আহলে কুরআন: গালি, উপহাস, না-কি বিশেষ কোনো ট্যাগ? কে কাকে দেয় এবং এর পরিণতি কী? Ahley Quran-Quranists!

বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম

পক্ষান্তরে- কুরআন রিসার্চের নামে মনগড়া ব্যাখ্যা, শব্দার্থের বহুমূখী প্রয়োগ ও বিভ্রান্তির বেড়াজাল!

বর্তমান সমাজে দ্বীনি আলোচনার ক্ষেত্রে “আহলে কুরআন” (কুরআনের অনুসারী) শব্দগুচ্ছটি প্রায়শই একটি নেতিবাচক ট্যাগ, উপহাস বা গালি হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। কিন্তু এই পরিভাষাটি ছুঁড়ে দেওয়া হয় কেন, কি উদ্দেশ্যে?  আল কুরআনের অভ্যন্তরীণ কাঠামো (নজম) এবং “তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন” পদ্ধতিতে গভীর অনুধাবন করলে এক বিস্ময়কর সত্য উন্মোচিত হয়। এই নিবন্ধে আমরা কুরআনের আয়াতের পারস্পরিক সামঞ্জস্য ও বিপরীতমুখী চিত্র  বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনুসন্ধান করব—আহলে কুরআন আসলে কী, এই উপহাস কে কাকে করছে এবং এর আধ্যাত্মিক  ও চূড়ান্ত পরিণতি কী।

নিচের দিকে ১টি ভিডিও শুনুন

আহলে কুরআন কী এবং এর প্রকৃত মানদণ্ড:

আরবি ‘আহল’ শব্দের অর্থ হলো কোনো কিছুর ধারক, পরিবার, স্বজন বা একনিষ্ঠ অনুসারী। সেই হিসেবে ‘আহলে কুরআন’ অর্থ হলো যারা কুরআনকে নিজেদের জীবনের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে ধারণ করেছে। আল কুরআনের শব্দগত সামঞ্জস্যতা থেকে আমরা দেখতে পাই, আল্লাহর রাসূল সালামুন আলা মুহাম্মদ ছিলেন এই পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ‘আহলে কুরআন’। সূরা আল-আহকাফের ৯ নম্বর আয়াতে তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন, “আমার প্রতি যা অহী করা হয়, আমি তো কেবল তারই অনুসরণ করি।”

রাসূল সালামুন আলা মুহাম্মদ (সা:)-এর জীবনে অহী তথা আল কুরআনের বাইরে অন্য কোনো মতবাদ, প্রবৃত্তি বা বিধানের বিন্দুমাত্র স্থান ছিল না। তিনি এই কুরআন দ্বারাই মানুষকে সতর্ক করেছেন, বিচার-ফয়সালা করেছেন এবং জীবন পরিচালনা করেছেন। কাজেই, যারা এই সুনাতিল্লাহকে বা কর্মপদ্ধতিকে অনুসরণ করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল কুরআনকে একমাত্র ফুরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী (২:১৮৫) হিসেবে গ্রহণ করে, তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক অর্থে তারাই ‘আহলে কুরআন’। এটি কোনো নতুন সৃষ্ট দল নয়, বরং এটি অহীর প্রতি নিরঙ্কুশ আত্মসমর্পণের একটি বিশুদ্ধ অবস্থা।

যেহেতু রব্বুল আলামিন বলেন-

তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, তোমরা সেটার অনুসরণ করো এবং তাঁর পরিবর্তে বহু অভিভাবকের অনুসরণ কোরো না। তোমরা যা উপদেশ গ্রহণ করো তা খুবই অল্প-আল আরাফ, আয়াত ৭:৩ (আরও দ্র: আয়াত ৬:১০৬, ৬:১৫৩, ৬:১৯)

তাহলে এটি কি গালি, উপহাস, নাকি বিশেষ ট্যাগ?

মজার বিষয় হলো, যে কিতাবটি আল্লাহ নিজে নাযিল করেছেন এবং যাকে সূরা আয-যুমারের ২৩ নম্বর আয়াতে ‘আহসানুল হাদীস’ (Best Hadis) বলে আখ্যায়িত করেছেন, সেই কিতাবের একনিষ্ঠ অনুসারী হওয়াটা সমাজে গালি বা তাচ্ছিল্যের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। 
আল্লাহ সু. তা. বলেন-

আল্লাহ সবোর্ত্তম হাদীস (‘আহসানুল হাদীস’ (Best Hadis) নাযিল করেছেন, বহুল পঠিত সাদৃশ্যপূর্ণ একটি কিতাব হিসাবে। সেটা দ্বারা তাদের ত্বকসমূহ শিহরিত হয়, যারা তাদের রবকে ভয় করে। তারপর আল্লাহর যিকিরের প্রতি তাদের ত্বকসমূহ ও তাদের অন্তরসমূহ বিগলিত হয়। সেটা আল্লাহর পথনির্দেশ, তিনি সেটা দ্বারা যাকে চান পরিচালিত করেন...। (সূরা আয যুমার; আয়াত ৩৯:২৩)

অথচ আল্লাহর নাযিলকৃত একমাত্র অহীর একখানা কিতাব এই ‘আহসানুল হাদীস’  সালামুন আলা মুহাম্মদ (সা:) এর অনুসরনের কথা বলা হয় এবং যখন কাউকে ‘আহলে কুরআন’ বলে কটাক্ষ করা হয়, তখন মূলত একটি বিশেষ ট্যাগ লাগিয়ে তাকে সমাজচ্যুত করার চেষ্টা করা হয়। এর অন্তর্নিহিত কারণ হলো, সমাজের একটি বড় অংশ অজ্ঞতাবশত মানুষের তৈরি ‘লাহওয়াল হাদীস’ (অবান্তর কথা) বা অন্যান্য মতবাদের সাথে কুরআনকে মিশ্রিত করে ফেলেছে।

আল্লাহ সু. তা. বলেন-
আর মানুষের মধ্য থেকে কোনো জ্ঞান ছাড়াই, আল্লাহর পথ হতে বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যে লেনদেন করে ‘লাহওয়াল হাদীস’ (অবান্তর কথা) এবং সে সেটা ঠাট্টা হিসাবে গ্রহণ করে, ওরাই, যাদের জন্য রয়েছে অপমানজনক শাস্তি। আর যখন তার কাছে আমাদের আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, সে অহংকারবশত মুখ ফিরিয়ে নেয়, কেমন যেন সে তা শুনতে পায়নি, যেন তার দুই কানের মধ্যে রয়েছে বধিরতা। অতএব, তাকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও-সূরা লুকমান; আয়াত ৩১:৬-৭

সূরা আল-জাসিয়ার ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ প্রশ্ন রেখেছেন এভাবে-

সুতরাং আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পর তারা আর কোন্ হাদীসের (বাণীর) ওপর ঈমান আনবে?

যখন একদল মানুষ এই আয়াতের ওপর ভিত্তি করে অন্য সকল মতবাদ বর্জন করে কেবল কুরআনে ফিরে যায়, তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নিজেদের বিশ্বাসের ভিত নড়ে ওঠার ভয়ে তাদেরকে উপহাস করতে শুরু করে। যারা পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত বিভিন্ন মতবাদকে দ্বীনের অংশ বানিয়ে নিয়েছে, তারাই মূলত নিরঙ্কুশ অহীর অনুসারীদের ‘আহলে কুরআন’ ট্যাগ দিয়ে পথভ্রষ্ট বলে উপহাস করছে।

তাহলে, এই ট্যাগ কে কাকে দেয়? মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ:

কুরআনের বিপরীতমুখী চিত্র বিশ্লেষণ করলে এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। যুগে যুগে সত্য অস্বীকারকারী বা অপরাধীরাই মুমিনদের উপহাস করে এসেছে। সূরা আল-মুতাফফিফীনের ২৯ থেকে ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ এই মনস্তত্ত্ব চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন, “নিশ্চয়ই যারা অপরাধী, তারা মুমিনদের দেখে হাসাহাসি করত... এবং যখন তারা মুমিনদের দেখত, তখন বলত—নিশ্চয়ই এরা পথভ্রষ্ট।”

আজকের প্রেক্ষাপটেও ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। যারা পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত বিভিন্ন মতবাদ, নিজস্ব খেয়াল-খুশি এবং মানবসৃষ্ট বিধানকে দ্বীনের অংশ বানিয়ে নিয়েছে, তারাই মূলত নিরঙ্কুশ অহীর অনুসারীদের ‘আহলে কুরআন’ ট্যাগ দিয়ে পথভ্রষ্ট বলে উপহাস করছে। অর্থাৎ, যারা কুরআনকে অসম্পূর্ণ মনে করে (মাআযাল্লাহ), তারা এই গালিটি দেয় তাদেরকে—যারা সূরা আল-আনআমের ৩৮ নম্বর আয়াতের ঘোষণায় বিশ্বাস করে যে, “আমি এই কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দিইনি।”

পক্ষান্তরে- কুরআন গবেষণার নামে মনগড়া ব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তির ভয়ংকর ফাঁদও আছে:

এই আলোচনার একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও বিপরীতমুখী  দিক রয়েছে, যা গভীরভাবে অনুধ্যান করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে একশ্রেণির মানুষ ‘কুরআন অনুসরণ’ বা ‘আয়াত রিসার্চ’-এর দাবি করে আল কুরআনের আয়াতের অর্থ ও কাঠামোর আমূল পরিবর্তন (তাহরীফ) করে ফেলছে। তারা দাবি করছে যে, কুরআনে সালাত, সিয়াম বা হজ্জের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক রূপ নেই! এটি এক ধরনের চরম বাড়াবাড়ি এবং ভয়ংকর ফিতনা।

কুরআনের নজম (ধারাবাহিকতা) ও অভ্যন্তরীণ কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, আল্লাহ সালাতের রুকু ও সিজদার সুস্পষ্ট শারীরিক কাঠামোর কথা বলেছেন। সূরা আল-ফাতহের ২৯ নম্বর আয়াতে মুমিনদের শারীরিক অবস্থা তুলে ধরে বলা হয়েছে:

“তুমি তাদেরকে রুকু ও সিজদাহরত অবস্থায় দেখতে পাবে।”

সিয়ামের নির্দিষ্ট সময়সীমা (ভোর থেকে রাত পর্যন্ত) সূরা আল-বাকারাহর ১৮৭ নম্বর আয়াতে এবং হজ্জের তাওয়াফ, সাফা-মারওয়া ও আনুষ্ঠানিকতার কথা সূরা আল-হাজ্জের ২৭-২৯ নম্বর আয়াতে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই সুস্পষ্ট আয়াতগুলোকে মনগড়া, রূপক বা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে বাতিল করা মূলত গবেষণার নামে নিজেদের খেয়াল-খুশি বা প্রবৃত্তির (হাওয়া) অনুসরণ করা। আল কুরআনের ভাষায় এটি হলো চরম বিকৃতি। সূরা আল-মায়িদাহর ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ এই মানসিকতার চিত্র তুলে ধরেছেন:

“তারা শব্দগুলোকে তার সঠিক স্থান থেকে পরিবর্তন করে (ইউহাররিফুনাল কালিমা আম-মাওয়াদিয়িহ)।”

এই বিকৃতির ফলে সাধারণ মানুষ সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে—তারা কোন্ দিকে যাবে তা বুঝতে পারে না এবং প্রকারান্তরে এই বিভ্রান্তিকর প্রচারণার ফাঁদে পড়ে কুফরির দিকে ধাবিত হয়। এরা মানুষকে কুরআনের নামে মূলত নিজেদের নিজস্ব মনগড়া মতবাদের দিকেই টানছে। সূরা আল-কাহফের ১০৩ ও ১০৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ এদের বিষয়েই এক আধ্যাত্মিক সতর্কবাণী দিয়েছেন:

“বলো, আমি কি তোমাদের ক্ষতিগ্রস্ত আমলকারীদের বিষয়ে জানাব? দুনিয়ার জীবনে যাদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, অথচ তারা মনে করত যে তারা সৎকাজই করছে।”

সুতরাং, আমাদের অত্যন্ত সাবধান থাকতে হবে। বিশুদ্ধতায় পরিপূর্ণতার জন্য কুরআনের গভীর অনুধ্যান অপরিহার্য, তবে তা হতে হবে কুরআনের নিজস্ব শব্দগত সামঞ্জস্য ও কাঠামোর ভেতরে থেকে, কোনো মনগড়া মতবাদের দিকে ধাবিত হয়ে নয়।

তবে যারা সত্যিই আল কোরআন অনুধাবনে নবী-রাসুলগণের অনুসরনে দ্বীনকে পারফেক্টলি বোঝার চেষ্টা করেন ও অনুসরন করতে চান তাদেরকে- উপহাস ও তাচ্ছিল্যের চূড়ান্ত পরিণতি:

যেকোনো নবী বা রাসূলের প্রকৃত অনুসারীদের উপহাস করার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। যারা ‘আহলে কুরআন’ উপাধিকে গালি হিসেবে ব্যবহার করছে, তারা অবচেতনভাবে আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবের স্বয়ংসম্পূর্ণতাকেই তাচ্ছিল্য করছে। এর একটি আধ্যাত্মিক ও বিচার দিবসের চূড়ান্ত পরিণতি আল কুরআনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।

যে রাসূল সালামুন আলা মুহাম্মদ-এর দোহাই দিয়ে আজ মানুষ কুরআনের পাশাপাশি অন্যান্য মতবাদকে আঁকড়ে ধরেছে, হাদিসের নামে বহু কিতাবের, মতাদর্শ, ফিকরার অনুসরন করছে, কিয়ামতের দিন সেই রাসূলই তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে এক ভয়ংকর অভিযোগ দায়ের করবেন। সূরা আল-ফুরকানের ৩০ নম্বর আয়াতের দৃশ্যপটটি গভীরভাবে অনুধ্যান করার মতো, (মামলা রজু করে বলবেন-) “আর রাসূল বলবে, ‘হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমার সম্প্রদায় এই কুরআনকে পরিত্যক্ত (মাহজুরা) হিসেবে গ্রহণ করেছিল।”

যে সম্প্রদায় কুরআনকে পরিত্যাগ করে বা এর বিধানকে যথেষ্ট মনে না করে অন্য উৎসের দিকে ধাবিত হয় এবং যারা কুরআনকে আঁকড়ে ধরে তাদের তাচ্ছিল্য করে, রাসূলের এই অভিযোগ সরাসরি তাদের বিরুদ্ধেই যাবে। পাশাপাশি সূরা আল-মুরসালাতের ৫০ নম্বর আয়াতের সতর্কবাণী তাদের জন্য অমোঘ পরিণতি নির্ধারণ করে দেয়, “অতএব, এর (কুরআনের) পর তারা আর কোন্ হাদীসের প্রতি ঈমান আনবে?” যারা কুরআনের বাইরে অন্য কিছু গ্রহণ করেছে, চূড়ান্ত বিচারে তারা চরম ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।

যৌক্তিক সমাপ্তি:

সমগ্র আলোচনার সারসংক্ষেপ হলো—‘আহলে কুরআন’ হওয়া কোনো গালি বা নেতিবাচক শব্দ হতে পারে না; এটি আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণকারী মুমিনের সর্বোচ্চ মর্যাদার পরিচয়, যার সর্বশ্রেষ্ঠ রূপকার ছিলেন স্বয়ং রাসূল সালামুন আলা মুহাম্মদ (সা:)। অন্যদিকে, কুরআন অনুসরণের দোহাই দিয়ে আয়াতের মনগড়া ব্যাখ্যা করা এবং সালাত, সিয়াম, হজ্জের মতো অকাট্য বিধানগুলোকে অস্বীকার করা এক ভয়াবহ বিভ্রান্তি। সত্যিকারের অনুধ্যান কখনোই মানুষকে আল্লাহ নির্ধারিত আনুষ্ঠানিক ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে নেয় না, বরং আরও গভীরভাবে সমর্পিত করে। সত্যনিষ্ঠ মুমিনদের কাজ হলো সকল প্রকার তাচ্ছিল্য, বিকৃতি এবং মনগড়া মতবাদের ফিতনা থেকে নিজেদের দূরে রেখে কেবল নাযিলকৃত সুস্পষ্ট অহী তথা আল কুরআনের বিশুদ্ধ কাঠামোর ওপর অবিচল থাকা।

░ ▓▒সংজ্ঞাগত তথ্য▒▓ ░

পাঠকের বুঝতে সহজতার জন্য কিছু প্রচলিত তথ্য:
তবে সাধারনত  আহলে কিতাব (أهل الكتاب),  আহলে কুরআন (أهل القرآن) ও আহলে হাদীস (أهل الحديث) বলতে কি বুঝায়?

1️⃣ আহলে কিতাব (أهل الكتاب):  অর্থ: নাযিলকৃত কিতাবের অধিকারী/ধারক জাতি

কুরআনে এই শব্দটি মূলত ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে, কারণ তাদের কাছে আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাব ছিল (তাওরাত, ইনজিল)।  উদাহরণ: Qur'an – ৩:৬৪, 5:15, 5:68, 9:29, 4:171

2️⃣ আহলে কুরআন (أهل القرآن):  এখানে “আহলুল কুরআন” বলতে বোঝানো হয়েছে:

“আহলে কুরআন” (أهل القرآن) শব্দটি কুরআনের আয়াতের কোনো নির্দিষ্ট উপাধি নয়। কুরআনে যেমন “আহলে কিতাব” বলা হয়েছে, তেমনভাবে “আহলে কুরআন” শব্দটি সরাসরি পাওয়া যায় না। তবে ধারণাটি এসেছে একটি সহীহ হাদিস থেকে।

হাদিসে “আহলে কুরআন”
রাসূল (সা:) বলেছেন—

“নিশ্চয় আল্লাহর কিছু বিশেষ লোক আছে।”
সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, তারা কারা?

তিনি বললেন: “আহলুল কুরআন, তারা আল্লাহর বিশেষ লোক ও নিকটবর্তী।”
— বর্ণনা: Sunan Ibn Majah 215

সত্যিকারে আল্লাহর রাসুলের প্রতি অহীকৃত এবং সালামুন আলা মুহাম্মদের অনুসরনে একমাত্র লেটেষ্ট ভার্সন হিসাবে আল কুরআন যারা  পড়ে-স্টাডি করে (তাদাব্বুর-তাফাক্খুর করে), কুরআন বুঝার চেষ্টা করে, এবং জীবনের সকল পর্যায়ে কুরআন অনুসরনের চেষ্টা-সাধনা করে থাকেন।

পরে এই শব্দের ব্যবহার কীভাবে বদলেছে?
আধুনিক সময়ে “আহলে কুরআন” শব্দটি দুইভাবে ব্যবহৃত হয়:

(ক) ইতিবাচক অর্থে 
কুরআনের অনুসারী বা কুরআনকে কেন্দ্র করে জীবনযাপনকারী।

(খ) মতবাদ বোঝাতে-
এমন একটি গোষ্ঠী/অনুসারী যারা বলে হাদিস শরিয়তের দলিল নয়, শুধু কুরআনই যথেষ্ট।

এদের অনেক সময় অন্যান্য অনাযিলকৃত কিতাব হাদীসের অনুসারীরা এদেরকে  “Quranist”ও বলে থাকে।

3️⃣ আহলে হাদীস (أهل الحديث): অর্থ: হাদিসের অনুসারী বা হাদিসকেন্দ্রিক আলেম/মতবাদ:

এটা একটি ধারার নাম, যারা কুরআনের সাথে রাসূল সালামুন আলা মুহাম্মদের (সা:)-এর মানুষের সংগৃহীত ও ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে ভিত্তিতে হাদিসকে শরিয়তের প্রধান দলিল হিসেবে যুক্ত করে বা মিশ্রণ করে গুরুত্ব দেয় এবং ফিকহে সরাসরি কুরআন-হাদিস অনুসরণকে জোর দেয়।

সংক্ষেপে পার্থক্য:

■ আহলে কিতাব → পূর্ববর্তী ঐশী কিতাবধারী জাতি (ইহুদি-খ্রিস্টান)।

■ আহলে কুরআন → কুরআনকেন্দ্রিক অনুসারী (কখনো একটি মতবাদ)।

■ আহলে হাদীস → কুরআন ও হাদিসকে সরাসরি অনুসরণে জোর দেওয়া ইসলামী ধারা।

░ ▓▒সংশ্লিষ্ট কিছু দোয়া-তাসবিহ:▒▓ ░

সত্য বিধান (কোরআন) গ্রহণ ও সাক্ষ্য প্রদানের দোয়া:

رَبَّنَا آمَنَّا بِمَا أَنْزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ
রব্বানা আমান্না বিমা আনঝালতা ওয়াত্তাবাগনার রসূলা ফাকতুবনা মাআশ-শাহিদিন।

হে আমাদের রব! আপনি যা নাজিল করেছেন আমরা তার প্রতি ঈমান এনেছি এবং আমরা রাসূলের অনুসরণ করেছি। সুতরাং আপনি আমাদেরকে সাক্ষ্যদাতাদের তালিকাভুক্ত করে নিন। (সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৫৩)

সত্যের পথে অবিচল থাকার দোয়া:

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ
রব্বানা লা তুযিগ কুলুবানা বা’দা ইয হাদাইতানা ওয়াহাব লানা মিল-লাদুনকা রহমাহ, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহাব।

হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে হেদায়েত দানের পর আমাদের অন্তরগুলোকে বক্র করে দেবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি মহাদাতা। ( আয়াত: 3:8)

নির্ভুল কিতাব নাজিলের জন্য আল্লাহর প্রশংসা বা তাসবিহ:

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْزَلَ عَلَى عَبْدِهِ الْكِتَابَ وَلَمْ يَجْعَلْ لَهُ عِوَجًا
আলহামদু লিল্লাহিল্লাযি আনযালা আলা আবদিহিল কিতাবা ওয়ালাম ইয়াজআল লাহু ইওয়াজা।

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি তাঁর বান্দার ওপর কিতাব (কোরআন) অবতীর্ণ করেছেন এবং এতে কোনো বক্রতা বা অসামঞ্জস্য রাখেননি। (সূরা আল-কাহফ, আয়াত: ১)

কুরআনের পথে অবিচল থাকা এবং সত্যবিরোধীদের উপহাস বা ফিতনা থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য আল কুরআনের এই দুআসমূহ অত্যন্ত কার্যকর:

رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ

রাব্বানা লা তাজআলনা মাআল ক্বাওমিজ জোয়ালিমিন।

অর্থ: “হে আমাদের রব! আমাদেরকে যালিম সম্প্রদায়ের সঙ্গী করবেন না।” (সূরা আল-আরাফ, ৭:৪৭)

رَبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ

রাব্বানা আলাইকা তাওয়াক্কালনা ওয়া ইলাইকা আনাবনা ওয়া ইলাইকাল মাসির।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমরা কেবল আপনার ওপরই তাওয়াক্কুল করেছি, আপনার দিকেই আমরা ফিরেছি এবং প্রত্যাবর্তন কেবল আপনারই কাছে। (সূরা আল-মুমতাহিনাহ, ৬০:৪)

حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ

হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকিল।

অর্থ: আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক!” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৭৩)

কোরআন অনুধাবনে জ্ঞান বৃদ্ধির দোয়া:

رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا
রব্বি যিদনি ইলমা।  হে আমার রব! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন। (সূরা ত্বা-হা, আয়াত: ১১৪)

উপহাসকারী সম্প্রদায়ের সাথে সত্য ফয়সালার দোয়া:

رَبَّنَا افْتَحْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ قَوْمِنَا بِالْحَقِّ وَأَنْتَ خَيْرُ الْفَاتِحِينَ
রব্বানাফতাহ বাইনানা ওয়া বাইনা কওমিনা বিল হাক্কি ওয়া আনতা খইরুল ফাতিহিন।

হে আমাদের রব! আমাদের ও আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে সত্যের সাথে ফয়সালা করে দিন। আর আপনিই তো শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী। (সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ৮৯)

🎬 Video Credit: মূল নির্মাতা (Original Creator)।

ℹ️ শ্রোতাদের অবগতির জন্য:
এই চ্যানেলে প্রকাশিত অডিও ও ভিডিওসমূহ মূলত ইউটিউব কিংবা অন্যান্য উৎস থেকে সংগ্রহকৃত বা ধার করা উপকরণ। এগুলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই কন্টেন্টের মাধ্যমে আপনাদের মাঝে শেয়ার করা হচ্ছে।

আলহামদুলিল্লাহির রব্বিল আলামিন!

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post