মানুষ যা চায় তা-ই সে পায়? কিন্তু মানুষ যা চেষ্টা করে, তা-ই সে পায়। (desire-wish-effort-striving-trying).

কুরআনের দৃষ্টিতে মানুষ যা চায় তা-ই পায় না। মানুষ কেবল তার চেষ্টার ফল পায় (সূরা আন-নাজম: ৩৯), তবে তা আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমতের ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ মানুষকে তা-ই দেন যা তার জন্য কল্যাণকর এবং যা আল্লাহ তার জন্য নির্ধারণ করে রেখেছেন।

অনেক সময় আমরা যা চাই তা না পাওয়ার পেছনে আল্লাহর বিশেষ কোনো রহমত লুকিয়ে থাকে, যা আমরা তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারি না।

সূরা আন-নাজমের ৩৯ নম্বর আয়াতটি এ বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি মানুষের চেষ্টা ও শ্রমের গুরুত্ব তুলে ধরে। 

🔗 সূরা আন-নাজমেরই ২৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে—

"মানুষ যা চায় (তমান্না/আকাঙ্ক্ষা করে), সে কি তা-ই পায়?" আর ৩৯ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে— "মানুষ যা চেষ্টা (সাঈ/পরিশ্রম) করে, তা-ই সে পায়।"

আবার এই আয়াতের পরবর্তী আয়াতে (আয়াত ৩৯:২৫) আল্লাহ বলছেন— "পরকাল ও ইহকাল কেবল আল্লাহরই অধিকারে।" অর্থাৎ, মানুষ চাইলেই সব পায় না, সবকিছুর মালিক ও নিয়ন্ত্রণকারী হলেন আল্লাহ।

এই দুটি আয়াতের মধ্যে এক গভীর সামঞ্জস্যতা ও  সুক্ষ শব্দগত অনুধ্যানের বিষয় রয়েছে:

১. আকাঙ্ক্ষা বনাম চেষ্টা: ২৪ নম্বর আয়াতে 'তমান্না' বা শুধু 'মনে মনে চাওয়া'র কথা বলা হয়েছে। শুধু ইচ্ছা করলেই বা দিবাস্বপ্ন দেখলেই সব পাওয়া যায় না। কিন্তু ৩৯ নম্বর আয়াতে 'সাঈ' বা 'প্রচেষ্টা'র কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, পাওয়ার জন্য কেবল ইচ্ছা যথেষ্ট নয়, বরং শ্রম ও চেষ্টা জরুরি।

২. চেষ্টার ফল সুনিশ্চিত: মানুষ যখন কোনো কিছুর জন্য সঠিক পথে শ্রম দেয়, আল্লাহ তার সেই শ্রমকে বৃথা যেতে দেন না। দুনিয়াতে হয়তো সব চেষ্টার ফল হুবহু পাওয়া যায় না (কারণ সেখানে আল্লাহর পরীক্ষা ও হিকমত থাকে), কিন্তু পরকালে প্রতিটি কাজের প্রতিদান মানুষ অবশ্যই পাবে।

৩. পরবর্তী আয়াত (আয়াত ৪০): এই আয়াতের ঠিক পরেই আল্লাহ বলেছেন— "আর তার প্রচেষ্টা অচিরেই তাকে দেখানো হবে।" অর্থাৎ মানুষ যা করেছে, তার ফলাফল সে অবশ্যই দেখতে পাবে।

৪. সাফল্যের সূত্র: এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ইসলামে অলস বসে থেকে কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করার সুযোগ নেই। রিযিক, জ্ঞান বা সাফল্য যা-ই হোক না কেন, তা অর্জনের জন্য মানুষকে চেষ্টা করতে হবে।

◆ পক্ষান্তরে এক কিতাবে বিশ^াীদের এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে যে-

মানুষ অনেক কিছু পেতে চায় যা তার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, আবার অনেক কিছু অপছন্দ করে যা তার জন্য ভালো। আল্লাহ বলেন:

"...হয়তো তোমরা এমন কিছু অপছন্দ করছ যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, আবার হয়তো এমন কিছু ভালোবাসছ যা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।" (সূরা আল-বাকারাহ: ২১৬)

◆ সূরা আশ-শূরা, আয়াত ২৭:

মানুষ যা চায় আল্লাহ যদি তাকে তার চেয়েও বেশি বা অবাধে সব দিয়ে দিতেন, তবে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো। আল্লাহ বলেন:

"যদি আল্লাহ তাঁর বান্দাদের রিযিক বাড়িয়ে দিতেন, তবে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত; কিন্তু তিনি যা চান এক নির্দিষ্ট মাপে নাযিল করেন। নিশ্চয় তিনি তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক অবহিত ও সর্বদ্রষ্টা।" (সূরা আশ-শূরা: ২৭)

◆ সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত ১৮-১৯:

যারা কেবল দুনিয়ার স্বার্থ চায় এবং যারা পরকাল চায়, তাদের বিষয়ে আল্লাহ বলেন:

"যে কেউ ইহকাল কামনা করে, আমি যাকে যা ইচ্ছা অতিসত্বর দিয়ে দেই। অতঃপর তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করি..." (সূরা বনী ইসরাঈল: ১৮)

◆ আল্লাহর ফয়সালা ও তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর ভরসা):

মানুষ যখন সর্বোচ্চ চেষ্টা (Sa'ee) করে, তখন তার পরবর্তী ধাপ হলো আল্লাহর ওপর ভরসা করা। কারণ সব চেষ্টার ফলাফল আমাদের অনুকূলে না-ও আসতে পারে, যদি তাতে আমাদের কল্যাণ না থাকে।

আল্লাহ বলেন:

فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ

"অতঃপর যখন তুমি কোনো সংকল্প করবে (অর্থাৎ চেষ্টা ও সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত করবে), তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।" (সূরা আল-ইমরান: ১৫৯)

সারকথা:

এই অংশটির মূল কথা হলো:

চেষ্টা করা মানুষের দায়িত্ব: আল্লাহ দেখতে চান বান্দা কতটুকু পরিশ্রম করেছে।

ফলাফল দেওয়া আল্লাহর ইচ্ছাধীন: আমাদের চেষ্টার ফলে আমরা যা পাব, তা যেন আমাদের জন্য কল্যাণকর হয়, সেই চূড়ান্ত ফয়সালা আল্লাহই করেন।

মুমিনের তৃপ্তি: যদি চেষ্টার পর আমরা কাঙ্ক্ষিত কিছু না পাই, তবে মুমিন হিসেবে বিশ্বাস করতে হয় যে— "আল্লাহর ফয়সালাই চূড়ান্ত এবং এর মধ্যেই আমার কোনো মঙ্গল নিহিত আছে।"

সংক্ষেপে পুরো বিষয়টির সারকথা দাঁড়ায়:

১. শুধু তামান্না বা ইচ্ছা (Wish) করলে পাওয়া যায় না। (৫৩:২৪)

২. পাওয়ার জন্য চেষ্টা বা পরিশ্রম (Effort) শর্ত। (৫৩:৩৯)

৩. চেষ্টার পর ফলাফল আল্লাহর ওপর সোপর্দ (Tawakkul) করতে হয়। (৩:১৫৯)

৪. আল্লাহ যার জন্য যা ভালো মনে করেন, তাকে ঠিক সেই পরিমাণই দান করেন। (৪২:২৭)

এই পূর্ণাঙ্গ চক্রটিই একজন মানুষকে পরিশ্রমী হতে শেখায় এবং একই সাথে ধৈর্য ও মানসিক প্রশান্তি দান করে।

উপসংহার:

মানুষ যা কেবল কল্পনা বা ইচ্ছা (Wish) করে, তা-ই সে পায় না; কিন্তু মানুষ যা পাওয়ার জন্য নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা (Effort) করে, আল্লাহ তাকে তার ফল দান করেন। তবে সেই ফল কখন এবং কীভাবে দেওয়া হবে, তা আল্লাহর হিকমতের ওপর নির্ভর করে। মানুষের কাজ হলো চেষ্টা করা, আর ফলাফল দেওয়ার মালিক আল্লাহ।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post