রব্বুনাল্লাহ!
আমাদের রব আল্লাহ!
—একটি আদি অঙ্গীকারের স্মরণে যিকির ও জীবনদর্শন
‘রব্বুনাল্লাহ’ কেবল একটি বাক্য বা যিকির নয়; এটি মুমিনের আত্মপরিচয়, তার সাহসের উৎস এবং সিরাতাল মুসতাকিমে টিকে থাকার মূল ভিত্তি। এই ঘোষণার মাধ্যমেই একজন মানুষ তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য খুঁজে পায়। নিচে আয়াতগুলোর আলোকে ‘রব্বুনাল্লাহ’ ও ‘ইস্তেকামাত’ (অবিচলতা) সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা উপস্থাপন করা হলো:
১. আদি অঙ্গীকার: বিশ্বাসের শেকড় (রূহ জগতের প্রতিশ্রুতি):
‘রব্বুনাল্লাহ’ বা ‘আল্লাহই আমাদের রব’—এই ঘোষণাটি কোনো নতুন বিষয় নয়। এটি আমাদের রূহের গভীরে গেঁথে থাকা সেই আদি অঙ্গীকার যা আমরা জন্মের আগেই দিয়ে এসেছি।
আয়াত (৭:১৭২): "...(আল্লাহ জিজ্ঞাসা করলেন) ‘আমি কি তোমাদের পালনকর্তা (রব) নই?’ তারা বলল— ‘অবশ্যই (বালা), আমরা সাক্ষ্য দিলাম’।" (সূরা আল-আরাফ, ৭:১৭২)
তাদাব্বুর: দুনিয়াতে এই ঘোষণা দেওয়া হলো সেই পুরনো শপথের নবায়ন। যখন একজন মুমিন বলে ‘রব্বুনাল্লাহ’, সে মূলত তার রূহের গহীনে থাকা সত্যকেই প্রতিধ্বনিত করে।
২. ইস্তেকামাত: বিশ্বাসের অগ্নিপরীক্ষা ও পুরস্কার
শুধু মুখে ‘রব্বুনাল্লাহ’ বলাই যথেষ্ট নয়, বরং এই ঘোষণার ওপর আমৃত্যু ‘ইস্তেকামাত’ বা অবিচল থাকাটাই হলো আসল সার্থকতা। কুরআন এই অবিচলতাকে অনন্য পুরস্কারের সাথে যুক্ত করেছে।
ক) ফেরেশতাদের অবতরণ ও সুসংবাদ:
আয়াত (৪১:৩০): "নিশ্চয়ই যারা বলে, ‘আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ’ (রব্বুনাল্লাহ), অতঃপর অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে: তোমরা ভয় পেয়ো না, চিন্তিত হয়ো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো।" (সূরা ফুসসিলাত)
খ) ভয় ও দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনের গ্যারান্টি:
আয়াত (৪৬:১৩-১৪): "নিশ্চয় যারা বলে, আল্লাহ আমাদের রব (রব্বুনাল্লাহ), তারপর তারা অবিচল থাকে, তাহলে তাদের জন্য কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না। ওরাই জান্নাতের অধিকারী..." (সূরা আল-আহক্বাফ)
তাদাব্বুর: ৪১:৩০ ও ৪৬:১৩ আয়াত দুটি প্রায় অভিন্ন। একটিতে আখেরাতের সুসংবাদ (জান্নাত) প্রধান, অন্যটিতে দুনিয়া ও আখেরাতের মানসিক প্রশান্তি (ভয় ও দুশ্চিন্তা মুক্তি) প্রধান। ‘ইস্তেকামাত’ হলো সফলতার চাবিকাঠি।
৩. সত্যের পথে সাহসিকতা ও বিপ্লবী ঘোষণা
‘রব্বুনাল্লাহ’ বলা কেবল একটি তাসবিহ নয়, এটি বাতিলের সামনে একটি বৈপ্লবিক ঘোষণা। ফেরাউনের দরবারে দাঁড়িয়ে একজন মুমিন এই সত্যটিই উচ্চারণ করেছিলেন।
আয়াত (৪০:২৮): "...তোমরা কি একজন মানুষকে একারণে হত্যা করবে যে, সে বলে— ‘আমার পালনকর্তা আল্লাহ’ (রাব্বিয়াল্লাহ)? অথচ সে তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণসহ তোমাদের কাছে এসেছে।" (সূরা গাফির/মুমিন)
তাদাব্বুর: এই আয়াত প্রমাণ করে যে, ‘রব্বুনাল্লাহ’ বলা মুমিনের সাহসিকতার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ, যা জালিমের ভিত কাঁপিয়ে দেয়।
৪. ত্যাগের মহিমা: বিশ্বাসের দায়ে হিজরত
ইতিহাস সাক্ষী, মুমিনরা যখনই বলেছে ‘রব্বুনাল্লাহ’, তখনই তাদের ওপর জুলুম এসেছে। কিন্তু তারা এই ঘোষণা থেকে বিচ্যুত হয়নি।
আয়াত (২২:৪০): "যাদেরকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে শুধু এই কারণে যে, তারা বলে— ‘আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ’ (রব্বুনাল্লাহ)।" (সূরা আল-হাজ্জ)
তাদাব্বুর: মুমিনদের ওপর নির্যাতন এসেছে কেবল এই একটি সত্যকে ধারণ করার কারণে। ‘রব্বুনাল্লাহ’ হলো আত্মপরিচয়ের চূড়ান্ত ঘোষণা, যার জন্য ঘরবাড়ি ত্যাগ করাও তুচ্ছ।
৫. সার্বভৌমত্ব ও সৃষ্টির হাকীকত
আল্লাহ কেন আমাদের একমাত্র রব, তার যৌক্তিক কারণ তিনি নিজেই কুরআনে তুলে ধরেছেন।
আয়াত (৩৯:৬): "...তিনিই আল্লাহ, তোমাদের পালনকর্তা (রব্বুকুম); সার্বভৌমত্ব কেবল তাঁরই। তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। অতএব, তোমরা কোথায় বিভ্রান্ত হচ্ছ?" (সূরা আয-যুমার)
তাদাব্বুর: সৃষ্টিজগতের সব ক্ষমতা যেহেতু আল্লাহর, তাই ‘রব্বুনাল্লাহ’ বলার পর অন্য কারো প্রতি আনুগত্য বা দাসত্বের প্রশ্নই ওঠে না।
৬. একনিষ্ঠতা ও সংশোধন: ইস্তেকামাতের পদ্ধতি
কিভাবে এই পথে অবিচল থাকা যায়? আল্লাহ তায়ালা তার রসূলের (সা.) মাধ্যমে সেই পথ বলে দিয়েছেন।
আয়াত (৪১:৬): "বলুন! আমি তো তোমাদের মতো একজন মানুষই, আমার প্রতি ওহী নাযিল হয় যে, তোমাদের ইলাহ কেবল একজনই। অতএব, তোমরা তাঁরই দিকে সোজা পথে চলো (ফাসতাকিমু ইলাইহি) এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো।" (সূরা ফুসসিলাত)
তাদাব্বুর: ‘ইলাহুন ওয়াহিদ’ এবং ‘রব্বুনাল্লাহ’ মূলত একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এখানে ‘ইস্তেকামাত’ বা সোজা পথে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা ‘সিরাতাল মুসতাকিম’-এরই নামান্তর। আর মানুষ হিসেবে চলার পথে ভুল হলে ‘ইস্তিগফার’ বা ক্ষমা প্রার্থনা হলো এই পথে টিকে থাকার জ্বালানি।
সারসংক্ষেপ:
আল-কুরআনের এই আয়াতগুলোর সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন ফুটে ওঠে:
১. অঙ্গীকার: আমরা রূহ জগতে স্বীকার করেছি যে তিনি আমাদের রব (৭:১৭২)।
২. ঘোষণা: দুনিয়াতে এসে প্রতিকূল পরিবেশেও আমরা বলি 'রব্বুনাল্লাহ' (২২:৪০, ৪০:২৮)।
৩. কর্মপন্থা: এই ঘোষণার পর আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো 'ইস্তেকামাত' বা অবিচল থাকা (৪১:৩০, ৪১:৬)।
৪. পরিণতি: যারা এই পথে অবিচল থাকবে, তারা দুনিয়াতে হবে নির্ভীক ও মানসিক প্রশান্তির অধিকারী (৪৬:১৩) এবং পরকালে হবে জান্নাতের চিরস্থায়ী উত্তরাধিকারী (৪১:৩০)।
উপসংহার:
সিরাতাল মুসতাকিম মূলত এই ‘রব্বুনাল্লাহ’ ঘোষণার ওপর আমৃত্যু টিকে থাকার একটি সক্রিয় সংগ্রাম। এটি কেবল জিব্বার যিকির নয়, বরং অন্তর, মুখ ও কর্মের এক অপূর্ব সমন্বয়। যারা এই ঘোষণাকে ধারণ করে এবং শত ঝড়েও অবিচল থাকে, তারাই সফল।