চরম মিথ্যাবাদী কাকে বলে? কে বা কারা এরা? বাঁচার উপায়? Extreme Liar" or "Chronic Denier-Kazib/Mukazzibun

# যারা আল্লাহর আয়াত মেনে নেয় না তাদের স্বরূপ! 

(কাযিবুন-আল-মুকাজ্জিবুন?)

# এদের থেকে বাঁচাতে দুআ-আশ্রয় চাওয়া:

আল-কুরআনের ‘তাদাব্বুর’ করলে দেখা যায়, মিথ্যাচারের চূড়ান্ত স্তর হলো আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শনকে অস্বীকার করা। মুখে সত্য বলার দাবি করলেও যারা আল্লাহর বিধানকে প্রত্যাখ্যান করে, কুরআন তাদের ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

◈ ১. আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করাই মিথ্যার মূল ভিত্তি:

কুরআন স্পষ্টভাবে বলে যে, মিথ্যা রটনা করা তাদেরই কাজ যারা আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শনাবলীতে বিশ্বাস স্থাপন করে না।

সুরা আন-নাহল (১৬:১০৫): মিথ্যা তো তারাই রটনা করে, যারা আল্লাহর আয়াতসমূহ  (আয়াতিল্লাহ) বিশ্বাস করে না; আর তারাই হলো প্রকৃত মিথ্যাবাদী (আল-কাযিবুন)।

তাদাব্বুর: এই আয়াতে ‘মিথ্যা’ রটনার সাথে ‘আয়াত’ বা ‘নিদর্শন’ না মানাকে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, কেউ যদি দাবি করে সে সত্যবাদী কিন্তু আল্লাহর নাযিলকৃত আয়াত সে মানে না, তবে কুরআনের দৃষ্টিতে সে মিথ্যাবাদী।


মৌখিক স্বীকৃতি বনাম ব্যবহারিক প্রত্যাখ্যান: কুরআনের দৃষ্টিতে ‘ব্যবহারিক মিথ্যাবাদিতা’

আল-কুরআনের গভীর ‘তাদাব্বুর’ করলে দেখা যায়, মিথ্যাচারের চূড়ান্ত ও ভয়াবহ স্তর হলো আল্লাহর আয়াতসমূহকে বাস্তব জীবনে অস্বীকার করা। অনেক মানুষ মুখে কুরআনের আয়াতের সত্যতা স্বীকার করলেও তাদের যাপিত জীবন ও কর্মপদ্ধতি আল্লাহর বিধানের সম্পূর্ণ বিপরীত হয়। কুরআন এই দ্বিচারিতাকেই ‘মিথ্যাবাদিতা’ (কিজব) হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

◈ ২. ‘লাহওয়াল হাদিস’ ও আয়াতের অবমাননা

কুরআনের আয়াত মেনে নেওয়ার মৌখিক দাবিদারদের একটি বড় অংশ বাস্তব জীবনে ‘লাহওয়াল হাদিস’ (সরল পথ থেকে বিচ্যুতকারী অসার কথা বা কাজ) নিয়ে মত্ত থাকে। তারা আল্লাহর বিধানের চেয়ে অলীক কাহিনী বা অনর্থক বিষয়কে প্রাধান্য দেয়।

সুরা লোকমান (৩১:৬): মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা ‘লাহওয়াল হাদিস’ (অসার কথা বা বিনোদন) ক্রয় করে, যাতে অজ্ঞতাবশত আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিচ্যুত করতে পারে এবং আল্লাহর আয়াতসমূহকে উপহাস হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। তাদের জন্যই রয়েছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি।

(১৬:১০৫ আয়াতে যারা আয়াত বিশ্বাস করে না তাদের মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে, আর ৩১:৬ আয়াতে দেখানো হয়েছে যে আয়াত মেনে নেওয়ার দাবি করেও যারা অসার বিষয়ে মত্ত থাকে, তারা মূলত আয়াতকে উপহাস করছে)

◈ ৩. দ্বীন পালনের নামে বিধান প্রত্যাখ্যান

অনেকে ধর্ম পালনের দাবি করে, কিন্তু যখনই আল্লাহর কোনো স্পষ্ট বিধান (আয়াত) তাদের সামনে আসে, তারা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী তা এড়িয়ে যায় বা প্রত্যাখ্যান করে।

সুরা আল-বাকারাহ (২:৪৪): তোমরা কি মানুষকে সৎকাজের নির্দেশ দাও, আর নিজেদের কথা ভুলে যাও? অথচ তোমরা কিতাব পাঠ করো! তবে কি তোমরা অনুধাবন করো না?

সুরা আল-বাকারাহ (২:৮৫): তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আনো আর কিছু অংশ অস্বীকার করো? তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনা...। 

(তাদাব্বুর: কিতাবের কিছু অংশ মানা আর কিছু অংশ না মানা হলো ‘ব্যবহারিক তাকজিব’ বা আংশিক মিথ্যাচার। সালামুন আলা মুসা-এর কওমের মধ্যেও এই রোগটি ছিল।)

◈ ৪. মুনাফিকী মিথ্যাচার: মুখে ইকরার, অন্তরে অস্বীকার:

মুনাফিকরা মুখে বলে তারা বিশ্বাসী, কিন্তু তাদের কাজ ও অন্তরের অনীহা তাদের ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে সাব্যস্ত করে।

সুরা আল-মুনাফিকুন (৬৩:১): আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদী (কাযিবুন)। 

(কুরআনী সামঞ্জস্যতা: কেন তারা মিথ্যাবাদী? কারণ তাদের মুখের ‘আয়াত স্বীকৃতি’ আর তাদের জীবনধারা ও অন্তরের ‘বিমুখতা’ এক নয়। তাদের জীবনটাই একটি জীবন্ত মিথ্যা।)

◈ ৫. সত্য ও ন্যায়ের সাক্ষ্য গোপন করা:

বাস্তব জীবনে ধর্ম পালনের দাবিদার অনেকে সত্য জানার পরও তা গোপন করে। কুরআন একে আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপের সমতুল্য বলেছে।

সুরা আল-বাকারাহ (২:১৪০): তার চেয়ে বড় যালিম আর কে হতে পারে, যে তার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সাক্ষ্য (আয়াত/বিধান) গোপন করে? আর তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফেল নন।

তাদাব্বুর ভিত্তিক সিদ্ধান্ত: আমরা যখন এই আয়াতগুলোকে সমন্বয় করি, তখন একটি পরিষ্কার সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়:

প্রকৃত সত্যবাদী (সাদিকুন): তারাই যারা আল্লাহর আয়াত শোনার পর তা মুখে স্বীকার করে এবং বিনাবাক্যে বাস্তব জীবনে তা পালন করে।

প্রকৃত মিথ্যাবাদী (কাযিবুন): তারা কেবল কাফিররাই নয়, বরং সেই সব নামধারী মুসলিমও যারা আল্লাহর আয়াতকে মুখে স্বীকার করেও বাস্তব জীবনে ‘লাহওয়াল হাদিস’ বা মনগড়া প্রথা অনুসরণ করে আল্লাহর বিধানকে প্রত্যাখ্যান করে।

সালামুন আলা নূহ থেকে সালামুন আলা মুহাম্মদ—সকল রাসূলগণ এই ‘ব্যবহারিক মিথ্যাবাদিতা’র বিরুদ্ধেই লড়াই করেছিলেন। ১৬:১০৫ আয়াতের সেই অমোঘ ঘোষণা

তারাই প্রকৃত মিথ্যাবাদী যারা আল্লাহর আয়াতসমূহ মেনে নেয় না—এটি কেবল অবিশ্বাসীদের জন্য নয়, বরং আয়াতকে অমান্যকারী প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই প্রযোজ্য।

◈ সত্য আসার পর তা না মানা ‘চরম যুলুম ও মিথ্যা’:

যখন কারো কাছে আল্লাহর সুস্পষ্ট বিধান বা আয়াত পৌঁছে যায়, তারপরও যদি সে তা গ্রহণ না করে বা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে সে চরম মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত।

সুরা আল-আনকাবুত (২৯:৬৮): তার চেয়ে বড় যালিম আর কে হতে পারে, যে আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করে অথবা তার কাছে সত্য (হাক্ক/আয়াত) আসার পর তাকে অস্বীকার করে?

সুরা আল-আন’আম (৬:৩৩): হে নবী! আমরা জানি যে তাদের কথাবার্তা আপনাকে নিশ্চয়ই ব্যথিত করে। আসলে তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী (তাকজিব) বলছে না, বরং যালিমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকেই অস্বীকার করছে।

কুরআনী সামঞ্জস্যতা: এখানে লক্ষ্য করুন, সালামুন আলা মুহাম্মদ (সা.)-কে তারা ব্যক্তিগতভাবে মিথ্যাবাদী বলতে পারেনি, কিন্তু যখনই তিনি ‘আয়াত’ শোনাতেন, তখনই তারা তা অস্বীকার করত। আল্লাহ বলছেন, আয়াত অস্বীকার করাই হলো মূল ‘তাকজিব’ বা মিথ্যাচার।

◈ ৩. আল-মুকাজ্জিবুন: যারা আল্লাহর আয়াতকে ‘পুরাকালের গল্প’ বলে-

যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে গুরুত্ব দেয় না এবং সেগুলোকে সেকেলে বা মানুষের তৈরি গল্প মনে করে, কুরআন তাদের জন্য ‘মুকাজ্জিব’ বা চরম মিথ্যাবাদী শব্দ ব্যবহার করেছে।

সুরা আল-মুতাফফিফিন (৮৩:১০-১৩): সেদিন ধ্বংস হবে মিথ্যাবাদীদের জন্য (লিল-মুকাযযিবিন), যারা বিচার দিবসকে অস্বীকার করে। ... যখন তার কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, সে বলে—‘এগুলো তো পুরাকালের উপকথা।

সুরা আল-আ’রাফ (৭:১৮২): আর যারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে (কাযযাবু বি-আয়াতিনা), আমি তাদের ক্রমে ক্রমে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাব এমনভাবে যে, তারা জানতেও পারবে না।

◈ ৪. আল্লাহর আয়াত নিয়ে বিদ্রূপকারী ও বিমুখ মিথ্যাবাদী:

কুরআনের অনেক জায়গায় ‘মিথ্যাবাদী’ (কাযিব) এবং ‘অহংকারী বিমুখ’ ব্যক্তিকে সমার্থক হিসেবে দেখানো হয়েছে।

সুরা আল-জাসিয়াহ (৪৫:৭-৮): ধ্বংস প্রত্যেক ঘোর মিথ্যাবাদী পাপাচারীর (আফফাকিন আসিম) জন্য। সে আল্লাহর আয়াতসমূহ শুনতে পায় যা তার কাছে পাঠ করা হয়, অথচ সে অহংকারের সাথে (তার ওপর) অবিচল থাকে যেন সে তা শুনতেই পায়নি।

তাদাব্বুর: এখানে ‘মিথ্যাবাদী’র বৈশিষ্ট্য হলো—সে আল্লাহর আয়াত শুনবে কিন্তু তা আমল করবে না বা মেনে নেবে না। এই ‘মেনে না নেওয়াটাই’ তাকে মিথ্যার রাজ্যে আসীন করে।

◈ ৫. সত্য ও মিথ্যার কুরআনিক সিমেট্রি (Symmetry):

আমরা আয়াতগুলোর সামঞ্জস্য দেখি:

ঈমান = আল্লাহর আয়াত মেনে নেওয়া।

মিথ্যা (কিবজ) = আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করা বা অমান্য করা।

সুরা আয-যুমার (৩৯:৩২): “তবে তার চেয়ে বড় যালিম আর কে হতে পারে, যে আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করে এবং সত্য (সিদক/আয়াত) আসার পর তা অস্বীকার করে?

সালামুন আলা নূহ, সালামুন আলা ইব্রাহিম ও সালামুন আলা মুসা—তাঁদের সময়কার অবাধ্য লোকগুলো কেবল সাধারণ মিথ্যা কথা বলত না, বরং তারা ‘আল্লাহর আয়াত’ মেনে নিতে অস্বীকার করত। এ কারণেই আল্লাহ তাদের ‘মুকাজ্জিবুন’ বা চরম মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করেছেন।

সারসংক্ষেপ ও উপসংহার: আল-কুরআনের অকাট্য দলিল অনুযায়ী ‘মিথ্যাবাদী’ (কাযিবুন) হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো আল্লাহর আয়াতসমূহ মেনে না নেওয়া।

◈ যারা আল্লাহর আয়াতকে উপহাস করে বা গুরুত্বহীন মনে করে।

◈ যারা সত্য জানার পরও নিজের খেয়াল-খুশিমতো চলার জন্য আয়াতকে অস্বীকার করে।

◈ যারা দাবি করে যে তারা মুমিন, কিন্তু আল্লাহর কিতাবের বিধান মেনে চলে না (মুনাফিকী মিথ্যা)।

চূড়ান্ত কথা: ১৬:১০৫ আয়াতটি আমাদের জন্য একটি চিরন্তন মানদণ্ড। এটি ঘোষণা করে যে, আল্লাহর আয়াতের প্রতি আনুগত্যহীনতাই হলো মিথ্যাচারের মূল উৎস। সত্যবাদী (সাদিকুন) কেবল তারাই, যারা আল্লাহর আয়াত শোনার সাথে সাথে তা শিরোধার্য করে নেয়।

░ ▓▒░দুআসমূহ:░▒▓ ░

আল-কুরআনে বর্ণিত ‘কাযিবুন’ (মিথ্যাবাদী) ও ‘আল-মুকাজ্জিবুন’ (সত্য অস্বীকারকারী)-দের পথ থেকে রক্ষা পেতে এবং সত্যের ওপর অবিচল থাকতে আল্লাহ যে দোয়াগুলো শিখিয়েছেন,  এই দোয়াগুলো পাঠের মাধ্যমে একজন মুমিন নিজের ঈমানকে মিথ্যার কলুষতা থেকে হেফাযত করতে পারেন।

মিথ্যাবাদীদের প্রভাব ও চারিত্রিক বিচ্যুতি থেকে রক্ষার কুরআনি দুআসমূহ:

◈ ১. অন্তরের বক্রতা (মিথ্যা ও বিচ্যুতি) থেকে বাঁচার দোয়া:

মিথ্যাবাদিতার মূল উৎস হলো অন্তরের বক্রতা। ঈমানকে রক্ষা ও সঠিক পথে অটল থাকতে এই দোয়াটি সর্বোত্তম।

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ

রব্বানা লা তুযিগ ক্বুলুবানা বা’দা ইয হাদায়তানা ওয়া হাবলানা মিল্লাদুনকা রহমাহ, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহ্‌হাব।

হে আমাদের রব! সরল পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে সত্যলঙ্ঘন বা বক্রতায় লিপ্ত করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি পরম দাতা। (সুরা আলে ইমরান, ৩:০৮)

◈ ২. মিথ্যাবাদী ও সত্য অস্বীকারকারীদের ফিতনা থেকে মুক্তির দোয়া:

সালামুন আলা ইব্রাহিম ও তাঁর অনুসারীরা এই দোয়ার মাধ্যমে মিথ্যাবাদী কাফিরদের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়েছিলেন।

رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلَّذِينَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ

ব্বানা লা তাজ’আলনা ফিতনাতাল লিল্লাযীনা কাফারূ ওয়াগফির লানা রব্বানা, ইন্নাকা আনতাল আযীযুল হাকীম।

হে আমাদের রব! আপনি আমাদের কাফিরদের (সত্য অস্বীকারকারী ও মিথ্যাবাদীদের) পরীক্ষার পাত্র করবেন না। হে আমাদের রব! আমাদের ক্ষমা করুন, নিশ্চয়ই আপনি মহাপরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়। (সুরা আল-মুমতাহিনা, ৬০:০৫)

◈ ৩. যালিম ও মিথ্যাচারী সম্প্রদায়ের প্রভাব থেকে রক্ষার দোয়া:

মিথ্যাবাদীরাই কুরআনের ভাষায় প্রকৃত যালিম। তাদের কুপ্রভাব থেকে বাঁচতে সালামুন আলা মুসা-এর কওমের মুমিনদের এই দোয়াটি শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ ۞ وَنَجِّنَا بِرَحْمَتِكَ مِنَ الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

রব্বানা লা তাজ’আলনা ফিতনাতাল লিলক্বাওমিয যলিমীন। ওয়া নাজ্জিনা বিরহমাতিকা মিনাল ক্বাওমিল কাফিরীন।

হে আমাদের রব! আপনি আমাদের এই যালিম কওমের পরীক্ষার পাত্র করবেন না। আর আপনার অনুগ্রহে আমাদের এই কাফির (সত্য অস্বীকারকারী) সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন। (সুরা ইউনুস, ১০:৮৫-৮৬)

◈ ৪. প্রতিটি কাজে সত্যবাদিতা (সিদক) বজায় রাখার দোয়া:

সব ধরনের মিথ্যাচার (কাযিব) থেকে দূরে থেকে প্রতিটি কাজে সত্যের প্রতিফলন ঘটাতে এই দোয়াটি অত্যন্ত কার্যকর।

رَّبِّ أَدْخِلْنِي مُدْخَلَ صِدْقٍ وَأَخْرِجْنِي مُخْرَجَ صِدْقٍ وَاجْعَل لِّي مِن لَّدُنكَ سُلْطَانًا نَّصِيرًا

রব্বি আদখিলনী মুদখালা সিদকিঁও ওয়া আখরিজনী মুখরাজা সিদকিঁও ওয়াজ’আললী মিল্লাদুনকা সুলত্বানান নাছীরা।

হে আমার রব! আমাকে দাখিল করুন সত্যের সাথে এবং আমাকে বের করুন সত্যের সাথে; আর আপনার পক্ষ থেকে আমাকে দান করুন সাহায্যকারী শক্তি। (সুরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৮০)

◈ ৬. অন্তরের বিদ্বেষ (মিথ্যার মূল কারণ) দূর করার দোয়া:

মানুষ যখন একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, তখনই সে মিথ্যা ও অপবাদের আশ্রয় নেয়। অন্তরকে এই ব্যাধি থেকে মুক্ত রাখতে এই দোয়াটি পঠনীয়।

رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ

রব্বানাগ্-ফির লানা ওয়া লি-ইখ্ওয়ানিনাল্লাযীনা সাবাকূনা বিল্-ঈমানি ওয়ালা তাজ্-আল ফী কুলূবিনা গিল্লাল-লিল্লাযীনা আমানূ রব্বানা ইন্নাকা রউফুর রহীম।

হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের সেই ভাইদের ক্ষমা করুন যারা আমাদের পূর্বে ঈমান এনেছে। আর আমাদের অন্তরে মুমিনদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আপনি দয়ালু ও পরম করুণাময়। (সুরা আল-হাশর, ৫৯:১০)

◈ ৭. মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের (মুকাজ্জিবুন) বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনার দোয়া

সালামুন আলা ইব্রাহিম, সালামুন আলা মুসা ও সালামুন আলা মুহাম্মদ—তাঁরা প্রত্যেকেই মিথ্যাবাদীদের চ্যালেঞ্জের মুখে এই সত্যের শক্তি দিয়েই জয়ী হয়েছিলেন।

সালামুন আলা নূহ এবং অন্যান্য রাসূলগণ যখন তাঁদের সম্প্রদায়ের ‘মুকাজ্জিবুন’ বা চরম মিথ্যাবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং তারা যখন সত্যকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিল, তখন তাঁরা এই প্রার্থনাটি করেছিলেন:

رَبِّ انصُرْنِي بِمَا كَذَّبُونِ

রব্বিন-সুরনী বিমা কাযযাবূন।  হে আমার রব! আপনি আমাকে সাহায্য করুন, কারণ তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলছে (আমার আনীত সত্যকে অস্বীকার করছে)। (সুরা আল-মুমিনুন, ২৩:২৬ ও ২৩:৩৯)

এই দোয়ার গভীরতা ও প্রাসঙ্গিকতা (তাদাব্বুর):

প্রেক্ষাপট: এই দোয়াটি এমন এক চরম মুহূর্তে করা হয় যখন মিথ্যাবাদীরা সত্যের কণ্ঠরোধ করতে চায়। সালামুন আলা নূহ যখন ৯৫০ বছর দাওয়াত দেওয়ার পরও দেখলেন যে তারা কেবল ‘তাকজিব’ (মিথ্যা প্রতিপন্ন) করছে, তখন তিনি এই সাহায্য চেয়েছিলেন।

কুরআনি সামঞ্জস্যতা (Symmetry): ১৬:১০৫ আয়াতে যেমন বলা হয়েছে যে যারা আয়াত বিশ্বাস করে না তারাই মিথ্যাবাদী, এই ২৩:২৬ আয়াতে সেই মিথ্যাবাদীদের কবল থেকে রক্ষার পথ দেখানো হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, যখন কেউ সত্যের ওপর অটল থাকে এবং চারপাশের মানুষ তাকে মিথ্যাবাদী বলে অপবাদ দেয়, তখন একমাত্র আল্লাহর সাহায্যই তার বড় আশ্রয়।

শিক্ষণীয় দিক: এই দোয়াটি আমাদের শেখায় যে—

১. মিথ্যাবাদীদের (মুকাজ্জিবুন) সংখ্যা বেশি হলেও ঘাবড়ানোর কিছু নেই।

২. সত্যের পথে থাকলে আল্লাহর কাছে সরাসরি সাহায্য চাওয়া নবীদের পথ।

৩. ‘তাকজিব’ বা সত্যকে মিথ্যা বলা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যার ফয়সালা আল্লাহ নিজেই করেন।


একনজরে ৭টি বিশেষ দোয়ার সারসংক্ষেপ (আমলযোগ্য):

১. অন্তরের বক্রতা থেকে বাঁচতে: (৩:৮)

২. মিথ্যাবাদীদের ফিতনা থেকে বাঁচতে: (৬০:৫)

৩. যালিম মিথ্যাচারীদের প্রভাব থেকে বাঁচতে: (১০:৮৫-৮৬)

৪. কাজে ও কথায় সত্যবাদিতা (সিদক) অর্জনে: (১৭:৮০)

৫. সত্যের ওপর ধৈর্য ও অবিচল থাকতে: (৭:১২৬)

৬. অন্তরের বিদ্বেষ ও অপবাদ থেকে বাঁচতে: (৫৯:১০)

৭. মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদের বিরুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য পেতে: (২৩:২৬)

এই সাতটি দোয়া আল-কুরআনের এমন এক সুসংহত সুরক্ষা দেয় যা একজন মুমিনকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সকল প্রকার মিথ্যা ও মিথ্যাবাদীদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করে।


আল-কুরআনের বিশাল ভাণ্ডারে আরও কিছু শক্তিশালী দোয়া রয়েছে যা সরাসরি ‘তাকজিব’ (সত্যকে মিথ্যা বলা), ‘ইফতিরা’ (মিথ্যা অপবাদ) এবং ‘বাতিলে’র (মিথ্যা ও অলীক বিষয়) কবল থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহ তাআলা শিখিয়েছেন।


◈ ৮. সত্য ও মিথ্যার চূড়ান্ত ফয়সালা ও বিজয়ের দোয়া

সালামুন আলা শুআইব এবং তাঁর অনুসারীরা যখন সত্য অস্বীকারকারী ‘মুকাজ্জিবিন’দের দ্বারা দেশান্তরী হওয়ার হুমকির মুখে পড়েন, তখন তাঁরা এই দোয়াটি করেছিলেন। এটি মিথ্যাবাদীদের ওপর সত্যের চূড়ান্ত বিজয়ের দোয়া।

رَبَّنَا افْتَحْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ قَوْمِنَا بِالْحَقِّ وَأَنتَ خَيْرُ الْفَاتِحِينَ

রব্বানাফতাহ্‌ বাইনানা ওয়া বাইনা ক্বাওমিনা বিল-হাক্বি ওয়া আনতা খইরুল ফাতিহীন।

হে আমাদের রব! আমাদের ও আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে ইনসাফের সাথে ফয়সালা করে দিন; আর আপনিই শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী (সুরা আল-আ’রাফ, ৭:৮৯)

◈ ৯. অনাগত প্রজন্মের মধ্যে সত্যের সুবাস (লিসানা সিদক) ধরে রাখার দোয়া

সালামুন আলা ইব্রাহিম এই বিশেষ দোয়াটি করেছিলেন যাতে তিনি এবং তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম সব সময় সত্যের পথে থাকে এবং তাদের পরিচিতি যেন ‘মিথ্যাবাদী’দের বিপরীতে ‘সত্যবাদী’ হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকে।

رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ ۞ وَاجْعَل لِّي لِسَانَ صِدْقٍ فِي الْآخِرِينَ

রব্বি হাবলী হুকমাও ওয়া আলহিক্বনী বিস-সলিহীন। ওয়াজ’আললী লিসানা সিদকিন ফিল আখিরীন।

হে আমার রব! আমাকে হিকমত (প্রজ্ঞা) দান করুন এবং আমাকে নেককারদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আর পরবর্তীদের মধ্যে আমার জন্য সত্যের সুখ্যাতি (সত্যবাদী হিসেবে পরিচিতি) সুপ্রতিষ্ঠিত করুন। (সুরা আশ-শুআরা, ২৬:৮৩-৮৪)

◈ ১০. শয়তানের প্ররোচনা (যা মিথ্যার মূল উৎস) থেকে রক্ষার দোয়া:

কুরআন অনুযায়ী শয়তানই মানুষের মনে মিথ্যার বীজ বপন করে (সুরা ২৬:২২১-২২২)। শয়তানি উসকানি থেকে বাঁচতে এই দোয়াটি অতীব জরুরি।

رَّبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ ۞ وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَن يَحْضُرُونِ

রব্বি আ’উযুবিকা মিন হামাযাতিশ শায়াত্বীন। ওয়া আ’উযুবিকা রব্বি আইঁ ইয়াহ্‌যুরুন।

হে আমার রব! আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি শয়তানের প্ররোচনা থেকে। আর হে আমার রব! আমি আপনার আশ্রয় চাই—তারা আমার কাছে উপস্থিত হওয়া থেকে। (সুরা আল-মুমিনুন, ২৩:৯৭-৯৮)


◈ ১১. মিথ্যা ও পাপের পরিবেশ থেকে মুক্তির দোয়া:

সালামুন আলা লুত যখন তাঁর সম্প্রদায়ের চরম মিথ্যাচার ও পাপাচারের মধ্যে অসহায় বোধ করছিলেন, তখন তিনি এই দোয়াটি করেছিলেন। এটি বর্তমান সময়ের মিথ্যা ও ফিতনাময় পরিবেশ থেকে বাঁচার এক অনন্য মাধ্যম।

رَبِّ نَجِّنِي وَأَهْلِي مِمَّا يَعْمَلُونَ

রব্বি নাজ্জিনী ওয়া আহ্‌লী মিম্মা ইয়া’মালুন।  
হে আমার রব! আমাকে এবং আমার পরিবারকে তারা যা করে (মিথ্যাচার ও পাপাচার) তা থেকে রক্ষা করুন। (সুরা আশ-শুআরা, ২৬:১৬৯)

◈ ১২. জালিম ও মিথ্যাবাদী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে বাঁচার দোয়া:

যখন মানুষ মিথ্যাবাদীদের দাপট দেখে বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করে, তখন এই দোয়াটি তাকে সত্যের ওপর অবিচল থাকতে সাহায্য করে।

رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ

রব্বানা লা তাজ’আলনা মা’আল ক্বাওমিয যলিমীন।

হে আমাদের রব! আমাদের এই যালিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করবেন না (অর্থাৎ তাদের মিথ্যা ও পাপে আমাদের জড়িয়ে দেবেন না)। (সুরা ৭:৪৭)


সত্যের ওপর অবিচল থাকা ও মিথ্যাবাদীদের প্রভাব থেকে রক্ষার শ্রেষ্ঠ কুরআনি দোয়া:

কুরআনের আয়াতসমূহ অনুযায়ী, মিথ্যাবাদীদের হাত থেকে বাঁচার প্রধান অস্ত্র হলো আল্লাহর নিদর্শনের ওপর দৃঢ় ঈমান এবং সত্যের ওপর মৃত্যুবরণ করার আকাঙ্ক্ষা। নিম্নে আপনার প্রদত্ত আয়াতত্রয়ের গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো:

◈ 13. আল্লাহর আয়াতের প্রতি সমর্পণ ও মিথ্যার বিরুদ্ধে ধৈর্য (সুরা আল-আ’রাফ ৭:১২৬)

آمَنَّا بِآيَاتِ رَبِّنَا لَمَّا جَاءَتْنَا ۚ رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ
আ-মান্না- বিআ-ইয়া-তি রব্বিনা-লাম্মা-জ্বা-য়াতনা-; রব্বানা- আফ্রিগ্ ‘আলাইনা- ছব্রাওঁ অতাওয়াফ্ফানা-মুসিলমীন্।

আমরা আমাদের রবের আয়াতগুলোর প্রতি ঈমান এনেছি। হে আমাদের রব! আপনি আমাদের ওপর ধৈর্য ঢেলে দিন এবং আমাদেরকে মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দান করুন।

তাদাব্বুর ও কুরআনী সামঞ্জস্যতা (Symmetry):

এই দোয়াটি করেছিলেন ফেরাউনের জাদুকররা, যখন তারা সালামুন আলা মুসা-এর মোজেজা দেখে সত্যকে চিনে ফেলেছিলেন। ফেরাউন তাদের ‘মিথ্যা ষড়যন্ত্রকারী’ (সুরা ২০:৬৩) বলে অপবাদ দিচ্ছিল।

কেননা মুসলিমের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে-আয়াতে বিশ^াসীরাই মুসলিম-দ্র: ্আয়াত ৪৩:৬৯, ২৭:৮১, ৩০:৫৩। ১৬:১০৫ আয়াতে বলা হয়েছে যারা আয়াত বিশ্বাস করে না তারাই মিথ্যাবাদী। আর জাদুকররা এখানে বলছেন ‘আ-মান্না বি-আয়াতিনা’ (আমরা আয়াত বিশ্বাস করেছি)। অর্থাৎ তারা মিথ্যার জগৎ ছেড়ে সত্যের জগতে প্রবেশের ঘোষণা দিয়েছেন।

❖ শিক্ষা: যখন সমাজ আপনাকে সত্যের জন্য ‘মিথ্যাবাদী’ বানানোর চেষ্টা করবে, তখন এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ধৈর্য ও ঈমানের ওপর অটল থাকার শক্তি চাইতে হয়।

◈ ২. সকল অবস্থায় আল্লাহর অভিভাবকত্ব ও সত্যবাদীদের সাহচর্য 

فَاطِرَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ أَنتَ وَلِىِّۦ فِى ٱلدُّنْيَا وَٱلْءَاخِرَةِ ۖ تَوَفَّنِى مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِى بِٱلصَّٰلِحِينَ
ফা-ত্বিরস্ সামা-ওয়া-তি অল্ আরদ্বি আংতা অলিয়্যী ফিদ্দুনইয়া-অল্ আ-খিরতি, তাঅফ্ফানী মুসলিমাওঁ অ আল্হিক্বুনী- বিচ্ছোয়া-লিহী-ন্।

হে মহাকাশ ও পৃথিবীর স্রষ্টা! দুনিয়ার মধ্যে ও আখেরাতে আপনিই আমার অভিভাবক। আপনি আমাকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দিন এবং আমাকে (সৎকর্মশীলদের) সালেহীনদের সাথে মিলিত করুন। (সুরা ইউসুফ ১২:১০১)

তাদাব্বুর ও কুরআনী সামঞ্জস্যতা (Internal Coherence):

সালামুন আলা ইউসুফ সারা জীবন মিথ্যার (অপবাদ ও ষড়যন্ত্র) শিকার হয়েছিলেন। আজিজ পত্নী তাঁর ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল (সুরা ১২:২৫-২৮)।

❖ তদাব্বুর: মিথ্যাবাদীদের (কাযিবুন) বড় বৈশিষ্ট্য হলো তারা সত্যবাদীদের একঘরে করে ফেলে। সালামুন আলা ইউসুফ এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ‘সালেহীন’ বা সত্যবাদী সৎকর্মশীলদের সাহচর্য চেয়েছেন।

❖ শিক্ষা: মিথ্যার ভিড়ে যখন আপনি একা হয়ে পড়বেন, তখন আল্লাহর অভিভাবকত্ব (ওয়ালি) এবং সৎলোকদের সাথে মিলিত হওয়ার এই প্রার্থনা আপনাকে পথ দেখাবে।

সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দোয়া:

মিথ্যাবাদীদের (কাযিবুন) বিপরীত হলো সত্যবাদী (সাদিকুন)। আল্লাহর কাছে সত্যবাদীদের সঙ্গী হওয়ার আরজি জানানো মুমিনের বৈশিষ্ট্য। [হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করো এবং সত্যবাদীদের (সাদিকিন) অন্তর্ভুক্ত হও-৯:১১৯]

(তাদাব্বুর: এটি একটি নির্দেশ হলেও মুমিন এটি আমল ও দোয়ার মাধ্যমে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করে যাতে সে মিথ্যাবাদীদের সঙ্গ থেকে বাঁচতে পারে।)

◈‘লিসানা সিদক’ বা সত্যভাষী হওয়ার প্রার্থনা (সুরা আশ-শুআরা ২৬:৮৩-৮৫):

رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ ۞ وَاجْعَل لِّي لِسَانَ صِدْقٍ فِي الْآخِرِينَ ۞ وَاجْعَلْنِي مِن وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ
রব্বি হাবলী হুক্মাঁও অআল্হিক্বনী বিচ্ছোয়া-লিহীন্। অজ্ব ‘আল্লী লিসা-না ছিদ্ক্বিন্ ফিল্ আ-খিরীন্। অজ্ব‘আল্নী মিঁও অরছাতি জ্বান্নাতিন্ না‘ঈম্।

হে আমার রব! আপনি আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের (সালেহীন) সাথে সম্পৃক্ত করুন। আর আমাকে পরবর্তীদের মাঝে সত্যভাষী বানান এবং আমাকে জান্নাতুন নাঈমের উত্তরাধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।

তাদাব্বুর ও কুরআনী সামঞ্জস্যতা (Symmetry of Sidq):  কেন এই দোয়াগুলো মিথ্যাবাদীদের বিরুদ্ধে কার্যকর?

সালামুন আলা ইব্রাহিম এই দোয়াটি করেছিলেন। তিনি মূর্তিপূজারী ও মিথ্যা উপাস্য গ্রহণকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।

❖ তদাব্বুর: এখানে একটি বিস্ময়কর শব্দ রয়েছে— ‘লিসানা ছিদ্ক্বিন’ (সত্যভাষী বা সত্যের সুখ্যাতি)। ১৬:১০৫ আয়াতে মিথ্যাবাদীদের ‘জিহ্বা’ দিয়ে মিথ্যা সাজানোর কথা বলা হয়েছে (১৬:১১৬), তার বিপরীতে সালামুন আলা ইব্রাহিম আল্লাহর কাছে ‘সত্যের জিহ্বা’ চেয়েছেন।

❖ শিক্ষা: এই দোয়াটি মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ঢাল। এটি কেবল সত্য বলা নয়, বরং কিয়ামত পর্যন্ত সত্যবাদী হিসেবে বেঁচে থাকার এবং মিথ্যার অন্ধকারকে পরাজিত করার আরজি।

আমরা যখন ৩:৮, ১৬:১০৫ এবং আপনার প্রদত্ত ২৬:৮৪ আয়াতগুলোকে মেলাই, তখন একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাই:

➤ মিথ্যাবাদী (কাযিবুন): তারা আয়াত অস্বীকার করে (১৬:১০৫) এবং তাদের জিহ্বা মিথ্যা সাজায় (১৬:১১৬)।

➤ সত্যবাদী (মুমিন): তারা আয়াত মেনে নেয় (৭:১২৬), আল্লাহর অভিভাবকত্ব চায় (১২:১০১) এবং তাদের জিহ্বাকে সত্যের জন্য উৎসর্গ করে (২৬:৮৪)।

সালামুন আলা মুসা, সালামুন আলা ইউসুফ এবং সালামুন আলা ইব্রাহিম—তাঁদের জীবন ছিল মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের লড়াই। এই দোয়াগুলো আমাদের সেই সত্যের মিছিলে শামিল হওয়ার শক্তি যোগায়।

◈ সুরা আশ-শুআরার আয়াতগুলোতে (২৬:৮৪) ‘লিসানা সিদক’ (সত্যের জিহ্বা) চাওয়ার মাধ্যমে মিথ্যার জিহ্বাকে পরাজিত করার পথ শেখানো হয়েছে।

◈ সুরা আল-আ’রাফের (৭:৮৯) দোয়ায় ‘আল-ফাত্তাহ’ (বিজয় দানকারী) নাম ধরে ডাকার উদ্দেশ্য হলো—মিথ্যার জঞ্জাল সরিয়ে সত্যের দ্বার উন্মোচন করা।

◈ সুরা আল-মুমিনুনের (২৩:৯৭-৯৮) দোয়াটি সরাসরি ১৬:১০৫ আয়াতের বিপরীতে সুরক্ষা দেয়। কারণ অবিশ্বাস ও মিথ্যা রটনার পেছনে শয়তানের প্ররোচনা (হামাযাত) কাজ করে।

উপসংহার:
এই ১২টি দোয়া (আগের ৭টি ও বর্তমান ৫টি) সম্মিলিতভাবে একজন মুমিনকে মিথ্যা ও মিথ্যাবাদীদের হাত থেকে পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা দেয়। সালামুন আলা ইব্রাহিম, সালামুন আলা লুত ও সালামুন আলা শুআইব—তাঁদের প্রত্যেকের সংগ্রামের মূলে ছিল সত্য (সিদক) বনাম মিথ্যা (কিবজ)। এই দোয়াগুলো কেবল তিলাওয়াত নয়, বরং এগুলো সত্যের পথে চলার এক একটি বজ্রকণ্ঠ।


অধিকতর জানার জন্য বিশেষ নোট: 

আল-মুকাজ্জিবুন (অস্বীকারকারী) এর বিপরীতে 'আল-মুসাদ্দিকুন' (সমর্থনকারী)।  আল-কুরআনের অনেক স্থানে 'তাকজীব' (মিথ্যা প্রতিপন্ন করা) এর বিপরীতে 'তাসদীক' (সত্য বলে গ্রহণ করা বা সত্যায়ন করা) শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়।

◈ ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: 'মুকাজ্জিব' হলো সেই ব্যক্তি যে সত্য আসার পর তাকে 'মিথ্যা' বলে উড়িয়ে দেয়। এর বিপরীতে 'মুসাদ্দিক' হলো সেই ব্যক্তি যে সত্যকে চিনে নিয়ে তা হৃদয়ে ও মুখে স্বীকার করে নেয়।

◈ কুরআনের আয়াত দিয়ে বিশ্লেষণ: সূরা আল-লাইল-এ এই বৈপরীত্যটি চমৎকারভাবে চিত্রিত হয়েছে:

"পক্ষান্তরে যে দান করে ও তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যা উত্তম (কালিমা বা জান্নাত) তাকে সত্য বলে গ্রহণ করে (ওয়া সাদ্দাকা বিল হুসনা)।" (সূরা লাইল: ৫-৬)।

আবার এর বিপরীতে বলা হয়েছে: "কিন্তু যে কার্পণ্য করে ও বেপরোয়া হয় এবং যা উত্তম তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে (ওয়া কাযযাবা বিল হুসনা)।" (সূরা লাইল: ৮-৯)।

◈ সমন্বিত বিশ্লেষণ: এখানে 'সাদ্দাকা' (সত্যায়ন করা) সরাসরি 'কাযযাবা' (মিথ্যা প্রতিপন্ন করা) এর বিপরীত ক্রিয়া হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ মুকাজ্জিবুনদের প্রধান প্রতিপক্ষ হলো তারা যারা সত্যের 'তাসদীক' বা সত্যায়ন করে।

কাযিবুন-এর চারিত্রিক বিপরীত শব্দ: 'আল-মুমিনুন' ও 'আল-মুত্তাকুন'

কুরআনের আয়াত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মিথ্যাচার কেবল একটি শব্দ নয়, বরং এটি একটি কুফরী মানসিকতা। এর বিপরীতে ঈমান ও তাকওয়াকে স্থাপন করা হয়েছে।

ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: কাযিবুন বা মুকাজ্জিবুনরা সত্যকে অস্বীকার করে নিজেদের কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে। পক্ষান্তরে মুমিনরা সত্যকে অদৃশ্যে থাকা সত্ত্বেও বিশ্বাস করে।

কুরআনের আয়াত দিয়ে বিশ্লেষণ: সূরা আয-যুমারে বলা হয়েছে:

"আর যে সত্য নিয়ে এসেছে এবং যে তা সত্য বলে গ্রহণ করেছে (সাদ্দাকা বিহি), তারাই তো মুত্তাকী (সাবধানী/আল্লাহভীরু)।" (সূরা যুমার: ৩৩)।

সমন্বিত বিশ্লেষণ: এখানে সত্য নিয়ে আসা এবং তা সত্যায়ন করার বিপরীতে যারা মিথ্যা আরোপ করে, তাদের পরকালীন শাস্তির কথা বলে পার্থক্য স্পষ্ট করা হয়েছে। অর্থাৎ 'মুকাজ্জিবুন' এর বিপরীত হলো 'মুত্তাকুন', যারা সত্যকে পাওয়ার পর তা আকড়ে ধরে।

ভাষাতাত্ত্বিক গভীরতা: 'তাকজীব' বনাম 'তাসদীক' (ক্রিয়া ও কর্তাবাচক রূপ):

কুরআনের সূরা আল-মুরসালাত-এ বারবার একটি সতর্কবাণী এসেছে— "ওয়াইলুল ইয়াওমাইযিল লিল মুকাজ্জিবীন" (সেদিন ধ্বংস অস্বীকারকারীদের জন্য)। এই অস্বীকারকারীরা কারা? এর উত্তর কুরআনের অন্য আয়াতে এভাবে পাওয়া যায়:

◈ মুকাজ্জিবুন (المكذبون): সত্য বা হক আসার পর যারা তাকে প্রত্যাখ্যান করে।

◈ মুহসিনুন (المحسنون): সূরা আল-মুরসালাতের শেষ দিকে (৪৪ নং আয়াত) মুত্তাকী ও মুহসিনদের বর্ণনা দিয়ে মুকাজ্জিবুনদের বিপরীত অবস্থান বোঝানো হয়েছে। বলা হয়েছে, "নিশ্চয়ই আমি সৎকর্মশীলদের (মুহসিনিন) এভাবেই পুরস্কৃত করি।"

◈ এখানে 'তাকজীব' বা মিথ্যা প্রতিপন্ন করার বিপরীতে 'ইহসান' বা উত্তম কার্য সম্পাদনকে রাখা হয়েছে। কারণ মিথ্যাচার মানুষকে অসৎ কর্মে লিপ্ত করে, আর সত্যের সত্যায়ন মানুষকে 'মুহসিন' বা শ্রেষ্ঠ মানবে পরিণত করে।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post