░ দুআ ও তাসবিহ: রমাদান ও জিলহজ্জের নতুন চাঁদ, সাহার ও ইতমাম (ইফতার)- উপলক্ষে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রকৃত অনুসরণে ১০০% অথেনটিক কুরআনি দুআ ও তাসবিহ ░
আল-কুরআনের আলোকে ইবাদতের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু তা’লা ও তাঁর রাসুল (সালামুন আলা মুহাম্মাদ) সুনির্দিষ্ট এবং অর্থবহ দুআ শিখিয়েছেন। নিচে মহাজাগতিক সময়ের সাথে মিল রেখে কুরআনের আয়াতসমূহ দুআ আকারে দেওয়া হলো:

▓ পর্ব-১: নতুন চাঁদ (আহিল্লা) দর্শন বা নতুন মাসে প্রবেশের দুআ:
(সময়: চাঁদ মাসের প্রথম রজনীতে)
আল্লাহ চাঁদকে ‘মাওয়াকিত’ বা সময় নির্ধারক বানিয়েছেন (২:১৮৯)। নতুন চাঁদ দেখা মানে একটি নতুন সময়ে বা ‘মঞ্জিলে’ প্রবেশ করা। এই সময়ের শ্রেষ্ঠ কুরআনি আমল হলো:
১. বরকতময় প্রবেশের দুআ:
সালামুন আলা নুহ-কে আল্লাহ শিখিয়েছিলেন কীভাবে নতুন কোনো স্থানে বা অবস্থায় নিরাপদ ও বরকতময়ভাবে অবতরণ করতে হয়। রমাদান বা নতুন মাসে প্রবেশের জন্য এটি শ্রেষ্ঠ দুআ।
رَّبِّ أَنزِلْنِي مُنزَلًا مُّبَارَكًا وَأَنتَ خَيْرُ الْمُنزِلِينَ
রব্বি আনযিলনি মুনযালাম-মুবারাকাওঁ ওয়া আনতা খাইরুল মুনযিলিন।
অর্থ: হে আমার রব! আমাকে বরকতময়ভাবে অবতরণ করাও (বা বরকতময় স্থানে/সময়ে প্রবেশ করাও)। আর আপনিই তো সর্বশ্রেষ্ঠ অবতরণকারী। সূরা আল-মুমিনুন (২৩:২৯)
২. মহাজাগতিক চিন্তন ও সুরক্ষার দুআ:
আকাশে চাঁদ বা নক্ষত্র দেখে উলিল আলবাব (জ্ঞানীগণ) এই দুআ করেন।
رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذا بَاطِلاً سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
রব্বানা মা খালাক্বতা হা-যা বা-ত্বিলান, সুবহানাকা ফাক্বিনা আযাবান নার।
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি এসব (আসমান-জমিন/চন্দ্র) অনর্থক সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র! সুতরাং আপনি আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। সূরা আলে-ইমরান (৩:১৯১)
৩. সঠিক পথের দিশা ও রহমত কামনার দুআ:
رَبَّنَا آتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا
রব্বানা আ-তিনা মিল্লাদুনকা রহমাতাওঁ ওয়া হাইয়্যিই লানা মিন আমরি-না রশাদা।
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করুন এবং আমাদের কাজ-কর্মে সঠিক পথের নির্দেশ দিন। সূরা আল-কাহফ (১৮:১০)
৪. চাঁদ দেখে সালামুন আলা ইব্রাহিম -এর উপলব্ধি:
চাঁদ দেখে দুআ করার চেয়ে বড় ইবাদত হলো চাঁদ যে ‘রব’ নয়, বরং রবের ‘সৃষ্টি’—এই সাক্ষ্য দেওয়া।
■ সূরা আল-আনআম (৬:৭৭):
চাঁদ দেখে ডুবে যাওয়ার পর সালামুন আলা ইব্রাহিম বলেছিলেন:
لَئِن لَّمْ يَهْدِنِي رَبِّي لأكُونَنَّ مِنَ الْقَوْمِ الضَّالِّينَ
লা-ইল লাম ইয়াহদিনি রব্বি লা-আকুনান্না মিনাল ক্বাওমিদ দোয়াল্লিন।
অর্থ: যদি আমার রব আমাকে হেদায়েত না দিতেন, তবে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতাম। (৬:৭৭)
▓ পর্ব-২: সাহার বা শেষ রাতের দুআ ও তাসবিহ:
(সময়: রাতের শেষ প্রহর বা ফজর উদয়ের আগ পর্যন্ত)
আল-কুরআনে মুত্তাকিনদের বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে—তারা ‘সাহারের সময়’ ক্ষমা প্রার্থনা করে (৫১:১৮)। এই সময়টি আল্লাহর তাসবিহ এবং ইস্তিগফারের জন্য নির্ধারিত।
১. সাহারের বিশেষ ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা):
যারা বলেন—‘আমরা ঈমান এনেছি’, তাদের জন্য এই দুআটি সাহারের সময় পাঠ করা কুরআনের নির্দেশ।
رَبَّنَا إِنَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
রব্বানা ইন্নানা আমান্না ফাগফির লানা যুনুবানা ওয়া-ক্বিনা আযাবান নার।
অর্থ: হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং আপনি আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন এবং আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। সূরা আলে-ইমরান (৩:১৬)
২. নিজের নফসের ওপর জুলুমের স্বীকৃতি (আদম আ. এর দুআ):
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
রব্বানা জোয়ালামনা আনফুসানা ওয়া ইল-লাম তাগফির লানা ওয়া তারহামনা, লানাকুনান্না মিনাল খাসিরিন।অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তবে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।” সূরা আল-আরাফ (৭:২৩)
৩. সওমের নিয়তে দুআ- তাসবিহ :
إِنِّي نَذَرۡتُ لِلرَّحۡمَٰنِ صَوۡمٗا
ইন্নী নাযারতু লিরহমা-নি ছোয়াওমান্
অর্থ: নিশ্চয়ই আমি দয়াময়ের জন্য সওমের মানত করছি-আল কুরআন ১৯:২৬
৩. সাহারের তাসবিহ: তারকা অস্ত যাওয়ার সময়:
যখন তারকারা ডুবে যায় বা ম্লান হয়ে আসে (ফজরের আগে), তখন আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করতে বলা হয়েছে।
সূরা আত-তূর (৫২:৪৮-৪৯): “...এবং আপনি আপনার রবের সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করুন... এবং রাতের একাংশে তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করুন এবং তারকা অস্ত যাওয়ার সময়ও।”
আকাশে চাঁদ বা নক্ষত্র দেখে উলিল আলবাব (জ্ঞানীগণ) এই দুআ করেন।
رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذا بَاطِلاً سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
রব্বানা মা খালাক্বতা হা-যা বা-ত্বিলান, সুবহানাকা ফাক্বিনা আযাবান নার।
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি এসব (আসমান-জমিন/চন্দ্র) অনর্থক সৃষ্টি করেননি। আপনি পবিত্র! সুতরাং আপনি আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। সূরা আলে-ইমরান (৩:১৯১)
سُبْحَانَ اللَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
সুব্হা-নাল্লা-হি রব্বিল্ ‘আ-লামীন্ (ঝঁনযধহধষষধযর জধননরষ ‘ধধষধসববহ!)। অর্থ: জগতসমূহের রব আল্লাহ অপবিত্রতামুক্ত-আল কুরআন ২৭:৮ (৮৭:১)।
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’-লামি-ন। অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য (কেননা তিনি) মহাবিশ^ সমূহের রব। দয়াময়, দয়ালু- কুরআনুল কারীম ৩৯:৭৫, ১:২, ৬:৪৫, ১০:১০, ৩৭:১৮২, ৪০:৬৫ (৩২:২, ৩৯:৬)।
تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ
তাবা-রাকাল্লা-হু রব্বুল্ ‘আ-লামীন্। অর্থ: আল্লাহ বরকতময়, জগতসমূহের রব-আল কুরআন ৭:৫৪, ৪০:৬৪. (২৭:৬১)।
أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ
আসলামতু লিরব্বিল্ ‘আ-লামীন।
অর্থ: আমি জগতসমূহের ররেব কাছে আত্মসমর্পণ করলাম-আল কুরআন ২:১৩১ (২২:৩৪, ২১:১০৮, ৩৯:৫৪)।
▓ পর্ব-৩: ইতমাম (ইফতার) বা সিয়াম পূর্ণ করার দুআ:
(সময়: সূর্যাস্তের [আল-গুরূব] ঠিক পর পর)
আল্লাহর নির্দেশ ‘রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করো’ (২:১৮৭)। সূর্যাস্তের মাধ্যমে যখন সিয়াম পূর্ণ হয়, তখন কৃতজ্ঞতা ও কবুলিয়াতের জন্য নিচের দুআগুলো শ্রেষ্ঠ।
رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا ۖ إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
রব্বানা- আত্মিম্ লানা-নূরানা- ওয়ার্গ্ফি লানা- ইন্নাকা ‘আলা-কুল্লি শাইয়িন্ ক্বদীর।
অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের জন্য আমাদের নূরকে পূর্ণ করুন। আর আমাদের ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান-আল কুরআন ৬৬:৮
১. আমল কবুল হওয়ার দুআ:
যেকোনো নির্মাণ কাজ বা ইবাদত শেষ করার পর এটিই কুরআনের শেখানো দুআ।
رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
রব্বানা তাক্বাববাল মিন্না, ইন্নাকা আনতাস সামিউল আলিম।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে (এই সিয়াম/ইবাদত) কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। সূরা আল-বাকারা (২:১২৭)
২. দুনিয়া ও আখেরাতের সর্বাঙ্গীন কল্যাণ (শ্রেষ্ঠ দুআ):
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
রব্বানা আ-তিনা ফিদ-দুনিয়া হাসানাতাওঁ ওয়া ফিল-আখিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়া-ক্বিনা আযাবান নার।অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দিন এবং আমাদের আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন। সূরা আল-বাকারা (২:২০১):
৩. ক্ষমা ও রহমতের চূড়ান্ত দুআ:
আল্লাহ রাসুল (সালামুন আলা মুহাম্মাদ)-কে এই দুআটি শিখিয়েছেন এবং এটি সূরা মুমিনুনের শেষ আয়াত।
رَّبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ وَأَنتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ
রব্বিগ-ফির ওয়ারহাম ওয়া আনতা খাইরুর রাহিমিন।
অর্থ: হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন এবং রহমত করুন; আর আপনিই তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। সূরা আল-মুমিনুন (২৩:১১৮)
৪. আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা (তাকবীর):
সিয়াম পূর্ণ হলে আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করতে বলা হয়েছে (২:১৮৫)।
আমল: ইফতারের সময় মনে মনে বা মৃদু স্বরে “আল্লাহু আকবার” (আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ) ধ্বনি দিয়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ
রব্বানা- অ তাক্বাব্বাল্ দু‘আ-। অর্থ: হে আমার রব! আর আপনি আমার দুআ কবুল করুন-আল কুরআন ১৪:৪০ (৫:২৭)
বি:দ্র: আল-কুরআনের এই আয়াতগুলো মুখস্থ করে বা দেখে দেখে পাঠ করা মুমিনের জন্য শাফায়াত বা সুপারিশের কারণ হতে পারে। কোনো মানুষের বানানো বাক্য নয়, বরং রবের কালাম দিয়েই রবের কাছে চাওয়া হলো সর্বোচ্চ আদব।