ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র তথা দেশের নিরাপত্তা-বিপর্যয় থেকে সুরক্ষাকল্পে ও দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনায় কুরআনি দুআ-দরখাস্ত-আবেদন: (safety-security-country-town-city)

দেশ-শহর-গ্রাম কিংবা জনপদের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য আল কোরআনে নবী সালামুন আলা ইবরাহীম -এর করা দুআগুলো বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে। 

১. জনপদের নিরাপত্তা ও রিযিকের প্রাচুর্যের জন্য:

এটি কোনো দেশ বা শহরের সার্বিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য শ্রেষ্ঠ দুআ।
رَبِّ اجْعَلْ هَٰذَا بَلَدًا آمِنًا وَارْزُقْ أَهْلَهُ مِنَ الثَّمَرَاتِ

রব্বিজ-আল হা-যা বালাদান আ-মিনাও ওয়ারযুক আহলাহু মিনাছ ছামারা-ত।

অর্থ: হে আমার রব! আপনি একে (শহরকে) একটি নিরাপদ শহর বানিয়ে দিন এবং এর অধিবাসীদেরকে ফলমূল দিয়ে রিযিক দান করুন। (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১২৬)

২. শান্তি রক্ষা ও ঈমানি পরিবেশের জন্য:

এই দুআটিতেও নিরাপত্তার পাশাপাশি ঈমানের ওপর অটল থাকার প্রার্থনা করা হয়েছে।

رَبِّ اجْعَلْ هَٰذَا الْبَلَدَ آمِنًا وَاجْنُبْنِي وَبَنِيَّ أَن نَّعْبُدَ الْأَصْنَامَ

রব্বিজ-আল হা-যাল বালাদা আ-মিনাও ওয়াজ-নুবনী ওয়া বানিয়্যা আন না’বুদাল আসনা-ম।

অর্থ: “হে আমার রব! এই শহরকে শান্তিময় করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখুন।” (সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৩৫)

৩. কোনো জনপদে বা স্থানে নিরাপদে বসবাসের দুআ/  যেকোনো জনপদে বরকতময় বসবাসের জন্য:

যখন কেউ নতুন কোনো শহর বা এলাকায় বসবাস শুরু করে, তখন এই দুআটি পড়া খুব কার্যকর।

رَّبِّ أَنزِلْنِي مُنزَلًا مُّبَارَكًا وَأَنتَ خَيْرُ الْمُنزِلِينَ

রব্বি আনযিলনী মুনযালান মুবা-রকাওঁ ওয়া আনতা খয়রুল মুনযিলীন।

অর্থ: হে আমার রব! আমাকে কল্যাণময় স্থানে অবতরণ করান (বসবাস করান); আর আপনিই শ্রেষ্ঠ অবতরণকারী। (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত: ২৯)


৪. শহর বা জনপদকে ধ্বংস ও বিপর্যয় থেকে রক্ষার জন্য সাধারণ দুআ:

কুরআনে বিভিন্ন জাতি বা জনপদের ওপর আযাব আসার কথা বলা হয়েছে। কোনো জনপদের শান্তি ও ঈমানি পরিবেশ রক্ষার জন্য এই প্রার্থনা করা যায়:

عَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْنَا رَبَّنَا لَا تَجْعَلْنَا فِتْنَةً لِّلْقَوْمِ الظَّالِمِينَ  وَنَجِّنَا بِرَحْمَتِكَ مِنَ الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ

আলা-ল্লাহি তাওয়াক্কালনা। রব্বানা লা- তাজ‘আলনা ফিতনাতাল্ লিল্ ক্বওমিয্ যালিমীন। ওয়া নাজ্জিনা বিরাহমাতিকা মিনাল্ ক্বওমিল্ কাফিরীন

অর্থ: আমরা আল্লাহ্‌র উপরই নির্ভর করলাম। হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে জালিম জনগোষ্ঠীর জন্য পরীক্ষার বস্তু বানাবেন না।  আর আমাদেরকে আপনার রহমতের মাধ্যমে কাফির জনগোষ্ঠী থেকে মুক্তি দিন- আল-কুরআন: ইউনুস, আয়াত ১০:৮৫-৮৬

5. জনপদে বিশৃঙ্খলা ও ফিতনা দমনের জন্য/ ফিতনা থেকে সুরক্ষার দুআ:

নবী সালামুন আলা লুত তাঁর কওম বা জনপদের সীমালঙ্ঘন ও বিশৃঙ্খলা থেকে বাঁচার জন্য এই দুআটি করেছিলেন। বর্তমান সময়ে কোনো এলাকায় সামাজিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে এটি পড়া যায়।

رَبِّ انصُرْنِي عَلَى الْقَوْمِ الْمُفْسِدِينَ

রব্বিন-সুরনী ‘আলাল ক্বওমিল মুফসিদীন।

অর্থ: হে আমার রব! বিপর্যয় সৃষ্টিকারী (বিশৃঙ্খলাকারী) সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করুন। (সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত: ৩০)

৫. জালিমদের কবল থেকে শহর ও জনপদের মুক্তির দুআ/  যুলুম ও অত্যাচার থেকে জনপদের মুক্তির দুআ:

আল-কুরআনে অসহায় নারী-পুরুষদের একটি দুআ বর্ণিত হয়েছে, যারা কোনো জনপদে নির্যাতিত হচ্ছিল। কোনো শহর বা দেশ যদি যুলুমের শিকার হয়, তবে এই দুআটি করা অত্যন্ত কার্যকর।

رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَٰذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ وَلِيًّا وَاجْعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ نَصِيرًا

রব্বানা- আখরিজনা- মিন হা-যিহিল ক্বোরইয়াতিয যা-লিমি আহলুহা-, ওয়াজ-আল লানা- মিল্লাদুনকা ওয়ালিইয়্যাঁও ওয়াজ-আল লানা- মিল্লাদুনকা নাছীরা-।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের এই জনপদ থেকে মুক্তি দিন, যার অধিবাসীরা জালিম; এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন অভিভাবক নির্ধারণ করুন এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন সাহায্যকারী নিযুক্ত করুন। (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৭৫)


৬. কঠিন পরিস্থিতিতে সঠিক পথ ও আশ্রয়ের জন্য দুআ:

আসহাবে কাহাফ বা গুহাবাসীরা যখন তাদের জনপদ থেকে পালিয়ে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন তারা আল্লাহর কাছে এই দুআটি করেছিলেন। কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে নিজের এলাকা বা দেশের সঠিক পথপ্রাপ্তির জন্য এটি পড়া যায়।

رَبَّنَا آتِنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً وَهَيِّئْ لَنَا مِنْ أَمْرِنَا رَشَدًا

রব্বানা- আ-তিনা- মিল্লাদুনকা রহমাতাঁও ওয়াহাইয়্যি’ লানা- মিন আমরিনা- রশাদা-।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের আপনার পক্ষ থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের এই অবস্থাকে (বা জনপদের বিষয়াদিকে) সঠিক পথে পরিচালনার ব্যবস্থা করুন।
(সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ১০)


৭. দেশ ও দুনিয়ার সার্বিক কল্যাণের দুআ

এটি কুরআনের সবচেয়ে ব্যাপক দুআ। একটি দেশের শান্তি, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি—সবই এই 'কল্যাণ' বা 'হাসানাহ' শব্দের অন্তর্ভুক্ত।

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

রব্বানা- আ-তিনা- ফিদ্দুনইয়া- হাসানাতাঁও ওয়া ফিল আ-খিরতি হাসানাতাঁও ওয়াক্বিনা- ‘আযা-বান না-র।

অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন আর আমাদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।
(সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২০১)

৮. জনপদকে ভয় ও ক্ষুধা থেকে মুক্ত রাখার জন্য কুরআনী ইঙ্গিত

সূরা কুরাইশে আল্লাহ শহরবাসীদের জন্য দুটি নিয়ামতের কথা বলেছেন যা নিরাপত্তার মূল ভিত্তি:
১. ক্ষুধা থেকে মুক্তি (খাদ্য নিরাপত্তা)
২. ভয় থেকে মুক্তি (শারীরিক নিরাপত্তা)

আরবী (আয়াতের অংশ যা দুআ হিসেবে পড়া যায়):

الَّذِي أَطْعَمَهُم مِّن جُوعٍ وَآمَنَهُم مِّنْ خَوْفٍ

আল্লাযী আত্ব-‘আমাহুম মিন জূ-ইঁও ওয়া আ-মানাহুম মিন খওফ।

অর্থ: (সেই মহান রব) যিনি তাদেরকে ক্ষুধা থেকে মুক্তি দিয়ে অন্ন দান করেছেন এবং ভয়-ভীতি থেকে তাদেরকে নিরাপদ করেছেন। সূরা কুরাইশ, আয়াত: ৪)

৯. ক্ষমা ও রহমতের দুআ (যা জনপদে শান্তি ও নিরাপত্তা আনে)/এলাকার মানুষের জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমত ও ক্ষমা প্রার্থনায় :

رَّبِّ اغْفِرْ وَارْحَمْ وَأَنتَ خَيْرُ الرَّاحِمِينَ

রব্বিগ-ফির ওয়ারহাম ওয়া আনতা খয়রুর-রা-হিমীন।

অর্থ: হে আমার রব! ক্ষমা করুন ও রহম করুন; আর আপনিই সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত: 23:118)

সবগুলো দুআ একনজরে:

১. নিরাপদ শহর ও রিযিকের জন্য: সূরা বাকারাহ- ১২৬

২. শান্তি ও ঈমান রক্ষার জন্য: সূরা ইবরাহীম- ৩৫

৩. উত্তম ও বরকতময় বাসস্থানের জন্য: সূরা মুমিনুন- ২৯

৪. বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের দমনে: সূরা আনকাবুত- ৩০

৫. যুলুম থেকে মুক্তির জন্য: সূরা নিসা- ৭৫

৬. রহমত ও সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য: সূরা কাহাফ- ১০

৭. দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণে: সূরা বাকারাহ- ২০১

৮. ক্ষুধা ও ভয় থেকে মুক্তির স্মরণে: সূরা কুরাইশ- ৪

৯. সার্বিক রহমত ও ক্ষমার জন্য: সূরা মুমিনুন- ১১৮

সারসংক্ষেপ:
আপনার শহর বা দেশের নিরাপত্তার জন্য প্রথম দুআটি (সূরা আল-বাকারাহ: 2:126) সবচেয়ে বেশি উপযোগী।  আমরা আমাদের মাতৃভূমি বা বর্তমান আবাসস্থলের জন্য এই কুরআনী দুআগুলো করতে পারি।


Post a Comment (0)
Previous Post Next Post