নাযিলকৃত সবকিছুই কি কুরআনে বিদ্যমান? আল্লাহ রসূল সালামুন আলা মুহাম্মদের নিজস্ব কথা ওহী নয়? -একটি কুরআনিক অনুসন্ধান (5:67,৬৯:৪৪-৪৬)

উক্ত জিজ্ঞাসিত বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীর চিন্তাশীলতার দাবি রাখে। সূরা আল-মায়িদাহ এর ৬৭ নং আয়াতের প্রেক্ষাপটে  আল্লাহর নাযিলকৃত ওহী বা নির্দেশনা সালামুন আলা মুহাম্মাদ সম্পূর্ণরূপে এই কুরআনের মাধ্যমেই পৌঁছে দিয়েছেন কি না—তা আমরা কেবল কোরআন ‘তাদাব্বুর’ এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করব।

নিচে আল-কুরআনের অকাট্য দলিলাদি, আয়াতের পারস্পরিক সংযোগ (Link) আলোকে বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

নাযিলকৃত সবকিছুই কি কুরআনে বিদ্যমান? একটি কুরআনিক অনুসন্ধান:

সূরা আল-মায়িদাহ (৫:৬৭) আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন:

“হে রসূল! তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমার ওপর যা নাযিল করা হয়েছে (মা উনজিলা ইলাইকা), তা পৌঁছে দাও।...”

কেউ কেউ বলে থাকে ওহী-এ গাইরে মাতলু ইত্যাদি আছে...।

এখন প্রশ্ন হলো, এই ‘যা নাযিল করা হয়েছে’ তা কি কেবলই কুরআন, নাকি কুরআনের বাইরেও অন্য কিছু? এর উত্তর কুরআন নিজেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও গাণিতিক সামঞ্জস্যের সাথে প্রদান করেছে।

১. ‘যা নাযিল হয়েছে’ তার পরিচয় কী?

আল্লাহ তায়ালা সালামুন আলা মুহাম্মাদ-কে যে ‘বস্তু’ বা ‘বিষয়’ দিয়ে সতর্ক করার নির্দেশ দিয়েছেন, তার পরিচয় তিনি নিজেই সূরা আল-আন‘আমে দিয়েছেন।

সূরা আল-আন‘আম (৬:১৯)

“...আর আমার নিকট এই ‘কুরআন’ ওহী করা হয়েছে (উহিই-য়া ইলাইয়া হাজাল কুরআন), যেন এর দ্বারা আমি তোমাদেরকে এবং যাদের নিকট এটা পৌঁছাবে তাদেরকে সতর্ক করি...”

পর্যালোচনা ও লিঙ্ক: ৫:৬৭ তে বলা হয়েছে “যা নাযিল হয়েছে তা পৌঁছে দাও”, আর ৬:১৯ এ সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে “এই কুরআন আমার নিকট ওহী করা হয়েছে পৌঁছানোর/সতর্ক করার জন্য”। অর্থাৎ, সমীকরণের সহজ সমাধান হলো: যা নাযিল হয়েছে = ওহী = আল-কুরআন।

২. কুরআন কি পূর্ণাঙ্গ নাকি অসম্পূর্ণ?

যদি দাবী করা হয় যে, রসূল কুরআনের বাইরেও দ্বীনের আবশ্যিক কোনো বিধান পৌঁছে দিয়েছেন, তবে তা কুরআনের ‘পূর্ণাঙ্গতা’ বা ‘কামালিয়াত’ এর দাবীকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অথচ কুরআন নিজেকে ‘মুফাসসাল’ বা বিশদভাবে বর্ণিত কিতাব হিসেবে পরিচয় দিয়েছে।

সূরা আল-আন‘আম (৬:১১৪)

“(বলো) তবে কি আমি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বিচারক (হাকামান) অনুসন্ধান করব? অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি এই কিতাবকে বিস্তারিত ও বিশদভাবে (মুফাসসালান) নাযিল করেছেন!...”

তাদাব্বুর: এখানে আল্লাহ চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। বিচারক বা ফয়সালাকারী হিসেবে একমাত্র আল্লাহ এবং তাঁর নাযিলকৃত ‘মুফাসসাল’ (বিস্তারিত) কিতাবই যথেষ্ট। যদি কুরআনে সবকিছু না থাকত, তবে আল্লাহ একে ‘মুফাসসালান’ বলতেন না।

৩. সবকিছু স্পষ্ট করার দাবী (তিবইয়ানান লি-কুল্লি শাইয়িন):

আল্লাহ তায়ালা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, এই কিতাবে সবকিছুর ব্যাখ্যা রয়েছে।

সূরা আন-নাহল (১৬:৮৯)

“...আর আমি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি যা প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা (তিবইয়ানান লি-কুল্লি শাইয়িন), পথনির্দেশ, দয়া ও আত্মসমর্পণকারীদের জন্য সুসংবাদ।”

সূরা ইউসুফ (১২:১১১)

“...এটা (কুরআন) কোনো বানানো গল্প নয়, বরং এটা তাদের পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যয়নকারী এবং প্রতিটি বিষয়ের সবিস্তার ব্যাখ্যা (তাফসিলা কুল্লি শাইয়িন), হেদায়াত ও রহমত মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য।”

শব্দগত সামঞ্জস্যতা (Symmetry): লক্ষ্য করুন, আয়াতে ‘কুল্লি শাইয়িন’ (প্রতিটি বিষয়/সবকিছু) শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে। দ্বীনের প্রয়োজনে যা যা দরকার, তার সবকিছুর ‘তাফসির’ বা ব্যাখ্যা এই কুরআনেই পৌঁছে দেয়া হয়েছে। সালামুন আলা মুহাম্মাদ যদি কুরআনের বাইরে অতিরিক্ত কোনো বিধান দিতেন, তবে এই আয়াতগুলোর কার্যকারিতা (Validity) ক্ষুণ্ন হতো।

৪. কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দেয়া হয়নি:

সূরা আল-আন‘আম (৬:৩৮)

“...আমি কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দেইনি (মা ফাররাতনা ফিল কিতাবি মিন শাই)...”

বিশ্লেষণ: আল্লাহ যখন বলেন ‘কোনো কিছুই বাদ দেইনি’, তখন একজন মুমিনের পক্ষে এটা বিশ্বাস করা অসম্ভব যে, দ্বীনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অংশ কুরআনের বাইরে রয়ে গেছে। সালামun আলা মুহাম্মাদ যা পৌঁছে দিয়েছেন, তা এই ‘পরিপূর্ণ কিতাব’-এরই অন্তর্ভুক্ত।

৫. রসূলের কাজ ছিল কেবল ওহীর অনুসরণ:

সালামুন আলা মুহাম্মাদ নিজের পক্ষ থেকে কোনো কথা বা বিধান রচনা করতেন না। তিনি কেবল তাই অনুসরণ করতেন এবং পৌঁছাতেন, যা তাঁর প্রতি ওহী (কুরআন) করা হতো।

সূরা আল-আহক্বাফ (৪৬:৯)

“বলো: আমি রসূলদের মধ্যে নতুন নই; আমি জানি না আমার সাথে কী করা হবে এবং তোমাদের সাথে কী করা হবে। আমি কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহী করা হয় (মা-ইউহা ইলাইয়া)...”

সেই অকাট্য দলিল: “অন্য কোনো কুরআন নিয়ে এসো অথবা এটি পরিবর্তন করো”

মক্কার মুশরিকরা সালামুন আলা মুহাম্মাদ-এর কাছে দাবি করেছিল যে, এই কুরআন তাদের মনপুত নয়, তাই তিনি যেন অন্য কোনো বিধান আনেন অথবা এই কুরআনের বিধানগুলো পরিবর্তন করেন। এর জবাবে আল্লাহ তায়ালা রসূলকে দিয়ে যে ঘোষণাটি দেওয়ালেন, তা ‘ওহীয়ে গাইরে মাতলু’র কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়।

সূরা ইউনুস (১০:১৫)

“আর যখন তাদের কাছে আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় (তুতলা আ’লাইহিম), তখন যারা আমার সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না তারা বলে, ‘এটি ছাড়া অন্য কোনো কুরআন নিয়ে এসো (ইতি বি-কুরআনিন গাইরি হাজা) অথবা একে পরিবর্তন করে দাও (আও বাদ্দিলহু)’।

(হে রসূল!) তুমি বলে দাও: ‘নিজ পক্ষ থেকে এর কোনো পরিবর্তন করার অধিকার আমার নেই। আমি তো কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার প্রতি ওহী করা হয় (ইন আত্তাবিউ ইল্লা মা-ইউহা ইলাইয়া)। নিশ্চয় আমি যদি আমার রবের অবাধ্যতা করি, তবে আমি মহাদিবসের আজাবের ভয় করি’।”

সূরা আল-আ‘রাফ (৭:২০৩)

“আর তুমি যখন তাদের কাছে কোনো আয়াত (নিদর্শন) না আন, তখন তারা বলে, ‘তুমি নিজেই তা বানিয়ে আনলে না কেন?’ বলো, ‘আমি তো কেবল তারই অনুসরণ করি যা আমার রবের পক্ষ থেকে আমার প্রতি ওহী করা হয়।...”

সংযোগ (Link): ৫:৬৭ তে বলা হয়েছে “যা নাযিল হয়েছে তা পৌঁছে দাও”, আর ৭:২০৩ এ রসূল বলছেন “আমি কেবল নাযিলকৃত ওহীরই অনুসরণ করি”। সুতরাং, তিনি যা অনুসরণ করেছেন এবং যা পৌঁছে দিয়েছেন—তা এই কুরআনই।

৬. দ্বীনের পূর্ণতা ও বিদায়ী ঘোষণা:

সূরা আল-মায়িদাহ’র ৩ নং আয়াতে আল্লাহ দ্বীনকে পরিপূর্ণ করার ঘোষণা দিয়েছেন।

সূরা আল-মায়িদাহ (৫:৩)

“...আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম (আকমালতু) এবং তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম...”

তাদাব্বুর: দ্বীন পরিপূর্ণ হওয়ার অর্থ হলো, বিধানে আর কোনো সংযোজন বা বিয়োজনের সুযোগ নেই। এই পরিপূর্ণতার ঘোষণাটি এসেছে কুরআনের মাধ্যমেই। অর্থাৎ, সালামun আলা মুহাম্মাদ যখন বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন এই কুরআনের মাধ্যমেই দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়ে গিয়েছিলেন।

তেলাওয়াত বা পাঠ করার নির্দেশ: ওহী কেবল পঠিত (Matlu):

‘গাইরে মাতলু’ শব্দের অর্থ হলো ‘যা পাঠ করা হয় না’। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা সালামুন আলা মুহাম্মাদ-কে নির্দেশ দিয়েছেন যে, ওহী হিসেবে যা নাযিল হয়েছে, তা যেন তিনি ‘তেলাওয়াত’ বা পাঠ করেন। যা পাঠ করা হয়, তা কখনো ‘গাইরে মাতলু’ হতে পারে না।

 সূরা আল-আনকাবুত (২৯:৪৫)

“তোমার প্রতি কিতাব থেকে যা ওহী করা হয়েছে তা তেলাওয়াত করো (উতলু মা-উহিই-য়া ইলাইকা মিনাল কিতাব)...”  সূরা আল-কাহফ (১৮:২৭)

আর তোমার রবের কিতাব থেকে যা তোমার প্রতি ওহী করা হয়েছে তা তেলাওয়াত করো (ওয়াতলু মা-উহিই-য়া ইলাইকা মিন কিতাবি রাব্বিকা); তাঁর কথার পরিবর্তনকারী কেউ নেই...

শব্দগত সামঞ্জস্য (Symmetry): লক্ষ্য করুন, উভয় আয়াতে ‘মা-উহিই-য়া’ (যা ওহী করা হয়েছে) এর সাথে ‘উতলু’ (তেলাওয়াত করো) শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত ওহী আবশ্যিকভাবেই ‘পঠিত’ (Matlu)। ওহী কখনোই ‘অপঠিত’ (Ghair Matlu) হতে পারে না; এটি কুরআনের পরিভাষার সাথে সাংঘর্ষিক (Contradictory)।

▓ রসূলের নিজস্ব কথা ওহী নয়: প্রমাণ-

যদি কেউ দাবি করে যে, রসূলের সব কথাই ওহী (হোক তা কুরআন বা কুরআনের বাইরের কথা), তবে সূরা আল-হাক্বক্বাহ’র আয়াতগুলো সেই দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করে।

সূরা আল-হাক্বক্বাহ (৬৯:৪৪-৪৬):

সে (রসূল) যদি আমার নামে কোনো কথা (যা ওহী নয়) নিজে রচনা করে চালাত, তবে আমি অবশ্যই তার ডান হাত পাকড়াও করতাম। এবং এরপর আমি তার জীবন-ধমনী কেটে দিতাম।”

লজিক্যাল আর্গুমেন্ট: আল্লাহ এখানে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছেন যে, রসূল ওহীর (কুরআনের) বাইরে নিজের পক্ষ থেকে আল্লাহর নামে কিছু বললে তাঁকে শাস্তি দেওয়া হতো। সালামুন আলা মুহাম্মাদ কখনো তা করেননি। তিনি কেবল কুরআনের ওহীই পৌঁছেছেন। সুতরাং, কুরআনের বাইরে অন্য কিছুকে ‘ওহী’ বলে চালিয়ে দেওয়া, আল্লাহর এই সতর্কবাণীর বিপরীতে দাঁড়ানোর শামিল।

সিদ্ধান্ত ও সারসংক্ষেপ:

কুরআনের আয়াতগুলোর আন্তঃসম্পর্ক (Inter-textuality) বিশ্লেষণ করলে আমরা যে সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত পাই তা হলো:

১. আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা হলো ‘ওহী’ বা ‘কুরআন’ (৬:১৯)।

২. রসূলকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যা নাযিল হয়েছে তা পৌঁছে দিতে (৫:৬৭)।

৩. রসূল ঘোষণা দিয়েছেন তিনি কেবল ওহীরই অনুসরণ করেন (৪৬:৯, ৭:২০৩)।

৪. আল্লাহ দাবী করেছেন এই কিতাব বিস্তারিত (৬:১১৪) এবং এতে সবকিছুর ব্যাখ্যা আছে (১৬:৮৯)।

৫. কিতাবে কোনো কিছুই অসম্পূর্ণ রাখা হয়নি (৬:৩৮)।

অতএব,  সালামুন আলা মুহাম্মাদ তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বের অংশ হিসেবে দ্বীনের যাবতীয় বিধান ও নির্দেশনা হুবহু এবং সম্পূর্ণরূপে এই পবিত্র কুরআনের মাধ্যমেই মানবজাতির কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। কুরআনের বাইরে দ্বীনের আবশ্যিক কোনো উৎসের প্রয়োজনীয়তা কুরআন নিজেই নাকচ করে দেয়।


প্রাসঙ্গিক দুআ:

কুরআন অনুধাবন ও সঠিক জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য আল্লাহ তায়ালা সালামুন আলা  মুহাম্মাদ-কে যে দুআ শিখিয়েছেন, তা আমাদের জন্যও পাঠ করা বাঞ্ছনীয়:

উচ্চারণ: “রাব্বি যিদনি ইলমা”

অর্থ: “হে আমার প্রতিপালক! আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করে দিন।” (সূরা ত্বহা ২০:১১৪)

উচ্চারণ: “রাব্বানা লা-তুযিগ ক্বুলুবানা বা‘দা ইয হাদাইতানা, ওয়া হাবলানা মিল্লাদুনকা রাহমাহ; ইন্নাকা আনতাল-ওয়াহ্‌হাব।”

অর্থ: “হে আমাদের রব! সরল পথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে সত্যলংঘনে বক্র করবেন না এবং আপনার নিকট থেকে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান করুন। নিশ্চয়ই আপনিই দাতা।” (সূরা আল-ইমরান ৩:৮)

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post