ফেরআউন কি একাই দোষী ছিল? নাকি তার জনগণও? বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব! Intellectual bankruptcy! #Firaun.

⚠️মানুষ যখন বোকা সাজতে পছন্দ করে, তখনই ফেরআউনের জন্ম হয়! 

আল-কোরআনে ‘ফেরআউন’ ও তার ‘অন্ধ অনুসারী জনগণ’ কেবল ইতিহাসের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি চিরস্থায়ী মনস্তত্ত্ব বা চরিত্রের নাম। যুগে যুগে, দেশে দেশে এই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। আল্লাহ তায়ালা মহাগ্রন্থে এসব আলোচনা অত্যন্ত ব্যাপকভাবে করেছেন যাতে আমরা সচেতন হতে পারি। কিন্তু আফসোস! রবের পাঠানো এই সর্বশেষ গাইডবুকটি আমরা কজন বুঝে পড়ি?

ফেরআউন তার জনগণকে প্রথমেই হুট করে বা জোর করে মানেনি; বরং সে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলেছিল। সে তার ক্ষমতা, জৌলুস আর জাগতিক ‘সুযোগ-সুবিধার’ দোহাই দিয়ে জনগণকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে ফেলেছিল। সে এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছিল, যেখানে জনগণ তাদের নিজস্ব বিচারবুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলে। তারা মনে করতে শুরু করে—ফেরআউনের আনুগত্যেই তাদের মুক্তি।

এই প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:

“সে তার জাতিকে বোকা বানাল (বিবেচনাশক্তি শূন্য করল), ফলে তারা তার আনুগত্য করল। নিশ্চয় তারা ছিল এক ফাসিক (পাপাচারী) জনগোষ্ঠী।” (সূরা জুখরুফ: ৫৪)

চিন্তার বিষয় হলো—ফেরআউনের অসীম ক্ষমতার উৎস কেবল সে একা ছিল না; বরং জনগণের ‘প্রশ্নহীন আনুগত্য’ তাকে স্বৈরাচারী হওয়ার জ্বালানি যুগিয়েছিল। কুরআন সাক্ষ্য দিচ্ছে, জনগণ খুব ভালো করেই জানত ফেরআউনের পথ সত্য ও সঠিক নয়—

“তারা ফেরআউনের আদেশের অনুসরণ করেছিল, অথচ ফেরআউনের কাজ-কারবার মোটেই সত্য ও সঠিক ছিল না।” (সূরা হুদ: ৯৭)

তবুও তারা জাগতিক লোভ বা ভয়ের কারণে তাকেই অন্ধভাবে ‘সাপোর্ট’ দিয়ে গেছে। আর ইতিহাস সাক্ষী, যখন জনগণ সত্য জেনেও অন্ধ থাকে, তখন ধ্বংস কেবল শাসকের নয়, পুরো জাতির ওপরই নেমে আসে।


ভয়াবহ পরিণতি (Collective Punishment):  

ফেরআউন একা ডোবেনি। যখন শাসক ও জনগণ উভয়েই সীমালংঘন করল, তখন আল্লাহর গযব কেবল শাসকের ওপর আসেনি, বরং তাকে সমর্থন দেওয়া পুরো জাতির ওপর নেমে এলো। আল্লাহ বলেন-

“অতঃপর যখন তারা আমাকে রাগান্বিত/অসন্তুষ্ট করল, আমি তাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করলাম, অতঃপর তাদের সবাইকে ডুবিয়ে দিলাম। (সূরা আজ-জুখরুফ: ৫৫)

শিক্ষা: অন্যায়ের সাথে আপোষ করা বা জালেমকে সমর্থন দেওয়া কোনো ছোট অপরাধ নয়। নেতা ও তার অন্ধ অনুসারী—উভয়েই একই পরিণতির শিকার হয়।


কুরআনের দৃষ্টিতে: স্বৈরাচার ও জনতার সাইকোলজি:

ফেরআউন এবং তার জাতির সম্পর্ক নিয়ে কুরআনের আয়াতগুলো সমাজবিজ্ঞানের এক অনন্য পাঠ।

🔹 ধাপ ১: বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব:

ফেরআউন জনগণকে চিন্তাশক্তিহীন বা 'হালকা' (Istakhaffa) বানিয়ে ফেলেছিল। সে যা বোঝাত, জনগণ তাই বুঝত। (সূরা জুখরুফ: ৫৪)

🔹 ধাপ ২: অন্ধ সমর্থন:

জনগণ জানত নেতার কমান্ড ভুল, তবুও তারা সত্যের পক্ষে না দাঁড়িয়ে মিথ্যার অনুসরণ (ইত্তেবা) করল। (সূরা হুদ: ৯৭)

🔹 ধাপ ৩: সম্মিলিত ধ্বংস:

যেহেতু জনগণ অন্যায়ের মৌন সমর্থন ও সক্রিয় সহযোগিতা দিয়েছিল, তাই আল্লাহর প্রতিশোধ থেকে তারাও রেহাই পায়নি। আল্লাহ তাদের সবাইকে ডুবিয়ে দিলেন। (সূরা জুখরুফ: ৫৫)

শিক্ষা: পাপী নেতার আনুগত্য করাও পাপ। বিচারবুদ্ধি কাজে না লাগানো মুমিনের কাজ হতে পারে না।

অতপর সর্বনাশা পরিণতি: পরকালে নেতার সাথে জাহান্নামে গমন-

যেদিন আমরা প্রতিটি দলকে তাদের নেতা বা ইমামসহ ডাকব-আয়াত ১৭:৭১। 

দুনিয়ায় যারা ফেরআউনকে সমর্থন দিয়েছিল, পরকালেও তারা তার নেতৃত্বেই জাহান্নামে যাবে।

সূরা হুদ, আয়াত ৯৮:

কিয়ামতের দিন সে (ফেরআউন) তার জাতির অগ্রভাগে থাকবে এবং তাদেরকে নিয়ে জাহান্নামের আগুনের ঘাটে পৌঁছাবে। আর ওটা কতই না নিকৃষ্ট ঘাট, যেখানে তারা উপনীত হবে।

তাদাব্বুর/শিক্ষা: এটি সমর্থক বা জনতার জন্য সবচেয়ে ভয়ের আয়াত। দুনিয়ায় যাকে নেতা মেনে তার অন্যায় কাজে সমর্থন দেওয়া হবে, পরকালে সেই নেতার পেছনেই লাইন ধরে জাহান্নামে যেতে হবে। অন্ধ সমর্থনকারী হিসেবে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

সারসংক্ষেপ (তাদাব্বুরের জন্য):

কুরআন স্পষ্ট করছে যে, ফেরআউনের ক্ষমতা কেবল তার নিজের শক্তি ছিল না, বরং তার জাতির ‘বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্ব’ এবং ‘অন্ধ আনুগত্য’ তাকে ফেরআউন হতে সাহায্য করেছিল। আল্লাহ এই ঘটনাগুলো বর্ণনা করেছেন যাতে মুমিনরা বুঝতে পারে—অন্যায়কারী শাসকের সমর্থন করাও বড় অপরাধ এবং এর পরিণতি ভয়াবহ।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post