জনৈক মুমিনা নারীর অনুসন্ধিৎসু প্রশ্নের, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুসরণে আল-কুরআন ভিত্তিক উত্তর: 
১. সিয়াম ও সালাত পালনের বয়স: সংখ্যা নয়, যোগ্যতা (The age of competence)
কুরআনের পরিভাষায়, ইবাদতের জন্য যোগ্য হওয়ার বয়স হলো— ‘রুশদ’ (বিচারবুদ্ধি) এবং ‘বালাগ’ (সাবালকত্ব)-এর সমন্বিত পর্যায়।
ক. সালাতের বয়স: ‘সচেতন বাকশক্তি’র বয়স (The age of understanding speech)
সালাত বা নামাজ হলো আল্লাহর সাথে কথোপকথন। অবুঝ শিশু বা যার বোধশক্তি নেই, তার সালাত সালাত নয়।
➤ দলিল:
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা সালাতের নিকটবর্তী হয়ো না যখন তোমরা নেশাগ্রস্ত (বা আচ্ছন্ন) থাকো, যতক্ষণ না তোমরা বুঝতে পারো যা তোমরা বলছো (হাত্তা তা‘লামু মা-তাকুলুন)...” — (সূরা আন-নিসা ৪:৪৩)
লজিক্যাল বিশ্লেষণ:
➜ আল্লাহ শর্ত দিয়েছেন: “যতক্ষণ না তোমরা বুঝতে পারো যা তোমরা বলছো।”
➜ একজন শিশু বা অবুঝ বালক তোতাপাখির মতো আরবি আউড়ে যেতে পারে, কিন্তু সে ‘কি বলছে’ তা বোঝার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে (Intellectual Level) থাকে না।
➜ সিদ্ধান্ত: সালাতের বয়স বা সময় তখনই শুরু হয়, যখন একজন মানুষ (নারী/পুরুষ) সালাতে পঠিত আয়াত ও তাসবিহগুলোর অর্থ ও মর্মার্থ বোঝার মতো ‘জ্ঞান’ ও ‘ভাষা’ আয়ত্ত করে।
২. সিয়াম ও সালাত পালনের আবশ্যক শর্তসমূহ (Mandatory Pre-requisites)
আল-কুরআনের আলোকে যে কোনো ইবাদত (সিয়াম বা সালাত) কবুল হওয়ার জন্য বা ফরজ হওয়ার জন্য ৪টি মেটাফিজিক্যাল শর্ত (Metaphysical conditions) অবশ্যই পূরণ করতে হবে:
শর্ত-১: ‘কিতাব’ ও ‘ঈমান’ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন (Knowledge First):
না জেনে বা অন্ধ অনুকরণে সিয়াম-সালাত আদায় করলে তা কুরআনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
➤ দলিল:
“...তুমি জানতে না ‘কিতাব’ কী এবং ‘ঈমান’ কী; কিন্তু আমি একে করেছি আলো...” — (সূরা আশ-শুরা ৪২:৫২)
“অতএব, জেনে নাও (ফা‘লাম) যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই...” — (সূরা মুহাম্মদ ৪৭:১৯)
শর্ত-২: সচেতন ঈমান বা ‘চুক্তি’ (Conscious Contract):
ইবাদত হলো রবের সাথে বান্দার চুক্তি। চুক্তি করার জন্য ‘মুমিন’ হতে হয়।
➤ দলিল:
“হে ঈমানদারগণ! রুকু কর, সিজদা কর এবং তোমাদের রবের ইবাদত কর...” — (সূরা আল-হজ্জ ২২:৭৭)
(লক্ষ্য করুন: ইবাদতের আদেশ কেবল ঈমানদারদের দেওয়া হয়েছে। সুতরাং ঈমান ছাড়া সালাত-সিয়ামের আদেশ প্রযোজ্য নয়।)
শর্ত-৩: বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্কতা বা ‘রুশদ’ (Intellectual Maturity):
যিনি ভালো-মন্দ বিচার করতে পারেন না (যেমন: শিশু, পাগল বা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী), তার ওপর বিধান কার্যকর হয় না।
➤ দলিল:
“...অতঃপর যদি তোমরা তাদের মধ্যে ‘বিচারবুদ্ধি’ (রুশদ) দেখতে পাও...” — (সূরা আন-নিসা ৪:৬)
(সম্পদ পরিচালনার জন্য যদি রুশদ লাগে, তবে সালাত ও সিয়ামের মতো আধ্যাত্মিক সম্পদ পরিচালনার জন্য রুশদ বা আকল আরও বেশি জরুরি।)
➤ আয়াত: আর যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তুমি সেটার পিছু নিও না। নিশ্চয় কান ও চোখ ও অন্তর, সেগুলোর প্রত্যেকটি সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে-17:36
শর্ত-৪: পবিত্রতা বা ‘তাহারাত’ (Purity - for Salat)
সালাতের জন্য শারীরিক ও আত্মিক পবিত্রতা আবশ্যক।
➤ দলিল:
“হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা সালাতের জন্য দাঁড়াও, তখন তোমাদের মুখমন্ডল ও হাতগুলো ধৌত কর...” — (সূরা আল-মায়িদা ৫:৬)
সুতরাং, অবুঝ শিশুকে জোর করে সালাত বা সিয়ামে বাধ্য করা কুরআনের নীতি ‘লা ইকরাহা ফিদ-দ্বীন’ (দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই - ২:২৫৬)-এর পরিপন্থী। বরং তাকে আগে ‘কিতাব ও হিকমত’ শিক্ষা দিয়ে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে সে স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে রবের ইবাদতে দাঁড়াতে পারে।
░ ▓▒সিয়াম পালনের বয়স▒▓ ░
সিয়াম পালনের বয়স ও যোগ্যতা: আল-কুরআনের ‘নজম’ ও দলিলের আলোকে-
সিয়াম বা সাওম পালনের জন্য আল-কুরআনে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যাবাচক বয়স (যেমন: ১০, ১২, ১৫ বা ১৮ বছর) উল্লেখ করা হয়নি। বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা একটি সুনির্দিষ্ট ‘মানদণ্ড’ (Criteria) বা ‘আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা’ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সেই যোগ্যতাটি হলো— ‘সচেতন ঈমান’ বা ‘নাযিলকৃত আয়াত ভিত্তিক ঈমানের ঘোষণা’ এবং ‘শারীরিক ও মানসিক সাধ্য’ (Capacity)।
১. সিয়ামের সম্বোধন ও ‘কুতিবা’ (Kutiba)-এর গূঢ় রহস্য:
সিয়ামের বিধানটি সর্বজনীন বা সব মানুষের (ইয়া আইয়ুহাল্লাজিনা নাছ) জন্য ঢালাওভাবে দেওয়া হয়নি। এটি একটি ‘এক্সক্লুসিভ’ বা বিশেষায়িত নির্দেশ।
➤ আয়াত:
“হে ঈমানদারগণ (ইয়া আইয়ুহাল্লাজিনা আমানু)! তোমাদের ওপর সিয়াম লিখিত (কুতিবা) করা হয়েছে...” — (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৩)
তাদাব্বুর ও সূক্ষ্ম অনুধাবন (Deep Realization):
এখানে অত্যন্ত সূক্ষ্ম অনুধাবনের বিষয় যে, ঈমানদার হিসাবে—মানে একমাত্র নাযিলকৃত আয়াত ভিত্তিক ঈমান না আনলে—সে ১০/১২ বছরের শিশু-কিশোর, কিংবা ২০ বছরের যুবক বা ৫০ বছরের বয়সপ্রাপ্ত বৃদ্ধ নারী কিংবা পুরুষ হোক না কেন—কারও জন্যই সিয়ামকে লিখে দেয়ার কথা বলা হয় নাই (মানে কুতিবা করা হয় নাই)। অর্থাৎ, দৈহিক বয়স যাই হোক, ‘আয়াত ভিত্তিক ঈমান’ না থাকলে আল্লাহর খাতায় তার জন্য সিয়াম প্রযোজ্য নয়।
২. ‘ঈমান’ কখন অর্জিত হয়? (The age of reason & conscious contract):
ঈমান কোনো বংশগত পরিচয় নয়, বরং এটি একটি সচেতন চুক্তি (Conscious Contract)। এই চুক্তি করার বয়স বা মানসিক স্তর কোনটি?
➤ আয়াত (ঈমানের ঘোষণা ও সংজ্ঞা):
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ঈমান আনো আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসূলের প্রতি এবং সেই কিতাবের প্রতি...” — (সূরা আন-নিসা ৪:১৩৬)
“(বলুন!) আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং যা আমাদের প্রতি নাজিল হয়েছে এবং যা ইবরাহীম, ইসমাইল... এবং তাঁর বংশধরদের প্রতি নাজিল হয়েছিল... আমরা তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না...” — (সূরা আল-বাকারা ২:১৩৬ এবং সূরা আলে-ইমরান ৩:৮৪)
বিশ্লেষণ:
ঈমান আনার জন্য প্রয়োজন ‘আকল’ (বুদ্ধিমত্তা/বিবেক) এবং ‘ইখতিয়ার’ (স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি)। একজন শিশু বা অবুঝ বালকের পক্ষে ২:১৩৬ বা ৩:৮৪ আয়াতের ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক/ নাযিলকৃত বিধানের গভীরতা বুঝে আল্লাহর সাথে চুক্তি করা সম্ভব নয়।
সিদ্ধান্ত: যখনই কোনো মানুষ (নারী বা পুরুষ) স্বাধীনভাবে, সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় নিজেকে ‘মুমিন’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক ও শারীরিক পরিপক্কতা অর্জন করে, ঠিক তখন থেকেই তার ওপর সিয়াম ‘কুতেবা’ (লিখিত/ফরজ) হয় (প্রকৃত মুমিনের সংজ্ঞা দেখুন আয়াত ৮:২, ২৩:১-৯)।
৩. ‘সাধ্য’ ও ‘দায়বদ্ধতা’র কুরআনি নীতি (Capacity & accountability):
কুরআন মানুষের ওপর এমন কিছু চাপিয়ে দেয় না যা তার সাধ্যের বাইরে বা যা সে বোঝে না। এটি আল্লাহর ন্যায়বিচারের মূলনীতি।
➤ আয়াত: “আল্লাহ কোনো সত্তাকে তার সাধ্যের (Wus'aha) বাইরে কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না...” — (সূরা আল-বাকারা ২:২৮৬)
মেটাফিজিক্যাল কানেকশন (Metaphysical Connection):
☛ শারীরিক সাধ্য: শরীর উপবাস সহ্য করতে সক্ষম হতে হবে। শিশুর শরীর বাড়ন্ত; কঠোর উপবাস তার ক্ষতি করতে পারে। যা আল-কুরআনের ২:১৯৫ আয়াতের ‘নিজেকে ধ্বংসে নিপতিত করো না’ (Do not throw yourselves into destruction)—এই নীতির বিরোধী।
☛ মানসিক সাধ্য: সিয়ামের উদ্দেশ্য ‘তাকওয়া’ (২:১৮৩)। তাকওয়া হলো সচেতনতা। যার সচেতনতাই (Consciousness) তৈরি হয়নি, তার জন্য সিয়াম অর্থহীন উপবাস মাত্র।
৪. এতিমদের সম্পদ হস্তান্তরের ‘লিঙ্ক’ আয়াত (The Link of maturity via Rushd):
কুরআনে পরিপক্কতা বা ম্যাচিউরিটি বোঝাতে ‘রুশদ’ (বিচারবুদ্ধি/ Sound Judgment) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এটি সিয়ামের ক্ষেত্রেও একটি শক্তিশালী ‘ইমপ্লাইড এভিডেন্স’ (Implied Evidence)।
➤ আয়াত:
“আর তোমরা এতিমদের পরীক্ষা করতে থাক, যে পর্যন্ত না তারা বিয়ের বয়সে পৌঁছায়। অতঃপর যদি তোমরা তাদের মধ্যে ‘বিচারবুদ্ধি’ (রুশদ) দেখতে পাও, তবে তাদের সম্পদ তাদের হাতে অর্পণ কর...” — সূরা আন-নিসা ৪:৬ (আরও দ্র: আয়াত ২:১৮৬ শেষাংশ)
পাজল সলভিং (Puzzle Solving):
এখানে ‘বিয়ের বয়স’ এবং ‘বিচারবুদ্ধি’ (Rushd)-কে পরিপক্কতার মানদণ্ড ধরা হয়েছে। ঠিক এই ‘রুশদ’ বা ভালো-মন্দ বিচারের বয়সটিতেই একজন মানুষ ‘ঈমান’ ও ‘কুফরের’ পার্থক্য বুঝতে পারে। সম্পদ বা টাকা-পয়সা বুঝে নেওয়ার জন্য যদি ‘রুশদ’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্কতা প্রয়োজন হয়, তবে আল্লাহর সাথে ঈমানের চুক্তি এবং সিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত পালনের জন্য এই ‘রুশদ’ আরও বেশি প্রয়োজন। তখনই সে ২:১৮৩ এর “ইয়া আইয়ুহাল্লাজিনা আমানু”-এর অন্তর্ভুক্ত হয়।
৫. আনুগত্যের চূড়ান্ত ঘোষণা:
এই যোগ্যতা অর্জিত হলে মুমিন ঘোষণা দেয়:
“...আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম (সামি‘না ওয়া আত্বা‘না)...” — (সূরা আল-বাকারা ২:২৮৫)
কুরআনি দলিলের ভিত্তিতে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত হলো:
১. বয়সসীমা: সিয়ামের জন্য কুরআনে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার (Number) বয়সসীমা নেই।
২. মানদণ্ড: এর মানদণ্ড হলো ‘ঈমান’। যে বয়সে একজন মানুষ আয়াত ৪:১৩৬ ও ২:১৩৬ অনুযায়ী বুঝে-শুনে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার ঘোষণা দেয় এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে সেই ঈমানের দাবি (সিয়াম) পূরণে সক্ষম হয় (২:২৮৬), সেই বয়স থেকেই তার ওপর সিয়াম প্রযোজ্য।
৩. বাস্তবায়ন: এটি ব্যক্তি ও তার অভিভাবকের বিচারবুদ্ধির (রুশদ) ওপর নির্ভরশীল যে, কখন সে ‘মুমিন’ বা ‘সচেতন বিশ্বাসী’র কাতারে উন্নীত হলো।
বয়স/ম্যাচুরিটি প্রসঙ্গ ও সিয়াম পালন:
যেহেতু সিয়াম পালনের প্রসঙ্গে দাম্পত্যজীবন এসেছে (দ্র: আয়াত ২:১৮৭) তাই বয়স/ম্যাচুরিটি প্রসঙ্গ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক:
লজিক্যাল লিংক আয়াত: ৪:৫-৬, ৪:২১
ক. ‘বালাগুন-নিকাহ’ (শারীরিক যোগ্যতা): খ. ‘রুশদ’ (মানসিক যোগ্যতা/Intellectual Maturity): (৪:৫-৬)
গ. সম্পদ বনাম সংসার: বিয়ের ‘চুক্তি’ ও রুশদ-এর সম্পর্ক (The covenant Link): আল-কুরআনে বিয়েকে ছেলেখেলা নয়, বরং একটি ‘মিছাকান গালিজা’ (সুদৃঢ় ও গুরুগম্ভীর চুক্তি) বলা হয়েছে। (৪:২১)
সবার আগে ‘কিতাব’ ও ‘ঈমান’ জানতে হবে: আল-কুরআনের অকাট্য দলিল:
না জেনে বা না বুঝে অন্ধের মতো আমল করার নাম ইসলাম নয়। বরং জ্ঞানের ভিত্তিতে ঈমান আনাই হলো আমল কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত।
আল-কুরআনের ‘নজম’ (বিন্যাস) এবং ‘লজিক্যাল ফ্লো’ (Logical flow) অনুযায়ী, আমল (যেমন: সিয়াম, সালাত, বিয়ে) করার আগে ‘কিতাব’ (জ্ঞান) এবং ‘ঈমান’ (বিশ্বাস) জানা ও অর্জন করা যে অপরিহার্য এবং সবার আগের শর্ত—তা প্রমাণের জন্য কুরআনের কিছু অকাট্য ও অত্যন্ত শক্তিশালী আয়াত
১. আল্লাহর রাসুলের প্রতি ওহীর প্যাটার্ন: কিতাব ও ঈমান ছিল অজানা (The Pre-requisite):
স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সালামুন আলা মুহাম্মদ)-এর জীবনেও নবুয়তের আগে ‘কিতাব’ ও ‘ঈমান’-এর বিস্তারিত জ্ঞান ছিল না। আল্লাহ তাঁকে ওহীর মাধ্যমে আগে এগুলো শিক্ষা দিয়েছেন। এটি প্রমাণ করে, কিতাব ও ঈমান ‘জন্মগত’ নয়, বরং ‘অর্জনযোগ্য’ জ্ঞান।
➤ সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল (The ultimate proof):
“আর এভাবেই আমি তোমার প্রতি ওহী করেছি আমার নির্দেশ থেকে একটি ‘রুহ’ (কুরআন)। তুমি জানতে না ‘কিতাব’ কী এবং ‘ঈমান’ কী (মা কুনতা তাদরি মাল-কিতাবু ওয়া লাল-ঈমান); কিন্তু আমি একে (কুরআনকে) করেছি আলো, যা দিয়ে আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করি...” -সূরা আশ-শুরা ৪২:৫২
তাদাব্বুর (Deep reflection):
➜ যদি স্বয়ং নবীর ক্ষেত্রেও আগে ‘কিতাব’ ও ‘ঈমান’ জানার বিষয়টি অপরিহার্য হয়ে থাকে (ওহী আসার আগে তিনি তা জানতেন না), তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য আমল (রোজা/নামাজ) শুরু করার আগে কিতাব ও ঈমান জানা কতটা জরুরি?
➜ সিদ্ধান্ত: আগে কিতাব ও ঈমান জানতে হবে, এরপর আমল।
২. আমলের আগে জ্ঞানের নির্দেশ (Knowledge before action):
আল্লাহ কুরআনে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন যে, আগে জানতে হবে (Knowledge), তারপর স্বীকৃতি দিতে হবে।
➤ আয়াত: আর যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তুমি সেটার পিছু নিও না। নিশ্চয় কান ও চোখ ও অন্তর, সেগুলোর প্রত্যেকটি সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে-17:36
➤ আয়াত: “অতএব, জেনে নাও (ফা‘লাম/Know) যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই এবং ক্ষমা চাও তোমার ত্রুটির জন্য...” — (সূরা মুহাম্মদ ৪৭:১৯)
লজিক্যাল বিশ্লেষণ:
এখানে আল্লাহ বলেননি “বলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”। বরং বলেছেন “ফা‘লাম” (জেনে নাও/জ্ঞান অর্জন করো)।
➜ লজিক: না জেনে কালিমা পড়লে তা নিছক ‘শব্দ উচ্চারণ’ হয়, ঈমান হয় না। তাই তাওহীদের সাক্ষ্য দেওয়ার আগেও ‘জ্ঞান’ (Know) অর্জন করা ফরজ।
৩. মরুবাসী আরবদের দাবি নাকচ: ঈমান মুখের বুলি নয় (Faith vs. Rituals):
কিছু মরুবাসী আরব দাবি করেছিল তারা ঈমান এনেছে। কিন্তু আল্লাহ তাদের দাবি নাকচ করে দিয়ে বললেন, তোমরা কেবল ‘আনুষ্ঠানিকতা’ (ইসলাম) পালন করছ, কিন্তু ‘ঈমান’ (বিশ্বাস) এখনো তোমাদের অন্তরে ঢোকেনি।
➤ আয়াত: “মরুবাসী আরবরা বলল: ‘আমরা ঈমান আনলাম’। (হে নবী) আপনি বলুন: ‘তোমরা ঈমান আনোনি’, বরং বলো: ‘আমরা আত্মসমর্পণ (ইসলাম গ্রহণ) করেছি’, কারণ ঈমান এখনো তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি...” — (সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১৪)
মেটাফিজিক্যাল কানেকশন:
এই আয়াত প্রমাণ করে, কেবল বাহ্যিক আমল (নামাজ/রোজা) বা মৌখিক দাবির নাম ঈমান নয়। ঈমান হলো ‘কিতাব’ ও ‘রাসূলের’ নির্দেশ অন্তরে ধারণ করা। যতক্ষণ না কিতাবের জ্ঞান অন্তরে প্রবেশ করছে, ততক্ষণ ঈমান অর্জিত হয় না।
৪. নিরক্ষরদের ‘কিতাব’ ও ‘হিকমত’ শিক্ষা দেওয়া (Education first):
রাসূল পাঠানোর মূল উদ্দেশ্যই ছিল মানুষকে আগে কিতাব (Knowledge of the Book) শিক্ষা দেওয়া, তারপর তাদের পরিশুদ্ধ (Purification/Amal) করা।
➤ আয়াত: “তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন, যিনি তাদের কাছে তাঁর আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করেন, তাদের পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদের শিক্ষা দেন ‘কিতাব’ ও ‘হিকমত’ (প্রজ্ঞা)...” — (সূরা আল-জুমু‘আ ৬২:২)
5. এই কুরআন একমাত্র রবের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত -একথাটি বুঝতে জ্ঞান দরকার হয়, প্রমাণ আয়াত:
আর যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে তারা দেখে, তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি যা নাযিল হয়েছে সেটা সত্য। আর সেটা পরাক্রমশালীর, প্রশংসিতের পথের দিকে পরিচালিত করে-আয়াত ৩৪:৬
ক্রমধারা (Sequence):
১. আয়াত তেলাওয়াত (তথ্য গ্রহণ)।
২. কিতাব ও হিকমত শিক্ষা (জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অর্জন)।
৩. তাজকিয়া বা আত্মশুদ্ধি (আমল ও চরিত্র গঠন)।
6. অন্ধ অনুসরণ বনাম জ্ঞানলব্ধ ঈমান (Blind following vs. reasoned Faith):
না জেনে বাপ-দাদার ধর্মের অনুসরণ বা অন্ধ বিশ্বাসকে কুরআন কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
➤ আয়াত: “আর যখন তাদেরকে বলা হলো, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা অনুসরণ করো, তারা বলল, আমরা বরং সেটার অনুসরণ করি যার ওপর আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের পেয়েছি। যদি এমন হয়, তাদের পূর্বপুরুষরা কিছুই বুঝত না এবং তারা সঠিকপথে চলত না, তবুও কি!?” — আয়াত ২:১৭০ (৫:১০৪)
সিদ্ধান্ত (Logical conclusion):
আল-কুরআনের উপরোক্ত আয়াতসমূহের (৪২:৫২, ৪৭:১৯, ৪৯:১৪, ৬২:২) ভিত্তিতে অকাট্য সিদ্ধান্ত হলো:
১. সর্বপ্রথম ধাপ: ‘কিতাব’ (কুরআন) এবং ‘ঈমান’-এর জ্ঞান অর্জন করা। (রেফারেন্স: ৪২:৫২)
২. দ্বিতীয় ধাপ: সেই জ্ঞানের ভিত্তিতে সচেতনভাবে আল্লাহর একত্ববাদ ও বিধানকে সত্য বলে জানা ও মানা। (রেফারেন্স: ৪৭:১৯)
৩. তৃতীয় ধাপ: এরপর সেই ঈমানের দাবিতে আমল (যেমন: সিয়াম, সালাত, বিয়ে ইত্যাদি) সম্পাদন করা।
সুতরাং, সবার আগে কিতাব ও ঈমান জানতে হবে। যার কিতাব ও ঈমানের জ্ঞান নেই, তার আমল বা সিয়াম নিছক উপবাস বা প্রথা ছাড়া আর কিছুই নয়।
অতএব, সিয়াম পালনের বয়স হলো— ‘ঈমান ও দৈহিক সক্ষমতার সমন্বিত বয়স’।