বিদাত কী? দ্বীনের নামে নব-উদ্ভাবিত রীতিনীতি ও তার স্বরূপ সন্ধান-আল কুরআন অনুধাবনে (Newly invented-innovation)

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

আল কুরআনের আলোকে ‘বিদাত’: দ্বীনের নামে নব-উদ্ভাবিত রীতিনীতি ও তার স্বরূপ সন্ধান

আল কুরআন মাজীদ হলো মানবজাতির জন্য আল্লাহ রব্বুল আলামিন কর্তৃক নাযিলকৃত চূড়ান্ত, পরিপূর্ণ, বিস্তারিত ব্যাখ্যাকৃত/তাফসিরকৃত এবং অপরিবর্তনীয় জীবনবিধান (প্রমাণিক দলিল আয়াত-৬:৩৮, ৬:৯২, ৭:৫২, ১০:৩৭, ১১:১–২, ১২:১১১, ১৬:৮৯, ১৮:৫৪, ৪১:৩, ৬:১১৪-১১৫, ৬:১৯১, ৯:১৫৭, ১১:১১৭, ১২:১১২, ২৬:১৯২–১৯৫, ৭৫:১৬–১৯, ২৯:৫১, ৫:৩)। 

আল্লাহ সু.তা. স্বয়ং এই নাযিলকৃত কিতাবকে ‘আহসানুল হাদীস’ বা সর্বোত্তম হাদিস বা কথা (best hadis) হিসেবে ঘোষণা করেছেন (আয়াত ৩৯:২৩)। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে দ্বীনের নামে মানুষের রচিত ‘লাহওয়াল হাদীস’ (অসার বাক্য)-এর অনুসারীরা তাদের নিজেদের তৈরি গ্রন্থগুলোকে ‘সহীহ’ (বিশুদ্ধ) ও ‘অসহীহ/জাল’ এই দুই মনগড়া মানদণ্ডে বিভক্ত করে নিয়েছে। তারা নিজেদের সংকলিত তথাকথিত ‘সহীহ’ বিষয়গুলোর ওপর নির্ভর করে কেবল ‘অসহীহ’ বা দুর্বল বিষয়গুলোকেই একধরনের ‘বিদাত’ হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করে।

অথচ আল কুরআনের অকাট্য মানদণ্ডে— নবী সালামুন আলা মুহাম্মাদ (সা:)-এর ওপর ওহী হিসেবে নাযিলকৃত একমাত্র কিতাব আল কুরআনকে তথা এই ‘আহসানুল হাদীস’-এর সুনির্দিষ্ট বিধি-বিধানের বাইরে গিয়ে, দ্বীন পালনের নামে যাকিছু নতুন নিয়ম-নীতি, প্রথা, বা আচার-অনুষ্ঠান উদ্ভাবন বা আবিষ্কার করা হয়, মূলত তাকেই ‘বি’দাত’ (নব-উদ্ভাবন) বলা হয়। আল্লাহর নাযিলকৃত অহীর বাইরে দ্বীনের নামে উদ্ভাবিত এই সবকিছুই আল কুরআনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বাতিল ঘোসণা করা হয়েছে।

নিচে কেবলমাত্র “তাফসিরুল কুরআন বিল কুরআন” পদ্ধতির আলোকে ‘বিদাত’-এর প্রকৃত স্বরূপ ও এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে একটি গভীর অনুধ্যানমূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করার চেষ্টা করছি-বিঈযনিল্লাহ!

আল কুরআনের ভাষায় ‘বিদাত’ শব্দের আভিধানিক ও প্রায়োগিক অর্থ:

আরবি ‘বিদাত’ (بدعة) শব্দটির মূল ধাতু হলো ‘ব-দ-আ’ (ب د ع)। এর আভিধানিক অর্থ হলো— পূর্বের কোনো নমুনা বা দৃষ্টান্ত ছাড়াই নতুন কিছুর উদ্ভাবন বা সৃষ্টি করা। আল কুরআনে এই মূল ধাতুর ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।  আল্লাহ সু.তা. নিজের পরিচয়ে বলেছেন:

তিনি আসমান ও যমীনের অভিনব স্রষ্টা (بَدِيعُ - বাদিউ)। তিনি যখন কোনো কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন কেবল বলেন ‘হও’, আর তা হয়ে যায়। (২:১১৭)

এখানে ‘বাদিউ’ অর্থ হলো, আল্লাহ রব্বুল আলামিন কোনো পূর্ববর্তী মডেল ছাড়াই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টিজগতের ক্ষেত্রে এই ‘উদ্ভাবন’ কেবল আল্লাহরই একক অধিকার।

অপরদিকে, নবী সালামুন আলা মুহাম্মাদ (সা:)-কে নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ সু.তা. বলছেন:

বলো! রসূলদের মধ্য থেকে আমি কোনো নতুন বা অভিনব (بِدْعًا - বিদ’আন) নই এবং আমি জানি না আমার সাথে কী করা হবে আর না তোমাদের সাথে। যা আমার প্রতি ওহী করা হয় সেটা ছাড়া আমি অনুসরণ করি না আর আমি স্পষ্ট সতর্ককারী ব্যতীত নই (৪৬:৯)

অর্থাৎ, রিসালাতের ধারাবাহিকতায় তিনি পূর্ববর্তী দৃষ্টান্তহীন কোনো নতুন বিষয় নিয়ে আসেননি, বরং তিনি পূর্ববর্তী রাসূলগণেরই ধারাবাহিকতা। এই আয়াতগুলোর শব্দগত সামঞ্জস্যতা থেকে অনুধাবন করা যায় যে, আল্লাহ সু.তা. মহাবিশ্বের স্রষ্টা হিসেবে ‘নতুন’ কিছুর উদ্ভাবক হতে পারেন, কিন্তু দ্বীনের ক্ষেত্রে নবী-রাসূলগণও নিজের মনগড়া কোনো ‘নতুন’ পথের উদ্ভাবক নন; তাঁরা কেবল ওহীর অনুসরণ করেন। সুতরাং, সাধারণ মানুষের জন্য দ্বীনের নামে নতুন কোনো আচার-অনুষ্ঠান সৃষ্টি করা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

দ্বীনের পূর্ণতা এবং নতুন বিধানের (বিদাত) অসারতা:

বিদাত বা নতুন রীতিনীতি প্রচলন করার মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো— পরোক্ষভাবে এই ধারণা পোষণ করা যে, দ্বীনের মধ্যে হয়তো কোনো অসম্পূর্ণতা রয়ে গেছে (মা’য়াযাল্লাহ!)। অথচ আল কুরআন মাজীদ দ্বীনের পূর্ণতার বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়েছে:

➥ আমরা কিতাবের মধ্যে কোনো কিছু বাদ রাখি নাই-আয়াত ৬:৩৮

 "...আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম..." (৫:৩)

 আর আমরা তোমার ওপর কিতাব নাযিল করেছি, সকল কিছুর জন্য সুস্পষ্ট বর্ণনা হিসাবে এবং মুসলিমদের জন্য পথনির্দেশ ও রহমত ও সুসংবাদ হিসাবে-১৬:৮৯।

 আর তোমার রবের বাণী সত্যরূপে ও সুবিচারপ্রসূত পূর্ণ হয়েছে। তাঁর বাণীসমূহের জন্য কোনো পরিবর্তনকারী নেই আর তিনি সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন-আয়াত ৬:১১৫

➥ নিশ্চয় এর মধ্যে (কুরআনের মধ্যে) ইবাদতকারী জনগোষ্ঠীর জন্য অবশ্যই সব বালাগ বার্তা (প্রয়োজনীয় যা কিছু) রয়েছে-আয়াত ২১:১০৬

যেহেতু দ্বীন ‘পূর্ণাঙ্গ’ (আকমালতু) হয়ে গেছে, তাই ইবাদত বা সওয়াব লাভের আশায় নতুন কোনো প্রথা, উৎসব বা অনুষ্ঠান দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত করার অর্থ হলো ৫:৩ আয়াতের ঘোষণাকে পরোক্ষভাবে অস্বীকার করা। পূর্ণাঙ্গ জিনিসে নতুন কিছু যোগ করলে তা আর বিশুদ্ধ থাকে না, বরং তা বিকৃত হয়ে যায়।

একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত: ‘রাহবানিয়াত’ বা বৈরাগ্যবাদের উদ্ভাবন (বিদাত):

দ্বীনের নামে নতুন আচার বা ইবাদত উদ্ভাবন করলে তার পরিণতি কী হয়, তার একটি সুস্পষ্ট, প্রত্যক্ষ এবং কনট্রাস্টিং (বিপরীতমুখী) চিত্র আল্লাহ সু.তা. সালামুন আলা ঈসা-এর অনুসারীদের বর্ণনায় তুলে ধরেছেন:

"...আর বৈরাগ্যবাদ (রাহবানিয়াত)— এটি তো তারা নিজেরাই উদ্ভাবন করেছিল (ابْتَدَعُوهَا - ইব্তাদা‘উহা); আমি তাদের ওপর এটি লিখে দিইনি বা ফরজ করিনি। তারা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় এটি করেছিল, কিন্তু তারা এর যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করতে পারেনি..." (৫৭:২৭)

এখানে ‘ইব্তাদা‘উহা’ (তারা এটি উদ্ভাবন করেছে) শব্দটি সরাসরি ‘বিদাত’ বা উদ্ভাবনকে নির্দেশ করছে। এই আয়াতটির গভীর অনুধ্যান থেকে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়:

১. উদ্ভাবকরা কিন্তু খারাপ উদ্দেশ্যে এটি করেনি, বরং "আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায়" করেছিল।

২. তা সত্ত্বেও আল্লাহ সু.তা. একে স্বীকৃতি দেননি, কারণ "আমি তাদের ওপর এটি বিধান হিসেবে দিইনি।"

৩. মানুষের তৈরি করা নতুন ইবাদতের মানদণ্ড মানুষ নিজেই রক্ষা করতে পারে না।

সুতরাং, ইবাদতের নামে ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন কোনো আচার প্রচলন করলেও তা আল কুরআনের মানদণ্ডে প্রত্যাখ্যাত।

কুরআনিক পরিভাষায় নব-আবিষ্কার (বিদাত)

আল কুরআনে বিদাত বা দ্বীনে নতুন কিছু উদ্ভাবনকে বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক ও সমজাতীয় পরিভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ‘ইফতিরা’ (আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনা) এবং শরীয়ত রচনার ধৃষ্টতা।

◾️ইফতিরা (মিথ্যা রচনা) বনাম সত্য (হক):

যেসব ইবাদত আল্লাহ নির্ধারণ করেননি, তাকে ইবাদত মনে করা আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনার শামিল। আল্লাহ রব্বুল আলামিন প্রশ্ন করেছেন:

"বলুন! আল্লাহ তোমাদের যে রিযিক দিয়েছেন, তারপর তোমরা তার কিছু হালাল ও কিছু হারাম করেছ— বল তো, আল্লাহ কি তোমাদের এর অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহর ওপর মিথ্যা রটনা করছ (تَفْتَرُونَ)?" (১০:৫৯)

আরেকটি আয়াতে কঠোরভাবে বলা হয়েছে:

"তোমাদের জিহ্বা মিথ্যা বলে অভ্যস্ত বলে তোমরা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করার জন্য এমন কথা বোলো না যে, ‘এটি হালাল এবং এটি হারাম’। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করে, তারা সফলকাম হবে না।" (১৬:১১৬)

◾️ দ্বীনের বিধায়ক হিসেবে অন্যকে শরিক করা (যুক্ত করা/বিদাত) [Shuraka]:

দ্বীনের নামে নতুন নিয়ম চালু করা পরোক্ষভাবে শিরকের পর্যায়ভুক্ত, কারণ বিধান দেওয়ার একমাত্র মালিক আল্লাহ।

"তাদের কি এমন কিছু শরিক আছে, যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন বিধান দিয়েছে, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি?..." (৪২:২১)

এই আয়াতের অভ্যন্তরীণ ইঙ্গিত হলো—  হুজুর, মাওলানা, মুফতি, পীর, বুজুর্গ, সমাজ বা পূর্বপুরুষের দোহাই দিয়ে সালাত, সিয়াম বা ইবাদতের কোনো নতুন কাঠামো তৈরি করা মানে ওই রচয়িতাদের আল্লাহর সমকক্ষ আইনপ্রণেতা বা ‘শরিক’ হিসেবে গ্রহণ করা।

অনুধ্যানমূলক বিশ্লেষণ: ওহী বনাম অনুমান (দলিল ছাড়া অনুমানের অনুসরনই বিদাত):

কুরআনের নজম বা বিন্যাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আল্লাহ সু.তা. বারবার ‘ইলম’ (সুনিশ্চিত জ্ঞান বা ওহী)-এর বিপরীতে ‘জন্ন’ (অনুমান বা ধারণা) এবং ‘হাওয়া’ (প্রবৃত্তি বা খেয়াল-খুশি)-কে দাঁড় করিয়েছেন।
যারা নাযিলকৃত বিধান বাদ দিয়ে নতুন প্রথা তৈরি করে, তারা মূলত অনুমানের অনুসরণ করে:

"তাদের অধিকাংশই কেবল অনুমানের (ظَنًّا) অনুসরণ করে। আর সত্যের (হক) মুকাবিলায় অনুমান কোনো কাজেই আসে না..." (১০:৩৬)

দ্বীনের নামে উদ্ভাবিত মিলাদ, উরস, নির্দিষ্ট রাতের বিশেষ আচার, বা মনগড়া কোনো জিকিরের মজলিস— এগুলো সবই মানুষের আবেগ ও প্রবৃত্তির (হাওয়া) ফসল। আল্লাহ সু.তা. নির্দেশ দিয়েছেন:

"...অতএব, তোমার কাছে যে সত্য এসেছে তা ছেড়ে তুমি তাদের খেয়াল-খুশির (أَهْوَاءَهُمْ) অনুসরণ কোরো না..." (৫:৪৮)

ওপরের সম্পূর্ণ কুরআনিক বিশ্লেষণ থেকে এই যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে:

১. আল্লাহ রব্বুল আলামিন দ্বীনকে সম্পূর্ণ করে দিয়েছেন (৫:৩)।

২. দ্বীনের বিধান রচনা করার একমাত্র অধিকার তাঁর (৪২:২১)।

৩. আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান ছাড়া ইবাদতের উদ্দেশ্যে সৎ নিয়তে নতুন কিছু উদ্ভাবন করাও পথভ্রষ্টতা, যেমনটি পূর্ববর্তীরা করেছিল (৫৭:২৭)।

৪. আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো কিছুকে দ্বীনের অংশ বা ইবাদত সাব্যস্ত করা আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনার (ইফতিরা) শামিল (১০:৫৯, ১৬:১১৬)।

সুতরাং, আল কুরআনের সুস্পষ্ট মাপকাঠিতে— নাযিলকৃত আল কুরআনের বিধি-বিধান বাদ দিয়ে, কিংবা এর বাইরে দ্বীনের নামে ধর্মপালন হিসেবে নতুন কোনো নিয়ম-নীতি, আচার-অনুষ্ঠানিক ইবাদত হিসেবে প্রচলন করা বা পালন করা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং এটিই মূলত ‘বিদাত’ বা দ্বীনের মধ্যে মনগড়া নব-উদ্ভাবন। সত্য এবং মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী একমাত্র কষ্টিপাথর হলো আল কুরআন মাজীদ।

বিধি-বিধান বা এর মূলনীতি দেওয়ার নিরঙ্কুশ মালিকানা কেবলই আল্লাহর:

আল কুরআনের মৌলিক ঘোষণা হলো— যিনি এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা, তাঁর সৃষ্টির ওপর আইন বা বিধান দেওয়ার নিরঙ্কুশ অধিকারও কেবল তাঁরই। আল্লাহ সু.তা. সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন:

"...জেনে রাখুন! সৃষ্টি তাঁরই, সুতরাং নির্দেশ বা বিধান দেওয়ার অধিকারও কেবল তাঁরই..." (৭:৫৪)

আইন বা হুকুম দেওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহ সু.তা. কাউকেই তাঁর সমকক্ষ বা অংশীদার করেননি। এটি তাঁর নিরঙ্কুশ একত্ববাদের (তাওহীদ) অবিচ্ছেদ্য অংশ:

"...এবং তিনি তাঁর হুকুমে (বিধানে) কাউকে শরিক করেন না।" (১৮:২৬)

এই আয়াতের অভ্যন্তরীণ ইঙ্গিত হলো— দ্বীনের নামে নতুন কোনো আচার-অনুষ্ঠান বা ইবাদতের নিয়ম তৈরি করা মূলত আল্লাহর হুকুম বা বিধান দেওয়ার ক্ষমতার সাথে নিজেকে বা অন্য কাউকে শরিক করার শামিল যা বিদাত হিসাবে পরিগণিত হয়।

নবী-রাসূলগণের সীমারেখা: ওহীর হুবহু অনুসরণ:

দ্বীন পালনে নতুন কোনো নিয়ম-নীতি চালু করার অধিকার আল্লাহ সু.তা. স্বয়ং নবী-রাসূলগণকেও দেননি। নবী মুহাম্মাদ (সালামুন আলাইহে) কেবল ততটুকুই পালন ও প্রচার করতেন, যতটুকু তাঁর কাছে ওহী হিসেবে নাযিল হতো।

➥ "বলুন, আমি তো রাসূলগণের মধ্যে কোনো নতুন বা অভিনব নই। ...আমার প্রতি যা ওহী করা হয়, আমি কেবল তারই অনুসরণ (ইত্তেবা) করি..." (৪৬:৯)

এমনকি যদি নবী (সালামুন আলাইহে) নিজের পক্ষ থেকে দ্বীনের নামে কোনো কথা রচনা করতেন, তবে তার পরিণতি কী হতো, সে বিষয়ে আল কুরআন মাজীদ কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে:

➥ "সে যদি আমার নামে কোনো কথা রচনা করত, তবে আমি তার ডান হাত পাকড়াও করতাম, অতঃপর তার হৃৎপিণ্ডের শিরা কেটে দিতাম।" (৬৯:৪৪-৪৬)

 এই গভীর অনুধ্যানমূলক আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, দ্বীনের নামে নতুন কোনো ইবাদত বা আচার-অনুষ্ঠান (বিদাত) রচনা করা চরম ধৃষ্টতা, যা খোদ রাসূলগণের জন্যও অকল্পনীয় ছিল।

দাওয়াত ও নসিহতে বিদাত (কুরআন বনাম মনগড়া কেসসা-কাহিনী): কুরআন দ্বারা দাওয়াত দিতে বলা হয়েছে অথচ অধিকাংশ দাওয়াত দেয়া হয় লাহওয়াল হাদিস দ্বারা এখানেও বিদাত:

মানুষকে মানে পরবর্তী সব জেনারেশনকে সতর্ক করতে, সুসংবাদ-উপদেশ দিতে,  দাওয়াত দিতে তথা এবাদতের নিয়ম-নীতি, হুকুম-আহকাম পেশ করতে বলা হয়েছে একমাত্র আল-কুরআন দ্বারা অন্যকোন  অনাযিলকৃত কিতাব থেকে নয়- প্রমাণিক আয়াত:

➥ সুতরাং তুমি কুরআনের মাধ্যমে তাকে উপদেশ দাও, যে আমার সতর্কবার্তাকে ভয় করে-আয়াত ৫০:৪৫

➥ বলো! সাক্ষ্য হিসাবে কোন বিষয় সবচেয়ে বড়? বলো, আল্লাহ! তিনি সাক্ষী আমার মাঝে ও তোমাদের মাঝে। এবং আমার কাছে এই কুরআন ওহী করা হয়েছে, যেন এর দ্বারা আমি তোমাদেরকে সতর্ক করি এবং তাকেও যার কাছে তা পৌঁছবে-আয়াত ৬:১৯ 

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে:

"...আর আপনি এর (কুরআনের) সাহায্যে তাদের সাথে প্রবল সংগ্রাম করুন।" (২৫:৫২)


কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে বাংলাদেশসহ এই উপমহাদেশের অধিকাংশ ওয়াজ-মাহফিল, ধর্মীয় সভা এবং জুমুআর খুৎবাগুলো জুড়ে থাকে কেবল অনাযিলকৃত কিতাব তথা ‘লাহওয়াল হাদীস’-এর মনগড়া বর্ণনা, আবেগনির্ভর কেসসা-কাহিনী ও ভিত্তিহীন ফতোয়া। আল্লাহর নির্দেশিত ‘আহসানুল হাদীস’ তথা আল কুরআনকে পাশ কাটিয়ে, মানুষের রচিত এসব ‘লাহওয়াল হাদীস’ দ্বারা দ্বীনের দাওয়াত ও নসিহত প্রদান করাও একটি মারাত্মক বিদাত। ওহীর বিশুদ্ধ আলো বাদ দিয়ে এই মনগড়া বয়ান ও ধর্মের নামে প্রচলিত গল্প-গুজবের মাধ্যমেই মূলত সাধারণ মানুষকে সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে।


আমল বাতিল করে দেয়ার ঘোসণা: ওহীর সাথে শিরক (যুক্ত করা/ বিদাতের প্রচলন) ও মনগড়া আমলের অসারতা :

বিদাত বা নতুন ইবাদত উদ্ভাবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এটি মানুষের জীবনের সমস্ত সৎকর্ম বা আমলকে সমূলে বিনষ্ট (حَبِطَتْ - হাবিতাত) করে দেয়। আল কুরআনের গভীর অনুধ্যান থেকে দেখা যায়, আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের সাথে অন্য কোনো বিধানকে শরিক করলে স্বয়ং নবী-রাসূলদের আমলও বাতিল হয়ে যাওয়ার সতর্কবাণী দেওয়া হয়েছে:

➥ "নিশ্চয়ই আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি ওহী করা হয়েছে যে, যদি আপনি শিরক করেন, তবে অবশ্যই আপনার আমল বাতিল হয়ে যাবে (لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ) এবং আপনি অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।" (৩৯:৬৫)

অনুরূপভাবে পূর্ববর্তী নবীগণের (সালামুন আলাইহিম) দীর্ঘ তালিকা উল্লেখ করার পর আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলছেন:

➥ "...এটি আল্লাহর হিদায়াত, তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা এর মাধ্যমে পথপ্রদর্শন করেন। আর যদি তারা শিরক করত (এর সাথে কিছু যুক্ত করত), তবে তারা যা আমল করত, তা অবশ্যই বাতিল হয়ে যেত (لَحَبِطَ عَنْهُم مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ)।" (৬:৮৮)

অর্থাৎ, আল্লাহর বিধানে অন্য কারো মনগড়া বিধানকে স্বীকৃতি দেওয়াই হলো এক ধরনের সূক্ষ্ম শিরক, যা মানুষের সারা জীবনের অর্জনকে শূন্য করে দেয়। আল্লাহ সু.তা. বলেন:

➥ "শীঘ্রই আমি কাফিরদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করব, কারণ তারা আল্লাহর সাথে এমন কিছুকে শরিক করেছে (যোগ করেছে), যার সপক্ষে তিনি কোনো দলিল (سُلْطَانًا - সুলতানা) নাযিল করেননি..." (৩:১৫১)

এখানে ‘যযার সপক্ষে আল্লাহ দলিল নাযিল করেননি’ কথাটি প্রমাণ করে, নাযিলকৃত আল কুরআনের বাইরের কোনো মনগড়া ইবাদত আল্লাহর কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

তাইতো আল্লাহ অর্ডিনেন্স জারি করেছেন এভাবেই-

আর বলো, হক এসেছে এবং বাতিল বিলীন হয়েছে। নিশ্চয় বাতিল হলো বিলীন। আয়াত ১৭:৮১ 

ভালো কাজের ভ্রান্ত ধারণা (মনস্তাত্ত্বিক আত্মপ্রবঞ্চনা):

যারা বিদাত বা নতুন প্রথার প্রচলন করে, তারা মূলত মনে করে যে তারা অনেক সওয়াবের কাজ করছে। আল কুরআন এই মনস্তাত্ত্বিক আত্মপ্রবঞ্চনার এক অসাধারণ চিত্র (cross-reference) তুলে ধরেছে:

➥ "বলুন, আমি কি তোমাদেরকে তাদের সংবাদ দেব, যারা আমলের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত? দুনিয়ার জীবনে যাদের সমস্ত চেষ্টা-সাধনা ব্যর্থ হয়ে গেছে, অথচ তারা ধারণা করে (يَحْسَبُونَ) যে, তারা খুব সুন্দর আমল করছে! তারাই সে সব লোক, যারা তাদের রবের আয়াতসমূহ এবং তাঁর সাথে সাক্ষাতের বিষয়কে অস্বীকার করে। ফলে তাদের সমস্ত আমল বাতিল হয়ে যায় (فَحَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ)..." (১৮:১০৩-১০৫)

বিদাত বা নতুন ইবাদত উদ্ভাবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এটি মানুষের জীবনের সমস্ত সৎকর্ম বা আমলকে সমূলে বিনষ্ট (حَبِطَتْ - হাবিতাত) করে দেয়। আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের সাথে অন্য কোনো বিধানকে শরিক করলে স্বয়ং নবী-রাসূলদের আমলও বাতিল হয়ে যাওয়ার সতর্কবাণী দেওয়া হয়েছে:

"নিশ্চয়ই আপনার প্রতি এবং আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি ওহী করা হয়েছে যে, যদি আপনি শিরক করেন, (মানে এর সাথে কোনো কিছু যুক্ত করেন) তবে অবশ্যই আপনার আমল বাতিল হয়ে যাবে (لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ) এবং আপনি অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।" (৩৯:৬৫)

"...আর যদি তারা শিরক করত বা যোগ করত, তবে তারা যা আমল করত, তা অবশ্যই বাতিল হয়ে যেত (لَحَبِطَ عَنْهُم مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ)।" (৬:৮৮)

অর্থাৎ, আল্লাহর বিধানে অন্য কারো মনগড়া বিধানকে স্বীকৃতি দেওয়াই হলো এক ধরনের সূক্ষ্ম শিরক। আল্লাহ সু.তা. বলেন:

"শীঘ্রই আমি কাফিরদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করব, কারণ তারা আল্লাহর সাথে এমন কিছুকে শরিক  করেছে মানে যুক্ত করেছে, যার সপক্ষে তিনি কোনো দলিল (سُلْطَانًا - সুলতানা) নাযিল করেননি..." (৩:১৫১)

নাযিলকৃত বিধান অপছন্দ করার পরিণতি হচ্ছে বিদাত আবিস্কারের কারন:

দ্বীনের নামে নতুন রীতিনীতি প্রচলনের পেছনে আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক কারণ হলো, আল্লাহর নাযিলকৃত সহজ ও সরল বিধান তাদের মনঃপূত হয় না। তারা তাতে জৌলুস বা আধিক্য খোঁজে। এর ফলে তাদের আমল বাতিল হয়ে যায়:

"এটি এ কারণে যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তারা তা অপছন্দ করেছে (كَرِهُوا مَا أَنزَلَ اللَّهُ), ফলে আল্লাহ তাদের সমস্ত আমল বাতিল করে দিয়েছেন (فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ)।" (৪৭:৯)

কারন, নাযিলকৃত আয়াত অপছন্দ করে বলেই তারা নতুন বিধি বিধান অনাযিলকৃত সোর্স থেকে সংগ্রহ, সংকলন ও অনুসরনে আমলে ব্যবহার করে এবং সব বাতিল হয়ে যাবে।

তাইতো আল্লাহ অর্ডিনেন্স জারি করেছেন এভাবেই-

আর বলো, হক এসেছে এবং বাতিল বিলীন হয়েছে। নিশ্চয় বাতিল হলো বিলীন। আয়াত ১৭:৮১ 

নাযিলকৃত বিধান বনাম মনগড়া আচার  (বিদাত): একটি তুলনামূলক চিত্র:

দ্বীনের নামে বর্তমানে এমন বহু আনুষ্ঠানিক (রিচুয়াল) বিধি-বিধান ও উৎসব পালন করা হচ্ছে, যার কোনো ‘সুলতান’ বা দলিল আল কুরআনে নেই। কুরআনের নাযিলকৃত আয়াতকে পাশ কাটিয়ে কিংবা আয়াতের বিপরীতে  এসব মনগড়া নিয়মকে ‘ফরজ’ বা ‘সুন্নাহ’ হিসেবে ইবাদত  সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দৃষ্টান্তের মাধ্যমে বিষয়টি অনুধাবন করা যায়:

উদাহরন-১: মনগড়া রোজা ও উপবাসের প্রচলন:

আল কুরআনে সিয়াম বা রোজার বিধান অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। আল্লাহ সু.তা. বলেছেন— "রমযান মাস, এতে নাযিল করা হয়েছে আল কুরআন... সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে এই মাস পাবে, সে যেন এই মাসে সিয়াম পালন করে।" (২:১৮৫)। কিন্তু এই সুস্পষ্ট বিধানের বাইরে গিয়ে মানুষ সওয়াবের আশায় মনগড়াভাবে শাওয়ালের ছয় রোজা, আশুরার রোজা, আরাফার দিনের রোজা ইত্যাদির প্রচলন করেছে। আল্লাহর নাযিলকৃত কিতাবে এই দিনগুলোতে সিয়াম পালনের কোনো নির্দেশ নেই। এটি মূলত আল্লাহর বিধানের ওপর নিজেদের পছন্দকে চাপিয়ে দেওয়ার শামিল। আল্লাহ প্রশ্ন করেছেন:

"বলুন! আল্লাহ তোমাদের যে রিযিক (বা বিধান) দিয়েছেন, তারপর তোমরা তার কিছু হালাল ও কিছু হারাম করেছ— বল তো, আল্লাহ কি তোমাদের এর অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহর ওপর মিথ্যা রটনা করছ?" (১০:৫৯)

উদাহরন-2:বিশেষ রাতের মনগড়া সালাত (শবে বরাত):

আল কুরআনে কেবল ‘লাইলাতুল কদর’ বা মহিমান্বিত রজনীর কথা বলা হয়েছে, যা রমযান মাসে অবস্থিত এবং যে রাতে কুরআন নাযিল হয়েছে (৯৭:১-৫)। সালাতের ক্ষেত্রে রাতের বেলা তাহাজ্জুদের কথা বলা হয়েছে (১৭:৭৯)। কিন্তু এসব বাদ দিয়ে শাবান মাসে ‘শবে বরাত’ নামে একটি মনগড়া রাতের উদ্ভাবন করা হয়েছে,  তারাবির নামাজ প্রচলন এবং তাতে নির্দিষ্ট রাকাতের বিশেষ সালাতের নিয়ম চালু করা হয়েছে, যার বিন্দুমাত্র অস্তিত্ব আল কুরআনে নেই।

উদাহরন-3: সাংস্কৃতিক উৎসবকে দ্বীনের রূপ দেওয়া (নওরোজ):

পারস্যের নববর্ষ ‘নওরোজ’ বা অন্যান্য আঞ্চলিক উৎসবগুলোকে দ্বীনের আবরণে পালন করা হচ্ছে। অথচ আল্লাহ সু.তা. দ্বীনকে সম্পূর্ণ করেছেন (৫:৩)। এতে নতুন কোনো উৎসব বা দিনক্ষণের পবিত্রতা আরোপ করা আল্লাহর দ্বীনকে বিকৃত করার নামান্তর।

উদাহরন-4: সালাতের কণ্ঠস্বর (মধ্যম পন্থা বনাম নীরবতা):

সালাত কায়েমের ক্ষেত্রে আল্লাহ রব্বুল আলামিন অত্যন্ত সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন:

"...আর আপনি আপনার সালাতে স্বর খুব উঁচুতে করবেন না, আবার একেবারে চুপিসারেও (تُخَافِتْ) পড়বেন না, বরং এর মাঝামাঝি একটি পথ অবলম্বন করুন।" (১৭:১১০)

অথচ বাস্তবে জোহর ও আসরের ৪ রাকাত সালাতে, মাগরিবের শেষ রাকাতে এবং ইশার শেষ দুই রাকাতে ইমাম সম্পূর্ণ চুপ থাকেন। মুক্তাদিরা বুঝতেই পারেন না ইমাম কী তিলাওয়াত করছেন। কুরআনের নির্দেশিত ‘মধ্যম পন্থা’ বাদ দিয়ে এই ‘নীরবতা’র প্রচলন সম্পূর্ণ অনাযিলকৃত একটি বিদাত।

■ এরা এতো বড় জালেম হয়ে উঠছে যে, এরা আর ফিরবে না (সব ফাঁসির আসামী?) যে কথা আল্লাহ জানিয়েছেন এভাবে-

➥ আর কে তার চেয়ে বড় জালিম, যাকে তার রবের আয়াতসমূহ দিয়ে উপদেশ দেয়া হয়, এরপরও সে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং যা তার দুহাত আগে পাঠিয়েছে তা ভুলে গিয়েছে। তা অনুধাবন করার ক্ষেত্রে নিশ্চয় আমরা তাদের অন্তরসমূহের ওপর আবরণ তৈরি করে দিয়েছি এবং তাদের কর্ণসমূহের মধ্যে বধিরতা। আর তুমি যদি তাদেরকে হিদায়েতের দিকে আহ্বান করো তাহলে তখন তারা কখনও কোনোদিন হিদায়েতপ্রাপ্ত হবেনা। আয়াত ১৮:৫৭

আর এরা সব ফাঁসির আসামী কেন? দ্র: আয়াত ৩৬:৬-৯)

◾️ সিয়ামের সময়কাল (‘ইলাল লাইল’ বনাম সূর্যাস্ত) বনাম বিদাতের প্রচলন:

সিয়াম পালনের সময়সীমা সম্পর্কে আল্লাহ সু.তা. বলেছেন:

"...অতঃপর রাত পর্যন্ত (إِلَى اللَّيْلِ - ইলাল লাইল) সিয়াম পূর্ণ করো..." (২:১৮৭)

এই আয়াতে ‘ইফতার’ বলে কোনো শব্দই নেই, বলা হয়েছে সিয়াম ‘পূর্ণ’ (ইতমাম) করতে। অথচ প্রচলিত নিয়মে ‘লাইল’ বা রাতের আগমন ঘটার আগেই, আকাশে দিন বিরাজমান থাকতেই সূর্যাস্তের সাথে সাথে সিয়াম ভঙ্গ করা হয়, যা আয়াতের সুস্পষ্ট লংঘন।

◾️ হায়েজকালীন ইবাদত (নিষেধাজ্ঞার মনগড়া সম্প্রসারণ):

নারীদের ঋতুস্রাব বা হায়েজ সম্পর্কে আল কুরআনের বিধান অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট:

"তারা আপনাকে হায়েজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, এটি একটি কষ্টদায়ক বিষয়। সুতরাং তোমরা হায়েজ অবস্থায় স্ত্রীদের থেকে (যৌনমিলন থেকে) বিরত থাকো এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হয়ো না..." (২:২২২)

এই আয়াতে কেবল স্বামী-স্ত্রীর যৌনমিলন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আল কুরআনের কোথাও নারীদেরকে এই সময়ে সালাত কায়েম, সিয়াম পালন, হজ্জের আনুষ্ঠানিকতা, জিকির বা কুরআন অধ্যয়নে বাধা দেওয়া হয়নি। অথচ প্রচলিত হাদিস বা ফিকহের নামে নারীদেরকে দিনের পর দিন ইবাদতের মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে।

অথচ আল্লাহ বলেন-

আর যে যিকরির রহমান থেকে (আল কুরআনের সংযুক্তি থেকে বা স্মরণ থেকে) বিরত থাকে (আবডালে বা অস্পষ্ট রাখে)  আমরা তার জন্য শয়তান নিযুক্ত করে দিই। তখন সে তার জন্য দোসর। এবং নিশ্চয় তারা, অবশ্যই তাদেরকে পথ হতে ফিরিয়ে দেয়, অথচ তারা মনে করে যে, তারা হিদায়েতপ্রাপ্ত। আয়াত ৪৩:৩৬-৩৭

◾️ অর্থনৈতিক ব্যয় বনাম মনগড়া শতকরা হিসেব (বিদাতের প্রচলন):

আল্লাহ রব্বুল আলামিন মানুষের উপার্জিত সম্পদ থেকে ব্যয়ের একটি চিরন্তন নীতি দিয়েছেন।

"...আর তারা আপনাকে জিজ্ঞাসা করে, তারা কী ব্যয় করবে? বলুন, যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত (الْعَفْوَ - আল-আফওয়া)..." (২:২১৯)

 অর্থাৎ, নিজের ও পরিবারের স্বাভাবিক প্রয়োজনের পর যা অতিরিক্ত থাকবে, তা কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে হবে। কিন্তু মানুষের মনগড়া বিধানে এই ‘আল-আফওয়া’-এর ধারণাকে সংকুচিত করে যাকাতের নামে ‘শতকরা আড়াই টাকা’ (২.৫%)-কে বাধ্যতামূলক (ম্যান্ডেটরি) করে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সমাজের মুষ্টিমেয় মানুষের কাছে পাহাড়সম সম্পদ কুক্ষিগত থাকলেও, ওই সামান্য অংশটুকু দিয়েই তারা দায়মুক্তির মিথ্যা আত্মতৃপ্তি লাভ করছে। 

◾️ হজ্জের আনুষ্ঠানিকতায় অনাযিলকৃত রীতিনীতি (বিদাত):

আল কুরআনে হজ্জের আনুষ্ঠানিকতা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। যেমন— সাফা ও মারওয়ার সায়ি, আরাফাত থেকে ফেরা, মাশ‘আরিল হারামে আল্লাহর জিকির ইত্যাদি। কিন্তু বর্তমান হজ্জে ‘শয়তানকে পাথর মারা’র মতো এমন এক রিচুয়াল পালন করা হচ্ছে, যার বিন্দুমাত্র উল্লেখ আল কুরআনে নেই।

◾️ পোশাকের মনগড়া মানদণ্ড অথচ নাযিলকৃত কুরআন কী বলে?

‘টাকনুর নিচে কাপড় পরলে জাহান্নামে যেতে হবে’— এমন কঠোর বিধান দ্বীনের নামে সমাজে প্রচলিত। অথচ পোশাকের ক্ষেত্রে আল কুরআনের মৌলিক দর্শন হলো শালীনতা ও তাকওয়া:

"...আর তাকওয়ার পোশাক (لِبَاسُ التَّقْوَىٰ)— সেটাই সর্বোত্তম..." (৭:২৬)

ইবাদতের সঠিক পদ্ধতি: ‘যেভাবে আল্লাহ শিখিয়েছেন’:

ইবাদত কীভাবে করতে হবে, তার জন্য আল্লাহ সু.তা. সুস্পষ্ট মানদণ্ড দিয়েছেন:

➥ নিশ্চয় এর মধ্যে (কুরআনের মধ্যে) ইবাদতকারী জনগোষ্ঠীর জন্য অবশ্যই সব বালাগ বার্তা (প্রয়োজনীয় যা কিছু) রয়েছে-আয়াত ২১:১০৬

"...সুতরাং তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো, ঠিক সেভাবে, যেভাবে তিনি তোমাদের শিখিয়েছেন, যা তোমরা জানতে না।" (২:২৩৯)

"...এবং তাঁকে স্মরণ করো যেভাবে তিনি তোমাদের পথনির্দেশ দিয়েছেন..." (২:১৯৮)

 অর্থাৎ, আল্লাহর জিকির বা ইবাদতের পদ্ধতি অবশ্যই আল কুরআনের মাধ্যমে নির্দেশিত হতে হবে।

◾️‘আহসানুল হাদীস’ বনাম ‘লাহওয়াল হাদীস’:

আল কুরআনের নজম (বিন্যাস) ও বিপরীতার্থক (Antonym) শব্দের প্রয়োগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আল্লাহ সু.তা. আল কুরআনকে সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ ‘হাদীস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন:

"আল্লাহ নাযিল করেছেন সর্বোত্তম বাণী (أَحْسَنَ الْحَدِيثِ - আহসানাল হাদীস)..." (৩৯:২৩)

কিন্তু এই ‘আহসানুল হাদীস’-কে পাশ কাটিয়ে মানুষ দ্বীনের নামে নানা অনাযিলকৃত কিতাব ও ফিকহ শাস্ত্র বানিয়ে নিয়েছে। আল্লাহ সু.তা. এই মনগড়া বাণীগুলোকে ‘লাহওয়াল হাদীস’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন:

"মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা অজ্ঞানতাবশত আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য অসার বাক্য (لَهْوَ الْحَدِيثِ - লাহওয়াল হাদীস) কিনে নেয়..." (৩১:৬)

কিন্তু এই ‘আহসানুল হাদীস’-কে পাশ কাটিয়ে মানুষ দ্বীনের নামে নানা অনাযিলকৃত কিতাব বানিয়ে নিয়েছে, যাকে আল্লাহ ‘লাহওয়াল হাদীস’ (অসার কথা) বলেছেন (৩১:৬)। এই ধর্মবেত্তাদের প্রবর্তিত ‘লাহওয়াল হাদীস’-এর অন্ধ অনুসরণের ফলে আজ অধিকাংশ মুসলিম কুরআন অধ্যয়নের প্রয়োজনবোধ করে না। নাযিলকৃত কুরআন কেবল না বুঝে তিলাওয়াতের বস্তুতে পরিণত হয়েছে। অথচ নির্দেশ ছিল:

"তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, তোমরা কেবল তারই অনুসরণ (ইত্তেবা) করো..." (৭:৩)

"আর এটিই আমার সরল পথ (ওয়া আন্না হাজা সিরাতুল মুস্তাকিম), সুতরাং তোমরা এর অনুসরণ করো। অন্যান্য পথের অনুসরণ কোরো না..." (৬:১৫৩)

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, যখন কোনো ব্যক্তি নবী মুহাম্মাদ (সালামুন আলাইহে)-এর প্রকৃত অনুসরণ করে কেবল নাযিলকৃত আল কুরআন বুঝে মানার চেষ্টা-সাধনায় রত হন, তখন সমাজের কথিত আলেমরা চরম নাখোশ হন। তারা এই কুরআন-অনুসারীদের ‘আহলে কুরআন’ নামক ট্যাগ লাগিয়ে তাচ্ছিল্য ও অপমান করার চেষ্টা করে। অথচ আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে ধরা ছাড়া মুমিনের আর কোনো পরিচয় হতে পারে না। এই করুণ বাস্তবতার চিত্র আল্লাহ সু.তা. পূর্বেই তুলে ধরেছেন রাসূলের আক্ষেপের মাধ্যমে:

আর রাসূল বলবে, ‘হে আমার রব! নিশ্চয়ই আমার সম্প্রদায় এই কুরআনকে পরিত্যক্ত (مَهْجُورًا - মাহজুরা) করে রেখেছে’।" (২৫:৩০)

আল কুরআন মাজীদকে কেবল না বুঝে তিলাওয়াত করা (recitation), অন্ধভাবে মুখস্থ করা (Hifz) এবং এর শব্দের উচ্চারণের মধ্যে সওয়াব খোঁজার মাধ্যম বানিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিধান ও চিন্তার উৎস হিসেবে তাই আল কুরআন আজ পরিত্যক্ত। 

যৌক্তিক পূর্ণতা ও সমাপ্তি:

আল কুরআনের উপরোক্ত গভীর অনুধ্যান ও আয়াতগুলোর আন্তঃসংযোগ (interconnection) থেকে এই অকাট্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে— বিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্য কোনো উৎসকে যুক্ত করা এক ধরনের শিরক, যা মানুষের সারা জীবনের সমস্ত সৎকর্ম বা আমলকে বাতিল (حَبِطَتْ) করে দেয়। মানুষ যতই সৎ নিয়তে নতুন প্রথার (বিদাত) প্রচলন করুক না কেন, আল্লাহর কাছে ওহী বহির্ভূত কোনো আমলের এক বিন্দুও ওজন নেই (১৮:১০৫)।

হাজারো বিদাতের মধ্যে উদাহরন হিসাবে দুএকটি তুলে ধরা হলো যেমন-সালাতের নীরবতা, সিয়ামের সময়সীমা বিকৃতি, নারীদের ইবাদতে মনগড়া বাধা, বা হজ্জের কাল্পনিক আচার— এগুলো সবই আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অপছন্দ করার এবং ‘লাহওয়াল হাদীস’-এর অনুকরণ করার ফল। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী এই আল কুরআনের ‘ইত্তেবা’ বা অনুসরণের মাধ্যমেই কেবল সকল প্রকার মনগড়া নব-উদ্ভাবন বা বিদাত থেকে মুক্ত হয়ে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে চলা সম্ভব।

যেহেতু আল কুরআনে বিদাত, আমল বাতিল, শিরক এবং ওহীর অনুসরণের মতো বিষয়গুলোর এত গভীর ও পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ দেওয়া হয়েছে, তাই এর বাইরে নতুন করে আর কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী এই আল কুরআনের ‘ইত্তেবা’ বা অনুসরণের মাধ্যমেই কেবল সকল প্রকার মনগড়া নব-উদ্ভাবন থেকে মুক্ত হয়ে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে চলা সম্ভব।

তাইতো আল্লাহ আগাম প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন এভাবে-

➥ আল্লাহর সেই আয়াতসমূহ, যা আমরা তোমার উদ্দেশে সত্যতার সাথে পাঠ করি। অতএব, আল্লাহর ও তাঁর আয়াতসমূহের পরে তারা কোন হাদিসে বিশ্বাস করবে? আয়াত ৪৫:৬

➥ তাদের জন্য কি যথেষ্ট হয় না যে আমরা, আমরাই তোমার ওপর কিতাব নাযিল করেছি, যা তাদের সামনে পাঠ করা হয়? নিশ্চয় সেটার মধ্যে এমন জনগোষ্ঠীর জন্য অবশ্যই অনুগ্রহ ও উপদেশ রয়েছে, যারা ঈমান রাখে-আয়াত ২৯:৫১

▓▒░ দুআ-তাসবিহ ░▒▓

প্রাসঙ্গিক কুরআনি দুআ-তাসবিহ

দ্বীনের সঠিক পথে অবিচল থাকার এবং মনগড়া পথ বা বক্রতা থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল কুরআনে চমৎকার দুআ শেখানো হয়েছে:

সরল পথে পরিচালিত হওয়ার দুআ:

اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ . صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ

উচ্চারণ: ইহদিনাস্ সিরা-ত্বাল মুস্তাক্বীম। সিরা-ত্বাল্লাযীনা আন‘আমতা ‘আলাইহিম গাইরিল মাগদূবি ‘আলাইহিম ওয়ালাদ্ দ-ল্লীন।
অর্থ: আমাদেরকে সরল পথ দেখান। তাদের পথ, যাদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ করেছেন; তাদের পথ নয়, যারা গযবপ্রাপ্ত এবং পথভ্রষ্ট। (আল কুরআন, ১:৬-৭)

অন্তরকে বক্রতা থেকে রক্ষার দুআ:

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ

উচ্চারণ: রব্বানা- লা তুযিগ কুলূবানা- বা‘দা ইয হাদাইতানা- ওয়াহাব লানা- মিল্লাদুনকা রাহমাহ; ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহা-ব।

অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদেরকে হিদায়াত দান করার পর আমাদের অন্তরসমূহ বক্র করে দেবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই মহাদাতা। (আল কুরআন,৩:৮)

رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا ۖ إِنَّكَ أَنتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ وَتُبْ عَلَيْنَا ۖ إِنَّكَ أَنتَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
উচ্চারণ: রব্বানা-তাক্বাব্বাল্ মিন্না; ইন্নাকা আনতাস্ সামী‘উল্ ‘আলীম্ অতুব্ ‘আলাইনা-ইন্নাকা আন্তাত্ তাওয়্যা-বুর রাহীম্।

অর্থ: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পক্ষ থেকে ক্ববূল করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিই সর্বস্পন্দনগ্রাহী, বিস্তৃত জ্ঞানসম্পন্ন। এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি, আপনিইতো ক্ষমাশীল, দয়ালু। (আল কুরআন ২:১২৭, ২:১২৮)

وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
অর্থ: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ রব্বুল আলামিনের।

Post a Comment (0)
Previous Post Next Post