যখন দুজন প্রার্থীই ভালো এবং ঈমানদার হন, তখন বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে কুরআনের মানদণ্ড কী হবে? (vote-election-selection-recommendation-support) episode-2

প্রশ্ন: যখন দুজন প্রার্থীই ভালো এবং ঈমানদার হন, তখন কুরআনের মানদণ্ড কী হবে, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

১. মৌলিক মানদণ্ড: শক্তি/যোগ্যতা (আল-কাভি) এবং বিশ্বস্ততা (আল-আমিন):

কুরআনে নেতৃত্ব বা দায়িত্ব অর্পণের ক্ষেত্রে দুটি গুণকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে। এই দুটির সমন্বয় যেখানে প্রবল, তিনিই অগ্রাধিকার পাবেন।

দলিল: সালামুন আলা মুসা-এর ঘটনায় আমরা একটি শাশ্বত নীতি পাই। যখন সালামুন আলা মুসা মাদায়েনে আশ্রয় নিলেন, তখন একজন নারী তাঁর পিতার কাছে মুসা-এর জন্য সুপারিশ করেছিলেন।
আল্লাহ বলেন:

“তাদের একজন বলল, ‘হে আমার পিতা, আপনি একে মজুর নিযুক্ত করুন। নিশ্চয়ই আপনার মজুর হিসেবে সেই উত্তম হবে, যে শক্তিশালী (আল-কাভি) এবং বিশ্বস্ত (আল-আমিন)’।” [সূরা আল-কাসাস ২৮:২৬]

তাদাব্বুর ও বিশ্লেষণ:

এখানে দুটি শব্দ ব্যবহার হয়েছে—‘আল-কাভি’ (শক্তিশালী/দক্ষ/সক্ষম) এবং ‘আল-আমিন’ (বিশ্বস্ত/ঈমানদার/আমানতদার)।

আপনার প্রশ্নে বলা হয়েছে দুজনই ‘ঈমানদার’ (অর্থাৎ ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ততার গুণ তাদের আছে)। এখন ‘কুরআনি সিমেট্রি’ বা সামঞ্জস্যের নীতি অনুযায়ী, যখন ‘আমানত’ বা ‘ঈমান’ উভয় পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান থাকে, তখন টাই-ব্রেকার বা নির্ণায়ক হবে ‘আল-কাভি’ বা সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য ‘সক্ষমতা ও দক্ষতা’

সুতরাং, যিনি রাষ্ট্র পরিচালনা বা সংশ্লিষ্ট পদের দায়িত্ব পালনে অধিকতর দক্ষ, সাহসী এবং প্রজ্ঞাবান, তাকেই বেছে নেওয়া কুরআনের নির্দেশ।

২. বিশেষায়িত জ্ঞান (আল-ইলাম) এবং সংরক্ষণকারী (আল-হাফিজ):

নেতৃত্বের জন্য কেবল ব্যক্তিগত পরহেজগারি যথেষ্ট নয়, বরং ওই নির্দিষ্ট পদের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান থাকাও জরুরি।

দলিল: সালামুন আলা ইউসুফ যখন মিশরের রাজকোষ বা সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব চাইলেন, তখন তিনি নিজের দুটি গুণের কথা উল্লেখ করেছিলেন।

তিনি বললেন:

আমাকে দেশের ধন-ভাণ্ডারের ওপর কর্তৃত্ব প্রদান করুন; নিশ্চয়ই আমি হেফাজতকারী (হাফিজুন) ও  সুবিজ্ঞ (আলিম)। [সূরা ইউসুফ ১২:৫৫]

তাদাব্বুর ও বিশ্লেষণ:

এখানে সালামুন আলা ইউসুফ নিজেকে ‘হাফিজ’ (যে আমানত রক্ষা করে) এবং ‘আলিম’ (যে ওই বিষয়ে জ্ঞান রাখে) হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।

যদি দুজন প্রার্থীই ঈমানদার (হাফিজ/আমানতদার) হন, তবে দেখতে হবে কার ‘ইলম’ বা ‘প্রশাসনিক জ্ঞান’ এবং ‘অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা’ বেশি। কুরআনের আলোকে, যে প্রার্থীর সংশ্লিষ্ট বিষয়ে (যেমন আইন প্রণয়ন, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি) জ্ঞান বা ‘ইলম’ বেশি, তিনিই এই পদের জন্য ‘ঈমানের দাবি’ পূরণে বেশি সক্ষম। কারণ, অজ্ঞ ব্যক্তি যত বড় আবেদই হোন না কেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারেন।

৩. জ্ঞান ও শারীরিক সক্ষমতার প্রাচুর্য:

নেতৃত্ব নির্বাচনে আল্লাহ তায়ালা আরেকটি মানদণ্ড ঠিক করে দিয়েছেন, যা বনী ইসরাঈলের তালুত (সাউল)-এর নেতৃত্বের ঘটনায় স্পষ্ট হয়। লোকেরা যখন তালুতের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলল, তখন নবী তাদের উত্তর দিয়েছিলেন।

দলিল:
“তাদের নবী তাদের বললেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাকে (তালুতকে) তোমাদের জন্য রাজা হিসেবে পাঠিয়েছেন।’... তিনি বললেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাকে তোমাদের উপর নির্বাচিত করেছেন এবং তাকে জ্ঞানে (ফিল ইলমি)দেহে (ওয়াল জিসমি) প্রাচুর্য দান করেছেন’।” [সূরা আল-বাকারা ২:২৪৭]

তাদাব্বুর ও বিশ্লেষণ:
এখানে আল্লাহ তায়ালা নির্বাচনের মাপকাঠি হিসেবে ‘অর্থ-সম্পদ’ বা ‘বংশমর্যাদা’ দেখেননি, দেখেছেন—
ক. জ্ঞানের গভীরতা (Ilm)

খ. শারীরিক বা কাঠামোগত সক্ষমতা (Jism/Execution Power)

সুতরাং, দুই ঈমানদারের মধ্যে যার ‘জ্ঞান’ এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ‘শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা’ (Capacity to execute) বেশি, তাকে ভোট দেওয়া কুরআনের মানদণ্ডে সঠিক সিদ্ধান্ত।

৪. আমানত উপযুক্ত পাত্রে অর্পণ করা:

ভোট দেওয়া মানে হলো আপনি একজনকে প্রতিনিধি হিসেবে ‘উকিল’ বা দায়িত্বশীল বানাচ্ছেন। এটি একটি আমানত।

দলিল:

“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও। আর যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে, তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে।” [সূরা আন-নিসা ৪:৫৮]

লিঙ্ক ও সংযোগ:

আমানতের হকদার কে? যে ওই আমানত রক্ষা করতে জানে। কুরআনের শব্দগত সামঞ্জস্যতায়, ‘আমানত’ রক্ষা করার জন্য ‘তাকওয়া’ (আল্লাহর ভয়) এবং ‘কুওয়াহ’ (শক্তি) উভয়ই প্রয়োজন। যে প্রার্থী ঈমানে অগ্রগামী হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্র বা সমাজ পরিচালনার জটিলতা বোঝেন এবং ন্যায়বিচার (Adl) প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম, তিনিই এই আমানতের প্রকৃত হকদার।

৫. ‘আহসান’ বা সর্বোত্তমকে অনুসরণ করা:

কুরআন মুমিনদের নির্দেশ দেয় সর্বদা ‘উত্তম’ বা ‘শ্রেষ্ঠ’ বিকল্পটি গ্রহণ করতে।

দলিল:
“আর তোমরা অনুসরণ করো সেই উত্তম (আহসানা) বিষয়, যা তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি নাজিল করা হয়েছে...” [সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৫]

“যারা মনোযোগ দিয়ে কথা শোনে এবং তার মধ্যে যা উত্তম (আহসানাহু) তার অনুসরণ করে...” [সূরা আয-যুমার ৩৯:১৮]

সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি:

যদি দুজনই ভালো হন, তবে কে ‘বেশি ভালো’ (আহসান)? কে পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী ‘আহসান’ বা সর্বোত্তম সেবা দিতে পারবেন?

ঈমানে অগ্রগামী হওয়ার অর্থ কেবল নামাজ-রোজা বেশি করা নয়; কুরআনের ভাষায় ঈমানের একটি বড় অংশ হলো ‘ওয়াদা রক্ষা করা’ এবং ‘দায়িত্ব পূর্ণ করা’।

“আর যারা তাদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে।” [সূরা আল-মুমিনুন ২৩:৮]

যে প্রার্থী জনগনের অধিকার আদায়ে এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষায় অধিকতর ‘সক্ষম’ ও ‘আন্তরিক’, কুরআনের দৃষ্টিতে সেই কর্মক্ষেত্রে ঈমানের পরীক্ষায় অগ্রগামী।

সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

কুরআনের আয়াতগুলোর পারস্পরিক সংযোগ (Inter-textuality) বিশ্লেষণ করলে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই:

১. উভয় প্রার্থী ঈমানদার হলে: প্রাথমিক শর্ত পূরণ হয়েছে (তারা ‘আল-আমিন’)।

২. এখন দেখতে হবে ‘আল-কাভি’ (শক্তিশালী/দক্ষ) কে: রাষ্ট্র বা সমাজ পরিচালনার জন্য কার দক্ষতা, জ্ঞান (ইলম) এবং প্রজ্ঞা বেশি।

৩. ঈমানে অগ্রগামীতার প্রকৃত অর্থ: কর্মক্ষেত্রে ঈমানে অগ্রগামী তিনিই, যিনি আল্লাহর আইন ও ন্যায়বিচার (Adl) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আপোষহীন এবং যার সেই আইন প্রয়োগের ‘জ্ঞান’ ও ‘ক্ষমতা’ আছে। একজন খুব পরহেজগার কিন্তু দুর্বল শাসক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না, ফলে সমাজে ‘ফিতনা’ সৃষ্টি হতে পারে।

অতএব, আপনি তাকেই ভোট দেবেন যিনি—
ঈমানদার (বিশ্বস্ত) + অধিকতর যোগ্য (জ্ঞান ও সক্ষমতায় অগ্রগামী)।

আল্লাহর কাছে সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য দুআ:

সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আল্লাহর সাহায্য চাওয়ার জন্য সালামুন আলা মুসা-এর এই দুআটি পাঠ করতে পারেন, যাতে আল্লাহ আপনার বক্ষ প্রশস্থ করে দেন এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়:

আরবী উচ্চারণ: “রাব্বিশ রাহলি সদরি, ওয়া ইয়াসসির লি আমরি, ওয়াহলুল ‘উকদাতাম মিল লিসানি, ইয়াফকাহু কওলি।”

অর্থ: “হে আমার রব! আমার বক্ষ প্রশস্ত করে দিন। এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। এবং আমার জিহবার জড়তা দূর করে দিন। যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।” [সূরা ত্ব-হা ২০:২৫-২৮]

এবং সালামুন আলা মুহাম্মাদ-কে শেখানো এই দুআটিও পাঠ করতে পারেন:

আরবী উচ্চারণ: রাব্বি আদখিলনি মুদখালা সিদকিউঁ ওয়া আখরিজনি মুখরাজা সিদকিউঁ, ওয়াজ‘আল লি মিল্লাদুনকা সুলতানান নাসিরা।”

অর্থ:
হে আমার রব! আমাকে প্রবেশ করাও সত্যের সাথে এবং আমাকে বের করো সত্যের সাথে। আর তোমার পক্ষ থেকে আমাকে দান করো সাহায্যকারী শক্তি (কর্তৃত্ব)।” [সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৮০]

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post