ওয়াকুল জা’আল হাক্কু ওয়াজাহা কাল বাতিলু, ইনাল বাতিলা কানা জাহুক্বা।
আর বলো, হক এসেছে (কুরআন) এবং বাতিল বিলীন হয়েছে। নিশ্চয় বাতিল হলো বিলীন। -সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ১৭:৮১ (দ্র: আয়াত ১৭:৭৮-৮২)
░ ▓▒বাতিল কী জিনিস?▒▓ ░
মহাগ্রন্থ আল কুরআন সত্য (হক) এবং মিথ্যার (বাতিল) মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করার জন্য একটি চূড়ান্ত, দ্ব্যর্থহীন ও নিখুঁত মানদণ্ড উপস্থাপন করে। কুরআনের অন্তর্নিহিত যৌক্তিক কাঠামো অনুযায়ী, মহাবিশ্বের স্রষ্টার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত ঐশী বাণী বা ‘অহী’ (Wahi) হলো একমাত্র সত্য বা ‘হক’। এই অহীর বাইরে মানব রচিত যাবতীয় মতবাদ, ধারণা, খেয়ালখুশি ও দর্শন— তা যতই চাকচিক্যময় হোক না কেন— চূড়ান্ত বিচারে তা নিছকই ‘বাতিল’। আল কুরআন এই অহী-বহির্ভূত সমস্ত কিছুকে এবং সেগুলোর অনুসারীদেরকে অত্যন্ত সুস্পষ্ট চিত্ররূপময় ভাষার মাধ্যমে মূল্যহীন ‘ফেনা’, ‘আবর্জনা’ বা ‘খরকুটো’-এর সাথে তুলনা করেছে। একইসাথে, এই মূল্যহীন সত্তা ও তাদের উদ্ভাবিত ধারণা থেকে নিজেদেরকে নিরাপদ রাখতে মুমিনদের প্রতি তাদেরকে সম্পূর্ণ ‘পরিত্যাগ’ বা ‘বর্জন’ করার সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই প্রবন্ধে আমরা “তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন” বা কুরআনের আয়াত দিয়ে কুরআনেরই ব্যাখ্যার মাধ্যমে এই চরম বৈপরীত্য এবং বর্জনের ঐশী নির্দেশনার একটি গভীর অনুধ্যানমূলক বিশ্লেষণ জানা-বোঝার চেষ্টা করছি, বিঈযনিল্লাহ!
অহী বনাম আবর্জনা (বাতিল): আল কুরআনের চূড়ান্ত বাইনারি (Binary):
কুরআনের নজম বা বিন্যাসগত সামঞ্জস্যতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, আল্লাহ তায়ালা সত্যকে কেবলমাত্র তাঁর নিজের সাথে এবং তাঁর প্রেরিত অহীর সাথে নির্দিষ্ট করেছেন। সূরা আল-বাকারাহ-এর ১৪৭ নং আয়াতে আল্লাহ চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছেন:
"সত্য (হক) হলো তা-ই, যা তোমার রবের পক্ষ থেকে আগত; সুতরাং তুমি কখনোই সন্দিহানদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।" (সূরা আল-বাকারাহ ২:১৪৭)
এই আয়াতের একটি সুস্পষ্ট বিপরীতমুখী বা কনট্রাস্টিং চিত্র (cross-reference) পাওয়া যায় সূরা ইউনুস-এ, যা অহী-বহির্ভূত সবকিছুর আসল পরিচয় উন্মোচন করে দেয়:
"আর সত্যের পর পথভ্রষ্টতা ছাড়া আর কী বা থাকতে পারে?" (সূরা ইউনুস ১০:৩২)
অর্থাৎ, কুরআনিক মেটাফিজিক্স বা আধ্যাত্মিক জগত-বীক্ষা অনুযায়ী এখানে কোনো মধ্যবর্তী স্থান নেই। যা কিছু রবের নাযিলকৃত অহী (প্রত্যাদেশ), কেবল তা-ই ওজনদার, বাস্তব ও সত্য। এর বাইরে মানুষের নিজস্ব প্রবৃত্তি (হাওয়া) এবং অনুমান বা ধারণাপ্রসূত (যন) যাবতীয় চিন্তা-চেতনার কোনো অন্তর্নিহিত অস্তিত্ব নেই; এগুলোই হলো বাতিল বা আবর্জনা।
মূল্যহীনতার কুরআনিক পরিভাষা: ‘যাবাদান’ এবং ‘গুছা-আন’:
কুরআনে এই অহী-বহির্ভূত বাতিল মতবাদ ও তার অনুসারীদের দুটি বিশেষ পরিভাষার মাধ্যমে আবর্জনা বা ফেনার সাথে তুলনা করা হয়েছে। শব্দ দুটি হলো “যাবাদান” (زَبَدًا - ফেনা বা গাদ) এবং “গুছা-আন” (غُثَاءً - বন্যার পানিতে ভেসে আসা আবর্জনা বা খরকুটো)।
সূরা আর-রা'দ-এর ১৭ নং আয়াতে আল্লাহ আসমান থেকে বর্ষিত পানি (যার মেটাফোরিক্যাল অর্থ ঐশী অহী) এবং জমিনের অবস্থার একটি চমৎকার রূপকের মাধ্যমে অহী এবং মানবীয় ধারণার পার্থক্য তুলে ধরেছেন:
"তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, ফলে উপত্যকাসমূহ তাদের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী প্লাবিত হয়। অতঃপর স্রোতধারা তার ওপর ফুলে ওঠা ফেনা (زَبَدًا - যাবাদান) বহন করে নিয়ে যায়... এভাবেই আল্লাহ সত্য ও মিথ্যার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন। যা ফেনা বা গাদ (الزَّبَدُ - আয-যাবাদু), তা শুকিয়ে বা উড়ে গিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, আর যা মানুষের উপকারে আসে, তা জমিনে টিকে থাকে।" (সূরা আর-রা'দ ১৩:১৭)
এই আয়াতের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যতা (Symmetry) অত্যন্ত গভীর। আসমান থেকে আসা পরিষ্কার পানি হলো ‘অহী’। যখন তা জমিনে আসে, তখন পার্থিব জীবনের নানা আবর্জনা ও মানুষের মনগড়া ধারণার সংমিশ্রণে তাতে ‘ফেনা’ তৈরি হয়। বাতিল বা মিথ্যার কোনো নিজস্ব ওজন নেই; এটি নিছকই অহীর স্রোতের ওপরে ফুলে ওঠা ফেনা, যা দেখতে বিশাল মনে হলেও এর ভেতরে কোনো সারবস্তু নেই। এর বিপরীতে অহী হলো ‘যা মানুষের উপকারে আসে’ (مَا يَنفَعُ النَّاسَ), যা মানবসত্তাকে সজীব করে এবং জমিনে টিকে থাকে।
যারা অহীকে বাদ দিয়ে এই ফেনা বা আবর্জনাকে নিজেদের জীবনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করে, পরিণতিতে তারা নিজেরাও আবর্জনায় পরিণত হয়। সূরা আল-মুমিনূন-এ সালামুন আলা নূহ এবং অন্যান্য রাসূলগণের অবাধ্য জাতিসমূহের বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেন:
"অতঃপর এক অনিবার্য সত্য হিসেবে এক বিকট আওয়াজ তাদেরকে পাকড়াও করল এবং আমি তাদেরকে বন্যার পানিতে ভেসে আসা আবর্জনায় (غُثَاءً - গুছা-আন) পরিণত করলাম। সুতরাং ধ্বংস হোক জালিম সম্প্রদায়!" (সূরা আল-মুমিনূন ২৩:৪১)
এখানে ‘গুছা-আন’ শব্দটি আল কুরআনের শব্দগত প্রজ্ঞার এক অনন্য উদাহরণ। যারা অহীকে বাদ দিয়ে নিজেদের উদ্ভাবিত মতবাদ নিয়ে পৃথিবীতে অত্যন্ত অহংকার করত, ঐশী সত্যের মানদণ্ডে তারা এতটাই ওজনহীন যে, চূড়ান্ত বিচারে তারা নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া শুষ্ক পাতা বা আবর্জনায় পরিণত হলো।
পরিত্যাগের ঐশী নির্দেশ: ‘যারহুম’ এবং ‘আ’রিদ আনহুম’:
যেহেতু অহীর বাইরের সবকিছুই ফেনা বা আবর্জনা, তাই এই আবর্জনার দুর্গন্ধে যেন মুমিনের অন্তর কলুষিত না হয়, সেজন্য আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সালামুন আলাইহে) এবং মুমিনদেরকে সুস্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করেছেন এদেরকে পরিত্যাগ করার। এই বর্জনের নির্দেশনার ক্ষেত্রে কুরআনে মূলত দুটি শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়েছে— “যারহুম” (ذَرْهُمْ - তাদেরকে ছেড়ে দিন) এবং “আ’রিদ আনহুম” (أَعْرِضْ عَنْهُمْ - তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন)।
কেন এই আবর্জনাতুল্য মতবাদ ও ব্যক্তিদের ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে? এর উত্তর সূরা আল-আনআম-এর একটি আয়াতে স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়েছে:
"আর যারা নিজেদের দ্বীনকে খেল-তামাশা হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং পার্থিব জীবন যাদেরকে প্রতারিত করেছে, তাদেরকে বর্জন করুন (وَذَرِ - ওয়া যারি)..." (সূরা আল-আনআম ৬:৭০)
কুরআনের অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত (Implied evidence) এখানে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। যারা অহীর মত ভারী ও মহাজাগতিক সত্যকে বাদ দিয়ে মানুষের মনগড়া দর্শন নিয়ে মেতে থাকে, তারা মূলত জীবনকে ‘খেল-তামাশা’ বানিয়ে ফেলে। ফলে তারা নিজেদের সত্তাকেই হালকা বা ওজনহীন (যাবাদান/গুছা-আন) করে ফেলে। যেহেতু তাদের আধ্যাত্মিক কোনো অস্তিত্ব অবশিষ্ট নেই, তাই তাদেরকে বর্জন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সূরা আল-হিজর-এর আয়াতে এই বর্জনের নির্দেশটি আরও কঠোরভাবে এসেছে:
"তাদেরকে ছেড়ে দিন (ذَرْهُمْ - যারহুম), তারা খেতে থাকুক, ভোগ করতে থাকুক এবং মিথ্যা আশা তাদেরকে গাফেল করে রাখুক; অচিরেই তারা জানতে পারবে।" (সূরা আল-হিজর ১৫:৩)
এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু যৌক্তিক আধ্যাত্মিক সামঞ্জস্য (metaphysical symmetry) লক্ষণীয়। শারীরিক ক্ষুধা নিবারণ বা পার্থিব ভোগবাদিতার মাধ্যমে মানুষের বাহ্যিক আকার বৃদ্ধি পেলেও, অহী বিবর্জিত হওয়ার কারণে তার ভেতরের সত্তাটি সম্পূর্ণ শূন্য ও বায়বীয় হয়ে যায়। তারা চলন্ত আবর্জনায় পরিণত হয়। এই কারণেই সূরা আস-সাজদাহ-এর শেষে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন:
"অতএব, আপনি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন (فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ - ফা-আ’রিদ আনহুম) এবং অপেক্ষা করুন; তারাও অপেক্ষমাণ।" (সূরা আস-সাজদাহ ৩২:৩০)
যৌক্তিক পূর্ণতা ও উপসংহার:
কুরআনের এই আয়াতগুলোকে একত্রিত করলে একটি নিখুঁত ও পূর্ণাঙ্গ কাঠামো দাঁড়ায়। পৃথিবীর যাবতীয় জ্ঞান, মতবাদ ও দর্শনকে কুরআন দুটি মাত্র ভাগে বিভক্ত করেছে— অহী এবং আবর্জনা। অহী হলো সেই আসমানি বারিধারা, যা মানবতাকে সজীব করে, যার শেকড় মজবুত এবং যা চিরস্থায়ী। আর অহীর বাইরে মানুষের মনগড়া যাবতীয় মতবাদ, তা যতই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থিত হোক না কেন, তা কেবলই ‘যাবাদান’ (ফেনা) এবং ‘গুছা-আন’ (খরকুটো)।
যে ব্যক্তি বা সমাজ অহীকে প্রত্যাখ্যান করে ফেনার পেছনে ছোটে, তারা মূলত নিজেদের মানবীয় মর্যাদাকে আবর্জনার স্তরে নামিয়ে আনে। যেহেতু আবর্জনার একমাত্র কাজ দূষণ ছড়ানো, তাই আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন এই আত্মিক দূষণ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে। ‘যারহুম’ বা ‘আ’রিদ আনহুম’ কেবল এড়িয়ে চলা নয়; বরং এটি বাতিল বা অহী-বিবর্জিত সমাজব্যবস্থা থেকে মুমিনের আধ্যাত্মিক পরিচ্ছন্নতা ও স্বকীয়তা রক্ষার এক ঐশী রক্ষাকবচ। সত্যের পথযাত্রীদের জন্য এই অনুধ্যান থেকে চূড়ান্ত শিক্ষা হলো— নাযিলকৃত অহীর বাইরে পৃথিবীতে দৃশ্যমান যাবতীয় চাকচিক্য মূলত স্রোতের ফেনা বৈ কিছু নয়। এই ফেনার আস্ফালনে বিচলিত না হয়ে একে তার অনিবার্য ধ্বংসের দিকে ‘ছেড়ে দেওয়াই’ কুরআনিক প্রজ্ঞা।
প্রাসঙ্গিক দুআ ও তাসবিহ:
নিজেদেরকে অহী বিবর্জিত ফেনা বা আবর্জনাতুল্য জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে রক্ষা পেতে এবং তাদের সৃষ্ট ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকতে আল কুরআনে বর্ণিত নিম্নোক্ত দুআসমূহ অত্যন্ত কার্যকর:
দুআ ১: জালিম সম্প্রদায়ের ফিতনা থেকে মুক্তির জন্য
رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ وَنَجِّنَا بِرَحْمَتِكَ مِنَ الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
রব্বানা- লা- তাজ‘আলনা- ফিতনাতাল লিলক্বাওমিজ জা-লিমি-ন। ওয়া নাজ্জিনা- বিরহমাতিকা মিনাল ক্বাওমিল কা-ফিরি-ন।হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে জালিম সম্প্রদায়ের জন্য পরীক্ষার বস্তু বানাবেন না। এবং আপনার অনুগ্রহে আমাদেরকে সত্য প্রত্যাখ্যানকারী (কাফির) সম্প্রদায় থেকে রক্ষা করুন।" (সূরা ইউনুস ১০:৮৫-৮৬)
দুআ ২: অবাধ্য ও আবর্জনাতুল্যদের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার জন্য-
رَبِّ فَلَا تَجْعَلْنِي فِي الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ
রব্বি ফালা- তাজ‘আলনি- ফিল ক্বাওমিজ জা-লিমি-ন।হে আমার রব! আপনি আমাকে জালিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করবেন না।" (সূরা আল-মুমিনূন ২৩:৯৪)
দুআ ৩: অহীর সত্যের ওপর অটল থাকার তাসবিহ ও দুআ
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
রব্বানা- লা- তুযিগ ক্বুলু-বানা- বা‘দা ইয হাদাইতানা- ওয়া হাবলানা- মিল লাদুনকা রাহমাহ; ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহা-ব।হে আমাদের রব! সরল পথ (অহী) প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে বক্র করে দেবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা।" (সূরা আলে-ইমরান ৩:৮)