আল কুরআন মাজীদ এমন একটি ঐশী গ্রন্থ, যার প্রতিটি শব্দ, বাক্য ও নজম (বিন্যাস) এক অদ্ভুত অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্যতায় গ্রথিত। মহাবিচারের দিনের এক চরম বিভীষিকাময় মুহূর্তের চিত্রায়ন করতে গিয়ে আল্লাহ রব্বুল আলামিন অকৃতজ্ঞ ও অস্বীকারকারী মানুষের একটি অন্তিম আক্ষেপের কথা তুলে ধরেছেন। সূরা আন-নাবার শেষ আয়াতে বলা হয়েছে—
নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে আসন্ন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করেছি; যেদিন মানুষ দেখতে পাবে তার দু’হাত কী অগ্রিম পাঠিয়েছে এবং কাফির বলবে— ‘হায়! আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম’! (আয়াত ৭৮:৪০)
এই আয়াতে উল্লিখিত “হায়! আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম” (يَا لَيْتَنِي كُنتُ تُرَابًا - ইয়া লাইতানী কুনতু তুরাবা) বাক্যটি কেবল একটি আক্ষেপ নয়; বরং এর অন্তরালে লুকিয়ে আছে মানব সৃষ্টির আদি ইতিহাস, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির পরিণতি এবং ঐশী ন্যায়ের এক সুগভীর অনুধ্যান।
‘তুরাব’ (ধূলামাটি) এর সূচনালগ্ন এবং মানব সৃষ্টির দর্শন:
আল কোরআনে ‘তুরাব’ (تُرَاب - মাটি বা ধূলামাটি) শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের সৃষ্টির সূচনা এই তুরাব থেকেই। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট ঈসা (সালামুন আলাইহে)-এর দৃষ্টান্ত হচ্ছে আদম (সালামুন আলাইহে)-এর মত। তাকে তিনি মাটি (তুরাব) থেকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তাকে বলেছেন ‘হও’, ফলে সে হয়ে যায়।” (আয়াত ৩:৫৯)
অন্যত্র বলা হয়েছে, “হে মানুষ! যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দিহান হও, তবে (ভেবে দেখ) আমি তো তোমাদেরকে মাটি (তুরাব) থেকে সৃষ্টি করেছি...” (২২:৫)।
এই আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, মানুষের আদি সত্তা হলো প্রাণহীন মাটি। আল্লাহ সু.তা. এই প্রাণহীন মাটির মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়ে তাকে চেতনাসম্পন্ন, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও জবাবদিহিতার অধিকারী মানুষে পরিণত করেছেন। সৃষ্টির এই ক্রমবিকাশ একটি বড় নিয়ামত। কিন্তু যেদিন এই স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির চূড়ান্ত হিসাব নেওয়া হবে, সেদিন ব্যর্থ মানুষটি তার এই চেতনাসম্পন্ন অস্তিত্বকে অভিশাপ মনে করবে এবং পুনরায় সেই প্রাণহীন, চেতনাহীন ‘তুরাব’-এ ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করবে। এটি কোরআনের এক অসামান্য শব্দগত গাঁথুনি ও অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত।
অস্বীকারকারীদের মনস্তত্ত্ব ও ‘তুরাব’ এর উপমা:
পার্থিব জীবনে অস্বীকারকারীরা এই ‘তুরাব’ বা মাটিকে ব্যবহার করত পুনরুত্থানকে অস্বীকার করার যুক্তি হিসেবে। আল কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তাদের এই মানসিকতার চিত্র পাওয়া যায়। তারা বলত—
“যখন আমরা মরে যাব এবং মাটি (তুরাব) ও অস্থিতে পরিণত হব, তখনও কি আমরা পুনরুত্থিত হব?” (৫৬:৪৭)
“তারা বলে, আমরা যখন মরে যাব এবং মাটি (তুরাব) ও হাড়ে পরিণত হব, তখনও কি আমরা পুনরুত্থিত হব?” (২৩:৮২)
এখানে একটি অসাধারণ বিপরীতমুখী চিত্র (Contrasting imagery) লক্ষ্য করা যায়। দুনিয়ার জীবনে ‘তুরাব’ বা মাটি হয়ে যাওয়াটা ছিল তাদের কাছে পরকালকে অস্বীকার করার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার বা ঢাল। তারা ভাবত মাটি হয়ে যাওয়াই হলো সমাপ্তি, এরপর আর কোনো হিসাব নেই। অথচ কিয়ামতের দিন যখন তারা তাদের কৃতকর্মের বাস্তব রূপ দেখতে পাবে, তখন সেই ‘তুরাব’ হওয়াই হবে তাদের চূড়ান্ত এবং সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত মুক্তির উপায়। দুনিয়াতে যা ছিল তাদের অহংকার ও উপহাসের বিষয়, আখিরাতে তা-ই হবে তাদের চরম আক্ষেপের বস্তু।
কর্মের প্রতিচ্ছবি ও মহাবিচারের দিনের অনুধ্যান:
সূরা আন-নাবার আলোচ্য আয়াতে (৭৮:৪০) বলা হয়েছে— “যেদিন মানুষ দেখতে পাবে তার দু’হাত কী অগ্রিম পাঠিয়েছে...”
এখানে “হাত” (يَدَاهُ) শব্দটি মানুষের কর্ম, ক্ষমতা ও স্বাধীন ইচ্ছার প্রতীক। ধূলামাটির কোনো হাত নেই, তার কোনো স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি নেই, তাই তার কোনো জবাবদিহিতাও নেই। যখন মানুষ তার স্বহস্তে উপার্জিত পাপ এবং তার ভয়াবহ পরিণতি স্বচক্ষে দেখবে, তখন তার ভেতরের অনুশোচনা এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে যে, সে তার মানবিক অস্তিত্বকেই অস্বীকার করতে চাইবে।
এর সাথে আমরা সূরা আল-আহযাবের একটি আয়াতের প্রাসঙ্গিক সাদৃশ্য টানতে পারি। আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন—
“নিশ্চয়ই আমি আসমান, যমীন ও পর্বতমালার সামনে আমানত (দায়িত্ব ও স্বাধীন ইচ্ছা) পেশ করেছিলাম, কিন্তু তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল এবং তাতে ভীত হল; কিন্তু মানুষ তা বহন করল...” (৩৩:৭২)
পাহাড় ও যমীন—যা মূলত মাটি বা তুরাব—তারা জবাবদিহিতার ভয়ে এই আমানত গ্রহণ করেনি। মানুষ তা গ্রহণ করেছিল। কিয়ামতের দিন যখন অবিশ্বাসী মানুষ এই আমানত রক্ষার ব্যর্থতার চরম শাস্তি সামনে দেখবে, তখন সে অনুভব করবে যে, পাহাড় বা মাটির সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। তাই সে চাইবে, “হায়! আমি যদি (আমানত গ্রহণকারী মানুষ না হয়ে) সেই আমানত-অস্বীকারকারী মাটি (তুরাব) হয়ে যেতাম!” এটি একটি সূক্ষ্ম কিন্তু যৌক্তিক ও আধ্যাত্মিক (metaphysical) সামঞ্জস্য।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ: সৃষ্টির উদ্দেশ্য বনাম পলায়নপরতা:
আল কুরআন মাজীদ সবসময় বিপরীতমুখী ধারণার (antonym / cross-reference) মাধ্যমে সত্যকে প্রস্ফুটিত করে। একদিকে মুমিন ব্যক্তিরা জান্নাতে চিরস্থায়ী জীবনের (حیات - হায়াত) আনন্দে উদ্বেলিত থাকবে, যেখানে তারা বলবে—
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের থেকে দুঃখ-দুর্দশা দূর করেছেন...” (৩৫:৩৪)।
অন্যদিকে, অস্বীকারকারীরা জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচতে সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন বা জড় পদার্থে (جماد - জামাদ) পরিণত হতে চাইবে। মুমিনরা তাদের সালাত, ধৈর্য ও সৎকর্মের মাধ্যমে যে আমল পাঠিয়েছে, তার বিনিময়ে তারা অনন্ত জীবনের আলো পাবে; আর অবিশ্বাসী তার দু’হাতে যা পাঠিয়েছে, তার প্রতিফলস্বরূপ সে জীবনের অস্তিত্বকেই বিলীন করে দিতে চাইবে। কিন্তু সেদিন মৃত্যু বা বিলীন হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। আল্লাহ বলেন—
“সেখানে সে মরবেও না, বাঁচবেও না।” (২০:৭৪)
যৌক্তিকতা:
আল কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, মাটি থেকে সৃষ্ট মানুষ যখন তার স্রষ্টাকে চেনে এবং তাঁর বিধান মেনে চলে, তখন সে মাটির স্তর থেকে ফেরেশতাদের চেয়েও উচ্চ মর্যাদায় আসীন হয়। কিন্তু যখন সে স্রষ্টাকে অস্বীকার করে এবং অহংকারে লিপ্ত হয়, তখন সে পশুর চেয়েও অধম হয়ে যায় (৭:১৭৯)। মহাবিচারের দিন এই অধঃপতনের চূড়ান্ত রূপটিই হলো “ইয়া লাইতানী কুনতু তুরাবা” (হায়! আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম)।
এই বাক্যটি আমাদের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। আমাদের এই চেতনাসম্পন্ন জীবন, আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি এবং আমাদের দু’হাতে করা প্রতিটি কাজ—সবই রেকর্ড করা হচ্ছে। আমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমরা শুধু মাটি নই; আমরা আল্লাহর রূহানী ফুঁকে দেওয়া এক মহান আমানতের বাহক। এই আমানতের সঠিক মূল্যায়ন না করলে, পরকালে মাটির মতো তুচ্ছ অস্তিত্বে ফিরে যাওয়ার বৃথা আক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
✧✧✧
প্রাসঙ্গিক কুরআনি দুআ-তাসবিহসমূহ:
এই ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা পেতে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমত কামনার জন্য আল কুরআনে বর্ণিত কয়েকটি দুআ নিম্নে প্রদান করা হলো:
১. পরকালের আযাব থেকে মুক্তির দুআ:
رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ ۖ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا
রব্বানাছরিফ্ ‘আন্না- ‘আযা-বা জাহান্নামা ইন্না ‘আযা-বাহা- কা-না গরা-মা-।
অর্থ: হে আমাদের রব! আমাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তি হটিয়ে দিন। নিশ্চয়ই এর শাস্তি এক অবিচ্ছিন্ন ধ্বংস।" (আল কুরআন ২৫:৬৫)২. নিজেদের ত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনার দুআ:
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
রব্বানা- জলামনা- আনফুসানা- ওয়া ইল্লাম তাগফির লানা- ওয়া তারহামনা- লানাকূ নান্না মিনাল খ-সিরীন।