◈ কিভাবে অন্যের প্রতি এহসান করতে পারি? (কুরআনিক গাইডলাইন):
◈ এহসানের প্রতিদান (Reward):
◈ আল-কুরআনের আলোকে ‘এহসান’ করতে না পারার অনুশোচনা এবং এর ক্ষতিপূরণের পদ্ধতি কী?
◈ এহসান অর্জনের জন্য প্রাসঙ্গিক কুরআনি দুআ-তাসবিহ:
এহসান (إِحْسَان) কী এবং কাকে বলে?
আরবি ‘হুনস’ (ح-س-ن) মূলধাতু থেকে ‘এহসান’ শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ হলো—সৌন্দর্য, কল্যাণ, শ্রেষ্ঠত্ব এবং কোনো কাজকে নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা। আল-কুরআনের পরিভাষায়, অন্যের প্রাপ্য অধিকারের চেয়ে স্বেচ্ছায় ও ভালোবেসে বেশি কিছু দেওয়া এবং নিজের অধিকারের চেয়ে কম গ্রহণ করার মানসিকতাই হলো ‘এহসান’। যিনি এই গুণের অধিকারী, কুরআনের ভাষায় তিনিই হলেন ‘মুহসিন’ (محسن)।
➢ মেটাফিজিক্যাল কনট্রাস্ট (বিপরীতমুখী তুলনা):
কুরআন অত্যন্ত সূক্ষ্ম লজিক্যাল মেথডে ‘এহসান’-এর সংজ্ঞা দিয়েছে এর ঠিক বিপরীত শব্দ বা ‘এন্টোনিম’ ব্যবহার করে।
সূরা আন-নাহলের ৯০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ‘আদল’ (ন্যায়বিচার) ও ‘এহসান’ (সদ্ব্যবহার)-এর বিপরীতে তিনটি নেতিবাচক শব্দ দাঁড় করিয়েছেন:
▪ "নিশ্চয়ই আল্লাহ নির্দেশ দেন ইনসাফ (عدل), এহসান (إحسان) এবং আত্মীয়-স্বজনকে দানের; আর তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা (فحشاء - ফাহশা), অসৎকাজ (منكر - মুনকার) এবং সীমালঙ্ঘন/অবাধ্যতা (بغي - বাগি) থেকে..." (সূরা আন-নাহল ১৬:৯০)।
তাদাব্বুর ফিল কুরআন (গভীর অনুধাবন):
এখানে ‘আদল’ (ন্যায়বিচার) হলো বেসলাইন বা ভিত্তি—অর্থাৎ, কেউ আপনার সাথে যেমন আচরণ করবে, আপনি ঠিক ততটুকুই করবেন; মন্দের বদলায় সমান মন্দ, ভালোর বদলায় সমান ভালো। কিন্তু ‘এহসান’ হলো এর চেয়েও উন্নত স্তর—কেউ আপনার সাথে মন্দ করলেও আপনি তার সাথে ভালো আচরণ করবেন। এর ঠিক বিপরীতে রয়েছে ‘ফাহশা’, ‘মুনকার’ ও ‘বাগি’—যা হলো অন্যের অধিকার হরণ করা বা প্রাপ্যের চেয়ে কম দেওয়া।
আল-কুরআনের আলোকে ‘মুহসিন’ (Muhsin) কারা?
কুরআনের ‘শব্দগত সামঞ্জস্যতা’ (Symmetry) অনুযায়ী সূরা আলে-ইমরানে আল্লাহ ‘মুহসিন’-এর প্র্যাকটিক্যাল বা ব্যবহারিক সংজ্ঞা দিয়েছেন।
▪ "যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে, যারা রাগ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়। আর আল্লাহ মুহসিনদের (সৎকর্মশীলদের) ভালোবাসেন।" (সূরা আলে-ইমরান ৩:১৩৪)।
ইমপ্লাইড এভিডেন্স (Implied Evidence):
এই আয়াতে মুহসিনের তিনটি শর্ত দেওয়া হয়েছে:
১. পকেটে টাকা থাকুক বা না থাকুক, অন্যের কল্যাণে ব্যয় করা।
২. নিজের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ‘রাগ’ (গাইজ) গিলে ফেলা।
৩. কেবল রাগ সংবরণই নয়, বরং অপরাধীকে ‘ক্ষমা’ (আফউ) করে দেওয়া। রাগ সংবরণ করা হলো ‘আদল’, আর ক্ষমা করে দেওয়া হলো ‘এহসান’।
কিভাবে অন্যের প্রতি এহসান করতে পারি? (কুরআনিক গাইডলাইন):
কুরআনের ‘তাফসির বিল কুরআন’ মেথডলজিতে অন্যের প্রতি এহসান করার নির্দিষ্ট কয়েকটি স্তর বা ক্যাটাগরি রয়েছে:
১. পিতা-মাতা ও আত্মীয়দের প্রতি এহসান:
কুরআন পিতা-মাতার ক্ষেত্রে ‘আদল’ বা ন্যায়বিচারের কথা বলেনি, সরাসরি ‘এহসান’ করার নির্দেশ দিয়েছে।
▪ "তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার প্রতি এহসান (সদ্ব্যবহার) করো..." (সূরা আল-ইসরা ১৭:২৩)।
২. সমাজের অন্যান্যদের প্রতি এহসান:
সূরা আন-নিসায় আল্লাহ এহসানের একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক নেটওয়ার্ক তৈরি করে দিয়েছেন।
▪ "...পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতীম, অভাবগ্রস্ত, নিকট-প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি এহসান করো..." (সূরা আন-নিসা ৪:৩৬)।
৩. শত্রুর প্রতি এহসান:
সবচেয়ে কঠিন এহসান হলো শত্রুর সাথে সদ্ব্যবহার করা। কুরআন মানবীয় সাইকোলজির এই সূক্ষ্ম স্তরটি সূরা ফুসসিলাতে বর্ণনা করেছে:
▪ "ভালো (হাসানাহ) এবং মন্দ (সায়্যিআহ) সমান হতে পারে না। মন্দকে প্রতিহত করো তা দিয়ে যা সর্বোৎকৃষ্ট (আহসান/এহসান); ফলে তোমার ও যার মাঝে শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।" (সূরা ফুসসিলাত ৪১:৩৪)।
যৌক্তিক পূর্ণতা: এখানে ‘হাসানাহ’ (ভালো)-এর বিপরীতে ‘সায়্যিআহ’ (মন্দ) ব্যবহার করে আল্লাহ বুঝিয়েছেন যে, মন্দের জবাব মন্দ দিয়ে দিলে চক্র চলতেই থাকবে। কিন্তু মন্দের জবাব ‘এহসান’ দিয়ে দিলে শত্রুর মনস্তাত্ত্বিক পরাজয় ঘটবে এবং সে বন্ধুতে পরিণত হবে।
সালামুন আলা ইউসুফ—তাঁর ভাইদের দ্বারা চরমভাবে নির্যাতিত ও কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পরও, যখন তিনি মিসরের ক্ষমতার শীর্ষে, তখন প্রতিশোধ না নিয়ে ভাইদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। কুরআন একেই এহসান বলেছে: "...নিশ্চয়ই যে তাকওয়া অবলম্বন করে এবং সবর করে, আল্লাহ তো মুহসিনদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।" (সূরা ইউসুফ ১২:৯০)।
এহসানের প্রতিদান:
কুরআন অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি গ্রন্থ। এহসানের বদলা কী হবে, তা আল্লাহ সূরা আর-রহমানে একটি রেটোরিক্যাল প্রশ্নের মাধ্যমে দিয়েছেন:
▪ "এহসানের প্রতিদান কি এহসান ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে?" (সূরা আর-রহমান ৫৫:৬০)। (هَلْ جَزَاءُ الْإِحْسَانِ إِلَّا الْإِحْسَانُ)
এর সমজাতীয় দলিল পাওয়া যায় সূরা ইউনুসে, যেখানে আল্লাহ মুহসিনদের জন্য জান্নাতের পাশাপাশি একটি ‘বোনাস’ বা ‘জিয়াদাহ’ দেওয়ার কথা বলেছেন:
▪ "যারা এহসান করে তাদের জন্য রয়েছে সর্বোত্তম প্রতিদান (জান্নাত) এবং আরও অতিরিক্ত (জিয়াদাহ/আল্লাহর দিদার)..." (সূরা ইউনুস ১০:২৬)।
চরম আবেগের সংকটে এহসান: বিচ্ছেদ বা তালাকের ক্ষেত্রে (emotional Test of Ihsan):
মানুষ সাধারণত সুসময়ে বা স্বাভাবিক অবস্থায় অন্যের প্রতি এহসান করে। কিন্তু যখন কোনো সম্পর্ক ভেঙে যায়, তখন মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রতিশোধপরায়ণ বা জালিম হয়ে ওঠে। কুরআন ‘এহসান’-এর সবচেয়ে কঠিন ও মেটাফিজিক্যাল পরীক্ষাটি রেখেছে বিবাহ বিচ্ছেদের সময়।
▪ "তালাক হলো দু’বার; এরপর হয় বিধি মোতাবেক (মারুফ) ভালোভাবে রেখে দেবে, নয়তো সদ্ব্যবহারের সাথে (এহসানের সাথে) মুক্ত করে দেবে (তাসহিরুম বি-ইহসান)..." (সূরা আল-বাকারাহ ২:২২৯)।
➢ ইমপ্লাইড এভিডেন্স:
কুরআনের সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক বিন্যাস লক্ষ্য করুন। আল্লাহ বলছেন, স্বামী-স্ত্রী হিসেবে থাকতে না পারলে যখন আলাদা হয়ে যাবে, তখনো যেন একে অপরের প্রতি ‘এহসান’ বজায় থাকে (অর্থাৎ, প্রাপ্য মোহরানা তো বটেই, প্রয়োজনে তার চেয়েও বেশি কিছু দিয়ে হাসিমুখে বিদায় করা, একে অপরের দুর্নাম না করা)। শত্রুতা বা তিক্ততার চরম মুহূর্তেও এহসান বজায় রাখা হলো ‘মুহসিন’-এর চূড়ান্ত চারিত্রিক সনদ।
২. সৃষ্টির মেটাফিজিক্স (Cosmology) এবং আল্লাহর এহসান (The divine source of Ihsan):
আমরা কেন অন্যের প্রতি এহসান করব? এর সবচেয়ে যৌক্তিক ও শক্তিশালী দলিল আল্লাহ দিয়েছেন সূরা আল-কাসাস-এ। আমরা এহসান করি কারণ আমাদের স্রষ্টা স্বয়ং আমাদের প্রতি এহসান করেছেন।
▪ "...আর তুমি এহসান করো, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি এহসান করেছেন এবং পৃথিবীতে ফাসাদ (বিপর্যয়) সৃষ্টি করতে চেয়ো না..." (সূরা আল-কাসাস ২৮:৭৭)।
➢সমজাতীয় দলিল:
আল্লাহ কীভাবে এহসান করেছেন? সূরা আস-সাজদাহ-তে আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির নিখুঁত সৌন্দর্যকে ‘এহসান’ শব্দ দিয়ে বুঝিয়েছেন:
▪ "যিনি তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিকে নিখুঁত ও সুন্দর (আহসানা/এহসান) করেছেন..." (সূরা আস-সাজদাহ ৩২:৭)।
তাদাব্বুর: যেহেতু আল্লাহর সৃষ্টিতে এহসান রয়েছে, তাই সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষের প্রতিটি কাজে, কথায় ও আচরণেও এহসান প্রতিফলিত হওয়া মহাজাগতিক সামঞ্জস্যতার (Cosmic Symmetry) অংশ।
বাক্যে বা কথায় এহসান:
এহসান শুধু সম্পদ দেওয়া বা কাজ করে দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কুরআনের ‘নজম’ অনুযায়ী মানুষের মুখের কথাও এহসানের অন্তর্ভুক্ত।
▪ "...এবং মানুষের সাথে উত্তম (হুলন/এহসান) কথা বলবে..." (সূরা আল-বাকারাহ ২:৮৩)।
এখানে আল্লাহ শুধু ‘মুমিনদের সাথে’ বলেননি, বলেছেন ‘লিন্নাস’ (সমস্ত মানুষের সাথে)। ধর্ম, বর্ণ, জাত নির্বিশেষে সবার সাথে সুন্দর ও সম্মানজনক কথা বলাও এহসানের একটি স্বাধীন ক্যাটাগরি।
ইবাদতের চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক স্তর এবং আল্লাহর নৈকট্য (The spiritual summit of Ihsan):
এহসানের আধ্যাত্মিক বা মেটাফিজিক্যাল রূপ হলো—এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত বা দাসত্ব করা যেন বান্দা আল্লাহকে দেখছে, আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে এটা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা যে আল্লাহ তাকে দেখছেন। কুরআনে এর সবচেয়ে জোরালো দলিলটি রয়েছে সূরা আল-আনকাবুত-এর শেষ আয়াতে।
▪ "আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা (জিহাদ) চালায়, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথসমূহ দেখিয়ে দেব। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহসিনদের (এহসানকারীদের) সাথেই আছেন।" (সূরা আল-আনকাবুত ২৯:৬৯)।
➢ মেটাফিজিক্যাল কনট্রাস্ট (বিপরীতমুখী তুলনা):
যারা নফসের তাড়নায় গা ভাসিয়ে দেয়, তারা আল্লাহর পথ থেকে ছিটকে পড়ে (অন্ধকার)। এর বিপরীতে যারা নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, আল্লাহ তাদেরকে শুধু পথই দেখান না (আলো), বরং তাদের সঙ্গী হয়ে যান (মায়িয়্যাহ বা আল্লাহর সাথী হওয়া)। কুরআনের ভাষায় মুহসিনরাই আল্লাহর এই বিশেষ নৈকট্য লাভ করে। সূরা আল-আরাফে আল্লাহ আরও সুনির্দিষ্ট করে বলেছেন:
▪ "...নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত মুহসিনদের (সৎকর্মশীলদের) অত্যন্ত নিকটবর্তী।" (সূরা আল-আরাফ ৭:৫৬)।
আলহামদুলিল্লাহ! ‘আমরা ‘এহসান’ বিষয়টির আদ্যোপান্ত অত্যন্ত শক্ত ও শক্তিশালী দলিলের মাধ্যমে অনুসন্ধান করেছি। আমরা দেখেছি এহসান হলো:
▪ পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে: অধিকারের চেয়ে বেশি দেওয়া (সূরা আন-নিসা ৪:৩৬)।
▪ সংকটে ও বিচ্ছেদে: তিক্ততার মুহূর্তেও সম্মান বজায় রাখা (সূরা আল-বাকারাহ ২:২২৯)।
▪ শত্রু মোকাবেলায়: মন্দের জবাবে সবচেয়ে সুন্দর আচরণ করা (সূরা ফুসসিলাত ৪১:৩৪)।
▪ কথাবার্তায়: সকল মানুষের সাথে সুন্দর ভাষায় কথা বলা (সূরা আল-বাকারাহ ২:৮৩)।
▪ আধ্যাত্মিকতায়: অনুশোচনা করে তওবা করা এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা (সূরা হুদ ১১:১১৪ এবং সূরা আল-আনকাবুত ২৯:৬৯)।
░ ▓▒░ক্ষতিপূরণ░▒▓ ░
আল-কুরআনের আলোকে ‘এহসান’ করতে না পারার অনুশোচনা এবং এর ক্ষতিপূরণের পদ্ধতি কী?
কারও প্রতি ‘এহসান’ (Ihsan) বা সদ্ব্যবহার করতে না পারার কারণে যদি আপনার মনে অনুশোচনা বা অপরাধবোধ জাগ্রত হয়, তবে আল-কুরআনের মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক লক্ষণ। কুরআনের ভাষায় একে বলা হয় ‘নাফসে লাওয়ামাহ’ (النَّفْسِ اللَّوَّامَةِ) বা ‘তিরস্কারকারী সত্তা’ (সূরা আল-কিয়ামাহ ৭৫:২)। এই অনুশোচনা প্রমাণ করে যে, আপনার অন্তর মরে যায়নি এবং আপনি পুনরায় ‘মুহসিন’ স্তরে ফিরে যাওয়ার যোগ্যতা রাখেন।
ক্ষতিপূরণের কুরআনিক মেকানিজম:
কুরআনের অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি ‘লজিক্যাল’ মেথড হলো—অতীতের কোনো ভালো কাজ (হাসানাহ/এহসান) করতে না পারা বা মন্দ কাজ (সায়্যিআহ) করে ফেলার ক্ষতিপূরণ হিসেবে আল্লাহ ‘রিপ্লেসমেন্ট থিওরি’ বা ‘প্রতিস্থাপন নীতি’ দিয়েছেন।
১. ভালো কাজ দিয়ে মন্দকে মুছে ফেলা (The rule of erasing):
আপনি যদি কারও প্রতি এহসান করতে ব্যর্থ হন, তবে কুরআন আপনাকে শেখাচ্ছে এর ক্ষতিপূরণ কীভাবে করতে হবে। সূরা হুদে আল্লাহ অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন:
"নিশ্চয়ই সৎকর্মসমূহ (হাসানাত) পাপকাজগুলোকে (সায়্যিআত) দূর করে দেয়। এটি উপদেশ গ্রহণকারীদের জন্য এক স্মরণিকা।" (সূরা হুদ ১১:১১৪)।
অনুধাবন: এখানে ‘হাসানাত’ হলো এহসানের বহুবচন রূপ। আপনি অতীতে যে ব্যক্তির প্রতি এহসান করতে পারেননি বা অবিচার করেছেন, এখন তার প্রতি (বা সে জীবিত না থাকলে অন্যের প্রতি) প্রচুর পরিমাণ ‘হাসানাহ’ বা ভালো কাজ করুন। এই নতুন এহসান আপনার অতীতের ঘাটতিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে দেবে।
২. মন্দকে ভালোতে রূপান্তরিত করা:
এর চেয়েও শক্তিশালী এবং সমজাতীয় একটি দলিল রয়েছে সূরা আল-ফুরকানে। অনুশোচনা করে ফিরে এলে আল্লাহ কেবল অপরাধই মোছেন না, বরং অতীতের শূন্যস্থানগুলোকে নেকিতে পরিণত করেন:
"তবে যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পুণ্য (হাসানাত) দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আল-ফুরকান ২৫:৭০)।
ইমপ্লাইড এভিডেন্স: আপনি কারও প্রতি এহসান করতে পারেননি—এই অনুশোচনা থেকে যখন আপনি তওবা করবেন এবং পরবর্তীতে সৎকাজে আত্মনিয়োগ করবেন, তখন আপনার ওই অনুশোচনা ও পরবর্তী কাজগুলোকে আল্লাহ আপনার আমলনামায় ‘এহসান’ হিসেবেই লিখে দেবেন (যৌক্তিক ক্ষতিপূরণ)।
বাস্তব জীবনে কীভাবে এই ক্ষতিপূরণ করবেন?
কুরআন শুধু আধ্যাত্মিক সান্ত্বনা দেয় না, বরং বাস্তব সমাধানও দেয়। যার প্রতি এহসান করতে পারেননি, তার ক্ষেত্রে কুরআনের গাইডলাইন হলো:
ক) ওই ব্যক্তি যদি জীবিত এবং আপনার নাগালে থাকেন:
সূরা আন-নূরের ২২ নং আয়াতে আল্লাহ মুমিনদেরকে সরাসরি ক্ষমা করা ও ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে বলেছেন।
"...তারা যেন ক্ষমা করে এবং উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করেন? আর আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আন-নূর ২৪:২২)।
করণীয়: আপনি সরাসরি সেই ব্যক্তির কাছে যান, নিজের ঘাটতির কথা স্বীকার করুন এবং এখন থেকে তার প্রতি প্রাপ্যের চেয়ে বেশি ভালো আচরণ (এহসান) শুরু করুন।
খ) ওই ব্যক্তি যদি ইন্তেকাল করে থাকেন বা নাগালের বাইরে থাকেন:
আপনি যদি পিতা-মাতা বা এমন কারও প্রতি এহসান করতে না পেরে থাকেন যিনি এখন পৃথিবীতে নেই, তবে তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং তার পক্ষ থেকে মানুষের কল্যাণ করাটাই হবে ক্ষতিপূরণ। (পূর্ববর্তী মন্তব্যে উল্লেখিত সূরা আল-ইসরা ১৭:২৪ এবং সূরা আল-হাশর ৫৯:১০ এর দুআ দুটি এখানে সবচেয়ে বেশি কার্যকর)।
অনুশোচনা ও হতাশা থেকে মুক্তির শক্তিশালী দলিল:
শয়তানের একটি মেটাফিজিক্যাল ধোঁকা হলো—মানুষকে এটা বোঝানো যে, "তুমি তো অমুকের প্রতি এহসান করতে পারোনি, তোমার আর কোনো উপায় নেই!" কুরআন এই ‘হতাশা’ (Qunut)-কে সরাসরি কুফরির সাথে তুলনা করেছে এবং এর বিপরীতে আল্লাহর রহমতের আশা (Raja)-কে দাঁড় করিয়েছে।
যারা অতীতের ভুলের কারণে চরম অনুশোচনায় ভুগছেন, তাদের জন্য কুরআনের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক (most hopeful) আয়াত হলো সূরা আয-যুমার:
বলুন! হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর অবিচার (যুলুম/এহসানের বিপরীত) করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে তোমরা নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" (সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩)।
যৌক্তিক পূর্ণতা: এই আয়াত প্রমাণ করে যে, এহসান করতে না পারার ঘাটতি যদি পাহাড় সমতুল্যও হয়, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও অসীম। অনুশোচনাই হলো এহসানে ফেরার প্রথম ধাপ।
এহসান, অনুশোচনা এবং ক্ষতিপূরণের আলোচনাটি এখানেই একটি ‘লজিক্যাল সার্কেল’ বা যৌক্তিক পূর্ণতা লাভ করে।
১. প্রথম ধাপ: এহসান করতে না পারার কারণে অন্তরে অনুশোচনা (নাফসে লাওয়ামাহ) তৈরি হওয়া।
২. দ্বিতীয় ধাপ: হতাশাগ্রস্ত না হয়ে আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা করা (সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩)।
৩. তৃতীয় ধাপ: অতীত ভুল স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৮৭)।
৪. চতুর্থ ধাপ (চূড়ান্ত পরিণতি): অতীতের মন্দের বিপরীতে এখন প্রচুর ভালো কাজ (হাসানাত) করা। ফলে আল্লাহ অতীতের ঘাটতিগুলোকেও ভালো কাজ দিয়ে প্রতিস্থাপন করে দেবেন (সূরা হুদ ১১:১১৪ এবং সূরা আল-ফুরকান ২৫:৭০)।
░ ▓▒░দুআ-তাসবিহ░▒▓ ░
এহসান অর্জনের জন্য প্রাসঙ্গিক কুরআনি দুআ-তাসবিহ:
এহসানের স্তর অর্জন করতে হলে অন্তর থেকে হিংসা ও বিদ্বেষ দূর করতে হয় এবং পিতা-মাতার প্রতি এহসানের মানসিকতা রাখতে হয়। নিচে সংশ্লিষ্ট দুটি দুআ দেওয়া হলো:
➢ পিতা-মাতার প্রতি এহসানের দুআ (সূরা আল-ইসরা ১৭:২৪):
(উক্ত আয়াতেই আল্লাহ পিতা-মাতার প্রতি এহসানস্বরূপ এই দুআটি শিখিয়েছেন)
رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
রাব্বির হামহুমা- কামা- রাব্বাইয়া-নী সাগী-রা।
অর্থ: "হে আমার রব! তাদের উভয়ের প্রতি রহম করুন, যেমন শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন।"➢ অন্তর থেকে বিদ্বেষ দূর করে মুহসিন হওয়ার দুআ (সূরা আল-হাশর ৫৯:১০):
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
রাব্বানাগফির লানা- ওয়ালি ইখওয়া-নিনাল্লাযীনা সাবাকূনা বিল ঈমা-নি ওয়ালা- তাজ‘আল ফী কুলূবিনা- গিল্লাল লিল্লাযীনা আ-মানূ রাব্বানা- ইন্নাকা রাউ-ফুর রাহী-ম।
অর্থ: "হে আমাদের রব! আমাদেরকে এবং ঈমানের সাথে যারা আমাদের আগে অতীত হয়েছে তাদেরকে ক্ষমা করুন। আর মুমিনদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ (গিল) রাখবেন না। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আপনি অতি দয়ালু, পরম করুণাময়।"
এহসানের স্তরে পৌঁছানোর ও আল্লাহর রহমত লাভের বিশেষ কুরআনি দুআ:
যেহেতু এহসানের পথ অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং শয়তানের প্ররোচনা থেকে মুক্ত থেকে এই স্তরে পৌঁছাতে আল্লাহর বিশেষ প্রজ্ঞা ও রহমত প্রয়োজন, তাই কুরআনে বর্ণিত সালামুন আলা ইব্রাহিম-এর এই চমৎকার দুআটি আমাদের নিয়মিত পাঠ করা উচিত, যা আমাদের মুহসিনদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত করবে:
➢ প্রজ্ঞা লাভ ও সৎকর্মশীলদের (মুহসিনদের) অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দুআ (সূরা আশ-শুআরা ২৬:৮৩):
رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ
রাব্বি হাব লী হুকমাও ওয়া আলহিকনী বিস সওয়া-লিহীন।অর্থ: "হে আমার রব! আমাকে প্রজ্ঞা (হিকমাহ) দান করুন এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের (যাদের আচরণে এহসান রয়েছে তাদের) সাথে যুক্ত করুন।"
➢ দুনিয়া ও আখিরাতে হাসানাহ (কল্যাণ/এহসান) লাভের সর্বশ্রেষ্ঠ দুআ (সূরা আল-বাকারাহ ২:২০১):
(এহসানের মূল ধাতু হ-স-ন থেকে হাসানাহ শব্দটি এসেছে, এই দুআটি সমগ্র জীবনের প্রতিটি স্তরে এহসানের পূর্ণতা দেয়)
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
রাব্বানা- আ-তিনা- ফিদ্দুনয়া- হাসানাতাও ওয়া ফিল আ-খিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা- আযা-বান না-র।