তানদের কাছ থেকে ‘মওসিক’ বা সুদৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছিলেন আল্লাহর নামে, কিন্তু তা ছিল সত্য রক্ষার জন্য, কারো অধিকার হরণের জন্য নয় (১২:৬৬)।
➲ সালামুন আলা ইবরাহিম যখন শপথ করেছিলেন, তখন তা ছিল মূর্তিপূজার অসারতা প্রমাণের জন্য, কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে নয় (২১:৫৭)।
উপসংহার ও বিশ্বাসীদের জন্য নসিহত:
বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে জমিক্রয় বা নির্বাচনী কার্যক্রমে ‘হলফনামা’ প্রদানকারী মুমিনদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়:
◈ হাল্লাফ হওয়া পরিহার করুন: আপনি যদি সত্যবাদী হন, তবে বারবার বা অতিরঞ্জিত শপথ করার প্রয়োজন নেই। অহেতুক হলফ করা হীনম্মন্যতা ও মোনাফেকির আলামত।
◈ আল্লাহকে জামিনদার ভাবুন: মনে রাখবেন, হলফনামায় স্বাক্ষর করার অর্থ হলো আল্লাহকে আপনার জামিনদার করা (১৬:৯১)। আল্লাহকে জামিন রেখে মিথ্যা তথ্য দেওয়া সরাসরি কুফরি ও প্রতারণা।
◈ তথ্য গোপন করা বর্জন করুন: জমির দলিলে বা নির্বাচনী ফর্মে তথ্য গোপন করা মূলত ‘আইমান’-কে প্রতারণার ঢাল বানানো। মনে রাখবেন, হাশরের ময়দানেও এই মিথ্যা শপথের অভ্যাস আপনার পিছু ছাড়বে না (৫৮:১৮)।
◈ তওবার সুযোগ: যদি কখনো পরিস্থিতির চাপে মিথ্যা শপথ বা হলফনামা প্রদান করে থাকেন, তবে সূরা মায়িদার ৮৯ নম্বর আয়াত অনুযায়ী কাফফারা আদায় করে সত্যের পথে ফিরে আসুন।
আল্লাহ আমাদের বাংলাদেশের সকল বিশ্বাসীকে ‘হাল্লাফ’ বা হীন শপথকারী হওয়া থেকে রক্ষা করুন এবং প্রতিটি চুক্তিতে ও হলফনামায় সত্যনিষ্ঠ হওয়ার তাওফিক দান করুন। রব্বানা ওয়া তাকাব্বাল দুআ।