প্রাণীকুলও কি উম্মাহ? | মানুষ কেন পৃথিবীর খলিফা বা প্রতিনিধি? -কুরআন কী বলে? Animals also an Ummah? Khalifa-Representative-Ambassador

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম।

আর পৃথিবীর মধ্যে বিচরণশীল কোনো প্রাণী নেই ও স্বীয় বাহুতে ওড়ে এমন কোনো আকাশচারী নেই, তোমাদের মতোই নানা প্রজাতি (উম্মা-community) ছাড়া। আমরা কিতাবের মধ্যে কোনো কিছু বাদ রাখি নাই। তারপর তাদের রবের কাছে তাদেরকে সমবেত করা হবে-আল কুরআন; আয়াত ৬:৩৮

    --- ✨ ---

শাহরু রমাদান আমাদের মাঝে রহমতের বার্তা নিয়ে এসেছে, আর দোরগোড়ায় ঈদুল ফিতর। খুশির এই আমেজে বাংলাদেশের বড় বড় বিদ্যাপীঠগুলো—যেমন, জাহাঙ্গীরনগর, ঢাকা, রাজশাহী কিংবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়—দীর্ঘ ছুটির কবলে পড়ে আজ প্রায় জনশূন্য।

নিচের দিকে ভিডিও দেখুন:

যে ক্যাম্পাসগুলো প্রতিদিন হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক আর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদচারণায় মুখরিত থাকত, যেখানে হোটেল-ক্যান্টিনগুলোতে মানুষের উচ্ছিস্ট কিংবা পরম মমতায় বিলিয়ে দেওয়া খাবার খেয়ে বেঁচে থাকত একদল নির্বাক প্রাণী; আজ সেখানে শুধুই নীরবতা। অন্যান্য প্রাণীদের পাশাপাশি অনেকটা মানুষের উপর নির্ভরশীল বিড়াল-কুকুরগুলোর জন্য এই ক্যাম্পাসই ছিল তাদের ঘর-বাড়ি। কিন্তু মানুষ যখন নাড়ির টানে আপন আলয়ে ফিরে গেছে, ক্যাম্পাসগুলো হয়ে পড়েছে বিজন। হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই প্রাণীগুলো আজ চরম খাদ্য সংকটে। অভুক্ত অবস্থায় ধুঁকতে ধুঁকতে অনেক প্রাণী অকালে প্রাণও হারাচ্ছে।

এই দৃশ্যপট আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—মানুষ হিসেবে, আল্লাহর প্রতিনিধি বা 'খলিফা' হিসেবে আমাদের কি ন্যূনতম কোনো দায়িত্ব নেই এই অভুক্ত প্রাণীদের প্রতি? আমরা যখন পরিবারের সাথে সাহরী আর ইতমামের তৃপ্তিতে মগ্ন, তখন আমাদেরই আঙিনায় থাকা এই 'উম্মাহ'গুলো কি না খেয়েই মরে যাবে?

আজকের আলোচনায় আমরা আল-কুরআনের গভীর দর্শনের আলোকে জানব—আমাদের এবং এই প্রাণীদের 'রব' আমাদের ওপর কী দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। খলিফা হিসেবে সৃষ্টির প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা কতটুকু এবং এই ছোট একবেলা খাবারের ব্যবস্থা করা আল্লাহর কাছে কত বড় মূল্যায়নের বিষয় হতে পারে।

আশার কথা হলো, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কিছু ক্যাম্পাসের একদল সংবেদনশীল শিক্ষার্থী,  শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কেউ এই বন্ধের মধ্যেও নিজস্ব উদ্যোগে এই নিরীহ প্রাণীদের খাদ্যের যোগান দিচ্ছেন। তারা কি কেবল দয়া করছেন? নাকি খলিফা হিসেবে তাদের ওপর অর্পিত ঐশী দায়িত্ব পালন করছেন? এবং আল্লাহ সুবহানাহু তালার সন্তুষ্টিও অর্জন করছেন? চলুন, কুরআনের ভাষাতাত্ত্বিক ও গঠনমূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করি।

খিলাফতের আমানত: সৃষ্টির সেবায় মুমিনের দায়বদ্ধতা ও আল-কুরআনের দর্শন:

খিলাফতের মহাজাগতিক ও ভাষাতাত্ত্বিক সংজ্ঞা:

আল-কুরআনে 'খলিফা' (خَلِيفَة) যার অর্থ একজনের পেছনে আসা বা প্রতিনিধি হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হওয়া।যাকে বলা যায় প্রতিনিধি মানে আল্লাহর পক্ষ থেকে বানানো Representative/ Ambassador এর দায়িত্ব অর্পন। 

সূরা আল-বাকারার ৩০ নম্বর আয়াতে (২:৩০) যখন আল্লাহ বললেন-"আর যখন তোমার রব মালাকদের উদ্দেশে বললেন, নিশ্চয় আমি পৃথিবীর মধ্যে খলিফা নিযুক্তকারী", তখন এটি কেবল মানুষের প্রশাসনিক শ্রেষ্ঠত্ব ছিল না, বরং রবের পক্ষ থেকে সমগ্র সৃষ্টিজগতকে রক্ষণাবেক্ষণের এক মহান 'আমানত' ছিল।

এই খিলাফতের ব্যবহারিক ও ন্যায়বিচারমূলক প্রয়োগ আমরা দেখতে পাই সালামুন আলা নবী দাউদ-এর জীবনে। আল্লাহ বলছেন, "হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে খলিফা বানিয়েছি; অতএব তুমি মানুষের মধ্যে ন্যায়ের সাথে বিচার করো..." (সূরা সোয়াদ, ৩৮:২৬)। খিলাফত মানেই হলো আল্লাহর দেওয়া 'মিযান' বা ভারসাম্য রক্ষা করা, যা কেবল মানুষের সমাজেই নয়, বরং প্রাণ-প্রকৃতির প্রতিটি স্তরে বিস্তৃত।

.....................................

🔗 আপনার সামান্য কন্ট্রিবিউশন হতে পারে পৃথিবীর ইকোসিস্টেম রক্ষা করা এবং খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালনের একটি অংশ। এখানে ফেসবুকে পোস্ট করা ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিস্তারিত জানতে  বা যাছাই করে নিতে নিচের লিংকটি ক্লিক করতে পারেন। 

https://www.facebook.com/share/p/16dfL5potj/

....................................

১. খলিফা হলো সম্পদের জিম্মাদার (Trusteeship of Resources):

খলিফা হওয়ার অন্যতম ব্যবহারিক অর্থ হলো—মানুষের হাতে থাকা সম্পদ বা ক্ষমতা তার ব্যক্তিগত মালিকানা নয়। সে কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকে তা বণ্টন ও দেখভালের জিম্মাদার।

প্রামাণিক আয়াত: "তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর ইমান আনো এবং তা থেকে ব্যয় করো—যাতে তিনি তোমাদেরকে স্থলাভিষিক্ত/প্রতিনিধি (মুস্তাখলাফীন) করেছেন।" (সূরা আল-হাদিদ, ৫৭:৭)।

ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ: এখানে 'মুস্তাখলাফীন' শব্দটি নির্দেশ করে যে, আপনার পকেটে থাকা অর্থ বা আপনার ক্যাম্পাসে থাকা উদ্বৃত্ত খাবার আসলে সেই বিড়াল বা কুকুরের হক, যার প্রতিনিধি হিসেবে আল্লাহ আপনাকে সম্পদ দিয়েছেন। এটি দয়া নয়, বরং জিম্মাদারি পালন।

২. প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা (balance):

আল্লাহ প্রকৃতি, পাহাড় ও প্রাণীকুলকে মানুষের অনুগত বা ‘তাশখির’ (تسخير) করে দিয়েছেন। কিন্তু এই ক্ষমতা যথেচ্ছ ব্যবহারের জন্য নয়।

আয়াত বিশ্লেষণ (৪৩:৩২): এই ‘সুখরিয়্যা’ বা পারস্পরিক নির্ভরশীলতার নীতি অনুযায়ী, খলিফা হিসেবে মানুষ যখন প্রকৃতির যত্ন নেয়, তখন সে মূলত একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনচক্র বজায় রাখে। মানুষ যেমন অক্সিজেনের জন্য উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল, তেমনি বনের পশুপাখি বা ক্যাম্পাসের প্রাণীরা মানুষের সচেতন আচরণের ওপর নির্ভরশীল। খলিফা হিসেবে এই 'মিযান' বা ভারসাম্য রক্ষা করাই হলো মুমিনের কাজ।

৩. খলিফা হলো 'আমানত' (Trust) বহনকারী

খিলাফতের মূল ভিত্তি হলো একটি স্বেচ্ছায় গৃহীত দায়িত্ব, যা আসমান-জমিন কেউ গ্রহণ করতে সাহস পায়নি।

প্রামাণিক আয়াত: "নিশ্চয়ই আমি আসমান, জমিন ও পাহাড়ের কাছে 'আমানত' পেশ করেছিলাম, তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল এবং এতে ভীত হলো; কিন্তু মানুষ তা বহন করল..." (সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৭২)।

বিশ্লেষণ: এই আমানতের একটি বড় অংশ হলো 'রক্ষণাবেক্ষণ'। পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী এবং প্রাণীকুলের ভারসাম্য রক্ষা করা মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। যারা এই আমানত রক্ষা করে তারাই সফল খলিফা।

৪. খলিফার দায়িত্ব ও প্রকৃতির সাথে মিতালী (correlative Analysis):

সালামুন আলা দাউদ নবী-এর দৃষ্টান্ত: আল-কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী সালামুন আলা দাউদ-এর তাসবিহ বা ইবাদতে পাহাড় এবং পাখিরাও শামিল হতো (সূরা সাবা, ৩৪:১০)। এটি প্রমাণ করে যে, একজন খলিফার শাসনের প্রভাব প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের ওপর পড়ে। খলিফা ও প্রকৃতি তখন একই সুরে রবের মহিমা ঘোষণা করে।

সালামুন আলা সুলাইমান -এর সংবেদনশীলতা: খলিফা হিসেবে সালামুন আলা সুলাইমান একটি ক্ষুদ্র পিপীলিকার জীবনের মূল্য অনুভব করেছিলেন (২৭:১৮-১৯)। এমনকি তিনি তাঁর বাহিনীর পাখিদেরও খোঁজ নিতেন।

বিশ্লেষণ: সূরা আন-নামল-এর ২০ নম্বর আয়াতে 'তফাক্কাদা' (تَفَقَّدَ) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ—সযত্নে অনুসন্ধান করা। ক্যাম্পাসের বন্ধের দিনে বিড়াল-কুকুরগুলোর জন্য খাবারের খোঁজ করা মূলত সালামুন আলা সুলাইমান-এর সেই 'তফাক্কাদা' বা খিলাফতি গুণাবলীরই প্রতিফলন।

৫. প্রাণীকুল: 'উমামুন আমছালুকুম' (communities like you):

সূরা আল-আন'আম-এর ৩৮ নম্বর আয়াতটি প্রাণী অধিকারের চার্টার বা সনদ: "পৃথিবীতে বিচরণশীল যত প্রাণী আছে এবং ডানা দিয়ে ওড়ে এমন যত পাখি আছে, তারা সবাই তোমাদের মতোই এক একটি সম্প্রদায় (উম্মাহ)।"

❑ আভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য: এখানে 'উম্মাহ' (أُمَمٌ) শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে আল্লাহ বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, পাখিরা বা বিড়াল-কুকুররা কেবল জীব নয়, বরং তাদের নিজস্ব সামাজিক কাঠামো ও অধিকার আছে। জাহাঙ্গীরনগর বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বসবাসরত প্রাণীরাও এক একটি 'উম্মাহ'। খলিফা হিসেবে মানুষের দায়িত্ব হলো অন্য উম্মাহর বিপদে পাশে দাঁড়ানো।

৬. ব্যয় ও তাকওয়ার ব্যাপকতা: ৩:১৩৪ আয়াতের বিশ্লেষণ:

মুত্তাকীদের বর্ণনায় আল্লাহ বলেন: "যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় (ইউনফিকুনা) করে..." (সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৩৪)।

❑ Linguistic Analysis: এই আয়াতে 'ইনফাক' (ব্যয়)-এর কোনো নির্দিষ্ট বস্তু (Object) উল্লেখ করা হয়নি। অর্থাৎ, আল্লাহ বলেননি কেবল মানুষের পেছনে ব্যয় করো। এই 'Generalization' প্রমাণ করে যে, কোনো ক্ষুধার্ত প্রাণীর পেছনে ব্যয় করাও তাকওয়ার অংশ। কারণ মুত্তাকী হওয়ার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দয়াপরবশ হওয়া।

৭. আল্লাহর মূল্যায়ন: 'শাকুর' ও 'খায়রুল ফাসিলীন':

মানুষ যখন খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে, তখন আল্লাহ তা মূল্যায়ন করেন। তিনি নিজেকে 'শাকুর' (الشَّكُورُ) বা গুণগ্রাহক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন (৩৫:৩০)।

আল্লাহ আরও বলেন, "নিশ্চয়ই তিনি শ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী/মূল্যায়নকারী (খায়রুল ফাসিলীন)" (৬:৫৭)। ক্যাম্পাসের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এই ক্ষুদ্র উদ্যোগ আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ, কারণ তারা রবের সৃষ্টির প্রতি রবের হয়েই দায়িত্ব পালন করছেন।

উপসংহার: খিলাফতের আধুনিক ও ব্যবহারিক প্রয়োগ:

শাহরু রমাদানের মূল শিক্ষা হলো 'তাকওয়া' অর্জন করা। আর তাকওয়ার একটি বড় বহিঃপ্রকাশ হলো খলিফা হিসেবে আল্লাহর আমানত রক্ষা করা।

জাহাঙ্গীরনগর, ঢাকা, রাজশাহী বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সকল সহৃদয় মানুষ এই বন্ধের সময়ে ক্যাম্পাসের নিরীহ প্রাণীদের খাবারের ব্যবস্থা করছেন, তারা মূলত আল-কুরআনের 'খিলাফত' দর্শনের এক জীবন্ত ভাষ্য উপস্থাপন করছেন বলে আমার অনুধাবনে এসেছে।

আমাদের রব এবং এই অবলা প্রাণীদের রব একই। সুতরাং ঈমানের সাথে সৃষ্টির সেবা করা রবের সাথে  connectivity-তে  থাকার একটি সংক্ষিপ্ততম পথ হতে পারে! 



ভিডিও: প্রাণীকুলও কি উম্মাহ? | মানুষ কেন পৃথিবীর খলিফা? কুরআন কী বলে?
Post a Comment (0)
Previous Post Next Post