কে কার সত্যিকারের বন্ধু-সহযোগী? পারস্পরিক সহযোগিতাও সম্মিলিত কল্যাণ: -কুরআন কী বলে? friendship-partner, supporter-relationship

 বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম

আল কুরআনের হেদায়েত অনুযায়ী জীবন পরিচালনার জন্য সঙ্গ বা বন্ধু নির্বাচন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পবিত্র কুরআনের ‘তাদাব্বুর’ (গভীর চিন্তা) করলে দেখা যায়, একজন মুমিনের বন্ধু বা সাথী কারা হবেন, তার সুস্পষ্ট রূপরেখা আল্লাহ তাআলা দিয়ে দিয়েছেন।

হ্যাঁ, মুমিনদের পারস্পরিক সহযোগিতা, সৎকাজে উদ্বুদ্ধ করা, ঐক্য ও কল্যাণমূলক দায়িত্ব নিয়ে কুরআনে আরও অনেক আয়াত আছে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত নিচে দিচ্ছি:

আল-কুরআনে “পারস্পরিক সহযোগিতা” ও সম্মিলিত কল্যাণ নিয়ে নির্বাচিত আয়াতসমূহ:

১. নেককাজে সহযোগিতা

“তোমরা নেককাজ ও তাকওয়ার বিষয়ে একে অপরকে সহযোগিতা করো; আর পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।”
— আল-কুরআন ৫:২


২. মুমিনরা একে অপরের সহায়ক

“মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী একে অপরের অভিভাবক/সহায়ক…”
— আল-কুরআন ৯:৭১


৩. কল্যাণে প্রতিযোগিতা

“তোমরা কল্যাণমূলক কাজে প্রতিযোগিতা করো।”
— আল-কুরআন ২:১৪৮


৪. সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ

“তারা পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় এবং ধৈর্যের উপদেশ দেয়।”
— আল-কুরআন ১০৩:৩


৫. ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ

“তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিভক্ত হয়ো না।”
— আল-কুরআন ৩:১০৩


৬. উত্তম কাজের আহ্বানকারী দল

“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে…”
— আল-কুরআন ৩:১০৪


৭. ন্যায় ও সদাচারের নির্দেশ

“নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার ও আত্মীয়কে দান করার নির্দেশ দেন…”
— আল-কুরআন ১৬:৯০


৮. অভাবগ্রস্তকে অগ্রাধিকার দেওয়া

“তারা নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যদেরকে অগ্রাধিকার দেয়…”
— আল-কুরআন ৫৯:৯


৯. সামাজিক দায়িত্বের চেতনা

“সৎকর্ম এ নয় যে তোমরা মুখ পূর্ব বা পশ্চিম দিকে ফেরাবে; বরং সৎকর্ম হলো… সম্পদ ব্যয় করা…”
— আল-কুরআন ২:১৭৭


১০. পারস্পরিক পরিচয় ও মানবিকতা

“আমি তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্র করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হও।”
— আল-কুরআন ৪৯:১৩


১১. বিরোধ মীমাংসায় ভূমিকা

“মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই; অতএব তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।”
— আল-কুরআন ৪৯:১০


১২. অভাবীকে সাহায্য

“তাদের সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতের অধিকার রয়েছে।”
— আল-কুরআন ৫১:১৯


১৩. খাদ্য দানের মহত্ত্ব

“তারা আল্লাহর ভালোবাসায় মিসকীন, এতিম ও বন্দীকে খাদ্য দান করে।”
— আল-কুরআন ৭৬:৮


১৪. পারস্পরিক পরামর্শ

“তাদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।”
— আল-কুরআন ৪২:৩৮


১৫. দুর্বলকে অবহেলা না করা

“আপনি কি তাকে দেখেছেন, যে দ্বীনকে মিথ্যা বলে? সে-ই তো এতিমকে ধাক্কা দেয় এবং মিসকীনকে খাদ্য দিতে উৎসাহিত করে না।”
— আল-কুরআন ১০৭:১–৩

এই আয়াতগুলো একত্রে দেখলে বোঝা যায়, ইসলামে ঈমান শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পারস্পরিক সহযোগিতা, ন্যায়, সহমর্মিতা ও সামাজিক কল্যাণও ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

১. মুমিনদের মধ্যকার সাথিত্ব:

Surah At-Tawbah 9:71

“মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী—এরা একে অপরের অলি (সহচর/সহযোগী)...”

ইস্তিনবাত:

  • সাথিত্ব = mutual responsibility
  • শুধু বন্ধুত্ব না, বরং নেক কাজে সহযোগিতা + মন্দ থেকে বিরত রাখা
আর তোমরা সকলে আল্লাহর রশিকে দৃঢ়ভাবে ধরো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা তোমাদের ওপর আল্লাহর নিয়ামতকে স্মরণ করো; যখন তোমরা ছিলে শত্রু। এরপর তিনিই তোমাদের হৃদয়ের মাঝে প্রেরণা সৃষ্টি করেছেন, ফলে তোমরা তাঁর অনুগ্রহে ভাইয়ে ভাইয়ে পরিণত হয়েছ-আয়াত ৩:১০৩

Surah Al-Ma’idah 5:55

“তোমাদের ওলি তো আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মুমিনগণ...”

ইস্তিনবাত:

  • সাথিত্বের hierarchy আছে
  • আল্লাহ → রাসূল → মুমিন

২. সৎ ও সত্যবাদীদের সাথেই থাকা

 Surah At-Tawbah 9:119

“হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাকো।”

 ইস্তিনবাত:

  • companionship based on sidq (truthfulness)
  • সত্যবাদী = reliable influence

Surah Al-Kahf 18:28

“তুমি নিজেকে তাদের সাথে স্থির রাখো যারা সকাল-সন্ধ্যা তাদের রবকে ডাকে...”

ইস্তিনবাত:

  • social status না, বরং আল্লাহকেন্দ্রিক মানুষ বেছে নিতে হবে

৩. খারাপ সাথীর ভয়াবহ পরিণতি

Surah Al-Furqan 25:27–29

“হায় আফসোস! আমি যদি অমুককে বন্ধু না বানাতাম... সে আমাকে পথভ্রষ্ট করেছে...”

ইস্তিনবাত:

  • friendship = guidance বা misguidance-এর বড় মাধ্যম

 Surah As-Saffat 37:51–57

(জান্নাতি ব্যক্তি বলবে) “আমার এক সাথী ছিল... সে (কুফরি পথে ডাকত)...”

ইস্তিনবাত:

  • দুনিয়ার বন্ধুত্ব আখিরাতে expose হবে

৪. অন্তরঙ্গ সাথী (بطانة) বিষয়ে সতর্কতা

Surah Aal-Imran 3:118

“হে মুমিনগণ! তোমাদের ছাড়া অন্য কাউকে বিতানাহ (অন্তরঙ্গ সাথী) বানিও না...”

ইস্তিনবাত:

  • inner circle ≠ সবাই
  • deep trust selective হওয়া জরুরি

৫. কাদেরকে ‘ওলি’ না বানাতে বলা হয়েছে

Surah Al-Ma’idah 5:51

“তোমরা ইয়াহূদী ও নাসারাদেরকে ওলি বানিও না...” (contextual—political/loyalty alliance)

ইস্তিনবাত (সতর্কভাবে বুঝতে হবে):

  • এটা সাধারণ বন্ধুত্ব না
  • বরং loyalty + alignment of دين/agenda

Surah Al-Mumtahanah 60:1

“আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে তোমরা বন্ধু বানিও না...”

ইস্তিনবাত:

  • যারা আল্লাহর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় → তাদের সাথে গভীর alliance না

৬. তাকওয়াভিত্তিক বন্ধুত্বই স্থায়ী

Surah Az-Zukhruf 43:67

“সেদিন বন্ধুরা একে অপরের শত্রু হবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।”

ইস্তিনবাত:

  • দুনিয়ার friendship temporary
  • taqwa-based friendship = eternal

৭. পরিবার বনাম ঈমান—priority

Surah At-Tawbah 9:23

“যদি তোমাদের পিতা-ভাই কুফরকে ঈমানের উপর প্রাধান্য দেয়, তাদেরকে ওলি বানিও না...”

ইস্তিনবাত:

  • emotional bond < iman priority

৮. আদর্শ সাথী (Prophetic model)

Surah Al-Kahf 18:17–18

(আসহাবে কাহফ—একসাথে ঈমান রক্ষা করেছে)

ইস্তিনবাত:

  • righteous companionship protects faith

সামগ্রিক ইস্তিনবাত (Deep Extraction)

সব আয়াত মিলিয়ে:

Ideal Companion:

  • মুমিন, মুত্তাকি
  • সত্যবাদী
  • আল্লাহকেন্দ্রিক
  • নেক কাজে সাহায্যকারী

❌ Dangerous Companion:

  • পথভ্রষ্টকারী
  • ঈমান দুর্বল করে
  • আল্লাহর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়
  • বাহ্যিকভাবে ভালো কিন্তু ভিতরে ক্ষতিকর

🔻 এক লাইনের শক্ত সারাংশ

“যে সাথী তোমাকে আল্লাহর দিকে নেয়, সে-ই কুরআনিক সাথী; আর যে দূরে সরায়, সে-ই প্রকৃত বিপদ।”


░ ▓▒░ একটু বিস্তারিত░▒▓ ░

সদেকীন বা সত্যবাদীদের সাথে থাকার নির্দেশ:

আল্লাহ তাআলা মুমিনদের আদেশ করেছেন তারা যেন নিজেদের পরিবেশ এবং সঙ্গ এমন ব্যক্তিদের সাথে নির্ধারণ করে যারা ‘সদক’ বা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। 

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং ‘সদেকীন’ বা সত্যবাদীদের সাথী হও (ওয়াকুনু মাআসসদিকীন)।” (সুরা আত-তাওবাহ ৯:১১৯)

এই আয়াতের ‘কাউন’ (كون) শব্দটির অর্থ শুধু পাশে বসা নয়, বরং তাদের সাথে একাত্ম হওয়া। এখানে ‘তাদাব্বুর’ করলে দেখা যায়, আল্লাহ ‘মুত্তাকীন’ (পরহেজগার) হওয়ার জন্য ‘সদেকীন’ (সত্যবাদী)-দের সঙ্গকে অপরিহার্য করেছেন। অর্থাৎ সত্যবাদীদের সংস্পর্শ ছাড়া তাকওয়া অর্জন ও বজায় রাখা অসম্ভব।

দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের প্রবেশদ্বার (প্রাথমিক শর্ত):

আল্লাহ তাআলা বন্ধুত্বের একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন যা শুরু হয় তাওবাহ এবং আমলের পরিবর্তনের মাধ্যমে। এমনকি যারা একসময় ইসলামের চরম শত্রু ছিল, তারাও যখন সঠিক পথে ফিরে আসে, তখন তাদের সাথে সম্পর্কের ধরণ বদলে যায়:

“অতঃপর তারা যদি তাওবাহ করে, সালাত (একমাত্র নাযিলকৃত অহীর সংযোগে ইবাদত) কায়েম করে এবং জাকাত  প্রদান করে, তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই (إِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ)। আর আমি জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আয়াতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি।” (সুরা আত-তাওবাহ ৯:১১)

➤ এখানে লক্ষ্যণীয় যে, আল্লাহ ‘দ্বীনি ভাই’ হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত দিয়েছেন— তাওবাহ, সালাত ও জাকাত (সাদাকা প্রদানপূর্বক পরিশুদ্ধতা লাভ করে)। এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, মুমিনের সত্যিকারের আত্মীয়তা বা বন্ধুত্ব রক্তের সম্পর্কের চেয়েও ‘আকিদাহ’ বা বিশ্বাসের ওপর বেশি নির্ভরশীল। যারা এই গুণের অধিকারী, তারাই আপনার প্রথম স্তরের বন্ধু বা ‘ইখওয়ান’।

মু’মিনদের পারস্পরিক সম্পর্কের গভীরতা:

সালেহীনদের পরিচয় দিতে গিয়ে কুরআন ‘বুনইয়ানুম মারসুস’ (সীসাঢালা প্রাচীর) এবং ‘ইখওয়ান’ (ভাই ভাই) শব্দ ব্যবহার করেছে:

“মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই...”  ৪৯:১০)

এই ভাতৃত্ববোধের কারণেই তারা একে অপরের সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষী হতে পারে।

কাদের সাথে আপনি চলবেন? (সর্বোত্তম বন্ধুত্বের স্তরবিন্যাস):

কুরআন মাজিদ বন্ধুত্বের একটি উচ্চতর মানদণ্ড ও একটি চমৎকার সিলসিলা (Sequence) পেশ করেছে। যারা আল্লাহর আনুগত্য করে, তারা পরকালে এবং ইহকালে কাদের সাহচর্য পাবে তা নিম্নোক্ত আয়াতে বর্ণিত হয়েছে:

“আর যারা আল্লাহ ও রসুলের আনুগত্য করে, তারা ওই ব্যক্তিদের সাথী হবে যাদের ওপর আল্লাহ নেয়ামত দান করেছেন; অর্থাৎ— নবীগণ, ‘সিদ্দীক’ (সত্যনিষ্ঠ), ‘শুহাদা’ (শহীদ) এবং ‘সালেহীন’ (সৎকর্মশীল)। আর সাথী হিসেবে তারা কতই না উত্তম!” (সুরা আন-নিসা ৪:৬৯)

এই আয়াতে ‘সালেহীন’ ও ‘সদেকীন’ (সিদ্দীক)-দের ‘রাফীক’ (رفيق) বা বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে ‘হাশুনা উলাইকা রাফীকা’ (আর সাথী হিসেবে তারা কতই না উত্তম) বাক্যটি প্রমাণ করে যে, জীবনের চলার পথে এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো টিম বা গ্রুপ হতে পারে না। সালামুন আলা ইব্রাহিম, সালামুন আলা মুসা ও হারুন এবং সালামুন আলা মুহাম্মাদ — এই সকল নবীগণ ছিলেন সদেকীন ও সালেহীনদের ইমাম।

আসল বন্ধু বা ‘ওয়ালী’ (Wali) কে?

মুমিনের প্রকৃত বন্ধু ও অভিভাবক নির্বাচনের ক্ষেত্রে কুরআন একচ্ছত্র মানদণ্ড প্রদান করেছে। সুরা আল-মায়েদাহ’র এই আয়াতটি এ বিষয়ে একটি ‘মুহকাম’ (সুস্পষ্ট) দলিল:

“তোমাদের সিদ্ধান্তদাতা (বন্ধু-ওয়ালী)  প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ও তাঁর রসূল এবং তারা, যারা ঈমান আনে, যারা সলাত প্রতিষ্ঠা করে এবং যারা যাকাত আদায় করে, বিনয়াবনত হয়ে (রুকুকারী) (সুরা আল-মায়েদাহ ৫:৫৫)

এখানে ‘ওয়ালী’ (ولي) শব্দটি একক বচনে ব্যবহৃত হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে আল্লাহ, তাঁর রসুল এবং মুমিনদের আনুগত্য ও বন্ধুত্ব একই সূত্রে গাঁথা। আপনি যদি আল্লাহর বন্ধু হতে চান, তবে আপনাকে সদেকীন মুমিনদের সাথেই বন্ধুত্ব করতে হবে।

ভুল বন্ধু নির্বাচনের করুণ পরিণতি (সতর্কবার্তা):

কুরআন কেবল বন্ধুত্বের সুফলই জানায়নি, বরং ভুল বন্ধু নির্বাচনের ভয়াবহতা ‘সাদৃশ্যপূর্ণ’ বর্ণনার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছে। কিয়ামতের দিন মানুষ যখন আক্ষেপে নিজের হাত কামড়াবে, তখনকার দৃশ্যটি দেখুন:

“হায় দুর্ভোগ আমার! আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমার কাছে উপদেশ (কুরআন) আসার পর সে-ই তো আমাকে তা থেকে বিভ্রান্ত করেছিল।” (সুরা আল-ফুরকান ২৫:২৮-২৯)

এখানে ‘খলীল’ (خليل) শব্দটি গভীর বন্ধুত্বের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। ‘তাদাব্বুর’ করলে বোঝা যায়, যে বন্ধু আপনাকে কুরআন ও আল্লাহর জিকির থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, সে আসলে আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী নয় বরং পরম শত্রু।

প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষীর পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য:

কে আপনার প্রকৃত হিতৈষী? কুরআন তাদের বৈশিষ্ট্য এভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে:

“আর মুমিন পুরুষরা ও মুমিন নারীরা তাদের একে অপরের বন্ধু। তারা ন্যায়কাজের বিষয়ে আদেশ দেয় এবং অন্যায়কাজ থেকে নিষেধ করে এবং সলাত প্রতিষ্ঠা করে এবং যাকাত আদায় করে আর আল্লাহর ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে। ওরাই, যাদেরকে অবশ্যই আল্লাহ দয়া করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সুরা আত-তাওবাহ ৯:৭১)

১. তারা আপনাকে সর্বদা ‘মা’রুফ’ বা ভালো কাজের দিকে ডাকবে।

২. তারা আপনাকে ‘মুনকার’ বা মন্দ কাজ থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করবে।

৩. তাদের মূল লক্ষ্য হবে আখেরাত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি।

যাদের সঙ্গ ত্যাগ করা জরুরি (কুরআনের অকাট্য যুক্তি):

আল্লাহ তাআলা সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন এমন ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকতে যারা তাঁর স্মরণে বিমুখ:

“আর আপনি নিজেকে তাদের সংস্পর্শে ধৈর্যশীল রাখুন, যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ডাকে এবং পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে আপনি তাদের থেকে আপনার দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। আর ওই ব্যক্তির আনুগত্য করবেন না, যার অন্তরকে আমি আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি এবং যে নিজের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে...” (সুরা আল-কাহাফ ১৮:২৮)

এখানে ‘তাদাব্বুর’ করলে দেখা যায়, বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা বা ধন-সম্পদ বড় নয়, বরং তার ‘কলব’ বা হৃদয়ে আল্লাহর জিকির বা স্মরণ আছে কি না, সেটাই বড় মাপকাঠি।

▓▒░ দুআ ░▒▓

সালেহীন বা নেককারদের অন্তর্ভুক্ত হতে এবং তাদের সঙ্গ পেতে সালামুন আলা ইউসুফ এই দুআটি করেছিলেন:

فَاطِرَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ أَنتَ وَلِىِّۦ فِى ٱلدُّنْيَا وَٱلْءَاخِرَةِ ۖ تَوَفَّنِى مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِى بِٱلصَّٰلِحِينَ 

ফা-ত্বিরস্ সামা-ওয়া-তি অল্ আরদ্বি আংতা অলিয়্যী ফিদ্দুনইয়া-অল্ আ-খিরতি, তাঅফ্ফানী মু¯িø­মাওঁ অ আল্হিক্বুনী- বিচ্ছোয়া-লিহী-ন্।

অর্থ: হে মহাকাশ ও পৃথিবীর ¯্রষ্টা!  দুনিয়ার মধ্যে ও আখেরাতে আপনিই আমার অভিভাবক। আপনি আমাকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দিন এবং আমাকে (সৎকর্মশীলদের) সলেহীনদের সাথে অন্তর্ভুক্ত করুন- আল কুরআন ১২:১০১ 

সালামুন আলা ইব্রাহিম এর দুআ ছিল:

رَبِّ هَبْ لي حُكْمًا وَأَلْحِقْني بِالصَّالِحِينَ

উচ্চারণ: রাব্বি হাব লী হুকমাও ওয়া আলহিকনী বিস-সালেহীন।

অর্থ: “হে আমার পালনকর্তা! আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন এবং আমাকে নেককারদের (সালেহীন) অন্তর্ভুক্ত করুন।” (সুরা আশ-শুআরা ২৬:৮৩)

সারসংক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত:

আল কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের সংযোগ (Link) থেকে প্রমাণিত হয় যে:

❖ ভ্রাতৃত্বের মূল ভিত্তি হলো ইমান, তাওবাহ, সালাত ও জাকাত (৯:১১)।

❖ মুমিন কেবল মুমিনেরই অকৃত্রিম বন্ধু বা ‘ওয়ালী’ হতে পারে (৫:৫৫)।

❖ বন্ধু নির্বাচনে তার সততা (সদক) এবং আমল (সালেহ) পরখ করতে হবে (৯:১১৯, ৪:৬৯)।

❖ যে ব্যক্তি আপনাকে আল্লাহর জিকির ও সৎকাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, সে আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী নয় (২৫:২৮)।

অতএব, আপনার বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষী হওয়ার যোগ্য তারাই, যারা আল্লাহর রজ্জুকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরে আছে এবং সালাত ও জাকাতের মাধ্যমে নিজেদের জীবন পরিচালিত করছে।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post