আল- কুরআনের অন্যতম কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয় হলো নিরঙ্কুশ একেশ্বরবাদ বা তৌহিদ। এই তৌহিদকে মানবজাতির সামনে একটি পূর্ণাঙ্গ ও জীবন্ত রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরার জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বারবার “মিল্লাতে ইবরাহীম” বা ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে)-এর জীবনাদর্শের দিকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কুরআনের অনুধ্যান করলে দেখা যায়, আল্লাহ তাঁর শেষ বার্তাবাহককেও নির্দেশ দিচ্ছেন: “অতঃপর আমি আপনার প্রতি ওহী প্রেরণ করেছি যে, আপনি একনিষ্ঠ ইবরাহীমের মিল্লাত অনুসরণ করুন; এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।” (১৬:১২৩)।
প্রচলিত কোনো ইতিহাস বা ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে নয়, বরং কুরআনের নিজস্ব “তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন” পদ্ধতির আলোকে যদি আমরা আয়াতগুলোর পারস্পরিক সামঞ্জস্য, নজম (বিন্যাস) এবং শব্দগত গাঁথুনি বিশ্লেষণ করি, তবে অত্যন্ত সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে—কেন আল্লাহ বান্দাদের মিল্লাতে ইবরাহীমের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
মিল্লাত ও হানীফ তাৎপর্য:
কুরআনে ‘মিল্লাত’ (مِلَّة) শব্দটি মূলত জীবনব্যবস্থা, আদর্শিক সম্প্রদায় বা সুনির্দিষ্ট পথ নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহ যখনই মিল্লাতে ইবরাহীমের কথা বলেছেন, তখনই এর সাথে একটি বিশেষ বিশেষণ যুক্ত করেছেন—‘হানীফ’ (حَنِيف)।
‘হানীফ’ শব্দের অর্থ হলো একনিষ্ঠ, যে ব্যক্তি সকল মিথ্যা ও বক্রপথ থেকে মুখ ফিরিয়ে কেবল সত্যের দিকে রুজু হয়। কুরআনের ভাষাতাত্ত্বিক সামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আল্লাহ ‘হানীফ’ শব্দের ঠিক বিপরীতার্থক শব্দ হিসেবে ‘মুশরিক’ (অংশীস্থাপনকারী/যুক্তকারী) শব্দটিকে দাঁড় করিয়েছেন।
বলুন! আল্লাহ সত্য বলেছেন। অতএব, তোমরা একনিষ্ঠ (হানীফ) ইবরাহীমের মিল্লাত অনুসরণ করো; এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। (৩:৯৫)
এখানে অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত (implied evidence) হলো, মিল্লাতে ইবরাহীম এবং শিরক—এই দুটি বিষয় পরষ্পর সাংঘর্ষিক। মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসারী হওয়ার প্রথম শর্তই হলো যাবতীয় দৃশ্যমান ও অদৃশ্য শিরক থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করা।
বিপরীতমুখী চিত্র (Contrasting View):
কুরআনের নজম বা আয়াতের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সূরা বাকারায় আল্লাহ যখন আহলে কিতাবদের (ইহুদী ও খ্রিস্টান) সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার সমালোচনা করেছেন, ঠিক তখনই কনট্রাস্টিং আয়াত (cross-reference) হিসেবে মিল্লাতে ইবরাহীমের প্রসঙ্গ এনেছেন।
তৎকালীন ইহুদী ও খ্রিস্টানরা দাবি করত, কেবল তাদের দলেই মুক্তি নিহিত। আল্লাহ তাদের এই খণ্ডিত ও বিভাজিত দাবির বিপরীতে শাশ্বত সত্যের মানদণ্ড উপস্থাপন করেন:
“তারা বলে- তোমরা ইহুদী অথবা খ্রিস্টান হয়ে যাও, তবেই পথ পাবে। বলুন, বরং আমরা একনিষ্ঠ ইবরাহীমের মিল্লাত অনুসরণ করি; এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।” (২:১৩৫)
কুরআনের এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, ইহুদী বা খ্রিস্টান হওয়াটা হলো মানুষের তৈরি করা ‘দলাদলি’ বা ‘সম্প্রদায়’ (sectarianism)। অন্যদিকে ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে)-এর মিল্লাত হলো দলমতের ঊর্ধ্বে নিখাদ স্রষ্টায় আত্মসমর্পণের এক বিশ্বজনীন রূপরেখা। কুরআন সুস্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়:
“ইবরাহীম ইহুদীও ছিল না, খ্রিস্টানও ছিল না; বরং সে ছিল একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণকারী (হানীফাম মুসলিমান) এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।” (৩:৬৭)
কেন মিল্লাতে ইবরাহীম? কুরআনিক যুক্তির অন্তর্নিহিত অনুধাবন:
আল্লাহ কেন অন্য কোনো নবীর মিল্লাতের কথা না বলে বিশেষভাবে ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে)-এর মিল্লাতের কথা বললেন, তার যৌক্তিক ও আধ্যাত্মিক (metaphysical) সামঞ্জস্য কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে ছড়িয়ে আছে।
১. নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ (আছলামা):
ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে)-এর সত্তার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল স্রষ্টার প্রতি কালবিলম্বহীন ও শর্তহীন আত্মসমর্পণ।
“যখন তার রব তাকে বললেন, ‘আত্মসমর্পণ করো (আছলিম)’, সে বলল, ‘আমি সৃষ্টিকুলের রবের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম (আছলামতু লি রব্বিাল আলামিন)। (২:১৩১)
এই আয়াতে ‘আছলিম’ এবং ‘আছলামতু’-এর মধ্যকার ক্রিয়াগত সামঞ্জস্য প্রমাণ করে যে, রবের নির্দেশের সাথে সাথে বান্দার অন্তরের সাড়া দেওয়ার নামই হলো মিল্লাতে ইবরাহীম। যে ব্যক্তি এই মিল্লাত থেকে বিমুখ হয়, কুরআন তাকে ‘নির্বোধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে (২:১৩০)।
২. যুক্তিনির্ভর আধ্যাত্মিক উত্তরণ:
ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে) অন্ধ অনুকরণ করেননি, বরং মহাবিশ্বের নিদর্শনাবলি নিয়ে গভীর অনুধ্যান করে স্রষ্টাকে চিনেছিলেন। তারকা, চন্দ্র ও সূর্যকে অস্তমিত হতে দেখে তিনি এই যৌক্তিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, পরিবর্তনশীল কোনো বস্তু স্রষ্টা হতে পারে না।
“আমি একনিষ্ঠভাবে (হানীফান) আমার মুখমণ্ডল তাঁর দিকে ফিরাচ্ছি, যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (৬:৭৯)
৩. ‘মুসলিম’ পরিচয়ের আদি পিতা:
আমাদের ‘মুসলিম’ পরিচয়টি কোনো নতুন উদ্ভাবন নয়, বরং এটি মিল্লাতে ইবরাহীমেরই ধারাবাহিকতা। আল্লাহ সূরা হজে এই ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক সংযোগটি তুলে ধরেছেন:
“তোমরা তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাতের ওপর কায়েম থাকো। তিনিই (আল্লাহ) পূর্বে তোমাদের নামকরণ করেছেন ‘মুসলিম’...” (২২:৭৮)
4. আল-কুরআনের ভাষায় কুনুতকারীর পরিচয়:
'ক্বনিতীন' (قَانِتِينَ) এবং 'ক্বনিতাত' (قَانِتَاتِ) শব্দদ্বয় যথাক্রমে সেইসব পুরুষ ও নারীদের নির্দেশ করে, যারা আল্লাহর প্রতি বিনয়ী ও অনুগত। কিন্তু কারা তাঁরা? তাঁদের স্বরূপ কী?
কুনুত: আনুগত্য, বিনয় এবং ঐশী কিতাবের প্রতি অবিচল আস্থা:
কুনুত হলো আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিজের ইচ্ছা ও সত্তাকে সমর্পণ করা। যারা কুনুত অবলম্বন করেন, তাঁরাই ‘ক্বনিতীন’। এটি কেবল শারীরিক ইবাদত নয়, বরং মানসিক ও আত্মিক আত্মসমর্পণের নাম।
কুনুত বাস্তবায়নে সালামুন আলা ইব্রাহিম:
একজন একক ব্যক্তি হয়েও কীভাবে ‘ক্বনিত’ হওয়া যায়, তার সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলেন- সালামুন আলা ইব্রাহিম।
আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেন:
নিশ্চয় ইব্রাহিম ছিলেন এক উম্মত (একক জাতি/অনুকরণীয়), আল্লাহর প্রতি একান্ত অনুগত (ক্বনিতান), একনিষ্ঠ এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।" (সূরা নাহল: ১২০)
তাঁকে ‘ক্বনিতান’ (একবচন) বলা হয়েছে কারণ তাঁর আনুগত্য ছিল নিঃশর্ত। তিনি সমাজের স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে একাই এক জাতির ভূমিকা পালন করেছিলেন। শিরক থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর দিকে একনিষ্ঠভাবে ঝুঁকে পড়াই হলো ইব্রাহিমী কুনুতের মূল শিক্ষা।
'ক্বনিতীন' ও 'ক্বনিতাত': ব্যাপক আনুগত্যের চিত্র:
এই গুণটি মুমিন নারী ও পুরুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। সূরা আল-আহযাবের ৩৫ নং আয়াতে আল্লাহ মুমিনদের দশটি গুণের মধ্যে কুনুতকে বিশেষ স্থান দিয়েছেন:
নিশ্চয় মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মু'মিন পুরুষ ও মু'মিন নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী (ক্বনিতীন ওয়া ক্বনিতাত)...-আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন। (সূরা আহযাব: ৩৩:৩৫)
যৌবনে বিপ্লবী আদর্শ আরও একটি উপমা:
পূর্বে আলোচিত ‘মিল্লাতে ইবরাহীম’ এবং ‘সমাজের বাড়াবাড়ি বা জুলুম’—এই দুটি বিষয়ের একটি অপূর্ব ও জীবন্ত মোহনা হলো ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে)-এর যৌবনের বিপ্লবী আদর্শ এবং আসহাবে কাহফ (গুহাবাসী যুবকদল)-এর ঘটনা। কুরআনের অনুধ্যান করলে এই দুটি ঘটনার মাঝে এক বিস্ময়কর শব্দগত (Fata/Fityah) এবং ভাবগত (তৌহিদের জন্য শিরক মিশ্রিত সমাজ ত্যাগ) সামঞ্জস্য বা সিমেট্রি (Symmetry) দেখতে পাওয়া যায়।
যখন কোনো সমাজ শিরক/যুক্তকারী ও বাড়াবাড়িতে নিমজ্জিত হয়, তখন সেই তথাকথিত পৈত্রিক সমাজব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে কেবলমাত্র রবের আশ্রয়ে চলে যাওয়ার যে চূড়ান্ত মানদণ্ড, তা এই দুটি ঘটনার তুলনামূলক বিশ্লেষণে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
যৌবনের দীপ্ত বিদ্রোহ: ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে) ও আসহাবে কাহফের সাদৃশ্য:
কুরআনের শব্দগত সামঞ্জস্যতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে) যখন তাঁর সমাজের মূর্তি ও শিরকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তিনি ছিলেন একজন যুবক। সমাজ তাঁকে বয়সের দিক থেকে অবজ্ঞা করে বলেছিল: “আমরা এক যুবককে (ফাতান) এদের (মূর্তিগুলোর) সমালোচনা করতে শুনেছি, যাকে ইবরাহীম বলা হয়।” (২১:৬০)।
ঠিক একই রকম শব্দগত ব্যবহার (cross-reference) আমরা দেখি সূরা কাহফে, যেখানে শিরক মিশ্রিত সমাজ থেকে বেরিয়ে আসা গুহাবাসীদের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ বলছেন: “নিশ্চয়ই তারা ছিল কয়েকজন যুবক (ফিতইয়াতুন), যারা তাদের রবের প্রতি ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদের হিদায়াত বৃদ্ধি করে দিয়েছিলাম।” (১৮:১৩)।
উভয় ঘটনার অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক ইঙ্গিত (Implied evidence) হলো—যৌবন হলো মানুষের জীবনের এমন এক পর্যায় যখন তার ওপর সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতার চাপ থাকে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে) এবং আসহাবে কাহফের যুবকেরা প্রমাণ করেছেন, রবের প্রতি একনিষ্ঠতা (হানীফ) থাকলে যৌবনের সেই প্রবল স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়েও সমাজকে প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব।
শিরক থেকে ‘বারাআত’ বা সম্পর্কচ্ছেদের অনুধ্যান:
মিল্লাতে ইবরাহীমের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, তৌহিদের স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি শিরক ও মুশরিক সমাজ থেকে সুস্পষ্টভাবে সম্পর্কচ্ছেদ করা। সূরা মুমতাহানায় আল্লাহ ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে) এবং তাঁর সাথীদের এই সম্পর্কচ্ছেদের ঘটনাকে মুমিনদের জন্য ‘উসওয়াতুন হাসানাহ’ বা ‘উত্তম আদর্শ’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
তাঁরা তাঁদের পূর্বপুরুষের অন্ধ অনুকরণ ও সামাজিক রীতিনীতিকে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন: “নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের থেকে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করো তাদের থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। আমরা তোমাদেরকে অস্বীকার করি। আমাদের ও তোমাদের মাঝে চিরকালের জন্য শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়ে গেল, যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো...” (৬০:৪)।
ঠিক একই রকম কনট্রাস্টিং ভিউ বা বিপরীতমুখী চিত্র আমরা আসহাবে কাহফের যুবকদের মাঝে দেখি। তারা যখন অনুভব করল তাদের সমাজ আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহকে যুক্ত করে সীমালঙ্ঘন (বাড়াবাড়ি) করছে, তখন তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল: “আমাদের এই কওম তাঁর (আল্লাহর) পরিবর্তে অন্য ইলাহ গ্রহণ করেছে... অতএব যে ব্যক্তি আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা উদ্ভাবন করে, তার চেয়ে বড় জালিম (বাড়াবাড়িকারী) আর কে হতে পারে? যখন তোমরা তাদের থেকে এবং তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছ, তখন তোমরা গুহায় আশ্রয় গ্রহণ করো...” (১৮:১৫-১৬)।
নিরাপদ আশ্রয়ের সামঞ্জস্যতা:
এই দুই ঘটনার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর আধ্যাত্মিক সামঞ্জস্য রয়েছে। ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে) যখন সমাজ ত্যাগ করে রবের ওপর ভরসা করেছিলেন, তখন সমাজ তাঁকে জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করেছিল। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশে সেই আগুন তাঁর জন্য শীতল ও নিরাপদ আশ্রয় (সালাম) হয়ে গিয়েছিল (২১:৬৯)।
অন্যদিকে আসহাবে কাহফের যুবকেরা যখন সমাজ ত্যাগ করল, তখন তাদের সামনে কোনো সুরম্য প্রাসাদ ছিল না, ছিল একটি অন্ধকার গুহা। কিন্তু কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, তারা যখন রবের কাছে আশ্রয় চাইল, আল্লাহ সেই সংকীর্ণ গুহাকেই তাদের জন্য তাঁর প্রশস্ত রহমতের চাদরে পরিণত করে দিলেন (১৮:১৬)। অর্থাৎ, রবের জন্য সমাজ ও শিরক ত্যাগ করলে, জাগতিক দৃষ্টিতে যা বিপদ বা অন্ধকার মনে হয়, আল্লাহ তাকেই পরম শান্তিতে রূপান্তরিত করেন।
ওহীর ধারাবাহিকতা: সালামুন আলা মুহাম্মাদকেও সালামুন আলা ইবরাহীম-এর আদর্শ অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন:
কুরআনে আল্লাহ অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ভাষায় মুহাম্মাদ (সালামুন আলাইহে)-কে ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে)-এর আদর্শ অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা নাহলের নজম লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আল্লাহ যখন ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে)-এর গুণাবলি বর্ণনা শেষ করলেন, ঠিক তার পরের আয়াতেই শেষ নবীকে উদ্দেশ্য করে বলছেন:
“অতঃপর আমি আপনার প্রতি ওহী প্রেরণ করেছি যে, আপনি একনিষ্ঠ ইবরাহীমের মিল্লাত অনুসরণ করুন; এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।” (১৬:১২৩)
এই আয়াতে ‘আওহাইনা’ (أَوْحَيْنَا - আমরা ওহী করেছি) এবং ‘ইত্তাবি’ (اتَّبِعْ - অনুসরণ করুন) শব্দ দুটির ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত (Implied evidence) হলো—মুহাম্মাদ (সালামুন আলাইহে)-এর নবুওয়াত ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে)-এর নবুওয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, বরং এটি একই ঐশ্বরিক ধারার (Divine continuum) চূড়ান্ত রূপ। আল্লাহ এখানে সুস্পষ্ট করে দিচ্ছেন যে, ওহীর মূল নির্যাস যুগে যুগে অপরিবর্তিত থাকে এবং তার কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘হানীফ’ (একনিষ্ঠ) হওয়া এবং ‘মুশরিক’ (অংশীস্থাপনকারী) না হওয়া।
প্রাসঙ্গিক কুরআনি দুআ ও আশ্রয় প্রার্থনা:
শিরক মিশ্রিত সমাজ ত্যাগ করে আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা স্থাপনের ক্ষেত্রে ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে) এবং আসহাবে কাহফের যুবকেরা যে দুআগুলো করেছিলেন, তা যেকোনো যুগে সমাজ ও রাষ্ট্রের বাড়াবাড়ির শিকার হওয়া মুমিনদের জন্য অব্যর্থ আশ্রয়।
ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে)-এর তাওয়াক্কুল ও সুরক্ষার দুআ:
সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি তাঁর রবের কাছে যে পরম নির্ভরতার দুআ করেছিলেন—
رَّبَّنَا عَلَيْكَ تَوَكَّلْنَا وَإِلَيْكَ أَنَبْنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلَّذِينَ كَفَرُوا وَاغْفِرْ لَنَا رَبَّنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
রব্বানা ‘আলাইকা তাওয়াক্কালনা ওয়া ইলাইকা আনাবনা ওয়া ইলাইকাল মাসীর। রব্বানা লা তাজ‘আলনা ফিতনাতাল লিল্লাযীনা কাফারূ ওয়াগফির লানা রব্বানা, ইন্নাকা আনতাল ‘আযীযুল হাকীম।হে আমাদের রব! আমরা কেবল আপনার ওপরই তাওয়াক্কুল (ভরসা) করেছি, আপনার দিকেই আমরা রুজু হয়েছি এবং আপনার কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন। হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে কাফিরদের জন্য পরীক্ষার পাত্র (নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তু) বানাবেন না এবং আমাদেরকে ক্ষমা করে দিন। হে আমাদের রব! নিশ্চয়ই আপনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (৬০:৪-৫)
আসহাবে কাহফের যুবকদের রহমত ও সঠিক পথের দুআ:
সমাজ ছেড়ে গুহায় আশ্রয় নেওয়ার সময় তারা কেবল রবের রহমত ও সঠিক ফয়সালা প্রার্থনা করেছিল—
رَبَّنَا آتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا
রব্বানা আ-তিনা মিল লাদুনকা রাহমাতাও ওয়া হাইয়্যি’ লানা মিন আমরিনা রাশাদা।যখন যুবকেরা গুহায় আশ্রয় নিল, তখন তারা বলল: হে আমাদের রব! আমাদেরকে আপনার পক্ষ থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের জন্য আমাদের কাজকে সঠিকভাবে পূর্ণ করার ব্যবস্থা করে দিন। (১৮:১০)
ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে)-এর প্রাসঙ্গিক দুআ ও তাসবিহ:
মিল্লাতে ইবরাহীমের এই তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থাকে নিজের জীবনে ধারণ করার জন্য ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে) নিজেই আল্লাহর কাছে যে দুআ ও তাসবিহগুলো পাঠ করেছিলেন, কুরআন তা সযত্নে সংরক্ষণ করেছে। এই দুআগুলো অনুধাবন করলে তাঁর একনিষ্ঠতার গভীরতা বোঝা যায়।
বংশধরদের জন্য আত্মসমর্পণের দুআ:
رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
রব্বানা ওয়াজ‘আলনা মুসলিমাইনি লাকা ওয়া মিন যুররিয়্যাতিনাউম্মাতাম মুসলিমাতাল লাকা ওয়া আরিনা মানাসিকানা ওয়া তুব ‘আলাইনা, ইন্নাকা আনতাত তাওয়্যাবুর রাহীম।
হে আমাদের রব! আমাদের উভয়কে আপনার একান্ত অনুগত (মুসলিম) করুন এবং আমাদের বংশধর হতে আপনার অনুগত এক উম্মত তৈরি করুন। আমাদেরকে আমাদের ইবাদতের নিয়ম-পদ্ধতি দেখিয়ে দিন এবং আমাদের ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।" (২:১২৮)
সালাত কায়েম রাখার দুআ:
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي ۚ رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ
রব্বিজ‘আলনী মুক্বীমাছ ছলাতি ওয়া মিন যুররিয়্যাতী, রব্বানা ওয়া তাক্বব্বাল দু‘আ।
(অর্থ): হে আমার রব! আমাকে সালাত কায়েমকারী বানান এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও। হে আমাদের রব! আর আমার দুআ কবুল করুন।" (১৪:৪০)
ক্ষমা প্রার্থনার সার্বজনীন দুআ:
رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ
রব্বানাগফির লী ওয়া লিওয়ালিদাইয়্যা ওয়া লিলমুমিনীনা ইয়াওমা ইয়াক্বূমুল হিসাব।হে আমাদের রব! যেদিন হিসাব কায়েম হবে, সেদিন আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং মুমিনদেরকে ক্ষমা করে দিন। (১৪:৪১)
শিরকমুক্ত সত্তার ঘোষণা ও তাসবিহ:
إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِي فَطَرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ حَنِيفًا ۖ وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِينَ
ইন্নী ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাযী ফাত্বারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বা হানীফাও ওয়া মা আনা মিনাল মুশরিকীন।নিশ্চয়ই আমি একনিষ্ঠভাবে আমার মুখমণ্ডল তাঁর দিকে ফিরাচ্ছি, যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।" (৬:৭৯)
যৌক্তিক পূর্ণতা (Logical completeness):
মিল্লাতে ইবরাহীম এবং আসহাবে কাহফের এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে এটি সুনিশ্চিতভাবে অনুধাবন করা যায় যে, তৌহিদ বা একত্ববাদ কেবল একটি তাত্ত্বিক বিশ্বাস নয়; এটি একটি সক্রিয় মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তব কর্মপন্থা।
যখন কোনো সমাজ তার নিজস্ব মনগড়া মতবাদ ও শিরকের কারণে হুদুদুল্লাহ (আল্লাহর সীমা) লঙ্ঘন করে বাড়াবাড়ি শুরু করে, তখন একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো আপস না করা। ইবরাহীম (সালামুন আলাইহে) এবং আসহাবে কাহফের যুবকেরা আমাদের শিখিয়েছেন—সত্যের ওপর অবিচল থাকার জন্য প্রয়োজনে পরিবার, পূর্বপুরুষের ভ্রান্ত ঐতিহ্য এবং পরিচিত সমাজব্যবস্থাকে ত্যাগ করতে হয়। এই ত্যাগ বা হিজরতের কারণেই আল্লাহ মুমিনদের হৃদয়কে সুদৃঢ় (রাবাতনা আলা কুলুবিহিম) করে দেন এবং তাদের জন্য এমন এক ঐশ্বরিক রহমতের দরজা খুলে দেন, যা জাগতিক সমীকরণের ঊর্ধ্বে। এটিই হলো মিল্লাতে ইবরাহীমের শাশ্বত উত্তরাধিকার।