উক্ত জিজ্ঞাসিত বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীর চিন্তাশীলতার দাবি রাখে। সূরা আল-মায়িদাহ এর ৬৭ নং আয়াতের প্রেক্ষাপটে আল্লাহর নাযিলকৃত ওহী বা নির্দেশনা সালামুন আলা মুহাম্মাদ সম্পূর্ণরূপে এই কুরআনের মাধ্যমেই পৌঁছে দিয়েছেন কি না—তা আমরা কেবল কোরআন ‘তাদাব্বুর’ এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করব।
▓ নাযিলকৃত সবকিছুই কি কুরআনে বিদ্যমান? একটি কুরআনিক অনুসন্ধান:
১. ‘যা নাযিল হয়েছে’ তার পরিচয় কী?
“...আর আমার নিকট এই ‘কুরআন’ ওহী করা হয়েছে (উহিই-য়া ইলাইয়া হাজাল কুরআন), যেন এর দ্বারা আমি তোমাদেরকে এবং যাদের নিকট এটা পৌঁছাবে তাদেরকে সতর্ক করি...”
২. কুরআন কি পূর্ণাঙ্গ নাকি অসম্পূর্ণ?
“(বলো) তবে কি আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বিচারক (হাকামান) অনুসন্ধান করব? অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি এই কিতাবকে বিস্তারিত ও বিশদভাবে (মুফাসসালান) নাযিল করেছেন!...”
৩. সবকিছু স্পষ্ট করার দাবী (তিবইয়ানান লি-কুল্লি শাইয়িন):
“...আর আমি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি যা প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা (তিবইয়ানান লি-কুল্লি শাইয়িন), পথনির্দেশ, দয়া ও আত্মসমর্পণকারীদের জন্য সুসংবাদ।”
“...এটা (কুরআন) কোনো বানানো গল্প নয়, বরং এটা তাদের পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যয়নকারী এবং প্রতিটি বিষয়ের সবিস্তার ব্যাখ্যা (তাফসিলা কুল্লি শাইয়িন), হেদায়াত ও রহমত মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য।”
৪. কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দেয়া হয়নি:
“...আমি কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দেইনি (মা ফাররাতনা ফিল কিতাবি মিন শাই)...”
৫. রসূলের কাজ ছিল কেবল ওহীর অনুসরণ:
“বলো: আমি রসূলদের মধ্যে নতুন নই; আমি জানি না আমার সাথে কী করা হবে এবং তোমাদের সাথে কী করা হবে। আমি কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহী করা হয় (মা-ইউহা ইলাইয়া)...”
সেই অকাট্য দলিল: “অন্য কোনো কুরআন নিয়ে এসো অথবা এটি পরিবর্তন করো”
মক্কার মুশরিকরা সালামুন আলা মুহাম্মাদ-এর কাছে দাবি করেছিল যে, এই কুরআন তাদের মনপুত নয়, তাই তিনি যেন অন্য কোনো বিধান আনেন অথবা এই কুরআনের বিধানগুলো পরিবর্তন করেন। এর জবাবে আল্লাহ তায়ালা রসূলকে দিয়ে যে ঘোষণাটি দেওয়ালেন, তা ‘ওহীয়ে গাইরে মাতলু’র কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়।
সূরা ইউনুস (১০:১৫)
“আর যখন তাদের কাছে আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় (তুতলা আ’লাইহিম), তখন যারা আমার সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না তারা বলে, ‘এটি ছাড়া অন্য কোনো কুরআন নিয়ে এসো (ইতি বি-কুরআনিন গাইরি হাজা) অথবা একে পরিবর্তন করে দাও (আও বাদ্দিলহু)’।
(হে রসূল!) তুমি বলে দাও: ‘নিজ পক্ষ থেকে এর কোনো পরিবর্তন করার অধিকার আমার নেই। আমি তো কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহী করা হয় (ইন আত্তাবিউ ইল্লা মা-ইউহা ইলাইয়া)। নিশ্চয় আমি যদি আমার রবের অবাধ্যতা করি, তবে আমি মহাদিবসের আজাবের ভয় করি’।”
“আর তুমি যখন তাদের কাছে কোনো আয়াত (নিদর্শন) না আন, তখন তারা বলে, ‘তুমি নিজেই তা বানিয়ে আনলে না কেন?’ বলো, ‘আমি তো কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার রবের পক্ষ থেকে আমার প্রতি ওহী করা হয়।...”
৬. দ্বীনের পূর্ণতা ও বিদায়ী ঘোষণা:
“...আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম (আকমালতু) এবং তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম...”
তেলাওয়াত বা পাঠ করার নির্দেশ: ওহী কেবল পঠিত (Matlu):
‘গাইরে মাতলু’ শব্দের অর্থ হলো ‘যা পাঠ করা হয় না’। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা সালামুন আলা মুহাম্মাদ-কে নির্দেশ দিয়েছেন যে, ওহী হিসেবে যা নাযিল হয়েছে, তা যেন তিনি ‘তেলাওয়াত’ বা পাঠ করেন। যা পাঠ করা হয়, তা কখনো ‘গাইরে মাতলু’ হতে পারে না।
সূরা আল-আনকাবুত (২৯:৪৫)
“তোমার প্রতি কিতাব থেকে যা ওহী করা হয়েছে তা তেলাওয়াত করো (উতলু মা-উহিই-য়া ইলাইকা মিনাল কিতাব)...” সূরা আল-কাহফ (১৮:২৭)
“আর তোমার রবের কিতাব থেকে যা তোমার প্রতি ওহী করা হয়েছে তা তেলাওয়াত করো (ওয়াতলু মা-উহিই-য়া ইলাইকা মিন কিতাবি রাব্বিকা); তাঁর কথার পরিবর্তনকারী কেউ নেই...”
শব্দগত সামঞ্জস্য (Symmetry): লক্ষ্য করুন, উভয় আয়াতে ‘মা-উহিই-য়া’ (যা ওহী করা হয়েছে) এর সাথে ‘উতলু’ (তেলাওয়াত করো) শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত ওহী আবশ্যিকভাবেই ‘পঠিত’ (Matlu)। ওহী কখনোই ‘অপঠিত’ (Ghair Matlu) হতে পারে না; এটি কুরআনের পরিভাষার সাথে সাংঘর্ষিক (Contradictory)।
▓ রসূলের নিজস্ব কথা ওহী নয়: প্রমাণ-
যদি কেউ দাবি করে যে, রসূলের সব কথাই ওহী (হোক তা কুরআন বা কুরআনের বাইরের কথা), তবে সূরা আল-হাক্বক্বাহ’র আয়াতগুলো সেই দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করে।
সূরা আল-হাক্বক্বাহ (৬৯:৪৪-৪৬):
“সে (রসূল) যদি আমার নামে কোনো কথা (যা ওহী নয়) নিজে রচনা করে চালাত, তবে আমি অবশ্যই তার ডান হাত পাকড়াও করতাম। এবং এরপর আমি তার জীবন-ধমনী কেটে দিতাম।”
লজিক্যাল আর্গুমেন্ট: আল্লাহ এখানে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছেন যে, রসূল ওহীর (কুরআনের) বাইরে নিজের পক্ষ থেকে আল্লাহর নামে কিছু বললে তাঁকে শাস্তি দেওয়া হতো। সালামুন আলা মুহাম্মাদ কখনো তা করেননি। তিনি কেবল কুরআনের ওহীই পৌঁছেছেন। সুতরাং, কুরআনের বাইরে অন্য কিছুকে ‘ওহী’ বলে চালিয়ে দেওয়া, আল্লাহর এই সতর্কবাণীর বিপরীতে দাঁড়ানোর শামিল।
